Showing posts with label দেব-দেবী. Show all posts
Showing posts with label দেব-দেবী. Show all posts

Friday, 16 October 2020

ঈশ্বর নিরাকার হলে দেব-দেবীদের আকার বা রূপ কিভাবে এলো ?

ঈশ্বর নিরাকার হলে দেব-দেবীদের আকার বা রূপ কিভাবে এলো ?

গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের ১ নং শ্লোকে অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেছেন-

"সতত ভগবানে সর্বকর্ম দিয়া যাঁহারা তোমার উপাসনা করেন, আর যাঁহারা নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন, এই উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সাধক কে ?"

এর জবাবে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

"হে পার্থ, যাঁহারা আমাতে মন নিবিষ্ট করিয়া নিত্যযুক্ত হইয়া আমাকেই পরম শ্রদ্ধার সহিত উপাসনা করে, তাঁহারাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ সাধক।"- (গীতা, ১২/২)

এই শ্লোকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে- ভক্তিমার্গে বা ভক্তিপথে ব্যক্ত উপাসনাই শ্রেষ্ঠ। তবে জ্ঞানমার্গে নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনাও নিষ্ফল নয়, এই পথেও স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেই পাওয় যায়, যেকথা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন এর পরের শ্লোক, গীতার ১২/৩,৪ এ, এভাবে-

"কিন্তু যাঁহারা সর্বত্র সমবুদ্ধি সম্পন্ন, সর্বপ্রাণীর মঙ্গলপরায়ণ হইয়া, ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয় হইতে সংযত করিযা, যাঁহারা- অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব, অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহারাও আমাকে প্রাপ্ত হন।"

সগুন-নির্গুণ বা সাকার-নিরাকার, উভয়ই ঈশ্বরের বিভাব, তবে এর মধ্যে সাকার উপাসনা শ্রেষ্ঠ; কারণ, সকলের পক্ষে নিরাকার উপাসনা করা সম্ভব নয়। যে কথা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন গীতার ১২/৫ নং শ্লোকে, এভাবে-

"যাঁহারা নির্গুন ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহাদের অধিক কষ্টভোগ হয়। কারণ, দেহধারীগণ অধিক কষ্টে নির্গুণ ব্রহ্ম বিষয়ক নিষ্ঠা লাভ করতে পারেন।"

এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো- নির্গুণ ব্রহ্ম বিষয়ক জ্ঞান ও নিষ্ঠা লাভ করা সকলের পক্ষে সহজ ও সম্ভব নয়। কারণ, দেহাত্মবোধ বিদূরিত না হলে নির্গুন ব্রহ্মে স্থিতিলাভ করা যায় না। আর এই অবস্থায় উত্তীর্ণ হতে পারেন শুধুমাত্র উচ্চস্তরের সাধকগণ, যা সাধারণ মানুষের শুধু নাগাল নয়, চিন্তারও বাইরে। এই সমস্যার সমাধানেই ব্যক্ত উপাসনা পদ্ধতির প্রয়োজন, যে উপাসনা পদ্ধতির পক্ষে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"যাঁহারা মৎপরায়ন হইয়া, আমাতে সর্বকর্ম সমর্পণ করিয়া, একমাত্র আমাকে ধ্যান করিতে করিতে উপসনা করেন, হে পার্থ, আমি তাঁহাদেরকে মৃত্যুময় সংসার সাগর হইতে উদ্ধার করিয়া থাকি।"-(গীতা, ১২/৬,৭)

তাই শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ হলো- "আমাতেই মন স্থির করো, বুদ্ধি আমাতেই নিবিষ্ট করো, তাহা হইলে দেহান্তে তুমি আমাকেই পাইবে।"- (গীতা, ১২/৮)

আর শ্রীকৃষ্ণকে পেলেই যে মোক্ষলাভ হয়, সেটা তো গীতার ছত্রে ছত্রে প্রমাণিত।

যা হোক, প্রতীক উপাসনা বা মূর্তি পূজার কেনো প্রয়োজন, সে সম্পর্কে গীতাশাস্ত্রী শ্রীজগদীশ চন্দ্র ঘোষ, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "শ্রীগীতা"র ভূমিকায় বলেছেন-

"যাহা নির্গুণ, নির্বিশেষ, নিষ্ক্রিয়… মনুষ্য তাহা ধারণ করিতে পারে না এবং তাহার সহিত ভাব-ভক্তির কোনো সম্বন্ধও স্থাপন করিতে পারে না। তাহা অচিন্ত্যরূপ, নিজ বোধরূপ…। অথচ কোন তত্বে চিত্ত স্থির না করিলে আত্মবোধও জন্মে না। এই হেতু নির্গুণ ব্রহ্ম উপাসনায় মন স্থির করিবার জন্য প্রতীক উপাসনা অর্থাৎ যাহা ব্রহ্ম নয়, তাহাকে ব্রহ্মরূপে ভাবনা করার ব্যবস্থা।"

জগদীশচন্দ্রের এই মত থেকে স্পষ্ট যে- নির্গুণ ব্রহ্মে চিত্ত স্থির করার জন্য প্রথমে প্রতীক উপাসনার প্রয়োজন। শুরুতে প্রতীক উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে নত হয়ে, তার সাথে ভাব-ভক্তির সম্বন্ধ স্থাপন করে, আস্তে আস্তে আত্মবোধ জাগ্রত হলে সাধক নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনার উপযুক্ত হয়।

-একারণে শুরুতেই কাউকে নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করতে বলা আসলে তাকে অথৈ মহাসমুদ্রে ফেলে দেওয়া, যেখানে সে শুধু হাবুডুবুই খাবে এবং হাবুডুবু খেতে খেতেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হবে। কিন্তু সে এই সংসাররূপ সাগরে বেঁচে যাবে, যদি সে কোনো খড়কুটা রূপ কাষ্ঠ পায়, এই কাষ্ঠই আসলে একটি প্রতীক, যাকে অবলম্বন করে সে বেঁচে যাবে এবং আস্তে আস্তে নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনার উপযুক্ত হবে।

সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকারে মন নিবিষ্ট করা সম্ভব নয় বলেই, বাস্তবতা মেনে নিয়ে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক "শহীদ মিনার" স্থাপন করা হয়েছে'; স্থাপন করা হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদের প্রতীক ঢাকার সাভারের "জাতীয় স্মৃতিসৌধ"। একই কারণে স্থাপন করা হয়েছে ঢাকার মীরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতীক "বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ"। এই ব্যবস্থা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, পৃথিবীর সকল দেশে রয়েছে। এই সব প্রতীকের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে সেই বিষয়টি আগে ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেই সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান প্রদান করা হয়, এরপর নিজ ক্ষমতা ও আগ্রহ অনুসারে কোনো ব্যক্তি সেই প্রতীককে অবলম্বন করেই সেই বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করে এবং সে সম্পর্কে আরও উচ্চতর জ্ঞান লাভ করে; একারণেই শুরুটা হওয়া চাই প্রতীককে অবলম্বন করে, এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনার মাধ্যম হিসেবে প্রথম ধাপ হলো সাকার উপাসনা, যাকে সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে মূর্তিপূজা।

মূর্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করতেই করতেই মানুষ এক সময় ঈশ্বর সম্পর্কে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তখন তারা বুঝতে পারে- যেকোনো দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে আসলে ঈশ্বরেরই পূজা করা হয় এবং সকল দেব-দেবী প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের বিভিন্ন কার্যকারী রূপ, তখন তারা সব ছেড়ে এক ঈশ্বরের প্রতীক শ্রীকৃষ্ণে মন নিবিষ্ট করে এবং এইভাবে উপাসনা করতে করতে এক সময় তারা নিরাকার ব্রহ্মের উপলব্ধি করতে পারে এবং সেই নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করতে করতে এক সময় তার সাথে একাত্ম হয়ে মোক্ষ লাভ করে। সুতরাং সাকার উপাসনা আসলে নিরাকার উপাসনারই প্রথম ধাপ এবং সাকার উপাসনা দুই ধাপে বিভক্ত, প্রথম ধাপে বহু দেব-দেবীর পূজা-প্রার্থনা এবং দ্বিতীয় ধাপে এক ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পূজা-প্রার্থনা।

সনাতন ধর্ম হলো বাস্তবতার ধর্ম, এই সব বাস্তবতাকে না বুঝে যারা সরাসরি নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কথা বলে, তারা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। যেমন কোনো নিরাকার ব্রহ্মের সাধক, কখনোই তারা ছোট বাচ্চাকে বোঝাতে পারবে না যে নিরাকার ব্রহ্ম আসলে কী ? ফলে সেই বাচ্চাকে দিয়ে সে কখনো নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করাতে পারবে না। এমনটি হলে সেই ছোট বাচ্চা ধর্মপথ থেকে বিচ্যুত হবে, এর থেকে বাঁচতে প্রথমে সেই ছোট বাচ্চাকে কোনো প্রতীককে নমস্কার করা শিখাতে হবে, প্রতীকের সামনে নত হওয়া শিখাতে হবে, যার মাধ্যমে সে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার একেবারে প্রাথমিক ধাপে প্রবেশ করবে।

যেসব হিন্দু সরাসরি নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কথা বলে, তারা আসলে সামাজিক বাস্তবতাকে না বুঝে অবাস্তব থিয়োরি ইসলামের অনুসারী মুসলমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তা বলে। কারণ, আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় মুসলমানরা এক নিরাকার আল্লার উপাসনা করে; কিন্তু কোরান হাদিসে আল্লার আকারের বর্ণনা দেওয়া আছে, সেই বর্ণনা মোতাবেক মূর্তি তৈরি করলে সেটা হিন্দুদের মতো হয়ে যায় বলে তারা সেটা করে না। এছাড়াও কোরান, হাদিসের বইকে তারা শ্রদ্ধা করে, যেটা প্রতীক উপাসনার পর্যায়ে পড়ে; তারা পশ্চিম দিককে শ্রদ্ধা ক'রে সেদিকে পায়খানা প্রস্রাব করে না বা পশ্চিমদিকে পা দিয়ে ঘুমায় না, এটাও একধরণের প্রতীকী উপাসনা। যেকোনো মসজিদকে তো তারা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে এবং তার জন্য দো্য়াও পড়ে। মসজিদ দেখে শ্রদ্ধা ভক্তি করা এবং তার জন্য দোয়া দরূদ পড়া কি প্রতীক উপাসনা নয় ? একই কথা প্রযোজ্য মক্কার কাবা শরীফ এবং তার ছবির ক্ষেত্রেও। হিন্দুদের বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি ঘরে রাখার মতো মুসলমানরাও বিভিন্ন দর্শনীয় মসজিদ, বিশেষ করে মক্কার কাবা শরীফের ছবি ঘরে রাখে এবং তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করে, যা একধরণের প্রতীক উপাসনা ই। বর্তমানে আরবি হরফে লেখা "আল্লাহু" এবং "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" লেখা ছবিও মুসলমানদের কাছে শ্রদ্ধার প্রতীকে পরিণত হয়েছে, তাই এগুলো তারা ঘরের মধ্যে, বাড়ির গেটে সেট করে রাখে। এগুলোও কি প্রতীক উপাসনা নয় ?

সনাতন ধর্মে উপাসনাযোগ্য প্রতীকের তো শেষ নেই, ইসলামে কী কী প্রতীকের উপাসনা করা হয়, তার বর্ণনা সংক্ষেপে উপরে দিয়েছি; খ্রিষ্টান মতবাদে- যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মরার ছবি, সদ্যজাত যীশু এবং তার মা মেরীর ছবি এবং শুধু মেরীর ছবিও খুবই শ্রদ্ধার প্রতীক এবং এগুলোর মাধ্যমের খ্রিষ্টানরা তাদের নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করে। বৌদ্ধ মতবাদেও গৌতম বুদ্ধের ছবি এবং তার মূর্তি বৌদ্ধদের উপাসনার মাধ্যম। ধর্ম এবং ধর্মীয় মতবাদে প্রতীক উপাসনা তো মাস্ট, রয়েছে যেকোনো দেশের প্রতীক, পতাকা; এমনকি যেকোনো জনসংঘ, দল বা বাণিজ্যিক কোম্পানিরও প্রতীক বা লোগো থাকে, যেগুলো সেই জনসংঘ, দল বা কোম্পানির লোকের কাছে বেশ শ্রদ্ধার বিষয়। এমন কি যে আর্য সমাজীরা নিরাকার উপাসনার পক্ষে এত গলা ফাটায়, তারাও ওঁ এর একটি বিকৃতি রূপ "ও৩ম" ব্যবহার করে, এটা কি সাকার উপাসনা নয় ? যেকোনো প্রতীক তো সাকার ই। এভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীর সর্বত্র প্রতীক উপাসনা রয়েছে এবং এটাই সনাতন ধর্মের প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা। তাই জেনে বা না জেনে, জ্ঞানে বা সজ্ঞানে- পৃথিবীর সকল মানুষ সনাতনী বিধি বিধান পালন বা চর্চা করে আসছে।

এসব বিষয় উপলব্ধি না করে, মুসলমানদের সস্তা প্রচার- আমরা এক নিরাকার আল্লার উপাসনা করি- তে প্রভাবিত হয়ে, সকল সনাতনীর জন্য নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা চালুর চিন্তা ও তার প্রচার করা মূর্খামি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, সকল মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কখনো এক হয় নি, কখনো এক হবেও না, তাই সকলের জন্য এক নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা কখনো বাস্তব সম্মত নয়।

প্রতীক উপাসনার বাস্তবতা কোথায়, এ সম্পর্কে একটি উদাহরণ নিচে দিচ্ছি-

ধরে নিন, বাংলাদেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ কোনো এক বিদেশী বাংলাদেশ ঘুরতে এসে কোনো এক জেলা শহরে তিন রাস্তার মোড়ে উঁচু বেদীর উপর নির্মিত কোনো এাকটি মূর্তি দেখতে পেলো। এটা সম্পর্কে কৌতূহলী হলে প্রথমেই সে তার গাইডকে জিজ্ঞেস করবে- এটা কী, আর এটা এখানে কেনো ? এর জবাবে গাইড তাকে জানাবে, এটা মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রতীক। তারপর সেই বিদেশী জিজ্ঞেস করত পারে মুক্তিযুদ্ধ কী, এটা কত সালে হয়েছিলো এবং সে সময় কী কী ঘটেছিলো ? এর জবাবে গাইড তাকে যা ই জানাক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সে আগ্রহী হলে সে নেট ঘেঁটে আরও তথ্য জানার চেষ্টা করবে, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে যাবে, ঢাকার সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবে, মীরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যাবে, বাংলাদেশের পতাকার বিবর্তনের ইতিহাস পড়বে, দেশের সকল জেলায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত ভাস্কর্যগুলো দেখতে যাবে, এভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর সে এমন উচ্চতর জ্ঞান লাভ করবে, যখন তার কাছে প্রথম দেখা সেই জেলা শহরের ভাস্কর্যটির হয়তো অতটা গুরুত্বই থাকবে না, যদিও তার জানার শুরুটা হয়েছিলো এখান থেকেই।

সনাতন ধর্মে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার স্তরে পৌঁছতে কোনো বিগিনারকে প্রতীক উপাসনা বা মূর্তিপূজা ঠিক 

এইভাবে নিবিষ্ট করে এবং পর্যায়ক্রমে তাকে উচ্চস্তরে পৌঁছে দেয়।

তাই প্রতীক উপাসনা বা মূর্তিপূজা নিরর্থক নয়; এটা উচ্চ স্তরের সাধকদের জন্য নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করে ব্রহ্ম লাভের প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। নিরর্থক তারা, যারা মূল বিষয় না বুঝে শুরুতেই সবার জন্য নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কথা বলে। যদিও গীতার বহুশ্লোক অনুযায়ী মোক্ষ লাভের জন্য কষ্টসাধ্য নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কোনো প্রয়োজনই নেই, একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান এবং তাতে মন নিবিষ্ট করাই যথেষ্ট। তারপরও যারা নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করে মোক্ষ লাভ করতে চান, করতে পারেন, কিন্তু আপনাদের জন্যও স্টার্টিং পয়েন্ট হলো কোনো প্রতীক উপাসনা বা মূর্তির পূজা। আমার এই কথা যে কতখানি সত্য ও বাস্তব, সেটা নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই তার প্রমাণ পাবেন, আজ যারা নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা বলে গলা ফাটাচ্ছেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই কি আপনারা সেই জ্ঞান পেয়ে গিয়েছিলেন ? ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথম যাকে পেয়েছিলেন, তিনিও একজন আকার, তিনি মা। তারপর জ্ঞান বুদ্ধির বিকাশের সাথে সাথে দেব-দেবীর মূর্তি বা ছবির সামনে আপনাকে নত হওয়া শিখিয়ে আপনার বাবা মা আপনাকে শিখিয়েছিলো কিভাবে ভগবানের পূজা করতে হয় এবং তার কাছে প্রার্থনা করতে হয়। শিশুকাল থেকে সেই আকার বা প্রতীককে ধরেই ধর্মীয় জগতে আপনার পথচলা, যে পথ চলতে চলতে আপনি আজ নিরাকার ব্রহ্মের চিন্তায় পৌঁছে গেছেন। তাই নিরাকার ব্রহ্মের বিষয়টা শুরুতে কেউ বোঝে না, বোঝা সম্ভব নয়; আকার দিয়েই প্রথমে কাউকে কোনো বিষয় বোঝাতে হয়, তারপর সে আস্তে আস্তে নিরাকারের দিকে এগিয়ে যায়, যার পারিভাষিক টার্ম হচ্ছে- মূর্ত থেকে বিমূর্ত।

তাই নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা সাকার দিয়েই শুরু হয় বা শুরু করতে হয়, এখন প্রশ্ন হলো- ঈশ্বর তো নিরাকার, তাহলে দেব-দেবীরা কোথা থেকে এলো আর তাদের আকারই বা কিভাবে কল্পিত হলো ?

আমরা জানি- শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ প্রদর্শন করেছিলেন, তাতে তিনি নিজের মধ্যেই সকল দেব-দেবীকে প্রদর্শন করিয়েছিলেন। সেই থেকেই দেব-দেবীদের রূপ কল্পিত হয়েছে এবং সেই কল্পনা অনুসারে দেব-দেবীদের মূর্তি নির্মান করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হয়, তাহলে এই দেব-দেবীদের তার কী প্রয়োজন আর আমরাই বা কেনো ঐ সকল দেব-দেবীর পূজা করে থাকি ?

