Showing posts with label চৈতন্যদেব / বৈষ্ণব সমাজ. Show all posts
Showing posts with label চৈতন্যদেব / বৈষ্ণব সমাজ. Show all posts

Wednesday, 26 August 2020

ভগবান হতে তাঁর ভক্তরা বড় ?



ভগবান হতে তাঁর ভক্তরা বড় ?

Bijoy Chandra Nath

এই যে আপনি বলেছন না যে- "চৈতন্য মহাপ্রভু কৃষ্ণের থেকেও ঊর্ধ্বে", এই কথা শুধু আপনি না, কেউ যদি আমার সামনে বলে, তাকে এমন চড় মারবো যে সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে শুধু পড়েই যাবে না, তার দু চারটি দাঁতও খুলে যেতে পারে।

চৈতন্যদেব, শ্রীকৃষ্ণের চেয়েও বড়, তাই না ? তাহলে চৈতন্যদেবকে পুরীর মন্দিরের পাণ্ডারা খুন করতে পারে কিভাবে ? অবতারদের শক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার ? চৈতন্যদেব অবতার হলে তাকে কেউ কি খুন করতে পারতো ? শ্রীকৃষ্ণের জীবনী পড়েছেন ? তাঁর শক্তি সম্পর্কে কোন ধারণা আছে আপনার ? অন্যান্য শক্তির ঘটনার কথা না হয় বাদই দিলাম, বালক বয়সে কংসের মতো একজন যোদ্ধাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে শ্রীকৃষ্ণ তাকে হত্যা করেছিলেন। চৈতন্যদেব যদি, শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে বড় হয়, তাহলে তো পুরীর মন্দিরের কয়েকজন পাণ্ডা কেনো, পুরীর সমস্ত লোক মিলেও তো চৈতন্যদেবকে হত্যা করতে পারতো না। কারণ, দুর্যোধন একবার শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার চেষ্টা করেছিলো, সমগ্রকে সৈন্যকে কাজে লাগিয়েও দুর্যোধন, শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করতে পারে নি। শ্রীকৃষ্ণ বুক ফুলিয়ে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। আর সেই কৃষ্ণের চেয়ে বড় আপনার চৈতন্যদেব পুরীর মন্দির থেকেই বের হতে পারে না, উধাও হয়ে যায় ! চৈতন্যদেব, কৃষ্ণের চেয়ে কত বড়, সেটা বুঝতে পারছেন ?

আপনি বলেছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, তার থেকে তার ভক্তরাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ। আপনি এই কথা বলেছেন ভাগবতের রেফারেন্সের ভিত্তিতে। ভাগবত- কখন, কে রচনা করেছে, তার কোনো ধারণা আছে আপনার ? বিষ্ণুপুরাণের ১০ জন অবতার, ভাগবতে এসে হয়েছে বাইশ জন, তাদের মধ্যে একজন গৌতম বুদ্ধ, যে বুদ্ধের জন্ম, শ্রীকৃষ্ণ বা ব্যাসদেবের সময়ের অন্তত প্রায় ২৭০০ বছর পর, তাহলে- ভাগবত যদি ব্যাসদেবের হাতে রচিত হয়, সেই ভাগবতে গৌতম বুদ্ধে কথা উল্লেখ থাকে কিভাবে ? 

ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের প্রথম অধ্যায়ে বলা আছে- "মহামুনি নারায়ণ কর্তৃক বিরচিত এই পরম রমণীয় ভাগবত শাস্ত্র শ্রবণেচ্ছু পুণ্যবান ব্যক্তিগণ শ্রবণমাত্রেই ঈশ্বরকে হৃদয়ে ধারণ করতে সমর্থ হন।" আরেক জায়গায় বলা আছে, "শ্রীমদ্ভাগবত শুকমুখ হতে নির্গত হয়েছে অখণ্ডিতভাবে।" আবার ভাগবতের দ্বিতীয় অধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, লোমহর্ষণপুত্র উগ্রশবা বা সূত মুনিদের নিকট তা বর্ণনা করছেন এবং সে বর্ণনার শুরুতেই বলেছেন- "সেই সর্বভূতাত্মা মহামুনি শুকদেবকে প্রণাম করছি।" ভাগবত যদি সরাসরি বেদব্যাসের হাতে রচিত হয়, তাহলে এই অসঙ্গতিগুলো কি থাকতে পারে ? বেদব্যাস কি তার পুত্র শুকদেবকে প্রণাম করতে যাবে ?

আমার ধারণা গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের পর, গৌতমবুদ্ধকে সনাতন ধর্মের একজন অবতার প্রমাণ করার জন্য কেউ বেদব্যাসের নাম দিয়ে এই ভাগবত রচনা করেছে। যে ভাগবতের অনেক ক্ষেত্রেই শ্রীকৃষ্ণ প্রায় লম্পট হিসেবে উপস্থাপিত। সেই ভাগবতের রেফারেন্স দিয়ে আপনি বলছেন, শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে চৈতন্যদেব বড়! শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্তের পূজাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ! শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্তরাই বড়!

কোনো কথা বলার আগে সেটার বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্তরাই যদি বড় হয়, তারাই যদি শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে বেশি পূজ্য হয়, তাহলে যে কেউ তো নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত বলে দাবী করতে পারে এবং অন্যদের কাছে পূজাও চাইতে পারে। তাহলে কে কাকে পূজা করবে ? আবার একজন কাউকে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত বলে ধরে নিয়ে তার পূজা করতে পারে, কিন্তু অন্যজন হয়তো তাকেই বড় ভক্ত বলে মনে না ক'রে, অন্য কাউকে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত মনে করতে পারে। এভাবে কে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত, সেটা নির্ণয়ে তো সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। যেমন- আপনি চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত মনে করেন, কিন্তু আমি তো চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত বলে মনে করি না, আপনি আমার চিন্তা বা সিদ্ধান্তকে ঠেকাবেন কিভাবে বা আমিই আপনার চিন্তা বা সিদ্ধান্তকে ঠেকাবো কিভাবে ? কোনো ধর্মীয় তত্ত্বকে এভাবে জনগনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না, সেটা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আর যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা কখনো বাস্তব ব্যাপার নয়, একারণেই -ভগবানের থেকে তার ভক্তরা বড়- এমন কথা সম্পূর্ণ অবাস্তব, ভিত্তিহীন এবং সমাজের বিশৃঙ্খলার জনক।

কেউ যখন কারো ভক্ত হয়, সে তখন তাকে আদর্শ হিসেবে মানে এবং সর্বান্তকরণে তার মতো হওয়ার চেষ্টা করে। চৈতন্যদেবের মধ্যে কি এমন কোনো গুন ছিলো, যা কৃষ্ণের আদর্শকে ধারণ করে ? করে না। তাহলে চৈতন্যদেব কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভক্ত হয় ? আমার তো মনে হয়, আমিই বর্তমানে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড় ভক্ত; কারণ, যারাই শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে কটূক্তি করে, তাদের সকলের কথার জবাবই শুধু আমি দিই না, শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত কলুষিত চরিত্র, যার স্রষ্টা ও প্রচারক বৈষ্ণবরা, শ্রীকৃষ্ণের সেই কলুষিত ভাবমূর্তিকে সাফসুতরো করার জন্য অনবরত শাস্ত্র ঘেঁটে প্রকৃত সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরছি, যাতে শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারণা সমাজে না থাকে এবং আমার জানা মতে এই কাজ আমার আগে কখনো কেউ আমার মতো ক'রে করে নি। এই প্রেক্ষাপটে আমি যদি নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড় ভক্ত বলে দাবী করি, সেটা কি অযৌক্তিক হবে ? হবে না। তাহলে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড় ভক্ত হিসেবে আমি যদি আপনার কাছে পূজা দাবী করি, আপনি কি আমার পূজা করবেন ? করবেন না। কারণ, আপনি আমাকে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড় ভক্ত বলে মনে করেন না। এই কথাই তো আমি বলছি- একেকজনের ভাবনা একেকরকম, তাই শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্তরা বড় বা শ্রেষ্ঠ, এটা একেবারে বোগাস একটা কথা, যে বোগাস কথা পরিকল্পনা করে ঢোকানো হয়েছে পিতৃপরিচয়হীন ভাগবতে।

শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্ত শ্রেষ্ঠ, এই কথা ভাগবতের যেখানে বলা হয়েছে, সেই একাদশ স্কন্ধে গিয়ে দেখা যাক, এই কথাটা প্রক্ষিপ্ত হতে পারে কি না ?

এখানে শ্রীকৃষ্ণ উদ্ভবকে বলেছেন, "ভক্তির পরম কারণ ভক্তিযোগ তোমাকে আমি বলবো। সর্বদা আমার অমৃতময়ী কথায় শ্রদ্ধা, নিত্য আমার নামকীর্তন, আমার পূজায় নিষ্ঠা, সর্বদা আমার স্তুতি দ্বারা স্তব, আমার পরিচর্যায় সর্বদা আমার সমাদর, অষ্টাঙ্গে অভিবাদন, আমার পূজা হতে আমার ভক্তের অধিক পূজা, সর্বভূতে আমার স্ফুরণ লক্ষ্য করা, আমার উদ্দেশ্যে শারীর চেষ্টা, বাক্য দ্বারা আমার গুনকীর্তন করা, আমাতে মন অর্পণ, সর্বকাম পরিত্যাগ, আমার ভজনের জন্য ভজনবিরোধী অর্থের পরিত্যাগ, ভোগসাধন অনিবেদিত চন্দনাদি ও সুখ অর্থাৎ পুত্র লালনাদি পরিত্যাগ, ইষ্ট বা যজ্ঞ ও দান, পূর্ত অর্থাৎ কূপ, পুষ্করিণী প্রভৃতি খনন, দান, হোম, ব্রত ও তপস্যা আমার জন্য করলে এই সকল আমার ভক্তির কারণ হয়।" 

এখন এই প্যারা হতে- আমার পূজা হতে আমার ভক্তের অধিক পূজা- বাক্যটি তুলে দিয়ে পড়ুন, দেখুন তো শ্রীকৃষ্ণের কথার ভাব ঠিক থাকে কি না ? এই অনুচ্ছেদের মধ্যে- আমার পূজা হতে আমার ভক্তের অধিক পূজা- ঢুকিয়ে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের কথাগুলোকেই তো মূল্যহীন করে ফেলা হয়েছে। কারণ, শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে তার ভক্তকেই যদি শ্রেষ্ঠ আমি মনে করি, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ যে বলেছেন, 

"আমার অমৃতময়ী কথায় শ্রদ্ধা, নিত্য আমার নামকীর্তন, আমার পূজায় নিষ্ঠা, সর্বদা আমার স্তুতি দ্বারা স্তব, আমার পরিচর্যায় সর্বদা আমার সমাদর, অষ্টাঙ্গে অভিবাদন, সর্বভূতে আমার স্ফুরণ লক্ষ্য করা, আমার উদ্দেশ্যে শারীর চেষ্টা, বাক্য দ্বারা আমার গুনকীর্তন করা, আমাতে মন অর্পণ"- এসবে আমার প্রয়োজন কী ? আমি শ্রীকৃষ্ণের যে ভক্তের পূজা করবো, আমি তার কথাই শুনবো, তার প্রতিই আমার সকল মনোযোগ নিবিষ্ট করবো। কিন্তু গীতায় বলা হচ্ছে- শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কেউ কারো জন্য কিছু করতে পারে না, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কোনো দেব-দেবী আপনাকে মুক্তি দিতেও সক্ষম নয়, তাহলে গীতার সাথে ভাগবতের এই বাণী- আমার পূজা হতে আমার ভক্তের অধিক পূজা-এর মিল কোথায় ?

তাছাড়া এই অনুচ্ছেদে- "সর্বকাম পরিত্যাগ, আমার ভজনের জন্য ভজনবিরোধী অর্থের পরিত্যাগ, ভোগসাধন অনিবেদিত চন্দনাদি ও সুখ অর্থাৎ পুত্র লালনাদি পরিত্যাগ।" কথাগুলোও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের সাথে বেমানান। কারণ, "সর্বকাম পরিত্যাগ" এর কথা যদি তিনি ভাগবতে বলেন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ গীতার ৭/১১ নং শ্লোকে কেনো বলেছেন যে- 'আমিই প্রাণীগণের ধর্মের অবিরোধী কাম' ? এরপর- আমার ভজনের জন্য ভজনবিরোধী অর্থের পরিত্যাগ- বিষয়টি আমার নিজেরই মাথাতেই ঢোকেনি যে এখানে ভাগবত রচয়িতা আসলে কী বলতে চেয়েছেন, অর্থ পরিত্যাগের তো কোনো প্রশ্নই আসে না; কারণ, অর্থই সকল শক্তির মূল। এরপর - "পুত্র লালনাদি পরিত্যাগ" ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের বিরোধী; কারণ, শ্রীকৃষ্ণের পুত্র ও স্ত্রী ছিলো, তিনি তাদেরকে পরিত্যাগ করেন নি।

শুধু তাই নয়, ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণ যদি - আমার পূজা হতে আমার ভক্তের অধিক পূজা- জাতীয় কোনো কথা বলে থাকেন, তাহলে গীতার ভক্তিযোগেও এরকম কোনো ইঙ্গিত নিশ্চয় থাকা দরকার, কিন্তু গীতাতে কি সেরকম কোনো কিছু বলা আছে ? নেই। বরং গীতায় ভক্তিযোগ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকে বলা আছে- "হে পার্থ, যাঁহারা আমাতে মন নিবিষ্ট করিয়া নিত্যযুক্ত হইয়া আমাকেই পরম শ্রদ্ধার সহিত উপাসনা করেন, তাঁহারাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ সাধক।"

ভক্তিযোগ প্রসঙ্গেই যেহেতু ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণ, উদ্ভবকে ঐসব কথা বলেছেন, যার মধ্যে আপনারা পান বা বিশ্বাস করেন- শ্রীকৃষ্ণের পূজা হতে তার ভক্তের পূজা শ্রেষ্ঠ- তাহলে, গীতার ভক্তিযোগ অধ্যায়ে এরকম কোনো কথা থাকবে না কেনো ? গীতার ভক্তিযোগে এরকম কোনো কথা নেই, কারণ, ভাগবতের ঐ কথা আসলে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন। ভাগবত যেহেতু বেদব্যাসের হাতে রচিত নয়, তাই কেউ শ্রীকৃষ্ণের নামে যা তা লিখে তা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে চালানোর চেষ্টা করেছে এবং অনেক তথ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে ছোট করার অপচেষ্টা করেছে। কারণ, এটা তো বাস্তব যে, আপনার মতো যারা ভাবগতের ঐ কথাকে বিশ্বাস করে, তারা শ্রীকৃষ্ণকে বড় নয়, চৈতন্যদেবকেই বড় মনে করে এবং তার আরাধানা করে। অথচ চৈতন্যভাগবত এবং চৈতন্যচরিতামৃত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে- চৈতন্যদেব, সবসময় তার ভক্ত শিষ্যদেরকে কৃষ্ণ নাম করতে নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি তিনি নিজেও সব সময় কৃষ্ণ নামে উন্মাদ ছিলেন।

এই কমেন্টের শেষে আপনি বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যরূপে আবির্ভূত হন কলি যুগে, হরিনাম সংকীর্ত্তন প্রচার করার জন্য।

এ প্রসঙ্গে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি- অবতার রূপে পৃথিবীতে কে আবির্ভূত হন- শ্রীকৃষ্ণ, না বিষ্ণু ? শাস্ত্র মতে- বিষ্ণু পৃথিবীতে অবতার রূপে আবির্ভূত হন এবং শ্রীকৃষ্ণ নিজেও বিষ্ণুর একজন পূর্ণ অবতার। সকল অবতারই যেহেতু বিষ্ণুর স্বরূপ, সেহেতু এক অবতার কখনো অন্য অবতারের ভক্ত হয় না। চৈতন্যদেবকে যেহেতু আপনারা অবতার মনে করেন, তাহলে চৈতন্যদেব কিভাবে বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণের এমন অন্ধ উন্মাদ ভক্ত হয় ?

যদিও শ্রীকৃষ্ণ গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৪১ নং শ্লোকে বলেছেন- 'এই পৃথিবীতে যাহা কিছু ঐশ্বর্যযুক্ত, শ্রী সম্পন্ন, অথবা শক্তিসম্পন্ন দেখ, তাহাই আমার শক্তির অংশ হতে উদ্ভূত বলিয়া জানিবে'।

-কিন্তু এটা, শ্রীকৃষ্ণই যে আবার পৃথিবীতে অবতার রূপে অবতীর্ণ হন, সেই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে না। গীতার ১০/৪১ নং শ্লোকের ভিত্তিতে চৈতন্যদেবকে যদি শ্রীকৃষ্ণের অবতার হিসেবে স্বীকার করা হয়, তাহলে পৃথিবীতে অন্তত কয়েক হাজার অবতার পাওয়া যাবে, যারা চৈতন্যদেবের চেয়ে জ্ঞানে গুনে শ্রেষ্ঠ, জনপ্রিয় বা শক্তিসম্পন্ন। তাই বৈষ্ণব প্রভাবিতরা যে বলে- চৈতন্যদেব হলেন অবতারের অবতারী, সেটা শুধু ভিত্তিহীন নয়, শাস্ত্রমতে একেবারে বোগাস কথা।

এতক্ষণ কী বললাম, আশা করি বুঝতে পেরেছেন, তাই ভবিষ্যতে আমার কোনো পোস্টে কমেন্ট করার আগে আরেকটু ভেবে কমেন্ট করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 12 August 2020

কে মহাপ্রভু- চৈতন্যদেব, না শ্রীকৃষ্ণ ?


কে মহাপ্রভু- চৈতন্যদেব, না শ্রীকৃষ্ণ ?

'মহা' একটি বিশেষণ পদ, এর ইংরেজি হলো- গ্রেট, যার বাংলা প্রতিশব্দগুলো হলো- আকার, পরিমাণ বা মাত্রায় সাধারণের উর্ধ্বে, বড়, মস্ত, বিশিষ্ট ক্ষমতা বা গুন সম্পন্ন, গুরুত্বপূর্ণ, সুবিদিত, উঁচু পদমর্যাদাসম্পন্ন, প্রবল, প্রচণ্ড।

বাংলায় মহা যুক্ত শব্দগুলো, যেমন- মহাসাগর, মহাগুরু, মহাকবি, মহাকর্ষ, মহাকাব্য, মহাকায়, মহাকাল, মহাকালী, মহাকাশ, মহাজন, মহাজ্ঞান, মহাতেজ, মহাদেব, মহাদেশ, মহানগর, মহাপাপ, মহাপ্রয়াণ, মহাপ্রলয়- এর সবকিছুর দ্বারাই শেষ বা চুড়ান্ত কিছুকে বোঝায়; এককথায় যে শব্দের সাথে মহা যুক্ত হবে, সেটাই হবে শেষ বা চুড়ান্ত কথা, তার পরে আর কোনো কথা নেই।

মুসলমানরাও মহানবী শব্দ দ্বারা মুহম্মদকে বোঝায় এবং তাই মুসলমানদের কাছে মুহম্মদই শেষ কথা, এমনকি মুসলমানদের কাছে মুহম্মদ, ক্ষেত্র বিশেষে আল্লার চেয়েও বড়; একারণে দেখবেন, আল্লার সমালোচনা করলে মুসলমানরা যতটা না ক্ষেপে, মুহম্মদের সমালোচনা করলে ক্ষেপে তার কয়েকগুন।

আল্লা কাল্পনিক ব্যাপার, আল্লাকে কেউ কখনো দেখে নি, এমনকি মুহম্মদ যে বলে গেছে, মেরাজের ঘটনার সময় সে আল্লার সাথে দেখা করে এসেছে, সেটাও পুরোটাই বোগাস। কাল্পনিক আল্লাকে বাদ দিলে মুসলমানদের কাছে ঐতিহাসিক সত্য হলো মুহম্মদ, সেকারণে তারা তাকে চুড়ান্ত মনে করে এবং এই চুড়ান্ত মনে করেই মুসলমানরা মুহম্মদকে বলে মহানবী। কিন্তু হিন্দু সমাজে মহাপ্রভু বলে যাকে আমরা বলে থাকি, এবার দেখা যাক তার অবস্থা কী ?

