Showing posts with label প্রশ্নোত্তর. Show all posts
Showing posts with label প্রশ্নোত্তর. Show all posts

Thursday, 1 October 2020

নারায়ণের কি দুই স্ত্রী ?

নারায়ণের কি দুই স্ত্রী ?

দেব দেবীদের স্বামী বা স্ত্রী বলে কিছু নেই। পার্থিব জগতে শুধু নারী শক্তি বা শুধু পুরুষ শক্তি অপূর্ণ এবং নারী ও পুরুষের সম্মিলিত শক্তিই যেহেতু পূর্ণশক্তি, এই তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দেবতাদের শক্তির অর্ধাংশকে নারী শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যাকে স্থূল বিবেচনায় আমরা স্ত্রী হিসেবে মনে করি। তাই দেব-দেবীদের স্বামী স্ত্রী তত্ত্ব খুব সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য, উচ্চস্তরের জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য নয়।

যা হোক, এই সাধারণ দৃষ্টিতে বিষ্ণু বা নারায়ণের স্ত্রী হিসেবে লক্ষ্মীকে কল্পনা করা হয় বা বলা হয়। এটাই মোটামুটিভাবে সবর্জন পরিচিত। কিন্তু ফটোপোস্টে দেখুন, নারায়ণের স্ত্রী হিসেবে দুজনকে দেখানো হয়েছে এবং তার পক্ষে যজুর্বেদের ৩১/২২ নং মন্ত্রের রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে, যা মোটেই সত্য নয়, নিচে তার প্রমাণ দিচ্ছি-

যজুর্বেদের যে মন্ত্র ফটোপোস্টে লিখা হয়েছে, সেটা মোটামুটি ঠিকই আছে, শুধু প্রথম শব্দ 'হ্রীশ্চ' এর স্থলে 'শ্রীশ্চ' হবে। কিন্তু এর অনুবাদে যে ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেটা প্রায় সম্পূর্ণ ভুল; হরফ প্রকাশনীর বেদ থেকে আমি এর অনুবাদ তুলে দিচ্ছি এবং অগ্নিবীর কর্তৃক প্রকাশিত ড. তুলসী রাম শর্মা এর ইংরেজিতে অনুবাদিত বেদ থেকেও একটি স্ন্যাপশট দিচ্ছি, যা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন যে #Amit_Barman এর ফটোপোস্টে এই মন্ত্রের যে অনুবাদ দেওয়া হয়েছে সেটা ভুল এবং এখানে নারায়ণের দুই স্ত্রীর বিষয়ে কোনো কথাই বলা হয় নি। নিচে দেখে নিন মন্ত্রটির অনুবাদ-

"হে আদিত্য, সম্পদ ও সৌন্দর্য তোমার পত্নীস্থানীয়, দিন রাত তোমার পার্শ্বস্থানীয়, নক্ষত্রগুলি তোমার রূপ, দ্যাবা পৃথিবী তোমার বিস্তৃত মুখ সদৃশ, এরূপ তোমার নিকট প্রার্থনা করি- পরলোক আমার ইষ্ট হোক, আমি যেন সর্বলোকাত্মক হই।"

-এখানে ভালো করে খেয়াল করুন, মন্ত্রের শুরুতেই বলা হয়েছে- সম্পদ ও সৌন্দর্য তোমার পত্নীস্থানীয়, এই সম্পদ ও সৌন্দর্যকেই শ্রী বা লক্ষ্মী বলা হয়, যে কারণে সাধারণভাবে বিষ্ণু বা নারায়ণের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী। এখানে সম্পদ ও সৌন্দর্য দ্বারা দুই সত্ত্বাকে বোঝানো হয় নি, বোঝানো হয়েছে একই সত্ত্বাকে। তুলসী রাম শর্মার ইংরেজি অনুবাদেও দেখুন, বলা হয়েছে- Beauty is yours, Glory is yours, এই বিউটি এবং গ্লোরি আলাদা বিষয় নয়, একই বিষয়। যার বিউটি থাকে, তার যেমন গ্লোরি থাকে, তেমনি যার গ্লোরি থাকে, তার বিউটিও থাকে। এখানে বিউটি মানে সৌন্দর্য এবং গ্লোরি মানে সম্পদ, ঐশ্বর্য; যারা একে অপরের পরিপূরক; তাই যেখানে সম্পদ থাকে, সেখানে সৌন্দর্যও থাকে; যেখানে সম্পদ বা ঐশ্বর্য থাকে না, সেখানে সৌন্দর্যও থাকে না। একারণে সম্পদ এবং সৌন্দর্যকে আলাদা ধরে নেবার কোনো কারণ নেই এবং এটার উপর ভিত্তি করে আদিত্য বা নারায়ণের দুই স্ত্রী, এটা ধরে নেবারও কোনো কারণ নেই।

সাধারণভাবে নারায়ণের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী; যিনি- সম্পদ, সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য হিসেবে কল্পিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্মী হলেন নারায়ণের নারীশক্তি, যে নারীশক্তি- সম্পদ, সৌন্দর্য এবং সৌভাগ্যের আধার। তাই যার জীবনে নারী অর্থাৎ স্ত্রী থাকে না, তার জীবনে এসব পরিপূর্ণভাবে থাকে না। কিন্তু ব্যতিক্রমভাবে যার জীবনে এসব কিছুমাত্রায় থাকে, তার জীবনে কোনো নারীর অভাবও হয় না।

যা হোক, নারায়ণের স্ত্রী যে একজন এবং তিনি লক্ষ্মী হিসেবে কল্পিত, আশা করছি উপরের আলোচনা দ্বারা আমার পাঠক বন্ধুদেরকে তা বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রী নারায়ণ।

"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"- গীতার এই শ্লোকে আসলে কী বলা হয়েছে ?


"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"- গীতার এই শ্লোকে আসলে কী বলা হয়েছে ?

ফটোপোস্টে গীতার যে বানীটি উ্রল্লেখ করা হয়েছে, সেটা রয়েছে গীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ১১ নং শ্লোকে এবং এই শ্লোকটি হলো-

"যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।

মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।"

এবং এর অর্থ হলো- যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদেরক সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ, সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"

"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।" এর আরও সরল মানে হচ্ছে মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যারা মানুষের মতো আচরণ করে বা করবে, তারা শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথ অনুসরণ করতে বাধ্য এবং সেই পথেই তারা শ্রীকৃ্ষ্ণকে লাভ করতে পারে বা পারবে।

এই শ্লোকটি নিয়ে আমার এক পাঠক বন্ধু যে প্রশ্নটি করেছে, তা তো ফটোপোস্টে দেখতেই পাচ্ছেন, তারপরও সেই প্রশ্নটি আমি আবারও উল্লেখ করছি-

"তাহলে পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্মের মানুষও কি তারই পথ অনুসরণ করে ?"

পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্ম বলে কিছু নেই, পৃথিবীতে ধর্ম একটাই আর সেটা হলো সনাতন ধর্ম, যাকে সনাতন মানব ধর্মও বলা হয়, যার বর্তমান প্রচলিত নাম হিন্দু ধর্ম। প্রচলিত ভাষায়- পৃথিবীতে ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, বৈষ্ণব ও জৈনসহ যে প্রায় ৪২০০ ধর্ম চালু আছে, এগুলো আসলে ধর্ম নয়, এগুলো ব্যক্তিগত মতবাদ; কারণ, কোনো না কোনো ব্যক্তির মতামতের উপর ভিত্তি করে এই থিয়োরিগুলো গড়ে উঠেছে। আর ব্যক্তিগত মতবাদকে ইংরেজিতে বলে ইজম (Ism), তাই Religion বলতে যা বোঝায়- তা ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, জৈনসহ প্রায় ৪২০০ ধর্মের একটিও নয়, রেলিজিয়ন বলতে বোঝায় শুধু একটি ধর্মকেই এবং সেটা সনাতন ধর্ম, যা আর্য ও সিন্ধু সভ্যতার মুনি ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, গীতায় বলা হয়েছে, "মনুষ্যগন সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।" এর সম্পূরক প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের মানুষ শ্রীকৃষ্ণের পথই অনুসরণ করে ?

একটু আগেই আমি বলেছি, পৃথিবীতে ধর্ম একটাই, আর সেটা হলো সনাতন, বাকিগুলো ইজম বা ব্যক্তিগত মত ও পথ। এই ব্যক্তিগত পথ বা মতের অনুসারীরা ধর্মের নামে যা বিশ্বাস ও পালন করে, সেটা মানুষের জীবন যাপনের জন্য সম্পূর্ণ নয়, তাই দৈনন্দিন জীবন যাপনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সনাতনের বিধি বিধান তারা পালন করতে বাধ্য। একটা উদাহরণ দিই- ইসলামে গান বাজনা করা ও শোনা নিষেধ, কিন্তু পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না যে গান বাজনা করতে বা শুনতে পছন্দ করে না, এককথায় টোটালি গান বাজনা শুনতে অপছন্দ করে এমন একজন মানুষও পৃথিবীতে নেই। এই গান বাজনা করা ও শোনা সনাতন ধর্মের অঙ্গ। কিন্তু ইসলামের কিছু অনুসারী আছে, যারা জঙ্গী বলে পরিচিত, তারা গান বাজনা শোনে না বা শুনতে চায় না, এমনকি অন্যেরা গান বাজনা করলে বা শুনলে সেটাও তারা সহ্য করতে পারে না, তাই তারা গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে আত্মঘাতী হামলা করে নিজেকে উড়িয়ে দেয় পরকালে আল্লার পতিতালয় বেহেশতে গিয়ে ৭২ হুরকে দোচার আশায়, মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্ম নিলেও এরা যে কোনোভাবেই মানুষ নয়, সেটা আপনারা আর একটু পরেই তথ্য প্রমানসহ বুঝতে পারবেন।

আজকের পোস্টের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, গীতায় যে বলা হয়েছে, মনুষ্যগন সর্বতোভাবে আমারই পথ অনুসরণ করে, তাহলে অন্যান্য ধর্মের মানুষও কি কৃষ্ণকে অনুসরণ করে ?- এই বিষয়টি।

সনাতন ছাড়া পৃথিবীতে যে অন্য কোনো ধর্ম নেই, সেটা তো একটু আগেই বললাম, এবার বুঝিয়ে বলছি যে পৃথিবীতে যারা মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবে তারা অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণের পথ অনুসর করে বা করতে বাধ্য।

হিন্দু শাস্ত্রের একটি বাণী হলো- 

"পরদ্রব্য লোষ্ট্রবৎ" 

অর্থাৎ, পরের সম্পদকে মাটির ঢেলা বিবেচনা করবে 

এবং 

“মাতৃবৎ পরদারেষু, কন্যাবৎ পরকন্যাষু” 

অর্থাৎ, পরের স্ত্রীকে নিজের মা এবং পরের কন্যাকে নিজের কন্যার মতো দেখবে।

-পৃথিবীতে নারী ও সম্পত্তি ই হলো সকল অপরাধের মূল, অন্যের অধিকারে থাকা এই দুটো বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ হিন্দু শাস্ত্রে একেবারে জিরো করে দেওয়া হয়েছে এবং এই দুটি বিষয় যারা মেনে চলে তারাই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে পরিচিত এবং এটাই আসলে মানুষের ধর্ম। যারা এই মানবধর্মকে মেনে চলে তারা শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথেই চলে এবং এই কথাই বলা হয়েছে গীতার ঐ শ্লোকে।

হিন্দু শাস্ত্র বলেছে, পরের সম্পদকে মাটির ঢেলা বিবেচনা করবে এবং পরের স্ত্রী ও কন্যাকে, নিজের মা ও নিজের কন্যার মতো দেখবে, কিন্তু এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে দেখূন-

"অতএব তোমরা যা কিছু ধন মাল লাভ করেছো, তা খাও, তা হালাল এবং তা পবিত্র।"- ( কোরান, ৮/৬৯)

-এখানে যুদ্ধলব্ধ ধন সম্পত্তির কথা বলা হয়েছে, ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলে গনিমতে মাল। এই গনিমতে মাল মানে পরাজিতদের যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং তাদের অধীনে থাকা নারী ও শিশু। মুসলমানদের সাথে যদি কখনো অমুসলিমদের যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে অমুসলিমরা পরাজিত হয়, তাহলে অমুসলিমদের যাবতীয় ধন সম্পদ এবং তাদের স্ত্রী কন্যাদেরকে মুসলমানরা দখল করে ভোগ করতে পারবে, সেই কথাই বলা হয়েছে কোরানের ঐ আয়াতে।

মুসলমানরা বর্তমানে কোরানে গনিমতের মালের কনসেপ্ট নিয়ে বিব্রত, তারা মুখে কখনো এই সব আয়াতের কথা তো বলেই না, পারলে কোরান থেকে ঐসব আয়াত ডিলিট করে দেয়, এই ধরণের মুসলমানরা বলতে পারে বা বলবে, কোরানের ঐ আয়াতে ধন সম্পত্তির সাথে যে নারীদের কথা বলা হয়েছে, তার প্রমান কী ? ওখানে কি নারীদের কথা উল্লেখ আছে ? এই ধরণের মুসলমানের মুখে শুয়োরের গু ভরে দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার জন্য দিলাম নিচের এই আয়াত-

"তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের উপর অধিকার অর্জন করেছে সেইরূপ নারী ব্যতীত অন্য কোনো সধবা নারী তোমাদের জন্য বৈধ নয়।"- (কোরান, ৪/২৪)

তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের উপর অধিকার অর্জন করেছে, এর মানে হলো যুদ্ধ করে যাদেরকে ধরে আনা হয়েছে, আর এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, "সেই নারী ব্যতীত", তার মানে যুদ্ধলব্ধ মালের মধ্যে নারীরাও থাকতো, এখানে তাদের কথা ই বলা হয়েছে।

এই হলো কোরান তথা ইসলামের বিধান, যেখানে স্পষ্টাক্ষরে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে অপরের স্ত্রী ও কন্যাকে ধর্ষণ করতে, এটা কোনো ঐশ্বরিক গ্রন্থ হতে পারে, না এটা কোনো ধর্ম হতে পারে ? আর যারা এই কোরান ও ইসলাম মেনে চলে তারা কি কখনো মানুষ হতে পারে ? নেভার, কখনো নয়। কোরান অনুসারে যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার মনোভাব পোষণ করে না এবং অমুসলিমদের ধন সম্পত্তিকে লুঠ করে খাওয়ার এবং অমুসলিমদের স্ত্রী ও কন্যাকে দখল করে ভোগ করার বা ধর্ষণ করার মানসিকতা পোষণ করে না, সে আসলে মুসলমানই নয়। এখন ভাবুন, এই যদি হয় মুসলমানের চরিত্র, তারা কিভাবে মানুষ হবে ? তারা কখনো মানুষ নয়, এই কারণে মুসলমানদেরকে কখনো আমি মানুষই মনে করি না, তারা মানুষের আকৃতিতে এক একটি হিংস্র, জংলী জানোয়ার। 

মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া যে ব্যক্তি, অমুসলিমদের ঘরে জন্ম নেওয়া কাউকে মানুষ হিসেবে মনে করে, অমুসলিমদের স্ত্রী ও কন্যাদেরকে নিজের মা ও কন্যার দৃষ্টিতে দেখে, ইসলামের সূত্র মতে, তারা মুসলমানই নয়; আর যারা মুসলমান নয়, তারাই মানুষ। পৃথিবীতে মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রজাতি দুটি ভাগে বিভক্ত; এক. Human, দুই. Musolman, তাই যারা মুসলমান, তারা যেমন মানুষ নয়, তেমনি যারা মানুষ, তারা কখনো মুসলমান নয়। আর যারা মানুষ, তারা জন্মসূত্রে যে মতবাদে বিশ্বাসীর ঘরে জন্ম নিক না কেনো বা যে মতবাদেই বিশ্বাসী হোক না কেনো, তারা সনাতন মানব ধর্মের নির্দেশিত পথেই চলে এবং শ্রীকৃষ্ণকে লাভের পথে এগিয়ে যায়, যে কথা বলা হয়েছে গীতার ঐ শ্লোকে এভাবে- 

"হে পার্থ, সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"

এই বিষয়টি বুঝতে হলে, এটা খুব ভালো করে বুঝতে হবে যে, মানুষের আকৃতিতে জন্ম নেওয়া যে সব প্রাণী- অপরের সম্পদ এবং অপরের স্ত্রী কন্যার দিকে নজর দেয় না, তারাই আসলে মানুষ; আর যারা এর বিপরীত কাজ করে তারা অমানুষ। গীতার এই শ্লোকে এই সব মানুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, মুসলমান নামের ইসলামী জঙ্গী জানোয়ার অমানুষদের সম্পর্কে নয় এবং মানবতার সূত্র অনুযায়ী যারা মানূষ, তারা জ্ঞাতে হোক বা অজ্ঞাতে হোক, অবশ্যই সনাতন ধর্মের বিধি বিধান মেনে চলে শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথেই চলেছে এবং এভাবে তারা আস্তে আস্তে শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

আশা করছি, আমি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে গীতার ৪/১১ নং শ্লোকটির সঠিক বক্তব্যটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 11 September 2020

জন্মান্তর কী এবং মোক্ষলাভ কিভাবে করা যায় ?


জন্মান্তর কী এবং মোক্ষলাভ কিভাবে করা যায় ?

#Sadman_Sakib_Ra'ad

সালাম ওয়ালাইকুম, আপনার আদাবের জবাবের উত্তরে শুধু আপনাকে সালাম দিলাম না, এর পেছনে অন্য একটি উদ্দেশ্যও আছে, যেটা আপনাকে বলবো এই প্রবন্ধের শেষে দিকে, এখন আপনার ১, ২ ও ৭ নং প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি, দেখে নিন নিচে-

আপনার প্রথম প্রশ্ন জন্মান্তর কী ?

-জন্মান্তর এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে যেকোনো আত্মা, তার পূর্ববর্তী সকল জন্মের কর্মফল অনুযায়ী বর্তমান জন্ম লাভ করে। বিষয়টিকে আমরা স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণীতে পাশ করার সাথে তুলনা করতে পারি। ক্লাস ওয়ানে একজন যেভাবে পড়াশোনা করে, তার ফল পায় সে ক্লাস টুতে রোল নং অনুযায়ী; ক্লাসে টু এর কর্মের ফল সে ভোগ করে ক্লাস থ্রিতে, ক্লাস থ্রির ফল ভোগ করে ক্লাস ফোরে, এভাবে আগের বছরের কর্মের ফল সে ভোগ করে বর্তমান বছরে। এবং শেষ পর্যন্ত একজন এস.এস.সি বা মাধ্যমিকে কী রেজাল্ট করবে, সেটা নির্ভর করে বিগত দশ বছর ধরে সে যেভাবে পড়াশোনা করেছে তার উপর এবং চুড়ান্তভাবে পড়াশোনার ভিত্তিতে সে কোন কর্ম করে জীবন অতিবাহিত করবে, সেটা নির্ভর করে তার সারা জীবনে পড়াশোনার কর্মের উপর।

জন্মান্তর যে ধ্রুব সত্য, তার প্রমাণ আমদের চারপাশেই রয়েছে। পৃথিবীর সকল প্রাণী জন্মান্তর প্রক্রিয়ার অধীন, অন্যান্য প্রাণীর কষ্টকর জীবন যাপনের কথা বাদ দিলেও, শুধু মানুষের কথাই যদি বিবেচনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাবো- এখানে কেউ সুন্দর, কেউ ধনী, কেউ কুৎসিত, কেউ গরীব, কেউ বিখ্যাত তার নিজ কর্মে বা জন্মসূত্রে, আবার কেউ অখ্যাত, তাদেরকে কেউ চিনেই না; কেউ শারীরিকভাবে পঙ্গু তো কেউ মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, কেউ নারী বা কেউ পুরুষ বা কেউ নপুংসক, কেউ জন্মসূত্রেই মেধাবী তো কেউ জন্মসূত্রেই মেধাহীন; কেউ জন্মসূত্রেই যুক্তিবাদী তো কেউ জন্মসূত্রেই অন্ধবিশ্বাসী; কারো জন্ম ধনীদেশে তো কারো জন্ম গরীবদেশে। এভাবে হাজারো ক্ল্যাসিফিকেশনে মানুষের জন্ম; ইসলাম অনুযায়ী যদি একই সময়ে সকল আত্মা বা রুহকে সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাহলে তারা সবাই নিষ্পাপ, তাদের কারো কোনো দোষ বা ত্রুটি নেই, তাহলে সকল রুহ বা আত্মার একই সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা আমরা দেখতে পাই না, এখানে কেউ কোনো দিক থেকে কারো সমান নয়- না ধনে, না জ্ঞানে, না সৌন্দর্যে, না জনপ্রিয়তায়, না আয়ুতে, কেউ কেউ তো নানারকমের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, আবার কেউ নিহত হয় গর্ভেই। ইসলামি সিদ্ধান্ত মতে- আল্লাহ, এই নানাভাবে মানুষের জন্ম দিয়ে কারো সাথে অন্যায় করেছেন, আবার কারো সাথে পক্ষপাতিত্ব করেছেন, কিন্তৃ সৃষ্টিকর্তা কি কারো সাথে পক্ষপাতিত্ব বা অন্যায় করতে পারেন ? যদি তিনি কারো সাথে পক্ষপাতিত্ব করেন, তাহলে কিভাবে ন্যায়বিচারক ?

কোরানের বহু জায়গায় বলা আছে- আল্লাহ, যার সাথে খুশি যা কিছু করতে পারে। কিন্তু তার সৃষ্ট করা জীব হিসেবে আল্লার এই স্বৈরাচারী সিস্টেমকে আমরা কেনো মানবো ? ক্লাস ফাইভে আমি যা পড়াশোনা করেছি, তার যোগ্য পুরস্কার যদি আমি ক্লাস সিক্সে না পাই, ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষককে আমি মানবো কেনো বা তাকে রেসপেক্ট করবো কেনো ? পৃথিবীর সকল নারী জাতীয় প্রাণী, পুরুষ জাতীয় প্রাণীদের তুলনায় একটু কষ্টভোগ বেশি করে এবং সুযোগ সুবিধা একটু কম পায়। ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদি মতবাদ অনুসারে পৃথিবীতে সকল প্রাণীর জন্ম মাত্র একবারই, সেই হিসেবে মানুষের জন্মও একবারই। তাহলে নারী হিসেবে জন্ম নেওয়া মানুষেরা আল্লাকে কি এই প্রশ্ন করতে পারে না যে- কোনো আমাকে পৃথিবীতে নারী হিসেবে জন্ম দিয়ে আমাকে এত কষ্ট ভোগ করিয়েছেন ?

ইসলাম যদি এমন কথা বলতো যে পৃথিবীতে যারা নারী হিসেবে জন্ম নেবে, তার পরকালে বিশেষ সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। ইসলামে তো সেটাও নেই। যারা পুরুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে নানারকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে, তারাই আবার মৃত্যুর পর বেহেশতে গিয়েও ৭২ হুর পাওয়া সহ নানারকম সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু নারীদের জন্য সেরকম কোনো সুযোগ সুবিধাই নেই; নারীরা, বেহেশতে স্বামীর প্রাপ্ত ৭২ হুরের দাসী হিসেবে জীবন কাটাবে আর তার স্বামী, কোন হুরের পর কোন হুর নিয়ে শুচ্ছে সেটা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে। নারীর প্রতি এই অবিচারের জন্য কোনো নারী কি আল্লাকে এই প্রশ্ন করতে পারে না যে- কেনো পৃথিবীতে আপনি আমাকে নারী হিসেবে জন্ম দিয়েছিলেন, যে জন্মে শুধু কষ্টই আর কষ্ট, আবার মৃত্যুর পর বেহেশতেও নারীদের জন্য কিছু নেই ?

এই একই প্রশ্ন পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীও আল্লাকে করতে পারে যে কেনো তাদেরকে মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে সৃষ্টি না করে ইতর শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি করে তাদেরকে এত কষ্ট দেওয়া হলো ? সকল রূহকে তো তিনি একই সাথে সৃষ্টি করেছিলেন এবং সবাই ছিলো নিষ্পাপ, তাহলে কেনো তাদের সাথে এমন বৈষম্য করা হলো ? মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে অন্যান্য প্রাণী হিসেবে জন্ম নেওয়া জীবজন্তুগুলো এই প্রশ্নগুলো অবশ্যই করবে, আর মানুষরা আল্লাকে প্রশ্ন করবে, কেনো আমাকে গরীব করে পৃথিবীতে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে কুৎসিত রূপে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে শারীরিক পঙ্গু হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে অন্ধবিশ্বাসী হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে মেধাহীন হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে ক্ষমতাহীন হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে অজনপ্রিয় হিসেবে সৃষ্টি করলেন ? কেনো আমাকে গরীব দেশে সৃষ্টি করলেন ?

