Showing posts with label ঐতিহাসিক সত্যতা. Show all posts
Showing posts with label ঐতিহাসিক সত্যতা. Show all posts

Tuesday, 18 August 2020

মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরির প্রত্যক্ষ প্রমাণ :


মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরির প্রত্যক্ষ প্রমাণ :

মুসলমান নামের মিথ্যুক, যাদের নবীর জন্মের ঠিক নেই বলে যাদের নিজেদের জন্মেরও ঠিক নেই, এই হারামজাদারা বলে বেড়ায়, মুসলিম শাসকরা ভারতের কোনো মন্দির ভেঙ্গে তাকে মসজিদ বা মাদ্রাসায় রূপান্তরিত করে নি, তাহলে এই ছবিটি কিসের সাক্ষ্য দিচ্ছে ? কোনো একটি মন্দিরের উপর গম্বুজ বানিয়ে কি তাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয় নি ? শিল্পকর্ম কী, সেটা কি তোরা বুঝিস বা করতে জানিস ? খেয়াল করে দ্যাখ, গম্বুজে কোনো কারুকার্য নেই, যেটা মুসলমানদের মোটা মাথার তৈরি। আর গম্বুজের নিচের অংশ দ্যাখ, কত কারুকার্যে পূর্ণ, এই সব শিল্পকর্ম কি কোনো মসজিদে আছে, না মসজিদের সাথে মানানসই ? আর মসজিদ কি কখনো এতটুকু আয়তনের হয় ? মসজিদের জন্মই তো সন্ত্রাসের জন্য মিটিং করতে, যেখানে প্রচুর লোকের জন্য জায়গা হওয়া মাস্ট, তো এই মসজিদের মধ্যে কয়জন লোক ধরবে বা কয়জন লোক নামাজ পড়তে পারবে ? তাহলে এটা কেমনে মসজিদ হয় ?

এছাড়াও হিন্দুদের মন্দিরে প্রবেশের গেট হয়- পশ্চিম দিকে, না হয় দক্ষিণ দিকে। এটা যদি শুরু থেকেই মসজিদ হয়, তাহলে মসজিদে পশ্চিম দিক নির্দেশ মিম্বর থাকে, ঠিক পশ্চিম দিকের দেওয়ালের সাথে অর্ধবৃত্তারকার ভাবে, এই মসজিদে পশ্চিম দিক নির্দেশক সেই মিম্বর কোথায় ? কোনো কিছু দখল করে তার উপর গম্বুজ বসিয়ে দিলেই সেটা মসজিদ হয়ে যায়, তাই না ?

শুধু এটাই নয়, ভারতে এরকম হাজার হাজার মসজিদ আছে, যেগুলো মন্দির ভেঙ্গে বা মন্দিরের উপর করা হয়েছে। এই সবগুলোকে এক সময় ভেঙ্গে ফেলে সেখানে আবার মন্দির নির্মান করা হবে, যেটা রাম মন্দিরের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তোরা তো কোনো বাল উপড়াতে পারবি না, তোদের আল্লাকে বল যদি সে তার ঘর মসজিদগুলোকে বাঁচাতে পারে।

আবাবিল পাখির মাধ্যমে আল্লা কাবাকে রক্ষা করেছিলো বলে তোরা একটা আত্মতৃপ্তিতে ভুগিস এবং বিশ্বাস করিস যে ভবিষ্যতেও মসজিদের জন্য কোনো সংকট এলে আল্লা আবার আবাবিল পাখি পাঠিয়ে সেগুলো রক্ষা করবে। কিন্তু তোরা এটা বুঝিস না যে, আল্লা যে কাবাকে রক্ষা করেছিলো, সেটাই বর্তমানের মতো ফাঁকা কাবা নয়, সেটা ৩৬০টি দেব-দেবীর মূর্তি সমন্বিত কাবা মন্দির। তাই আল্লা কোনো মসজিদকে নয়, রক্ষা করার হলে মন্দিরকেই করবে, যেকারণে রক্ষা করে নি বাবরি মসজিদকে।

ছবি দেখে আমার মনে হচ্ছে এটা পরিত্যক্ত, তার মানে ঐ এলাকায় কোনো মুসলমান নেই, তাই এটাকে রাতের অন্ধাকারে বোমা মেরে ধ্বংস করে ফেলা যেতে পারে, তারপর সেখানে নতুন করে মন্দির নির্মান করা যেতে পারে। অথবা গম্বুজের অংশটিতে কারুকার্য করে একে পুনরায় মন্দিরের রূপ দেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট এলাকার হিন্দুরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে আশা করছি।

জয় হিন্দ।

Monday, 3 August 2020

অযোধ্যার রাম মন্দিরের রক্তাক্ত ইতিহাস:



অযোধ্যার রাম মন্দিরের রক্তাক্ত ইতিহাস:

রাম মন্দির নির্মিত হয় একাদশ শতাব্দীতে অর্থাৎ ১ হাজার থেকে ১১শ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এটা আমার মত নয়, প্রত্নতত্ত্ববিদদের মত।

১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে ইবরাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর, দিল্লি দখল করে। এরপর মুসলমান শাসকদের যে চিরাচরিত প্রথা, ক্ষমতা দখল করেই ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানো এবং অমুসলিমদের উপাসনা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে মসজিদ বানানো বা তাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা, বাবর সেদিকে নজর দেয়। এজন্য বাবরের নির্দেশে তার সেনাপতি মীর বাকি খাঁ, ১৫২৭/২৮ সালে অযোধ্যা আক্রমন ক'রে প্রথমে কিছু হিন্দুকে হত্যা করে এবং বাকিদের বন্দী করে। এরপর ভারতের প্রধান রাম মন্দির, যা রামের জন্মভূমি অযোধ্যাতেই অবস্থিত, সেটার উপরের অংশ ভেঙ্গে ফেলে এবং মন্দিরের মূল ভিত্তির উপরেই মসজিদ তৈরি করে, যেটা বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত। এই মসজিদ তৈরি করার সময়, যেসব হিন্দুদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো, তাদের গলা কেটে প্রথমে একটি পাত্রে সেই রক্ত সংগ্রহ করা হয় এবং তারপর জলের পরিরর্তে চুন-সুড়কির সাথে সেই রক্ত মিশিয়ে মন্দিরের মূল ভিতের উপরই ইটের পর ইট গেঁথে মসজিদ নির্মান করা হয়। তাই ইসলামি প্রথাসম্মত মসজিদ এটা নয়, ইসলামের বিজয় অভিযানে হিন্দুদের মনোবল ভাঙতে যত্রতত্র অসংখ্য মন্দির ভেঙ্গে যেমন বিজয় স্মারক নির্মিত হয়েছিলো, বাবরি মসজিদও তেমনি বাবরের একটা বিজয় স্মারক। একইভাবে বাবর সম্ভলচান্দেরীর মন্দির ভেঙ্গে তাকে মসজিদে রূপান্তরিত করে এবং গোয়ালিয়রের নিকটবর্তী জৈন মন্দির ও বিগ্রহ ধ্বংস করে।

বাবর যে রাম মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানিয়েছে, এর ঐতিহাসিক প্রমান হলো, বাবরের আমলেই হিন্দুরা ২১ বার লড়াই করেছিলো মন্দির উদ্ধারের জন্য। বাবর যদি মন্দির না ভেঙ্গে পৃথক একটি জায়গায় মসজিদ নির্মান করতো, তাহলে কি হিন্দুরা সম্রাট নির্মিত মসজিদকে ভেঙ্গে দিয়ে সেখানে মন্দির স্থাপন করার জন্য ২১ বার লড়াই করার মতো দুঃসাহস দেখাতো ? আর এরকম দুঃসাহস দেখালে বাবর কি হিন্দুদের অস্তিত্ব তার সাম্রাজ্যে রাখতো ? এরপর হুমায়ূনের রাজত্বকালে ১০ বার এবং আকবরের রাজত্বকালে ২০ বার হিন্দুরা রামজন্মভূমিতে মন্দির উদ্ধারের জন্য লড়াই করে। শেষে আকবর একটি আপোষ নিষ্পত্তি করে মসজিদের পাশেই রাম মন্দির নির্মানের অনুমতি দেয় এবং ছোট একটি মন্দির নির্মিত হয়। এসব উল্লেখ আছে, আকবরের শাসন কালের ইতিহাস "দেওয়ান-ই-আকবরি" তে। ওখানে মন্দির যদি না ই থাকতো তাহলে, হিন্দুরা এতবার লড়াই কেনো করলো, কেনো এইসব লড়াই এর ইতিহাস মুঘল ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হলো আর কেনোই বা আকবর একটি আপোষ মীমাংসা করে মন্দির নির্মানে অনুমতি দিলো ?