উপরেই বলেছি মহা যুক্ত শব্দগুলো দ্বারা বোঝায় চুড়ান্ত বা শেষ অবস্থা; এককথায় কোনো শব্দের সাথে যদি মহা যুক্ত থাকে, তার চেয়ে বড় আর কিছু থাকবে না বা তারপর আর কোনো কথা থাকবে না। কিন্তু সনাতন ধর্মে মহপ্রভু বলে খ্যত চৈতন্যই কি শেষ কথা ? বাস্তবতা বলে মোটেই তা নয়। কারণ, মহাপ্রভু বলে কথিত চৈতন্যদেবের উপরে সনাতন ধর্মের ঐতিহাসিক সত্য শ্রীকৃষ্ণ রয়েছেন, যে শ্রীকৃষ্ণ শুধু সকলেরই আরাধ্য নয়, মহাপ্রভু বলে খ্যাত চৈতন্যদেবেরও আরাধ্য। শুধু তাই নয়, চৈতন্যদেবের উপরে সনাতন ধর্মের আরও ঐতিহাসিক সত্য বা সত্ত্বা হলো- শ্রীরাম চন্দ্র, বলরাম, পরশুরামসহ অবতারগণ; এনারা তো বিষ্ণুর ডাইরেক্ট অবতার, অন্যদিকে চৈতন্য তো বিষ্ণুর কোনো অবতারই নন। তাহলে যেখা্নে সনাতন ধর্মের ঐতিহাসিক সত্য বিষ্ণুর অংশ অবতারগণ রয়েছেন, রয়েছেন বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, গীতা অনুসারে যিনি জগতের প্রভু অর্থাৎ মহাপ্রভু, তাকে বাদ দিয়ে আমরা মহাপ্রভু বলে উল্লেখ করছি চৈতন্যদেবকে; আর এটা করে নিজের জনককে পিতা বলার পরিবর্তে আমরা এমন একজনকে আমাদের পিতা বলছি, যিনি নিজেও পরমপিতা শ্রীকৃষ্ণের সন্তান এবং ভক্ত। 

বাপকে বাপ না বলে আমরা যদি বড় ভাইকে বাপ বলি বা দূর গাঁয়ের কোনো অপরচিতকে বাবা বলে ডাকি, সেটা যেমন শুধু আমাদের বাপেরই অপমান নয়, আমাদের নিজেদের জন্যও লজ্জার; তেমনি মহাপ্রভু হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকে সম্বোধন না করে, চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু মনে করে, আমরা জগতপিতা শ্রীকৃষ্ণকেই অপমান করছি, যেটা বোঝার মতো বোধ-বুদ্ধিও আমাদের নেই, আর যাদের বোধ-বুদ্ধি থাকে না, তাদের লজ্জাও কি থাকে ? থাকে না। আমরা হিন্দুরা হচ্ছি সেই নির্লজ্জ ও নির্বোধ জাতি।

জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী জগতে তিনটি গণ বা শ্রেণীর মানুষ আছে- দেবগণ, নরগণরাক্ষসগণ। রাক্ষসগণের মানুষেরা জগতের সকল অশান্তির কারণ; নরগণের মানুষ হলো সাধারণ মানুষ আর দেবগণের মানুষ হলো দেবতা স্বভাবের মানুষ। দেব স্বভাবের মানুষ ছোট বেলা থেকেই পরোপকারী, সমাজ সেবক এবং ধর্মানুরাগী; এই সূত্রে চৈতন্য ছিলেন দেব স্বভাবের মানুষ, তাই তাকে রামকৃষ্ণদেবের মতো চৈতন্যদেব বলা যেতেই পারে এবং যেটা বলা হয়ও, কিন্তু কিছুতেই চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু বলা যায় না বা বলা উচিত নয়; কারণ, তাহলে জগৎপ্রভু শ্রীকৃষ্ণকে অপমান বা অস্বীকার করা হয়। 

আশা করছি উপরের আলোচনা থেকে চৈতন্যদেব যে মহাপ্রভু নয়,  এই বিষয়টি বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

'ওঁ সহানা ভবতুঃ'(ঈশ্বর আমাদেরকে রক্ষা করুন।)

Tuesday, 11 August 2020

বৈষ্ণব মতবাদে শ্রীকৃষ্ণ নয়, চৈতন্যদেবই বড় :


বৈষ্ণব মতবাদে শ্রীকৃষ্ণ নয়, চৈতন্যদেবই বড় :

বৈষ্ণব সমাজে মহাপ্রভুর ভোগ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কেউ মারা গেলে বাধ্যতামূলকভাবে মহাপ্রভুর ভোগ তো দিতেই হয়, কেউ কেউ ছেলে মেয়ের অন্নপ্রাশনেও মহাপ্রভুর ভোগ দেয়, আবার কেউ শখ করেও দেয়।

যা হোক, বৈষ্ণব সমাজের এই মহাপ্রভুর ভোগ মানে চৈতন্যদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভোগ, চৈতন্যদেবকে এখানে মহাপ্রভু হিসেবে বোঝানো হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব নয়। কারণ, মহা মানেই চুড়ান্ত কিছু, তাই মহাপ্রভু মানেই শেষ কথা, আর এই শেষ কথার বিচারে হিন্দুধর্মের মহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণ; কারণ, শ্রীকৃষ্ণের উপরে কিছু নেই। কিন্তু বৈষ্ণব সমাজ মহাপ্রভু বলতে চৈতন্যদেবকে বোঝায়, যেটা তাদের প্রথম ভুল এবং সাধারণ হিন্দু সমাজেরে জন্য একটি চুড়ান্ত ধোকা।

বৈষ্ণব সমাজে আরেক প্রকার ভোগ প্রচলিত, যাকে বলে গিরিধারীর ভোগ। এই ভোগ কথিত মহাপ্রভুর ভোগের চেয়ে ছোট, তাই এর আয়োজন কম এবং খরচও অল্প।

বৈষ্ণব সমাজসহ প্রায় সব হিন্দু এটা জানে যে চৈতন্যদেব আসলে কে, কিন্তু বৈষ্ণবসহ সবাই যদি জানতো যে গিরিধারী আসলে কে, তাহলে আমার মনে হয় চৈতন্যর নামে দেওয়া ভোগের চেয়ে গিরিধারীর ভোগ বড় হতো।

আমরা অনেকেই জানি যে, শ্রীকৃষ্ণ ৭ বছর বয়সে, দেবরাজ ইন্দ্রের অহংকারকে চূর্ণ করার জন্য বৃন্দাবনবাসী কর্তৃক ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করে গোবর্ধন নামে এক পর্বতের পূজা শুরু করেন, এতে ইন্দ্র ক্ষেপে গিয়ে বৃন্দাবন বাসীর উপর এক ভয়্ঙ্কর ঝড় বৃষ্টি চাপিয়ে দেয়। ইন্দ্রের এই কোপ থেকে বৃন্দাবনবাসীকে রক্ষা করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গোবর্ধন পর্বতকে হাতের উপর ছাতার মতো তুলে ধরেন এবং ৭ দিন ঐ অবস্থায় তুলে রাখেন।

যা হোক, শ্রীকৃষ্ণের শক্তির পরিচয় পেয়ে শেষ পর্যন্ত ইন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণের কাছে হার স্বীকার করেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারেন। পর্বতের সমার্থক শব্দ হলো গিরি। শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু গিরি গোবর্ধনকে নিজের হাতের আঙ্গুলের উপর ধারণ করেছিলেন, তাই শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম গিরিধারী। এই শ্রীকৃষ্ণের নামে যে ভোগ হয় তাই গিরিধারী ভোগ, এর গুরুত্ব বা সম্মান বৈষ্ণব সমাজে কম এবং সেই শ্রীকৃষ্ণের যিনি ভক্ত সেই চৈতন্যের নামে যে ভোগ হয়, তার গুরুত্ব বৈষ্ণব সমাজে বেশি; এভাবে বৈষ্ণব মতবাদে শ্রীকৃষ্ণ নয়, চৈতন্যদেবই বড় এবং শ্রীকৃষ্ণ তাদের মহাপ্রভু নয়, মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত চৈতন্যদেব!

এই বৈষ্ণব সমাজের এবং বৈষ্ণব সমাজ কর্তৃক প্রভাবিত হিন্দুদের, যারা মনে করে মহাপ্রভু হলেন শ্রীচৈতন্য এবং গিরিধারীর ভোগকে যারা ছোট ভোগ মনে করে এবং চৈতন্যের নামে দেওয়া ভোগকে বড় মনে করে, সেই সব ভক্তের আত্মার কোনো সদগতি হবে ?

হবে না।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 7 August 2020

চৈতন্যদেব কি মধ্যযুগে হিন্দুদেরকে মুসলমান হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে হিন্দুসমাজকে বাঁচিয়েছিলো ?


চৈতন্যদেব কি মধ্যযুগে হিন্দুদেরকে মুসলমান হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে হিন্দুসমাজকে বাঁচিয়েছিলো ?

যারা বলে চৈতন্যদেব হিন্দুদেরকে ধর্মান্তরের হাত থেকে বাঁচিয়ে হিন্দুধর্মকে রক্ষা করেছে, তাদের কোনো ধারণাই নেই সেই সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে। তিনি যে হিন্দু ধর্ম থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা একটি মতবাদ বৈষ্ণব ধর্ম চালু করেছিলেন, সেটাও অনেকে জানে না। কিন্তু বৈষ্ণবরা হিন্দু সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে নি শুধু কৃষ্ণের জন্য; কারণ, চৈতন্যদেবের আরাধ্য দেবতা যেমন কৃষ্ণ, তেমনি হিন্দুদেরও আরাধ্য দেবতা কৃষ্ণ; কিন্তু বর্তমান বৈষ্ণব সমাজে চৈতন্যদেবের গুরুত্ব, কৃষ্ণের চেয়েও বেশি এবং একারণে মহাপ্রভুর ভোগের অনুষ্ঠানে চৈতন্যই সবকিছু, কৃষ্ণ সেখানে ফোর সাবজেক্ট। বৈষ্ণবরা কৃষ্ণকে অল্প হলেও মানে ব’লে এবং বৈষ্ণব থিয়োরি যেহেতু জীবন যাপনের জন্য সম্পূর্ণ বাস্তব বা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় এবং নানা প্রয়োজনে যেহেতু তাদেরকে সনাতন ধর্মের নানা বিধি বিধানকে ধার করতে হয়, তাই তারা এখনও হিন্দু সমাজ থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে নি এবং আর কখনো পারবেও না।

শুধু বৈষ্ণবরা কেনো, পৃথিবীর কোনো ব্যক্তিমতের ধর্মের অনুসারীদের ক্ষমতা নেই সনাতন মানব ধর্মের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আলাদা জীবন যাপন করার। যদি কেউ তা চেষ্টা করে, তাকে হয় জঙ্গীদের মতো অন্যদেরকে মারতে হবে, না হয় মারতে গিয়ে নিজেকে মরতে হবে। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, মানুষ যে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে সেটাই সনাতন মানব ধর্ম। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে সনাতন ধর্মে যে বিভিন্ন প্রকার দেব-দেবীর পূজা যুক্ত হয়েছে, সেগুলো ধর্মের মোড়কে হলেও কোনো ধর্ম নয়, সেগুলো এক একটি হিন্দু উৎসব মাত্র।

যা হোক, বৈষ্ণবরা কিন্তু কাগজ পত্রেও সনাতন ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেকারণে কেউ যদি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হতে চায়, তাকে সরকারিভাবে এফিডেফিট করে তা করতে হয়। আর যে বৈষ্ণবরা কাগজপত্রে ধর্মের জায়গায় সনাতন ধর্ম লিখে, তারা আসল থিয়োরি জানে না বলেই লিখে। আর এই অজ্ঞতার ফলে প্রতিদিনের জীবন যাপনে বৈষ্ণবরা যেমন সনাতন মানবধর্মের নানা বিধি-বিধান পালন করে, তেমনি অনেক সনাতনী হিন্দুরাও না বুঝে বিভিন্ন কারণে মহাপ্রভুর ভোগের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নিজের অজান্তেই অল্পমাত্রায় হলেও বৈষ্ণব মতবাদকে পালন করে।

যা হোক, মধ্যযুগে মুসলমানদের প্রভাব থেকে হিন্দুদেরকে রক্ষা করতে চৈতন্যদেব যে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে নি,  এবার নজর দিই সেদিকে-

সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম গ্রহনের ফলে অখণ্ড ভারতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ হিন্দু বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। খ্রিষ্টীয় ৮ম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্য, কুমারিল ভট্ট সহ আরো কয়েকজন মহাত্মার চেষ্টায় বাংলা ছাড়া প্রায় সমগ্র ভারতের বৌদ্ধরা আবারও হিন্দু ধর্মে ফিরে আসে। কিন্তু বাংলা, শঙ্করাচার্য এর জন্মস্থান গুজরাট থেকে প্রায় ২ হাজার কি.মি দূরে হওয়ায় এবং তার জীবনীকাল মাত্র ৩২ বছর হওয়ায় তার কর্মের প্রভাব এই বাংলায় এসে পৌঁছায় নি, ফলে এখানকার বৌদ্ধরা, বৌদ্ধই থেকে যায়; সেই সময় থেকে মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার সময় পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু ছিলো এক তৃতীয়াংশ এবং বৌদ্ধ ছিলো দুই তৃতীয়াংশ।

ভারতে ইসলামি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর মুসলমানদের একটাই লক্ষ্য ছিলো যেকোনো প্রকারে হিন্দুধর্মকে ধ্বংস করে পুরো ভারতকে ইসলামিক করা। এজন্য ক্ষমতা দখল করে মাথার উপর চেপে বসার পর, মুসলমান শাসকরা শর্ত দিয়েছিলো, হয় ইসলাম গ্রহন করো, না হয় মৃত্যু বরণ করো। শতকরা ৯৯ জন হিন্দু এ শর্তকে না মেনে মৃত্যু বরণ করছিলো বা করার জন্য প্রস্তুত ছিলো। এভাবে সব লোক মারা গেলে রাজ্য চালাবে কাদের নিয়ে ? এই সমস্যার সমাধানে মুসলমান শাসকরা, সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী হলেও হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে তাদেরকে বেঁচে থাকার সুযোগ দেয় এবং এই অপশান রাখে যে, কেউ যদি ইসলাম গ্রহন করে তাহলে তাদেরকে আর জিজিয়া কর দিতে হবে না। এই আর্থিক চাপে পড়েও কিছু দরিদ্র হিন্দু পরে মুসলমান হয়, কিন্তু সেটাও সব মিলিয়ে ১% এর বেশি নয়।

এরপর ১২০৪ সালে, বাংলা, বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে মুসলমানদের দখলে এলে নানামুখী অত্যাচার এবং সুযোগ সুবিধার জন্য এই বৌদ্ধরা আবার ইসলাম গ্রহন করে মুসলমান হয়ে যায়। বৌদ্ধদের জাতীয় পোষাক হলো লুঙ্গি, সেকারণেই বাঙ্গালি মুসলমানদের পোষাক লুঙ্গি হয়ে যায় এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ন্যাড়া হয়ে থাকতো ব’লে, ইসলামে ধর্মান্তরিত বৌদ্ধরা ন্যাড়া মুসলমান নামে পরিচিত হয়। বাংলায় মুসলমান শাসকদের ক্ষমতা এবং অত্যাচারের মাত্রা এত বেশি ছিলো যে, এক এলাকার মানুষদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের কাহিনী শুনে, সেই অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাঁচতে অন্য এলাকার মানুষরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো, এভাবে যারা মুসলমান হয়, তারা পরিচিত হয় “শুইন্যা মুসলমান” নামে। কিন্তু সকল অত্যাচার সহ্য করে, মৃত্যুকে বরণ করে এবং জিজিয়া কর দিয়ে হলেও বাংলার হিন্দুরা দলে দলে তাদের ধর্ম ত্যাগ করে নি, প্রবল স্রোতের মুখে দু’চারটা খড়কুটো হয়তো ভেসে গিয়েছে এবং তা যেতেই পারে, বর্তমানে যেমন নানারকম ফাঁদে পড়ে দু’চার জন হিন্দু ধর্মান্তরিত হয় বা হচ্ছে।

বাংলার যে এক তৃতীয়াংশ হিন্দু, সম্রাট অশোকের আমলেও ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ হয় নি, তারা মুসলমান শাসনামলেও ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহন করে নি, সেই এক তৃতীয়াংশ হিন্দু এখনও হিন্দুই আছে, তাই দুই বাংলা মিলিয়ে টোটাল জনসংখ্যার ওয়ান থার্ড লোক এখনও হিন্দু। তাহলে চৈতন্যদেব কোন হিন্দুদেরকে ধর্মান্তরের হাত থেকে রক্ষা করেছে ? এরা তো আগে থেকেই ধর্ম ত্যাগ না করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো। চৈতন্যদেব মধ্যযুগে হিন্দুদেরকে মুসলমান হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে, আসলে এই কথা বলে তাকে হিন্দু সমাজে মহান বানানোর চেষ্টা করা হয় বা হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত সত্য তা নয়, বাংলায় ধর্মান্তরের ঝড় ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে রাজা গনেশ এর পুত্র যদুর রাজত্বকালের(১৪১৮-১৪৩১)সময় পর্যন্ত ছিলো, যেটা চৈতন্য দেবের সময়ের (১৪৮৬-১৫৩৩) পূর্বেই শেষ হয়ে যায় এবং যে প্যাঁচে পড়ে যদুকেও মুসলমান হয়ে বাঁচতে ও রাজ্য চালাতে হয়।

মূলত ধর্মান্তরের ঝড় স্তিমিত হওয়ার পর চৈতন্যদেবের আবির্ভাব এবং তারপর কিছু সনাতনী হিন্দু চৈতন্যদেবের আদর্শে প্রভাবিত হয় এবং বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়। এরা সব সময়ই ছিলো সনাতনী হিন্দু এবং এখনও নিজেদেরকে বৈষ্ণব বললেও জীবনাচরণের প্রতিটা ক্ষেত্রেই তারা সনাতনী হিন্দু। কারণ, বৈষ্ণব হতে হলে আপনাকে ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে, সেটা কয়জন লোক করে বা করতে পারে বা করার ইচ্ছা রাখে ? আর বর্তমান সমাজে কে বৈষ্ণব ? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি একজনও বৈষ্ণব নেই, সবাই সনাতনী হিন্দু।

সুতরাং চৈতন্যদেবের কারণে মধ্যযুগে বাঙ্গালি হিন্দু সমাজ ধর্মান্তরের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, এটা যে একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার, আশা করছি- আমার বন্ধুদের কাছে তা ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 24 July 2020

চৈতন্যদেবের ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী নীতি :


চৈতন্যদেবের ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী নীতি :

আপনারা অনেকেই জানেন যে চৈতন্যদেব তাঁর জীবনে দুটো বিয়ে করেছিলেন, প্রথমে লক্ষ্মী প্রিয়াকে, পরে বিষ্ণু প্রিয়াকে। লক্ষ্মী প্রিয়াকে বিয়ের কিছুদিন পরই চৈতন্যদেব, নদীয়া থেকে পূর্ববঙ্গে অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে এসেছিলেন হরি নাম প্রচার করতে, এই সময় লক্ষ্মী প্রিয়ার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু সম্পর্কে বলা হয় যে তিনি সর্প দংশনে মারা গেছেন, কিন্তু এটি একটি ডাহা মিথ্যা প্রচার। চৈতন্যদেবের চরিত্রকে সাফসুতরো রাখতে চৈতন্যদেবের অনুসারীরা এটা প্রচার করেছে, কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় আমি মনে করি লক্ষ্মী প্রিয়া আত্মহত্যা করেছে, যার কিছু ইঙ্গিত আছে চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে।

এ প্রসঙ্গে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের ষোড়শ পরিচ্ছদে বলা আছে-

"এই মত বঙ্গে প্রভু করে নানা লীলা।
এথা নবদ্বীপে লক্ষ্মী বিরহে দুঃখী হৈলা।।
প্রভুর বিরহ-সর্প লক্ষ্মীরে দংশিল।
বিরহ সর্প বিষে তাঁর পরলোক হৈল।।"

-এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, লক্ষ্মী প্রিয়া যদি সর্প দংশনেই মারা যায়, তাহলে সেটা বর্ণনা করতে গিয়ে তার সাথে বিরহ শব্দটা জুড়ে দেওয়া হলো কেনো ? এখানে বিরহের প্রসঙ্গ আনায় এটা স্পষ্ট যে বিয়ের পর পরই লক্ষ্মীকে সময় না দিয়ে, তাকে ফেলে পূর্ববঙ্গে চলে যাওয়ায় লক্ষ্মী একাকীত্বে ভুগছিলো; কারণ, বিয়ের পর প্রত্যেক মেয়েই চায় তার স্বামীকে অন্তত কিছুদিন একান্তে কাছে পেতে, যাতে তার মনের ও দেহের জ্বালার নিরসন হয়। কিন্তু সেদিকে চৈতন্যদেব কোনো নজর না দিয়ে তাকে ফেলে পূর্ববঙ্গে চলে যায়, নিজের প্রতি স্বামীর এই অনাদর ও অবহেলাকে সহ্য করতে না পেরে, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া না করে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে লক্ষ্মী প্রিয়া আত্মহত্যা করে, এই বিষয়টিকে লুকানোর জন্য লক্ষ্মী প্রিয়ার মৃত্যুর ঘটনাকে সর্প দংশন বলে প্রচার করা হয়েছে, কিন্তু খুনী কাউকে খুন করার পর যেমন তার খুনের কিছু প্রমাণ রেখে যায়, তেমনি লক্ষ্মী প্রিয়ার মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সর্প দংশনের সাথে বিরহ শব্দটা জুড়ে দিয়ে কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর গ্রন্থে সেই প্রমাণটা রেখে গিয়েছেন।
তাহলে এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, লক্ষ্মী প্রিয়া কিভাবে আত্মহত্যা করেছে ?