আল্লার কাছে এই সব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। কোরানে যদিও বহুবার বলা হয়েছে যে- আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাই তিনি তার পেশীশক্তির জোরে একজন স্বৈরাচারী সম্রাটের মতো তার সৃষ্ট জীবদের মুখ বন্ধ রাখতে পারেন, তাহলে তিনি কি মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তি অর্জন করতে পারেন ? আল্লার পরিস্থিতিও এমন, তিনি সবার সাথে ন্যায় করেন না, কাউকে খারাপভাবে জন্ম দিয়ে কষ্ট দেন, আবার কাউকে ভালোভাবে জন্ম দিয়ে সুখ প্রদান করেন, আর যারা সুখে আছে, তাদের সংখ্যা খুবই কম, দুরাবস্থার মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি, আর মানুষ ছাড়া পৃথিবীর সকল প্রাণী তো যন্ত্রণাময় জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, মানুষদের দ্বারাও তারা কুরবানীর সময় নির্বিচারে হত্যা ছাড়াও নানারকমের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। এই সব প্রাণীরা আল্লাকে নানারকম প্রশ্ন করতেই পারে বা করবেই, যার কোনো জবাব আল্লার কাছে তো নেই ই, আল্লার অনুসারী মুসলমানদের কাছেও নেই।

এর বিপরীতে এই পুরো সিস্টেমকে সনাতন ধর্মে জন্মান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে একেবারে সকলের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ সনাতন ধর্মে বলেই দেওয়া হয়েছে জীবন হলো আত্মার ভ্রমণ এবং প্রতিটি আত্মার এই ভ্রমণ শুরু হয়েছে একেবারে পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রথম এককোষী প্রাণী এ্যামিবা দিয়ে। সময়ের সাথে সাথে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহুকোষী জটিল প্রাণীদের উৎপত্তির স্তর অতিক্রম করে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রাণীদের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে আত্মারা ঐ ধরণের প্রাণীদেহ ধারণ করে উন্নত শ্রেণীর জীবের সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে। জীবজন্তুর শ্রেণীকে অতিক্রম করে প্রাণীদের জন্য শ্রেষ্ঠ দেহ হলো মানবদেহ, একটি আত্মাকে সকল ইতর শ্রেণীর প্রাণীর দেহ ধারণ করে তাদের সকল প্রকার সুখ দুঃখকে ভোগ করে মানবদেহ ধারণের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এই যোগ্যতা অর্জনের বার সনাতন ধর্ম মতে ৮০ লক্ষ বার, অর্থাৎ ৮০ লক্ষ বার একটি আত্মা বিভিন্ন প্রাণী রূপে জন্ম নিয়ে মানবদেহ পায় এবং মানবদেহ পাওয়া মাত্রই সে সুন্দর, সুস্থ, সক্ষম শরীর পায় না, মানবরূপে প্রথম জন্মেই পায় না ধনী, জ্ঞানী, বিখ্যাত ও মানী পরিবারে জন্ম নিতে, পায় অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের দেহ, পরিবেশ ও আর্থিক অবস্থা।

জন্মান্তর প্রক্রিয়ার জ্ঞান শুধু মানুষই বুঝতে পারে, এই জ্ঞানকে হৃদয়ে ধারণ করে যখন কোনো মানুষ সনাতন ধর্মের বিধি বিধান মতে চলে তখন সে পরের জন্মে, পূর্বের জন্মের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় জন্ম নিতে পারে, এভাবে জন্ম নিতে নিতে এক পর্যায়ে সে মোক্ষের জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তখন সে সমাজের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণকর কর্ম করে ঈশ্বরের সাথে লীন হয়ে মোক্ষ অর্জন করতে পারে, যে মোক্ষ অর্জন করার পর এই যন্ত্রণাময় পৃথিবীতে কারো আর জন্ম হয় না।

আগেই বলেছি একটি আত্মা ৮০ লক্ষবার বিভিন্ন ইতর শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে জন্ম নিয়ে তাদের সুখ দুঃখ ভোগ করে মানবরূপে জন্ম নিতে পারে। এই মানবরূপেও একটি আত্মাকে সর্বোচ্চ ৪ লক্ষবার জন্ম নিতে হয়। কিন্তু এই চার লক্ষবার জন্মের শেষেই যে সে মোক্ষলাভ করবে বা করতে পারবে এমন নয়, সে আগেও মোক্ষলাভ করতে পারে বা কেউ সঠিক পথ না পেয়ে মোক্ষ লাভ নাও করতে পারে, এভাবেই কল্প এক সময় শেষ হয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে পৃথিবীর সৃষ্টি প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে যেতে পারে।

সমগ্র মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে, মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এখনও সেখানে পৌঁছতে পারে নি ব'লে সেগুলোর প্রমাণ আমরা পাচ্ছি না, কিন্তু মহাবিশ্ব জুড়ে যে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড আছে এবং সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে, একথা প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি আগে রচিত সনাতনধর্মীয় গ্রন্থে বলা আছে। তাই পৃথিবী থেকে প্রাণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও যারা মোক্ষ লাভ করতে পারে নি, তাদের কর্মফল অনুযায়ী জন্ম হবে অন্য ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনো গ্রহে এবং প্রতিটি মানুষের এই জন্মান্তর প্রক্রিয়া চলতে থাকবে অনন্তকাল ধরে যতক্ষণ সে ঈশ্বরের সাথে লীন হয়ে মোক্ষলাভ না করতে পারে।

আশা করছি- এই পোস্টে আপনার ১, ২ ও ৭ নং প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি, বাকিগুলোর জবাব দেবো পরের পোস্টে।

এবার বলি- কেনো আপনাকে পোস্টের শুরুতেই সালাম দিয়েছি। আমার কথা শুনে আপনি মন খারাপ করেন আর যা ই করেন, প্রকৃত বাস্তব ব্যাপার হচ্ছে- পৃথিবীতে কোনো প্রকৃত মুসলমান সুখে নেই, শান্তিতে নেই। কোরানের নির্দিশেই একজন প্রকৃত মুসলমান, কখনো কোনো অমুসলিমের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না, তার ভালো চাইতে পারে না, সে যদি ইসলামের দাওয়াত গ্রহন না করে তাকে হত্যা ক'রে তার ধন সম্পদ ও স্ত্রী কন্যাকে অধিকার করা মুসলমানদের কর্তব্য। মুসলমান নামধারী হলেও খুব কমসংখ্যক মুসলমানের পক্ষেই অমুসলিমদের প্রতি কোরানের যে নির্দেশ সেটা পালন করা সম্ভব। কারণ, এগুলো সম্পূর্ণ অমানবিক। কারো মধ্যে যদি সামান্যতম মানবিকতা থাকে এবং কেউ যদি যুক্তিবাদী হয়, তাহলে তার পক্ষে কিছুতেই কোরানের এসব নির্দেশ মানা সম্ভব নয়। আবার কোরানের সব নির্দেশ না মানলে কারো পক্ষে প্রকৃত মুসলমান হওয়াও সম্ভব নয়, আর প্রকৃত মুসলমান না হলে কেউ কোনো দিন বেহেশতেও যেতে পারবে না। এই ধর্মীয় নির্দেশ এবং বাস্তবতার দ্বিধাদ্বন্দ্বে অনেক মুসলমানই প্রচুর অশান্তিতে ভুগে।

আবার মুসলিম সমাজ যেহেতু আচারহীন, এরা কোনো কাজে তিথি নক্ষত্র দিন বার মাস কিছুই মানে না, বাস্তু ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশ্বাস করে না বা সেগুলো মানেও না, সেহেতু এদের জীবনে দুর্ঘটনার কোনো শেষ নেই; অনেক টাকা পয়সা খরচ করে হয়তো মেয়ের বিয়ে দিলো, কিন্তু সেই বিয়ে টিকলো না, কয়েক মাস পরেই মেয়ে হয়তো তালাক খেয়ে বা তালাক নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো, এটা একটা মানুষের জীবনে কঠিন অশান্তি; এরকম আরো ছোটখাটো অনেক ব্যাপার আছে, যেগুলো নিয়ে মুসলমানরা ভীষণভাবে অশান্তিতে থাকে।

খতনা করার ফলে কোনো মুসলমান যেমন প্রকৃত যৌনসুখ কখনোই পায় না, তেমনি আচারহীনতার কারণে কোনো মুসলমান সাংসারিক জীবনে প্রকৃত শান্তিও কখনোই পায় না। কারণ, মুসলমানরা প্রকৃত শান্তির সংজ্ঞাই জানে না। নিজেদের আচার এবং ধর্মবিশ্বাসের কারণেই মুসলমানরা যে চিরদিন অশান্তিতে থাকবে, এটা সম্ভবত আপনাদের নবী, মুহম্মদ বুঝতে পেরেছিলো, তাই এক মুসমলমান অপর মুসলমানের সাথে দেখা হলে এমন একটা কথা বলার সিস্টেম চালু করেছিলো, যাতে মুসলমানদের জীবনের অশান্তি কিছুটা লাঘব হয়। যেকারণে এক মুসলমান অপর মুসলমানকে আরবিতে বলে- আস সালামু ওয়ালাইকুম, যার অর্থ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, জবাবে অপর মুসলিমও বলে- আপনার উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। এই দুটো বাক্য থেকেই প্রমাণিত যে কোনো মুসলমান বাস্তবে শান্তিতে নেই, সবাই অশান্তিতে আছে, তাই একে অপরের জন্য দোয়া করে যাচ্ছে, যাতে তারা শান্তিতে থাকে।

একজন কোটিপতি ব্যক্তিকে কেউ যদি এই বলে দোয়া করে যে তুমি কোটিপতি হও, একজন পুত্রবতী নারীকে কেউ যদি এই বলে দোয়া বা আশীর্বাদ করে যে-তুমি পুত্রবতী হও, তাহলে কোটিপতি বা পুত্রবতী কারোরই যেমন খুশী হওয়ার কোনো কারণ নেই, যেহেতু তারা আগে থেকেই ঐসবের মালিক, সেরকম যে ব্যক্তি শান্তিতে আছে, তাকেও আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক বললে তার খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই, যেহেতু সে শান্তিতে আছে।

এইসব বিবেচনায়, ইসলামি সম্ভাষণ- আস সালামু ওয়ালাইকুম, যার অর্থ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক- প্রমাণ করে যে কোনো মুসলমান শান্তিতে নেই। আপনিও যেহেতু একজন মুসলমান এবং যেহেতু আপনি হিন্দুদেরকে আদাব দিয়ে আপনার লিখা শুরু করেছেন, সেহেতু আদাবের জবাবে আমারও তো কিছু বলা উচিত, তাই আপনাকেও সালাম দিয়ে আমার লেখা শুরু করেছি, এই সালামের মধ্যে শুধু আপনাকে সম্ভাষণ করাই আমার উদ্দেশ্য ছিলো না, আমার মনে হলো, যেহেতু মুসলমানরা সব সময় অশান্তিতে থাকে, তাই তাদের জন্য একটু শান্তি প্রার্থনাও করা যাক, আপনাকে সালাম দেওয়ার পেছনে আমার মনে আসলে এই থিম কাজ করেছে।

আর আপনি যে কী কারণে হিন্দুদের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে অপনার লিখা শুরু করেন নি, সেটাও কিন্তু আমি জানি।

আপনারা মনে করেন হিন্দুরা কাফের, তাদেরকে সালাম দিয়ে তাদের শান্তি কামনা করা গুনাহ বা পাপ, তাই কোনো হিন্দুকে সালাম দেওয়া যাবে না, এই শিক্ষা, আপনাদেরকে ছোট বেলা থেকেই দেওয়া হয়, আর এই কারণেই আপনি সালাম না দিয়ে বেয়াদবের বিপরীত শব্দ আদাব দিয়ে আপনার লিখা শুরু করেছেন। ঠিক বলেছি কি না বলেন ? কিন্তু আমরা হিন্দুরা আপনাদের মতো শুধু মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি না, আমরা যখন প্রার্থনা করি, তখন বলি- "সর্বে ভবন্তু সুখিন," অর্থাৎ বিশ্বের সকল প্রাণী সুখী হোক; আর এটাই হলো সনাতন ধর্ম এবং ইসলামের মধ্যে পার্থক্য।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Saturday, 29 August 2020

হিন্দুদের- জন্ম, মৃত্যু, বিয়েতে নাপিত লাগে কেনো ?



হিন্দুদের- জন্ম, মৃত্যু, বিয়েতে নাপিত লাগে কেনো ?

#Rudro_Dev_Rud,

কর্ম অনুযায়ী সনাতনী সমাজ চার ভাগে বিভক্ত- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র- এটা আমরা সবাই জানি। কর্মগুনেই ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়রা সমাজে ভালো অবস্থানে থাকে। সমাজে ব্রাহ্মণ তারাই, যারা বিদ্যা-বুদ্ধি খাটিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, আর ক্ষত্রিয় তারাই, যারা দেশরক্ষা এবং দেশ শাসন করে। এদের বাইরে বৈশ্যরা হলো স্বাধীন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তি, যাদের মাথার উপর কোনো বস নেই; আর শুদ্ররা হলো চাকর শ্রেণী, যাদের মাথার উপর সব সময় বস থাকে, যাদেরকে অন্যের নির্দেশে কাজ করতে হয়, স্বাধীনভাবে যাদের কাজ করার কোনো ক্ষমতা নেই।

বৈশ্য শ্রেণীর লোকজন সাধারণত ব্যবসায়ী হয়, সেটা ক্ষুদ্র ব্যবসা হোক বা বৃহৎ। কামার, কুমার, জেলে, নাপিত, ধোপা- এরাই বৈশ্য শ্রেণীর নিম্নস্তরের মানুষ, যাদেরকে সাধারণ মানুষ শুদ্র ব'লে বিবেচনা করে ভুল করে থাকে।

সমাজে মানুষের মর্যাদা নির্ণিত হয় অর্থের ভিত্তিতে। তো সমাজে যারা নিম্ন আয়ভূক্ত মানুষ, তাদেরকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে অর্থ সহায়তা করার ব্যবস্থা সনাতন ধর্মে রয়েছে, যেহেতু সনাতন ধর্মে ভিক্ষা করা বা গরীব থাকা পাপ। তাই সনাতনী হিন্দু সমাজে কোনোরকম পারিশ্রমিক বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দেওয়া নিষেধ বা কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়াও নিষেধ।

সনাতনী হিন্দু সমাজে- বিয়ে, জন্ম এবং মৃত্যুর সময় বাধ্যতামূলক নাপিত লাগার কারণ হলো এটাই। নাপিতরা যেহেতু সমাজের নিম্নআয়ভূক্ত মানুষ, সেহেতু নাপিতদেরকে সামান্য কাজ করিয়ে নিয়ে এত বেশি পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়, যা তার কাজের পারিশ্রিমিকের তুলনায় বহুগুন বেশি, নিম্নআয়ভূক্ত মানুষদের জন্য এটা একপ্রকার সামাজিক সহায়তা।

ইসলামে নিম্নআয়ভূক্ত মানুষদের জন্য যাকাত ফিতরার ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে গরীব লোকজন বিনা পরিশ্রমে ধনীদের কাছ থেকে বছরে একবার করে অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে। কিন্তু কাউকে বিনা পরিশ্রমে অর্থ সহায়তা করে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা যায় না। বিনা পরিশ্রমে অর্থ সহায়তা পেলে মানুষ কর্মবিমুখ হয় এবং তাতে মানুষ আরো গরীব হয়। খেয়াল করে দেখবেন, গ্রামের দরিদ্র লোকজন, যারা সাধারণত প্রতিদিন শ্রম বিক্রি করে অর্থ আয় করে, তারা যখন মাঝে মাঝে সরকার থেকে রিলিফ পায়, তখন সেই পাঁচ/সাত কেজি রিলিফের চাল নেওয়ার জন্য সেদিন আর কাজ করে না, যে চালের দাম খুব বেশি হলে দেড়শ বা দুইশ টাকা, কিন্তু সে যদি কাজ করতো, তাহলে সে ঐ দিন ৩০০ বা চারশ টাকা আয় করতে পারতো। এভাবেই বিনা পরিশ্রমে পাওয়া অর্থ মানুষকে গরীব থেকে আরো গরীব করে, এতে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

ইসলামে বলা আছে- গরীবরা, ধনীদের চেয়ে ৫০০ বছর আগে বেহেশতে যাবে, আবার কুরবানীর মাংসের তিন ভাগের একভাগ সব সময় গরীবদের মাঝে বন্টন করতে হবে এবং যাকাত ফিতরার অর্থও গরীবদের জন্য বরাদ্দ, এই বিষয়গুলো নির্দেশ করে যে ইসলাম হলো গরীবদের ধর্ম এবং এখানে একতৃতীয়াংশ লোক সব সময় গরীব থাকবে; কারণ, একতৃতীয়াংশ লোক যদি গরীব না থাকে তাহলে যাকাত ফিতরা এবং কুরবানীর একতৃতীয়াংশ মাংসের হবে টা কী ?