-সনাতন ধর্ম বাস্তবতার ধর্ম এবং এটা সব সময় আমাদেরকে বাস্তবতার শিক্ষা দেয়। যেকোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সেখানে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি থাকে। তিনি রাষ্ট্রপরিচালনার সুবিধার্থে তার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ করে থাকেন, এদেরকে সহায়তা করার জন্য থাকে বিভিন্ন পদমর্যাদার সরকারী কর্মচারীবৃন্দ। সবাই মিলে রাষ্ট্রটাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ বা ভারতের ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলেন রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু তিনি একা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন না, রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য তিনি নির্ভর করেন তার সরকারী কর্মচারীসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের উপর, যদিও এদের সকলের যে ক্ষমতা, তা প্রধানমন্ত্রীরই দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী চাইলে তাদের সেই ক্ষমতাকে কেড়ে নিতেও পারেন।

সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার এই বাস্তবতার শিক্ষাকেই লালন করা হয় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে। কারণ- বাস্তব জীবনে মানুষ শুধু কোনো একজনকে সন্তুষ্ট করে চলতে পারে না, তাকে প্রতিদিনের জীবনে, প্রতিটা ক্ষেত্রে নানাজনকে সন্তুষ্ট করে পথ চলতে হয়। শুরু করছি একেবারে বাড়ি থেকে- আপনার বাড়িতে যতজন সদস্য, ততজনকেই সন্তুষ্ট করে আপনাকে চলতে হবে, মন রক্ষা করে চলতে হবে পাড়া প্রতিবেশীদেরকেও। আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, সকল কাস্টমারের মন আপনাকে রক্ষা করতে হবে। আপনি যদি চাকুরীজীবী হন, অফিসের সকলের মন যুগিয়ে আপনাকে চলতে হবে। মন রক্ষা করে চলতে হবে আপনার এলাকার মেম্বার, কমিশনার, চেয়ারম্যানসহ ছোট বড় সকল রাজনৈতিক নেতাদের; কারণ, কখন যে কাকে আপনার প্রয়োজন হবে, সেটা আপনি নিজেও জানেন না, তাই সকলের মন রক্ষা করে না চললে আপনি সামাজিকভাবে বিপদে পড়বেন। এই যাদের মন রক্ষা করে বা তাদেরকে সন্তুষ্ট করে আপনার চলতে হচ্ছে, এরা সকলেই একেক প্রকারের, একেক ক্ষমতার অধিকারী দেব-দেবী, যাদের সকলের মাথার উপরে রয়েছে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী।

আবার রাষ্ট্রের একজন সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাত করা প্রায় অসম্ভব বা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার এমন ব্যক্তিও রয়েছে, যারা চাইলেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা সাক্ষাত করতে পারে; হয় এরা জন্মসূত্রে প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়, নয়তো কর্ম ও গুণে এরা নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর নিকটে নিয়ে যেতে পেরেছে। তো যে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করা সম্ভব নয়, সেই সাধারণ নাগরিকও যদি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চায়, প্রথমত তাকে প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত হতে হবে, তারপর তার দেখা করার পক্ষে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে, তারপর তাকে গিয়ে ধরতে হবে গ্রামের পাতিনেতাকে, পাতিনেতা গিয়ে ধরবে শহরের নেতাকে, সেই নেতা গিয়ে ধরবে এমপিকে, এমপি যদি মন্ত্রী না হয়, সে গিয়ে ধরবে কোনো মন্ত্রীকে, সেই মন্ত্রী যদি সিনিয়র মন্ত্রী না হয়, সে গিয়ে ধরবে কোনো সিনিয়র মন্ত্রীকে, যে প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ, সেই মন্ত্রী যদি চায় তো, সে সেই সাধারণ ব্যক্তির সাথে প্রধানমন্ত্রীর দেখা করিয়ে দিলেও দিতে পারে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীরূপ ঈশ্বরকে পাওয়ার এই প্রসেস আসলে সনাতন ধর্মের দেবতত্ত্বের মধ্যে নিহিত। যেকোনো দেব-দেবীর পূজায় যে ভক্তি সে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে, সেই ভক্তি তাকে আস্তে আস্তে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিয়ে যায় বা যেতে পারে।

কোনো মানুষ শুধু একজনকে সন্তুষ্ট করে চলতে পারে না, যেটা আগেও বলেছি; জীবন যাপনের তাগিদেই তাকে নানাজনকে নানাভাবে সন্তুষ্ট করে চলতে হয়, সমাজ জীবনের এই শিক্ষাই দেওয়া হয় বহু উদ্দেশ্যে বহু দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে। যে কারণে সনাতন ধর্মে বহ দেব-দেবীর পূজার ব্যবস্থা রয়েছে, আর বহু দেব-দেবী যে সনাতন ধর্মে স্বীকৃত সেটা তো শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের মধ্যেই রয়েছে। এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন- সকল দেবতার পূজার মাধ্যমে আসলে তারই পূজা করা হয় (৯/২৩) এবং দেব-দেবীদের পূজা করে ভক্তরা যে ফল লাভ করে, সেটা শ্রীকৃষ্ণই দেয় (৭/২২) তাই বহু দেব-দেবীর পূজা যে সনাতন ধর্ম স্বীকৃত তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং ঈশ্বর নিরাকার হলেও তাকে বোঝা এবং পাওয়ার সুবিধার্থে প্রথমে তার আকাররূপ কোনো দেব-দেবীর আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, সেই দেব-দেবীর পূজা করে নিজের মধ্যে ভক্তি সৃষ্টি করতে হয়। মানুষ যেহেতু কোনো আকার বা প্রতীক ব্যতীত নিজের ভক্তি শ্রদ্ধাকে প্রদর্শন করতে পারে না, যেকারণে শহীদ মিনার বা জাতীয় স্মৃতিসৌধের সৃষ্টি, সেহেতু নিরাকার ঈশ্বরের প্রতি নত হতে বা তার প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেব-দেবীদের উৎপত্তি, যা সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতার প্রতিরূপ।

আলোচনার শেষে সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়- দেবদেবীরা হলেন ঈশ্বরের বিভিন্ন শক্তি বা ক্ষমতার প্রকাশ, যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার প্রকাশ হলো তার মন্ত্রী আমলাসহ সকল সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী বৃন্দ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেমন সকলে পৌঁছতে পারে না, তাকে বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীর হাত ধরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছতে হয়, তেমনি বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করে নিজের মধ্যে ভক্তির সৃষ্টি করে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে যাওয়া যায়। ঈশ্বর নিরাকার হলেও নিরাকারের সামনে যেহেতু কেউ নত হতে পারে না বা কোনো নিরাকারে ভক্তি শ্রদ্ধা অর্পন বা প্রদর্শন করা যায় না, সেহেতু ভক্তদের সুবিধার্থেই ঈশ্বরের বিভিন্ন সাকার শক্তির প্রকাশ দেবদেবীদের মূর্তি বানিয়ে তার সামনে নত হয়ে তার মাধ্যমে ঈশ্বরের আরাধনা করে ঈশ্বরের প্রতি যে আমাদের ভক্তি আছে, তার প্রমাণ আমাদেরকে দিতে হয়, এজন্যই নিরাকার ঈশ্বরের সাকার শক্তিরূপ দেব-দেবীদেরকে পূজা আমাদের করতে হয়, যেহেতু আমরা স্বল্পজ্ঞানী সাধারণ মানুষ; কিন্তু যখন আমাদের জ্ঞানের উন্নয়ন ঘটবে, যখন আমরা বুঝতে পারবো যে এক শ্রীকৃষ্ণই সব, তখন সবধরণের মূর্তি পূজা ছেড়ে শুধু শ্রীকৃষ্ণে মন নিবিষ্ট করলেই হবে, যদিও এটা সাকার উপাসনা ই এবং ঈশ্বর প্রাপ্তির তুলনামূলক সহজ পথ এটা। কিন্তু যদি কেউ এর চেয়েও কঠিন পথে নিরাকার ঈশ্বরের সাধনা করতে চায়, সেটাও সে করতে পারে, কিন্তু তার ফল হবে একই, যেকারণে- গীতার ১২/৩,৪ এ বলা হয়েছে,

"কিন্তু যাঁহারা সর্বত্র সমবুদ্ধি সম্পন্ন, সর্বপ্রাণীর মঙ্গলপরায়ণ হইয়া, ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয় হইতে সংযত করিযা, যাঁহারা- অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব, অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহারাও আমাকে প্রাপ্ত হন।"

নিরাকার ব্রহ্মের কঠিন সাধনা করে যদি শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণকেই প্রাপ্ত হয়, তাহলে নিরাকার ব্রহ্মের এই কঠিন সাধনার দরকার কী, গীতার মতে- শ্রীকৃষ্ণের সাকার সাধনাতেই আমি তো তাকে লাভ করতে পারছি ?

নিরাকার ঈশ্বরের সাকার রূপ দেব-দেবীর কল্পনা কেনো করা হয়েছে এবং তাদের পূজা আমাদেরকে কেনো করতে হয়, আশা করছি- উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমার পাঠক বন্ধুদেরকে তা বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 17 September 2020

বিশ্বকর্মার বাহন হাতি কেনো ?


বিশ্বকর্মার বাহন হাতি কেনো ? 

এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্বকর্মা পূজার মূল তত্ত্ব ও এই পূজা করার তাগিদ।

শিল্পী ও নির্মাতাদের দেবতা হলেন বিশ্বকর্মা, এজন্য বিশ্বকর্মাকে বলা হয় দেব শিল্পী, তিনি দেবতাদের প্রয়োজনীয় সকল অস্ত্রপাতি এবং যানবাহনও তৈরি করে দেন। বিশ্বকর্মার চার হাত, তিনি হাতির পিঠে বসে থাকেন, তার চার হাতের এক একটিতে থাকে- দাঁড়িপাল্লা, হাতুরি, ছেনী এবং কুঠার; এগুলোর তত্ত্ব জানলেই উপলব্ধি করা যাবে, বিশ্বকর্মার পূজা কী ও কেনো ?

ব্যবসায়ীরা যেমন বেশী করে গণেশ পূজা, তেমনি কারিগররা করে বিশ্বকর্মার পূজা, এর কারণ কী ?

দেব বিশ্বকর্মা হলেন নির্মান শিল্পী বা্ নির্মাতা, তাই যারা নির্মান পেশায় বা কারিগরী কাজে জড়িত, তারা এই দেবতার আশীষ কামনায় এনার পূজা করে থাকে, যাতে তারা তাদের পেশায় আরো দক্ষতা লাভ করতে পারে। নির্মাতা বা কারিগরদের যন্ত্রপাতির প্রতীক হলো হাতুড়ি, ছেনী ও কুঠার, তাই এগুলো হাতে ধরে থাকেন দেব বিশ্বকর্মা। কিন্তু তার হাতে দাঁড়িপাল্লা কেনো, দাঁড়ি পাল্লা তো ব্যবসায়ীদের প্রতীক ? 

যারা কোনো কিছু নির্মান করে বা বানায়, তারা তা বিক্রির জন্যই বানায়, এই হিসেবে নির্মাতাদেরও প্রধান উদ্দেশ্য ব্যবসা ই, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকর্মার হাতে দাঁড়িপাল্লা থাকতেই পারে, কিন্তু এর অন্য একটি ব্যাখ্যাও আছে।

দাঁড়িপাল্লা হলো ব্যালান্স বা ভারসাম্য বা সমতার প্রতীক। দাঁড়িপাল্লার দুই দিকে থাকে দুটো পাল্লা এবং এর পাল্লাকে ধারণকারী দণ্ডের মাঝখানে সমতাসূচক একটি কাঁটা থাকে, এই কাঁটা যখন ভূমির সাথে ৯০ ডিগ্রী কোন করে থাকে তখন পাল্লা দুটির সমতাকে নির্দেশ করে। 

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা হলেন জ্ঞান ও কর্মের সমতার প্রতীক, সবাই জানেন যে, জ্ঞান ছাড়া কোনো কর্ম করা যায় না বা কোনো কিছু নির্মান করা যায় না; বিশ্বকর্মার হাতের দাঁড়িপাল্লার দুটো পাল্লা এটা নির্দেশ করে যে, তার এক পাল্লায় রয়েছে জ্ঞান এবং অন্য পাল্লায় রয়েছে কর্ম এবং তাতে জ্ঞান ও কর্মের একটা ব্যালান্সও রয়েছে। যে ব্যক্তির জীবনে এই জ্ঞান ও কর্মের ব্যালান্স রয়েছে, তার জীবনে উন্নতি হতে বাধ্য। কেউ যদি জ্ঞান অর্জন করে বসে থাকে অর্থাৎ জ্ঞানকে কাজে না লাগায় তার জীবনে যেমন উন্নতি হবে না, তেমনি যার জ্ঞান নেই, সেও কোনো কর্ম করতে পারবে না, এটা যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনি এটাও চিরসত্য যে, যে ব্যক্তি কোনো একটি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন না ক'রে একাধিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যায়, পরিশেষে সে আসলে সে কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারে না বা তার জ্ঞানকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, এজন্যই প্রবাদ বাক্যের সৃ্ষ্টি হয়েছে- Jack of all trades, masater of none, এর মানে হচ্ছে যে ব্যক্তি সকল কাজ করতে চায় বা যায়, সে আসলে কোনো কাজই ঠিক মতো করতে পারে না; এটা ঘটে জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যের অভাবে। যে জ্ঞান অর্জন করা হবে, সেটাকেই ঠিকমতো কাজে লাগাতে হবে, এটাই হলো জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্য, এই ভারসাম্যের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো- অর্জিত জ্ঞানকে যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে যদি আরও জ্ঞান অর্জনের জন্য জ্ঞানের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কর্মকে অবহেলা করা হবে, পরিণামে আসবে দুঃখ, অভাব; আবার কর্মের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়লে আসবে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ । তাই জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যহীনতা মানেই কোনো না কোনো সমস্যা। এই ভারসাম্যকে বজায় রাখার প্রতীকই হলো বিশ্বকর্মার হাতের দাঁড়িপাল্লা।

এবার নজর দিই বিশ্বকর্মার বাহন হাতির দিকে।

আমি আমার অনেক লেখায় আগেই বলেছি, দেব-দেবীরদের বাহন বলে কিছু হয় না; কারণ, দেব-দেবীরা এমনিতেই সুপার পাওয়ারের অধিকারী, এখানে সেখানে যাওয়ার জন্য তাদেরকে কারো উপর নির্ভর করতে হয় না। তাই দেব-দেবীদের বাহন বলে যাদেরকে আমরা মনে করি, সেগুলো আসলে বহন করে বিশেষ কিছু তথ্য, যা জানলে ও সেই মতো কাজ করলে মানুষের মঙ্গল বা কল্যান নিশ্চিত।

হাতি হচ্ছে স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, শক্তিশালী এবং মানুষ ছাড়া অন্যানী প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিমানও বটে। মানব সমাজে- নির্মাতা বা কারিগররাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণী, যাদের কাছে অন্য সকল শ্রেণীর মানুষ আসতে বা প্রতীকি অর্থে নত হতে বাধ্য। আপনার পোষাক প্রয়োজন, আপনি দর্জির কাছে যেতে বাধ্য; আপনার ছুরি-বটি-দা প্রয়োজন, আপনি কামারের কাছে যেতে বাধ্য; আপনি বাড়ি বানাবেন, আপনি স্থাপত্য ইঞ্জিনিয়ার এবং রাজমিস্ত্রী, রং মিস্ত্রি, ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাছে যেতে বাধ্য; আপনি ঘরের আসবাপত্র বানাবেন, আপনি সুতার বা কাঠমিস্ত্রির কাছে যেতে বাধ্য; আপনি গহনা বানাবেন, আপনি জুয়েলার বা সোনারের কাছে যেতে বাধ্য: আপনি সাইকেল, মোটর সাইকেল বা গাড়ি কিনবেন, আপনি এসবের নির্মাতা কোম্পানির কাছে যেতে বাধ্য; এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনি কারিগর বা নির্মাতাদের কাছে জিম্মি। জীবনকে সহজ ও সুন্দর করতে হলে তাদের কাছে আপনাকে যেতেই হবে, এভাবে নির্মাতা বা কারিগর শ্রেণী হলো মনুষ্য সমাজে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণী, যাদের জ্ঞান ও কর্মের কাছে আপনি মাথা নত করতে বাধ্য। মানব সমাজের এই শক্তিশালী শ্রেণীর প্রতীক হলো বিশ্বকর্মার সাথে থাকা হাতি, যে স্থলচরদের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী।

বিশ্বকর্মার থাকে চার হাত, এই চার হাত এই তথ্যও দেয় যে- শিল্পী, নির্মাতা বা কারিগড়রা, সাধারণ মানুষের মতো নয়, তারা বিশেষ শ্রেণীর এবং বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ, কেননা হাত হচ্ছে শক্তির প্রতীক, যার যত হাত তার তত বেশি শক্তি, এই সূত্রেই সর্বশক্তির প্রতীক হিসেবে দুর্গার দশ হাত।

প্রতিবছর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিন বিশ্বকর্মার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। 

পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী বিশ্বাস করা হয় যে- বিশ্বকর্মা, স্বর্গ, লঙ্কা নগরী, দ্বারকা নগরী এবং ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মান করেছেন। এছাড়াও বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর বিমান বা পুষ্পক রথ যা পরে রাবন ছিনাতাই করে, তা, ইন্দ্রের বজ্র এবং পুরীর প্রসিদ্ধ জগন্নাথ মূর্তিও বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেছেন। 

ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৮১ ও ৮২ নং সূক্তে বিশ্বকর্মা সম্পর্কে বলা আছে।

বিশ্বকর্মার পূজার মন্ত্র হলো-

"দেবশিল্পিন্ মহাভাগ দেবানাং কার্যসাধক।

বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টফলপ্রদ॥"

এবং বিশ্বকর্মার ধ্যান ও প্রণাম মন্ত্র হলো-

ওঁ দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।

বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।। 

ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।

বিশ্বকর্মার মানস সন্তান- শিল্পী, কারিগর ও নির্মাতারা- বিশ্বকর্মার পূজা করে, বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে, সমাজ সংসার ও সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে আরো ভূমিকা রাখুক, এই কামনায় বলছি-

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় হোক বিশ্বকর্মা এবং তার মানস সন্তানদের।

জয় হিন্দ।

Friday, 11 September 2020

শিবের গাঁজা খাওয়া : প্রকৃত ব্যাপারটা কী ?


শিবের গাঁজা খাওয়া : প্রকৃত ব্যাপারটা কী ?

অনেক মুসলমানই শিবকে নিয়ে এই ভাবে কটুক্তি করে যে, শিব গাঁজা খায়, আর গাঁজাখোর শিবকে হিন্দুরা পূজা করে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

যারা এই ভাবে কটূক্তি করে, তারা জানে না শিবের আসল পরিচয় এবং তারা এটাও জানে না যে, গাঁজা আসলে কোনো মাদকদ্রব্য নয়। এই দুটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হবে, আজকের এই পোস্টে।

প্রথমেই বলি শিব কে ?