যা হোক, আকবর মন্দির নির্মানে অনুমতি দেওয়ায় এবং মসজিদের পাশে একটি মন্দির নির্মিত হওয়ায় জাহাঙ্গীর এবং শাজাহানের আমলে এ নিয়ে কোনো লড়াই সংগ্রাম হয় নি। কিন্তু ঔরঙ্গজেবের সেটা সহ্য হলো না। সে একটি বাহিনী পাঠায় ঐ মন্দির ধ্বংস করার জন্য। ১০ হাজার লোক নিয়ে বৈষ্ণব দাস মহারাজ নামে এক সাধু, ঔরঙ্গজেবের এই বাহিনীকে প্রতিরোধ করে, ফলে সেবার মন্দির রক্ষা পায়। এরপর আরো কয়েক বার ঔরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংসের জন্য তার বাহিনী পাঠায়, কিন্তু প্রতিবারই হিন্দু এবং শিখগুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে শিখরা মিলে মন্দিরকে রক্ষা করে বা দখলকৃত মন্দিরকে আবার উদ্ধার করে। কিন্তু ঔরঙ্গজেব দমবার পাত্র ছিলো না। মুঘল সৈন্যরা এক রমজান মাসের সপ্তম দিনে হঠাৎ আক্রমন করে আকবরের সময়ে মসজিদের পাশে নির্মিত হওয়া ঐ রাম মন্দিরকে ভেঙ্গে ফেলে এবং হিন্দুরা বাধা দিতে এলে প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করে। মুঘলদের আরেক ইতিহাসের বই আলমগীর নামায় এই ঘটনার উল্লেখ আছে।

এরপর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় হনুমান গড়ির মোহন্ত উদ্ভব দাস, অস্ত্র হাতে নিয়ে রামজন্মভূমিকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। সেই সময় অযোধ্যার নবাব ফরমান আলীর মুসলিম সৈন্যদের সাথে হিন্দুদের যুদ্ধ হয়। শেষে নবাব একটি ফরমান জারি ক'রে একটি প্রাচীর ঘেরা জায়গায় মন্দির নির্মান ও পূজা উপাসনার অনুমতি দিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটায় এবং হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যরা মিলিতভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেয়। মূলত নবাব এই আপোষ করতে বাধ্য হয়েছিলো সিপাহী বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিম সৈন্যের একত্রিত করার স্বার্থে| কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে এইসব কিছুই জলে যায়। ইংরেজরা ঐ রাম জন্মভূমিরই একটি তেঁতুল গাছে অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারে এবং নবাবের ফরমান ইংরেজরা বাতিল করে দেয়; ফলে আবারও হিন্দুরা ঐ স্থানে পূজা-প্রার্থনার অধিকার হারায়। শুধু তাই নয়, ইংরেজরা ঐ তেঁতুল গাছটিকেও সমূলে উপড়ে ফেলে।

এরপর ১৯১২ সালে হিন্দুরা নির্মোহী আখড়ার সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে বহু প্রাণের বিনিময়ে জন্মভূমির একাংশ উদ্ধার করে এবং বাকি অংশ উদ্ধারের জন্য লড়াই হয় ১৯৩৪ সালে। এরপরই ইংরেজরা অযোধ্যার ঐ স্থানে হিন্দু মুসলমান সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। সেই থেকেই বাবরি মসজিদে কেউ নামাজ পড়ে নি। ফৈজাবাদ কালেক্টরির রেকর্ডে লিপিবদ্ধ আছে এসব ইতিহাস। ভাঙার সময় বাবরি মসজিদ ছিলো যে একটি পরিত্যক্ত মসজিদ, তা জঙ্গল ও গাছপালায় ভরা এবং ক্ষয়ে যাওয়া মসজিদের দেয়ালের ছবি দেখে তা সহজেই বোঝা যায়।

১৫২৭ সাল থেকে হিন্দুরা রাম মন্দির উদ্ধারের জন্য লড়াই করেছে বা চেষ্টা করেছে, ছোট বড় মিলিয়ে মোটামুটি ৭৬ বার৭৭ তম বারের প্রচেষ্টায় ১৯৯২ সালে, বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দুরা- দখল, রূপান্তর ও অসহিষ্ণুতার প্রতীক বাবরি মসজিদকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। কিন্তু এই শেষ বারের প্রচেষ্টাও ছিলো প্রায় সোয়া বছরের। বিজেপির সমর্থনে হিন্দুরা প্রথম ২০ সেপ্টম্বর, ১৯৯০ সালে জনসংকল্প দিবস পালন করে। এরপর বহু জেল জরিমানা হুমকি ধামকিকে অগ্রাহ্য করে কিছু প্রাণের বিনিময়ে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সালে ভেঙে ফেলে বাবরি মসজিদ। তাই এই ৬ ডিসেম্বর হিন্দুদের কাছে "শৌর্য দিবস" হিসেবে বিবেচিত ও পরিচিত ।

কিন্তু মন্দির এখনও নির্মান হয় নি। তাই লড়াই এখনও শেষ হয় নি। এ লড়াই ততদিন চলবে, যতদিন না রামের জন্মভূমিতে রাম মন্দিরের চূড়া কমপক্ষে তিন মাইল দূর থেকে দেখা না যায় এবং মুসলিম দুঃশাসনের আমলে, ভারতে, মন্দিরের উপর নির্মিত সমস্ত মসজিদ, ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া না যায়।

জয় হিন্দ। 
জয় শ্রী রাম। জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Monday, 20 July 2020

তাজমহল নয়, তেজোমহালয় :


তাজমহল নয়, তেজোমহালয় :

আমরা নেহেরু মার্কা ইতিহাসের বদৌলতে পড়েছি- সম্রাট শাজাহান তার প্রিয়তম স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে তাজমহল নির্মান করেন। এতে ২০ হাজার শ্রমিক, ২২ বছর ধরে কাজ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

শুরুতেই নেহেরু মার্কা ইতিহাস কেনো বললাম, তার ব্যাখ্যা দিয়ে নিই। অখণ্ড ভারত দুই টুকরা হওয়ার পর, বর্তমান ভারতের শাসনভার- ব্রিটিশদের এজেন্ট নেহেরুর কাছে হস্তান্তর হলে, ইতিহাস রচয়িতাদের প্রতি নেহেরু সরকারে একটি অলিখিত নির্দেশ ছিলো- মুসলমানদের নামে কোনো কিছু খারাপ বলা যাবে না। যেখানে দরকার বলতে হবে ভালো ভাবে, আর যেটা ভালো ভাবে বলা যাবে না, সেটাকে এড়িয়ে যেতে হবে। যেমন ২৮ এপ্রিল ১৯৮৯ সালে, পশ্চিমবঙ্গের সেকুলার বামফ্রন্ট সরকার মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ এর মাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যার মূল কথা ছিলো- “ভারতের মুসলমান আমলের সময়কে কোনোরকম বিরূপ সমালোচনা করা যাবে না। মুসলমান শাসকরা যে হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছে তা উল্লেখ করা যাবে না।” এই নির্দেশ অনুযায়ী বাংলার ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকগুলো সংশোধিত বা লিখিত হয় আর তাতে লিখা হয় এইধরণের ইতিহাস - “গজনীর সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেন”। কিন্তু প্রতিবারই সুলতান মাহমুদ যে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পুরুষকে খুন করে লক্ষ লক্ষ হিন্দু মেয়েকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী হিসেবে বাজারে বিক্রি করেছিলো, আর সেই সাথে সোমনাথ মন্দিরের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলে মন্দির লুঠ করে কোটি কোটি টাকার সমমূল্যের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাস কোথাও লিখা নেই। হিন্দু ছেলে মেয়েরা প্রকৃত ইতিহাস জানবে কিভাবে, কোথা থেকে ?