কিন্তু সনাতন বা হিন্দু ধর্ম গরীবদের ধর্ম নয়। কোনো লোক যাতে গরীব না থাকে, সেজন্য সনাতন ধর্মে ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করার বিধান রয়েছে। অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে লক্ষ্মীর পূজা করলেই যে কেউ প্রচুর ধনী হয়ে যাবে, এমনটা নয়; তবে লক্ষ্মী পূজার কিছু শিক্ষা আছে, সেগুলো যদি কেউ জানে এবং সেগুলো যদি মেনে চলে, তাহলে যে সে ধনী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; শুধু তাই নয় ধন-সম্পদজনিত মানুষের যে বিপদ আপদ ঘটে, সেগুলো থেকেও সে রক্ষা পাবে। লক্ষ্মীপূজার প্রকৃত শিক্ষা একজন মানুষকে ধনী করে তুলবেই, যদি কোনো ব্যক্তি লক্ষ্মীপূজার শিক্ষা না জানে বা না বোঝে, তারপরও যদি সে শুধু ধন সম্পদ অর্জনের জন্য অন্ধবিশ্বাস নিয়ে লক্ষ্মীপূজা করে, এতেও সে কিছু ফল পাবেই; কারণ- ধন সম্পদ অর্জনের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে লক্ষ্মীপূজা করেছে, এই আকাঙ্ক্ষাই তাকে কিছুটা হলেও ধনী করবে। কিন্তু যে লক্ষ্মীপূজার প্রকৃত শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে জানে বা বোঝে, সে ধনী হবেই, সে গরীব থাকতে পারে না।

সনাতনী সমাজের একেবারে নিম্নআয়ভুক্ত মানুষও যাতে একেবারে হতদরিদ্র না থাকে, তারা যেন সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর মানুষদের থেকে তার কর্মের বিনিময়ে অর্থ পায়, সেই চিন্তা-ভাবনা থেকেই নাপিতদেরকে হিন্দু সমাজের জন্ম, মৃত্যু এবং বিয়ের আচারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যাতে এইসব উপলক্ষ্যে তারা তাদের সামান্য কর্মের বিনিময়ে প্রচুর অর্থ পায় এবং কিছুটা ভালো জীবন যাপন করতে পারে, যেহেতু সনাতন ধর্মে বিনা পরিশ্রমে কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া বা ভিক্ষা করা পাপ বলে বিবেচিত।

এই ভাবে কর্মের বিনিময়ে অর্থে ব্যবস্থা শুধু নাপিতদের ক্ষেত্রেই নেই, পূজায় যারা ঢাক বাজায়, মূর্তি তৈরি করে বা পূজার বিভিন্ন উপকরণ তৈরি বা বিক্রি করে তাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপক প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই দুর্গাপূজার সময়।

সনাতন ধর্মে যেহেতু বিনা পরিশ্রমে কাউকে কিছু দেওয়া বা কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া নিষেধ, যে কথা আগেই বলেছি- সেহেতু সমাজের নিম্নআয়ভূক্ত মানুষদেরকে সামান্য কর্মের বিনিময়ে বেশি অর্থ প্রদান করে তাদের জীবনযাত্রার মানের কিছুটা উন্নয়ন ঘটনানোর জন্য সনাতনী হিন্দু সমাজের নিম্নআয়ভূক্ত মানুষদেরকে সনাতনী হিন্দু সমাজের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে যে যুক্ত করা হয়েছে, আশা করছি- উপরের আলোচনা থেকে সেটা শুধু প্রশ্নকারীকে নয়, আমার পাঠকবন্ধুদেরকেও বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Saturday, 22 August 2020

বিয়ের পর মেয়েদেরকেই কেনো শ্বশুড় বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে, ছেলেদেরকেই কেনো বংশধর মনে করা হয়, মুখাগ্নির অগ্রাধিকার ছেলেদের কেনো, সংসারের দায়ভার কেনো ছেলেকেই বহন করতে হয়, ঋতুস্রাবকে কেনো লোকজন খারাপ চোখে দেখে, কেনো শুধু মেয়েদেরই সম্ভ্রমহানি হয়, লগ্নভ্রষ্টা কেনো শুধু মেয়েরাই হয়, বউভাত বা জামাই ষষ্ঠীর পরিবর্তে বরভাত বা মেয়েষষ্ঠী হয় না কেনো, কেনো বরপক্ষ, কনে পক্ষকে যৌতুক দেয় না ?


Nishi Acharjee,

বিয়ের পর মেয়েদেরকেই কেনো শ্বশুড় বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে, ছেলেদেরকেই কেনো বংশধর মনে করা হয়, মুখাগ্নির অগ্রাধিকার ছেলেদের কেনো, সংসারের দায়ভার কেনো ছেলেকেই বহন করতে হয়, ঋতুস্রাবকে কেনো লোকজন খারাপ চোখে দেখে, কেনো শুধু মেয়েদেরই সম্ভ্রমহানি হয়, লগ্নভ্রষ্টা কেনো শুধু মেয়েরাই হয়, বউভাত বা জামাই ষষ্ঠীর পরিবর্তে বরভাত বা মেয়েষষ্ঠী হয় না কেনো, কেনো বরপক্ষ, কনে পক্ষকে যৌতুক দেয় না ? আপনার এই সকল প্রশ্নের জবাব আপনি পেতে চলেছেন, আমার এই প্রবন্ধে-

নিশি, 

আমি আপনার সমস্ত প্রশ্নের জবাব মাত্র একটা তথ্য দিয়ে দিতে পারি, যাতে আপনার মুখ এমনি ই বন্ধ হয়ে যাবে বা আপনার সমস্ত প্রশ্নের জবাব আপনি আমার ঐ একটা জবাবেই পেয়ে যাবেন, সেই কথাটি বলবো আমি এই প্রবন্ধের শেষে, তার আগে আপনার প্রতিটা প্রশ্নের জবাব শুনুন-

প্রথম প্রশ্নে আপনি বলেছেন- আজীবনই কেনো একটা মেয়েকে বিয়ে করে শ্বশুড় বাড়িতে যেতে হবে !? ছেলে কেনো বিয়ে করে শশুড় বাড়িতে আসতে পারবে না ?

-এটা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ফল। যেখানে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আছে, যেমন বাংলাদেশের কিছু উপজাতি পর্যায়ে, সেখানে আপনার পছন্দের এই ধরণের সিস্টেম আছে। কিন্তু পৃথিবীতে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন খুবই কম, কিছু বাস্তব কারণে। এই যেমন ধরুন- যদি কোনো মেয়ে চাকরি বা ব্যবসা করে, এজন্য তাকে বাড়ির বাইরে যেতেই হবে। কিন্তু সে যখন প্রকৃতির নিয়ম মেনে গর্ভধারণ করবে, তখন বেশ কয়েক মাস সে কিছুই করতে পারবে না, সেই সময় তাকে তার চাকরি বা ব্যবসা থেকে ছুটি নিতে হবে এবং বাচ্চার জন্মের পরও তাকে লালন পালনের জন্য তাকে অনেক সময় ব্যয় করতে হবে। তার চাকরি তো বন্ধ করতেই হবে, যদি বিকল্প কেউ না থাকে, তাহলে তার ব্যবসাকেও বন্ধ করে দিতে হবে; সরকারি চাকরি হলে সে নির্দিষ্ট সময় হয়তো সবেতন ছুটি পাবে, কিন্তু বেসরকারি চাকরি হলে সে ছাঁটাই হবে। আর সেই নারী ব্যবসায়ী হলে, আর তার ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, আর কোনো ব্যবসা একবার বন্ধ হয়ে গেলে, সেটাকে পুনরায় চালু করে আগের মতো চালানো প্রায় অসম্ভব। আর এই ব্যবসা বন্ধের ঘটনা বার বার ঘটলে সেই ব্যবসা তো চলবেই না। 

এই আধুনিক যুগে জন্মনিয়ন্ত্রণের অনেক পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার ফলে গর্ভধারণকে নারীরা অনেকটাই নিজের কন্ট্রোলে নিতে পেরেছে, তারা একটি বা দুটো বাচ্চা নিয়েই পুরো সিস্টেমটাকেই অফ করে দিতে পারছে। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থার যখন উদ্ভব, তখন এই ক্ষমতা মানুষের হাতে ছিলো না, তখন গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদান ছিলো মানুষের যৌনক্রিয়ার ফলে প্রকৃতির খেয়ালের অধীন, যে কারণে প্রাপ্ত বয়স্ক একটি মেয়েকে তার জীবনের প্রায় পুরো সময়ই গর্ভধারণ এবং সন্তান লালন পালনে ব্যয় করতে হতো। এখন আপনিই বলেন, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বিবাহিতা কোনো নারীর পক্ষে কি বাড়ির বাইরে গিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকরি বা ব্যবসা করা সম্ভব ? অথচ প্রাকৃতিক কারণে একজন পুরুষের এই সমস্যা নেই। একজন পুরুষ সারা বছর, এমনকি সারাজীবন ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে তার চাকরি বা ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে এবং তার নিজের বা তার পরিবারের জন্য অর্থ রোজগার করতে পারে, যে অর্থ রোজগার বেঁচে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। পুরুষের এই সুবিধার কারণেই পুরুষরা অর্থ রোজগারের দায়িত্ব নিয়েছে বা পেয়েছে, যে কারণে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যেখানে পরিবার বা সমাজের কর্ণধার হলো পুরুষরা, তাই পুরুষরা নিজ বাড়িতেই থাকে, আর মেয়েদেরকে বিয়ের পর ছেলের বাড়িতে চলে যেতে হয়।

দ্বিতীয় প্রশ্নে আপনি বলেছেন- ছেলেদেরকেই কেনো বংশধর মনে করা হয়, কেনো মেয়েদেরকে মনে করা হয় না ?

-পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়, ছেলেরা যেহেতু সারাজীবন বাড়িতেই থাকে, পিতা মাতার দেখাশোনা করে এবং সন্তানের জন্ম দিয়ে বংশ রক্ষা করে, সেজন্যই তাদেরকে বংশধর মনে করা হয়। বিয়ের পর মেয়েরা যেহেতু অন্য বংশে চলে যায়, সেহেতু তাদেরকে পিতৃ বংশের বংশধর মনে করা হয় না, তবে তারা অবশ্যই শ্বশুড়কূলের বংশধর।

তৃতীয় প্রশ্নে আপনি বলেছেন- পিতা মাতার মুখাগ্নির অধিকার ছেলেরা কেনো পায়, মেয়েরা কেনো পায় না ?

-আপনার এই জানার মধ্যে একটু ভুল আছে। পিতা মাতার মুখাগ্নির অধিকার মেয়েরাও পায়, তবে সেটা মৃত ব্যক্তির পুত্রপৌত্রের পর। বিয়ের পর মেয়েরা যেহেতু শ্বশুড় বাড়িতে গিয়ে থাকতে বাধ্য হয় এবং সেটা দূর দূরান্তে হতে পারে, পিতা মাতা মারা গেলে যেখান থেকে তাদের আসতে অনেক সময় লাগতে পারে বা অনেক ক্ষেত্রে আসা সম্ভব নাও হতে পারে, এই সব বিষয় বিবেচনা করে, মৃত ব্যক্তির বাড়িতেই যারা থাকে, তাদেরকেই প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে পিতা মাতার মুখাগ্নি করার জন্য, তাদের অভাবে প্রথমে অবিবাহিতা কন্যা এবং তার পর বিবাহিতা কন্যাদের অধিকার দেওয়া হয়েছে পিতা মাতার মুখাগ্নি করতে, সুতরাং বাস্তবতা বিবেচনা করলে এটা নিয়ে ক্ষোভের কিছু নেই।

চতুর্থ প্রশ্নে আপনি বলেছেন- একটা সংসারের দায়ভার সব সময় কেনো ছেলেদেরকেই বহন করতে হবে, কেনো এই দায়ভার মেয়েরা বহন করতে পারবে না ?