এ ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত আছে বৃন্দাবন দাসের লেখা চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে, তিনি তার গ্রন্থে লক্ষ্মী প্রিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গে সর্প দংশন জাতীয় কিছু বলেন নি, বৃন্দাবন দাস এ সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থের আদি খণ্ডের দশম অধ্যায়ে বলেছেন-

"এথা নবদ্বীপে লক্ষ্মী প্রভুর বিরহে।
অন্তরে দুঃখিতা দেবী কারে নাহি কহে ।।
নিরবধি করে দেবী আইর সেবন।
প্রভু গিয়াছেন হৈতে নাহিক ভোজন।।
নামেরে সে মাত্র অন্ন পরিগ্রহ করে।
ঈশ্বর বিচ্ছেদে বড় দুঃখিতা অন্তরে।।
একেশ্বর সর্বরাত্রি করেন ক্রন্দন।
চিত্তে স্বাস্থ্য লক্ষ্মী না পায়েন কোন ক্ষণ।।
ঈশ্বর বিচ্ছেদ লক্ষ্মী না পারি সহিতে।
ইচ্ছা করিলেন প্রভুর সমীপে যাইতে।।
নিজ প্রতিকৃতি দেহ থুই পৃথিবীতে।
চলিলেন প্রভু পাশে অতি অলক্ষিতে।।
প্রভু পাদপদ্ম লক্ষ্মী করিয়া হৃদয়।
ধ্যানে গঙ্গা তীরে দেবী করিলা বিজয়।।"

- খেয়াল করুন, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, তার চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে বললেন সর্প দংশনে লক্ষ্মী প্রিয়া মারা গেছেন, কিন্তু বৃন্দাবন দাস তার চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে সর্প দংশনের কোনো উল্লেখই করেন নি, তিনি বললেন- প্রভুর বিরহে অনাহারে ভগ্ন স্বাস্থ্য ও ভগ্ন মন নিয়ে গঙ্গা তীরে লক্ষ্মী নিজেকে শেষ করে দিয়েছে, এ থেকে তো এটাই প্রমাণিত হয় যে লক্ষ্মী প্রিয়া গঙ্গার জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছেন এবং এর মূল কারণ স্বামীর বিরহ।

এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে- নববিবাহিতা স্ত্রীকে এভাবে একা রেখে গিয়ে তাকে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে তার মৃত্যুর কারণ হওয়া কি চৈতন্যদেবের উচিত হয়েছে ? যেহেতু তিনি বিয়ে করেছেন, সেহেতু দীর্ঘদিনের সফরে গেলে তাকে সাথে নিয়ে যাওয়া বা সাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে মাঝে মাঝে তার নিজের বাড়ি ফেরা কি তার উচিত ছিলো না ? অবশ্য চৈতন্যদেব বাড়ি ফিরেই বা কী করতেন ? পুরুষকে তার স্ত্রীর কাছে আসতে হয় প্রধানত দৈহিক কামনা মেটানোর জন্য, দ্বিতীয় সংসার ঠিকমতো চলছে কিনা, তা দেখার জন্য; চৈতন্যদেবের কি তার কোনো প্রয়োজন ছিলো ? আমার তো মনে হয়, না। যদি চৈতন্যদেবের দৈহিক চাহিদা মেটানোর কোনো প্রয়োজন না ই ছিলো, তাহলে এখানে আমা্র প্রশ্ন হচ্ছে তিনি বিয়ে করতে গেলেন কেনো ? আর বিয়ে করেই বা তাদেরকে সময় দিলেন না কেনো ? চৈতন্য অনুসারীরা প্রচার করে যে তিনি অবতার বা কলিযুগের ভগবান, তাহলে তিনি কি জানতেন না যে তার বিয়ে করার কোনো প্রয়োজন নেই, চৈতন্যদেব যদি ভগবান হতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তার ভবিষ্যত জানতেন, তাহলে তিনি কেনো একজন নয়, দুই জন নারীর জীবনকে ব্যর্থ বা ধ্বংস করে দিলেন ? অবতার বা ভগবান তো দূরের কথা, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও কি চৈতন্যদেবের সেটা উচিত হয়েছে ?

উপরে লক্ষ্মী প্রিয়ার কথা বললাম, তিনি কোন শোকে মারা গেছেন বা আত্মহত্যা করেছেন সেটাও বর্ণনা করার চেষ্টা করলাম। এছাড়াও এটা বহুল প্রচলিত যে, চৈতন্যদেব, লক্ষ্মী প্রিয়া মারা যাওয়ার কিছু দিন পরেই নবদ্বীপ ফেরেন এবং পুনরায় বিষ্ণু প্রিয়াকে বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি বিষ্ণু প্রিয়ার সাথে কী আচরণটা করলেন ? তিনি রাতের আঁধারে ঘুমন্ত স্ত্রীকে বিছানায় একা ফেলে, সন্ন্যাস নেওয়ার নামে তার কাছ থেকে পালিয়ে গেলেন। এই কারণে চৈতন্যদেবকে বিয়ে করে বিষ্ণু প্রিয়ার জীবনও ব্যর্থ বা ধ্বংস হলো। চৈতন্যদেব কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়ার পর বিষ্ণুপ্রিয়ার জীবনে কী ঘটেছিলো সে ব্যাপারে চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে কোনো কিছুই বলা নেই। তবে আমার মনে হয়- বিষ্ণু প্রিয়া, লক্ষ্মী প্রিয়ার মতো বিদ্রোহিনী ছিলেন না, তিনি নীরবে সব কষ্ট সয়ে প্রাকৃতিকভাবেই ইহলীলা সমাপ্ত করেছেন।

বিষ্ণুপ্রিয়া প্রসঙ্গেও চৈতন্যদেব সম্পর্কে এই প্রশ্নগুলো তোলা যায় যে, তাঁর উদ্দেশ্যই যদি ছিলো সন্ন্যাস গ্রহণ, তাহলে তিনি তো লক্ষ্মী প্রিয়ার থেকে মুক্তি পেয়েই গিয়েছিলেন, তাহলে আবার বিষ্ণু প্রিয়াকে বিয়ে করতে গেলেন কেনো ? আর বিয়েই যদি করলেন, তাহলে চোরের মতো চুপি চুপি তার কাছ থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেলেন কেনো ? কোনো মানুষ তার স্ত্রীর কাছ থেকে পালাতে পারে দুটি কারণে- স্ত্রীর ভরণ পোষণ এবং তার যৌন চাহিদা মেটাতে না পারলে; চৈতন্য ভক্তদের কাছে আমার প্রশ্ন, চৈতন্যদেবের মধ্যে কোন গুনের অভাব ছিলো বলে আপনার মনে হয় ? সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে দায়িত্ব নিলে তা পালন করতেই হয়, চৈতন্যদেব সজ্ঞানে জেনে শুনে একটি নয় দুটি বিয়ে করেছিলেন, বিবাহ করা মানে বিশেষ ভাবে তাকে বহন করা বা তার দায়িত্ব পালন করা, চৈতন্যদেব তার দুজন স্ত্রীর প্রতিই কোন দায়িত্ব পালন করেছিলেন ?

এছাড়াও আমরা জানি, চৈতন্যদেবের বড়ভাই, আগেই সন্ন্যাস নিয়ে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন, চৈতন্যদেবের পিতাও মারা গিয়েছিলেন, চৈতন্যদেবের মাকে দেখা শোনা করার মতো চৈতন্যদেব ছাড়া আর কেউ ছিলো না; তাহলে চৈতন্যদেব কিভাবে তার মায়ের দায়িত্ব পালন না করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ? একদিকে মা, অন্যদিকে স্ত্রী, এই দুই দুইজন নারী, যারা সামাজিকভাবে অর্থ এবং দৈহিক শক্তিতে পুরুষের তুলনায় কিছুটা অসহায়, তাদের দায়িত্ব পালন না করে চৈতন্যদেব তাদেরকে কার ভরসায় রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ?
মুসলমানরা ধর্মের নামে গু পর্যন্ত খেতে পারে, যেমন ২০১৪/১৫ সালে ইরাক সিরিয়ায় অনেক মুসলিম নারী গিয়েছিলো জিহাদীদের যৌনসেবা দেওয়ার জন্য, এরকম মনোবৃত্তিকে আমি ধর্মের নামে গু খাওয়াই বলি; চৈতন্যদেবের প্রভাবে প্রভাবিত বৈষ্ণব সমাজ মুসলমানদের চেয়ে কম যায় না, এরা ধর্মের নামে মল-মূত্র না খেলেও আবর্জনা খায়, তাই যেই তারা জানতে পারে যে চৈতন্যদেব সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য বাড়ি এবং তার স্ত্রী ও মাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, অমনি চৈতন্যদেবের সকল দোষ তাদের কাছে গুনে পরিণত হয়। কিন্তু মা ও স্ত্রীদের প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করে চৈতন্যদেব যে মহা অপরাধ করেছে, এটা অন্ধ চৈতন্যভক্তদের চোখেই পড়ে না।

চৈতন্যদেবের এই অপরাধকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার আগে একবার ভাবুন তো, আপনার পিতা মারা গেছে এবং আপনার মাকে দেখাশোনার আপনি ছাড়া কেউ নেই, এই অবস্থায় আপনি নিজে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ও মাকে ফেলে সন্ন্যাস গ্রহণের নামে বাড়ি থেকে চলে গেলেন, লোকজন আপনার সম্পর্কে কী বলবে বা কী ভাববে ? প্রথমেই তো সবাই বলবে, সন্ন্যাসই যদি নিবি, তাহলে বিয়ে করতে গেলি কেনো ? এভাবে একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করার মানে কী ? আরও বলবে, এখন তোর মা ও বউকেই বা কে দেখবে ? ঠিক এই প্রশ্নগুলো চৈতন্যদেব সম্পর্কে সবসময় তোলা যায় বা তোলা যাবে। এমন কোনো চৈতন্যভক্ত নেই যে, এসব প্রশ্নের তারা যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

মা ও স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করায় চৈতন্যদেব নিজে অধার্মিক, এমন অধার্মিককে তো মানুষ হিসেবেই গণ্য করা উচিত নয়, অথচ বৈষ্ণবসমাজের সাথে সাথে অবৈষ্ণবসমাজও বর্তমানে তাকে অবতার বা ভগবান হিসেবে পূজা করে আসছে, এটা শুধু পাপ নয়, মহাপাপ। বাঙ্গালি হিন্দু সমাজের দুর্গতির মূল কারণ আসলে এটাই, পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে ছেড়ে বা পাশে রেখে চৈতন্যদেবকেই ভগবান জ্ঞানে পূজা করা।

এই পোস্টের নাম দিয়েছি চৈতন্যদেবের নারী বিদ্বেষী নীতি এবং যে ঘটনা লিখবো বলে এই প্রবন্ধটি লিখতে শুরু করেছিলাম এবার সেদিকে নজর দিই; ঘটনাটা জানার পর বুঝতে পারবেন, চৈতন্যদেব কী ভয়াবহ পরিমান নারী বিদ্বেষী ছিলেন এবং প্রকৃত বৈরাগী বা বৈষ্ণব কাদের বলে ?

এই ঘটনাটির বর্ণনা পাবেন চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের অন্ত্যলীলার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে। মূল কাহিনী গদ্যাকারে বর্ণনার মাঝে মাঝে আমি চৈতন্যচরিতামৃত থেকেও দুচারটি চরণ তুলে দিয়ে আমি আমার কথার সত্যতার প্রমাণ দেবো।

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার নিকটবর্তী উত্তর ২৪ পরগণার হালিশহরের জমিদার শ্রেণীর লোক ছিলেন শতানন্দ আচার্য্য, তার পুত্র ছিলেন ভগবান আচার্য্য। ইনি চৈতন্যদেবের সংস্পর্শে এসে ঘর সংসার ফেলে বা ভুলে, নীলাচলে গিয়ে চৈতন্যদেবের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং তার পাশাপাশিই থাকতে শুরু করেন। অন্যদিকে শিখি মাহাতি ছিলেন পুরীর শ্রীজগন্নাথদেবের মন্দিরের হিসাব রক্ষক, ইনি ছিলেন চৈতন্যদেবের একান্ত ভক্ত, এই শিখি মাহাতির বোন মাধবীও ছিলেন চৈতন্যদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত, এই ঘটনার সূত্রপাত এই মাধবীকে নিয়ে, ঘটনার সময় যিনি ছিলেন বৃদ্ধা। এই কাহিনীর প্রধান চরিত্র হলেন হরিদাস, ইনি সিন্ধুকূল নিবাসী এবং ইনি ছোট হরিদাস নামেও খ্যাত।

তো একদিন ভগবান আচার্য্য,

"প্রভুকে কৈলা নিমন্ত্রণ।
ঘরে ভাত করি করে বিবিধ ব্যঞ্জন।।
ছোট হরিদাস নাম প্রভুর কীর্তনীয়া।
তাঁহারে কহেন আচার্য্য ডাকিয়া আনিয়া।
মোর নামে শিখি মাহিতীর ভগ্নিস্থানে গিয়া।
ওরাইয়া চাল এক মান আনহ মাগিয়া।।
মাহিতীর ভগিনী সেই নাম মাধবী দেবী।
বৃদ্ধা তপিস্বিনী আর পরম বৈষ্ণবী।।"

-তো এই বৃদ্ধা তপস্বিনী আর পরম বৈষ্ণবী মাধবী শুধু নয়, নারীদের ব্যাপারেই চৈতন্যদেবের কী মনোভাব ছিলো, দেখুন সেটা নিচে-

"মধ্যাহ্নে আসিয়া প্রভু ভোজনে বসিলা।
শাল্যন্ন দেখি প্রভু আচার্য্যে পুছিলা্।।
উত্তম অন্ন এ তণ্ডুল কাঁহাতে পাইলা।
আচার্য্য কহে মাধবী দেবী পাশে মাগিয়া আনিলা।।
প্রভু কহে কোন যাই মাগিয়া আনিল।
ছোট হরিদাসের নাম আচার্য্য করিল।।
অন্ন প্রশংসিয়া প্রভু ভোজন করিলা।
নিজ গৃহে আসি গোবিন্দেরে আজ্ঞা দিলা।।
আজ হইতে এই মোর আজ্ঞা পালিবা।
ছোট হরিদাসে ইহা আসিতে না দিবা।।

তারপর-

দ্বার মানা হৈল হরিদাস দুঃখী হৈল মনে।
কি লাগিয়া দ্বার মানা কেহ নাহি জানে।।
তিন দিন হরিদাস করে উপবাস।।
স্বরূপাদি আসিয়া পুছিলা মহাপ্রভুর পাশ।।
কোন অপরাধ প্রভু কৈল হরিদাস।
কি লাগিয়া দ্বার মানা করে উপবাস।।

অর্থাৎ, এই ঘটনাটির সারস্ংক্ষেপ হলো- চৈতন্যদেবের এক শিষ্য ভগবান আচার্য্য,  একদিন নিজ বাড়িতে চৈতন্যদেবকে নিমন্ত্রণ করে, কিন্তু রান্না করতে গিয়ে দেখে চাল কম, তাই সে, চৈতন্যদেবের আরেক ভক্ত-শিষ্য ছোট হরিদাসকে বলে, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের হিসেব রক্ষক শিখি মাহাতির বোন মাধবী দেবীর কাছে গিয়ে আমার নাম করে কিছু চাল নিয়ে এসো, ছোট হরিদাস এই আজ্ঞা পালন করে। রান্না বান্না শেষ হলে দুপুর বেলা চৈতন্যদেব খেতে বসে জিজ্ঞেস করে এমন সুন্দর চাল সে কোথায় পেলো। ভগবান আচার্য্য বলে, শিখি মাহাতির বোন মাধবী দেবীর কাছ থেকে আনিয়েছি। চৈতন্যদেব বলে- সেই চাল কে এনেছে ? ভগবান আচার্য্য বলে- ছোট হরিদাস।

এরপর চৈতন্যদেব অন্নের প্রশংসা করে আহার সেরে নিজ আস্তানায় যায় এবং গোবিন্দ নামের একজনকে আদেশ দেয় যে, ছোট হরিদাস যেন এই গৃহে ঢুকতে না পারে। কিন্তু ছোট হরিদাসসহ কেউ বুঝতে পারে না আসলে ছোট হরিদাসের অপরাধটা কী। ছোট হরিদাস তিন দিন ধরে উপবাস করছে, তার তো চৈতন্যদেবের বাড়িতে ঢোকা নিষেধ, সে ঢুকতে পারছে না। অন্যরা চৈতন্যদেবের কা্ছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, প্রভু, হরিদাসের অপরাধটা কী ? কেনো তার এই শাস্তি ?

এরপর-

"প্রভু কহে বৈরাগী করে প্রকৃতি সম্ভাষণ।
দেখিতে না পারি আমি তাঁহার বদন।।
দুর্ব্বার ইন্দ্রিয় করে বিষয় গ্রহণ।
দারবী প্রকৃতি হরে মহামুনির মন।।"

অর্থাৎ- চৈতন্যদেব এখানে বলেছেন, বৈরাগী বা বৈষ্ণব হয়ে প্রকৃতি অর্থাৎ কোনো নারীকে সম্ভাষণ করা বা ডাকা যাবে না, যে এমন করে আমি তার মুখ দেখতে চাই না। প্রচণ্ড শক্তিশালী ইন্দ্রিয় বিষয় বাসনায় মত্ত থাকে, দারবী অর্থাৎ কাষ্ঠনির্মিত নারী মূর্তিও মহামুনির মন হরণ করতে পারে। তাই নারীকে সম্ভাষণ করে চাল চেয়ে আনায় ছোট হরিদাসের কোনো ক্ষমা নেই।

এ প্রসঙ্গে চৈতন্যদেব আরো বলে,

"ক্ষুদ্র জীবসব মর্কট বৈরাগ্য করিয়া।
ইন্দ্রিয় চরাঞা বুলে প্রকৃতি সম্ভাষিয়া।"

যা হোক, এরপর আরেক দিন-

"আর দিন সবে মিলি প্রভুর চরণে।
হরিদাস লাগি কিছু কৈল নিবেদনে।।
অল্প অপরাধ প্রভু করহ প্রসাদ।
এবে শিক্ষা হৈল, না করিবে অপরাধ।।
প্রভু কহে মোর বশ নহে মোর মন। (ইনি নাকি আবার ভগবান, মন যার বশে থাকে না।)
প্রকৃতি সম্ভাষী বৈরাগী না করে দর্শন।।
নিজ কার্য্যে যাহ সবে, ছাড় বৃথা কথা।
পুনঃ যদি কহ আমা না দেখিবে হেথা।
এত শুনি সবে নিজ কর্ণে হস্ত দিয়া।
নিজ নিজ কার্য্যে সব চলিল উঠিয়া।।"

খেয়াল করুন, এখানে চৈতন্যদেব বললেন, হরিদাসের ক্ষমা প্রসঙ্গে কেউ যদি তাকে কিছু বলে, "পুনঃ যদি কহ আমা না দেখিবে হেথা" বলে সবাইকে হুমকি দিয়ে বললো এখান থেকে সে চলে যাবে; এইরকম ঘটনা এখানেই শেষ নয়, চৈতন্যদেবের গুরুস্থানীয় পরমানন্দ পুরী বা পুরী গোঁসাঞ্রি একবার তাঁর কাছে এলে চৈতন্যদেব জিজ্ঞেস করলেন,

"কেনে কৈলে আগমন।
'হরিদাসে প্রসাদ লাগি' কৈলে নিবেদন।।
শুনি মহাপ্রভু কহে শুনহ গোঁসাঞ্রি।
সব বৈষ্ণব লঞ্রা তুমি রহ এই ঠাঞ্রি।।
মোরে আজ্ঞা দেহ মুই যাঙ আলালনাথ।
একলা রহিব তাঁহা গোবিন্দমাত্র সাথ।।
এত বলি প্রভু গোবিন্দেরে বোলাইলা।
পুরীকে নমস্কার করি উঠিয়া চলিলা।।"

-এরপর কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না দেখে, সবাই মিলে হরিদাসকে সান্ত্বনা দেয় যে- প্রভু যা করছে তা তোমার ভালোর জন্যই করছে। তুমি স্নান ভোজন ত্যাগ করে বসে থেকো না; কারণ, তুমি যদি হঠকারী করে এসব করতে থাকো, প্রভুও হঠকারী করবে, তুমি স্নানভোজন করো, প্রভুর রাগ এমনিতেই যাবে। এরপর চৈতন্যদেব যদি কখনো তার গৃহ থেকে বের হয়ে জগন্নাথ দর্শনে যান, হরিদাস দূরে দূরে দাঁড়িয়ে চৈতন্যদেবকে ফলো করতে থাকে, ভয়ে কাছে যায় না। এক নারীর কাছে থেকে চাল চেয়ে আনায়, হরিদাসের প্রতি চৈতন্যদেবের এই আচরণ দেখে চৈতন্যদেবের শিষ্যরা বাস্তবে স্ত্রীর মুখ দেখা তো দূরের কথা, স্বপ্নেও সে কথা ভাবা ছেড়ে দিয়েছিলো, যে ঘটনার কথা কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, এভাবে-

"দেখি ত্রাস উপজিল সব ভক্তগণে।
স্বপ্নেহ ছাড়িল সবে স্ত্রী সম্ভাষণে।।
এই মত হরিদাসের এক বৎসর গেল।
তবু মহাপ্রভুর মনে প্রসাদ নহিল।।
রাত্রি অবশেষ প্রভুরে দণ্ডবৎ হইয়া।
প্রয়াগেতে গেল, কারে কিছু না বলিয়া।।
প্রভুপাদ প্রাপ্তি লাগি সংকল্প করিল।
ত্রিবেণী প্রবেশ করি প্রাণ ছাড়িল।।"

তারপর হরিদাসকে কোথাও না দেখে সবাই অনুমান করলো যে হরিদাস বোধহয় বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু কিছু দিন পর-

"প্রয়াগ হৈতে এক বৈষ্ণব নবদ্বীপ আইলা।
হরিদাসের বার্ত্তা তেঁহো সবারে কহিলা।।
যৈছে সঙ্কল্প তৈছে ত্রিবেণী প্রবেশিলা।
শুনি শ্রীবাসাদি মনে বিস্ময় হইলা।।

তারপর শ্রীবাস যখন এই কথা চৈতন্যদেবকে জানালেন, তখন চৈতন্যদেব-

"শুনি প্রভু হাসি কহে সুপ্রসন্ন চিত্ত।
প্রকৃতি দর্শন কৈলে এই প্রায়শ্চিত্ত।।

অর্থাৎ বৈরাগী হয়ে কোনো বৈষ্ণব যদি কোনো নারীর মুখ দর্শন করে, তাহলে জলে ডুবে আত্মহত্যা করাই তার প্রায়শ্চিত্ত। এসব কথা বলছে বৈষ্ণবদের প্রাণের গ্রন্থ শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, আর এসব না পড়ে বা না বুঝে বর্তমানের বৈষ্ণব বা বৈরাগীরা শুধু নারীর মুখদর্শনই নয় নারীদেরকে বিয়ে করে নারীর সাথে রাত্রিযাপন করছে, নারী সম্ভোগ করে ছেলে মেয়ের জন্মও দিচ্ছে, যারা একটু বেশি মাত্রার বৈষ্ণব, তারা তো আবার গেরুয়া বসন প'রে, গলায় মালা, নাকে তিলক কেটে গুরু সেজে সস্ত্রীক শিষ্যদের বাড়িতে মাঝে মাঝে টিপও মারে বা মারছে। চৈতন্যদেবের এই ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী নীতির কথা, আমার মনে হয় একজন চৈতন্যভক্তও জানে না, জানে না কোনো বৈষ্ণব নারীও, জানলে যে চৈতন্যদেব নারীদেরকে এত ঘৃণা করতো, সেই নারী সমাজ চৈতন্যদেবকে অবতার বা ভগবান মনে করে নিজের উদ্ধারের জন্য তার কাছে কান্নাকাটি করতো না।