হিন্দুশাস্ত্র মতে, সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর হলো পরমব্রহ্ম, যাকে শুধু ব্রহ্মও বলা হয়। পরমাত্মারূপে এই ব্রহ্ম সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত, এই জন্যই হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, 

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

এর অর্থ হলো- সকলের মধ্যে ব্রহ্ম বিদ্যমান। - (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৩/১৪/১, বেদান্ত দর্শন)

পরমব্রহ্ম, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, এই তিনটি রূপে তার কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তার নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তার নাম বিষ্ণু; যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তার নাম শিব বা মহেশ্বর। কিন্তু আমরা স্থূল দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে বিভক্ত করে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরে এই তিনভাগে বিভক্ত করেছি এবং এই তিনটি সত্ত্বাকে আলাদা আলাদা তিনটি রূপ দান করেছি। প্রকৃতপক্ষে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, এগুলো জাস্ট তিনটি নাম এবং এই তিনটি নাম পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের নাম মাত্র।

ব্রহ্ম এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ব্যাপারটা সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রীর হাতে তিনটি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে; তো যখন প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী যে মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করেন বা ফাইলে সই করেন, তখন তিনি কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী। ব্রহ্মও ঠিক সেরূপ, তিনি যখন যে কাজ করেন, তখন সেই রূপের নামে কাজটি করেন, সেই তিনটি নামই হলো- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।

এই ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার করার জন্য বলছি, অনেকে বা সকলেই জানেন যে, বিষ্ণু হলো পালন কর্তা। তাহলে বিষ্ণুর অবতারদের তো যুদ্ধ, ধ্বংস, বিনাশ এই সব করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিষ্ণুর আংশিক অবতার রাম কি যুদ্ধ করে রাবনের বংশকে বিনাশ করে নি ? বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ কি নিজে কংস, শিশুপাল, নরকাসুরকে হত্যা করে নি ? কৃষ্ণ কি ভীমের মাধ্যমে জরাসন্ধ, দুর্যোধনকে হত্যা করায় নি ? কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের মাধ্যমে কুরুবংশকে ধ্বংস করে নি ? বিষ্ণু যদি কোনো আলাদা সত্ত্বা হতো আর তার কাজ শুধু যদি পালন করা হতো, তাহলে কি সে এই যুদ্ধ, বিনাশগুলো করতো ? আসলে এগুলো করিয়েছেন ব্রহ্ম, আমাদের শাস্ত্রকাররা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। না হলে পৃথিবীতে এত বিষ্ণুর অবতার, সেই তুলনায় ব্রহ্মা ও শিবের কোনো অবতার নেই কেনো ? আসলে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর তো আলাদা কেউ নয়। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তারই নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তারই নাম বিষ্ণু এবং যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তারই নাম শিব বা মহেশ্বর; যে কথা বলা আছে গীতার এই শ্লোকে-

“অবিভক্তংচ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্।

ভূতভর্তৃ চ তজজ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।”

অর্থ- পরমেশ্বরকে যদি যদিও সমস্ত ভূতে বিভক্তরূপে বোধ হয়, কিন্তু তিনি অবিভক্ত। যদিও তিনি সর্বভূতের পালক, তবু তাঁকে সংহার কর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলে জানবে।

এতক্ষণে পাঠক-পাঠিকাদেরকে নিশ্চয় এটা বোঝাতেপেরেছি যে, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা আলাদা কেউ নয়, তারা একই ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ। 

একটু আগেই বলেছি, আমাদের শাস্ত্রকাররা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র।

তার মানে আমাদের মুনি ঋষিরা- বিশ্বের সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের থিয়োরিকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রকৃতি রূপ ঈশ্বর বা ব্রহ্মকে সর্বশক্তিমান হিসেবে ধরে নিয়ে, তার প্রধান তিনটি রূপ- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এবং তার পরবর্তী অন্যান্য দেব-দেবীগুলোকে কল্পনা করে নিয়েছেন মাত্র। এই বহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এবং অন্যান্য দেব-দেবী কোনো দিনই বাস্তব পৃথিবীতে ছিলো না, তাই তাদেরকে নিয়ে যেসব পৌরাণিক গল্প, তা কোনো দিন পৃথিবীতে ঘটে নি; আমাদের শাস্ত্রকাররা, বিভিন্ন দেব-দেবীকে নিয়ে যেসব গল্প লিখেছে, তার মূল কারণ সেই সব গল্পের মাধ্যমে লোকশিক্ষা দেওয়া।

তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, দেব-দেবীরা যদি বাস্তব পৃথিবীতে কখনো না এসে থাকে, তাহলে তাদের কি কোনো শক্তি নেই ? অবশ্যই আছে। কোনো অঙ্কের সমাধানের জন্য আমরা যেমন এক্স ওয়াই জেড ধরে নিই, যদিও সেই অঙ্কের মধ্যে এক্স ওয়াই জেড নাই, কিন্তু অঙ্কের সমাধানের পর আমরা কিন্তু এক্স ওয়াই জেড এর একটি মান ঠিকই পাই, যেটা ঐ অঙ্কের ক্ষেত্রে এক্স, ওয়াই, জেড এর মান বা শক্তি। তেমনি বিশ্বের সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের মহাজটিল অঙ্কের সমাধানের জন্য আমাদের মহাগণিতবিদ মুনি-ঋষিরা, এক্স-ওয়াই-জেড রূপ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাদের যে মান বা শক্তি পেয়েছেন, তাহলো- ব্রহ্মা= সৃষ্টি, বিষ্ণু= পালন, শিব= ধ্বংস এবং এরকম আরো ইত্যাদি ইত্যাদি।

দেব-দেবীরা যে কাল্পনিক, এই কথা মেনে নিতে যদি কারো মনে এখনও দ্বিধা থাকে বা কষ্ট হয়, তাদের জন্য আরও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের মুনি ঋষিরা পৃথিবীর প্রত্যেকটি শক্তিসত্তাকে কোনো না কোনো দেবতা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। যেমন- বাতাসের যে শক্তি, সেটা একজন দেবতা, নাম পবনদেব। জলের শক্তি বরুনদেব। আগুনের শক্তি অগ্নিদেব। মাটির যে শক্তি, সেও একজন দেবী, মাতা বসুন্ধরা। এই ভাবে প্রকৃতির সব শক্তিই হিন্দুদের কোনো না কোনো দেব-দেবীরূপে পূজিত। শুধু তাই নয়, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিশালী প্রাণীও হিন্দু দেব-দেবীদের সহযোগীশক্তি, যেমন- সিংহ, হাতি, ময়ূর, ইঁদুর, হুনুমান ইত্যাদি। প্রকৃতির যে সকল শক্তির মাধ্যমে আমরা টিকে থাকি, সেই সকল অদৃশ্য ও দৃশ্যমান শক্তি, এই ভাবে হিন্দু শাস্ত্রে পূজিত বা শ্রদ্ধার পাত্র।

প্রকৃতিতে প্রভাব বিস্তার করা- আগুন, জল, বায়ুর মতো শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে অন্যান্য যে শক্তি বা দেব-দেবীর কথা হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়, সেগুলো যে আমাদের মুনি-ঋষিদের ধরে বা কল্পনা করে নেওয়া, আশা করছি- সেই বিষয়টি এখন পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। এর সাথে আরো একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, পৃথিবীতে যার জন্ম হয় নি, তার দুটি জিনিসের কখনো প্রয়োজন হবে না, সে দুটি জিনিস হলো খাদ্য ও যৌনতা। অবতারগণ পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, তাই তাদের খাদ্যের ও যৌনতার প্রয়োজন ছিলো। এই জন্যই রাম, কৃষ্ণ- খাবার খেয়েছেন এবং বিয়ে করেছেন এবং তাদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যে শিবের কখনো পৃথিবীতে জন্মই হয় নি, তার খাবারের প্রয়োজন হবে কেনো ? 

দেব-দেবীরা কাল্পনিক, এই কথা মেনে নিতে যাদের এখনও অসুবিধা হচ্ছে, তাদের জন্য বলছি- পরশুরাম, রাম, বলরাম, কৃষ্ণ, এরা পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, তাই এদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, গণেশ- এদের কি কখনো মৃত্যু হয়েছে ? এদের মৃত্যু সম্পর্কে কি আপনি কিছু জানেন বা বলতে পারবেন ? পারবেন না। কারণ, আগেই বলেছি, যারা পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি, তাদের যেমন খাদ্যের ও যৌনতার প্রয়োজন হবে না, তেমনি তাদের কখনো মৃত্যুও হবে না। অবতারগন ছাড়া কোনো দেব-দেবীর মৃত্যুর কোনো ইতিহাস বা ঘটনা নেই, এই ঘটনা ই প্রমান করে যে, পৃথিবীতে তারা কখনো এবং কোনোদিনই ছিলেন না।

এবার নিশ্চয় প্রমাণিত যে, শিব পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি; তাহলে যে পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি, তার কোনো খাদ্যের প্রয়োজন হবে না, যেটা আগে বলেছি। তাহলে শিবের গাঁজা খাওয়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে ?

শিব যে কখনো গাঁজা খায় নি বা শিবের যে গাঁজা খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সেই বিষয়টি নিশ্চয় এতক্ষণে পাঠকেদর কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তাহলে এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে- শিবের নামে এই অপবাদের উৎপত্তি আসলে হলো কিভাবে ?

আমাদের মুনি-ঋষিরা ধ্যান করতেন। ধ্যান আসলে গবেষণা। হিন্দিতে ধ্যান শব্দের অর্থ মনোযোগ। তার মানে কোনো কিছুর প্রতি মন নিবিষ্ট করাই হলো ধ্যান। আর যেখানে মন নিবিষ্ট হয়, সেখানেই কোনো নতুন কিছুর উদ্ভব বা আবিষ্কার হয়। এই ধ্যান বা গবেষণা করতে গিয়ে আমাদের মুনি-ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন, প্রকৃতির লক্ষ লক্ষ গাছ পালার মধ্যে রয়েছে অজস্র ভেষজ বা ঔষধি গুন। এ থেকেই তারা আবিষ্কার করেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্র, যা পৃথিবীর প্রথম চিকিৎসা জ্ঞান। এই চিকিৎসা জ্ঞান বেদের অংশ বলেই এর নাম আয়ুর্বেদ। অর্থাৎ বেদ এর যে জ্ঞান মানুষের আয়ু বাড়ায় তাই আয়ুর্বেদ। এই আয়ুর্বেদ বলছে, গাঁজার রয়েছে অসংখ্য ঔষধি গুন, যা স্বল্পমাত্রার ব্যবহারে মানুষ তার উপকার পেতে পারে।

কিন্তু গাঁজা খেলে যেহেতু একধরণের নেশা হয় এবং মানুষ এটা বার বার খেতে বাধ্য হয়, তাই আধুনিক যুগ শুরু হলে, অনেকেই এটাকে মাদক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে এবং এটা এবং এর সেবনকারীরা, সমাজে একেবারে ঘৃণিত না হলেও তারা সমালোচনার পাত্র হয়ে পড়ে। 

স্বল্প পরিমানের গাঁজা খাওয়ার যে বিজ্ঞানভিত্তিক কী উপকারিতা, সেটা আমি একটু পরেই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো; কিন্তু গাঁজা খেলে যে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাজে বা কোনো বিষয়ে গভীর মনোযোগের সৃষ্টি হয় বা গাঁজা সেবনকারী কোনো বিষয়ে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে পারে, এটা কিন্তু বাস্তবভাবে প্রমাণিত। এজন্যই আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান বা গবেষণায় মনোযোগ বৃদ্ধির সুবিধার্থে স্বল্প পরিমান গাঁজা সেবন করতেন।

আমাদের মুনি ঋষিদের পরম্পরা হলো বর্তমানের সাধু-সন্ন্যাসী, এই পরম্পরা চলে আসছে প্রায় ৮/১০ হাজার বছর আগে থেকে; তো মুনি ঋষিরা যা করতেন, তার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে এখনও আছে। এই ভাবে সমাজ সংসার ত্যাগ করা, পাহাড় জঙ্গল শ্মশানে বিচরণকারী সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে গাঁজা সেবনের প্রচলন এখনও আছে এবং প্রাচীন বা মধ্যযুগেও ছিলো। কিন্তু মধ্যযুগের শেষ এবং আধুনিক যুগের শুরুর দিকে যখন গাঁজাকে মাদক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হলো, তখন সাধু-সন্ন্যাসীদের মতো ব্যক্তি কেনো গাঁজা খায়, এই প্রশ্নের জবাবে আমাদের সাধু-সন্ন্যাসীরা বিব্রত হলো; কারণ, এর ভেষজগুন সম্পর্কে তাদের কোনো স্পষ্ট এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা ছিলো না, কিন্তু তারা যেহেতু খায় এবং তাদেরকে যেহেতু এটা খেতে হবে, তাই আত্মপক্ষ সমর্থন ক’রে এটা সেবনের জন্য তারা বলে দেয়, আমাদের মহাদেব শিবও গাঁজা সেবন করতেন এবং শিবের বেশ ভূষা যেহেতু সাধু সন্ন্যাসীদের মতোই এবং সে সব সময় থাকে ধ্যানমগ্ন, সেহেতু শিবের সাথে গাঁজা সেবনের এই গল্প খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে যায় এবং লোকজন তা বিশ্বাস করে ফেলে।

এভাবেই সমাজে শিবের গাঁজা সেবনের গল্প ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের অন্নদামঙ্গল কাব্যের মাধ্যমে তা লোকমনে একেবারে সুপ্রতিষ্ঠিত রূপ পায়; কারণ, সেই কাব্যে বলা আছে, স্বয়ং শিবঠাকুর গাঁজা-ভাং খেয়ে কচুরিপানায় উপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে বেড়াতেন। এইসব বিবেচনা থেকেই বাংলা গান বানানো হয়েছে,

“গাঁজার নৌকা পাহাড় বাইয়া যায়।”

মূলত বন জঙ্গল পাহাড়ে বসবাসকারী ও বিচরণকারী আমাদের স্বল্পজ্ঞানী সাধু সন্ন্যাসীরা নিজেদের গাঁজা সেবনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য মহাদেব শিবের উপর এই কলঙ্ক লেপন করে এবং যেহেতু মনে করা হয় যে, সাধু সন্ন্যাসীরা শাস্ত্র পড়ে এবং তারা শাস্ত্র সম্পর্কে ভালো জানে এবং যেহেতু বেশ ভূষা ও ধ্যানমগগ্নতার দিক থেকে শিব হলো সাধু-সন্ন্যাসীদের রোল মডেল, সেহেতু জনসমাজে শিবের নামে গাঁজা খাওয়ার এই অপপ্রচার খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

যা হোক, অপপ্রচার করে যতই শিবের নামে গাঁজা খাওয়ার অপবাদ দেওয়া হোক, একটা প্রশ্নে এই থিয়োরি সম্পূর্ণ ধ্বসে পড়বে, আর তা হলো, পৃথিবী যে শিব জন্ম নেয় নি, তার খাবারের প্রয়োজন হবে কেনো ? আর যদি কেউ বলে, পৃথিবীতে শিব ছিলেন। তখন তাকে প্রশ্ন করবেন, তাহলে সেই শিব মরলেন কোথায় এবং কিভাবে ? ব্যস, দেখবেন সব চুপ।

আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান বা গবেষণায় গাঁজার উপকারিতা সম্পর্কে জেনেছিলেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন আমাদের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে; আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের সেই কথাই নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায়, এবার নজর দেওয়া যাক সেই দিকে।

গাঁজা, পুরুষের বন্ধ্যাত্বকে দূর করে:

হ্যাঁ,এমনই অবিশ্বাস্য কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গাঁজার নেশা করলে তা গিয়ে প্রভাব ফেলে ব্রেনের ক্যানাবিনয়েড রিসেপটরে, এই ক্যানাবিনয়েড রিসেপটরে গাঁজার ধোয়া যখন তা পৌঁছায় তখন তা স্পার্ম উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এইভাবে সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম পুরুষদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাঁজা ফলদায়ক। ডিটেইলস রিপোর্টি দেখত হলে ক্লিক করুন নিচের এই লিঙ্কে:

http://zeenews.india.com/bengali/lifestyle/marijuana-can-help-in-infertility_139329.html

গাঁজা খেলে ভালো থাকে চোখ :

হ্যাঁ, এরকমই কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। গাঁজা খেলে রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হয়। কারণ, গাঁজার মধ্যে রয়েছে ক্যানাবিনয়েডস, যা অল্প আলোতেও দেখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। গাঁজার উপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়েছেন কানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল গবেষক। তাদের গবেষণাতেই উঠে এসেছে এই তথ্য। তারা বলেছেন, গাঁজার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আলো শনাক্তকরণ ক্ষমতা। মারিজুয়ানা বা গাঁজা বা ক্যানাবিস-এ রয়েছে ৫০০টি প্রাকৃতিক যৌগ। এরমধ্যে কমপক্ষে ৮৫টি যৌগ মিলে তৈরি করে ক্যানাবিনয়েডস। যারমধ্যে সবচেয়ে বেশি গুণসম্পন্ন হল THC বা টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল ও CBD বা ক্যানাবিনল। বিস্তারিত রিপোর্টটি পাবেন নিচের এই লিঙ্কে :

http://zeenews.india.com/bengali/health/marijuana-can-cause-this-benefit-to-you_147425.html

গাঁজা প্রতিরোধ করে অ্যালঝেইমারস : 

বয়স হলে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার রোগ অ্যালঝাইমার এর উদাহরণ রয়েছে সারা বিশ্বে। ডায়বেটিস, ওবেসিটির মতোই বর্তমান সময়ের অন্যতম দুঃশ্চিন্তার বিষয় অ্যালঝাইমার। এই অসুখের চিকিৎসা এখনও অজানা বিশ্বের কাছে। তবে সম্প্রতি জানা গিয়েছে গাঁজার মধ্যে খুব কম পরিমানে থাকা ডেল্টা-৯- টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল বা টিএইচসি রুখে দিতে পারে অ্যালঝাইমারকে।

ইউনিভার্সিটি অফ সাইথ ফ্লোরিডার নিউরোসাইন্টিস্টরা জানাচ্ছেন বয়স্ক মস্তিষ্কের অ্যামাইলয়েড বিটার পরিমান কমিয়ে দিতে পারে গাঁজা সেবন। গবেষকরা বলেন খুব কম পরিমানে গাঁজা সেবনের ফলে ধরে রাখা যাবে স্মৃতিশক্তি। গবেষকরা এখন টিএইচসি-র মধ্যে ড্রাগ ককটেলের ব্যবহার নিয়ে গবেষনা করছেন। 

দেখুন, জার্নাল অফ অ্যালজাইমারস ডিজিসে প্রকাশিত হয়েছে গবেষনার রিপোর্ট। 

http://zeenews.india.com/bengali/lifestyle/marijuana-can-beat-aljhimers_120146.html

এছাড়াও দেখুন, গবেষকরা বলছেন পরিমাণমতো গাঁজা ওষুধ হিসেবে সেবন করলে নাকি অনেক উপকার৷ বিজ্ঞানীদের বাতলে দেওয়া এমনই নয়টি উপকার তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে !

মৃগীরোগ কমায় :

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০১৩ সালেই জানিয়েছেন, মারিজুয়ানা বা গাঁজা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিলে মৃগী বা এই ধরণের কিছু স্নায়ুরোগ থেকে দূরে থাকা যায়৷ বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী জার্নাল অফ ফার্মাকোলজি অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল থেরাপিউটিক্সে ছাপাও হয়েছে তাদের এই গবেষণালব্ধ তত্ত্ব৷

গ্লুকোমা দূরে রাখতে সহায়তা করে :

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আই ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, মারিজুয়ানা গ্লুকোমার ঝুঁকিও কমায়৷ গ্লুকোমা চোখের এমন এক রোগ যা চির অন্ধত্ব ডেকে আনে৷ এখানে মারিজুয়ানা বলতে যা বোঝানো হচ্ছে, তা গাঁজারই আমেরিকান নাম।

গাঁজা, ক্যানসারেরও ‘অ্যানসার’!

এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবেই স্বীকার করেছে৷ ২০১৫ সালে সেই দেশের ক্যানসার বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্যানসার অর্গ-এ জানানো হয়, মারিজুয়ানা অনেক ক্ষেত্রে টিউমারের ঝুঁকি কমিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধকেরও ভূমিকা পালন করে৷ 

কেমোথেরাপির ক্ষতি কম :

ইউএস এজেন্সি ফর ড্রাগ জানিয়েছে, মারিজুয়ানা ক্যানসার রোগীর রোগ যন্ত্রণা অন্যভাবেও কমায়৷ ক্যানসার রোগীকে এক পর্যায়ে কেমোথেরাপি নিতে হয়৷ কেমোথেরাপির অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া৷ মারিজুয়ানা কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত অনেক ক্ষতি লাঘব করে৷

স্ট্রোক কম হয় :

এটি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহ্যামের গবেষকদের উদ্ভাবন৷ তাঁরা গবেষণা করে দেখেছেন, মারিজুয়ানা মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতেও সহায়তা করে৷ ফলে স্ট্রোক-এর ঝুঁকি কমে৷

গাঁজা মাল্টিপল সক্লেরোসিস বিরোধী:

মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিশেষ স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হলে ‘মাল্টিপল সক্লেরোসিস’ বা এমএস নামের এক ধরণের স্নায়ুরোগ হয়৷ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মারিজুয়ানা সেবন করলে এই রোগের ঝুঁকিও কমে৷

ব্যথা নিরোধ :

ডায়াবেটিস চরম রূপ নিলে রোগীদের অনেক সময় হাত-পা এবং শরীরের নানা অংশে জ্বালা-যন্ত্রণা হয়৷ ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা বলছেন, ক্যানাবিস সেই যন্ত্রণা লাঘব করতে সক্ষম৷

হেপাটাইটিস ‘সি’-র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমায় :

হেপাটাইটিস সি-র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কমায় মারিজুয়ানা৷ নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধের মতো গাঁজা সেবন করিয়ে দেখা গিয়েছে এই রোগে আক্রান্তদের শতকরা ৮৬ ভাগেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক কমেছে।

উপরের এই প্রতিবেদনটি যে আমার বানানো নয়, তার প্রমান পাবেন নিচের এই লিঙ্কে গেলে।

http://www.chandpurweb.com/health/2016/04/21/25051

গাঁজা শরীরের বিষ-ব্যথা সারায়:

একটু আগেই অন্য একটা রিপোর্টে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছি, এখানে করছি বিস্তারিত। গাঁজার এই উপকারের কথার বর্ণনা রয়েছে ভারতবর্ষের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিকিৎসা শাস্ত্র অর্থাৎ আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বর্তমানে গাঁজা, ভাং ও মারিজুয়ানার ওপর গবেষণা করে জেনেছেন যে, এ সব দ্রব্য থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ব্যথানাশক ওষুধ প্রস্তুত করা সম্ভব, যা মানুষের কোনো ক্ষতি করবে না। গবেষণাটি করেছে ফ্রান্সের বায়োমেডিকেল ইনস্টিটিউট। এর নেতৃত্ব দিয়েছে আইএনএসইআরএম। ফ্রান্সের গবেষকরা জানান, 'তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের যে অংশের কোষের নিউরনে গাঁজা বা মারিজুয়ানা ক্রিয়া করে তা ওষুধ প্রয়োগ করে নিষ্ক্রিয় করেন প্রথম। এর পর ওই ইঁদুরের শরীরে এসব পদার্থ প্রবেশ করিয়ে দেখা গেছে যে, তাতে ইঁদুরটি বেহুশ হয় না। বরং ওটির প্রাণচাঞ্চল্য ঠিকই থাকে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ব্যথানাশক হিসেবে গাঁজা বা মারিজুয়ানার ভালো গুণ মানুষের বিভিন্ন রোগের ওষুধ এবং অস্ত্রোপচারের জন্য চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। শিগগিরই গাঁজা ও মারিজুয়ানার নির্যাস থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এ ওষুধ প্রস্তুত হবে।

গাঁজার ক্ষতি সিগারেটের চেয়ে কম :

যারা গাঁজাকে খুব নিম্নশ্রেণির নেশা বলে মনে ক’রে সিগারেট ফুঁকেন, তাদের জন্য আছে দাঁত ভাঙ্গা জবাব। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় দেখেছেন, ভাং ও গঞ্জিকা সেবনে ফুসফুসের ক্ষতি, তামাক পাতায় প্রস্তুত সিগারেটের চেয়ে কম।

এই দুটি বিষয়ের উপর করা রিপোর্ট দেখতে পারেন, নিচের এই লিঙ্কে :

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9C%E0%A6%BE

গাঁজা সেবনকারীর হাড় জোড়া লাগে খুব তাড়াতাড়ি :

সম্প্রতি ইসরায়েলের একদল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় দেখেছেন যে, গাজা সেবনকারীদের মধ্যে কারও হাড় ভেঙ্গে গেলে তা যারা গাজাসেবন করেন না তাদের চেয়ে দ্রুত জোড়া লাগে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে গবেষকদল গাজায় থাকা  নন-সাইকোঅ্যাকটিভ কমপাউন্ড ক্যানাবাইডিয়ল (সিবিডি) কিছু ইদুরের উপর পরীক্ষা করেন। গবেষকদলের গবেষক ড. ইয়াঙ্কেল গাবেত বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে সিবিডি হাড় জোড়া হতে এবং খুব দ্রুত ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলতে বেশ কার্যকরীই শুধু নয়, অন্যান্য উপাদানের চেয়ে অধিক কার্যকরী। হাড়ের নতুন টিস্যু তৈরিতে এর রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। সিবিডি’র মাধ্যমে একবার হাড় জোড়া লাগলে তা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত হয়।’ গবেষকদলের মতে, মানবশরীর প্রকৃতিগত ভাবেই এন্ডোক্যানাবাইনয়েড ব্যবস্থা চালু রাখে যা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মেরুদণ্ডের উপর কাজ করে। মানুষের মস্তিস্ক এবং শরীর ক্যানাবাইনয়েডের সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিকভাবেই সাড়া দেয়, তা সেটা আভ্যন্তরীন পর্যায়েই হোক অথবা গাজা সেবনের মাধ্যমেই হোক।

এছাড়াও এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাজা রক্তচাপ সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রন করতে এবং এইচআইভি প্রতিহত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

শুধু তাই নয় কয়েক প্রকার ক্যান্সার নিরাময়েও পর্যন্ত গাজা ভালো ফল দেয়। বিশেষ করে যারা লিওকোমিয়ায় আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিনই চিকিৎসকরা অনুমোদন সাপেক্ষে গাজা ব্যবহার করে আসছেন।

যারা ভাবছেন গাঁজার যখন এতই উপকারিত তখন এটা এখনো কেনো নিষিদ্ধ মাদক ? তাদের জন্য বলছি

ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশ ইতোমধ্যেই চিকিৎসাশাস্ত্রের খাতিরে গাজাকে বৈধতা দিয়েছে। গাজা বৈধকরণে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি রাজ্য। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কলোরাডোতে প্রথম বৈধতা দেয়া হয়েছিল। এরপর কলোরাডোতে গাজা বৈধকরণের সফলতার পর অন্যান্য রাজ্যগুলোও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এর বাইরে নতুন করে চিলি তাদের দেশ গাজাকে শুধু বৈধতাই দেয়নি, প্রতিটি নাগরিক সর্বোচ্চ পাঁচটি গাজা গাছ লাগাতে পারবে সেই অনুমোদনও দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কানাডা, স্পেন, হল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া মারিজুয়ানাকে ঔষধ হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। নিচে উইকিপিডিয়ার একটি লিঙ্ক দিয়েছি, সেখানে দেখতে পাবেন এই তথ্যটি।

যা হোক, প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন মিথ বা সাহিত্যে গাজার ব্যবহার দেখা যায়। কোথাও নেশাদ্রব্য হিসেবে গাজার ব্যবহার দেখা যায়নি। এর ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শাস্ত্রবিদেরা এবং অন্যান্য গবেষকরা দাবি করছেন যে, গাজার ক্ষতি নেই বরংচ রয়েছে শারিরীক লাভ। মানব শরীরের বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণে গাজা মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু ভারতের সেকুলার সরকার, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের এই জ্ঞানকে পাত্তা না দিয়ে কেমিক্যালজাত মাদকের সাথে সাথে গাজাকেও মাদকের পর্যায়ভূক্ত করে এবং ১৯৮৫ সালে আইন করে গাজাকে অবৈধ ঘোষণা করে।

এই রিপোর্টটি সত্য কিনা, তা যাচাই করতে চাইলে দেখুন লিঙ্কটি।

http://www.24updatenews.com/bangla/article/17620/index.html

উপরে বলেছি, আমাদের মুনি-ঋষিরা গাঁজা সেবন করতেন, এটা শুনে যাদের কষ্ট হয়েছে বা মেনে নিতে পারেন নি, তাদের জন্য উইকিপিডিয়া বলছে,

“হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতে হিন্দু ও শিখদের মাঝে এবং নেপালে কান্নাবিস গ্রহণের রেওয়াজ ছিল।এই বনজ উদ্ভিদের নাম ছিল সংস্কৃত ভাষায় গঞ্জিকা বা গাঁজা।” 

এটা যে শুধু হিন্দু মুনি-ঋষিরাই খেতো, তাই নয়, প্রাচীন কালের ইহুদি খ্রিষ্টানরা সেবন করতো এমন কি সেবন করতো, মামলুক আমলের মুসলিম সুফীরাও। দেখুন, উইকিতে কিভাবে বলা আছে এই কথা- 

“কান্নাবিসকে প্রাচীন ইহুদি ও ক্রিস্টানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করত। মামলুক সময়ে বিভিন্ন সূফী সম্প্রদায়রা কান্নাবিস গ্রহণ করত।”

উইকির এই লিঙ্কটি দেখতে পারেন নিচে-

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE

তাস খেলা একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও মজাদার খেলা, কিন্তু এই খেলার সাথে যখন টাকা যুক্ত হলো অর্থাৎ তাস খেলা যখন জুয়ায় পরিণত হলো, তখন সমাজ তাকে খারাপভাবে দেখতে শুরু করলো এবং যারা তাস খেলে, তারা সমালোচনার পাত্র হয়ে পড়লো। শুধু এই ভয়েই অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাস খেলে না। এটা কিন্তু তাসের দোষ নয়, দোষ মানুষের; যারা তাসকে ঐ খারাপভাবে ব্যবহার করা শুরু করেছিলো।

একইভাবে উপকারী গাঁজাকে যারা নেশার দ্রব্যে পরিণত ক’রে একে সমালোচিত করেছে, দোষ সেইসব মানুষদের, কোনোভাবেই গাঁজার নয়।

অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ, এমনকি যদি অতিরিক্ত ভাত বা জল খাওয়া হয়, সেটাও খারাপ। তাহলে আপনি অতিরিক্ত গাঁজা খাবেন কেনো ? আপনার প্রয়োজনে এবং কার্য সিদ্ধির জন্য যতটুকু খাওয়া প্রয়োজন তাই খাবেন।

আগুন খুব উপকারী, যতক্ষণ সেটা নিয়ন্ত্রণে থাকে; আর যেই সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তখনই সেটা হয়ে উঠে বিধ্বংসী। তাই বলে কি আমরা আগুনকে ব্যবহার করছিনা ? না, আগুনের ব্যবহার ছেড়ে দিয়ে আমরা আদিম যুগে ফিরে গিয়েছি বা যাবো ? একইভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে অবশ্যই গাঁজা ক্ষতিকর। যদি আমরা এর থেকে উপকার চাই, তাহলে অবশ্যই এটাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে ব্যবহার করতে হবে।

শেষে একটা কথা না বললেই নয়, গাঁজার উপকারিতা নিয়ে পোস্ট লিখলাম বলে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমি কাউকে গাঁজা খেতে উৎসাহিত করছি। শিব সম্পর্কে মুসলমানদের কটূক্তির জবাব দিতে গিয়ে, আমি শুধু প্রকৃত সত্যটাকে জানালাম, এখন এটাকে কে কিভাবে ব্যবহার করবে, সেটা তার বা তাদের ব্যাপার।

জয় হিন্দ।

Monday, 17 August 2020

মনসা পূজায় 'বলি' প্রদান- অশাস্ত্রীয় এবং নিরর্থক :


মনসা পূজায় 'বলি' প্রদান- অশাস্ত্রীয় এবং নিরর্থক :

হিন্দু সমাজে তিন ধরণের দেব দেবী আছে- বৈদিক, পৌরাণিক এবং লৌকিক। যে দেব-দেবীর উল্লেখ বেদে আছে, তাঁরা বৈদিক; যাঁদের উল্লেখ শুধু পুরাণে আছে, তাঁরা পৌরাণিক এবং যাদের উল্লেখ বেদে বা পুরাণে নেই, কিন্তু দেব-দেবী হিসেবে লোকসমাজের পূজিত, তাদেরকে বলে লৌকিক দেব-দেবী। লৌকিক দেব-দেবীদের মধ্যে প্রধান হলেন- মনসা।

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ(১২০০-১৮০০)এর শুরুর দিকে মঙ্গলকাব্য নামে এক ধরণের কাব্য রচিত হয়েছিলো, এগুলো পড়লে বা শুনলে মানুষের মঙ্গল হয়, এই বিশ্বাস থেকেই এগুলোর নামকরণ হয়েছিলো মঙ্গলকাব্য। এই মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যে একটি হলো মনসামঙ্গল, এ সম্পর্কে উইকিপিডিয়া বলছে-

"বিশিষ্ট মঙ্গলকাব্য বিশারদ আশুতোষ ভট্টাচার্য মনসামঙ্গল কাব্যের আখ্যানভাগটিকে “রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ-নিরপেক্ষ একটি স্বাধীন লৌকিক কাহিনী” বলে বর্ণনা করেছেন। খ্রিষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় মনসার মূর্তিনির্মাণ শুরু হয়। মনসামঙ্গল কাব্যের মূল লৌকিক কাহিনিটি তারও আগে থেকে পল্লিগীতি ও ছড়ার আকারে বাংলার লোকসমাজে প্রচলিত ছিল বলে অনুমান করা হয়। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে এই লোককথাটি শক্তিশালী কবিদের নিপুণ হাতে পড়ে কাব্যকৃতির রূপ নেয়। ক্রমে তার মধ্যে নানা উপকাহিনি ও পৌরাণিক উপাখ্যানের সমাবেশ ঘটে।"

মনসামঙ্গলের কাহিনী নিয়ে মধ্যযুগে পাঁচজন কবি কাব্য রচনা করেন, এরা হলেন-

1. কানাহরি দত্ত

2. বিপ্রদাস পিপলাই

3. বিজয়গুপ্ত

4. নারায়ণদেব

5. কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ

এদের মধ্যে মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি হরিদত্ত এবং এই কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন বিজয়গুপ্ত ।

এই তথ্যগুলো থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, শুরু থেকেই বেদ বা পুরাণের সাথে মনসার কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কবিদের হাতে কাহিনীর ডালপালা মেলতে মেলতে মনসা, পুরাণের সাথে যুক্ত হয়ে শিবের কন্যাতে পরিণত হয়েছে; মঙ্গলকাব্য বিশারদ আশুতোষ ভট্টাচার্য যে কথাটি বলেছেন, এভাবে- 

"খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে এই লোককথাটি শক্তিশালী কবিদের নিপুণ হাতে পড়ে কাব্যকৃতির রূপ নেয়। ক্রমে তার মধ্যে নানা উপকাহিনি ও পৌরাণিক উপাখ্যানের সমাবেশ ঘটে।"

এবার আসি আলোচনার মূল বিষয় মনসা পূজায় বলি প্রসঙ্গে।

ঋগ্বেদ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বলি প্রদানের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে, তাই আমি বলি প্রথার বিরুদ্ধে নই। কারণ, এর সামাজিক উপযোগিতা রয়েছে। দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে বলি প্রদানের মূল উদ্দেশ্যে হলো মানুষের ক্ষাত্র শক্তিকে জাগ্রত করে তাকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করা, এখানে মানবিকতার চেয়ে আত্মরক্ষার বিষয়টি বড়; যেহেতু নিজে না বাঁচলে আপনার নিজের মানবধিকারই তুচ্ছ হয়ে যাবে; কারণ বিচারে হত্যাকারীর ফাঁসি হলে তাতে পূর্বেই হত্যাকারীর হাতে নিহত ব্যক্তির কোনো লাভ হয় না। তাই আগে বেঁচে থাকতে হবে, টিকে থাকতে হবে, তারপর অন্যান্য বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। পৃথিবীতে অসুররূপী মুসলমানদের থেকে এই বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্যই পশুবলির ন্যায় প্রথার চর্চা করে কালীর ন্যায় হিংস্র রূপ ধারণ করার ক্ষমতা প্রতিটি হিন্দুর থাকতে হবে এবং এজন্যই বলি প্রথা চালু রাখা প্রয়োজন, কিন্তু এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে- যার বলি তাকেই দিতে হবে, একজনের মানত করা বলি অন্যকে দিলে হবে না, এতে পশুবলি প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

ঋগ্বেদ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীশ্রীচণ্ডীতে যাদের উদ্দেশ্যে বলি প্রদানের নির্দেশ আছে, তারা হলেন বৈদিক বা পৌরাণিক দেব-দেবী, এদের পূজা করলে যে স্বয়ং শ্রীকৃ্ষ্ণেরই পূজা করা হয়, যেটা গীতায় বলা আছে(৯/২৩)। তাই ঐসব দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দিলে, বলি প্রদত্ত পশুদের আত্মার উন্নয়ন ঘটে, পরের জন্মে তারা আরো উন্নত প্রাণী, এমনকি মানুষ হিসেবেও জন্ম নিতে পারে, ফলে দেবতাদের উদ্দেশ্যে কোনো পশুকে বলি দিলে ঐ পশুদের আত্মাকে সাহায্য করা হয় বিভিন্ন পশু জীবনের স্তর দ্রুত পার হয়ে মানুষ রূপে জন্ম নিয়ে মোক্ষে পৌঁছার জন্য। এজন্য বলি প্রথা খারাপ কিছু নয়, কিন্তু মনসা পূজার 'বলি' ?

আগেই বলেছি মনসা কোনো বৈদিক বা পৌরাণিক দেবী নয়, মনসা মানুষের ভয় থেকে সৃষ্ট লৌকিক দেবী, তাই মনসার সাথে সনাতন ধর্মের প্রকৃত দেব-দেবীদের কোনো সম্পর্ক নেই, মনসাকে যে শিব পার্বতীর কন্যা বলা হয় বা কোনো উপাখ্যানে ঋষি কাশ্যপের মানসী কন্যা বলা হয়, এটা কবিদের কল্পনার ডালপালা মেলার ফল। তাই মনসার উদ্দেশ্যে বলি দিলে সেই পশুর আত্মার কোনো উন্নয়ন ঘটবে না, সেটা করা হবে ঐ পশুর সাথে নৃশংসতা।

ফটোপোস্টে দেখুন, 'বাইশকবি পদ্মাপুরাণ' নামের একটি কাব্যে মনসার পূজায় বলির কিছু নিদর্শন আছে। কিন্তু এই কাব্যটি তো কোনো মুনি ঋষিদের দ্বারা রচিত নয়, এর রচয়িতা আপনার আমার মতোই সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই লিখতে পারে বা বলতে পারে, কিন্তু সেটাকে যদি শাস্ত্রগ্রন্থ ধরে নিয়ে ধর্মীয় আচরণ করা হয়, সেটা ধর্ম হবে না, হবে-অধর্ম। 

শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের একটি হাতে একটি সাপ আছে, অনেকে এটাকে মনসার দেবী হিসেবে স্বীকৃতি বলে ধরে নিতে পারেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ গীতার ১০/২৮ নং শ্লোকে বলেছেন- সর্পদের মধ্যে আমি বাসুকী, সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপে প্রদর্শিত সাপ যে মনসা নয়, সেটা প্রমাণিত।

মনসার যে কাহিনী, সেখানেও বলি গ্রহণের প্রতি তার কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। মনসার একমাত্র উদ্দেশ্যে ছিলো, পৃথিবীতে যেভাবেই হোক, তার পূজা প্রচলিত হোক। এজন্য সে সওদাগর চাঁদকে টার্গেট করে এবং একের পর এক ক্ষতিসাধন করে শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে পূজা আদায় করে, এই পূজায় চাঁদ সওদাগর অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্য দিকে তাকিয়ে বাম হাতে শুধু একটি ফুল মনসার প্রতিমার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলো, মনসা তাতেই খুশী ছিলো, চাঁদ সওদাগরের সেই পূজা, যার মাধ্যমে মনসার পূজা প্রচলন হয়েছে, সেখানে বলির কোনো ব্যবস্থা বা ইঙ্গিত ছিলো না।

এই সব দিক বিচারে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মনসার পূজায় 'বলি' সম্পূর্ণ অশাস্ত্রীয় এবং নিরর্থক।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Tuesday, 2 June 2020

দেব-দেবীর পূজা করে মুক্তি পাওয়া সম্ভব কি না ?