-আপনার এই প্রশ্নের জবাব প্রথম প্রশ্নের আলোচনাতেই দিয়েছি, নারী ও পুরুষের প্রকৃতিগত সুবিধার জন্যই পুরুষেরা বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি বা ব্যবসা করার জন্য বেশি যোগ্য, একারণেই তাদের উপর সংসার চালানোর মতো অর্থ রোজগারের ভার পড়েছে, আর নারীর উপর ভার পড়েছে বাড়ি ও সন্তান সামলানোর।

পঞ্চম প্রশ্নে আপনি বলেছেন- ঋতুস্রাব তো ভগবানেরই সৃষ্টি, তবে সেটা নিয়ে কেনো একটি নারীকে ছোটো করে দেখা হয় ?

-প্রাচীন থেকে বর্তমান, সব সময়েই একজন নারীকে দেবী দুর্গার মতো দশহাতে একটি বাড়ির সকল কাজকর্ম করে সংসারকে সামাল দিতে হয়। চাইলেই নারীরা এ থেকে ছুটি নেয় না বা নিতে পারে না। নারীরা যাতে মাসে অন্তত কয়েকদিন সকল প্রকার কাজকর্ম থেকে বিশ্রাম পায়, সেজন্য প্রাচীনকালে ঋতুস্রাবের সময় নারীদেরকে সকল প্রকার কাজকর্ম থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে, রেগুলার কাজ থেকে বিশ্রাম বা এই ছুটিই কালক্রমে নিষিদ্ধ হয়ে উঠেছে এবং যেহেতু সেই সময় মেয়েরা কোনো ধরণের কাজে অংশ নিতো না, তাই এক সময় এই ভাবনা গড়ে উঠে যে ঋতুস্রাবকালীন মেয়েরা কোনো শুভ বা পবিত্র কাজ করতে পারবে না, তাই ঋতুস্রাবকালীন কোনো শুভ বা মাঙ্গলিক কাজে অংশগ্রহন এক সময় সমাজে নিন্দনীয় হয়ে উঠে। মূলত এটা প্রকৃত ঘটনা না বোঝার ফল এবং সমাজের মূর্খ মানুষদের মনোভাব। কিন্তু বাস্তবে ঋতুস্রাব অপবিত্র বা অশুচি নয়, এটা নারী শরীরের একটা সাধারণ ঘটনা। আপনি ঋতুস্রাব নিয়ে এই ধরণের প্রশ্ন তুলেছেন, এর কারণ আপনার পিতা মাতা আপনাকে এ সম্পর্কে সঠিক শিক্ষাটা দেন নি বা না জানার কারণে দিতে পারেন নি। কিন্তু এখন আপনি তো প্রকৃত বিষয়টা জানলেন, এর পর আপনি আপনার জুনিয়রদেরকে বা আপনার সন্তানদেরকে সঠিক শিক্ষাটা দিয়েন, তারা এটাকে আর ছোট করে দেখবে না। বরং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তার জন্ম বলে, সে এটা নিয়ে গর্ববোধ করবে।

ষষ্ঠ প্রশ্নে আপনি বলেছেন- সম্মানহানির টপিক এলে কেনো বলা হয় মেয়েটার সম্মানহানি হয়েছে, মেয়ের ভার্জিনিটি নষ্ট হয়েছে, কেনো ছেলেদের ক্ষেত্রে এমন বলা হয় না ?

-এটাও আসলে পুরুষের প্রকৃতিগত দৈহিক সুবিধা। কারণ, বিয়ের আগে কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর সাথে সেক্স করে, তাহলে তার কোনো চিহ্ন তার পুংলিঙ্গে থাকে না, কিন্তু বিয়ের আগে কোনো নারী যদি সেটা করে, তাহলে তার চিহ্ন তার শরীরে থেকে যায়। শুধু তাই নয়, বিয়ের পূর্বে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত যৌনমিলনের ফলে একজন নারী গর্ভধারণও করে ফেলতে পারে, যার দায় পুরোটাই বহন করতে হয় সেই নারীকে, তাই নারীকে সব সময় কোনো প্রকার ভুল করা থেকে সাবধান থাকতে হয়, নারীদেরকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে মহাভারতের কুন্তী এবং রামায়ণে বর্ণিত অহল্যার ঘটনার মাধ্যমে।

সপ্তম প্রশ্নে আপনি বলেছেন- লগ্নভ্রষ্টা হলে কি শুধু মেয়েরই হয়, ছেলের হয় না ?

-বিয়ের লগ্ন হলো বিবাহের জন্য একটি শুভ সময়, এই শুভ সময়ে বিয়ে হলে কন্যার দাম্পত্য জীবন ভালো ও সুখী-সমৃদ্ধ হয়, যেটা সব পিতা মাতাই কামনা করে। শুধু নির্দিষ্ট দিনের লগ্ন নয়, বিয়ের জন্য শুভ বার এবং শুভ মাসও রয়েছে। যে কন্যার কর্ম ভালো, অটোমেটিক্যালি সে কন্যার সব কিছু শুভ মাস, শুভ বার বা শুভ সময়ে হবে। আর যার কর্ম খারাপ, শত চেষ্টার পরেও তার কোনো কিছু শুভ সময়ে হবে না, এমন মেয়েই শুধু লগ্নভ্রষ্টা হতে পারে। এই লগ্নভ্রষ্টা নারীকে যে পুরুষ বিবাহ করতে বাধ্য হবে, তার কর্ম যদি ভালো হতো, তাহলে তার বিবাহে এমন ঘটনাই ঘটতো না। সুতরাং লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার জন্য কন্যা তো অবশ্যই দায়ী, তার সাথে দায়ী বরও। কারণ, দুই জনের কর্ম মিলেই তাদের ভাগ্য তৈরি করেছে। কিন্তু সমাজ পুরুষ শাসিত বলে, পুরুষের দোষ কম দেখা হয়; কারণ, এই দোষটা নির্ধারণ করবে তো পুরুষই। এজন্য পুরুষরা নিজেদের অপকর্ম বা কুকর্মের ফল যখন পায়, তখন তা নিজেদের ঘাড়ে না নিয়ে, মেয়েদের ঘাড়ে দিতে স্বস্তি বোধ করে, মূলত এই কারণেই লগ্নভ্রষ্টা হলে নারী নিন্দিত হয়, যদিও তাতে নারী ও পুরুষ, উভয়ের দোষ সমান।

অষ্টম প্রশ্নে আপনি বলেছেন- আজীবন কি ছেলেদেরকেই পরিবার ও স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হবে, মেয়েরা কি পারে না পরিবার ও স্বামীর দায়িত্ব নিতে ?

-আপনার এই প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে, যার উত্তর অনেকটা আপনার প্রথম প্রশ্নের আলোচনায় দিয়ে দিয়েছি। অর্থ রোজগারে পুরুষের সুবিধা ছাড়াও, দৈহিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও পুরুষ, নারীদের চেয়ে প্রকৃতিগতভাবে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত, এটা শুধু ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান, এবং স্তন্য পান করানো বা লালন পালননের দিক থেকেই নয়, শারীরিক শক্তির দিক থেকেও। সাধারণভাবে নারীরা পুরুষের তুলনায় কম উচ্চতা সম্পন্ন এবং কম দৈহিক শক্তি সম্পন্ন। দৈহিক শক্তির এই তারতম্যের কারণেই প্রায় সব নারী নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তারা পুরুষদের দ্বারা ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়, আর একারণেই নারীর হাতে অর্থ সম্পদ রাখাকে আমাদের শাস্ত্রকারগণ নিরাপদ মনে করেন নি, তাই তাদেরকে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার করা হয় নি। তুলনামূলকভাবে নারীর কম দৈহিক শক্তির কারণেই, তাকে রক্ষার ভার পড়েছে পুরুষের উপর এবং অর্থ রোজগারের সুবিধার কারণেও স্ত্রীর ভরণপোষণের দায় পড়েছে পুরুষেরই উপর। তাই ছেলেদেরকেই আজীবন পরিবার ও স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে নারীরা যে এ দায়িত্ব নিতে পারবে না, তা নয়; এখন সময় বদলেছে, নারীরা চাইলে, পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের অনেক দায়িত্ব নিতে পারে, যে দায়িত্ব অনেক নারী পালন করছেও, কিন্তু বাস্তব কারণেই কোনো নারীর পক্ষে তার স্বামীর ও পরিবারের পুরো দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তার গর্ভধারণ ও বাচ্চা প্রসবকালে তাকে তার চাকরি বা ব্যবসা থেকে ছুটি নিতেই হবে, সেই সময় তার স্বামীকেই সংসার চালনোর মতো অর্থ উপার্জন করতে হবে, এভাবে অটোমেটিক্যালি তার স্বামীর হাতে সংসার চালানোর সব রকম ম্যাকানিজম এক সময় চলে যাবে।

দশম প্রশ্নে আপনি বলেছেন- আজীবন বউ ভাত বা জামাই ষষ্ঠী কেনো হতে হবে ? বর ভাত বা বউ ষষ্ঠী হলে সমস্যা কী ?

-পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়, মেয়েকে বিয়ের পর তার শ্বশুড়বাড়িতে যেতে হয়। বিয়ের পর, বউ ভাত হলো, সেই মেয়ের শ্বশুড়বাড়ির এলাকায় তার পরিচিতি অনুষ্ঠান। যদি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্খা কোনো দিন চালু হয়, যখন ছেলেরা বিয়ের পর তার শ্বশুড় বাড়িতে গিয়ে থাকতে বাধ্য হবে, তখন অবশ্যই বিয়ের পর বর ভাত হবে। আর জামাই ষষ্ঠী হলো- জামাইকে বা জামাইয়ের বাড়ির লোকজনকে কনের বাড়ির লোকজন কর্তৃক ঘুষ প্রদান, যাতে, তাদের মেয়েকে, তারা কোনো কষ্ট না দেয় এবং সুখে শান্তিতে রাখে। জামাই ষষ্ঠীর আরো কিছু বাস্তব কারণ আছে, সে সম্পর্কে আমার- "জামাই ষষ্ঠী কী ও কেনো" নামে একটি প্রবন্ধ আছে, সেটা পড়লে বিস্তারিত বুঝতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আপনি আমার পোস্টগুলো রেগুলার বছর খানেক পড়লে আপনার মনের সকল প্রশ্নের জবাবই পেয়ে যাবেন, তারপর একজন সনাতনী হিসেবে নিজে গর্ববোধ করতে বাধ্য হবেন।

১১ তম অর্থাৎ শেষ প্রশ্নে আপনি বলেছেন- বিয়ের সময় ছেলেদেরকেই কি মেয়ের বাপকে যৌতুক দেওয়া উচিত নয়, যেহেতু মেয়ের বাপ, মেয়েকে জন্ম দিয়েছে, বড় করতে টাকা পয়সা খরচ করেছে ?

-আপনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা কেমন জানেন, সেটা হলো মেয়েকে বিক্রি করে দেওয়া, যেটা আরবীয় দেশগুলোতে প্রচলিত। ঐসব দেশে বিয়ের সময় মেয়ের পিতাকে, ছেলে পক্ষকে মোহরানার নামে মেয়ের দাম দিয়ে দিতে হয়, যেটা একপ্রকারে কন্যাকে কিনে নিয়ে যাওয়া, এরপর ছেলেপক্ষ, সেই কন্যাকে নিয়ে যা খুশি করতে পারে, যেহেতু তারা উপযুক্ত দামে সেই মেয়েকে কিনেছে ? যে ছেলে মনে করে যে, সে তার বউকে কিনেছে, সেই ছেলের সংসারে সেই মেয়ে কি কখনো সুখে শান্তিতে থাকতে পারে ? সেই মেয়ে তো ঐ ছেলের জাস্ট ভোগের বস্তু, আর বাড়ির দাসী।

অপরপক্ষে সনাতনীমতের বিয়েতে, কন্যাকে যথেষ্ট উপহার সামগ্রী দিয়ে শ্বশুড়বাড়িতে পাঠানোর যে বিধান, (কন্যার পিতার অবিবেচনায় এবং সুযোগসন্ধানী মনোভাবের কারণে যেটা বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক যৌতুক প্রথায় পরিণত হয়েছে) সেই বিধানে কন্যাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় না, তাই সেই কন্যার সাথে শ্বশুড় বাড়ির লোকজনের যা খুশি তা করার অধিকার থাকে না। এছাড়াও বিয়ের পর থেকে নতুন বউয়ের পেছনে বরের বাড়ির লোকজনের অর্থ খরচ করতে হয়, তার- প্রয়োজন, শখ ও বিলাস অর্থাৎ ভরণ-পোষণের জন্য। যাতে ধনীর দুলালীরা তো নয়ই, এমনকি ভিখারী ঘরের কোনো মেয়ে, যাকে দয়া করে বিয়ে করে একটি সংসার দেওয়া হয়েছে, সেও ছাড় দেয় না। বিয়ের পূর্বে মেয়ে যখন বাপের বাড়িতে ছিলো, তখন তো সেই মেয়ের ভরণ-পোষণের জন্য মেয়ের বাপের তো অর্থ খরচ হতো, তাহলে বিয়ের সময় সেই মেয়েকে খালি হাতে শ্বশুড় বাড়িতে পাঠিয়ে মেয়ের বাপ মা সারাজীবনের মতো তাদের দায়িত্ব ছেড়ে দেয় কিভাবে ? মেয়ে কি শ্বশুড় বাড়িতে এসে বা গিয়ে শুধু জল বাতাস খেয়ে থাকে ? থাকে না । বরং তার চাহিদা আরো বাড়তে থাকে, বাপের বাড়িতে থাকতে তার যে চাহিদা বা স্বপ্ন পূরণ হয় নি, স্বামীর বাড়িতে এসে সেই চাহিদাগুলো পূরণ করতে চায়, আর সেটা ঠিক ঠাক পূরণ না হলেই শুরু করে অশান্তি; একজন আমাকে বলেছিলো- বউ কিছু চাইলে, সেটা দিতে না পারলে রাতে বিছানায় উল্টো হয়ে শুয়ে থাকে, বুঝে নেন, কী বলতে চাইছি।

আমি জানি সব মেয়ে এমন নয়, কিন্তু বেশির ভাগ মেয়ের মনের অবস্থায় এমন; যা হোক, এই যখন বেশিরভাগ মেয়েদের মনের অবস্থা, তখন তারা খালি হাতে শ্বশুড় বাড়িতে আসবে বা যাবে কেনো বা নিজেদের কর্মের ফলে জন্ম দেওয়া মেয়েকে, মেয়ের জনক পিতা মাতা, খালি হাতে মেয়েকে শ্বশুড় বাড়িতে পাঠিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে কেনো ?