যা হোক, ফিরে যাই তাজমহলের ইতিহাসে, প্রথমে মিথ্যা প্রচারণার পোস্টমর্টেম করি, শেষে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমান দিয়ে লেখার পরিসমাপ্তি ঘটাবো।

তাজমহল নির্মানের ইতিহাস সম্পর্কে বলা হয়, তাজের নকশা করার জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার ডাকা হয়েছিলো এবং সেই নকশার সাথে কাঠের তৈরি তাজের একটি ছোট্ট নমুনা দাখিল করতে বলা হয়েছিলো। বহু নকশা ও নমুনা জমা পড়েছিলো এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর নামকরা স্থপতিদের ডেকে একটা পরিষদ গঠন করা হয় এবং সেই পরিষদ তাজের চুড়ান্ত নমুনা নির্বাচন করে এবং এই নমুনা হলো পারস্য বা তুরস্কের স্থপতি ওস্তাদ ইশা নামের এক ব্যক্তির; হ্যাঁ, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ই বলছে এইসব কথা।

এখন কমনসেন্সটাকে একটু খাটান। তাজের মতো একটি বিখ্যাত অট্টালিকা, যার মতো সৌন্দর্যময় দ্বিতীয় কোনো অট্টালিকা এখনও পৃথিবীতে নেই। যার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে; এক. যারা তাজমহল দেখেছে, আর দুই. যারা তাজমহল দেখে নি। সেই তাজমহলে নকশা যার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, তিনি পারস্য না তুরস্কের লোক, সেই কথাই কেউ ঠিক মতো বলতে পারছে না। ইনি নাকি আবার বিখ্যাত স্থপতি ! যার দেশ সম্পর্কেই সঠিক কিছু জানা যাচ্ছে না, তার সম্পর্কে আর অন্যান্য তথ্য জানার চেষ্টা করাটাই তো বৃথা; কারণ, ওস্তাদ ইশা নামের কেউ থাকলে তো তার সম্পর্কে কিছু জানা যাবে ?

আর একটা বিষয়; চীন ও কোরিয়ার ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশের অনেক বড় বড় সেতু, ফ্লাইওভার ইত্যাদি নির্মান করেছে এবং করছে, এর কারণ তারা প্রথমে নিজেদের দেশে ঐসব নির্মান করে দেখিয়েছে, তারপর তাদেরকে ডেকে এনে আমরা তাদেরকে ঐসব বানানোর দায়িত্ব দিয়েছি, এই সূত্রে ওস্তাদ ইশা নামের যদি কেউ থাকতো এবং সে যদি পারস্য বা তুরস্কের কোনো ব্যক্তি হতো, তাহলে নিশ্চয় তাজমহল বা এর মতো বা এই জাতীয় কোনো অট্টালিকা পারস্য বা তুরস্কে নিশ্চয় থাকতো, সেটা কি আছে ?

যদি ধরে নিই শাজহান তাজমহল বানিয়েছিলো, তাহলে এই সব বিক্রীত ঐতিহাসিকদের মতে, তাজমহলের নির্মান শুরু হয়- কারো মতে ১৬৩০, কারো মতে ১৬৩১, কারো মতে ১৬৩২, আবার কারো মতে ১৬৪১ সালে। ১৬৪১ সালে কোনোমতেই সম্ভব নয়; কারণ, শাজাহানের জীবনী বাদশানামার তথ্য মতে, শাজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যু হয় ১৬৩০ সালে, এর পর তাকে অস্থায়ীভাবে বুরহান পুরের একটি উদ্যানে সমাহিত করা হয়, মৃত্যুর ৬ মাস পর তাকে তাজের মধ্যে এনে স্থায়ীভাবে কবরস্থ করা হয়। এই সূত্রে ১৬৩২ সালও গ্রহনযোগ্য নয়; কারণ, ‘বাদশানামা’য় উল্লেখ আছে, আরবি মাস ১৫ জমাদিয়াল আউয়াল মমতাজের মৃতদেহ তাজের মধ্যে স্থানান্তরিত করা হয়। আরবি বছর যেহেতু হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে, সেহেতু ঐ দিনটি ইংরেজি সাল অনুযায়ী সঠিক কোন তারিখ ছিলো তা বের করা খুবই কঠিন হিসাবের একটা ব্যাপার, এই হিসেবকে এড়িয়ে গিয়ে যদি ধরে নিই যে, মমতাজের মৃত্যুর সময়টি ছিলো ১৬৩০ সালের শেষ দিকে, তাহলে মৃত্যুর ৬ মাস পর তাজের মধ্যে তার মরদেহ স্থানান্তর ১৬৩১ সালে হয়েছিলো বলে ধরে নেওয়া যায়। ফলে তাজের নির্মান শুরুর সাল ১৬৩২ ও খারিজ হয়ে যায়।

উপরের এই তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মমতাজের মৃত্যুর ৬ মাস পর তার দেহকে স্থায়ীভাবে তাজের মধ্যে সমাহিত করা হয়। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাজমহল নির্মানের জন্য সময় পাওয়া যাচ্ছে ৬ মাসেরও কম। অথচ আমাদের ঐতিহাসিকরা বলছে, এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক টেণ্ডার ডেকে নকশা অনুমোদন করে তাজ নির্মান করা হয়। এটা কি সম্ভব ? খেয়াল করুন, সময়টা ১৬৩০ সাল, যখন যাতয়াতের একমাত্র দ্রুত মাধ্যম স্থলপথে ঘোড়ার গাড়ি আর জল পথে পাল তোলা জাহাজ। যে জাহাজে ১৭৫৬ সালেও কোলকাতা থেকে মাদ্রাজ যেতেও সময় লাগতো একমাস। এইসব পুরোনো সময়ের কথা ছেড়ে এই আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটেও কী ওরকম একটি ইমারত এক বছরেও কি নির্মান করা সম্ভব ? আপনাদের কমনসেন্স কী বলে ?

এখন দেখুন তাজমহল নির্মানের ইতিহাস সম্পর্কে ইতিহাসের গ্রন্থগুলো কী বলছে ?

সম্রাট শাজহানের রাজত্বকাল এবং তার কিছু আগে পরের ইতিহাস পাওয়া যায় নিচের এই ৭ টি গ্রন্থে –

১. আবদুল হামিদ লাহোরী রচিত ‘বাদশানামা

২. সম্রাট জাহাঙ্গীরের লেখা আত্মজীবনী ‘ ওয়াকিঅৎ জাহাঙ্গিরী

৩. ইনায়েত খাঁ রচিত ‘সাহজাহাননামা

৪. মুফাজ্জল খাঁ রচিত ‘তারিখ-ই-মুফাজ্জলি

৫. বখতিয়ার খাঁ রচিত “মিরাত-ই-আলম

৬. মহম্মদ কাজিম রচিত ‘আলমগির নামা’ এবং

৭. কাফি খাঁ রচিত ‘মুস্তাখাবুল লুবাব

বর্তমান ইতিহাস মতে, শাজাহানের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো তাজমহল নির্মান, কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো শাজাহানের প্রায় সমসাময়িক এই সব বেতনভোগী মুসলিম ইতিহাস রচয়িতাদের মধ্যে শুধু আবদুল হামিদ লাহোরী রচিত ‘বাদশানামা’ ছাড়া তাজের ব্যাপারে আর কারো কোনো গ্রন্থে তাজের ব্যাপারে কিছু উল্লেখই নেই। বিষয়টি কি মানানসই ? আর বাদশানামায় তাজের ব্যাপারে কী কী বলা আছে, এই পোস্টের মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে সেগুলো একটা একটা করে জানতে পারবেন।

এবার দেখুন তাজ নির্মানের জন্য খরচের ব্যাপারে কে কী বলছে ?