উপরে বর্ণিত- এক নারীর কাছ থেকে চাল চেয়ে আনায় ছোট হরিদাসের প্রতি চৈতন্যদেবের ব্যবহার এবং তার ফলে ছোট হরিদাসের পরিণতির কথা চিন্তা করুন আর ভাবুন কেনো চৈতন্যদেব - সংসার সমুদ্রে তার মা এবং স্ত্রীকে একাকী ফেলে চলে গিয়েছিলো ? আর সেই সাথে এটাও ভাবুন, যে সব চৈতন্যভক্ত, সংসারে আছে, বিয়ে করছে, স্ত্রীর সাথে রাত্রি যাপন করছে, ছেলে মেয়ের জন্ম দিচ্ছে, তারা কতটুকু বৈষ্ণব বা বৈরাগী।

এ প্রসঙ্গে আমার মনে হচ্ছে- কোনো কোনো ইসকন ভক্ত, যারা চৈতন্যদেবের কট্টর অনুসারী, তারা যে তাদের মায়ের হাতের রান্না খায় না, সেটা তো খুবই সাধারণ বিষয়, তাদের উচিত তাদের মা্য়ের সাথে কথা না বলা বা মায়ের মুখ না দেখা, তারা যে তাদের বাড়ি যায় এবং মায়ের সাথে কথা বলে বা মায়ের মুখ দেখে, সেটা তাদের মায়ের প্রতি তাদের দয়া, যদিও সেটা বৈষ্ণব শাস্ত্র বিরোধী।

চৈতন্যদেবের নারী বিদ্বেষী ভাবের আরেকটি কাহিনী আছে শ্রীবাসের শাশুড়ির সঙ্গে, এই ঘটনাটির বর্ণনা পাবেন বৃন্দাবন দাস রচিত শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবতের মধ্যখণ্ডের ষোড়শ অধ্যায়ে, ঘটনাটি এরকম :

চৈতন্যদেব প্রায় দিন তার বিভিন্ন ভক্তের বাড়িতে পাগলের মতো নৃত্য করতো আর হরিনাম করতো, কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে শুধু পুরুষরা থাকতে পারতো, কোনো নারী সেখানে থাকতে পারতো না বা নারীদের চৈতন্যদেবের গান-কীর্তন-নাচের অনুষ্ঠানে থাকা নিষেধ ছিলো। কিন্তু চৈতন্যদেব কিভাবে নাচে ও গায়, এটা দেখার লোভ শ্রীবাসের শাশুড়ি সামলাতে না পেরে শ্রীবাসের বাড়িতে অনুষ্ঠিত গান কীর্তনের দিনে শ্রীবাসের শাশুড়ি সবার অলক্ষ্যে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে চৈতন্যদেবের নাচ গান দেখছিলো, তারপর-

"একদিন নাচে প্রভু শ্রীবাসের বাড়ী।
ঘরে ছিলো লুকাইয়া শ্রীবাস শাশুড়ি।।
ঠাকুর পণ্ডিত আদি কেহো নাহি জানে।
ডোলমুণ্ডে দিয়া আছে ঘরের এক কোণে।।
--------
নাচিতে নাচিতে প্রভু বলে ঘনে-ঘন।
"উল্লাস আমার আজি নহে কি কারণ?"
-----------
পুনঃপুন নাচি বলে সুখ নাহি পাই।
কে বা জানি লুকাইয়া আছে কোনো ঠাঁই ?
সর্ব বাড়ি বিচার করিল জনে জনে।
শ্রীবাস চাহিল ঘর সকল আপনে।।
"ভিন্ন কেহো নাহি" বলি করয়ে কীর্ত্তন।
উল্লাসে নাচয়ে প্রভু শ্রীশচীনন্দন।।
আর-বার রহি বোলে "সুখ নাহি পাই।
আজি বা আমারে কৃষ্ণ-অনুগ্রহ নাই।"
-----------
আর বার ঠাকুর পণ্ডিত ঘরে গিয়া।
দেখে নিজ শাশুড়ী আছয়ে লুকাইয়া।।
---------
বিশেষ প্রভুর বাক্যে কম্পিত শরীর।
আজ্ঞা দিয়া চুলে ধরি করিলা বাহির।।
কেহো নাহি জানে ইহা, আপনি সে জানে।
উল্লসিত বিশ্বম্ভর নাচে ততক্ষণে।।

অর্থাৎ শ্রীবাসের শাশুড়ি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে চৈতন্যদেবের নাচ গান দেখায়, নাচ-গানে চৈতন্যদেবের ভাব আসছিলো না, তাই তার ইচ্ছায় সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখা হয় যে কোথাও কোনো সমস্যা বা কোথাও কেউ লুকিয়ে আছে কি না, এই খুঁজতে গিয়েই শ্রীবাস নিজেই আবিষ্কার করে তার শাশুড়িকে যে ঘরের কোণে লুকিয়ে থেকে চৈতন্যদেবের নাচ-গান দেখছিলো। এই অপরাধে শ্রীবাস, চৈতন্যদেবের নির্দেশে তার শাশুড়ির চুল ধরে টেনে ঘর থেকে বের করে এবং তাকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেয় এবং তারপর চৈতন্যদেব আবার স্বাভাবিক ছন্দে নাচ-গান শুরু করে।

চৈতন্যদেব কী পরিমাণ ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী ছিলো এটাই তার প্রমাণ, তার কীর্তনস্থলে এক নারীর উপস্থিতিও তার মধ্যে এলার্জির সৃষ্টি করেছিলো, যার কারণে সে নামকীর্তনে ভাব পাচ্ছিলো না। যার যে বিষয়ে ভয়াবহ বিদ্বেষ, সেই বিষয়ে দীর্ঘকাল তার মনে বিদ্বেষভাব পোষণ করার ফলে প্রকৃতিও সেই বিষয়ে তাকে সচেতন করে, মূলত এই কারণেই শ্রীবাসের শাশুড়ির অজ্ঞাত উপস্থিতির ফলে চৈতন্যদেব নাচ-গানে কোনো মজা পাচ্ছিলো না।

চৈতন্যদেবের এইসব ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী নীতির কথা জানতে পেরে আমার মনে হচ্ছে- তাঁর জন্ম কোনো নারীর গর্ভ থেকে হয় নি, জন্মের পর সে কোনো নারীর দুধ পান করে নি, কোনো নারী তাকে লালন পালন ক'রে বড় করে নি, যার জন্ম হয়েছে কোনো ইতর বন্য প্রাণীর গর্ভ থেকে।

যদিও আমার জন্ম বৈষ্ণব ঘরেই, কিন্তু বৈষ্ণব শাস্ত্রের অসারত্বকে বুঝতে পেরে আমি বহু আগেই বৈষ্ণবমতবাদকে ত্যাগ করেছি এবং এটা আমি আমার পরিচিত লোকজনের কাছে নিঃসঙ্কোচে মুখ ফুটে বলতেও পারি, কিন্তু চৈতন্যদেবের এই নারী নীতিকে জানার পর এটা ভেবে আমার গর্ব হচ্ছে যে আমি সত্যই চৈতন্যের অনুসারী নই, তাই আমি বৈষ্ণব নই, আমি শ্রীকৃষ্ণের অনুসারী সনাতনী, হ্যাঁ, আমি শুধুমাত্র সনাতনী।

শেষে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যে চৈতন্যদেব নারীর মুখ দেখতে চান নি, নারীকে সম্ভাষণ করায় ছোট হরিদাসকে যিনি কখনো ক্ষমা করেন নি, যার জলে ডুবে মরাকে তিনি বলেছেন প্রকৃতি দর্শনের প্রায়শ্চিত্ত, তার নাচ গান লুকিয়ে লুকিয়ে দেখায় একস নারীকে যে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলো, সেই চৈতন্যদেব আবার শ্রীকৃষ্ণের পাশে নারীরূপী রাধাকে স্বীকার করে তার ভজনা করে গেছেন, এটা পাগল, না ভণ্ড ?

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

চৈতন্যদেব সম্পর্কে কিছু মিথ্যা প্রচার, যা হয়তো এতদিন আপনি বিশ্বাস করে এসেছেন-


চৈতন্যদেব সম্পর্কে কিছু মিথ্যা প্রচার, যা হয়তো এতদিন আপনি বিশ্বাস করে এসেছেন-

চৈতন্যদেব কি কলিযুগের অবতার ?

অনেককেই বলতে শুনেছেন, চৈতন্যদেব হলেন কলিযুগের অবতার । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ডাহা মিথ্যা প্রচার, যেটা করেছেন চৈতন্যদেবের শিষ্যরা আবেগে আপ্লুত হয়ে চৈতন্যেদেবের উপর জীবনীগ্রন্থ লিখে চৈতন্যদেবকে মহান করতে গিয়ে; কিন্তু হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য কোনো শাস্ত্রীয় গ্রন্থে চৈতন্যদেবকে অবতার বলা হয় নি, চৈতন্যদেব নিজেও কখনো নিজেকে কারো অবতার বলে দাবী করেন নি। হিন্দুধর্ম মতে অবতারের সংখ্যা ১০; এঁরা হলেন- মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণ এবং কল্কি, এদের মধ্যে চৈতন্যদেবের কোনো নাম নেই। তাছাড়াও শাস্ত্রে কোনো নির্দিষ্ট যুগের অবতার বলে কিছু নেই, থাকলে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব দ্বাপর যুগের শেষে না হয়ে দ্বাপর যুগের শুরুতে হতো, একইভাবে চৈতন্যদেব কলিযুগের অবতার হলে তার জন্ম ২০১৯ সাল থেকে মা্ত্র ৫৩৩ বছর আগে ১৪৮৬ সালে না হয়ে ৫৩০০ বছর আগে কলিযুগের শুরুতে হতো। সকল অবতারগণ তাদের সময়ে, সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সকল অবতারের শিক্ষাই তাদের পরবর্তী সময়ের মানুষদের জন্য প্রযোজ্য।

আবার অনেকে বলে থাকেন, চৈতন্যদেব হলেন রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। কিন্তু হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য কোনো গ্রন্থে রাধা বলে কেউ নেই, এই সূত্রে শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধা নামের কোনো নারী নেই; আর পৃথিবীতে অবতার আছে শুধু বিষ্ণুর, কৃষ্ণের অবতার বলে কিছু নেই; গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে বলেছেন, যখনই প্রয়োজন হয়, তখনই তিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, সেটা তিনি বলেছেন তাঁর পূর্ববর্তী অবতারগণকে স্মরণ করে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে; তার নিজের অবতার হিসেবে নয়, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার।

এছাড়াও এক অবতার কখনো অপর অবতারের ভক্ত হয় না, যেহেতু তারা একই শক্তি বিষ্ণু অবতার; একারণেই শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর পূর্ববর্তী রাম বা পরশুরামের ভক্ত নয়, কিন্তু চৈতন্যদেব ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অন্ধ উন্মাদ ভক্ত; এই তথ্যও প্রমাণ করে যে চৈতন্যদেব কোনো অবতার নয়, তিনি শুধু শ্রীকৃষ্ণের একজন পরম ভক্ত মাত্র।

চৈতন্যদেব কি ভগবান ?

ইতিহাস বলছে- চৈতন্যদেবকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ভেতর হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিলো। যশ, বীর্য, ঐশ্বর্য, শ্রী, জ্ঞান, বৈরাগ্য- এই ছয়টি গুন থাকলে তাকে বলে ভগবান, আর সকল গুন থাকলে তাকে বলে ঈশ্বর; চৈতন্যদেবেরে মধ্যে বীর্য তথা শক্তি থাকলে তাকে কেউ হত্যা করতে পারতো না। এই তথ্য প্রমাণ করে যে চৈতন্যদেব  কোনো ভগবান নয়।

চৈতন্যদেব কি মহাপ্রভু ?

কোনো শব্দের পূর্বে 'মহা' বিশেষণটি যুক্ত করলে, সেটাই হয় চুড়ান্ত বা শেষ কথা।  অন্যদিকে প্রভু শব্দের অর্থ হলো মালিক এবং সনাতন ধর্মের প্রধান গ্রন্থ গীতার মতে শ্রীকৃষ্ণই হলেন এই জগতের মালিক, এইসূত্রে মহাপ্রভু হলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব নয়। অজ্ঞানতাবশত চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু বলে সম্বোধন করে আপনি চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের স্থানে বসাচ্ছেন, এটা শুধু পাপ নয়, মহাপাপ; কারণ, চৈতন্যদেবকে আপনি যখন মহাপ্রভু বলে সম্বোধন বা প্রচার করছেন, তখন চৈতন্যদেবই হচ্ছেন শেষ কথা, কিন্তু বাস্তবে শ্রীকৃষ্ণই হলেন সনাতন ধর্মের শেষ বা চুড়ান্ত কথা।

চৈতন্যচরিতামৃত বা চৈতন্যভাগবত কি শাস্ত্রগ্রন্থ ?

কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ কখনো একাধিক ব্যক্তি লিখে না, লিখে একজন; যেমন- রামায়ণ একজনই লিখেছে, মহাভারত একজনই লিখেছে, ভাগবত এবং পুরাণগুলোও একজনই লিখেছে; কিন্তু চৈতন্যদেবকে নিয়ে মোট ৫ জনে লিখেছিলো ৫টি গ্রন্থ, যেমন-

১।বৃন্দাবন দাসের # চৈতন্যভাগবত (প্রকাশ-১৫৭৫ খ্রি.);
২।কবিরাজ গোস্বামীর # চৈতন্যচরিতামৃত (১৬১৫);
৩।ত্রিলোচন দাস ঠাকুরের # শ্রীচৈতন্যমঙ্গল (১৫৭৭); 
৪।জয়ানন্দেরও # শ্রীচৈতন্যমঙ্গল (১৫৭৬/৭৭);
৫।শ্রীচুড়ামনিদাসের # গৌরাঙ্গবিজয় বা ভুবনমঙ্গল (১৫৩৫) 

এগুলোর মধ্যে বাজারে চলে চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবত; একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি লিখায় চৈতন্যদেবকে নিয়ে লিখা জীবনীগ্রন্থগুলো কখানো শাস্ত্র নয়, সাহিত্য। তাই ধর্মের কোনো মীমাংসায় চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবতের কোনো বক্তব্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা বা কোনো মূল্য নেই এবং এগুলো থেকে উৎসারিত পরবর্তী বৈষ্ণবগ্রন্থগুলোও কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ নয়।

চৈতন্যদেব, তাঁর ভক্ত-শিষ্যদেরকে কী নির্দেশ দিয়েছেন ?

চৈতন্যদেব, তার ভক্ত শিষ্যদেরকে শুধুমাত্র কৃষ্ণনাম করতেই নির্দেশ দিয়েছেন। গুরু হিসেবে তিনি সঠিক নির্দেশই দিয়েছেন, অথচ কিছু লোক কৃষ্ণভজন বাদ দিয়ে চৈতন্যদেবকেই ভজনা করছে, এতে শুধু সেই ব্যক্তিরই পাপ হচ্ছে না, পাপ হচ্ছে স্বয়ং চৈতন্যদেবেরও।

হিন্দু সমাজের আদর্শ কে ?

হিন্দু সমাজের আদর্শ অন্য কেউ নয়, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং গীতার মতে, পূজা-প্রার্থনা পাবার অধিকারী শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণ।

সুতরাং আপনার জন্য আমার পরামর্শ- সকল ধরণের ব্যক্তিপূজা এবং ব্যক্তিভজনা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করুন, আপনার আত্মার মুক্তি হলে হতেও পারে।

আশা করছি- উপরের আলোচনা থেকে চৈতন্যদেব সম্পর্কে বৈষ্ণব সমাজ তথা আধুনিক ইসকনের মিথ্যা প্রচার সম্পর্কে আপনাকে বোঝাতে এবং সাবধান করতে পেরেছি।

শেষে একটা কথা বলছি- চৈতন্যদেবের জীবনের কোনো আদর্শকে অনুসরণ নয়, শুধু তাঁর উপদেশ- তোমরা কৃষ্ণ নাম করো- এটাকে অনুসরণ করুন এবং কাল্পনিক রাধাকে বাদ দিয়ে কৃষ্ণের আদর্শকে ফলো করুন, আপনার জীবনে কোনো সমস্যা আসতেই পারবে না।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

চৈতন্যদেবের অবতারত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াস :


চৈতন্যদেবের অবতারত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াস :

এই প্রবন্ধের সাথে ফটো হিসেবে যা পোস্ট করেছি, সেখানে খেয়াল করুন, কোনো এক ইসকন ভক্ত- শ্রীমদ্ভাগবত, মহাভারত, পদ্মপুরাণ, বামন পুরাণ, বায়ু পুরাণ থেকে একটি করে রেফারেন্স তুলে দিয়ে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে, চৈতন্যদেব যে অবতার তার শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি আছে। খুব সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে এগুলোকে আপনার সত্য বলেই মনে হতে পারে, কিন্তু ভেজালের ভীড়ে সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্য সমুদ্রের উপরের জলে নেই, এই সত্যকে পেতে হলে আপনাকে সমুদ্রের গভীরে ডুব দিতে হবে, যেই ডুবটা আমি দিতে পেরেছি বলে মনে করি এবং আজকের এই প্রসঙ্গে সেখান থেকে সত্য তুলে এনে তা আজ আপনাদেরকে দর্শন করাবো।

যিনি একটা মিথ্যা বলতে পারেন, তিনি একশটা মিথ্যা্ও বলতে পারেন, এই ইসকন ভক্ত চৈতন্যদেবের অবতারত্বের পক্ষে যতগুলো রেফারেন্স দিয়েছে, তার থেকে মাত্র দুটোর আলোচনা করে আপনাকে বুঝিয়ে দেবো যে, এ যা বলেছে- তার সব মিথ্যা; তাই বাকিগুলোর আর আলোচনা করার প্রয়োজনই পড়বে না।

চৈতন্যদেবের অবতারত্বের প্রমাণে সে প্রথমেই শ্রীমদ্ভাগবতের ১১/৫/৩২ নং শ্লোকের রেফারেন্স দিয়েছে, যেখানে লিখা আছে-

" কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ।।"

এর অর্থ হিসেবে সে লিখেছে,

"এই কলিযুগে সুমেধাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ অবিরাম কৃষ্ণকীর্তনকারী ভগবানের অবতারকে আরাধনা করার জন্য সংকীর্তন যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। যদিও তাঁর গায়ের রং অকৃষ্ণ,তবুও তিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তিনি তাঁর সঙ্গী,সেবক,অস্ত্র(নাম),পার্ষদ পরিবৃত।"

এখানে সে- অবিরাম কৃষ্ণকীর্তনকারী ভগবানের অবতারকে- শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে চৈতন্যদেবের প্রতি ইঙ্গিত করেছে, যেটা সে ধার করেছে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের আদি লীলার তৃতীয় পরিচ্ছেদ থেকে। কিন্তু এটা যেহেতু ভাগবতের রেফারেন্স, তাই ভাগবতে অবশ্যই এর অনুবাদ পাওয়া যাবে, সেখানে গিয়ে দেখলাম, এর অনুবাদ হিসেবে লিখা রয়েছে-

"কৃষ্ণবর্ণ ও ইন্দ্রনীলজ্যোতিবিশিষ্ট, সাঙ্গ হৃদয়াদি, উপাঙ্গ কৌস্তুভাদি ও পার্ষদ সুনন্দাদিসহ যিনি অবতীর্ণ তাঁকে মনুষ্যগণ সঙ্কীর্তনরূপ যজ্ঞদ্বারা তাঁর অর্চনা করেন।" (সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ কর্তৃক অনুবাদিত, কোলকাতার তুলি-কলম থেকে প্রকাশিত মূল সংস্কৃত ভাগবতের পূর্ণাঙ্গ গদ্য অনুবাদ, পৃষ্ঠা নং-৬৫৯)

এখানে যার কথা বলা হয়েছে, তিনি যে চৈতন্য নয়, কৃষ্ণ; সেটা তাঁর রূপের বর্ণনায়-কৃষ্ণবর্ণ ও ইন্দ্রনীলজ্যোতিবিশিষ্ট- শব্দগুচ্ছদ্বারাই বোঝানো হয়েছে, কিন্তু ধান্ধাবাজ বৈষ্ণবরা এই শ্লোকের অনুবাদে "কৃষ্ণবর্ণং" শব্দের অর্থ কালো রং না লিখে, 'যিনি কৃষ্ণের বর্ণনা করেন' অর্থাৎ চৈতন্যদেবকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এবং তার পরের শব্দ 'ত্বিষাকৃষ্ণং' যে শব্দের অর্থ 'ইন্দ্রনীলজ্যোতিবিশিষ্ট', তা না লিখে শব্দটিকে 'ত্বিষা অকৃষ্ণং' এভাবে ভেঙ্গে এবং এর অর্থ 'অঙ্গকান্তিতে গৌরবর্ণ' লিখে চৈতন্য অর্থাৎ গৌরাঙ্গকেই বোঝানোর চেষ্টা
করেছে। কিন্তু এই শ্লোকে যে শ্রীকৃষ্ণের কথাই বলা হয়েছে, সেটা বোঝা যাবে এর একটু উপরের শ্লোকে গেলেই; কারণ, সেখানে বলা হয়েছে-

"দ্বাপরে ভগবান শ্যামবর্ণ, পীতবসন, চক্রাদি আয়ুধধারী শ্রীবৎসচিহ্নে চিহ্নিত এবং কৌস্তভ ভূষণে ভূষিত হয়ে অবতীর্ণ হন।"

সুতরাং উপরের এই আলোচনা থেকে- শ্রীমদ্ভাগবতে, চৈতন্যের উল্লেখ আছে এটা যে বৈষ্ণব সমাজের একটি ডাহা মিথ্যা প্রচার, আশা করছি আমার বন্ধুদের কাছে তা ক্লিয়ার হয়েছে।

এর পর আসা যাক পরের রেফারেন্সে-

দ্বিতীয় রেফারেন্সে সে মহাভারতের বনপর্বের একটি একটি শ্লোকের কথা উল্লেখ করেছে, কিন্তু খেয়াল করে দেখুন শ্লোকের নং, শ্লোকটি কোন উপাখ্যানের অন্তর্ভূক্ত সে সব কিন্তু উল্লেখ করে নি, যেভাবে উল্লেখ করেছিলো ভাগবতের রেফারেন্সটি। এর মানে কী ? এর মানে হলো- মহাভারতের এই রেফারেন্সটি একটি বানানো রেফারেন্স, তাই তার পিতা মাতা বা পরিচয়ের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি মহাভারতের বনপর্বে ৫৮ টি উপাখ্যান আছে, আর তাতে আছে হাজার হাজার শ্লোক, আপনি কোথায় গিয়ে এই শ্লোক খুঁজবেন ? শুধু মুখচেনা কাউকে কোলকাতা বা ঢাকা শহরে গিয়ে কি আপনি খুঁজে বের করতে পারবেন, যদি তার ঠিকানা আপনার কাছে না থাকে ? আর যদি আপনার কাছে তার ঠিকনা থাকেই অর্থাৎ এটা কোন উপাখ্যানের কোন শ্লোক, সেটা যদি আপনার জানা থাকেই, তাহলে সেটা আমাকে না দিয়ে, আমাকে মহাসমুদ্রে ফেলে দেওয়ার মানেটা কী ?