শেষ প্যারায় আপনি বলেছেন- আমি মনে করি সবই এই সমাজ সৃষ্ট কুসংস্কার।

-কিন্তু আসলে এগুলোর কোনো কিছুই কুসংস্কার নয়, সবই সামাজিক বাস্তবতা। সনাতনী মতের বিয়েতে বর ও কনে উভয় পক্ষকেই তিন দিন ব্যাপী নানা ধরণের নিয়ম-কানুন মানতে হয়, অহিন্দুদের কাছে এগুলোকে কুসংস্কার বলে তো মনে হয় ই, অনেক হিন্দুর কাছেও এগুলোকে কুসংস্কার বলে মনে হয়। কিন্তু সনাতনী পদ্ধতির বিয়ের প্রতিটা আচার বৈজ্ঞানিক যুক্তিসম্পন্ন, যেগুলো পালন করে বিয়ে করলে বাসর রাতে কোনো মেয়ে ধর্ষিতা হবে না, তাদের দাম্পত্য জীবন ভালো যাবে, সুন্দর যাবে। আর সনাতনী পদ্ধতিতে যে মেয়ে বিয়ে করবে এবং বিয়ের পর শাঁখা সিঁদুর খারু পলা পরিধানসহ সৎ জীবন যাপন করবে, কোনোদিন সেই মেয়ের কোনো কষ্ট হবে না, তার স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে তাকে কষ্ট দেবে না বা আরেকটা বিয়ে করে তাকে সতীনের সংসারের কষ্টে ফেলবে না বা তাকে ডিভোর্স দিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেবে না।

সনাতনী পদ্ধতির বিয়ের এত ঝামেলা সহ্য করার ফল আসলে এটাই- একটা সুন্দর সুখময় দাম্পত্য জীবন। এর বিপরীতে যেকোনো অসনাতনী বিয়ে হলো পতিতাবৃত্তির একটি চুক্তি, যে চুক্তি যেকোনো সময় কারণে বা অকারনে ভেঙ্গে দেওয়া যায়, যার ফলে পুরুষ কিছু না হারালেও নারী হারায় সব। এই সব হারাতে চান বলেই বিয়ের সময় বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুড় বাড়িতে কিছু অর্থ সম্পত্তি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে আপনার চাপিয়ে দেওয়া মনে হচ্ছে। আগেই বলেছি, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত উপহার সামগ্রী দিয়ে কন্যাকে তার শ্বশুড় বাড়িতে পাঠাতে হবে, কিন্তু মেয়ের বাপের অবিবেচনা এবং সুযোগ সন্ধানী মনোভাবের কারণে বর্তমানে যেটা চুক্তি ভিত্তিক যৌতুক প্রথায় পরিণত হয়েছে; কারণ, সুযোগ পেলেই মেয়ের বাপেরা চায় বিনা খরচে কন্যার দায়কে মাথা থেকে নামাতে। তাই ভদ্রতার খাতিরে যেসব বর পক্ষ বিয়ের আগে কোনো রকম যৌতুক চায় না, সেসব ক্ষেত্রে মেয়ের বাপেরা সুযোগ নিয়ে মেয়েকে এক প্রকার খালি হাতেই শশুড় বাড়িতে পাঠায় এবং ছেলের যোগ্যতার কোনো মূল্য দেয় না। খেয়াল করে দেখবেন, যে বাপ, তার মেয়ের বিয়েতে সুযোগ পেয়ে এই ধরণের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করে, সেই মেয়ের সংসারই সুখের হয় না, কারো কারো তো সংসারই ভেঙ্গে যায়; কারণ, এখানে মুনি ঋষিদের যে শাস্ত্রীয় বিধান, বিয়ের সময় মেয়েকে পর্যাপ্ত উপহার সামগ্রী দিয়ে শ্বশুড় বাড়িতে পাঠাতে হবে, সেটা ফলো করা হয় না।

আমার ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচিত একজন হিন্দু ছেলে একদিন কথা প্রসঙ্গে আমার কাছে দুঃখ করে বললো- পরিবারের মতে দেখে শুনে বিয়ে করলে, আমার যে যোগ্যতা, তাতে আমি ৮/১০ লাখ টাকা পেতাম, কিন্তু প্রেম করে বিয়ে করেছি বলে বিয়ের খরচের জন্য আমার শ্বশুড় আমাকে যে টাকা দিয়েছে, তাতে বিয়ের খরচই উঠে নি, তার চেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে, আর এর ফলে আমার যে ক্যাশ ছিলো তা নিঃশেষ হয়ে গেছে, এখন চাকরির টাকায় কোনো রকমে খেয়ে পরে দিন চলে, আমাকে একটা পরামর্শ দেন, কিভাবে আরো বেশি টাকা পয়সা আয় করতে পারবো ?

আমি বললাম- এই যে প্রেম করে বিয়ে করেছেন, এটাই আপনার জীবনের ঐতিহাসিক ভুল। এই ভুলের মাশুলই আপনি দিচ্ছেন এবং আরো দিতে হবে। কারণ, কর্মের ফল মানুষ পাবেই, কর্ম কখনো কাউকে ক্ষমা করে না।

বিয়ের পূর্বের প্রেম সনাতন ধর্মে স্বীকৃত নয়; কারণ, প্রেম প্রতিটা মানুষের জীবনে কোনো না কোনোভাবে বিপর্যয় নিয়ে আসে। প্রেম, বিয়ে পর্যন্ত গড়ালেও ম্যাক্সিমাম দম্পতি তাতে সুখী হয় না। যারা প্রেমের আবেগে পালিয়ে বিয়ে করে তাদের তো সুখী হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই, তিন মাসের মধ্যে এদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি মারপিট মাস্ট। আর যে প্রেমের বিয়ে লোক দেখানো এ্যারেঞ্জে হয়, সেখানে মেয়ের বাপ সুযোগ নেয় ই, এতে ছেলের পরিবার বঞ্চিত হয়, প্রথমে মুখে কিছু না বললেও, ছেলের পরিবারের লোকজনের মনে একটা কষ্ট থাকে, যে কষ্ট একদিন না একদিন মুখ ফুটে বের হয়ে পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি করেই বা করবে। তাই আমার মতে যে ছেলেরা প্রেম করে বিয়ে করে তারা নির্বোধ; কারণ, এখানে পাওয়ার চেয়ে বঞ্চনার পরিমাণই বেশি, যে বঞ্চনা দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে দেয় না।

সনাতন ধর্মের যাবতীয় বিধি বিধান বিজ্ঞানসম্মত এবং বাস্তব, তাই জীবন যাত্রার যেখানেই আপনি সনাতন ধর্মকে পাশ কাটিয়ে যাবেন, সেখানেই সমস্যায় পড়বেন। আর সনাতন ধর্মে কোনো কুসংস্কার নেই, সবই সংস্কার; যেটাকে আপনার কু সংস্কার বলে মনে হবে, ধরে নিতে হবে যে সেই ব্যাপারে আপনার জ্ঞান পর্যাপ্ত নয়, তাই বিষয়টি আপনি বোঝেন নি, যে কারণে সেটা আপনার কাছে কুসংস্কার বলে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা বা বোধের উপলব্ধির অভাবই সনাতন ধর্মের বিধি বিধানকে কুসংস্কার বলে মনে হওয়ার কারণ।

যা হোক, প্রথমে আপনাকে যে কথাটি বলবো বলে বলেছিলাম, এখন সেই কথাটি বলছি-

আপনার মতো যারাই নারীবাদী চিন্তা-ভাবনা করে, তারা ইসলাম-খ্রিষ্টান-ইহুদিদের মতো অসনাতনী মতবাদ বা তথাকথিত ধর্ম দ্বারা আক্রান্ত বা প্রভাবিত, যে মতবাদগুলো জগত ও জীবনের সকল রহস্যকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এই সব মতবাদ অনুযায়ী সকল প্রাণীর একবারই মাত্র জন্ম হয়, আর একবারই মৃত্যু হয়। এদের কাছে জীবন একটাই, তাই এরা ভাবে- আমাকে নারী হিসেবে জন্ম নিয়ে কেনো এত কষ্ট ভোগ করতে হবে, পুরুষের তুলনায় কেনো এত বঞ্চনা সহ্য করতে হবে, কেনো নারী শরীরের এত সমস্যা সহ্য হবে। যেহেতু এরা ভাবে জীবন একটাই এবং এই এক জীবনে পুরুষেরা, নারীদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন এবং সুখী, তাই এদের ভাবনা হলো- নারীদেরকে কেনো এরকম সমস্যাশঙ্কুল জীবন যাপন করতে হবে ?

এই ভাবনার মূল কারণ- সনাতনী জ্ঞানের অভাব। যে জ্ঞান বলে- জীবন হলো আত্মার ভ্রমণ এবং সেই ভ্রমণে প্রতিটি আত্মাকে জগতের সকল প্রাণীর সুখ দুঃখকে ভোগ করতে হয়। আজ আমি পুরুষ, কিন্তু গত জন্মে যে আমি নারী ছিলাম না, এমনটা নয়; আবার আগামী জন্মে যে আমি নারী হয়ে জন্ম নিয়ে নারীর সুখ দুঃখকে ভোগ করবো না, এমনটাও নয়। শুধু তাই নয়, আমি এটাও ভাবি যে গত কোনো জন্মে হয়তো আমি কুকুর, বিড়াল বা গরু রূপে কষ্ট করেছি, তাই আমি ইতর শ্রেণীর প্রাণীদের কষ্টকে ফিল করি, যে কারণে আমার আয়ত্বের মধ্যে যারা, তারা যেন যতটা সম্ভব সুখে থাকে, ভালো থাকে, ক্ষুধায় তারা যেন কোনো কষ্ট না পায়, সেই চেষ্টা করি। 

এবং আমি আমার স্ত্রীর প্রতিও খুবই সহানুভূতিশীল, নারী হিসেবে জন্ম নেওয়ায়- ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব এবং সন্তানদের লালন পালনে তার যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সে ব্যাপারে আমি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখি, এই ভাবনা থেকে যে গত জন্মে আমিও হয়তো নারী ছিলাম, তখন এই কষ্টগুলো আমি ভোগ করেছি, আবার আগামী জন্মে যদি নারী হিসেবে জন্ম নিই, তখনও এই কষ্টগুলো আমাকেও ভোগ করতে হবে, আর পূর্ব জন্মের কর্মফল যেহেতু মানুষ পরের জন্মেও ভোগ করে, সেহেতু পরের জন্মে নারী হিসেবে জন্ম নিলেও আমার যাতে ওরকম কষ্ট না হয়, আমার স্বামী যেন আমার প্রতি সর্বোচ্চ যত্নশীল হয়, তার জন্য এ জন্মে পুরুষ হয়ে আমি সেই কাজ করে রাখছি, এজন্য পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়েও আমার বিশেষ কোনো গর্ব নেই এবং শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে নারীদের প্রতি আমার বিশেষ কোনো অবহেলা বা বঞ্চনা নেই, পথ ঘাটে নারীদেরকে আমি শিকার এবং নিজেকে শিকারী মনে করি না; কারণ, আমি জানি- আগামী জন্মেই হয়তো আমাকে নারী হিসেবে জন্ম নিয়ে নারীদের সুখ দুঃখকে ভোগ করতে হবে।

সনাতন ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান আমাকে এই রকম চিন্তা-ভাবনা করতে শিখিয়েছে, যার কারণে আমার এরকম মহান ও উচ্চ চিন্তাভাবনা এবং যার কারণে নিজের বহু সময় ব্যয় করে আমি প্রতিদিন ফেসবুকে উত্থাপিত শত শত প্রশ্ন বা রহস্যের সমাধান দেওয়ার জন্য লিখি। কারণ, আমি এটাও জানি যে- ঈশ্বর আমাকে এই জন্মে যে জ্ঞান দিয়েছেন, আমি যদি তার সদ্ব্যবহার না ক'রে, লোকজনকে সেগুলো না জানাই বা তাদেরকে সেই জ্ঞান না দিই, পরের জন্মে ঈশ্বর আমাকে মূর্খ করে সৃষ্টি করবেন; পরের জন্মে আমি মূর্খ হয়ে জন্ম নিতে চাই না, তার জন্য এ জন্মে কাজ করছি। আসলে অনেকে অপরের জন্য কাজ করলেও, পরোক্ষভাবে সেটা নিজের জন্যই করে, আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