বাদশানামায় আবদুল হামিদ লাহোরী বলছে, তাজের জন্য খরচ হয়েছে ৪০ লক্ষ টাকা। পরবর্তীতে শ্রী রমেশচন্দ্র মজমুদার এবং অতুলচন্দ্র রায় এই সত্যের কাছাকাছি থাকার জন্য বলেছেন ৫০ লক্ষ টাকা। কিন্তু তাজের মতো এত সুন্দর ও বিশাল একটি অট্টালিকা যে এত কম টাকায় নির্মান করা সম্ভব নয় এটা বুঝতে পেরে বিক্রীত ইতিহাস রচয়িতারা এর নির্মান ব্যয় বাড়াতে শুরু করে, এ ব্যাপারে মহম্মদ দীন নামে একজন বলে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা; গাইড টু তাজে বলা আছে ১ কোটি ৮৪ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা; তাবার্নিয়ে বলেছে ৩ কোটি, এই তাবার্নিয়েই ২২ বছর সময়ের প্রবক্তা; যা হোক, তাজমহল যদি সত্যই শাজহান নির্মান করতো, তাহলে মমতাজের মৃত্যুর পর থেকে সেই প্ল্যান করলেও ১৬৩২/৩৩ সালের আগে তা নির্মান শুরু সম্ভব হতো না এবং তখন থেকে ২২ বছর লাগলে নির্মান শেষ হতো ১৬৫৫ সালে, কিন্তু ১৬৫০ সালে থেভেনট নামে এক ফরাসী পর্যটক তাজমহল দেখে বর্ণনা করে গেছেন, ‘তাজ ভারতীয় ভারতীয়দের সূক্ষ্ম শিল্পনৈপূন্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন’

এর মানে নির্মান শেষ হওয়ার আগে থেকেই তাজ তার জায়গায় দাঁড়িয়েছিলো। এটা কিভাবে সম্ভব ? সম্ভব এভাবেই যে, তাজ শাজাহান বানায় ই নি। যা হোক, ‘কানোয়ারলাল’ বলেছে তাজের নির্মান ব্যয় ৪ কোটি ১৮ লক্ষ ৪৮ হাজার ৮২৬ টাকা; টাকার হিসেবে যেমন পয়সা উল্লেখ করা যায়, তেমনি কোটির হিসেবে লক্ষ বা খুব বেশি হলে হাজার উল্লেখ করা যায়, কিন্তু এই ‘কানোয়ার লাল’ ৮২৬ টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করেছে এই ভাবনা থেকে যে সূক্ষ্ম হিসেব ধরে নিয়ে তার তথ্যটাই যেন মানুষ বিশ্বাস করে। যা হোক এর পর ‘কীনস’ বলেছে তাজের নির্মানের পিছে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ১৭ লক্ষ টাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাজের নির্মানের ব্যয় হিসেবে এত মুনির এত মত কেনো ? সত্য তো একটাই হয়। এতগুলো তো আর সত্য নয়। তাহলে তাজের নির্মান ব্যয়ের পেছনে প্রকৃত সত্যটা কী ? প্রকৃত সত্য হিসেবে আমাদেরকে সেটাই ধরে নিতে হবে, তাজ সম্পর্কে যার গ্রন্থে কিছু তথ্যের উল্লেখ আছে, সেই আব্দুল হামিদ লাহোরীর তথ্যকে, যিনি বলেছেন ৪০ লক্ষ টাকার কথা। কিন্তু তাজের মতো একটি বিশাল ও সৌন্দর্যময় অট্টালিকা কী মাত্র ৪০ লক্ষ টাকায় নির্মান করা সম্ভব ? একটু পরে পাবেন এই প্রশ্নের উত্তর।

এখন দেখুন আবদুল হামিদ লাহোরীর ‘বাদশানামা’য় তাজমহল সম্পর্কে কী লিখা আছে। বাদশনামা ফার্সি ভাষায় লিখা; এই গ্রন্থের ৪০৩ নং পৃষ্ঠায় ২১ নং পঙক্তি থেকে ৪১ নং পঙক্তি পর্যন্ত যা লিখা আছে তার বাংলা অনুবাদ এরকম :

২১. শুক্রবার, ১৫ জমাদিয়াল আউয়াল, পরপারের যাত্রী পবিত্রা হজরত মমতাজ উল জামানির সেই পবিত্র মৃতদেহ,

২২. যা অস্থায়ীভাবে কবরস্থ করা হয়েছিলো, তা

২৩. যুবরাজ শাহ সুজা বাহাদুর, ওয়াজির খাঁ এবং সতিউন্নেসা খানম, যারা

২৪. মৃতের মন মেজাজের ব্যাপারে খুবই ওয়াকিবহাল ছিলো,

২৫. এবং রানীদের রানীর মনোভাব বুঝতো এবং তার কার্যাবলীর সঙ্গে পরিচিত ছিলো,

২৬. তাদের সাহায্যে রাজধানী আগ্রায় আনা হলো

২৭. শহরের দক্ষিনে যেখানে সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল উদ্যান,

২৮. যার মাঝখানে সেই বিশাল ইমারত, যা পূর্বে রাজা মানসিংহের সম্পত্তি ছিলো এবং

২৯. যার বর্তমান মালিক তাঁর পৌত্র রাজা জয়সিংহ,

৩০. সেখানেই বেহেশতবাসী রানীকে কবরস্থ করা হবে বলে স্থির করা হয়েছিলো,

৩১. যদিও রাজা জয়সিংহ পূর্বপুরুষের সেই সম্পত্তিকে অতিশয় মূল্যবান বলে মনে করতেন, তথাপি সম্রাট শাজাহানকে তা ছেড়ে দিতে রাজী হন।

৩২. কিন্তু ধর্মীয় নিয়ম ও মৃতের প্রতি মর্যাদার কথা চিন্তা করে সম্রাট সেই প্রাসাদ বিনা পয়সায় নেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না বিবেচনা করে শরীফাবাদ নামক স্থান তাকে দিলেন।

৩৩. কাজেই সেই বিশাল প্রাসাদ এর বদলে জয়সিংহকে সরকারী জমি দেওয়া হলো।

৩৪. ১৫ জমাদিয়াল আউয়াল, শবদেহ আগ্রায় পৌঁছবার পর

৩৫. সেই শোভন শবদেহকে চির বিশ্রামে শায়িত করা হলো……

৪১. সেই প্রাসাদ নির্মানে ৪০ লক্ষ টাকা খরচ করা হলো।

এই ৪০ লক্ষ টাকা আসলে জয়সিংহের কাছ থেকে যে প্রাসাদ নেওয়া হয়েছিলো, সেটাকে একটা ইসলামিক কবরখানায় রুপান্তরিত করতে সংস্কারের জন্য ব্যয় করা হয়েছিলো।

এখন দেখা যাক রাজা জয় সিংহ বা তার পূর্ব পুরুষের হাতে এই বিশাল অট্টালিকা এলো কিভাবে ?

আগ্রা শহরের একটি জয়গার নাম বটেশ্বর, এটি আগ্রা থেকে ৪ কি.মি দূরে অবস্থিত। ১৯০০ সালে, ঐ বটেশ্বরের একটা ঢিবি খুঁড়ে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের প্রথম অধিকর্তা জেনারেল ক্যানিংহাম একটা শিলালিপি আবিষ্কার করেন, যা বটেশ্বর শিলালিপি নামে পরিচিত। এই শিলালিপিটি বর্তমানে লখনৌ এর সরকারী সংগ্রহশালায় রাখা আছে। এই বটেশ্বর শিলালিপিটি সংস্কৃত ভাষায় লিখা এবং এতে মোট ৩৪টি শ্লোক আছে। এর মধ্যে ২৫, ২৬ এবং ৩৪ নং শ্লোকের বাংলা অর্থ হলো-

২৫. তিনি একটি সৌধ নির্মান করেছেন, যার মধ্যে ভগবান বিষ্ণু অধিষ্ঠান করছেন, রাজা মাথা নাত করে তার চরণ স্পর্শ করেন।

২৬. রাজা মর্মর পাথরে আরও একটি মন্দির নির্মান করেছেন এবং সেখানে সেই দেব অধিষ্ঠান করছেন, যার কপালে শোভা পাচ্ছে চন্দ্র। যিনি এই সুরম্য মন্দিরকে বাসস্থান হিসেবে পেয়ে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বাসনা ত্যাগ করেছেন।

৩৪. এই শিলালিপিটি আজ বিক্রম সংবতের ১২১২ সালের আশ্বিন মাসে, রবিবার শুক্ল পঞ্চমীর দিনে স্থাপন করা হলো।

বিক্রম সংবত ১২১২ মানে ১১৫৬ খ্রিষ্টাব্দ, যা খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতক। এই সময়ের রাজা ছিলেন চান্দেল রাজ পরমার্দিদেব, যার অন্য নাম ছিলো পরমাল। চান্দেলদের রাজ্যের নাম ছিলো বুন্দেলখণ্ড, যা বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত ছিলো। এই শিলালিপি অনুযায়ী রাজা চান্দেলদেব বিষ্ণু এবং শিবের জন্য শ্বেত পাথরের দুটো মন্দির নির্মান করেছিলেন, সম্ভবত নানা উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে এই দুটি মন্দির আকবরের সময়ে রাজা মানসিংহের হাতে আসে, মানসিংহ যেহেতু নিজের বোনকে আকবরের সাথে বিয়ে দিয়ে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেছিলো, সেহেতু আকবর, জাহাঙ্গীরের সময় পর্যন্ত হয়তো সেই মন্দিরগুলো অক্ষত ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে সেই মন্দির দুটি গেলো কোথায় ?