দেব-দেবীর পূজা করে মুক্তি পাওয়া সম্ভব কি না ?

পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ গীতার ৭ম অধ্যায়ের ২১ ও ২২ নং শ্লোকে বলেছেন-

"যে যে ভক্ত ভক্তিযুক্ত হইয়া যে যে দেবমূর্তি অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি সেই সকল ভক্তের সেই সেই দেবমূর্তিতে অচলা ভক্তি সৃষ্টি করিয়া দিই। সেই ভক্তি নিয়া সে সেই দেবমূর্তির অর্চনা করিয়া থাকে এবং সেই দেবতার নিকট হইতে যে কাম্যবস্তু লাভ করিয়া থাকে, প্রকৃতপক্ষে আমিই সেই কামনা পূর্ণ করিয়া থাকি, কেননা সেই সকল দেবতা আমারই অঙ্গস্বরূপ।"

গীতার এই দুইটি শ্লোক হতে একথা স্পষ্ট যে- সকল দেবতা, শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গস্বরূপ অর্থাৎ অধীনস্থ এবং দেবতারা তাদের ভক্তদের জন্য যা করে, তা শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি এবং অনুগ্রহ বলেই করে। যেকোনো নদীর জল যেমন এক সমুদ্রেই যায়, তেমনি সকল দেব-দেবীর পূজা ঘুরপথে হলেও শ্রীকৃষ্ণের কাছেই যায় বা যাবে, কিন্তু এই মনোভাব নিয়ে সেই সকল দেব-দেবীর পূজা করতে হবে যে এই সকল দেব-দেবীর মাধ্যমে আমি আসলে শ্রীকৃ্ষ্ণেরই পূজা করছি। সকল দেব-দেবীর উৎস শ্রীকৃষ্ণ এবং দেব-দেবীদের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণেরই পূজা করা হয়, যদি এই মনোভাব নিয়ে দেব-দেবীর পূজা করা হয়, তাহলে দেব-দেবীর পূজা করে মুক্তি পাওয়া গেলেও যেতে পারে; কিন্তু মুক্তি বা মোক্ষলাভের এটি প্রত্যক্ষ পথ নয়, পরোক্ষ পথ।

কোনো মানুষ যখন এটা উপলব্ধি করতে পারে যে- শ্রীকৃষ্ণই সব, তখন তিনি সবকিছুকে ছেড়ে, গাছের পরিচর্যার জন্য গাছের মূলে সার জল দেবার জন্য গাছের গোড়ায় জল ঢালার মতো এক শ্রীকৃষ্ণেরই আরাধনা করেন এবং এইভাবে তিনি মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু এই উপলব্ধি মানুষের এক জনমে হয় না। এই কথাই শ্রীকৃষ্ণ গীতার ৭/১৯ নং শ্লোকে বলেছেন এভাবে-

"বহু বহু জন্মের পর জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝিয়া থাকেন যে আমিই সব। তখন তিনি আমাকে পান। এই রূপ মহাত্মা জগতে বড়ই দুর্লভ।"

কেনো বহু বহু জন্মের পর জ্ঞানী ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন যে শ্রীকৃষ্ণই সব, নিচের আলোচনার মাধ্যমে মাধ্যমে তা বোঝানোর চেষ্টা করছি-

কোনো মানুষ- যে লিঙ্গে, যে পরিবারে, যে সমাজে, যে দেশে জন্ম গ্রহন করে, সেটাই তার ভাগ্য। এই ভাগ্যচক্রে সব মানুষ একইরকম জ্ঞান ও ক্ষমতা নিয়ে জন্ম নেয় না। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে মেয়ে বা নিকট আত্মীয়রা, চাইলেই প্রধানমন্ত্রীর দেখা সাক্ষাত পেতে পারে, এর জন্য তাদেরকে বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না, কিন্তু গ্রামের একজন সাধারণ মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করার জন্য উপযুক্ত কারণ সৃষ্টি করতে হয়, তারপর তাকে গ্রামের সরকার দলীয় নেতাকে ধরতে হয়, গ্রামের সেই নেতা গিয়ে ধরে শহরের কোনো পাতি নেতাকে, পাতি নেতা গিয়ে ধরে নেতাকে, নেতা গিয়ে ধরে এম.পিকে, এম.পি গিয়ে ধরে কোনো মন্ত্রীকে এবং সেই মন্ত্রী যদি চায়, তাহলে সেই গ্রামের সাধারণ লোককে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করালেও করাতে পারে। এইভাবে একটি দীর্ঘ প্রসেসের মাধ্যমে গ্রামের কোনো সাধারণ লোক সরাসরি প্রধান মন্ত্রীর সাক্ষাত পেলেও পেতে পারে। গ্রামের কোনো সাধারণ লোককে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য এই যে দীর্ঘ অনিশ্চিত একটি প্রসেসের মাধ্যমে যেতে হয়, এটাই তার জন্মের পাপ, যদি সে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বা মেয়ে হিসেবে বা তার কোনো নিকট আত্মীয় হিসেবে জন্ম নিতো, তাকে এই কষ্ট স্বীকার করতে হতো না।

শ্রীকৃষ্ণ যে গীতাই বলেছেন- জ্ঞানী ব্যক্তিরা বহু জন্মের পর বুঝিয়া থাকেন যে আমি বাসুদেবই সব। সে্ই রূপ কোনো আত্মা ইতর প্রাণী থেকে এক জন্মেই জ্ঞানী, জনপ্রিয় ও ক্ষমতাবান মানুষ হিসেবে জন্ম নেয় না। জ্ঞানী, জনপ্রিয় ও ক্ষমতাবান হিসেবে জন্ম নেওয়ার জন্য প্রতিটা জন্মে মানুষকে সুকর্মের মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করার সাধনা করতে হয়। জন্ম জন্মান্তর ধরে এই সাধনা করার ফলেই কোনো এক জন্মে মানুষ হয়ে উঠে জ্ঞানী, জনপ্রিয় বা ক্ষমতাবান এবং এই ধরণের মানুষ জগতে খুব দুর্লভ, এই কথাই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন গীতার ৭/১৯ নং শ্লোকে।

তো একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে যেমন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির সাক্ষাত পাওয়া সম্ভব নয়, তাদের সাক্ষাত পাওয়ার জন্য তাকে বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা অর্জন করতে হয়, তেমনি শ্রীকৃষ্ণকে বোঝা ও জানার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতার প্রয়োজন হয়, ভাগ্যচক্রে যার সেই জ্ঞান ও ক্ষমতা থাকে তিনি সরাসরি শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করে মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করতে পারেন, কিন্তু ভাগ্যচক্রে সাধারণ মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার মতো, জন্মসূত্রে যার সেই জ্ঞান ও ক্ষমতা থাকে না, তাকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অংশীদার পাতি নেতা, নেতা, এম.পি, মন্ত্রীদেরকে তুষ্ট করে কিছু পাওয়ার মতো নানা দেব-দেবীকে পূজা করে কোনো কিছু পেতে হয়। কোনো এম.পি বা মন্ত্রী যেমন সাধারণ পাবলিকের জন্য রাস্তা, ব্রিজের মতো যা কিছু করে, তা যেমন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই করে, তেমনি সকল দেব-দেবী, তাদের ভক্তদের জন্য যা করে, তা শ্রীকৃষ্ণের অনুমতিক্রমে, শ্রীকৃষ্ণের মাধ্যমেই করে।

সকলে যেহেতু একইরকম সুকর্ম করে না, সেহেতু সকলে একইরকম ভাগ্য নিয়েও জন্ম নেয় না, এই জন্য সকলে শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে পারে না। যার যার অবস্থান থেকে শ্রীকৃষ্ণকে বোঝার জন্য চেষ্টা ও সাধনা করে যেতে হবে, তাহলে হয়তো কোনো এক জন্মে শ্রীকৃষ্ণকে বুঝে উ্ঠা সম্ভব হবে, তখন শ্রীকৃ্ষ্ণের ভজনা করে মোক্ষ লাভ করা যাবে, যতদিন সেই জ্ঞানের জন্ম না হচ্ছে ততদিন সামনে যেই দেব-দেবী পাওয়া যায়, তারই পূজা অর্চনা করে যেতে হবে; কারণ, এটা্ই শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার বা তার কাছে পৌঁছার একমাত্র পথ।

দেব-দেবীর পূজা করে মোক্ষ লাভ করা যাবে কি না বা কিভাবে মোক্ষলাভ করা যাবে, আশা করছি উপরের আলোচনা থেকে আমার বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 27 May 2020

জামাই ষষ্ঠী কী ও কেনো ? এবং দেবী ষষ্ঠীর বাহন কেনো বিড়াল ?


জামাই ষষ্ঠী কী ও কেনো ? এবং দেবী ষষ্ঠীর বাহন কেনো বিড়াল ?

জামাই ষষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত- মাতৃত্ব, সন্তানধারণ ও বংশবৃদ্ধির গল্প ৷ মা ষষ্ঠীকে খুশি করে এইসব আশীর্বাদ পাওয়ার অনুষ্ঠানই হলো জামাই ষষ্ঠী ৷

কথিত আছে, একসময় নিয়ম ছিলো, কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয়, ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে যেতে পারবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় যে সমস্যা দেখা দেয়, তা হলো- সন্তানধারণে বিলম্ব বা সদ্যজাত সন্তানের মৃত্যুর ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য ৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখ অদর্শনে পিতামাতার কষ্টের কথা ভেবে সমাজের বিধানদাতারা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নেয় জামাই ষষ্ঠী হিসাবে, যেদিন মেয়ে ও জামাইকে নেমন্তন্ন করে সমাদর করা হবে, এতে কন্যার মুখ দর্শনও করা যাবে আর সেইসঙ্গে মা ষষ্ঠীর পুজো করে তাঁকে খুশি করাও হবে, যাতে কন্যা শীঘ্র পুত্রমুখ দর্শন করতে পারে ৷

জামাই ষষ্ঠী প্রচলনের পর, সন্তান না হওয়া পর্যন্ত কন্যার বাড়িতে পিতা মাতার না যাওয়ার বিধি বর্তমানে পরিবর্তিত হয়ে- এক বৎসর কন্যার বাড়িতে না যাওয়ার বিধি প্রবর্তিত হয়েছে।

কিন্তু, ১০৮টি দুর্বাবাঁধা আঁটি দিয়ে, নতুন পাখার উপর আমের পল্লব এবং আম ও তৎসহযোগে কমপক্ষে পাঁচ ধরনের ফল সাজিয়ে জামাই-এর মঙ্গল কামনায় শাশুড়ির দল ‘জামাই ষষ্ঠী'-র দিনে যে ব্রত রক্ষায় ব্রতী হন তার সারমর্মটা কী?


সনাতন ধর্মে দেবী ষষ্ঠী, মাতৃত্বের প্রতীক বা জননী। তিনি সন্তান কোলে ধারণ করে থাকেন। মায়ের পূজা শেষে তার কাছে জামাইয়ের দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করা হয় এবং মেয়ে যাতে সন্তানবতী হয়- তার কামনা করা হয়।

দেবী ষষ্ঠীর সাথে দুটি সন্তান থাকলেও সাধারণভাবে ষষ্ঠী দেবীর নির্দিষ্ট কোনো অবয়ব বা মূর্তি নির্মান করে পূজা করা হয় না। মঙ্গল ঘটে আঁকা মূর্তি, শিলে পিটুলি দিয়ে তৈরি মূর্তি, ঘটে পোঁতা বটগাছের ডাল ইত্যাদিতে ষষ্ঠীদেবীর প্রতিমা কল্পনা করে পূজা করা হয়। ষষ্ঠীদেবীর পূজা সাধারণত বটগাছতলায়, বাড়ির আঙিনায়, নদী বা পুকুরের ধারে হয়ে থাকে। অনেক গ্রামে বট-অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে 'ষষ্ঠীতলা' বলে নির্দিষ্ট স্থানে বিভিন্ন ষষ্ঠীদেবী নির্দিষ্ট তিথিতে পূজিতা হন। মূলত গৃহস্থ নারীরা তেল-হলুদ-দই, ঘট, বটের ডাল ইত্যাদি উপকরণের মাধ্যমে পূজা নির্বাহ করে থাকেন, পূজাশেষে 'ব্রতকথা' শ্রবণ করে স্নান সেরে বাড়ি ফিরে ফলাহার করেন।

এছাড়াও সনাতন ধর্মে দেবী ষষ্ঠীকে যেহেতু মাতৃত্বের প্রতীক বা সন্তানদাত্রী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, সেহেতু শিশুর জন্মের দু'দিন পর 'সূতিকাষষ্ঠী', ষষ্ঠ দিনে 'ঘাটষষ্ঠী', একুশদিনে 'একুশে' এবং শিশুর বারো বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি জন্মতিথিতে 'জলষষ্ঠী' দেবীর পূজা করার নিয়ম রয়েছে। জৈষ্ঠ মাসে জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্যষষ্ঠী ছাড়াও শ্রাবণ মাসে লোটনষষ্ঠী, ভাদ্র মাসে চাপড়া বা মন্থনষষ্ঠী, আশ্বিন মাসে দুর্গাষষ্ঠী বা বোধনষষ্ঠী, অগ্রহায়ণ মাসে মূলাষষ্ঠী, পৌষ মাসে পাটাইষষ্ঠী, মাঘ মাসে শীতলষষ্ঠী, চৈত্র মাসে অশোকষষ্ঠী বা নীলষষ্ঠী পূজার প্রচলন আছে। বৈশাখ, আষাঢ়, কার্তিক ও ফাল্গুন মাসে ষষ্ঠী পূজার কোনো প্রচলন নেই।

বলা হয় ষষ্ঠী দেবীর বাহন বিড়াল। এবার দেখা যাক ষষ্ঠীর বাহন হিসেবে কেনো বিড়ালকে কল্পনা করা হয়েছে ?

আমার বিভিন্ন লেখায় আমি বলেছি যে, দেব-দেবীদের বাহন বলে কিছু হয় না, কারণ, দেব-দেবীরা এমনিতেই সুপার পাওয়ারের অধিকারী, তাদের কোথাও যাওয়ার জন্য কোনো বাহনের প্রয়োজন হয় না, তারা এমনিতেই যেখানে খুশি যখন তখন যেতে পারেন। দেব-দেবীদের সাথে যেসব পশু পাখি থাকে, তারা আসলে বহন করে বিশেষ কিছু তথ্য, যা জানলে মানুষের উপকার নিশ্চিত; এই সূত্রে দেখা যাক, ষষ্ঠী দেবীর বাহন বিড়াল আসলে মানুষের জন্য কোন বিশেষ তথ্যকে বহন করে চলেছে ?

চিকিৎসা শাস্ত্র বলছে, ‘বাধক’ রোগ, যা মাতৃত্বের পথে এক ধরণের বাধা, তা দূর করতে নারীদের পক্ষে বিড়ালের স্পর্শ খুবই উপকারী। বিড়ালের দুধ যে বিভিন্ন মেয়েলী রোগের মহৌষধ , তা Dictionary of Homeopathic Materia Medica গ্রন্থে বলা আছে। যে সকল কারণে মানুষের বাচ্চা হয় না , সেই সকল কারণ দূর করার শক্তিও বিড়ালের দেহে বর্তমান চিকিৎসা শাস্ত্র জানাচ্ছে।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি যে, দেবী ষষ্ঠী হলেন মাতৃত্বের প্রতীক আর মাতৃত্বের পথে বিভিন্ন রকম বাধা দূর করতে বিড়াল সাহায্য করে বলেই বিড়াল থাকে দেবী ষষ্ঠীর সাথে, যাতে আমরা অযথা বিড়ালকে বাড়ি থেকে না তাড়িয়ে বিড়ালের যত্ন ও পালন করে তার থেকে আমরা উপকার নিতে পারি।

বিড়ালকে যে খারাপ চোখে দেখা যাবে না এবং তার সম্পর্কে অযথা খারাপ কিছু বলা যাবে না, তার নির্দেশ দেওয়া আছে ষষ্ঠী দেবীর পাঁচালির গল্পে, সেই গল্পটি এরকম :

এক বাড়িতে দুই বউ ছিলো, এর মধ্যে ছোট বউ বিভিন্ন জিনিস চুরি করে খেতো আর বিড়ালের নাম দিতো, শুধু তাই নয়, বিভিন্ন জিনিস চুরি করে খেয়েছে বলে বিড়ালকে সে অযথা মারতোও। বিড়ালের এই কষ্টের কথা দেবী ষষ্ঠী অবগত হয়ে সেই বউকে দেবী ষষ্ঠী নানারকম শাস্তি দিতে শুরু করে, একে একে তার সাতটি ছেলে এবং একটি কন্যা মারা যায়। এরপর অলক্ষুণে বলে স্বামী ও শাশুড়ি মিলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। অন্যদিকে বড় বউ স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করতে থাকে।

ছোট বউ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে বনে গিয়ে কাঁদতে থাকে, সেই সময় মা ষষ্ঠী, এক বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করে। ছোট বউ তার সন্তান মারা যাওয়ার কাহিনী বলে; বৃদ্ধা, ছোট বউকে বিড়ালের প্রতি তার খারাপ আচরণের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়, এতে ছোট বউ লজ্জা পায় এবং তার অমন আচরণের জন্য ক্ষমা চায়। বৃদ্ধা তখন ছোট বউকে বলে, বিড়াল, মা ষষ্ঠীর বাহন, বাড়ি ফিরে গিয়ে তুমি ভক্তি ভরে মা ষষ্ঠীর পূজা করো আর বিড়ালের প্রতি ভালো ব্যবহার করো, তাহলে তোমার কোনো সন্তান আর মারা যাবে না, আস্তে আস্তে স্বামী সংসার সব ফিরে পাবে।

এর পর ছোট বউ বাড়ি ফিরে মা ষষ্ঠীর পূজা করে এবং তার সুখ ফিরে পায়, এভাবে পৃথিবীতে মা ষষ্ঠীর পূজা চালু হয়ে যায়।

এই গল্পের আধ্যাত্মিক দিক বাদ দিলেও বা ষষ্ঠী দেবীর পূজা করলে সন্তান লাভ হয়, এমন গল্পকে বিশ্বাস না করলেও, জামাই ষষ্ঠীর কার্যকারিতা যে- জামাইকে বাড়িতে এনে তাকে খাইয়ে দাইয়ে কাপড় চোপড় উপহার দিয়ে জামাইকে খুশি রেখে নিজ কন্যার সুখকে নিশ্চিত করা বা রাখা তাতে কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই; বর্তমানে সবকিছুকে বাদ দিলেও জামাই ষষ্ঠীর এটাই হলো বাস্তব বা কার্যকর কারণ। ষষ্ঠীর পর কন্যার বাড়ি থেকে ডালি ভ’রে কন্যার শ্বশুর বাড়িতে যে ফল-মূল দেওয়া হয়, এটাও কিন্তু জামাইয়ের বাড়ির লোকজনকে খুশি রেখে কন্যার সুখ শান্তিকে নিশ্চিত করার একটি কৌশল।