এই একই অবস্থা, পরের তিনটি রেফারেন্স- পদ্মপুরাণ, বামন পুরাণ, আর বায়ুপুরাণের ক্ষেত্রেও, কোনো অধ্যায় বা শ্লোক নং এর কোনো উল্লেখ নেই।

এসব থেকেই প্রমাণ হয় যে, ভাগবতের রেফারেন্সটি সঠিক হলেও তা যে বিকৃত সেটার প্রমাণ এবং ব্যাখ্যা তো আগেই দিয়েছি, আর পরের চারটি রেফারেন্সই ডাহা মিথ্যাচার; কারণ, সেগুলোর কোনো জন্ম পরিচয় ই নেই।

যা হোক, উপরে আমি- বৈষ্ণবীয় ইসকন কর্তৃক চৈতন্যদেবকে অবতার প্রমাণ করার যে শাস্ত্রীয় অপচেষ্টা, তাকে তো মিথ্যা প্রমাণ করেই দিলাম। কিন্তু নিচে আমি- চৈতন্যদেব যে কোনো অবতার বা ভগবান নয়- সে সম্পর্কে আমার যুক্তি তুলে ধরলাম, কোনো বৈষ্ণব বা ইসকনীদের যদি ক্ষমতা থাকে তো আমার এই সব যুক্তিকে খণ্ডন করে আমার কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করুক-

চৈতন্যদেব সম্পর্কে কিছু মিথ্যা প্রচার, যা হয়তো এতদিন আপনি বিশ্বাস করে এসেছেন-

চৈতন্যদেব কি কলিযুগের অবতার ?

অনেককেই বলতে শুনেছেন, চৈতন্যদেব হলেন কলিযুগের অবতার । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ডাহা মিথ্যা প্রচার, যেটা করেছেন চৈতন্যদেবের শিষ্যরা আবেগে আপ্লুত হয়ে চৈতন্যেদেবের উপর জীবনীগ্রন্থ লিখে চৈতন্যদেবকে মহান করতে গিয়ে; কিন্তু হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য কোনো শাস্ত্রীয় গ্রন্থে চৈতন্যদেবকে অবতার বলা হয় নি, চৈতন্যদেব নিজেও কখনো নিজেকে কারো অবতার বলে দাবী করেন নি। হিন্দুধর্ম মতে অবতারের সংখ্যা ১০; এঁরা হলেন- মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণ এবং কল্কি, এদের মধ্যে চৈতন্যদেবের কোনো নাম নেই। তাছাড়াও শাস্ত্রে কোনো নির্দিষ্ট যুগের অবতার বলে কিছু নেই, থাকলে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব দ্বাপর যুগের শেষে না হয়ে দ্বাপর যুগের শুরুতে হতো, একইভাবে চৈতন্যদেব কলিযুগের অবতার হলে তার জন্ম ২০১৯ সাল থেকে মা্ত্র ৫৩৩ বছর আগে ১৪৮৬ সালে না হয়ে ৫৩০০ বছর আগে কলিযুগের শুরুতে হতো। সকল অবতারগণ তাদের সময়ে, সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সকল অবতারের শিক্ষাই তাদের পরবর্তী সময়ের মানুষদের জন্য প্রযোজ্য।

আবার অনেকে বলে থাকেন, চৈতন্যদেব হলেন রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। কিন্তু হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য কোনো গ্রন্থে রাধা বলে কেউ নেই, এই সূত্রে শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধা নামের কোনো নারী নেই; আর পৃথিবীতে অবতার আছে শুধু বিষ্ণুর, কৃষ্ণের অবতার বলে কিছু নেই; গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে বলেছেন, যখনই প্রয়োজন হয়, তখনই তিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, সেটা তিনি বলেছেন তাঁর পূর্ববর্তী অবতারগণকে স্মরণ করে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে; তার নিজের অবতার হিসেবে নয়, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার।

এছাড়াও এক অবতার কখনো অপর অবতারের ভক্ত হয় না, যেহেতু তারা একই শক্তি বিষ্ণু অবতার; একারণেই শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর পূর্ববর্তী রাম বা পরশুরামের ভক্ত নয়, কিন্তু চৈতন্যদেব ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অন্ধ উন্মাদ ভক্ত; এই তথ্যও প্রমাণ করে যে চৈতন্যদেব কোনো অবতার নয়, তিনি শুধু শ্রীকৃষ্ণের একজন পরম ভক্ত মাত্র।

চৈতন্যদেব কি ভগবান ?

ইতিহাস বলছে- চৈতন্যদেবকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ভেতর হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিলো। যশ, বীর্য, ঐশ্বর্য, শ্রী, জ্ঞান, বৈরাগ্য- এই ছয়টি গুন থাকলে তাকে বলে ভগবান, আর সকল গুন থাকলে তাকে বলে ঈশ্বর; চৈতন্যদেবেরে মধ্যে বীর্য তথা শক্তি থাকলে তাকে কেউ হত্যা করতে পারতো না। এই তথ্য প্রমাণ করে যে চৈতন্যদেব কোনো ভগবান নয়।

চৈতন্যদেব কি মহাপ্রভু ?

কোনো শব্দের পূর্বে 'মহা' বিশেষণটি যুক্ত করলে, সেটাই হয় চুড়ান্ত বা শেষ কথা। অন্যদিকে প্রভু শব্দের অর্থ হলো মালিক এবং সনাতন ধর্মের প্রধান গ্রন্থ গীতার মতে শ্রীকৃষ্ণই হলেন এই জগতের মালিক, এইসূত্রে মহাপ্রভু হলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব নয়। অজ্ঞানতাবশত চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু বলে সম্বোধন করে আপনি চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের স্থানে বসাচ্ছেন, এটা শুধু পাপ নয়, মহাপাপ; কারণ, চৈতন্যদেবকে আপনি যখন মহাপ্রভু বলে সম্বোধন বা প্রচার করছেন, তখন চৈতন্যদেবই হচ্ছেন শেষ কথা, কিন্তু বাস্তবে শ্রীকৃষ্ণই হলেন সনাতন ধর্মের শেষ বা চুড়ান্ত কথা।

চৈতন্যচরিতামৃত বা চৈতন্যভাগবত কি শাস্ত্রগ্রন্থ ?

কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ কখনো একাধিক ব্যক্তি লিখে না, লিখে একজন; যেমন- রামায়ণ একজনই লিখেছে, মহাভারত একজনই লিখেছে, ভাগবত এবং পুরাণগুলোও একজনই লিখেছে; কিন্তু চৈতন্যদেবকে নিয়ে মোট ৫ জনে লিখেছিলো ৫টি গ্রন্থ, যেমন-

১।বৃন্দাবন দাসের # চৈতন্যভাগবত (প্রকাশ-১৫৭৫ খ্রি.);
২।কবিরাজ গোস্বামীর # চৈতন্যচরিতামৃত (১৬১৫);
৩।ত্রিলোচন দাস ঠাকুরের # শ্রীচৈতন্যমঙ্গল (১৫৭৭);
৪।জয়ানন্দেরও # শ্রীচৈতন্যমঙ্গল (১৫৭৬/৭৭);
৫।শ্রীচুড়ামনিদাসের # গৌরাঙ্গবিজয় বা ভুবনমঙ্গল (১৫৩৫)

এগুলোর মধ্যে বাজারে চলে চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবত; একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি লিখায় চৈতন্যদেবকে নিয়ে লিখা জীবনীগ্রন্থগুলো কখানো শাস্ত্র নয়, সাহিত্য। তাই ধর্মের কোনো মীমাংসায় চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্যভাগবতের কোনো বক্তব্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা বা কোনো মূল্য নেই এবং এগুলো থেকে উৎসারিত পরবর্তী বৈষ্ণবগ্রন্থগুলোও কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ নয়।

চৈতন্যদেব, তাঁর ভক্ত-শিষ্যদেরকে কী নির্দেশ দিয়েছেন ?

চৈতন্যদেব, তার ভক্ত শিষ্যদেরকে শুধুমাত্র কৃষ্ণনাম করতেই নির্দেশ দিয়েছেন। গুরু হিসেবে তিনি সঠিক নির্দেশই দিয়েছেন, অথচ কিছু লোক কৃষ্ণভজন বাদ দিয়ে চৈতন্যদেবকেই ভজনা করছে, এতে শুধু সেই ব্যক্তিরই পাপ হচ্ছে না, পাপ হচ্ছে স্বয়ং চৈতন্যদেবেরও।

হিন্দু সমাজের আদর্শ কে ?

হিন্দু সমাজের আদর্শ অন্য কেউ নয়, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং গীতার মতে, পূজা-প্রার্থনা পাবার অধিকারী শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণ।

সুতরাং আপনার জন্য আমার পরামর্শ- সকল ধরণের ব্যক্তিপূজা এবং ব্যক্তিভজনা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করুন, আপনার আত্মার মুক্তি হলে হতেও পারে।

আশা করছি- উপরের আলোচনা থেকে চৈতন্যদেব সম্পর্কে বৈষ্ণব সমাজ তথা আধুনিক ইসকনের মিথ্যা প্রচার সম্পর্কে আপনাকে বোঝাতে এবং সাবধান করতে পেরেছি।

শেষে একটা কথা বলছি- চৈতন্যদেবের জীবনের কোনো আদর্শকে অনুসরণ নয়, শুধু তাঁর উপদেশ- তোমরা কৃষ্ণ নাম করো- এটাকে অনুসরণ করুন এবং কাল্পনিক রাধাকে বাদ দিয়ে কৃষ্ণের আদর্শকে ফলো করুন, আপনার জীবনে কোনো সমস্যা আসতেই পারবে না।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদে সমগ্র বাঙ্গালি হিন্দু সমাজ :


বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদে সমগ্র বাঙ্গালি হিন্দু সমাজ :

যিনি নারীর মুখ দেখেন না এবং নারীকে কোনোভাবেই ডাকেন না, চৈতন্যদেবের মতে তিনিই প্রকৃত বৈষ্ণব বা বৈরাগী। এই বিশ্বাস থেকেই চৈতন্যদেব তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ও মাকে পরিত্যাগ করেছিলো এবং এক বৃদ্ধা নারীর মুখ দেখা ও তাকে ডাকার অপরাধে চৈতন্যদেব, তার শিষ্য ছোট হরিদাসকে বর্জন করেছিলো ; এরপর এক বছর আশে পাশে ঘোরাঘুরি করার পরও চৈতন্যদেব তাকে ক্ষমা না করায় ছোট হরিদাস জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলো এবং এই সংবাদ যখন চৈতন্যদেবের নিকট আসে, তখন চৈতন্যদেব বলেছিলো- ইহাই প্রকৃতি সম্ভাষণের প্রায়শ্চিত্ত।

এই সেই চৈতন্যদেব, যার জীবনাদর্শ মানলে পরিবার, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্রের ধ্বংস অনিবার্য। কারণ, গার্হস্থ্য ধর্ম- যেটা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি, সেটা চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব মতবাদে নেই। বৈষ্ণব মতবাদের মূল কথা হলো সংসার পরিত্যাগ করে মাধুকরী অর্থাৎ ভিক্ষার দ্বারা জীবিকা অর্জন; বৈষ্ণব মতবাদে বিয়ে শাদী, সংসার, সন্তানের জন্মদান বলে কিছু নেই।

চৈতন্যদেবের জন্ম ১৪৮৬ সালে, সমাজ সংসারে তার প্রভাব শুরু হয় মোটামুটি ১৫০০ সালের পর থেকে। হরিনাম প্রচারের নাম করে ২৪ বছর বয়সে চৈতন্যদেব, তার সদ্য বিবাহিতা দ্বিতীয় স্ত্রী বিষ্ণু প্রিয়া এবং মাকে পরিত্যাগ করে সংসার ছেড়ে চলে যান। অথচ হরিনাম প্রচারের জন্য সংসার পরিত্যাগ করতে হবে, এমন কথা সনাতন ধর্মের কোথাও বলা নেই। সনাতন ধর্মের প্রধান পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, তিনিও কখনো এমন কথা কোথাও বলেন নি বা নিজে কখনো সংসার থেকে পালিয়ে বেড়ান নি, তাহলে চৈতন্যদেব কার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্ত্রী ও মায়ের প্রতি উত্তর দা্য়িত্বকে অবহেলা বা অবজ্ঞা করে সংসার ত্যাগ করেছিলেন ?

যা হোক, বাঙ্গালি হিন্দু সমাজের খুব কম হিন্দুই এটা জানে যে- প্রচলিত মতে বৈষ্ণব ধর্ম, যাকে আমি বলি বৈষ্ণব মতবাদ, সেটা সনাতন ধর্ম থেকে আলাদা। মুহম্মদের অনুসারীদের যেমন বলে মুসলমান, তেমনি চৈতন্যদেবের অনুসারীদেরকে বলে বৈষ্ণব বা বৈরাগী। এই বৈষ্ণব বা বৈরাগীদের কালচার, সনাতনী হিন্দুদের থেকে অনেকটা আলাদা; যেমন বৈরাগীরা কেউ মারা গেলে তাকে সনাতনী হিন্দুদের মতো পোড়ায় না, তাকে মাটিতে পুঁতে রাখে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শ্রাদ্ধ করে না, দেয় চৈতন্যের নামে মহাপ্রভুর ভোগ। সনাতনী হিন্দুদের সাথে বৈষ্ণব সমাজের কালচারে এই দুটিই মূলত প্রধান পার্থক্য, কিন্তু এছাড়াও আরও কিছু সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে যেটা বৈষ্ণব বা সনাতনী কেউ খুব একটা খেয়াল করে না। যেমন- বৈষ্ণব মতবাদে মূর্তিপূজা বলে কিছু নেই, কিন্তু বর্তমানে সব বৈষ্ণব ই সনাতনী সমাজের সাথে মিলে মূর্তিপূজা করে। বৈষ্ণবদের আরাধ্য চৈতন্যদেব এবং তার কয়েকজন পারিষদ যারা পঞ্চতত্ত্ব নামে খ্যাত, বৈষ্ণবরা মূলত এদেরই পূজা প্রা্র্থনা করে। বৈষ্ণব সমাজ, সনাতনী হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা হতে পারে নি মূলত শ্রীকৃষ্ণের জন্য; কারণ, চৈতন্যদেবের আরাধ্য যেমন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, তেমনি সনাতনী সমাজের আরাধ্যও শ্রীকৃষ্ণ।

হিন্দু সমাজে বৈষ্ণবরা আধিপত্য বিস্তার করেছে তাদের গুরুগিরি ব্যবসার মাধ্যমে। এই বৈষ্ণব গুরুদের প্রায় সবাই বিবাহিত, তাদের সংসার আছে, ছেলে মেয়ে আছে, যেটা চৈতন্যদেবের আদর্শের সম্পূর্ণ বিরোধী, তারপরও এরা নিজেদের বৈষ্ণব বলে দাবী করে এবং বৈষ্ণব মতবাদ সমাজে প্রচার করে!

চৈতন্যদেব- স্ত্রী ও সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন, তিনি কোনো ছেলে মেয়েরও জন্ম দেন নি। তার কারণ তিনি
কাম অর্থাৎ যৌনতায় বিশ্বাস করতেন না। এজন্য তিনি উত্তেজক খাদ্য পরিহার করে নিরামিষ খাবার খেতেন। এই সূত্র ধরে চৈতন্য অনুসারীরা প্রচার করে যে কৃষ্ণভক্ত হতে হলে নিরামিষ খাবার খেতে হবে, এর জন্য তারা গীতার অপব্যাখ্যা করে বলে যে সাত্ত্বিক মানে নিরামিষ খাবার । কিন্তু গীতায় সাত্ত্বিক বলতে নিরামিষকে বোঝানো হয় নি, বরং গীতার ৯/২৭ নং শ্লোকে খাবার দাবারের ব্যাপারে চুড়ান্ত স্বাধীনতা দিয়ে বলা হয়েছে যে, “তোমরা যা কিছু আহার করো তা আমাকে নিবেদন করে আহার করো।” কিন্তু বৈষ্ণব সমাজ মানুষকে নিরামিষ খাওয়াতে বদ্ধ পরিকর।

আগেই বলেছি- তিনিই বৈষ্ণব, যিনি নারীর মুখ দেখেন না বা নারীকে ডাকেন না। নারী ছাড়া কোনো পরিবার গড়ে উঠে না, আর পরিবার ছাড়া সমাজ রচিত হয় না; এই সূত্রে পৃথিবীতে বৈষ্ণব সমাজ বলে আদৌ কিছু নেই। তাই জন্ম সূত্রে কারো বৈষ্ণব বা বৈরাগী হওয়ার সুযোগ নেই, যেহেতু তার পিতা মাতা বিয়ে করার অপরাধে বৈষ্ণব নয়। কিন্তু চৈতন্যদেবের অনুসারী বা ভক্তরা দেদারসে বিয়ে করছে, সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, সংসার করছে, বিভিন্ন রকম মূর্তির পূজা করছে, যা সম্পূর্ণ সনাতনী কালচার- আর নিজেদেরকে ভাবছে বৈষ্ণব, এটা আসলে ভণ্ডামীর চুড়ান্ত রূপ।

অন্যদিকে সনাতনী হিন্দু সমাজের অনেকেই ছেলে মেয়ের মুখের ভাত বা অন্নপ্রাশন উপলক্ষ্যে, পিতা মাতার মৃত্যুতে বা অনেক সময় শখ বা খেয়ালের বশেও চৈতন্যের নামে মহাপ্রভুর ভোগ দিয়ে মানুষকে খাওয়ায়, আবার অনেক সময় অনেকে বছরে দু একবার বাড়িতে কীর্তনও দেয়, আর কীর্তনীয়ারা গিয়ে শুরু করে পঞ্চতত্ত্বের পূজা আর গাইতে শুরু করে- জয় গুরু গৌরাঙ্গ, জয় গুরু গৌরাঙ্গ, জয় গুরু গৌরাঙ্গ, জয় জয়; যেখানে শুধু গৌরাঙ্গ বা চৈতন্যেরই আরাধনা, শ্রীকৃষ্ণের কোনো কথাই নেই।

এই ভাবে সনাতনী হিন্দু সমাজ, বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদে পড়ে নিজেদের অজ্ঞাতেই চর্চা করছে বৈষ্ণব মতবাদের, যেখানে প্রধান চৈতন্যদেব, শ্রীকৃষ্ণ নয়। এছাড়াও বৈষ্ণবদের মিথ্যা প্রচারে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই প্রায় সকল হিন্দুই বিশ্বাস করে যে চৈতন্যদেব হলেন মহাপ্রভু। কিন্তু বাস্তবে মহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণ। এভাবে বৈষ্ণবরা সনাতনী হিন্দু সমাজকে আস্তে আস্তে বৈষ্ণব মতবাদে প্রায় কনভার্ট করে ফেলেছে। বৈষ্ণব মতবাদের এই ফাঁদে পড়ে আবার প্রায় সকল হিন্দু এটা বিশ্বাস করে যে চৈতন্যদেব হলেন কলিযুগের অবতার বা ভগবান এবং এর ফলে দ্বাপর যুগের অবতার শ্রীকৃষ্ণকে তারা ফলো করে না, ফলে বৈষ্ণব সমাজের কারণে সনাতনী হিন্দু সমাজ আস্তে আস্তে শ্রীকৃষ্ণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা হিন্দু সমাজের সর্বনাশকে ডেকে আনছে; কারণ, আগেই বলেছি চৈতন্যদেব বা বৈষ্ণব মতবাদেক ফলো করলে আস্তে আস্তে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ধ্বংস হতে বাধ্য, অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি আত্মরক্ষা করে টিকে থাকতে এবং বাড়তে সক্ষম, যা সমাজ রক্ষার মূল ভিত্তি।

চৈতন্যদেবকে মহান করে তোলার জন্য বৈষ্ণবদের আরেকটি মিথ্যা প্রচার হলো চৈতন্যদেব কলিযুগের অবতার বা ভগবান, কলিহত জীবকে উদ্ধার করার জন্য তিনি এই ধরাধামে এসেছিলেন। আমরা যেহেতু কলিযুগের মানুষ, এবং যখন কোনো হিন্দু, চৈতন্যদেবের এই কলিযুগের অবতার বা ভগবান তত্ত্বে বিশ্বাস করে, তখন সে আর শ্রীকৃষ্ণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন দ্বাপর যুগে; এইভাবে তথ্য সন্ত্রাস করে এবং শ্রীকৃষ্ণের পাশে রাধাকে দাঁড় করিয়ে, শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তোলার সুযোগ দিয়ে, বৈষ্ণবরা, যার মধ্যে আধুনিক ইসকনও অন্তর্ভূক্ত, এরা সনাতন হিন্দু সমাজের ফোকাস শ্রীকৃষ্ণের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে চৈতন্যদেবের উপর নিবদ্ধ করছে এবং হিন্দুসমাজের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করছে; কারণ, আগেই বলেছি বৈষ্ণব মতবাদ আসলে হিন্দু সমাজের ধ্বংসের পথ।