বর্তমানে আগ্রা শহরে শ্বেতপাথরের মাত্র দুটি ই ইমারত আছে, একটি তাজমহল এবং অপরটি নূরজাহানের পিতা ইদমত-উদ-দৌলার সমাধি। এ থেকে স্পষ্ট যে, শিব মন্দিরটিকে তাজমহল এবং বিষ্ণু মন্দিরটিকে নূরজাহানের বাবার সমাধি বানানো হয়েছে।


শিব মন্দিরটিই যে তাজমহল, এখুন দেখুন তার আকৃতিগত ও প্রত্নতাত্ত্বিকগত কিছু প্রমান :

১. তাজমহলের প্রধান গম্বুজের শীর্ষদেশে রয়েছে ত্রিশুল যা অভ্রান্তভাবে মহাদেবের অস্ত্র বা প্রতীক।

২. বটেশ্বর শিলালিপিতে বলা হয়েছে, এই মন্দিরকে বাসস্থান হিসেবে পেয়ে মহাদেব শিব কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বাসনা ত্যাগ করেছেন, একমাত্র তাজমহলের সৌন্দর্যের সাথেই শিলালিপিতে বর্ণিত ঐ মন্দিরের সৌন্দর্য মিলে।

৩. তাজমহলের দুটি তলায় কবর রয়েছে, উপরের তলায় নকল কবর, নিচের তলায় আসল কবর। দুই তলায় কবর বিশিষ্ট কোনো কবর ইসলামের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই, কিন্তু দুই তলায় শিবলিঙ্গ বিশিষ্ট শিব মন্দির ভারতের নানা জায়গায় আছে। ফলে এ থেকে স্পষ্ট যে শিবলিঙ্গগুলোকে ঢেকে দিতেই বা ঢেকে দিয়েই সেখানে কবর বসানো হয়েছে।

৪. ইসলামিক কবরখানায় কেউ কবরকে প্রদক্ষিণ করে না, কিন্তু তাজের কবর প্রদক্ষিণ করার ব্যবস্থা আছে, এ থেকে স্পষ্ট যে, ভক্তরা এককালে সেই পথে শিবলিঙ্গকে প্রদক্ষিণ করতো

৫. তাজমহলের প্রধান গম্বুজের ছাদ থেকে ঝুলছে একটি শিকল, কবরখানার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এক সময় সেই শিকলের সঙ্গে ঝোলানো ছিলো একটি মঙ্গলঘট, যার থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল শিবলিঙ্গের মাথায় পড়তো, এখনও বৃষ্টি হলে সেই বৃষ্টির জল কবরের উপর পড়ে। আসলে এটা শিবলিঙ্গের উপর জল পড়ার স্মৃতিমাত্র

৬. ‘জ্যঁ বাপতিস্ট তাভার্নিয়ে’ ভারত ভ্রমন করে গিয়ে এ সম্পর্কে একটি বই লিখেন যা লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ সালে, সেই বই য়ে তিনি লিখেছন, তাজ পরিসরের মধ্যে বাজার বসতো। একমাত্র হিন্দু মন্দিরের মধ্যেই বাজার বসে এবং যেখানে ফুল, ফল, প্রসাদের উপকরণসহ আরও নানা জিনিসের বেচাকেনা হয়, কোনো মুসলিম কবরখানায় কোনোদিন বাজার বসে না।

৭. তাজমহলে স্থাপিত শিবলিঙ্গের নাম ছিলো তেজোলিঙ্গ, এই নাম থেকেই তাজমহলের পূর্বনাম ছিলো তেজোমহালয়। তেজোমহালয়ে স্থাপিত মহাদেব শিবের আরেকটি নাম ছিলো অগ্রেশ্বর মহাদেব, যার থেকেই উৎপত্তি হয় আগ্রা নামের।

৮. যার কবরকে নিয়ে এত কথা ও কাহিনী, শাজাহানের সেই স্ত্রীর নাম প্রকৃত নাম ছিলো ‘আরজুমান্দ বানু’ যাকে ‘মমতাজ উল জামানি’ বলেও ডাকা হতো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মমতাজের নামে সমাধি বানানো হলো তার নাম ‘মমতাজমহল’ না হয়ে বা নাম থেকে ‘মম’ বাদ দিয়েশুধু ‘তাজমহল’ হবে কেনো ? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, এর পূর্ব নাম ‘তেজোমহালয়’ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এর নাম করণ করা হয়েছে তাজমহল। যদিও এর কোনো প্রয়োজন ছিলো না, কিন্তু ঐ যে খুনিরা যেমন খুনের প্রমান রেখে যায়, এই ব্যাপারটিও ঠিক তেমন।

৯. তাজমহলের প্রধান ফটকের উপর রয়েছ একটা স্থান, বর্তমানে যার নাম দেওয়া হয়েছে নহবত খানা; এককালে সেখান থেকে নাকি সকাল সন্ধ্যা সানাই বাজানো হতো; আসলে সেখান থেকে এক সময় পূজা উপলক্ষে ঢাক ঢোল বাজানো হতো । নিস্তব্ধতায় কবরখানার বৈশিষ্ট্য, সেখানে এরকম সানাই বাজানোর স্থান বড়ই বেমানান। কিন্তু আগে থেকেই যেহেতু আছে এবং সেটাকে আর ভেঙ্গেও ফেলা যাচ্ছে না, তাই ঢাক ঢোল বাজানোর স্থানকে নহবতখানা নাম দিয়ে প্রকৃতসত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

১০. তাজের বিশাল কমপ্লেক্স জুড়ে রয়েছে নানা বাড়িঘর দালান কোঠা। যা একটি মুসলিম কবরখানার জন্য অপ্রয়োজনীয় ও বেমানান। বরং অতিথিশালা, গোশালা, ভাণ্ডারঘর, রন্ধনশালা, ঠাকুরের ঘর, চাকর ও রক্ষীদের থাকার ঘর এবং অফিস ঘরের জন্যই একটা মন্দিরের এসব দরকার এবং যা এখনও আছে ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে, কিন্তু যা নেই কোনো ইসলামিক কবরখানায়।

১১. তাজমহলের নিচতলার ঘরগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কারণটা কী ?