জামাই ষষ্ঠী প্রতি বছর হলেও এবং প্রতি বছর জামাইকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে এমন খাতির যত্ন করার নিয়ম থাকলেও, মূলত বিয়ের পর যে ষষ্ঠী আসে, তাতে জামাইকে অবশ্যই শ্বশুর বাড়ি বাধ্যতামূলক যেতেই হয়; এতে অন্য যে সুবিধাটি নিহিত আছে, তা হলো- বিয়ের সময় অনেক সময়ই নানা বিষয় নিয়ে বর ও কনে পক্ষের মধ্যে মনোমালিন্য হয়, যদি সেরকম কোনো ঘটনা ঘটে, সেই বিষয়গুলো যাতে জামাই মনে না রাখে এবং শ্বশুর বাড়ি যেতে বাধ্য হয়ে সব ভুলে সম্পর্ক ঠিকঠাক করতে বাধ্য হয়, জামাই ষষ্ঠীতে জামাইয়ের, শ্বশুরবাড়িতে বাধ্যতামূলক যাওয়ার এটাও একটা কারণ, যা শাস্ত্রকারদের মাথায় ছিলো এবং এসব ছোট ছোট কারণকে প্রাধান্য দিয়ে বিধি নিষেধ তৈরি করার জন্যই কিন্তু হিন্দুধর্ম ও কালচার গ্রেট।

এই হলো জামাই ষষ্ঠীর কারণ ও কাহিনী; আশা করছি, আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে বিষয়টি ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।

Sunday, 24 May 2020

শনিদেবের বাহন কাক এবং বিষ্ণুর বাহন গরুড় কেনো ? বা দেব-দেবীদের বাহন তত্ত্ব – 3 :


শনিদেবের বাহন কাক এবং বিষ্ণুর বাহন গরুড় কেনো ?
বা দেব-দেবীদের বাহন তত্ত্ব – 3 :

এর আগে “দেব-দেবীদের বাহন তত্ত্ব- 1 ও 2” শিরোনামে দুটি পোস্ট লিখে সেখানে বহুল প্রচলিত কয়েকটি বাহন সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। সেই পোস্টগুলো পড়ে অনেকে- শনিদেবের বাহন কাক এবং বিষ্ণুর বাহন গরুড় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এই পোস্টে জানানোর চেষ্টা করছি সেগুলো সম্পর্কে -

প্রথমেই বলছি শনিদেবের বাহন কাক সম্পর্কে:

শনিদেবের বাহন সম্পর্কে দুই ধরণের তথ্য পাওয়া যায়, কোথাও বলা আছে শনির বাহন শকুন আবার কোথাও কাক। কিন্তু আমার বিবেচনায় শনির বাহন কাক হওয়া ই যুক্তিসঙ্গত, এর কারণ এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি:

আমি আগেই বলেছি দেব-দেবীদের বাহন বলে কিছু হয় না; কারণ, দেব-দেবীরা এমনিতেই সুপার ন্যাচারাল শক্তির অধিকারী, তারা ইচ্ছা করলেই যেখানে সেখানে যখন তখন যেতে পারে, তাই তাদের চলাচলের জন্য কোনো বাহনের প্রয়োজন নেই। বরং দেব-দেবীদের সাথে থাকা প্রাণীগুলো বিশেষ কিছু তথ্য বহন করে, যা ঐ দেব-দেবী সম্পর্কে আমাদেরকে আরো স্পষ্ট ধারণা দেয়।

শনির সাথে থাকা কাক, আমাদেরকে আসলে কী বার্তা দেয়, এটা বুঝতে হলে জ্যোতিষ শাস্ত্র সম্পর্কে কিছু জ্ঞান থাকা দরকার, না হলে এই বিষয়টা বোঝা আসলে কঠিন।

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে, আমাদের জীবনের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে গ্রহ নক্ষত্র এবং এটাই চিরন্তন সত্য, না হলে কোনো একটা বিষয়ে আপনি কেনো বিশেষভাবে পারদর্শী বা কোনো বিষয়ে কেনো আপনার ব্যাপক আগ্রহ বা কোনো একটি রং কেনো আপনার বিশেষ পছন্দের ?

জ্যোতিষ শাস্ত্র ছাড়া এগুলোর ব্যাখ্যা আপনি কিছুতেই দিতে পারবেন না।

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে শনি গ্রহ হচ্ছে, পৃথিবীর যেকোনো শক্ত ও কালো পদার্থ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার কারণ বা কারক । এগুলোর বাইরেও শনির আরও কারকতা আছে, কিন্তু আমার এই আলোচনায় যতটুকু দরকার, আমি ততটুকুই উল্লেখ করলাম বা করবো।

যে ব্যক্তির উপর শনির বেশি প্রভাব থাকে- তার গায়ের রং কিছুটা কালো, দৈহিক গঠন স্লিম এবং কোনো না কোনো বিষয়ে তার কিছুটা ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান অবশ্যই থাকবে।

সমস্ত পাখিদের মধ্যে কোকিল যেমন গায়ক পাখি, তেমনি কাক হলো ইঞ্জিনিয়ার পাখি। এমনও তথ্য পাওয়া যায় যে, কাক শুধু তাদের প্রয়োজন মতো যন্ত্রপাতি বানিয়েই নিতে পারে না, তার ব্যবহারও করতে পারে। যদিও কাকের যন্ত্রপাতি বানানো এবং তা ব্যবহার করার কোনো প্র্যাকটিক্যাল প্রমাণ এখন আমি দিতে পারবো না, কিন্তু একটি গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে কাকের ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান সম্পর্কে আপনারা কিছুটা ধারণা পাবেন।

আমরা অনেকেই ছোটবেলায় ঈশপের একটি গল্প পড়েছি বা শুনেছি যে, একটি তৃষ্ণার্ত কাক জলের জন্য এখানে সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছিলো, কিন্তু কোথাও জল পাচ্ছিলো না, শেষে সে একটি কলসের তলায় জল আবিষ্কার করে কিন্তু তা পান করার ক্ষমতা তার ছিলো না; কারণ, তার ঠোঁট অতদূর পৌঁছাচ্ছিলো না। এরপর সে আশপাশ থেকে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে ঐ কলসের মধ্যে ফেলতে থাকে, ফলে জল কলসের মুখ পর্যন্ত উঠে আসে এবং সে তা পান করে।
ঈশপ ছিলো মিশরের অধিবাসী এবং তার গল্পগুলো খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিলো। কিন্তু তার গল্পগুলো শুধুই গল্প, না এর মধ্যে কিছুটা বাস্তবতা আছে, এই তথ্যের অনুসন্ধানে একদল প্রাণী বিজ্ঞানী কাকের উপর নজর রাখা শুরু করে এবং তারা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে, ঈশপ তার গল্পে যা বলেছে, কাক, সেই রকম বিপদে পড়লে আসলে সেই রকমআচরণই করে।

ঈশপের গল্পটি বাচ্চাদের কাছে একটি মজার গল্প হলেও এর মধ্যে রয়েছে একটি চমৎকার ইঞ্জিনিয়ারিং। খেয়াল করুন, কাক যখন- খাল, বিল, নদী বা পুকুরে জল পাচ্ছিলো না, তখন সে চুপচাপ বসে না থেকে জলের অনুসন্ধান করে যাচ্ছিলো এবং শেষ পর্যন্ত সে একটি কলসের তলায় জল আবিষ্কার করে, যা একজন অনুসন্ধিৎসু ইঞ্জিনিয়ারের কাজ। এরপর যখন সেই কাক, সেই কলসের তলায় থাকা জল খেতে ব্যর্থ হলো, তখনো সে বসে না থেকে আশপাশ থেকে নুড়ি কুড়িয়ে সেই কলসের মধ্যে ফেলতে থাকলো এবং নিজের কাজ উদ্ধার করলো বা সমস্যার সমাধান করলো, যা একজন ইঞ্জিনিয়ারের ধর্ম, গুন বা বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে সে যেকোনো সমস্যার সমাধান করে।

আগেই বলেছি, শনি গ্রহ যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার কারক, প্রকৃতিতে তেমনি কাকও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার প্রতীক। কাকের রং যেমন কালো, তেমনি শনির রংও কালো। আবার কালোর সমগোত্রীয় বা বিবর্তিত রূপ নীল ব’লে কৃষ্ণ বা শনিদেবের গায়ের রংও কালোর পাশাপাশি নীল, যদিও এই বিষয়টি আমাদের আলোচনায় কোনো কাজে আসবে না, কিন্তু প্রসঙ্গ এলো বলেই তথ্যটা জাস্ট শেয়ার করলাম ।

যা হোক, শনি দেবের সাথে কাক থেকে জ্যোতিষ বিদ্যার অনেক বিষয় প্রকাশের সাথে সাথে আমাদেরকে যে ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার বিষয়টির কারকতা সম্পর্কেও ধারণা দেয়, সেই বিষয়টি সম্ভবত আমি আপনাদেরকে বোঝাতে পেরেছি। এর সাথে আবার এই কথাটিও বলছি যে, জ্যোতিষ শাস্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে এই বিষয়টি বোঝা খুব একটা সহজ নয় বা বোঝা একেবারেই সম্ভব নয়।

একটা কথা মনে রাখবেন, হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার কোনো কিছু্ অযথা বা বোগাস নয়, প্রতিটি আচরণের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট মানসিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিককারণ। হিন্দুজীবন ব্যবস্থার কোনো কিছুকে যদি আপনার অযথা বা বোগাস বলে মনে হয়, সেই সমস্যা হিন্দুশাস্ত্রের নয়, সমস্যা আপনার; কারণ, আপনি সেটা জানার সৌভাগ্য লাভ করেননি বা জানার চেষ্টা করেন নি।

এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে, বিষ্ণুর বাহন কেনো গরুড় পাখি ?

এ প্রসঙ্গে একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে, সেটা আগে সংক্ষেপে বলে নিই।

মহাভারতের আদিপর্ব অনুযায়ী গরুড়ের মাতা বিনতা নিজের সতীন সর্পমাতা কদ্রুর নিকট একটা বাজিতে পরাজিত হয়ে কদ্রুর দাসীতে পরিণত হয়। গরুড়, কদ্রুর নিকট মাতার দাস্যমুক্তির জন্য বললে, কদ্রু তাঁকে বলে যে, যদি সে অমৃত নিয়ে আসতে পারে তাহলে সে বিনতাকে মুক্ত করে দেবে। মাতার মুক্তির জন্য গরুড় অমৃত আনতে স্বর্গে চলে যায়। স্বর্গের সকল দেবতা চেষ্টা করেও গরুড়কে নিবৃত্ত করতে বিফল হন। দেবরাজ ইন্দ্র নিজের বজ্র প্রয়োগ করলেও তা ব্যর্থ হয়। এভাবে সকল দেবতাকে পরাস্ত করে গরুড় অমৃত হরণ করে নিয়ে আসে এবং নিজের মাতাকে মুক্ত করে।

গরুড় অমৃত আহরণে সক্ষম হলেও অমৃতে তাঁর কোন লোভ ছিল না। অমৃত সে নিজের হাতে বহন করে নিয়ে এলেও একবিন্দু অমৃত পান করে নি। গরুড়ের এই চরিত্রে খুশি হয়ে বিষ্ণু তাঁকে বর দিতে ইচ্ছা করেন। তখন গরুড় অমৃতপান ব্যতীত অমরত্বলাভ এবং সর্বদা বিষ্ণুর উপরে থাকার বর প্রার্থনা করে। বিষ্ণু তা স্বীকার করেন এবং গরুড়কে নিজের উপরে স্থান দিতে তিনি নিজের ধ্বজায় গরুড়কে স্থান দেন। এরপর গরুড় নিজেই বিষ্ণুকে বর দিতে ইচ্ছা করে, বিষ্ণু বর হিসেবে গরুড়কে তাঁর বাহন হতে বলেন এবং গরুড়ও তা মেনে নেন।এই ভাবেই গরুড় পাখি হয় বিষ্ণুর বাহন।

এবার বাস্তবতার দিকে তাকানো যাক, গরুড় যে মোটেও কোনো কাল্পনিক পাখি নয়, তার প্রমান হলো,

উইকিপিডিয়া বলছে, “ ব্রাহমিনি কাইট পাখিটিকে গরুড়ের সমসাময়িক রূপ মনে করা হয়।” তার মানে হচ্ছে গরুড় পাখি এবং ব্রাহমিনি কাইট পাখিটি সমসাময়িক, গরুড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু ব্রাহমিনি এখনও টিকে আছে। গরুড় পাখি যে ছিলো এবং তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তার আরেকটি প্রমান প্রাণি বিজ্ঞানীদের হাতে এসেছে, ঘটনাটি এরকম:

“অস্থিবিদেরা পৃথিবীর দক্ষিণাংশে অনেকগুলো বৃহদাকার পাখির ফসিল পেয়েছেন । প্রথম দিকে এই পাখিগুলোর নাম পাওয়া না গেলেও পরবর্তীতে নাম জানা যায়। ওই প্রাপ্ত ফসিলগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ছিলো তিতানিস পাখির। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির নাম তিতানিস, প্রাচীণ ভারত বর্ষের সাহিত্যে যাকে বলা হয়েছে গরুড় পাখি । ইউরোপ আমেরিকায় এই পাখির নাম তিতানিস হলেও ভারতর্ষে এই পাখির গরুড় নামকরণের কারণ হলো, মহাকাশে ঈগল মণ্ডল নামক একটি তারামণ্ডল রয়েছে, যার ভারতীয় নাম গরুড়, এ থেকেই গরুড় নামটি এসেছে, যেমন ইউরোপ আমেরিকায় স্যাটার্ন বলে যাকে বলা হয়, তার ভারতীয় নাম শনি।

বিজ্ঞানীরা আরো জানিয়েছে, পৃথিবীর তৎকালীন অবস্থায় বসবাসকারী পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং শিকারী পাখি ছিল তিতানিস তথা গরুড়। এই পাখির উৎস মূলত উত্তর আমেরিকা হলেও, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এর ফসিল পাওয়া গেছে।

একদল বিজ্ঞানীর দাবি, প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এই পাখির বিচরণ ছিল।কিন্তু টেক্সাসে যে ফসিল পাওয়া যায় তার কার্বণ ডেটিং করে দেখা গেছে যে তাদের বয়স প্রায় পাঁচ মিলিয়ন বছর পুরনো। প্রাগৈতিহাসিক সময়কার বর্ণনায় দেখা যায়, তিতানিস পাখি ছিল পক্ষীকূলের মধ্যে ভয়ঙ্কর শিকারী, যাদের ছিল শক্ত থাবা যুক্ত পা এবং ভারি ডানা। এর বাইরে এদের মস্তিষ্ক্যের হাড়ের গঠন ও তীক্ষ্ণ এবং ধারালো ঠোঁট অন্যান্য পাখিদের তুলনায় ভিন্ন ছিল। আর এই কারণেই উত্তর আমেরিকার অনেক বিজ্ঞানী তিতানিসকে পাখি না বলে ডায়নোসর গোত্রীয় বলেও আখ্যা দেন।

বিজ্ঞানীদের দাবি এক একটি তিতানিসের উচ্চতা ছিল প্রায় আট ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা এবং প্রায় দেড়শ কিলোগ্রাম ওজন। ভারি ডানা কাজে লাগিয়ে তারা ঘণ্টায় প্রায় ৬৫ কিলো মিটার বেগে উড়তে পারতো। তবে অন্যান্য পাখিদের ডানার গড়নের তুলনায় তিতানিসের ডানার গড়ন ছিলো ভিন্ন। এদের ছোটো ডানার পেছনের অংশের হাড় সরাসরি মেরুদন্ডের হাড়ের সঙ্গে যুক্ত, যে কারণে অন্যান্য পাখিদের মতো পা দিয়ে বেগ সৃষ্টি করে উড়তে হতো না তিতানিসদের।ডানার বেগ কাজে লাগিয়েই তারা উড়তে পারতো।

তবে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত ফসিল গুলোর মধ্যে কিছু দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা যায়।কয়েকটি ফসিলে শুধু ডানার অস্তিত্বের পাশাপাশি হাতের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। যে তিতানিসদের হাতছিল তাদের ডানা তুলনামূলক কম শক্তিশালী ছিল এবং সেই ডানাদিয়ে লড়াই করতে পারতোনা তারা। লড়াইয়ের জন্য হাত ও বিশাল ঠোঁট ব্যবহার করতে হতো। খাদ্যশৃঙ্খলের হিসেব অনুযায়ী তিতানিস গোত্র ছিল মূলত মাংশাসী। ভূমিতে বসবাস যোগ্য প্রাণী ছিল তাদের খাবার।

এই গরুড় পাখি যে প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীতে কী পরিমাণ প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ছিলো তার প্রমান পাওয়া যায়, নিচের এই তথ্যে:

“গরুড়- ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং মঙ্গোলিয়ার জাতীয় প্রতীক।”

শুধু তাই নয়, ইন্দোনেশিয়ান এয়ারলাইন্সের নামও গরুড় পাখির নামে।

শুধু যে গরুড়ের প্রভাবশালীতার কারণেই, গরুড় ঐসব দেশের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে বা ইন্দোনেশিয়ার এয়ার লাইন্সে স্থান করে নিয়েছে, তা কিন্তু নয়; শুধু বৃহদাকার বা হিংস্র শিকারী হওয়ার কারণে গরুড় যদি কোনো দেশের জাতীয় প্রতীক অর্থাত শ্রদ্ধার প্রতীকে পরিণত হতো, তাহলে দুই একটি দেশের জাতীয় প্রতীক ডায়নোসোরও হতে পারতো, কিন্তু তা হয় নি। আসলে গরুড়ের জাতীয় প্রতীক বা শ্রদ্ধার প্রতীকে পরিণত হওয়ার পেছনে ছিলো একটা ধর্মীয় আবেগ, যে ধর্মটা ছিলো সনাতন ধর্ম এবং এই তথ্য এটা প্রমান করে যে প্রাচীন কালে ইন্দোনেশিয়া থেকে সুমেরু পর্যন্ত ছিলো সনাতন ধর্মের এলাকা। এখানে আরো একটি তথ্য দিয়ে রাখি, রাশিয়ার পাশে কৃষ্ণসাগর বলে যে সাগর আছে, সেটা কিন্তু পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের নামে। এই তথ্যগুলো এই প্রমান দেয় যে, প্রাচীন কালে এক বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে সনাতন ধর্মের বিস্তৃতি ছিলো, কিন্তু আমাদের ধর্মগুরুদের নির্বুদ্ধিতা ও উদাসীনতায়, তা সংকুচিত হতে হতে বর্তমান ভারতের ভূখণ্ডে স্থিতি হয়েছে, বহুমুখী ইসলামি চক্রান্তকে মোকাবেলা করতে না পারলে, হয়তো সেটাও আমরা হারাবো।

এবার গরুড়ের ধর্মীয় থিয়োরির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।

প্রকৃতির প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য শক্তি হিন্দু ধর্মে দেব-দেবী হিসেবে পরিচিত। যেমন জলের শক্তির দেবতা বরুন, বায়ুর শক্তির দেবতা পবন, স্থলজ প্রাণির শক্তির দেবতা হাতি, হিংস্র শক্তির দেবতা সিংহ, বিষাক্ত শক্তির দেবী মনসা; তেমনি গরুড় হচ্ছে উড্ডীয়মান প্রাণীর শক্তির দেবতা। উড্ডীয়মান সকল পাখিদের মধ্যে যেহেতু গরুড় হচ্ছে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী, সেহেতু পরমব্রহ্ম বা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পালনকারী রূপ, বিষ্ণুর সাথে তাকে কল্পনা করা হয়েছে, প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা বলছি, বিষ্ণুর বাহন। কিন্তু গরুড় পাখি আসলে বিষ্ণুর শক্তিমত্তা ও প্রভাব প্রতিপত্তির প্রতীক, এছাড়াও গরুড়কে বৈদিক জ্ঞানের প্রতীক বলা হয়।

দেব-দেবীর বাহন তত্ত্ব পোস্ট পড়ে যিনি বা যারা যমরাজের বাহন এবং মনসার বাহন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, যমরাজের কোনো বাহন আছে বলে কখনো শুনি নি বা অনুসন্ধানেও পাই নি, আর সাপ বা নাগ হচ্ছে মনসার প্রতীক, কোনো বাহন নয়; তাই সাপ মনসার সাথে থেকে কোনো বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে না. মনসার প্রতীকী রূপটি প্রকাশ করে মাত্র।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

“হর হর মহাদেব” মানে কী ?