যা হোক, বিভিন্ন কারণে বিভিন্নভাবে চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব মতবাদ সনাতনী হিন্দু সমাজে ঢুকে পড়ার ফলে সনাতনী হিন্দুরা যেমন বৈষ্ণব কালচারকে পালন করছে, তেমনিভাবে বৈষ্ণব নামধারীরাও চৈতন্যদেবের নামে মহাপ্রভুর ভোগ দেওয়া এবং মৃত্যুর পর লাশ না পোড়ানো ছাড়া আর অন্য সকল ক্ষেত্রে সনাতনী কালচার পালন করছে। এর ফলে হিন্দু সমাজের সবাই যেমন এক দিক থেকে বৈষ্ণব, তেমনি বৈষ্ণব সমাজেরও কেউ বৈষ্ণব নয়, সবাই সনাতনী হিন্দু। মূলত চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব মতবাদ, সনাতনী হিন্দু সমাজে ছড়িয়ে পড়ার ফলে, বৈষ্ণব ও সনাতনী মিলে একটা জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছে, ফলে এখানে আর কারোরই কোনো বিশুদ্ধতা নেই।

বাস্তবতার কারণে- শুধু বৈষ্ণবরা নয়, পৃথিবীর সকল মানুষ সনাতনী কালচার পালন করে বা পালন করতে বাধ্য, কিন্তু হিন্দু সমাজে বৈষ্ণবদের ধর্মীয় আধিপত্যের কারণে প্রায় সকল হিন্দু চৈতন্যদেবকে কলিযুগের অবতার বা ভগবান মনে করে এবং নিজেদের মুক্তি বা উদ্ধারের জন্য চৈতন্যের শরণাপন্ন হয়ে তার নামে কারণে অকারণে ভোগ দেয় এই মনে করে যে তারা ধর্মপালন করছ। কিন্তু বাস্তবে চৈতন্যদেবকে অবতার বা ভগবান মনে ক’রে, যিনি কৃষ্ণ তিনিই চৈতন্য এই মিথ্যা থিয়োরিতে বিশ্বাস ক’রে, শুধু বৈষ্ণবরাই নয়, সমগ্র হিন্দু সমাজ এক ভীষণ পাপ করছে এবং এটা তারা করছে বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদে পড়ে। সমগ্র হিন্দু সমাজকে যতক্ষণ এই বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন করা না যাবে বা তাদেরকে এই বৈষ্ণব মতবাদ থেকে রক্ষা করা না যাবে, ততক্ষণ হিন্দু সমাজের অধঃপতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।

জন্মসূত্রে যে সব অবৈষ্ণব, বৈষ্ণবদের মিথ্যা প্রচারে বিশ্বাস করে চৈতন্যদেবকে কলিযুগের অবতার বা ভগবান মনে করে এবং নিজের আত্মার মুক্তি বা উদ্ধারের জন্য সারাক্ষণ চৈতন্য ভজনায় রত থাকে, তাদের ক্ষেত্রে একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়, আর তা হলো- সারাজীবন এরা বৈষ্ণব সেজে থাকার পরও নামের শেষে দাস বা মহন্ত লাগায় না এবং মৃত্যুর পর তাদেরকে না পুড়িয়ে সমাধিস্থ করে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে যায় না। এই ধরণের ব্যক্তিদেরকে যদি বলা হয় যে- আপনি তো সারাক্ষণ চৈতন্য বা গৌরাঙ্গ ভজনায় মেতে থাকেন, তো আপনি কি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছেন বা বৈরাগী হয়েছেন বা মারা যাওয়ার পর কি আপনাকে দাহ না করে সমাধিস্থ করা হবে ?

তখন দেখবেন এদের আসল রূপ, বলবে- বৈরাগী হবো কেনো বা বৈরাগীদরে মতো আমাকে সমাধিস্থ করা হবে কেনো ? এরা আসলে জানেই না যে বৈষ্ণব মতবাদ এবং সনাতন ধর্ম প্রকৃতপক্ষে আলাদা দুটো ব্যাপার। শ্রীকৃষ্ণকে ছেড়ে বা শ্রীকৃষ্ণকে পাশে রেখে যখন কেউ চৈতন্যদেবকে তার উদ্ধারকর্তা হিসেবে ধরে নিয়ে চৈতন্যদেবের ভজনা শুরু করে, তখন সে আর সনাতনী থাকে না, হয়ে যায় বৈষ্ণব; খুব কম হিন্দুই এই তত্ত্ব জানে, আর এটাই আসলে বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদ, যে মতবাদের ফাঁদে পড়ে প্রায় সকল হিন্দু কম বেশি বৈষ্ণব মতবাদের চর্চা করে চলেছে এবং এর ফলে দু চার জন সনাতনী হিন্দু বৈষ্ণব মতবাদকে গ্রহন করে নিজেদের নামের পাশে দাস/মহন্তও লাগাচ্ছে, এই ঘটনা ঘটেছে আমার পাশের গ্রামেই এবং আমার থানার পাশের থানার একটি ঋষি/মাটিয়াল অধ্যুষিত গ্রামের সবাই বৈষ্ণব মতবাদ গ্রহণ করে বৈরাগী হয়ে গেছে, তারা এখন এত উচ্চ মাত্রার বৈরাগী যে সবার হাতে অন্ন এবং জল খান না এবং বৈরাগী ছাড়া অন্য কারো সাথে নিজেদের ছেলে মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত দেন না।

কাগজে কলমে এইভাবে বৈষ্ণব হওয়ার হার যদিও খুবই কম, কিন্তু যারা ইসকনে সক্রিয়ভাবে যোগ দিচ্ছে, তাদের নামের পাশে তো দাস লাগানো বাধ্যতামূলক; এই ভাবে বৈষ্ণব মতবাদ, আস্তে আস্তে সমগ্র হিন্দু সমাজকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছে এবং কারণে অকারণে সব হিন্দুকে নিরামিষ খেতে উদ্বুদ্ধ করে বা বাধ্য করে, তাদের কাম ক্রোধ কমিয়ে, গার্হস্থ্য ধর্মের প্রতি তাদেরকে উদাসীন বা বিরাগী করছে, এর ফলে আস্তে আস্তে সমগ্র হিন্দু সমাজ জনসংখ্যা হারিয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে এবং শক্তি হারিয়ে অসুর জাতের সাথে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে জন্মভূমি ত্যাগেও বাধ্য হচ্ছে। আর এর সবই ঘটছে সনাতনী হিন্দু সমা্জের উপর বৈষ্ণব মতবাদের অশুভ প্রভাবের ফলে। গত ৪/৫শ বছর ধরে বৈষ্ণব মতবাদ এইভাবে সনাতনী সমাজের ক্ষতি করে চলেছে, তাই এখনই যদি এ সম্পর্কে সকল হিন্দু সচেতন না হয় এবং বৈষ্ণব মতবাদকে যদি রুখতে না পারে, বৈষ্ণব মতবাদের ফাঁদে পড়ে সমগ্র সনাতনী হিন্দু সমাজ বিলুপ্ত হতে বাধ্য।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যদেবের চরণ ধুয়ে তার সেবা করছে !


ফটো পোস্টে দেখুন, এক চৈতন্যভক্ত ফটোশপ দিয়ে ছবি বানিয়েছে- যেখানে শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেবের চরণ ধুয়ে দিয়ে তার সেবা করছে এবং ছবির ক্যাপশনে লিখেছে- হরেকৃষ্ণ জয় গৌর জয়নিতাই।

তার মানে হরেকৃষ্ণ সে স্বভাববশত বলেছে এবং জয় কামনা করেছে গৌর অর্থাৎ চৈতন্যদেবের। বৈষ্ণব সমাজের চৈতন্য এবং শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে যে মনোভাব এই ছবির মাধ্যমে আসলে সেটাই ফুটে উঠেছে। বৈষ্ণব সমাজ- অজ্ঞতা এবং মিথ্যাপ্রচারের ফলে চৈতন্যদেবকেই বড় মনে করে, তাই তাকে বলে মহাপ্রভু, কিন্তু এই তথাকথিত মহাপ্রভু চৈতন্যই যে ছিলেন পরমকৃষ্ণ ভক্ত এবং তিনি তার ভক্ত শিষ্যদেরকে সব সময় কৃষ্ণ নাম করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি নিজেই কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, সেটা বেশির ভাগ বৈষ্ণবই মনে হয় জানে না, তাই তারা কৃষ্ণ নাম বাদ দিয়ে ভজ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম বলে চিৎকার করে এবং কৃষ্ণকে ছোট ক'রে এই রকম ছবি বানানোর মতো ক্ষমাহীন পাপ করে। যা হোক, বৈষ্ণব সমাজ আর কী কী ভাবে চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে বড় মনে করে, সেটা দেখে নিন নিচের প্রবন্ধ থেকে-

বৈষ্ণব মতবাদে শ্রীকৃষ্ণ নয়, চৈতন্যদেবই বড় :

বৈষ্ণব সমাজে মহাপ্রভুর ভোগ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কেউ মারা গেলে বাধ্যতামূলকভাবে মহাপ্রভুর ভোগ তো দিতেই হয়, কেউ কেউ ছেলে মেয়ের অন্নপ্রাশনেও মহাপ্রভুর ভোগ দেয়, আবার কেউ শখ করেও দেয়।

যা হোক, বৈষ্ণব সমাজের এই মহাপ্রভুর ভোগ মানে চৈতন্যদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভোগ, চৈতন্যদেবকে এখানে মহাপ্রভু হিসেবে বোঝানো হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব নয়। কারণ, মহা মানেই চুড়ান্ত কিছু, তাই মহাপ্রভু মানেই শেষ কথা, আর এই শেষ কথার বিচারে হিন্দুধর্মের মহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণ; কারণ, শ্রীকৃষ্ণের উপরে কিছু নেই। কিন্তু বৈষ্ণব সমাজ মহাপ্রভু বলতে চৈতন্যদেবকে বোঝায়, যেটা তাদের প্রথম ভুল এবং সাধারণ হিন্দু সমাজেরে জন্য একটি চুড়ান্ত ধোকা।

বৈষ্ণব সমাজে আরেক প্রকার ভোগ প্রচলিত, যাকে বলে গিরিধারীর ভোগ। এই ভোগ কথিত মহাপ্রভুর ভোগের চেয়ে ছোট, তাই এর আয়োজন কম এবং খরচও অল্প।

বৈষ্ণব সমাজসহ প্রায় সব হিন্দু এটা জানে যে চৈতন্যদেব আসলে কে, কিন্তু বৈষ্ণবসহ সবাই যদি জানতো যে গিরিধারী আসলে কে, তাহলে আমার মনে হয় চৈতন্যর নামে দেওয়া ভোগের চেয়ে গিরিধারীর ভোগ বড় হতো।
আমরা অনেকেই জানি যে, শ্রীকৃষ্ণ ৭ বছর বয়সে, দেবরাজ ইন্দ্রের অহংকারকে চূর্ণ করার জন্য বৃন্দাবনবাসী কর্তৃক ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করে গোবর্ধন নামে এক পর্বতের পূজা শুরু করেন, এতে ইন্দ্র ক্ষেপে গিয়ে বৃন্দাবন বাসীর উপর এক ভয়্ঙ্কর ঝড় বৃষ্টি চাপিয়ে দেয়। ইন্দ্রের এই কোপ থেকে বৃন্দাবনবাসীকে রক্ষা করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গোবর্ধন পর্বতকে হাতের উপর ছাতার মতো তুলে ধরেন এবং ৭ দিন ঐ অবস্থায় তুলে রাখেন।

যা হোক, শ্রীকৃষ্ণের শক্তির পরিচয় পেয়ে শেষ পর্যন্ত ইন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণের কাছে হার স্বীকার করেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারেন। পর্বতের সমার্থক শব্দ হলো গিরি। শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু গিরি গোবর্ধনকে নিজের হাতের আঙ্গুলের উপর ধারণ করেছিলেন, তাই শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম গিরিধারী। এই শ্রীকৃষ্ণের নামে যে ভোগ হয় তাই গিরিধারী ভোগ, এর গুরুত্ব বা সম্মান বৈষ্ণব সমাজে কম এবং সেই শ্রীকৃষ্ণের যিনি ভক্ত সেই চৈতন্যের নামে যে ভোগ হয়, তার গুরুত্ব বৈষ্ণব সমাজে বেশি; এভাবে বৈষ্ণব মতবাদে শ্রীকৃষ্ণ নয়, চৈতন্যদেবই বড় এবং শ্রীকৃষ্ণ তাদের মহাপ্রভু নয়, মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত চৈতন্যদেব!

এই বৈষ্ণব সমাজের এবং বৈষ্ণব সমাজ কর্তৃক প্রভাবিত হিন্দুদের, যারা মনে করে মহাপ্রভু হলেন শ্রীচৈতন্য এবং গিরিধারীর ভোগকে যারা ছোট ভোগ মনে করে এবং চৈতন্যের নামে দেওয়া ভোগকে বড় মনে করে, সেই সব ভক্তের আত্মার কোনো সদগতি হবে ?

হবে না।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

সেবাই কি পরম ধর্ম ?


সেবাই কি পরম ধর্ম ?

বৈষ্ণব গুরুরা, তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রচার করে যে- কলির ধর্ম সেবা বা সেবাই পরমধর্ম এবং এই সেবা বলতে তারা কোনো সামগ্রিক মানবসেবাকে বোঝায় না, বোঝায় কিছু মুষ্টিমেয় ব্যক্তির পেটপূজাকে। এটা তারা এজন্য প্রচার করে যে, এটা প্রচার না করলে বা শিষ্যরা এটা বিশ্বাস না করলে, শিষ্যরা বা সাধারণ হিন্দুরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে এই সেবা উপলক্ষ্যে ঐসব গুরুদের পেট পূজা করবে কেনো ? কিন্তু বাস্তবে এটি একটি মিথ্যা প্রচার, ভাগবত বা গীতায় পাইকারী হারে জনসেবার কোনো কথা বলা নেই, ভাগবত বা গীতায় দানের কথাই বলা আছে। যেমন- গীতার ৯/২৭ নং শ্লোকে বলা আছে-

"হে কৌন্তেয়, তুমি যাহা কিছু কর, যাহা কিছু ভোজন কর, যাহা কিছু হোম কর, যাহা কিছু দান কর, যাহা কিছু তপস্যা কর, তত সমস্তই আমাকে অর্পন করিও।"

এখানে দানের বিষয় উল্লেখ আছে, কিন্তু সেবার বিষয় নেই।

এছাড়াও গীতার ১১/৪৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে-

"ন বেদযজ্ঞাধ্যয়নৈর্ণ দানৈর্ন চ ক্রিয়াভির্ণ তপোভিরুগ্রৈঃ
এবং রূপঃ শক্য অহং নৃলোকে দ্রষ্টুং ত্বদন্যেন কুরুপ্রবীর।।"

এর অর্থ - হে কুরুশ্রেষ্ঠ, বেদ অধ্যয়ন, যজ্ঞ, দান, পূণ্যকর্ম ও কঠোর তপস্যার দ্বারা এ জড় জগতে তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমার এই বিশ্বরূপ দর্শন করতে সমর্থ নয়।

এখানেও দানের বিষয় উল্লেখ আছে, কিন্তু সেবার বিষয় নয়।

তাছাড়াও দানের বিষয়ে গীতায় বলা হয়েছে-

"দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেহনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম।।" -(গীতা, ১৭/২০)

এর অর্থ - দান করা কর্তব্য বলে মনে করে, প্রত্যুপকারের আশা না করে, উপযুক্ত স্থানে, উপযুক্ত সময়ে এবং উপযুক্ত পাত্রে যে দান করা হয়, তাকে সাত্ত্বিক দান বলে।

আবার ভাগবতের ১ম স্কন্ধের পঞ্চম অধ্যায়ের এক স্থানে বলা হয়েছে

"পুরুষের তপস্যাই বলো, বেদ অধ্যয়নই বলো, যাগযজ্ঞ বা মন্ত্রপাঠই বলো, আর জ্ঞান বা দানই বলো, শ্রীভগবানের গুনবর্ণনাকেই এই সমস্ত কার্যের নিত্যসিদ্ধ অক্ষয় ফল বলে সুধীগণ সিদ্ধান্ত করেছেন।"

এখানেও দানের কথাই উল্লিখিত হয়েছে, সেবার নয়।

তবে গীতায় সেবার কথা যে বলা নেই, তা কিন্তু নয়, কিন্তু সেটা বৈষ্ণব গুরুদের দ্বারা প্রচারিত পাইকারী হারে জনসেবা নয়, তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য, তত্ত্বজ্ঞান লাভের উপায় হিসেবে গুরুসেবার কথা গীতায় বলা হয়েছে, এভাবে-

"গুরুচরণে দণ্ডবৎ প্রণাম দ্বারা, নানা বিষয় প্রশ্ন দ্বারা এবং গুরুসেবা দ্বারা সেই জ্ঞান লাভ কর। জ্ঞানী তত্ত্বদর্শী গুরুগণ তোমাকে সেই জ্ঞান উপদেশ করিবেন।"- (গীতা, ৪/৩৪)

গীতা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, জ্ঞানলাভের জন্য শুধু তত্ত্বদর্শী গুরুর সেবা করতে হবে। তাই হরিবাসর বা হরিসভা করে পাইকারীভাবে জনসেবা, শুধু অর্থক্ষয় মাত্র; কারণ, এসব ক্ষেত্রে পেটপূজা গ্রহণ করার পর কারো মধ্যে সেই ফিলিংসই জাগ্রত হয় না যে কেউ তাকে সেবা দিলো, তাই সেটা করার কথা গীতায় বলা হয় নি, কিন্তু বৈষ্ণবরা সেবা বলতে মূলত এটাকেই বুঝিয়ে থাকে।

তবে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বাড়িতে লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো বা দরিদ্রদেরকে সেবা দেওয়া মোটেই খারাপ কিছু নয়, এতে বাড়ি বা গৃহস্থের কল্যান হয় । কিন্তু এই সেবা হতে হবে একান্ত ব্যক্তিগত খরচে, হরিববাসর বা হরিসভার মতো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, যেখানে ১০ জনের টাকা ই ১০ জন খায় এবং তারপরও অর্থ উদ্বৃত্ত্ থাকে। যা হোক, তারপরও নিজ গৃহে নিজ খরচে লোকজনকে সেবা দেওয়া মোটেই পরম ধর্ম নয়, এটা একটা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান মাত্র।

পরিশেষে বলা যায়, সেবাই পরমধর্ম, এটা বৈষ্ণব গুরুদের দ্বারা প্রচারিত একটা মহামিথ্যা, যা শিষ্যদের কষ্টার্জিত অর্থকে অপচয় করার বা লুট করে খাওয়ার একটি বৈষ্ণবী মন্ত্র মাত্র।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Tuesday, 21 July 2020

যিনি কৃষ্ণ তিনিই কি চৈতন্য ?


যিনি কৃষ্ণ তিনিই কি চৈতন্য ?

বৈষ্ণব সমাজের একটি বহুল প্রচারিত তত্ত্ব হলো- যিনি কৃষ্ণ তিনিই চৈতন্য। হরিবাসর বা হরিসভায় যেসব লোক লীলাকীর্তন করে, তারা মঞ্চে উঠে এই কথাটি একবার হলেও বলবেই বলবে। এর ফলে সাধারণ হিন্দুরা চৈতন্যকে, শ্রীকৃষ্ণের সমান মনে করে এবং এর ফলে তারা নিজের অজান্তেই এক অমার্জনীয় অপরাধ করে, যেটা তাদেরকে মোক্ষ বা মুক্তি থেকে বহু দূরে সরিয়ে দেয়।

গীতায় বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারবে, সেই ব্যক্তির মুক্তি বা মোক্ষের কোনো সম্ভাবনা নেই (গীতা, ১০/৩)। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি, শ্রীকৃষ্ণকে চৈতন্যর সমান বিবেচনা করে, তখন সে মহাসমুদ্রকে এক পুকুরের সমান বিবেচনা করে, এর ফলে শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করা তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না, সে ভুল পথে তার জীবনকে অতিবাহিত করে।

বস্তুত এই জগতে কেউ শ্রীকৃষ্ণের সমান নয়, কেউ শ্রীকৃষ্ণের তুল্য নয়, এমনকি ব্রহ্মা এবং শিবও শ্রীকৃষ্ণের সমান বা তুল্য নয়, যদিও আমরা সাধারণ বিবেচনায়- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ব'লে, এই তিন দেবসত্ত্বাকে একই মনে করি, কিন্তু তত্ত্বগতভাবে সেটা সত্য নয়। এ প্রসঙ্গে ভাগবতের দুটি গল্পের উল্লেখ করা যায়-

শ্রীবিষ্ণুর, পৃথিবীতে শ্রীকৃষ্ণ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর, শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে যখন তার অদ্ভুত সব লীলা প্রদর্শন করে যাচ্ছিলেন, সেই সময় অঘাসুর বধের পর ব্রহ্মার এক অুনচর, ব্রহ্মাকে জানায় যে বৃন্দাবনে এক অদ্ভুত বালকের জন্ম হয়েছে, আমার মনে হচ্ছে সেই বালক স্বয়ং বিষ্ণু, বিষ্ণুই সেই বালক রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে। ব্রহ্মার সেই কথা বিশ্বাস হয় না, ব্রহ্মা বলে- আমি বিষ্ণুকে ভালোরকম জানি, বিষ্ণু পৃথিবীতে কেনো অবতীর্ণ হতে যাবেন আর তিনি যদি সেটা করেন, সেটা কি আমি জানবো না ? এরপরেও ব্রহ্মার সেই অনুচর তার নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে যে, বৃন্দাবনের সেই বালকই অবশ্যই বিষ্ণুর অবতার। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মা বৃন্দাবনে এসে সেই বালককে স্বচক্ষে দেখার এবং সেই বালক বিষ্ণুর অবতার কিনা তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়, এরপর অনুচরসহ ব্রহ্মা বৃন্দাবনে আসে এবং দেখে গরু চরানোর পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণ, তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে খেলাধুলা করছে। এরপর একটি গরু খোঁজার কারণে, শ্রীকৃষ্ণ দল থেকে আলাদা হয়ে গেলে, ব্রহ্মার বিমোহনে সকল বালক এমনকি গরুর বাছুর এবং তাদের সাথে থাকা একটি বানরও ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে এবং শ্রীকৃষ্ণের অলক্ষ্যে তাদের সবাইকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে ব্রহ্মালোকে লুকিয়ে রাখে।

গরু খোঁজা থেকে ফিরে আসার পর শ্রীকৃষ্ণ দেখে তাদের খেলার স্থলে কেউ নেই, শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারে, ব্রহ্মা তাদের সবাইকে চুরি করে নিয়ে গেছে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায়, ছেলেরা এখনও বাড়ি ফিরছে না দেখে তাদের মায়েরা উদ্বিগ্ন হয় এবং হারিকেন জ্বালিয়ে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করে। এতে শ্রীকৃষ্ণ ভাবে, তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে গ্রামে না ফিরলে তাদের পিতা মাতারা পেরেশনে পড়ে যাবে এবং নানা সমস্যার সৃষ্টি হবে; এই সমস্যার সমাধানে শ্রীকৃষ্ণ, প্রথমে তার সঙ্গে যতজন সঙ্গী ছিলো, নিজেই তাদের রূপ ধারণ করে এবং সকলকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। এর ফলে গ্রামবাসীরক কেউ বুঝতেই পারে না যে আসলে ঘটনা কী ঘটেছে। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ একাই- কয়েকটি বাছুর, একটি বানর এবং তার কয়েকজন বন্ধুর রূপে প্রক্সি দিতে থাকে এবং এর ফলে বৃন্দাবনের সবাই এক অদ্ভুত শান্তি ও সৌন্দর্য অনুভব করতে থাকে এবং এভাবেই কেটে যায় এক বছর।

এক বছর পর ব্রহ্মার হঠাৎ মনে হয়, আরে এক বছর পূর্বে সে তো শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গী সাথীদেরকে চুরি করে নিয়ে এসেছিলো, এই এক বছর শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে বৃন্দাবনে সময় কাটাচ্ছে, সেটা একটু দেখে আসা দরকার; সাথে সাথে সে বৃন্দাবনে এসে উপস্থিত এবং দেখে, শ্রীকৃষ্ণ আগের মতোই তার বন্ধু বান্ধবদেরকে নিয়ে খেলাধুল করছে, এই দৃশ্য দেখে ব্র্হ্মা তো অবাক, নিজেই নিজেকে বলে- এটা কিভাবে সম্ভব ? আমি তো সবাইকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে ব্রহ্মালোকে লুকিয়ে রেখেছি, তাহলে এরা এলো কোথা থেকে। ব্রহ্মার উপস্থিতি বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণ, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের ব্রহ্মাকে আহ্বান করে, ফলে হাজার হাজার ব্রহ্মা ঐখানে উপস্থিত হতে থাকে। এটা দেখে ব্রহ্মা আশ্চর্য হয়ে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে- আমি তো ব্রহ্মা, তাহলে এত সব ব্রহ্মা কোথা থেকে আসছে ?