নেহেরু সরকারে সময়ে একবার তাজমহলে ফাটল দেখা দেয়। সেইসময় প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্রী এস.আর.রাও আগ্রার আর্কিওলজিক্যাল সুপারিটেনডেন্ট ছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি দল তাজের ফাটল পরীক্ষা করার জন্য একটু দেওয়াল খুঁড়তেই দেওয়ালে আঁকানো বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি বেরিয়ে পড়ে, যেটা বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে অঙ্কিত একটি সাধারণ চিত্র। সেই সময় নেহেরুর নির্দেশে ঘটনাটা দ্রুত চাপা দেওয়ার জন্য একেবারে নিচতলায় যাবার রাস্তা ই স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেই থেকেই নিচতলার যাওয়ার রাস্তা বন্ধ।

১২. তাজমহল এবং শাজাহানের পক্ষে সাফাই প্রদানকারী ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন তাজমহলের বাগানের নকশা করেছিলেন ‘রনমল’ নামে কাশ্মিরের এক লোক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আন্তর্জাতিক টেন্ডার ডেকে যে তাজের নকশা অনুমোদন করা হয় সেই তাজের বাগানের নকশা, কাশ্মিরের কোনো হিন্দুকে দিয়ে করাতে হবে কেনো ? নাকি মিথ্যার আড়ালে সত্যের ইঙ্গিত এভাবেই মাঝে মাঝে প্রকাশ পায়।

১৩. ১৯৭৩ সালে, যখন নেহেরু আর নেই, আমেরিকার নিউইয়র্কের প্র্যাট স্কুলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক অধ্যাপক ‘মারভিন মিলস’ আগ্রায় তাজ পরীক্ষা করতে আসে এবং তাজের কোনো এক কাঠের দরজার সামান্য নমুনা সংগ্রহ করে আমেরিকায় নিয়ে যায়। আমেরিকার ব্রুকলিন কলেজের রেডিও কার্বন ল্যাবরেটরির অধ্যক্ষ ড. ইভান উইলিয়ামস এর তত্ত্বাবধানে ঐ কাঠের নমুনাটির ‘কার্বন-১৪’ পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, সেটা ১৩২০ থেকে ১৪০০ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ের তৈরি। যেটা শাজহানের সময় থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগের। এখন এটা অসম্ভব কিছু নয় যে, দ্বাদশ শতকে তৈরি করা শিব মন্দির তেজোমহালয়ের কোনো দরজা বা জানালার সংস্কার দেড়শ দুশো বছর করা হয় নি ? কিন্তু এই পরীক্ষা থেকে এটা তো প্রমানিত যে, শাজহানের অনেক আগে থেকেই তাজমহল বলে যাকে চালানো হচ্ছে, তা পৃথিবীতে ছিলো ।

মমতাজমহল ওরফে আরজুমান্দ বানু ছাড়া শাজহানের আরো অনেক নিকা করা বিবি ছিলো। তাজমহলের চত্বরের মধ্যেই আরো দুজন নিকা করা বিবি কবর আছে। এরা হলো সতিউন্নেসা খানমসরহন্দি বেগম। এছাড়া আরজুমান্দ বানুর এক খাস পরিচারিকার কবরও তাজের মধ্যে আছে। এখানে উল্লেখ্য যে এই তিনজনের কবর প্রায় হুবহু একই রকম। এখন প্রশ্ন হলো, একই সমাধি সৌধের মধ্যে প্রধান বেগমের সাথে অপ্রধান বেগম এবং তার দাসীকে কবর দিয়ে শাজাহান কি মমতাজের সম্মান বাড়িয়েছে, না কমিয়েছে ? আসলে শাজাহান, কোনো একটা উছিলায়, জয়সিংহের এই মন্দিরটিকে দখল করবে ব’লে, মমতাজের মৃত্যু উপলক্ষে দখল করেছিলো এবং পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থান বানিয়েছে, প্রেম ট্রেম কিচ্ছু নয়, মমতাজের প্রতি এত প্রেম থাকলে মমতাজের মৃত্যুর পরই শাজহান মমতাজের ছোট বোনকে বিয়ে করতে পারতো না।

এসব ই হচ্ছে ইতিহাসের কচকচানি। কিন্তু এই কচকচানির প্রয়োজন এখন এজন্যই যে, মুসলিম শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে হিন্দুরা যেমন শুধু তেজোমহালয়ই নয়, অনেক কিছু হারিয়েছে, তেমনি ভারতে বর্তমান মুসলিম সেন্টিমেন্টকে মূল্য দিতে গিয়ে ভারতের সেকুলার সরকারগুলো প্রকৃত সত্যকে চাপা দিয়ে মিথ্যা ইতিহাস প্রচার করেছে এবং এখনও করছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য তো বের হবেই, আজ বা কাল; সেই সত্য আজ বের হয়েছে। কিন্তু এই সত্য জানাটাই শেষ কথা নয়। মুসলিম শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে হিন্দুরা তেজোমহালয় হারিয়েছে, দীর্ঘদিন সেই সত্যাটা পর্যন্ত তারা জানতে পারে নি, এখনও সর্বস্তরের হিন্দু সেই কথা জানে না; এখন দরকার সর্বস্তরের হিন্দুকে সেই প্রকৃত সত্য জানানো এবং তাজমহলকে পুনরায় তেজোমহালয়ে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা।

এখানে আর একটি রূঢ় বাস্তব কথা প্রত্যেক হিন্দুর মনে রাখা দরকার যে, এত সুন্দর মন্দির পেয়ে কৈলাসে ফিরে যাবার ইচ্ছা ত্যাগ করেছেন বলে মহাদেব সম্পর্কে কল্পনা করে যে শিলালিপি লিখা হয়েছিলো, সেই মন্দির রক্ষার জন্য মহাদেব কিন্তু কোনো ভূমিকা রাখে নি, আর ভবিষ্যতে কখনো রাখবেও না। মহাদেবের যদি কিছু করার  থাকতো তাহলে তার সোমনাথ মন্দির ১৭ বার সুলতান মাহমুদের হাতে লুন্ঠিত হতো না। প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে মহাদেব শিব কোনো হিন্দুর জন্য কিছু করবে না, যা করার করতে হবে নিজেকেই; কারণ, পৃথিবীতে মানুষের শক্তিই শেষ কথা। আর শিবের মূর্তির মধ্যেই বলা আছে কোথায় আছে সেই শক্তি, আর কিভাবে তার ব্যবহার করতে হবে। শিবের সকল শক্তি নিহিত আছে তার ত্রিশুলের মধ্যে, যখন তা কোনো শিবভক্তের হাতে উঠে। এই ত্রিশুল শিবভক্তরা হাতে তুলে নেয় নি বলেই হিন্দুরা বার বার পরাজিত হয়েছে, বার বার মার খেয়েছে এবং এখনও খাচ্ছে এবং ততদিন খাবে যতদিন না শিবের অস্ত্র ত্রিশুলকে নিজের হাতে তুলে না নেবে।

জয় হিন্দ।

হর হর মহাদেব।

Saturday, 20 June 2020

যে কারণে বা যাদের কারণে হুমকির মুখে- হিন্দুসমাজ এবং হিন্দুধর্ম :


যে কারণে বা যাদের কারণে হুমকির মুখে- হিন্দুসমাজ এবং হিন্দুধর্ম :

ফটোপোস্টে যে ছবিটি দেখছেন, সেটা বর্তমান পাকিস্তানে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দির।
এই মন্দিরটি বিশালতা এবং এর টিকে থাকার ক্ষমতা দেখে এটা খুব সহেজই অনুমান করা যায় যে, এই মন্দিরের আশে পাশের কয়েকশ মাইল এলাকা জুড়ে এক সময় প্রচুর সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ বাস করতো, তারাই তৈরি করেছিলো এই মন্দির এবং এই মন্দিরে দেব-দেবীদের পূজাও হতো নিয়মিত। কিন্তু কোনো এক সময় ইসলামিক শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে ঐ এলাকার হিন্দুরা, হয় নিহত হয়ে বা নির্যাতিত হয়ে ঐ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে বা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে বাধ্য হয়েছে, ফলে ঐ এলাকায় বর্তমানে কোনো হিন্দু না থাকায় ঐ মন্দিরটি হয়েছে পরিত্যক্ত, ফলে আজ সেখানে পূজো দেবার মতো লোক নেই, তাই সেখানে শঙ্খ, ঢাক, কাঁসর বাজে না, উলুধ্বনিও উচ্চারিত হয় না, দু চারজন উৎসাহী লোক হয়তো মাঝে মাঝে সেই এলাকায় ঘুরতে যায় পরিত্যক্ত মন্দিরটি দেখতে এবং হিন্দুদের নির্বুদ্ধিতা ও নপুংসকতার ইতিহাস স্মরণ করতে।

এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবং মন্দিরকে দেব-দেবীর পূজার স্থানের বিনিময়ে জাস্ট টুরিস্ট স্পটে পরিণত হতে না দিতে একটা কথা আমাদের হিন্দুদের মাথায় খুব ভালো করে ঢুকিয়ে নেওয়া দরকার যে- ধর্ম ও সমাজ টিকে থাকে জনসংখ্যায়, যদি জনসংখ্যা না থাকে, সমাজও থাকবে না, ধর্মও থাকবে না, থাকবে না মন্দির, হবে না কোনো দেব-দেবীর পূজাও, তাই সবার আগে প্রয়োজন জনসংখ্যা; কারণ, জনসংখ্যা হলো- মন্দির, দেব-দেবী, সমাজ ও ধর্মের ভিত্তি। জনসংখ্যা থাকলে এই সবগুলো থাকবে, কিন্তু জনসংখ্যা না থাকলে এগুলোর কিছুই থাকবে না।

এই সত্যের ভিত্তিতে এখন দেখা যাক, হিন্দু সমাজের সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজরা প্রকৃতপক্ষেই হিন্দুসমাজের কোনো কল্যান করে কি না বা এদের দ্বারা হিন্দুধর্ম ও সমাজের প্রকৃতপক্ষেই কোনো উপকার হয় কি না ?