“হর হর মহাদেব” মানে কী ?

ধ্বংসের দেবতা মহাদেব শিবকে, তেজঃবীর্য অর্থাৎ জোশের সাথে স্মরণ করতে সবাই বলে থাকে “হর হর মহাদেব”, কিন্তু খুব কম মানুষই আছে, যারা এর প্রকৃত অর্থ জানে বা প্রকৃত অর্থকে উপলব্ধি করতে পারে বা পেরেছে।

বিশেষ্য পদ হিসেবে ‘হর’ শব্দের অর্থ- সংহার কর্তা, শিব বা রুদ্র; অর্থাৎ ‘হর’ মানেও শিব আবার মহাদেব মানেও শিব। এই সূত্রে ‘হর হর মহাদেব’ মানে ‘শিব শিব শিব’ বা তিনবার একই সাথে শিবকে স্মরণ করা।

অংকের ক্ষেত্রে ‘হর’ মানে ভগ্নাংশের নিচের অংশ, যা ধারণ করে উপরের অংশকে এবং ‘হর’ সেটাই যা লবের চেয়ে বড়; অর্থাৎ হর রূপী মহাদেব সবচেয়ে বড়, যা ধারণ করতে পারে বা ধারণ করে রেখেছে সবাইকে।

কিন্তু এগুলোর বাইরেও ‘হর’ শব্দের আরেকটি গূঢ় অর্থ আছে, যা প্রমান করে সকলের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজমান।

বাংলায়- “যত জীব, তত শিব” বলে একটা কথা আছে এবং এই কথা দিয়ে এটা বোঝায় যে, প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যেই শিব বাস করে এবং এটা দিয়ে প্রকৃতিতে সৃষ্ট প্রতিটি প্রাণীকে শ্রদ্ধা করতে বা ভালোবাসতে শিক্ষা দেয় সনাতন মানব ধর্ম বা হিন্দুধর্ম।

এর বিপরীতে ইসলামে পশুদের জন্য রয়েছে শুধুই ঘৃণা। দেখে নিন সে সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস-

সহীহ মুসলিমের ৪/১০৩২ নম্বর হাদিসে বলা আছে,

“কালো কুকুর মানেই শয়তান।”

কুকুরকে শুধু শয়তান বলেই মুহম্মদ ক্ষান্ত হয় নি, তাদেরকে হত্যা করার আদেশও দিয়ে গেছে সে। দেখুন নিচের হাদিস-

“আব্দুল্লাহ বিন উমর বর্ণিত, হুযুর বলিয়াছেন কুকুরকে মারিয়া ফেলা উচিত। ( বুখারী, ৫৪/৫৪০)

এছাড়াও কোনো মুসলমান যেন বাড়িতে কুকুর না পুষে সেজন্য মুহম্মদ বলে গেছে,

“ফেরেশতা ঢুকেন না সেই ঘরে, যে ঘরে কোনো কুকুর বা ছবি রয়েছে” – (বুখারি, ৪/৫৪/৫৩৯)

শুধু কুকুর নয়, সাপও বোধহয় মুহম্মদের পাছা মারিয়াছিল, তাই সে সাপকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়ে গেছে এবং সাপকে হত্যা করার কারণ সম্পর্কে যে বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা মুহম্মদ বলে গেছে, তা পড়লে আপনি হাসি আটকাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। দেখুন সেই হাদিস-

“আয়শা হইতে বর্ণিত, হুযুর লেজ-কাটা এবং পিঠে দুইটি দীর্ঘ সাদা রেখাবিশিষ্ট সাপ মারিয়া ফেলিবার নির্দেশ দিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, এই জাতীয় সাপ চক্ষুর জ্যোতি নষ্ট করে এবং গর্ভপাত ঘটায়।” ( বুখারী, ৫৪/৫২৭,২৮)

এছাড়াও মুসলমানদের দ্বারা কুরবানীর নামে প্রতি বছর নির্বিচারে কোটি কোটি পশু হত্যার কথা তো সবাই জানেন এবং এটাও জানেন যে, রোগাক্রান্ত কোনো পশুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয় না কোনো মুসলিম পরিবারে। রোগ ব্যাধিতে কোনো পশু মরতে লাগলেই মুসলমানরা তাকে জবাই করে খেয়ে ফেলে, এরা এমনই নিষ্ঠুর এবং নির্মম। এজন্যই আমি একটা প্রবাদ বাক্যের জন্ম দিয়েছি,

“শকুনের দেশে যেমন কোনো পশু পচে না, তেমনি মুসলমানদের দেশেও কোনো পশু মরে না।”

এর বিস্তৃত ব্যাখ্যা হলো- শকুনের দেশে যদি কোনো পশু মরে, সেই পশুর দেহ পচে যাওয়ার আগেই শকুনেরা তা খেয়ে ফেলে; সেইরূপ মুসলিম পরিবারে কোনো পশু রোগাক্রান্ত হয়ে মরতে লাগলে, মুসলমানরা তাকে জবাই করে মেরে ফেলে, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হতে দেয় না !

যা হোক, ফিরে যাই মূল আলোচনায়, যত জীব, তত শিবেরই আরেকটি রূপ হলো “হর হর মহাদেব”, আর এটা বুঝতে হলে আপনাকে ঢুকতে হবে বাংলা ব্যাকরণে।

“রোজ রোজ” মানে প্রতিদিন, আর ‘রোজ রোজ’ এর আরেকটি রূপ হলো ‘হর রোজ’, তাই হর রোজ এর মানেও প্রতিদিন। তাহলে এখানে ‘হর’ এর মানে দাঁড়াচ্ছে প্রতি বা প্রত্যেক বা প্রতিজন। এখন ‘হর’ এর মানে প্রতি হিসেবে ধরে ‘হর হর মহাদেব’ এর অর্থ হলো ‘জনে জনে শিব’ বা প্রতিজনই শিব, এখন এটাকে উপরে বলা ‘যত জীব তত শিব’ এর সাথে মিলিয়ে দেখুন, দুটো বিষয় একই অর্থ প্রকাশ করে কি না ?

‘হর হর মহাদেব’ এবং ‘যত জীব তত শিব’ যে একই অর্থ প্রকাশ করে, আশা করছি সবার কাছে সেটা ক্লিয়ার হয়েছে। কিন্তু এই হর হর মহাদেব শব্দগুচ্ছের মধ্যে অন্য কী অর্থ বা কী শিক্ষা লুকিয়ে আছে আমাদের জন্য ?

সবাই জানেন যে, শিব হলো ধ্বংসের দেবতা। শিব তাকেই ধ্বংস করে, যে বা যারা সমাজের জন্য অশুভ, ভয়ংকর বা ক্ষতিকর। শিব কোনো শুভ শক্তিকে ধ্বংস করে না। হর হর মহাদেব শব্দগুচ্ছটি আমাদেরকে এই বার্তা বা এই শিক্ষাই দেয় যে, অন্যায় বা অশুভকে দমন করার জন্য আমাদের প্রত্যেককে হতে হবে শিবের মতো সংহার কর্তা, দমন করতে হবে দুষ্কৃতকারীদের এবং রক্ষা করতে হবে সাধুদের।

প্রকৃতপক্ষে ‘হর হর মহাদেব’ বাক্যটি আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয় যে, অন্যায় ও অশুভ শক্তিকে দমনে তোমরা প্রত্যেকে হয়ে উঠো এক একজন শিব এবং বিনাশ করো সকল অত্যাচারীকে।

আমরা অনেকেই বলি হর হর মহাদেব, কিন্তু ক’জন এই প্রকৃত সত্যকে হৃদয়ে লালন করি বা সেই মতো কাজ করি ?

মহাদেবের আদর্শ এবং তার ত্রিশুলই হিন্দু সমাজকে রক্ষা করার একমাত্র পথ। যেদিন প্রতিটি হিন্দুর হাতে থাকবে একটি করে ত্রিশুল, সেই দিন হবে না কোনো হিন্দু নারী ধর্ষণ, হবে না কোনো হিন্দুর ভিটে মাটি দখল, কোনো মুসলমান কোনো হিন্দু মেয়েকে লাভ জিহাদের কবলে ফেলেও দখল করতে পারবে না, কোনো হিন্দুকে ত্যাগ করতে হবে না তার জন্মভূমি।

তাই আমি সকল হিন্দুকে অনুরোধ করবো, মুখে ‘হর হর মহাদেব’ বলার সাথে সাথে অন্তরে ধারণ করুন এই বাক্যের মর্ম এবং হয় উঠুন এক একজন শিব। তাহলে আপনার হাতেই রক্ষা পাবে হিন্দুধর্ম এবং হিন্দু সমাজ।

জয় হিন্দ।
ঔঁ নমো শিবায়
হর হর ম হা দে ব ।

শিব কে এবং শিবরাত্রি কী ?


শিব কে এবং শিবরাত্রি কী ?

আমাদের হিন্দু সমাজে- কেউ শিবের ভক্ত, কেউ কালীর ভক্ত, কেউ দুর্গার ভক্ত, কেউ কৃষ্ণের ভক্ত, কেউ বিষ্ণুর ভক্ত, কেউ লোকনাথের ভক্ত, কেউ রামকৃষ্ণের, কেউ বিবেকানন্দের, কেউ বা প্রণবানন্দের; কে যে কার ভক্ত, তার ঠিক নেই; এই শতধা বিভক্ত ভক্ত এবং তাদের ভক্তিমার্গের ভিন্ন পথের জন্যই হিন্দু সমাজে আজ- এত মত পথ, এত অনৈক্য, এত বিশৃঙ্খলা।

হিন্দু সমাজে এত মত পথের আরেকটা কারণ হলো, যে যার ভক্ত বা উপাসক, সে আসলে তার Root বা মূলটা জানে না, যদি তারা জানতো যে সকল নদীর জল একই হয় এবং তারা সমুদ্ররূপ একই জলধারে গিয়ে পড়ে, তাহলে তাদের মধ্যে এই মত বা পথ থাকতো না, তারা বুঝতে পারতো, আমরা আসলে সবাই একই ঈশ্বরের সন্তান এবং সকল দেব-দেবীর মাধ্যমে আসলে এক ঈশ্বরেরই পূজা করি।

দেবতা সম্পর্কে সাধারণ হিন্দুদের এই তত্ত্ব বুঝতে না পারার কারণ হলো, হিন্দু সমাজে প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের চর্চার অভাব এবং বিভিন্ন পুরাণ গ্রন্থের আধিপত্য এবং এই পৌরাণিক জালের মধ্যে পড়ে, বেশির ভাগ হিন্দু সারাজীবন জানতেই পারে না যে তাদের প্রকৃত ঈশ্বর আসলে কে ? একটা অস্পষ্টতা নিয়েই তাদের সারাটা জীবন কাটে। যেমন- কোনো শিব ভক্তকে যদি বলা হয়, শিব আসলে কে ? সে শুধু বলতে পারবে, শিব হলো দেবাদিদেব মহাদেব; সতী, দুর্গা বা কালীর স্বামী, কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতীর বাপ; আর ? আর কোনো তথ্য তার জানা নেই, দু চার জন বাদ দিয়ে প্রত্যেক হিন্দুর অবস্থা এই, আর এই হিন্দুরা যা জানে, আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য যে, এর বেশির ভাগই ভুল বা বিকৃত।

আজকের আলোচনা শিবকে নিয়ে, তাই আলোচনার যতই ডাল পালা গজাক, ঘুরে ফিরে শিবের কাছেই ফিরে আসার চেষ্টা করবো।

প্রথমেই দেখা যাক শিবরাত্রি কী এবং এর উৎপত্তি বা প্রচলন হলো কিভাবে ?

ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথির রাত্রিকে বলা হয় শিবরাত্রি। সব কিছুরই যেমন একটা বিশেষ দিন বা তিথি থাকে, যে সময়ে ঐ বিশেষ ঘটনার গুণ-গান বা আলোচনা করা হয়; যেমন- একুশে ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস, ছাব্বিশে মার্চ; তেমন আবার বিশেষ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেও বিশেষ বিশেষ প্রিয়দিন বা তিথি আছে, এই রকমই, শিবের একটি প্রিয় সময় হলো ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি। শিব পুরান মতে, এই দিন শিবের আরাধনা করলে তিনি যতটা খুশি হন, সারা বছরের অন্যদিনগুলোতে করলে ততটা খুশি হন না এবং এই রাতে শিবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যা কিছু করা হয়, তাকে বলে শিব রাত্রির ব্রত।

ব্রতের আগের তিথি অর্থাৎ ত্রয়োদশীতে নিরামিষ খেতে হয় এবং চুতর্দশীতে উপবাস থাকতে হয়। শিবরাত্রির রাতে সারারাত জেগে শিব মাহাত্ম্য শ্রবণ ও কীর্তন এবং বিভিন্ন উপাচার দিয়ে শিবের পূজা করে কাটাতে হয়, একান্তই ঘুম পেলে বিছানায় না ঘুমিয়ে মাটিতে সন্ন্যাসীর মতো ঘুমাতে হয়।

শিবরাত্রির উৎপত্তি হিসেবে শিবপুরাণে বলা হয়েছে,

অতি প্রাচীনকালে বারাণসী তথা কাশীধামে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ বাস করত । সে প্রচুর জীব হত্যা করত । একদিন শিকারে বেরিয়ে, ফেরার পথে ক্লান্ত হয়ে সে এক গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়ে এবং যখন সে জাগে, তখন রাত হয়ে যাওয়ায় আর বাড়ি ফিরতে না পেরে হিংস্র জীবজন্তুর ভয়ে গাছে উঠে রাত কাটায়; ঘটনাক্রম সেটা ছিলো শীতের রাত, যে সময়ে সাধারণভাবে প্রচুর শিশির পড়ে, এবং তিথি ছিলো ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী, যেটা শিবের প্রিয় তিথি; ব্যাধ যে গাছে উঠেছিলো, সেটা ছিলো বেল গাছ এবং সেই বেল গাছের নিচে ছিলো শিবের প্রতীক একটি শিবলিঙ্গ। এখানে আর একটা তথ্য জানিয়ৈ রাখি, তুলসী গাছে যেমন স্বয়ং বিষ্ণু বাস করে, তেমনি বেল গাছে বাস করে শিব। যা হোক, সারাদিন শিকার করার পর ব্যাধ ছিলো অভূক্ত অর্থাৎ উপবাসী, শিশিরে ভিজে এবং শীতের প্রকোপে ব্যাধ গাছে উঠে কাঁপছিলো, যেই কাঁপুনির প্রভাবে বেলের গাছ থেকে দু্ একটি ঝরা পাতা শিব লিঙ্গের উপর পড়েছিলো এবং ব্যাধের দেহ থেকেও শিশিরের জল শিবলিঙ্গের উপর পড়েছিলো। এইভাবে সারারাত কষ্ট করে জেগে থেকে ব্যাধ নিজের অজান্তেই শিবরাত্রির ব্রত পালন করে ফেলে।

যা হোক, ব্যাধ পরের দিন বাড়ি ফিরে যায় এবং যথা সময়ে তার মৃত্যু হলে, তার প্রাণী হত্যার পাপ স্বরূপ যমরাজ তাকে যমলোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপস্থিত হয়, কিন্তু শিবের অনুচরেরা তাকে শিবলোকে নিয়ে যায়; এর কারণ জানার জন্য যমরাজ শিবের কাছে উপস্থিত হলে, শিব বলে, এই ব্যাধ প্রাণী হত্যা করে শত পাপ করলেও নিজের অজান্তেই সে একবার শিবরাত্রির ব্রত করেছিলো, সেজন্য সে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়েছে।

শিবপুরানের মাধ্যমে এই কাহিনী পরে পৃথিবীতে প্রচলিত হয় এবং শিবরাত্রির ব্রত চালু হয়।

এটি একটি পৌরাণিক গল্প, যে গল্পগুলো সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেবার জন্য  রচনা করা হয়েছিলো, যে গল্পগুলোর কোনো মাথা মুণ্ডু নেই, যে গল্পগুলো পরে নানাভাবে বিকৃত হয়ে গেছে এবং একই বিষয়ের গল্প একেক পুরাণে একেক রূপ ধারণ করেছে, যেসব গল্পের সাপেক্ষে কোনো প্র্শ্ন করলে বাস্তবতার ভিত্তিতে তার কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়া যায় না; তাই পৌরাণিক গল্পগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, শোনার দরকার হলে এগুলো শুধু শুনবেন, এগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না বা এর উপর ভিত্তি করে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা চাইবেন না।

পৌরাণিক গল্পগুলোর উপর ভিত্তি করে শিবকে যদি চেনা না যায় তাকে ব্যাখ্যা করা না যায়, তাহলে শিব আসলে কে ?

হিন্দুশাস্ত্র মতে, সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর হলো পরমব্রহ্ম, যাকে শুধু ব্রহ্মও বলা হয়। পরমাত্মারূপে এই ব্রহ্ম সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত, এই জন্যই হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে,

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”
এর অর্থ হলো- সকলের মধ্যে ব্রহ্ম বিদ্যমান। - (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৩/১৪/১, বেদান্ত দর্শন)

পরমব্রহ্ম, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, এই তিনটি রূপে তার কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তার নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তার নাম বিষ্ণু; যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তার নাম শিব বা মহেশ্বর। কিন্তু আমরা স্থূল দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে বিভক্ত করে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরে এই তিনভাগে বিভক্ত করেছি এবং এই তিনটি সত্ত্বাকে আলাদা আলাদা তিনটি রূপ দান করেছি। প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, এগুলো জাস্ট তিনটি নাম এবং এই তিনটি নাম পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের নাম মাত্র।

তবে কার্যকারিতার দিক থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর সমশক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও, সৃষ্টির মূল হলেন বিষ্ণু বা নারায়ণ, যিনিই ব্রহ্ম নামে পরিচিত; এই বিষ্ণু থেকেই ব্রহ্মার এবং ব্রহ্মা থেকে মহেশ্বর বা শিবের উৎপত্তি। যেহেতু সৃষ্টির মূল ব্রহ্ম এবং সকল দেবশক্তি ব্রহ্মেরই অংশ এবং অধীন, সেহেতু ব্রহ্মা ও মহেশ্বরকে, বিষ্ণু নিজের সমশক্তি হিসেবে এবং অন্যান্য দেবশক্তিকে অধীনস্থ হিসেবে গ্রহণ করে সৃষ্টিকার্য পরিচালনা করছেন।

যা হোক, কার্যকারিতার দিক থেকে ব্রহ্ম এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ব্যাপারটা সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রীর হাতে তিনটি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে; তো যখন প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী যে মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করেন বা ফাইলে সই করেন, তখন তিনি কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী। ব্রহ্মও ঠিক সেরূপ, তিনি যখন যে কাজ করেন, তখন সেই রূপের নামে কাজটি করেন, সেই তিনটি নামই হলো- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।

এই ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার করার জন্য বলছি, অনেকে বা সকলেই জানেন, বিষ্ণু পালন কর্তা। তাহলে বিষ্ণুর অবতারদের তো যুদ্ধ, ধ্বংস, বিনাশ এই সব করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিষ্ণুর আংশিক অবতার রাম কি যুদ্ধ করে রাবনের বংশকে বিনাশ করে নি ? বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ কি নিজে- কংস, শিশুপালকে হত্যা করে নি ? কৃষ্ণ কি ভীমের মাধ্যমে জরাসন্ধ, দুর্যোধনকে হত্যা করায় নি ? কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের মাধ্যমে কুরুবংশকে ধ্বংস করে নি ? বিষ্ণু যদি কোনো আলাদা সত্ত্বা হতো আর তার কাজ শুধু যদি পালন করা হতো, তাহলে তাঁর অবতারগণ কি সে এই যুদ্ধ, বিনাশগুলো করতো ? আসলে এগুলো করিয়েছেন ব্রহ্ম, আমাদের শাস্ত্রকারা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। না হলে পৃথিবীতে এত বিষ্ণুর অবতার, সেই তুলনায় ব্রহ্মা ও শিবের কোনো অবতার নেই কেনো ? আসলে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর তো আলাদা কেউ নয়। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তারই নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তারই নাম বিষ্ণু এবং যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তারই নাম শিব বা মহেশ্বর; যে কথা বলা আছে গীতার এই শ্লোকে-

“অবিভক্তংচ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্।
ভূতভর্তৃ চ তজজ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।”

অর্থ- পরমেশ্বরকে যদি যদিও সমস্ত ভূতে বিভক্তরূপে বোধ হয়, কিন্তু তিনি অবিভক্ত। যদিও তিনি সর্বভূতের পালক, তবু তাঁকে সংহার কর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলে জানবে।

এতক্ষণে পাঠক-পাঠিকাদেরকে নিশ্চয় এটা বোঝাতে পেরেছি যে, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা আলাদা কেউ নয়, তারা একই ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ; তাহলে লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং দুর্গা বা কালী কে ?