ইতোমধ্যে বালকরূপী শ্রীকৃষ্ণের সকল সঙ্গী সাথী বিষ্ণুর রূপ ধারণ করে এবং তারা বালকরূপী শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে একে একে লীন হয়ে যায়; তারপর শ্রীকৃষ্ণ, ব্রহ্মাকে বলে- চতুর্মুখী ব্রহ্মা, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে হাজার হাজার ব্রহ্মাণ্ড আছে, তুমি শুধু একটির রচয়িতা, কিন্তু আমি এই হাজার হাজার ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক এবং তার হাজার হাজার ব্রহ্মার স্রষ্টা, আমার আসল রূপ তোমাকে দেখানোর জন্যই আমি এই লীলার আয়োজন করেছি।

এরপর ব্রহ্মা তার নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং শ্রীকৃষ্ণের কাছে তার মূর্খতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। এরপর শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে সকল ব্রহ্মা সেখান থেকে চলে যায় এবং তারপর ব্রহ্মা, ব্রহ্মালোক থেকে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে এসে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেরত দেয় এবং নত মস্তকে শ্রীকৃ্ষ্ণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। এরপর ঘুম থেকে উঠে কেউ বলে খুব ভালো ঘুমিয়েছি, কেউ বলে মনে হচ্ছে একবছর পর ঘুম থেকে উঠছি। যা হোক, সন্ধ্যা হলে যথারীতি কৃষ্ণ সকলকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে, কেউ বুঝতেও পারে না যে বালকরূপী কৃষ্ণ, গত এক বছরে কি কঠিন পরীক্ষা দিয়েছে, ব্রহ্মার কাছে এবং বৃন্দাবনবাসীর কাছে। এই ঘটনাটির বর্ণনা আছে বেণীমাধব শীলের ভাগবতের দশম স্কন্ধে "পিতামহের মোহ" এবং "কমল যোনী কর্তৃক কৃষ্ণের স্তব" পর্বে; সুবোধচন্দ্রের ভাগবতের দশম স্কন্ধের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে "ব্রহ্মার মোহনাশ" এবং চতুর্দশ অধ্যায়ে "ব্রহ্মা কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণের স্তব" অধ্যায়ে; এছাড়াও এই ঘটনাটি পাওয়া যাবে যেকোনো গদ্য ভাগবতের দশম স্কন্ধের ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ে। বিভিন্ন ভাগবতে এই ঘটনাটির বর্ণনা হয়তো বিভিন্নরকম হবে, কিন্তু মূল ঘটনা এক, যা আমি উপরে বর্ণনা করলাম।

ভাগবতের আরেকটি বর্ণনায়, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ, বকাসুর নামে এক অসুরকে বধ করে, সেই বর্ণনায় দেখা যায়, বকাসুর, শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমন করে গিলে ফেললে, দেবতারা সন্ত্রস্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে উদ্ধার করতে আসে এবং ইন্দ্র, ব্রহ্মা, শিব ও অগ্নিদেব বকাসুরকে প্রহার করে বালক কৃষ্ণকে উদ্ধার করতে না পেরে, তারা শুধু কৃষ্ণের জন্য প্রার্থনা করতেই পারে বলে ফিরে যায়, এরপর বকাসুরের ঠোঁটের মধ্যে থাকা কৃষ্ণ, বকাসুরের ঠোঁটকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে এবং বকাসুরকে হত্যা করে।

উপরের এই দুই ঘটনাতে প্রমাণ হয়, শিব বা ব্রহ্মা, কেউ শ্রীকৃষ্ণের সমান নয়।তাহলে ব্রহ্মা বা মহেশ্বর যেখানে শ্রীকৃষ্ণের সমান নয়, সেখানে চৈতন্যদেব কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সমান হয় ?

অনেক বৈষ্ণব, চৈতন্যদেবকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার মনে করে, এই সূত্রেও তারা মনে করে যে যিনি কৃষ্ণ তিনিই চৈতন্য। কিন্তু পৃথিবীতে শ্রীকৃষ্ণের অবতার বলে কিছু নেই। অবতার যা আছে তা বিষ্ণুর, এমনকি শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার এবং রামচন্দ্র, বিষ্ণুর আংশিক অবতার; এই সূত্রে রামও শ্রীকৃষ্ণের সমান নয়, তাহলে যে চৈতন্য বাস্তবে কোনো অবতার নয়, বা ভগবান নয়, সেই চৈতন্য কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সমান হয় ?

শ্রীকৃষ্ণের তুল্য এই জগতে যে কেউ হতে পারে না, তার প্রমাণ আছে গীতায়। শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় তাঁর বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন গীতার একাদশ অধ্যায়ের ৪৩ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলেছেন-

"তোমার মহিমার তুলনা নাই, তুমি বিশ্বপিতা, তুমি জগতের পূজ্য, তুমি সকলের গুরু, তুমি গুরু হইতে গুরুতর। এই ত্রিলোকে তোমার তুল্য কেহ নাই, তোমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ থাকিবে কি প্রকারে ?"

আবার গীতার ১০ম অধ্যায়ের ২ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

"দেবতারা বা মহর্ষিরা কেহই আমার উৎপত্তির বিষয়ে জ্ঞাত নহেন। কারণ, আমি সকল প্রকারে তাহাদের আদিতে বিরাজমান।"

গীতার এই শ্লোকগুলোও প্রমাণ করে যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেহই শ্রীকৃষ্ণের তুল্য বা শ্রীকৃষ্ণের সমান হতে পারে না, সেখানে চৈতন্যদেব কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সমান হবে ?

আমি আমার গবেষনায় দেখেছি- ইসলামের মতো চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব মতবাদও একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব মতবাদ, এর কোনো কিছুই ঠিক নেই এবং বৈষ্ণবরা ধর্মের নামে সমাজে যা প্রচার করে তার প্রায় পুরোটাই ভুল, এই ভুল শিক্ষা নিয়ে হিন্দু ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে উঠল হিন্দুধর্মের ধ্বংস নিশ্চিত। তাই হিন্দু সমাজে বৈষ্ণব মতবাদের প্রচার যত দ্রুত বন্ধ করা যায়, ততই হিন্দু সমাজের মঙ্গল।

চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব মতবাদ, কিভাবে হিন্দু সমাজকে আস্তে আস্তে দুর্বল এবং ধ্বংস করছে, তার প্রমান পাবেন এই পোস্টের সাথে যুক্ত Written photo পোস্টটি পড়লে।

সুতরাং বৈষ্ণব মতবাদের প্রচারকে প্রতিরোধ করে হিন্দু সমাজের মঙ্গল করা আপনার আমার সকলের একান্ত ধর্মীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব।

কী বলছি, আমার পাঠক বন্ধুরা আশা করি তা বুঝেছেন।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 10 July 2020

যেসব কারণে চৈতন্যদেব হিন্দু সমাজের জন্য আদর্শ নয় :


যেসব কারণে চৈতন্যদেব হিন্দু সমাজের জন্য আদর্শ নয় :

শুরু থেকেই শুরু করি-

১. চৈতন্যদেবের বড় ভাই বিশ্বরূপ, সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগ করার পর; চৈতন্যদেব, তার পিতা-মাতাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি তাদের সেবা যত্ন বা দেখা শোনা করবেন, তারা যেন দুশ্চিন্তা না করে। কিন্তু পরে চৈতন্যদেব সংসার ছেড়ে চলে গিয়ে পিতা মাতাকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন।- (শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, আদিলীলা, পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ)

-বর্তমান হিন্দু সমাজের যুবকরা যদি চৈতন্যদেবের এই আদর্শকে অনুসরণ করে, তাহলে তারা শুধু প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারী বলেই পরিচিত হবে না, বৃদ্ধ বয়সে তাদের পিতা মাতার করুন পরিণতির জন্যও দায়ী হবে, যা ক্ষমাহীন পাপ।

২. চৈতন্যদেব, লক্ষ্মীপ্রিয়াকে বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু তিনি নববিবাহিতা স্ত্রীকে সময় না দেওয়ায় লক্ষ্মীপ্রিয়া বিরহ জ্বালায় প্রায় অনশনে থেকে হাড্ডিসার হয়ে জলে ডুবে আত্মহত্যা করে।- (শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, আদিলীলা, ষোড়শ পরিচ্ছেদ; শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, দশম অধ্যায়)

-বর্তমানন যুগে কোনো হিন্দু যুবক যদি চৈতন্যদেবের এই আদর্শকে ফলো করে, তাহলে- পিতৃকূল শ্বশুরকূল, উভয়কূল থেকেই সে শুধু গালি গালাজ নয়, ঝাঁটাপেটা খাবে।

৩. লক্ষ্মীপ্রিয়ার মৃত্যুর পর চৈতন্যদেব পুনরায় বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের কিছুদিন পর বিছানায় স্ত্রীকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে চিরদিনের মতো গৃহত্যাগ করেন। -(এসব তথ্য বহুল প্রচলিত, তাই রেফারেন্স নিষ্প্রয়োজন)

-বর্তমানে কোনো যু্বক যদি এটা করে, তাকে শুধু নপুংসক, হিজড়া বলেই গালি দেওয়া হবে না; সমাজে সে সাংঘাতিকভাবে ধিকৃত হবে এবং তাকে শুধু ঝাঁটাপেটা দিয়ে লোকজন সন্তুষ্ট হবে না, তাকে বেদমভাবে লাঠিপেটা করবে।

৪. চৈতন্যদেব মনে করতেন, বৈরাগী হয়ে নারীর মুখ দর্শন করা পাপ, এই বোধ থেকেই তিনি মূলত সংসার ত্যাগ করেন এবং তারপর কোনোদিন স্ত্রী ও মায়ের মুখ দেখেন নি এবং এই কারণেই তিনি তার 'ছোট হরিদাস' নামের এক শিষ্যকে ত্যাগ করেন, ষাটোর্ধ্ব এক বিধবা নারীর নিকট থেকে চাল চেয়ে এনেছিলেন ব'লে। শেষ পর্যন্ত ছোট হরিদাস জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন, যা শুনে চৈতন্যদেব মন্তব্য করেছিলেন- এটাই নারীমুখ দর্শনের প্রায়শ্চিত্ত।-(শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ); অথচ এই চৈতন্যদেবের প্রধান পার্ষদ নিত্যানন্দ দুইটি বিয়ে করে সংসার করেছিলেন এবং শোনা যায় নিত্যানন্দ এটি করেছিলেন চৈতন্যদেবের অনুমতি বা সম্মতি ক্রমেই। চৈতন্যদেবের এই দ্বিমুখী নীতি কি ভণ্ডামি নয় ?

-বর্তমানে কেউ যদি এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে চলে লোকজন তাকে কতটুকু মূল্য দেবে ?

৫. চৈতন্যদেবের আদর্শ হলো ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করা। -(শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, দ্বিতীয় অধ্যায়, অষ্টম অধ্যায়)

-বর্তমানে এটা করে কারো পক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব কি না বা কয়জন এটাকে জীবিকা হিসেবে নিতে পারবে ?

৬. চৈতন্যভাগবত এবং চৈতন্যচরিতামৃত এটাই সাক্ষ্য দেয় যে- বিয়ে করা, সংসার রচনা করা এবং সন্তানের জন্ম দেওয়া চৈতন্যের আদর্শের বিরোধী।

-তাহলে সব হিন্দু যদি চৈতন্যদের আদর্শকে ফলো করে, হিন্দু সমাজ পৃথিবীতে কয়দিন টিকে থাকবে ?

৭. চৈতন্যদেব তার জীবনে যা করে গেছে, যেগুলো উপরে আলোচনা করলাম, সেগুলো যদি কেউ শুধু করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তার পরিবারে ভূমিকম্প ঘটে যাবে; এটা পারিবারিক দুঃখের কারণ কি না ? এবং কেউ যদি বাস্তবে চৈতন্যদেবের আদর্শকে ফলো করে, তার দ্বারা তার পরিবার ধ্বংস বা বিলুপ্ত হবে কি না ?

৮. চৈতন্যদেব, তার ভক্তদের মাথায় পা রেখে আশীর্বাদ করতেন।-  (শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যলীলা, অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ)

-কোনো বৈরাগী বা বৈষ্ণবের পক্ষে বর্তমান যুগে এটা করা সম্ভব কি না ?

৯. চৈতন্যদেবের মতে, বৈষ্ণবের বৈশিষ্ট্য হলো-

"তৃণ হইতে নীচ হঞা সদা লৈবে নাম।
আপনি নিরভিমানী অন্যে দিবে মান।।
তরুসম সহিষ্ণুতা বৈষ্ণব করিবে।
ভর্ৎসন তাড়নে কারে কিছু না বলিবে।।
কাটিলেহ তরু যেন কিছু না বোলয়।
শুকাইয়া মৈলে তুব জল না মাগয়।।
এইমত বৈষ্ণব কারে কিছু না মাগিব।
অযাচিত বৃত্তি কিংবা শাক ফল খাইব।।"
-(শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ

-এখানে 'অযাচিত বৃত্তি' মানে, না চাওয়ায় কেউ যদি কিছু দেয়, সেটা নেওয়া। খেয়াল করুন, বৈরাগীদের একমাত্র পেশা যেখানে ভিক্ষা করা, না চাইলে যে ভিক্ষা কেউ কখনো দেবে না, সেখানে সেই ভিক্ষাও চাওয়া নিষেধ! কেউ যদি এমনি কিছু দেয়, সেটা নিয়ে খাবে, আর কেউ যদি কিছু না দেয়, তাহলে জঙ্গল থেকে শাক তুলে খাবে বা বন থেকে ফল পেরে খাবে। কিন্তু বর্তমানে মালিক ছাড়া জঙ্গল বা বন কিছুই নেই; তাহলে বৈষ্ণবেরা শাক ফল কোথায় পাবে ?

যা হোক, এই যেখানে একজন বৈষ্ণবের বৈশিষ্ট্য, সেখানে কারো পক্ষে বৈষ্ণব হওয়া সম্ভব কি না বা সমাজে কোনো বৈষ্ণব তথা বৈরাগী আছে কি না ?

১০. চৈতন্যদেব ছিলেন একজন মৃগী রোগী, এই রোগ জাগলে মাঝে মাঝেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যেতেন।-(শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যলীলা, অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ); কিন্তু তার বর্তমান ভক্ত শিষ্যরা, সেটাকে শ্রীকৃষ্ণে ভাব সমাধি বলে প্রচার করে চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু বানিয়েছে।

-এটা সনাতন হিন্দু সমাজের সাথে প্রতারণা কি না ?

যারা আমার এই প্রবন্ধের সমালোচনা করবে, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি-

চৈতন্যদেবের পাণ্ডিত্য নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, চৈতন্যদেব অসাধারণ মেধাবী ছিলেন বলে আমার অনেক পোস্টে আমি নিজেই তার প্রশংসা করেছি, এখানেও করছি। আমার প্রশ্ন চৈতন্যদেবের কর্ম ও আদর্শ নিয়ে। মহাপ্রভু মহাপ্রভু বলে তো লাফান, নিজের বুকে হাত রেখে একবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন তো, চৈতন্যদেবের কোনো আদর্শ, কারো পক্ষে ফলো করা সম্ভব কি না, এমনকি আপনি নিজেও তার কোনো আদর্শ ফলো করতে পারেন বা পারবেন কি না ?

এই চৈতন্যদেবকে কেউ কেউ কলিযুগের অবতার বা ভগবান হিসেবে প্রচার করছে এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে বাদ দিয়ে এবং শ্রীকৃষ্ণের শরণ নেওয়ার পরিবর্তে চৈতন্যের শরণ নেওয়ার কথা প্রচার করছে! এবং এভাবে হিন্দুসমাজকে শুধু মহাপাপের মধ্যে ফেলছে না, হিন্দুদের আত্মার অবনতিও ঘটাচ্ছে। চৈতন্যদেবকে নিয়ে আমার আপত্তিটা আসলে এখানেই। চৈতন্যদেব একজন কঠিন কৃষ্ণভক্ত এবং তিনি তার ভক্তশিষ্যদেরকে সব সময় কৃষ্ণ নামে রত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে সেভাবেই তুলে ধরা হোক এবং সেভাবেই তাকে তার সম্মান দেওয়া হোক, যাতে কারো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু সেটা না করে, বর্তমানে বৈষ্ণব সাধু গুরুরা কৃষ্ণ নাম বাদ দিয়ে শুধু চৈতন্যদেবের ভজনা করতেই বেশি ব্যস্ত এবং বৈষ্ণব সাধু-গুরুরা কারণে অকারণে মহাপ্রভুর ভোগের নামে হিন্দু সমাজে যে চৈতন্য বন্দনা চালু করেছে, শাস্ত্রগত দিক থেকে তা শুধু গুরুত্বহীনই নয়, একেবারে অর্থহীন। শুধু তাই নয়, বৈষ্ণব সাধু-গুরুরা, বৈষ্ণব ধর্মের নামে হিন্দু সমাজে কিছু বিষয় চালু করেছে, যা সনাতন ধারার একেবারে বিপরীত; যেমন- মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শবদাহের পরিবর্তে সমাধি দেওয়া, শ্রাদ্ধের পরিবর্তে চৈতন্যের নামে ভোগ দিয়ে লোক খাওয়ানো এবং দেব-দেবীর পূজা বাদ দিয়ে শুধু চৈতন্যের আরাধনা করা, যা সম্পূর্ণ শাস্ত্র বহির্ভূত।

পিতার মৃত্যুর পর চৈতন্যদেব নিজে বৈদিক নিয়মে তার শ্রাদ্ধ করেছে এবং গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করেছে (শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়); অথচ বৈষ্ণব সাধু গুরুরা বৈষ্ণব সমাজ থেকে শ্রাদ্ধ এবং পিণ্ডদানই তুলে দিয়েছে। তাহলে কি বৈষ্ণব সাধু-গুরুরা চৈতন্যদেবের আদর্শকে ফলো করেছে ? প্রকৃত বৈষ্ণবের যে বৈশিষ্ট্য, এরা কি সেটাও অন্তরে লালন বা ধারণ করে ? এরা যেমন চৈতন্যদেবের আদর্শকে ফলো করে না, তেমনি সনাতনী ধারা, যেটা শাস্ত্রসম্মত, সেটাও মানে না; ফলে বৈষ্ণব সমাজে ধর্মের নামে যা চলছে, সেটা শুধু জগাখিচুড়ি, এই জগাখিচুড়িতে শরীরের পুষ্টি হয় না, হয় শুধু পেট খারাপ এবং শরীরের অবনতি, যেটা চৈতন্যদেবের প্রভাবে বর্তমান হিন্দু সমাজের বাস্তব রূপ।