হিন্দু সমাজের সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজরা বিয়ে করে না, সন্তানের জন্ম দেয় না, সংসারের দায়িত্ব পালন করে না, উৎপাদন মূলক কোনো কাজ করে না, সমাজের জন্য সেবামূলক কোনো ব্যবসাও করে না; ফলে এদের কাছ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র বিন্দুমাত্র আর্থিক উপকার পায় না, উল্টো এরা পরগাছার মতো রাষ্ট্র ও সমাজের বিশেষ করে হিন্দু সমাজের খায় আর হাতির মতো আর গতর বাড়ায়।

হিন্দু সমাজে এই পরগাছা শ্রেণীর প্রবর্তক চৈতন্যদেব, চৈতন্যদেবের আগে বিচ্ছিন্নভাবে দু চারজন ব্যক্তি সংসারহীন জীবন যাপন করলেও, সেটা বর্তমানের মতো ব্যাপক ছিলো না; কিন্তু চৈতন্যদেবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে চৈতন্যদেবের জীবদ্দশাতেই অনেকে সংসার ত্যাগ ক'রে, কর্মহীন হয়ে অর্থাৎ পরগাছা হয়ে তার সাথে পথে পথে ঘুরেছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিপথে চালিত করার শাস্তি স্বরূপ চৈতন্যদেবের নির্মম মৃত্যুর পরও গত চারশ বছরে অন্তত কয়েক হাজার হিন্দু যুবক বিয়ে-শাদী-সংসার না ক'রে, উৎপাদন বা সেবামূলক কোনো কাজে জড়িত না হয়ে, পরগাছার মতো অন্যের পরিশ্রমের ফল খেয়ে তারা শুধু রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে নি, বিয়ের মাধ্যমে সংসার না করে হিন্দু সমাজের জনসংখ্যা কমিয়ে হিন্দু সমাজেরও অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। কারণ, যে ব্যক্তির পক্ষে রাষ্ট্র নিয়ে ভাবার কোনো দরকার নেই বা সুযোগ নেই, সে যদি বিয়ে করে সংসার না করে আর কমপক্ষে একটি সন্তানের জন্ম না দেয়, তার দ্বারা সমাজের কোনো উপকারই হয় না। এই সূত্রে বর্তমান হিন্দু সমাজের সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজদের দ্বারা হিন্দুসমাজের কোনো উপকারই হচ্ছে না।

আপনি যদি কোনো বীরের পূজা করেন, আপনি যেমন আস্তে আস্তে বীরে রূপান্তরিত হবেন, তেমনি আপনি যদি কোনো নপুংসককে আদর্শ ধরেন, আপনিও আস্তে আস্তে নপুংসকে পরিণত হবেন। হিন্দু সমাজের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে- রাম, বলরাম, পরশুরাম, অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণের মতো বীরের আদর্শ হিন্দুধর্মে থাকতেও আমরা তাদেরকে নিজেদের আদর্শ মনে না করে চৈতন্যদেব এবং এর মতো সংসারবিরাগী ব্যক্তিদেরকে আমরা আমাদের আদর্শ মনে করি এবং রাম, বলরাম, পরশুরাম, অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে চৈতন্যদেব মার্কাদের পূজা করি। ফলে হিন্দু সমাজ আস্তে আস্তে হয়েছে, হচ্ছে হীনদুর্বল; ফলে হিন্দুরা মার খাচ্ছে সর্বত্র, সেটা সংখ্যায় কম বা বেশি হলেও।

সংসার অর্থাৎ গার্হস্থ্য ধর্ম পালন না ক'রে সন্ন্যাস নেবার কোনো বিধান সনাতন ধর্মে নেই। মহাভারতে বলা হয়েছে- নিঃসন্তানদের যজ্ঞ, দান, তপস্যা উপবাস সবই ব্যর্থ এবং এরা কখনো স্বর্গে যাবে না। এছাড়াও সনাতন ধর্মের জীবনাচরণে চারটি আশ্রম- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাসে কিন্তু স্পষ্ট করে বলেই দেওয়া হয়েছে যে- জীবনের কোন সময় আপনাকে কী করতে হবে। জীবনের শুরুতে আপনাকে শিক্ষা গ্রহন করতে হবে, শিক্ষা শেষ হলে করতে হবে সংসার, সংসারে পুত্র কন্যার জন্ম দিয়ে তাদেরকে বড় করতে হবে এবং উপযুক্ত সময় উপস্থিত হলে পুত্র কন্যার বিয়ে দিতে হবে এবং পুত্রের হাতে সংসারের দায়িত্ব অর্পন করে আপনাকে যেতে হবে বাণপ্রস্থে, বাণপ্রস্থ মানে কোনো ধর্মীয় সংগঠণের অধীনে থেকে নিজের কর্মদক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগানো, এভাবে বয়স যখন ৭৫ এ পৌঁছবে তখন আপনি সন্ন্যাস নিতে পারবেন; সন্ন্যাস মানে পূর্ণ অবসর, সংসার ও সমাজের সকল প্রকার দায়িত্ব থেকে; সন্ন্যাসে একজন ব্যক্তি শুধু ঈশ্বরের নাম জপ ও ধ্যান করবে এবং মোক্ষ প্রাপ্তির বিষয়ে প্রচেষ্টা করবে।

অথচ চৈতন্যপন্থী, যারা মনে করে যৌনতা পাপ এবং যৌনতার মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়াও পাপ। এই মনোভাবের কারণে তারা নিজেরা তো বিয়ে শাদী সংসার করেই না, তাদের সংস্পর্শে যাওয়া অন্যদেরকেও বিয়ে ও সংসার না করতে পরামর্শ বা উৎসাহ দেয়। এভাবে হিন্দু সমাজের হাজার হাজার যুবক আজ পর্যন্ত বিয়ে শাদী না ক'রে, সংসার ত্যাগ ক'রে পিতা-মাতা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজনদের স্বপ্নকেই শুধু ধুলিস্মাত করে নি; কোনো উৎপাদন ও সেবামূলক কাজে শ্রম না দিয়ে পরগাছার মতো জীবন কাটানোর সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে বহু। আর এসবের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হিন্দু সমাজ সংসারবিরাগী হিন্দু ছেলেদের বিয়ে না করা এবং সন্তান জন্ম না দেবার কারণে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে- যারা এই ভাবে আমাদের হিন্দু সমাজের ক্ষতি করছে, আমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ক'রে আমাদের ইহকালের এবং পরকালের ক্ষতি করছে, অকারণে তাদেরকেই আমরা মাথায় তুলে রাখছি বা তাদেরকে মাথায় তুলে নিয়ে নাচানাচি করছি। ফলে জনসংখ্যা কমে গিয়ে হিন্দু সমাজ বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর এর মধ্যেও যে কয়জন টিকে আছে, তারাও নিরামিষ খাবারের প্রভাবে দৈহিক ও মানসিকভাবে হীন দুর্বল হয়ে প্রতিনিয়ত মুসলমানদের হাতে মার খেতে খেতে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য হয় সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যাচ্ছে বা ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঁচানোর জন্য নীরবে দেশ ত্যাগ করছে। তবুও আমাদের হিন্দুদের চেতনা ফিরছে না; রাম, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ, যে আদর্শ সংসার ত্যাগ করা নয়, সংসার করা, যে আদর্শ আমাদেরকে ইহকালে টিকিয়ে রেখে পরকালে মুক্তি প্রদান করবে, সেই আদর্শকে বাদ দিয়ে আমরা, যত সব নপুংসক, যারা সংসারের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না ব'লে সংসার থেকে পালিয়েছে, বিয়ে করে সংসার না করার কারণে যাদের নিজেদেরই পারলৌকিক মুক্তি নেই, যাদের আদর্শ আমাদেরকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের আদর্শকে আমরা ফলো করছি! বিলুপ্তি আমাদের হবে না, আমাদের মন্দির পরিত্যক্ত হবে না বা তা মসজিদ মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হবে না, তো কি অন্যদেরগুলো হবে ?