ব্রহ্ম যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করেন তখন তার নাম হয় ব্রহ্মা, আর যেহেতু যেকোনো কিছু সৃষ্টি করতেই লাগে জ্ঞান এবং প্রকৃতির নিয়ম হলো নারী ও পুরুষের মিলন ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হয় না, সৃষ্টি বলতে সাধারণ অর্থে এখানে মানুষকেই বোঝানো হচ্ছে, সেহেতু প্রকৃতির এই নিয়মকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই ব্রহ্মার নারীশক্তি হলো সরস্বতী, যাকে আমরা স্থূল অর্থে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে মনে করি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে কিছু নেই, এমন কি ব্রহ্মা বলেও আলাদা কোনো সত্ত্বা নেই, লেখক কর্তৃক গল্প-উপন্যাসে, একাধিক চরিত্র সৃষ্টির মতো সবই ব্রহ্মের খেলা, এখানে ব্রহ্মই সবকিছু ।

আবার, কোনো কিছু তৈরি বা সৃষ্টি করতে হলে যেমন লাগে জ্ঞান, তেমনি সৃষ্টিকে নিখুঁত করার জন্য নজর রাখতে হয় চারেদিকে, এই চারিদিকে দৃষ্টি রাখার জন্যই কল্পনা করা হয়েছে ব্রহ্মার চারটি মাথা এবং তার নারীশক্তি সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে জ্ঞানের দেবী হিসেবে।

বিষ্ণুকে কল্পনা করা হয়েছে পালনকর্তা রূপে, কাউকে পালন করত লাগে ধন সম্পদ, এজন্যই বিষ্ণুর নারী শক্তিকে হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীকে।

এবার আসি শিব বা মহেশ্বরে। ব্রহ্মের ধ্বংকারী রূপের নাম শিব, মহেশ্বর বা রুদ্র। সৃষ্টি বা পালন করতে যেমন লাগে নারী শক্তি, তেমনি ধ্বংস করতেও লাগে নারী শক্তি। একারণেই রামায়ণের সীতা ও মহাভারতের দ্রৌপদীর জন্ম। এছাড়াও বিখ্যাত, গ্রীস ও ট্রয়ের মধ্যকার যুদ্ধের কারণও ছিলো এক নারী, নাম হেলেন। নারী শক্তি যেমন ধ্বংসের কারণ হতে পারে, তেমনি নারী নিজেও ধ্বংস করতে পারে। প্রকৃতির এই নিয়মকে স্বীকৃতি দিতেই ব্রহ্মের ধ্বংসকারী রূপ মহেশ্বর বা শিবের নারী শক্তি হলো দুর্গা, যার আরেক রূপের নাম কালী।

আবার আমরা অনেকেই কোনো কোনো দেব-দেবীকে ছোট আবার কোন দেব-দেবীকে বড় বলে মনে করি, কিন্তু আসলে ব্যাপারটা কী ?

আমরা দেবাদিদেব মহাদেব বলে আদি দেব হিসেবে শুধু মাত্র শিবকে বুঝলেও, আসলে আদি দেব তিন জন, তারা হলেন- ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর বা শিব। সাধারণভাবে এই তিন দেবতাকে বড় বলে মনে করা হলেও আসলে দেবতাদের মধ্যে কোনো ছোট বড় নেই, সকল দেবতাই গুরুত্বের দিক থেকে সমান। ভূমিকার দিক থেকে কাউকে কাউকে আমরা ছোট বড় বলে ভাবতে পারি, কিন্তু কোনো দেবতাই যে ছোট বা বড় নয়, এটা আমরা বুঝতে পারবো যদি গীতার বাণীর অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে পারি।

যেমন- দেবতা হিসেবে কার্তিকের খুব বেশি ভূমিকা নেই, সে বিখ্যাত দেবতাও নয়, সমগ্র বাংলায় আলাদা হিসেবে কার্তিক পূজা হয় শুধু পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায়; দুর্গা পূজার বিশালত্বে কার্তিক খুবই ছোট একটি দেবতা, কিন্তু এই কার্তিক সম্পর্কে গীতার ১০ম অধ্যায়ের ২৪ নং শ্লোকে বলা আছে,

"সেনানীনামহং স্কন্দঃ"

আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন যে, কার্তিকের অন্য নাম স্কন্দঃ এবং স্কন্দপুরাণেই কার্তিকের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। "সেনানীনামহং স্কন্দঃ" এই কথার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, আমিই কার্তিক। তার মানে কার্তিক মানেই শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণ মানেই শ্রীবিষ্ণু, শ্রীবিষ্ণু মানেই পরম ব্রহ্ম, অর্থাৎ কার্তিকই হলেন পরমব্রহ্ম বা সৃষ্টিকর্তা। এখন চিন্তা করুন, আপাতদৃষ্টিতে কার্তিককে আমরা ছোট দেবতা বলে বিবেচনা করলেও, আসলে তিনি কে ?

আবার শ্রীকৃষ্ণ, বিষ্ণুর অবতার হলেও তাকে আমরা অবতার বলে গণ্য করি না; যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার, তাই কৃষ্ণকে আমরা ভগবান এবং পরমেশ্বর মনে করি। এখানে একটা বিষয় বলা প্রয়োজন যে, ভগবান এবং ঈশ্বর কিন্তু একই অর্থ বহন করে না। ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য-এই ছয়টি গুণ যার মধ্যে থাকে তাকে বলে ভগবান এবং সকল গুন যার মধ্যে থাকে তাকে বলে ঈশ্বর। এই ঈশ্বরের কোনো ধ্বংস নাই, ধ্বংস নাই বলেই তার নাম ঈশ্বর, আর যার ধ্বংস আছে তাকে বলে নশ্বর। যা হোক, যার মধ্যে উপরের ছয়টি গুন আছে, তাকে বলা হয় ভগবান। কিন্তু এই ছয়টি গুন অর্জন করা মানব রূপে জন্ম নেওয়া কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এই ছয়টি গুন শুধু মাত্র অবতার রূপে জন্ম নেওয়া মানুষ এবং দেবতাদের মধ্যেই থাকা সম্ভব। একারণেই বিষ্ণুর আংশিক অবতার হিসেবে মানবরূপে জন্ম নেওয়া- রাম, বলরাম ও পরশুরামকে বলা হয়- ভগবান রাম, ভগবান বলরাম এবং ভগবান পরশুরাম; আবার শ্রীকৃ্ষ্ণকেও আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলি; কারণ পূর্ণ অবতার বা ঈশ্বর হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে শুধু ৬টি নয়, সকল গুণই আছে; একারণেই শ্রীকৃষ্ণ একই সাথে ভগবান এবং ঈশ্বর। ব্যাপারটা এমন- কিছু সরকারি ক্ষমতা থাকলে কেউ কেউ মন্ত্রী, কিন্তু যার সকল ক্ষমতা আছে সে প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীও একজন মন্ত্রী। অর্থাৎ সকল মন্ত্রীই প্রধানমন্ত্রী নয়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই যেকোনো মন্ত্রী। সেইরকম ঈশ্বর মানেই ভগবান, কিন্তু সকল ভগবান ঈশ্বর নয়।

উপরের এই আলোচনায় আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ বড় এবং রাম ছোট; যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ, বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার এবং রাম আংশিক অবতার। কিন্তু গীতার ১০/৪১ শ্লোকে বলা আছে,

"রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্"

অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শস্ত্রধারীদের মধ্যে আমিই রাম। তার মানে হলো- রাম ও যা, শ্রীকৃষ্ণও তাই। অর্থাৎ দুজনেই সমান।

আবার আপাত দৃষ্টিতে একজন ছোট দেবী হলো লক্ষ্মী; কারণ লক্ষ্মী পূজার আয়োজন ও ফোকাস সরস্বতী পূজার চেয়েও কম। কিন্তু উপরেই জেনেছেন, লক্ষ্মী আসলে বিষ্ণুর নারী শক্তি, অর্থাৎ লক্ষ্মী মানেই বিষ্ণু এবং বিষ্ণু মানেই পরমব্রহ্ম, সুতরাং লক্ষ্মী কে, সেটা নিশ্চয় এবার বুঝতে পারছেন ?

একই ভাবে সরস্বতী, ব্রহ্মার নারী শক্তি এবং দুর্গা বা কালী, শিবের নারী শক্তি। তার মানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা, কালী, কার্তিক গনেশসহ যে দেব-দেবীরই পূজা করেন না কেনো, তা আল্টিমেটলি পরম ব্রহ্ম বা ঈশ্বরেরই পূজা, তাই কোনো দেব-দেবী ই ছোট নয় বা কেউই বড় নয়, সবাই সমান এবং চুড়ান্ত বিচারে সবাই এক, সবাই পরমেশ্বর ব্রহ্মের এক একটি রূপ।

এই সব তত্ত্ব যখন কোনো হিন্দু জানবে, তখন সে আর নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট দেবতার ভক্ত বলে মনে করবে না; কারণ, সে তখন নিজেকে চিনতে পারবে এবং জানতে পারবে যে, সে যে দেবতারই ভজনা করুক না কেনো, তার প্রার্থনা আসলে পৌঁছায় একজনেরই কাছে, যেটা হলো রুট বা মূল; এই মূলটাকে সে চেনেনা বলেই, ক্ষুদ্র গণ্ডীতে নিজেকে আটকে রেখে নিজের পরিচয় দেয়, আমি অমুকের ভক্ত বা অমুকের অনুসারী বলে! কিন্তু এটা মনে করে, নিজে সমুদ্রের সন্তান হয়ে, সে যে নিজেকে কোনো নদীর সন্তান বলে পরিচয় দিচ্ছে, যেটা সে নিজেই জানে না।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

সরস্বতী পূজা কী ও কেনো ? (সংক্ষিপ্ত)


সরস্বতী পূজা  কী ও কেনো ? (সংক্ষিপ্ত)

কোনো হিন্দুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, দেবী সরস্বতী কে ? বলবে, জ্ঞানের দেবী, বিদ্যার দেবী। আর ? আর কোনো তথ্য তার কাছে নেই। এরপর হয়তো দু’চার জন হিন্দু বলবে যে, সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে কিছু নেই বা কিছু হয় না। তাহলে-

দেবী সরস্বতী কে ?

পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সৃষ্টিকারী রূপের নাম ব্রহ্মা আর ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম সরস্বতী; এর মানে হলো সরস্বতীই ব্রহ্মা, আর ব্রহ্মা মানেই পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর, অর্থাৎ সরস্বতীই পরমেশ্বর বা ঈশ্বর। অনেকেই সরস্বতীকে ছোটো দেবী হিসেবে মনে করে, প্রকৃতপক্ষে দেব-দেবীদের মধ্যে ছোট বা বড় বলে কিছু নেই, সব দেব-দেবী ই সমান; সুতরাং সরস্বতী, ঈশ্বরেরই একটা রূপের নাম এবং স্ত্রীলিঙ্গে স্বয়ং ঈশ্বরীরূপে সরস্বতীই পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর।

সরস্বতীর গায়ের রং সাদা কেনো ?

দেবী সরস্বতীর শুভ্র মূর্তি নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রতীক; এটা এই শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক ছেলে মেয়েকে হতে হবে নিষ্কলুষ নির্মল চরিত্রের অধিকারী; যে ছেলে মেয়েবাল্য কাল থেকে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা করবে, সে যে সারা জীবন তার সকল কর্ম ও চিন্তায় নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে পারবে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই।

সরস্বতীর সাথে রাজহাঁস থাকে কেনো ?

রাজ হাসেঁর মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে, এক পাত্রে থাকা জল মিশ্রিত দুধের থেকে সে শুধুমাত্র দুধ শুষে নিতে পারে। সরস্বতী যেহেতু শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট পূজা, সেই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যেতে পারে যে, রাজহাসেঁর এই তথ্য শিক্ষার্থীদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সবকিছুই থাকবে, তার মধ্যে থেকে তোমাদেরকে শুধু ভালোটুকু শুষে নিতে হবে। অধিকাংশ হিন্দু ছেলে-মেয়েরা যে মেধাবী এবং চরিত্রবান বা চরিত্রবতী, সরস্বতী পূজা এবং তার রাজহাঁসজনিত এই শিক্ষাই তার কারণ।

সরস্বতীর হাতে বীণা থাকে কেনো ?

এর কারণ হচ্ছে-হিন্দুধর্ম হলো নাচ, গান সমৃদ্ধ শিল্পকলার ধর্ম; যা সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে সাপোর্ট করে। কারণ, প্রত্যেক ছেলে মেয়েই কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহন করে; প্রকৃতির ধর্ম হিসেবে হিন্দুধর্ম এই সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, এই কারণেই দেবী সরস্বতীর হাতের বীণা হচ্ছে সেই শিল্পকলার প্রতীক। আর এটা সুধীজন স্বীকৃত যে, যারা- নাচ, গান, কবিতা লেখা বা নাট্যচর্চার মতো শিল্পকলার সাথে জড়িত, তারা সাধারণত কখনো মিথ্যাও বলে না; চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ তো দূরের ব্যাপার। সাধারণ ভাবে সকল হিন্দুই যে সৎ প্রকৃতির এবং প্রত্যেক হিন্দু ছেলে মেয়েই যে শিল্পকলার কিছু না কিছু না জানে, এটাই তার অন্যতম কারণ।

সরস্বতীর হাতে পুস্তক থাকে কেনাো ?

পুস্তক হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার বা জ্ঞানের বাস হলো পুস্তকে। যেহেতু সরস্বতী হলো জ্ঞানের দেবী, তাই তার হাতে থাকে পুস্তক বা পূজায় পাঠ্যপুস্তক দিতে হয়। পৃথিবীতে হিন্দুরাই একমাত্র জাতি যারা জ্ঞানার্জনের জন্য পূজা প্রার্থনা করে। একারণেই হিন্দুরা একটি জ্ঞান পিপাসু এবং জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি। এখনও যেকোনো স্কুলে যে কয়জন হিন্দু ছাত্র ছাত্রী পাওয়া যাবে, দেখা যাবে তাদের মধ্যে৯০% ই জিনিয়াস।

সরস্বতীর দুই হাত না চার হাত ?

বর্তমানে দেবী সরস্বতীকে দুই হাত বিশিষ্ট দেখা গেলেও দেবী সরস্বতীর মূল মূর্তি আসলে চার হাত বিশিষ্ট, এরকম ছবি আপনারা অনেকে জায়গায় দেখলেও দেখে থাকতে পারেন, সরস্বতীর মূল থিমের সাথে এই চার হাত ই মানানসই; কারণ হলো- পড়াশুনার পাশাপাশি কেউ যদি নাচ গান বা অন্য যে কোনো শিল্পকলায় এক্সপার্ট হতে চায়, তাকে দুই হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করলে চলবে না, তাকে চার হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করত হবে।

সরস্বতীর আসন, রাজহাঁস, না পদ্মফুল ?

অনেক কাঠামোতে দেখা যায়, সরস্বতী দেবী হাঁসের উপর বসে আছে আবার কোনো কাঠামোয় দেখা যায় পদ্মফুলের উপর; পদ্মফুলের উপ সরস্বতীর আসন ই সঠিক আসন। এর কারণ- পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মফুল হলো সফল ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক; এই কারণেই লেখা হয়েছে- “ফুলের মতো গড়বো মোরা মোদের এই জীবন” এই ধরণের কবিতা। এককথায় ফুলের বিকাশের সাথে মানুষের জীবনের বিকাশকে তুলনা করা হয়েছে। পূর্ণ বিকশিত একটি পদ্মফুলের উপর সরস্বতীর বসে থাকার মানে হলো- সরস্বতীর আদর্শকে লালন করে নিজের জীবনকে বিকশিত করতে পারলে সেই জীবনও ফুলের মতোই পবিত্র, সুন্দর, বিকশিত ও সমৃদ্ধ হবে।

সরস্বতী কেনো মাতৃ মূর্তি ?

স্বয়ং ঈশ্বর হলেও সরস্বতী নারী মূর্তি অর্থাৎ মাতৃমূর্তি, এর কারণ হলো- পিতার চেয়ে মায়ের কাছে কোনো কথা বলা সহজ বা কোনো কিচু চাওয়া সহজ। সরস্বতীর পূজারীরা যেহেতু সাধারণভাবে শিশু বা বালক-বালিকা অর্থাৎ শিক্ষার্থী, তাই তারা যাতে সহজে নিজের মনের কথা নিজের মনের আকুতি, দেবী মায়ের কাছে জানাতে পারে, এজন্যই সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে মাতৃরূপে।

শেষে একটা ছোট্ট তথ্য- বৌদ্ধ মতবাদ যেহেতু সনাতন ধর্ম থেকে উদ্ভূত, সেই কারণেই হোক বা হিন্দুদের জ্ঞান অর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখেই হোক, বৌদ্ধরাও সরস্বতী পূজা করে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রী কৃষ্ণ।
----------------------------------------------------
বি.দ্র – সরস্বতী পূজা সম্পর্কে পুস্তিকা ছাপানো যায়, এরকম একটি বিস্তারিত লেখা এর আগে পোস্ট করেছি। কিন্তু সবার পক্ষে পুস্তিকা ছাপানো সম্ভব হবে না বিবেচনা করে সরস্বতী পূজা সম্পর্কে সাধারণ তথ্যগুলো দিয়ে এই লেখাটি সংক্ষপ্তিভাবে এমনভাবে লিখেছি, যাতে A4 সাইজ কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় এটি ফটোকপি করা যায় বা এই সাইজের কাগজে প্রিন্ট করে হ্যান্ডবিল বানিয়ে বিলি করা যায়। আমার বন্ধুদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে, আমি আশা করবো প্রতি জনে ৫০ কপি করে ফটোকপি করে বা কয়েকজন মিলে একসাথে ১ হাজার কপি প্রেস থেকে ছাপিয়ে আপনার এলাকার প্রতিটি হিন্দু বাড়িতে বা জনে জনে বিলি করুন, যাতে একজন হিন্দুও সরস্বতী পূজার সাধারণ তথ্যগুলো জানা থেকে বঞ্চিত না হয়।