তাই আমার লড়াই শুধু বৈষ্ণব সমাজের এই সব অশাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে নয়, সনাতন সমাজে প্রচলিত সকল অনাচারের বিরুদ্ধে এবং এটা করার জন্যই আমি শুধু সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরছি, এই তুলে ধরতে গিয়ে কারো অপছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি, হয়েছি কারো শত্রু, কিন্তু তাতেও আমার কোনো সমস্যা নেই বা তাতেও আমি বিচলিত নই; কারণ, অনেকের শত্রু বা অপছন্দের লোক হয়েও আমি চাই সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যটাকে তাদের কাছে পৌঁছাতে, যাতে তারা তাদের আত্মার অবনতির পথে একটু হলেও বাধা পায়। কারণ, গীতায় স্পষ্ট করে বহু জায়গায় বহুভাবে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের শরণ ছাড়া কারো কোনো মুক্তি নেই এবং যার বা যাদের মধ্যে গীতার জ্ঞান রয়েছে, তার বা তাদের উচিত অন্যদেরকে গীতার সেই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা; আমি যা করছি, তা গীতা তথা শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ মতোই করছি, যেমন করেছিলেন মহভারতের অর্জুন। তাই কে আমাকে পছন্দ করে, বা কে আমাকে অপছন্দ করে, সেটা আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যকে সবার কাছে তুলে ধরে বা পৌঁছিয়ে দিয়ে সাধারণ হিন্দুদেরকে সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যকে জানার সুযোগ করে দেওয়া। আমাদের শাস্ত্রে আছে, "সত্যমেব জয়তে", অর্থাৎ সত্যের জয় একদিন হবেই, তাই আমার ভবিষ্যৎ বা পরিণাম নিয়ে আমার কোনো শঙ্কা বা আশঙ্কা কোনোটাই নেই; কারণ, আমি জানি, আজ যারা আমার বিবোধিতা করছে, একদিন তাদের ছেলে মেয়েরা বা নাতী নাতনীরা আমার কথাকে গ্রহন করবেই করবে। কেননা, সত্যকে অবহেলা বা অবজ্ঞা, সবাই, সব সময় করতে পারে না।

আমার এই লড়াইয়ে প্রথম থেকেই কিছু সহযোদ্ধা পেয়েছি, যারা শুরু থেকেই আমার লেখাকে নিরন্তরভাবে নিজের পয়সা খরচ করে প্রচার করছে, এছাড়াও পেয়েছি দেশ বিদেশের বহু অজানা লোকের ভালোবাসা, উৎসাহ, শ্রদ্ধা, ভক্তি; যা আমার এই মুহুর্তের প্রাপ্তি এবং আগামী দিনের চলার পথের পাথেয় এবং এদের সংখ্যা, আমাকে যারা অপছন্দ করে, তাদের থেকে অন্তত কয়েকশগুন বেশি। আমার সমালোচনাকারীরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন, যদি আমি মিথ্যা, ভুল বা যুক্তিহীন কথা লেখি, তাহলে এতগুলো লোক কিন্তু এত বছর ধরে আমার সাথে থাকতো না এবং আমার লেখাগুলো পড়তো না বা প্রচার করতো না।

শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্ত সমগ্র বাংলার বহু হিন্দুর হিন্দুত্ববোধ জাগিয়ে তাদেরকে আমি প্রকৃত হিন্দু তৈরি করেছি, যারা হিন্দুধর্ম ও হিন্দু সমাজের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে এবং সমগ্র বাংলার এমন কোনো হিন্দুত্ববাদী লোক নেই, যারা কোনো না কোনোভাবে আমার লেখার সংস্পর্শে আসে নি। হিন্দুধর্ম ও সমাজের জন্য আমার এই কাজের তুলনায় প্রতিষ্ঠিত কোনো আশ্রম বা হিন্দুধর্মীয় সংগঠনের কোন কাজকে তো আমি মূল্যই দিই না; কারণ, আমার দৃষ্টিতে ঐসব সংগঠনের হিন্দুধর্ম ও সমাজের জন্য কোনো পজিটিভ ভূমিকাই নেই, বরং সর্বধর্মসম্বয়কারী কারো কারো আছে নেগেটিভ ভূমিকা, তারা হিন্দুদের খায় প'রে, আর হিন্দু ছেলে মেয়েদেরকে অন্যধর্মে দীক্ষিত হতে উৎসাহিত করে হিন্দুদের সর্বনাশ করে।

তাই আমার সমালোচকদেরকে বলবো, আমার সমালোচনা করার আগে এই বিষয়গুলো ভেবে, তারপর সমালোচনা করবেন।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 7 May 2020

চৈতন্যদেব কি সন্ন্যাসী ?


চৈতন্যদেব কি সন্ন্যাসী ?

হাজার বছরের ভুল ব্যাখ্য এবং মিথ্যা প্রচারের ফলে সাধারণ হিন্দুরা এটাই মনে করে যে- যে ব্যক্তি গৃহ বা সংসার ত্যাগ করেছে বা যিনি বিয়ে ক'রে সংসার না ক'রে সাধুর বেশে ঘুরে বেড়ান- তিনিই সন্ন্যাসী; কিন্তু শ্রীমদ্ভগ্বদগীতায় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ একথা বলেন না। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন- কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া যিনি কর্তব্য কর্মগুলি করিয়া যান, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী। যিনি যজ্ঞাদি শ্রৌতকর্ম অথবা শারীরকর্ম ত্যগ করিয়াছেন, তিনি নহেন।

দেখে নিন গীতার এই শ্লোকটি-

"অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ।
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্নচাক্রিয়ঃ।।"- (গীতা, ৬/১)

এই সূত্রে যেসব ছেলে যুবক বয়েস বিয়ে শাদী না ক'রে, সংসার রচনা না ক'রে, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন না ক'রে, কোনো মঠ বা আশ্রমে চলে যান বা গেরুয়া পোষাক প'রে সাধুর বেশে ঘুরে বেড়ান, তিনি কি সন্ন্যাসী ? মোটেই নন। এই সূত্রে সন্ন্যাসী নন চৈতন্যদেবও।

সনাতন ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা। সনাতন ধর্মে পরিষ্কার করে বলা আছে কোন বয়সে মানুষকে কী করতে হবে। সনাতন ধর্মে মানুষের সমগ্র জীবনকে- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস- এই চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্মচর্য আশ্রমের সময় কাল ২৫ বছর পর্যন্ত, এই সময়ে একজন মানুষকে শরীর গঠন এবং শিক্ষা অর্জন করতে হবে। ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাকে বিয়ে করে সংসারে প্রবেশ করে ছেলে মেয়ের জন্ম দিতে হবে এবং স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং ছেলে-মেয়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করে তাদেরকে মানুষ করতে হবে, ছেলে মেয়েদেরকে বিয়ে দিতে হবে; একে বলে গার্হস্থ্য আশ্রম। ৫০ বছর বয়সের পর, সেই ব্যক্তিকে সংসারের দায়িত্ব ছেলের হাতে অর্পণ করে কোনো ধর্মীয় সংগঠন বা আশ্রমের অধীনে গিয়ে তার নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী সমাজের জন্য কাজ করতে হবে, একে বলে বাণপ্রস্থ আশ্রম; এই আশ্রমের সময়কাল ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত। বাণপ্রস্থ আশ্রমের কাল শেষ হলে সেই ব্যক্তি সন্ন্যাস নিতে পারবে, সন্ন্যাস মানে পূর্ণ অবসর, এই সময়ে সংসার বা সমাজ কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো দায়িত্ব থাকবে না, এই সময়ে ব্যক্তি শুধু ভগবানের নাম জপ বা ধ্যান করে মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে দিন অতিবাহিত করবে।

সনাতন ধর্মের এই আশ্রম প্রথার মাধ্যমে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে যে কোনো বয়সে ব্যক্তির কী কর্তব্য। কোনো ব্যক্তি যেমন শরীর গঠন ও শিক্ষাগ্রহন না করে সংসারে প্রবেশ করতে পারে না, তেমনি সে সংসারের অভিজ্ঞতা না নিয়ে বাণপ্রস্থে যেতে পারে না, আবার বাণপ্রস্থে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন না করে কেউ সন্ন্যাসেও যেতে পারে না। কাউকে সন্ন্যাস নিতে হলে আগের তিনটি স্তর- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য ও বাণপ্রস্থ অতিক্রম করে আসতে হবে এবং এইভাবে কেউ যদি সন্ন্যাস স্তরে পৌঁছে সে অবশ্যই মোক্ষ লাভ বা মোক্ষের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু কেউ যদি গার্হস্থ্য আশ্রমে সংসারে প্রতি দায়িত্ব পালন না করে, সে কিছুতেই সন্ন্যাস নিতে পারে না, তার সকল ধর্ম আচরণই বৃথা।

মহাভারতে বলা হয়েছে- যে পুরুষ, সন্তানের জন্ম না দিয়ে মারা যাবে সে কখনো স্বর্গে যেতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে স্বর্গলাভ এবং মোক্ষপ্রাপ্তি সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক বলে মনে করছি-

স্বর্গ-নরক হলো মানুষের জন্ম মৃত্যু চক্রের সিস্টেমের একটি অংশ। মানুষ মারা গেলে তার কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গ বা নরকের ফল ভোগ করে এবং তারপর পুনরায় পৃথিবীতে জন্ম নেয়। কিন্তু কোনো মানুষ যদি মোক্ষ লাভ করে, তাকে আর পৃথিবীতে জন্ম নিতে হয় না। সনাতন ধর্মে বলা হচ্ছে- সন্তানের জন্ম না দিয়ে মারা গেলে কেউ স্বর্গই পায় না, তাকে নরক ভোগ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়; এই যখন প্রকৃত সত্য, তখন যুবক অবস্থায় কোনো পুরুষ যদি বিয়ে-শাদী না ক'রে সংসার ত্যাগ ক'রে সন্ন্যাসীর ভান ধরে ঘুরে বেড়ায়, তার কি মোক্ষ লাভের কোনো সম্ভাবনা আছে ? মোটেই নেই, সে তো স্বর্গে যাওয়ার অধিকারীই নয়, তার মোক্ষপ্রাপ্তি তো বহুত দূরের ব্যাপার। বিষয়টি এমন- পরীক্ষায় যে পাশই করতে পারবে না, সে চিন্তা করছে গোল্ডেন জিপিএর !
সনাতন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা একজন মানুষকে বাঁচায়, তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে এবং তার মাধ্যমে সমাজ সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। কিন্তু বর্তমানে চৈতন্যদেবের অনুসারীদের মাধ্যমে সমাজে সন্ন্যাসের নামে যা চলছে, তাতে সমাজ সংসারের বিকাশ তো দূরের কথা, হিন্দু সমাজ ধ্বংস বা বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার দরকার নেই, খুব সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়, যুবক বয়সে কেউ যদি সংসার ত্যাগ করে, তার দ্বারা সমাজের বিন্দুমাত্র উপকার হয় না। কারণ, তার সংসারে ত্যাগের ফলে একটি সনাতনী মেয়ে স্বামী পায় না, সে বিধর্মীদের হাতে চলে যেতে পারে বা যায়, সেই ছেলেকে নিয়ে তার পিতা মাতার যে স্বপ্ন তা ভঙ্গ হয়, তাদের বৃদ্ধ বয়সের সুরক্ষা অনিশ্চিত হয়, এছাড়াও সেই পরিবারে কোনো ছেলে মেয়ের জন্ম না হওয়ায় সেই পরিবারটি এক সময় বিলুপ্ত হয়, এভাবে সমাজের জনসংখ্যা কমতে থাকে।
সমাজ টিকে থাকে জনসংখ্যায়, জনসংখ্যা যদি কমে যায়, তাহলে সেই সমাজের সকল মাহাত্ম্য ব্যর্থ। কারণ, সমাজে লোক যদি না থাকে, আপনি কার কাছে ধর্মপ্রচার করবেন বা কার কাছে হরিনাম বিলি করবেন ? চৈতন্যদেব হরিনাম বিলিয়েছেন, কিন্তু তিনি কি কোনো সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ? সংসারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন ? বৃদ্ধা মাতার অবলম্বন ছিলেন ? তিনি কি সন্ন্যাস নেওয়ার বয়সে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন ?

এই সকল প্রশ্নের উত্তর হলো- না।

তাহলে চৈতন্যদেব কিভাবে সমাজের কল্যানে কোনো কাজ করে গিয়েছেন ?

চৈতন্যদেবের দ্বারা সমাজের কোনো কল্যান হয় নি, বরং ক্ষতি হয়েছে প্রভূত এবং এখনও হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি যদি চৈতন্যদেবের জীবনাদর্শকে অনুসরণ করে তার পরিবার বিলুপ্ত হতে বাধ্য, যেমন বিলুপ্ত হয়েছে চৈতন্যের নিজের পরিবার। এভাবে প্রত্যেকে যদি চৈতন্যের আদর্শকে অনুসরণ করে, শুধু সমাজ নয়, সন্তান জন্মের অভাবে মাবনসভ্যতা ই এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে, যা ঈশ্বরের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে।

আচ্ছা, চৈতন্যদেব যে বিয়ে করার পরেও স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালন না ক'রে, বৃদ্ধা মায়ের ভরণ পোষণ নিরাপত্তার কথা চিন্তা না ক'রে, সংসার থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেলেন, এটা করতে তাকে কে বলেছিলো বা এই নির্দেশ সে কোথা থেকে পেয়েছিলো ? শ্রীকৃষ্ণ হলেন মানব জীবনের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণ কি এমন কিছু করেছিলেন বা এমন কিছু করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন ? শ্রীকৃষ্ণ পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন, বিয়ে করেছেন, সংসার করেছেন, সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন, রাজ্য পরিচালনা করেছেন, অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থাৎ একজন মানুষকে তার সারাজীবনে যা করতে হয় তার সবই করেছেন। তাহলে যে চৈতন্যদেব, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে পাগল হয়েছিলেন, সেই চৈতন্য, শ্রীকৃষ্ণের কোন আদর্শটিকে অনুসরণ করেছেন ? বস্তুত চৈতন্যদেব, শ্রীকৃষ্ণের কোনো আদর্শকেই অনুসরণ করেন নি, এমনকি মানব জীবনের যে সাধারণ ধর্ম, সেটাও তিনি পালন করেন নি, তাহলে এই চৈতন্যদেব কিভাবে কোনো মানুষের আদর্শ হতে পারে ?

আমার দৃঢ় বিশ্বাস- সংসারের প্রতি দায়িত্ব পালন না করায় এবং সমাজকে ভুল পথে চালিত করায়, চৈতন্যদেব মোক্ষলাভ তো দূরের কথা, তিনি স্বর্গই পান নি; কারণ, শাস্ত্র অনুযায়ী তিনি সন্ন্যাসীই নন। সুতরাং এই চৈতন্যদেবের অনুসরণে যেসব যুবক ছেলে সংসার ত্যাগ করে চলে যায়, বিয়ে করে কোনো নারীর দায়িত্ব নেয় না, সমাজের ভবিষ্যৎ অবলম্বন সন্তানের জন্ম দেয় না, বৃদ্ধ পিতা মাতার দায়িত্ব পালন করে না, তারা গেরুয়া পোষাক প'রে কপাল থেকে নাক পর্যন্ত লম্বা তিলকসহ দ্বাদশ অঙ্গে তিলক এবং মাথা ন্যাড়া করে মাথায় বড় একটি টিকি রাখলেই তারা সন্ন্যাসী নয়, তাদের পায়ে প্রণাম করলে যেমন আপনার পাপ হবে, তেমনি তাদের উদরপূর্তির জন্য দক্ষিনা দিলেও আপনার অধর্ম হবে; কারণ, সেই ব্যক্তিই শ্রদ্ধা ভক্তি পাওয়ার যোগ্য, সমাজ সংসারে যার অবদান আছে; আর সেই ব্যক্তিই পূজ্য, যার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ আছে।

আমরা পাঠক বন্ধুদের মধ্যে যারা, মাঝে মাঝে বা বছরে দু এক বার ধর্মসভা বা আলোচনার সভার আয়োজন করেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা ভুলেও কখনো এমন কোনো ব্যক্তিকে ধর্ম আলোচনার জন্য ডাকবেন না বা আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাবেন না- যিনি যুবক বয়সে সংসার ত্যাগ করেছেন বা বিয়ে শাদী করেন নি বা সংসারের অভিজ্ঞতা যার নেই। কারণ, এই ধরণের ব্যক্তি নিজেই শাস্ত্র অনুযায়ী স্পষ্টতই ভুল পথে আছে, সে আপনাকে সঠিক পথ দেখাবে কিভাবে ? সে কিভাবে বুঝবে আপনার সংসার প্রতিপালনের সমস্যার কথা ? এই ধরণের সংসার বিরাগী বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে সংসার থেকে পলায়ন করা অকর্মা ব্যক্তির কথা শুনলে এবং তার কথা বিশ্বাস করলে আপনি নিজেও একসময় ভুল পথে পরিচালিত হবেন, আপনার মানব জীবন ব্যর্থ হবে।

মনে রাখবেন, আপনি যদি ধর্ম সম্পর্কে কিছুই না জানেন, আপনি যদি শুধু বিয়ে করেন, সন্তানের জন্ম দেন, তাদেরকে মানুষ করার চেষ্টা করেন, পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, আপনি আমার কাছে চৈতন্যদেবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, বয়সে বড় হলে আপনার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে আমার কোনো আপত্তি নেই, আর বয়সে ছোট হলে আপনার জন্য আমার আশীর্বাদ বা শুভ কামনা চিরকালীন; কারণ, আপনি শ্রীকৃষ্ণের পথে আছেন, চৈতন্যদেব বা তার অনুসারীদের মতো ভুল পথে নেই।

পরিবার, সংসার এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করায় উপর্যুক্ত কারণেই আমার নিরক্ষর পিতাকে আমি চৈতন্যদেবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি। কারণ, তিনি আমার মতো একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং যার কারণে আমি হিন্দু সমাজ, ধর্ম ও হিন্দু জাতির কল্যানের জন্য কিছু ভাবতে পারছি বা করতে পারছি। যারা আমার কর্ম ও চিন্তা সম্পর্কে অবগত বা আমার কর্ম ও চিন্তার সাথে যুক্ত, তারা জানেন হিন্দুধর্ম ও সমাজের কল্যানের জন্য আমি কিভাবে কাজ করছি, আর এটা সম্ভব হচ্ছে আমার পিতা মাতার দ্বারা আমার জন্মের কারণেই। সুতরাং আমার কর্মের সমস্ত পুণ্যফলে আমার পিতা মাতার যেমন স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটবে, তেমনি আমিও যদি তেমন কোনো সন্তানের জন্ম দিতে পারি, তার কর্মের পুণ্যফলে আমারও স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটতে পারে বা মোক্ষলাভ হতে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটবে না, যদি আমি বিয়ে না করে সংসার না করতাম বা সন্তানের জন্ম না দিই।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে চৈতন্যদেবের মত বা পথ একটি বোগাস মত বা পথ। কারণ, এর দ্বারা আপনার ইহকাল বা পরকাল, কোনো কালেরই কোনো প্রকার কল্যাণ হওয়ার কোনোকরম সম্ভাবনা নেই।

উপরে গীতার রেফারেন্সে বলেছি- "কর্মফলে আকাঙ্ক্ষা না করিয়া যিনি কর্তব্য কর্মগুলি করিয়া যান, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী।"

এখানে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মের কথা বলেছেন। নিষ্কাম কর্ম সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট এবং সঠিক ধারণা নেই। নিষ্কাম কর্ম মানে কর্মের ফল আশা না করা নয়, ঈশ্বর আমাকে দিয়ে কর্ম করাচ্ছেন এমন মনোভাব নিয়ে কোনো কর্ম করা। সকাম ও নিষ্কাম কর্ম সম্পর্কে আমার একটি প্রবন্ধ আছে, সেখানে এই বিষয়ের ডিটেইলস আলোচনা আছে।

যা হোক, উপরের এই আলোচনা থেকে আশা করছি, আমি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে এটা বোঝাতে পেরেছি যে- চৈতন্যদেব নামে সন্ন্যাসী হলেও বাস্তবে শাস্ত্রমতে তিনি কোনো সন্ন্যাসী নন; কারণ, তিনি গার্হস্থ্যধর্ম ঠিক মতো পালন করেন নি, মানব জাতির আদর্শ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে অনুসরণ করেন নি, এই ভুল পথে চলার জন্যই তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পুরীর মন্দিরের পাণ্ডাদের হাতে নিহত হয়েছেন।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।
------------------

বি.দ্র # বাংলাদেশে যারা বিভিন্ন ধর্মসভার জন্য আলোচক বা বক্তার খোঁজ করছেন, তারা আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি এমন ব্যক্তির সন্ধান আপনাদেরকে দেবো, যিনি আপনাদেরকে মিথ্যা শেখাবেন না, ভুল পথে পরিচালিত করবেন না, সনাতন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা এবং মানব মুক্তির সঠিক পথ দেখাবেন। এ প্রসঙ্গে আরো জানিয়ে রাখি, আমি একটা ধর্মীয় সংগঠনের পরিকল্পনা করেছি, যেখানে সনাতন ধর্মের চার আশ্রম ব্যবস্থার বিধি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ আমার সংগঠনে সংসার ত্যাগী কোনো যুবক ছেলেকে পার্মানেন্টলি নেয়া হবে না, আমার সংগঠনে তারাই পার্মানেন্টলি স্থান পাবে, যারা গার্হস্থ্য ধর্ম পালন করেছে এবং যাদের বয়স ৫০ এর উপরে। তারা আমার সংগঠনে এসে বাণপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস ধর্ম পালন করতে পারবে। আর আমার সংগঠনে যোগ দেওয়ার জন্য কাউকে কখনো পার্মানেন্টলি সংসার ত্যাগ করতে হবে না। কারণ, সংসার ত্যাগের বিধান সনাতন ধর্মে কোথাও নেই। সংসারে থেকেই সকল শ্রেণীর হিন্দু আশ্রমের সাথে যুক্ত থেকে ধর্ম শিক্ষা করতে পারবে এবং বয়স ৫০ বছর পার হলেও কেবল সংসারে দায়িত্ব ছেলের হাতে অর্পণ করে আশ্রমে পূর্ণ সময় কাটাতে পারবে এবং আশ্রমের বিধি মোতাবেক সমাজের কাজে নিজেকে নিয়োগ করতে পারবে। এভাবে কাজ করার পর কেউ যদি ৭৫ বছর বয়সের পর জীবিত থাকে, সে সন্ন্যাস নিতে পারবে এবং সমাজ সংসারের দায়িত্ব থেকে পূর্ণ অবসর নিয়ে শুধু ভগবানের নাম জপ ও ধ্যান করে দিন অতিবাহিত করতে পারবে।