এ প্রসঙ্গে অনেকেই বলতে পারেন- যে দেব-দেবী, তাদের পূজা অর্চনার জন্য তাদের ভক্তদেরকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, তাদের পূজা অর্চনা করে লাভ কী ?

দেব-দেবীদের নিজেদের জন্য কোনো পূজা অর্চনার দরকার নেই, তাই তাদের দায় নেই কোনো মন্দির টিকিয়ে রাখা এবং সেই মন্দিরের পূজার জন্য ভক্তদেরকে টিকিয়ে রাখার। দেব-দেবীদের পূজা করতে হয় ভক্তদেরকে নিজেদেরই স্বার্থেই, দেব-দেবীর পূজা করে ভক্তরা ইহকালীন ও পরকালীন কল্যান লাভ করে থাকে এবং এই পূজা করতে করতেই ভক্তরা এক সময় পরমব্রহ্মকে বুঝতে পারে এবং মোক্ষ লাভ করতে পারে। আর যদি কেউ দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে পরমব্রহ্মকে বুঝতে এবং তার কাছে পৌঁছতে না পারে, তাহলে সে পরের জন্মে আবার আগের বারের চেয়ে খারাপ অবস্থায়, এমনকি ইতর প্রাণী রূপে জন্ম নিয়ে আগের জন্মের ভুলের শাস্তি পাবে, এভাবে যতদিন সে নিজেকে শুধরে না নেবে, ততদিন সে জন্মমৃত্যুর চক্রে খারাপ থেকে খারাপ অবস্থায় পতিত হবে এবং শাস্তি পেতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় দৃঢ় নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় যে, যত যা ই ঘটুক সনাতন ধর্ম পৃথিবী থেকে কোনোদিন নিশ্চিহ্ন হবে না। মানুষের মোক্ষপ্রাপ্তির আলোকবর্তিকা হিসেবে এটি পৃথিবীতে টিকে থাকবেই, এখন এটি কতভালো ভাবে বা কত খারাপ ভাবে টিকে থাকবে, সেটা নির্ভর করছে জীবিত সনাতনীদের কর্মের উপর।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কঠিন কথা বলা প্রয়োজন যে- কোনো দেব-দেবীর মূর্তির মধ্যে কোনো শক্তি নেই, শক্তি আছে সেই দেব-দেবীর মূর্তির আদর্শের মধ্যে এবং শিক্ষাও আছে সেই দেব-দেবীর পূজার মধ্যে। কোনো দেব-দেবীর পূজা করে কোনো মানুষ যদি সেই দেব-দেবীর মূর্তির মধ্যে থাকা শিক্ষাকে বুঝতে পারে এবং সেটা গ্রহন করতে পারে, তাহলেই সেই ব্যক্তির সেই দেব-দেবীর পূজা করা সার্থক। সরস্বতীর পূজা করে কেউ যদি মনে করে যে দেবী সরস্বতী তাকে জ্ঞান বুদ্ধি প্রদান করবে, তাহলে সে মূর্খ। সরস্বতীর এক হাতে থাকে বই, এই বই ই বলে দিচ্ছে যে জ্ঞান বুদ্ধি অর্জন করতে হলে বই পড়তে হবে। তাই কেউ সরস্বতী পূজা করুক বা না করুক, বাস্তবে কেউ যদি সরস্বতী পূজার প্রধান শিক্ষা, বই পড়ে, তাহলেই সে জ্ঞানী হবে। অনেকে ভেবে বা বলে থাকে যে, মুসলমানসহ ইহুদি খ্রিষ্টানরা তো কখনো সরস্বতী পূজা করে না, তাহলে তারা কিভাবে এত জ্ঞানী হয় ? তারা জ্ঞানী হয় এইভাবে, সরস্বতী পূজার শিক্ষা বই পড়াকে কাজে লাগিয়ে। বই যে জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং মানুষ বই পড়লে যে জ্ঞানী হবে, সেই ধারণা প্রথম দিয়েছে সিন্ধু সভ্যতার মুনি ঋষিরা; কারণ, তারাই পৃথিবীর প্রথম বই ঋগ্বেদের লেখক এবং তারাই বই পড়ার শিক্ষাটাকে সরস্বতী পূজার মাধ্যমে প্রচার করেছেন।

একইভাবে কেউ যদি মনে করে যে লক্ষ্মী পূজা করলেই সে ধনী হবে, সে আসলে মূর্খ। লক্ষ্মীর সাথে থাকে ধান, সেই ধান হলো ধনের প্রতীক, যে ধান চাষ করা পৃথিবীর কঠিন পরিশ্রমগুলোর মধ্যে একটি। লক্ষ্মীর সাথে থাকা ধান দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পরিশ্রম করলেই মানুষ ধনী হবে এবং সেই পরিশ্রম যদি সরস্বতীর পূজার শিক্ষা জ্ঞানের সমন্বয়ে করা হয়, তাহলে সে আরো বেশি ধনী হবে। এই ধন মানুষকে শুধু বিপদ আপদ থেকে রক্ষাই করে না, ধন মানুষকে বিপদেও ফেলে, এমনকি প্রাণেও মেরে ফেলে, তাই এই ধন বা অর্থ যাতে অনর্থ সৃষ্টি না করে, সেজন্য লক্ষ্মীর সাথে দিয়ে দেওয়া হয়েছে পেঁচা, যে পেঁচা দিনে বের হয় না অর্থাৎ পেঁচা গোপনীয়তার প্রতীক, লক্ষ্মীর সাথে পেঁচা দিয়ে এটা বলে দেওয়া হয়েছে যে, পরিশ্রম করে যে ধন অর্জন করবে, সেই ধন রাখতে হবে গোপনে, না হলে এই ধনই তোমার বিপদ ডেকে আনবে।

এভাবেই দুর্গা, শিব, কালী, কার্তিক পূজার আদর্শের মধ্যে দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে- যোদ্ধা হও এবং হাতে অস্ত্র রাখো, তাহলেই নিজেকে রক্ষা করতে পারবে এবং নিজেকে রক্ষা করতে পারলে সমাজ এবং ধর্মকেও রক্ষা করতে পারবে, আর তাতেই রক্ষা পাবে তোমাদের আবেগ, ভালোবাসা এবং শিক্ষার স্থান দেবমন্দির।

এসবকারণেই দেবতার মন্দির মানুষকেই রক্ষা করতে হবে এবং দেব-দেবীর পূজাও মানুষকেই করতে হবে, নিজেদের টিকে থাকা এবং মোক্ষপ্রাপ্তি অর্থাৎ জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভের স্বার্থে।

যা হোক, এখন উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে ভাবুন, আপনার পাড়ার মন্দিরে মহাপ্রলয় পর্যন্ত পূজা অর্চনা হোক, সেটা আপনি চান, না চান পাকিস্তানের ঐ মন্দিরটির মতো সেটি পরিত্যক্ত বা পূজা শূন্য হোক ? যদি চান মহাপ্রলয় পর্যন্ত আপনার পাড়ার মন্দিরে পূজা অর্চনা হোক আর পূজা উপলক্ষে ঢাক বাজুক, শঙ্খ বাজুক, উলুধ্বনি উচ্চারিত হোক, তাহলে সর্বপ্রকার নপুংসকের আদর্শকে নিজের মাথা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে- রাম, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনের আদর্শকে ধারণ করুন, প্রতিদিন তাদের পূজা করুন, তাদের আশীর্বাদে আপনার অস্তিত্ব টিকে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত।

জয় হিন্দ।