যদি আপনার মধ্যে সনাতনের এই সব জ্ঞান থাকতো, তাহলে নারী হিসেবে জন্ম নিয়ে আপনার মনে এত ক্ষোভ বা এতসব প্রশ্নের উদ্ভব হতো না। সনাতন ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ই আপনার মনে এই সব প্রশ্নের উদ্ভাবক। তাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ, নিজের এই জন্মে নারী হিসেবে জন্ম নেওয়াকে পূর্বজন্মের কর্মফল হিসেবে মেনে নিয়ে, আগামী জন্মে যাতে পুরুষ হিসেবে জন্ম নেন, সেজন্য পুরুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন, পুরুষের ব্যাপারে পজিটিভ মনোভাব রাখুন, পুরুষদেরকে নিজের শত্রু হিসেবে নয়, নিজেকে পুরুষদের মিত্র হিসেবে ভাবতে শিখুন; কারণ, এ জন্মে যারা পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছে, সেটা তাদের পূর্বজন্মের কর্মফলের অর্জন, তাদের সেই অর্জনকে আপনার সম্মান করতে হবে, যদি সেই সম্মান আপনি না করেন, পরের জন্মে আপনি বর্তমান জন্মের চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থার নারী হিসেবে জন্ম নিয়ে এই জন্মে পুরুষ বিদ্বেষী হওয়ার ফল ভোগ করবেন। কারণ, এটা চিরসত্য যে- যে সব গরীব ব্যক্তি, ধনীদেরকে পছন্দ করে না, কারণে অকারণে ধনীদের সমালোচনা করে, ধনীদেরকে গালি দেয়, তারা কিন্তু কখনো ধনী হতে পারে না, তারা গরীব হয়ে জন্ম নিয়ে গরীব হয়েই মরে। তাই পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে পুরুষের সুখকে ভোগ করতে চাইলে পুরুষকে শ্রদ্ধা করুন। এটাই যে আপনার শেষ বা একমাত্র জন্ম, আর নারী হিসেবে জন্ম নেওয়াই আপনি বঞ্চিত, দুঃখ-যন্ত্রণা-কষ্ট স্বীকার করতে বাধ্য- এই আব্রাহামিক বা সেমেটিক চিন্তা-ভাবনাকে ত্যাগ করুন; কারণ, সেটা সত্য নয়; শুধু এই জন্মই নয়, আপনাকে অনেক জন্ম ভোগ করতে হতে পারে, সে জন্মগুলো যাতে সুন্দর হয়, উন্নত হয়, তার জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করুন।

আপনার এই জন্মসহ, পরের সকল জন্মকে সুন্দর করতে আমি আমার দায়িত্ব পালন করলাম, বাকিটা আপনার হাতে, সনাতন ধর্মে আপনার মতি স্থির হোক, এই কামনায় বলছি-

জয় হিন্দ।

Tuesday, 18 August 2020

পশুবলি শাস্ত্রসম্মত, কিন্তু মনসা পূজায় নয় :


পশুবলি শাস্ত্রসম্মত, কিন্তু মনসা পূজায় নয় :

পশুবলির কথা উঠলেই কিছু কিছু সস্তা মানবতাবাদী এবং কপট পশুপ্রেমী মুরগীর মতো ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠে, এদের চোখে দুচারটা বলি চোখে পড়ে, কিন্তু লাখ লাখ কুরবানী চোখে পড়ে না।

যা হোক, এর আগের একটি পোস্টে আমি পশুবলির সামাজিক কারণ এবং উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছি, এই পোস্টে আলোচনা করছি পশুবলির শাস্ত্রীয় রেফারেন্স নিয়ে-

প্রথমেই রেফারেন্স দিচ্ছি ঋগ্বেদ থেকে, ঋগ্বেদের ১/১৬২/১১ নং ঋকে বলা আছে,

"যত্তে গাত্রাদগ্নিনা পচ্যমানাদিভি শূলং নিহতস্যাবধাবতি। 

মা তদ্ভুম্যামা শ্রিষন্মা তৃণেষু দেবভ্যস্তদুশদ্ভ্যো রাতমস্তু।।"

এর অর্থ- হে অশ্ব। রন্ধনকালে তোমার মাংস হইতে যে রস (ঝোল)নির্গত হয় এবং তোমার যে অংশ শূলে বিদ্ধ থাকে,তাহা যেন মৃত্তিকাতে পতিত বা তৃণাদির সহিত একত্রিত না হয়। দেবগণ মাংস লোলুপ হইয়াছেন,অতএব সমস্ত মাংসই তাহাদিগের তৃপ্তার্থে প্রদত্ত হউক।

এরপর ১/১৬৩/১২ ঋকে বলা হয়েছে-

" উপ প্রাগাচ্ছসনং বাজ্যর্বা দেবদ্রীচা মনসাদীধ্যানঃ।

অজঃ পুরো নীয়তে নাভিরস্যানু পশ্চাৎকবয়ো যন্তি রেভাঃ।।" 

এর অর্থ - এই তুর্ণগামী অশ্ব একমনে দেবগণকে ধ্যান করতে করতে বধ্যস্থানে গমন করিতেছে। উহার বন্ধুতুল্য ছাগলকেও বলির জন্য অগ্রে লইয়া যাওয়া হইতেছে এবং স্তোত্রপাঠক কবিগণ উহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতেছে।

এরপর ১/১৬২/২১ নং ঋকে বলা হয়েছে-

"ন বা উ এতন্রিয়সে ন রিষ্যসি দেঁবা ইদেষি পথিভিঃ সুগেভিঃ।"

এখানে বলিপ্রদত্ত পশুর উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে-

"তুমি মরিতেছো না এবং আমরাও তোমার অনিষ্ট করিতেছি না, বরঞ্চ তুমি এই কার্য্য দ্বারা সৎপথে গমন করিতেছো।"

পশুবলি সম্পর্কিত এরকম আরো কয়েকটি ঋক হলো- ১/১৬২/৩,৯,১০

অনেকে ভাবতে পারেন, হরফ প্রকাশনীর বেদ যেহেতু মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত, সেহেতু এটাতে কিছু সমস্যা থাকতে পারে, তাই এই রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না, তাদের জন্য নিবেদন করছি ভাগবত থেকে কিছু রেফারেন্স, যেখানে বেদের সপক্ষেই পশুবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে-

"বেদে যে পশুবধ আছে, তা দেবতাদের উদ্দেশ্যে, তা আনম্ভন মাত্র, হিংসা নয়। ভক্ষণের উদ্দেশ্যে যে পশুহত্যা, তাই হিংসা।" (একাদশ স্কন্ধ, পঞ্চম অধ্যায়, তুলি-কলম প্রকাশিত, সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ অনুবাদিত)

অর্থাৎ, এখানে বলা হচ্ছে- দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত পশুর মাংস খাওয়া যাবে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন না করে খেলে তা পশুহত্যাজনিত পাপ হবে। এমন কথা তো গীতার ৯/২৭ নং শ্লোকেও বলা হয়েছে যে- তুমি যা কিছু আহার করো, তা আমায় নিবেদন করে করো। 

আবার ভাগবতের ১ম স্কন্ধের দ্বাদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে-

"পশু মানুষের ভক্ষ্য, আবার পশুর ভক্ষ্য তৃণগুল্মাদি। এই রূপে সকল প্রাণীই ক্ষুদ্রতর জীবকে আপনা হতে ভক্ষণ ক'রে জীবনধারণ করে।"

অর্থাৎ বিজ্ঞানের যে খাদ্যশৃঙ্খল, তা ভাগবতে ৫ হাজার বছর আগেই বলে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পশুবলি হয় কালীপূজায়, আর কালীপূজা সম্পর্কিত শাস্ত্র হলো "শ্রীশ্রীচণ্ডী", এবার দেখা যাক শ্রীশ্রীচণ্ডীতে পশুবলি সম্পর্কে কী বলা হয়েছে-

শ্রীশ্রীচণ্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়, যার নাম দেবীস্তব মাহাত্ম্য, তার ১০, ১১ এবং ২১, ২২ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে-

"বলিদান, পূজা, যজ্ঞ, ইত্যাদি ও বিবাহ মহোৎসবে আমার এই সমগ্র চরিত্র পাঠ করিবে এবং শুনিবে। কেহ জ্ঞানে বা অজ্ঞানে আমার উদ্দেশ্যে বলিদান, পূজা এবং বহ্নিহোম করিলে তাহা আমি প্রীতির সহিত গ্রহন করিয়া থাকি। সারা বছর দিন রাত পশুবলি, পুষ্প, অর্ঘ্য, ধূপ, দীপ, ব্রাহ্মণভোজন, যজ্ঞ, নানাপ্রকার ভোগ ও সোনা রূপা উৎসর্গে আমার যে প্রীতি লাভ হয়, এই মাহাত্ম্য একবার শুনিলে আমি সেই প্রীতি লাভ করি।"

অর্থাৎ কালী পূজায় বলিপ্রদান করলে মা কালী খুশি হোন এবং তার কাছে বলি একটি সাধারণ বিষয়। আর বেদ ভাগবতের রেফারেন্স দিয়ে আগেই তো বলেছি যে, দেবতার উদ্দেশ্যে বলিপ্রদান করলে কোনো পশুর হত্যা হয় না, বরং সেই পশুর মঙ্গল করা হয়। জীবন হলো আত্মার ভ্রমণ, এই ভ্রমণে আত্মা এক দেহ ছেড়ে অন্য দেহ ধারণ করে। কোনো পশুরদেহ যখন কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়, তখন সেই পশুর আত্মার সদগতি হয় এবং পরের জন্মে সে আরো উন্নততর জন্মলাভ করে। এজন্যই বেদ ভাগবতে বলা হয়েছে- দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা বলি, পশুহত্যা নয়।

আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, কোনো দেব-দেবীর মূর্তির মধ্যে কোনো শক্তি নেই, শক্তি আছে সেই দেব-দেবীর আদর্শের মধ্যে। কালী পূজা করে কেউ যদি তার নিজের মধ্যে কালীর হিংস্রতাকে ধারণ করতে পারে, তাহলেই কালী কেবল তাকে রক্ষা করতে পারে। 

সরাসরি কালী নয়, কালীর হাতের অস্ত্রই যে আমাদেরকে রক্ষা করবে, সে কথা বলা আছে শ্রীশ্রীচণ্ডীর একাদশ অধ্যায়ের ২৬ ও ২৮ নং মন্ত্রে, এখানে বলা হয়েছে-

"সমস্ত অসুর বিনাশকারী, অতি উগ্র, ভীষণ শিখাযুক্ত তোমার এই ত্রিশুল আমাদেরকে ভয় হতে রক্ষা করুক। হে দেবী চণ্ডীকে, অসুরগণের রক্ত ও মেদরূপ কর্দম মাখা তোমার উজ্জ্বল ঝকঝকে খড়গটি আমাদের মঙ্গল করুক।"

-তো দেবী কালীর এই ত্রিশুল এবং খড়গটি কিভাবে তার ভক্তদেরকে রক্ষা করবে ? বিপদে পড়ে দেবী কালীকে ডাকলে তিনি কি সশরীরে এসে তার ভক্তদেরকে রক্ষা করবে ? কখনোই নয়। এজন্যই আমি বলি দেব-দেবীর মূর্তির মধ্যে কোনো শক্তি নেই, শক্তি আছে সেই দেব-দেবীর আদর্শের মধ্যে। কেউ যদি চায় কালীর ত্রিশুল এবং খড়গ তার মঙ্গল করুক, তাহলে তাকে নিজেকেই সেই ত্রিশুল এবং খড়গ চালাতে শিখতে হবে, এগুলোর ব্যবহার শিখতে হবে এবং এই ব্যবহার শেখার জন্য মাঝে মাঝে এগুলো নিয়ে চর্চা করতে হবে। এজন্যই চালু বলির সিস্টেম, এক কোপে পশুর গলা কাটতে কাটতে অভ্যাসে পরিণত হয়ে অসুররূপী সন্ত্রাসীদের গলা কাটতে যেন হাত, পা এবং বুক না কাঁপে; তাহলেই আপনি রক্ষা পাবেন মা কালীর আশীর্বাদে।

সনাতন ধর্ম মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান এবং এতে মানুষের আত্মরক্ষার ব্যাপারটি নিয়েও ভাবা হয়েছে। কিন্তু সনাতন ধর্মের মধ্যে চৈতন্যদেবের হিজড়া নীতি বৈষ্ণব মতবাদ অনুপ্রবেশ করে হিন্দু সমাজকে নপুংসকে পরিণত করে ফেলেছে এবং ফেলছে। কারণ, বৈষ্ণব মতবাদ অনুযায়ী একজন মানুষ হবে দীন হীন, তার কোনো অহংকার, রাগ জেদ, বিদ্বেষ থাকবে না, কেউ তার গালে একটা চড় মারলে, সে পাল্টা আঘাত করার পরিবর্তে বলবে- তোমার হাতে লাগে নি তো, এর মানে হলো- মেরেছো কলসীর কানা, তাই বলে কি প্রেম দেবো না ? কোনো বৈষ্ণব কোনোদিন কিছু সঞ্চয় করবে না, প্রতিদিন সে মাধুকরী করে অর্থাৎ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে তার জীবিকা অর্জন করবে; এই হলো একজন বৈষ্ণবের চরিত্র, এর বাইরে বৈষ্ণব মতবাদের মূল থিয়োরি মোতাবেক বৈষ্ণবের কোনো বিয়ে শাদী ঘর সংসার ছেলে মেয়ে নেই, ফলে বৈষ্ণব সমাজ বলেও কিছু নেই। যার স্ত্রী নেই, তার যেমন স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ এবং রক্ষার কোনো ব্যাপার নেই, বৈষ্ণব মতবাদেও তেমনি বৈষ্ণব সমাজ বলেই কিছু নেই, ফলে সেই সমাজ রক্ষার তাগিদ তার মধ্যে থাকবে কেনো ? তাই বৈষ্ণব মতবাদে আত্মরক্ষার কোনো ব্যাপার নেই, ব্যাপার আছে শুধু মার খাওয়ার এবং কান্নাকাটি করার।

আজ যারা বলির বিরুদ্ধে কথা বলছে বা বলে, তারা হয় এই বৈষ্ণব, না হয় চৈতন্যের বৈষ্ণব মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত নপুংসক। বৈষ্ণব মতবাদে সাধারণভাবে মাছ মাংস খাওয়াই অন্যায়, সেখানে তারা পশুবলির বিরুদ্ধে কথা বলবে না কেনো ? বৈষ্ণব মতবাদ, বিয়ে-শাদির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, পরিবার গঠনের বিরুদ্ধে কাজ করে একদিকে যেমন হিন্দু সমাজের জনসংখ্যা কমাচ্ছে, অন্যদিকে হিন্দু সমাজকে নিরামিষ খাইয়ে হিন্দুদের কাম ক্রোধ ও দৈহিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়ে হিন্দু সমাজকে তার বিরোধী মুসলিম শক্তির কাছে মার খাওয়াইয়ে হিন্দু সমাজকে বিলুপ্ত করার জন্য তারা তাদের অজ্ঞাতেই কাজ করে চলেছে।

হিন্দুত্রাতা লেখক ড. রাধেশ্যাম ব্রহ্মচারী, পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের ভয়াবহ কুফল উপলব্ধি করে তার সে সম্পর্কিত একটি বইয়ের নাম রেখেছেন, "বামপন্থা : বাংলার সর্বনাশ", একইভাবে আমি বলছি- বৈষ্ণব মতবাদ হলো সনাতন হিন্দুধর্মের সর্বনাশ। বামপন্থাকে ঝেড়ে ফেলেই যেমন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা একটু একটু করে উঠে  দাঁড়াচ্ছে, তেমনি বৈষ্ণব মতবাদকে মাথা থেকে সম্পূর্ণভাবে ঝেড়ে ফেললেই কেবল হিন্দুরা কোমড় সোজা করে উঠে দাঁড়াতে পারবে, তারপর কারো ক্ষমতা নেই হিন্দুদেরকে কোনোভাবে দাবিয়ে রাখে।

মোদী-অমিত শাহ বর্তমানে ভারত শাসন করছেন সনাতন ধর্মের ক্ষত্রিয় নীতিতে, এর ফলে পাকিস্তান তো কোন ছাড়, সারা বিশ্ব বর্তমানে ভারতকে কুর্নিশ করতে বাধ্য হচ্ছে, একইভাবে প্রতিটি হিন্দু যখন বৈষ্ণবীয় হিজড়া নীতিকে পরিত্যাগ করে সনাতনী নীতিতে চলবে, তখন পৃথিবীর সমগ্র জাতি হিন্দুদের কাছে মাথা নত করে চলতে বাধ্য হবে। আর সনাতন ধর্মেরই একটি বিধি বা নীতি হলো দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পশুবলি, যা হিন্দুদেরকে দেয় মানসিক শক্তি এবং দৈহিক ক্ষমতা, যে মানসিক শক্তি এবং দৈহিক ক্ষমতার বলে পৃথিবীতে টিকে থাকে এবং রাজ করে কোনো জাতি।

আশা করছি- উপরের আলোচনা থেকে পশুবলির মূল কারণ এবং তার শাস্ত্রীয় রেফারেন্স সম্পর্কে, আমার বন্ধুদেরকে অবগত করাতে পেরেছি। 

এবার নিচের পোস্টে দেখে নিন, কেনো মনসা পূজার বলি শাস্ত্র সম্মত নয়।

মনসা পূজায় 'বলি'  প্রদান- অশাস্ত্রীয় এবং নিরর্থক :

Tuesday, 11 August 2020

যোগমায়ার গল্প এবং ব্রহ্মের সাথে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্পর্ক বা এদের প্রকৃত রহস্যটা আসলে কী ?


যোগমায়ার গল্প এবং ব্রহ্মের সাথে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্পর্ক বা এদের প্রকৃত রহস্যটা আসলে কী ?

শ্রীকৃষ্ণের জন্মের রাতের কাহিনী লিখতে গেলেই ‘যোগমায়া’ শব্দটি আসবেই। কারণ- গল্পে, বসুদেব, নন্দের কাছ থেকে যে কন্যা শিশুটিকে নিয়ে কারাগারে ফিরে আসে, তার নাম হিসেবে যেমন বলা হয় যোগমায়া; তেমনি বলা হয় যোগমায়ার প্রভাবেই সেই রাতে ঝড়-বৃষ্টিপূর্ণ দুর্যোগময় আবহাওয়ার সৃস্টি হয়েছিলো এবং কংস সহ কারাগারের রক্ষীরা সবাই গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এই যোগমায়া সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। যাদের এ বিষয়ে ধারনা নেই, আমি চেষ্টা করছি, এ বিষয়ে তাদেরকে কিছু ধারণা দিতে; সেই সাথে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরেরও প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করবো।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস মতে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা হলেন পরমব্রহ্ম। এই ব্রহ্মের কোনো আকার বা রূপ নেই এবং তিনি সর্বত্র বিরাজমান। এজন্যই ছান্দোগ্য উপনিষদ (৩/১৪/১) এবং বেদান্ত দর্শনে বলা হয়েছে,

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

এর অর্থ - সবকিছু বা সকলের মধ্যেই ব্রহ্ম বিদ্যমান। 

এই ব্রহ্মের তিনটি রূপ হলো- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। খেয়াল রাখতে হবে যে, এরা কোনো আলাদা সত্ত্বা নয়, এরা পরম ব্রহ্মেরই তিনটি আলাদা রূপ। পরমব্রহ্ম যখন সৃস্টি করেন তিনি ব্রহ্মা, যখন পালন করেন তখন তিনি বিষ্ণু এবং যখন ধ্বংস করেন তখন তিনি মহেশ্বর, রুদ্র বা শিব। যেমন প্রধানমন্ত্রীর হাতে যদি তিনটি পৃথক মন্ত্রণালয় থাকে, তিনি যখন যে মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করেন বা ফাইলে সই করেন, তখন তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেই সিগনেচার করেন কিন্তু বাস্তবে তিনি সাধারণ মন্ত্রী নন, প্রধানমন্ত্রী। পরমব্রহ্ম এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের ব্যাপারটা ঠিক সেই রকম; একই সত্ত্বা, কিন্তু কর্ম ও গুণে আলাদা আলাদা রূপ। 

কিন্তু স্থূলদৃষ্টিজনিত কারণে আমরা এসব বিবেচনা না ক’রে পরমব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে আলাদা করে ফেলে পরমব্রহ্মকেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছি। ভুল শিক্ষার ফলে আমরা মনে করি, যিনি সৃষ্টি করেন তিনি ব্রহ্মা; যিনি পালন করেন তিনি বিষ্ণু; আর যিনি ধ্বংস করেন তিনি শিব বা মহেশ্বর। এটা সত্য হলে, বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণ- তিনি পালন না করে কিভাবে কংস ও শিশুপালকে হত্যা করে বা জরাসন্ধ এবং দুর্যোধনকে হত্যা করায় ? প্রকৃতপক্ষে পরম ব্রহ্মের সৃষ্টিকারী রূপ হলো ব্রহ্মা, পালনকারী রূপ হলো বিষ্ণু এবং ধ্বংসকারী রূপ হলো শিব; যেমন প্রধানমন্ত্রী তার অধীনে থাকা মন্ত্রণালয়গুলোতে যখন যান, তখন সেই তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, যে উদাহরণটা একটু আগেই দিলাম।

যা হোক- আজকের বিষয় যোগমায়া, এবার সেই দিকে নজর দিই। পৃথিবীতে চেতনাগত শক্তি দুই প্রকারের- এক. নারীর, দুই. পুরুষের এবং এই দুই শক্তির মিলনের ফল ই হলো সৃষ্টি। কোনো পুরুষের যেমন একা কোনো কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই, তেমনি সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই একা কোনো নারীর। প্রকৃতির এই বিধানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই বা প্রকৃতির এই বিধানকে মেনে ব্রহ্মার নারী শক্তি যেমন সরস্বতী, তেমনি বিষ্ণুর নারী শক্তি হলো যোগমায়া। 

পুরুষের নারী শক্তিকে যেমন আমরা তার স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করি, তেমনি আমরা কল্পনা করে নিয়েছি যে ব্রহ্মার নারী শক্তি সরস্বতী হলো ব্রহ্মার স্ত্রী এবং বিষ্ণুর নারী শক্তি যোগমায়া বা লক্ষ্মী হলো বিষ্ণুর স্ত্রী, একইভাবে মহাদেবের নারী শক্তি বা স্ত্রী হলো দুর্গা। এই ভাবে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং দুর্গাকে আমরা আলাদা আলাদা সত্ত্বা হিসেবে তৈরি করে নিয়েছি। শুধু তাই নয় দুর্গার গল্পে সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকে দুর্গার মেয়েও বানিয়ে দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং দুর্গা- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বররই নারী শক্তির প্রতীক এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, কর্মের ভিত্তিতে পরম ব্রহ্মেরই পৃথক পৃথক তিনটি রূপ, যা আগেই উল্লেখ করেছি। 

লক্ষ্মী, সরস্বতী যে দুর্গার মেয়ে নয়, এ বিষয়ে যদি আপনার কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে নিজেকেই প্রশ্ন করবেন যে, হিন্দুশাস্ত্রের গল্পের ইতিহাসে প্রথম আবির্ভাব বিষ্ণুর, তারপর ব্রহ্মার ও শিবের। দুর্গার আবির্ভাব বহু পরে, যখন অলরেডি বহু দেবতার সৃষ্টি হয়ে গেছে, তাদের মিলিত শক্তির ফলেই দুর্গার সৃষ্টি, তাহলে সেই দুর্গা কিভাবে প্রথম দিকে সৃষ্টি হওয়া ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর নারী শক্তির প্রতীক সরস্বতী ও লক্ষ্মীর মা হয় ?

কারো মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম কেনো সরস্বতী ? তত্ত্ব মতে ব্রহ্মা সৃষ্টির দেবতা, তো সৃষ্টি করতে কী লাগে ? জ্ঞান। সরস্বতী সেই জ্ঞানের দেবী বা প্রতীক। একজন পুরুষ যেমন তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে একটি সন্তান সৃষ্টি করে, তেমনি ব্রহ্মা তার নারী শক্তির সাহায্যে সকল সৃষ্টি কর্ম সম্পাদন করে। প্রকৃত অর্থে যদি ব্রহ্মার স্ত্রী সরস্বতী হতো, তাহলে কিন্তু সরস্বতীরও ছেলে মেয়ে থাকতো। কিন্তু তা কি আছে ? নেই। অন্যদিকে কিন্তু ব্রহ্মার ছেলে মেয়ে আছে। তাহলে এই ছেলে মেয়েগুলো এলো কোথা থেকে ? আসল ব্যাপার হচ্ছে, ব্রহ্মা, সৃষ্টির সময় তার নিজেরই নারী শক্তির রূপ সরস্বতীর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিকর্ম সমাধা করে থাকে।

একই ভাবে বিষ্ণুর নারী শক্তি হলো ধনের প্রতীক লক্ষ্মী, কারণ কী ? বিষ্ণু পালন কর্তা। তো পালন করতে কী লাগে ? ধন-সম্পদ। এজন্যই বিষ্ণুর নারী শক্তির প্রতীক হলো ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী।

মহাদেবের নারী শক্তির প্রতীক হলো দুর্গা, কালী, চণ্ডী; যাদের হাতে ভয়ংকর সব মারণাস্ত্র, যাদের কাজই হলো অসুরদের ধ্বংস করা, কারণ আর কিছুই নয়- সৃষ্টি বা পালন করার জন্য যেমন নারী শক্তির দরকার, তেমনি ধ্বংস করার জন্যও নারী শক্তির দরকার। দুর্গা, কালী, চণ্ডী আসলে মহাদেবের সেই নারী শক্তিরই প্রতীক, যাদের আমার মহাদেবের স্ত্রী রূপে কল্পনা করে নিয়েছি।

এমন প্রশ্নও কারো মনে আসতে পারে যে- লক্ষ্মী, সরস্বতী যে দুর্গার মেয়ে এই তথ্যটা হিন্দু সমাজে প্রচলিত হলো কিভাবে, আর কেনোই বা একসাথে তাদের পূজার করা হয় ?

দুর্গাপূজা হলো হিন্দু সমাজের মহাশক্তির মহাপূজা। ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন, হিন্দুধর্মের এমন কোনো দেবতা বা তার প্রতিনিধি নেই যা, যা দুর্গাপূজায় নেই। শিবের প্রতিনিধি হিসেবে স্বয়ং দুর্গা; বিষ্ণু ও ব্রহ্মার প্রতিনিধি হিসেবে লক্ষ্মী ও সরস্বতী, এছাড়াও রয়েছে সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং যোদ্ধার প্রতীক হিসেবে কার্তিক। এর সাথে আরও আছে প্রকৃতির প্রতিনিধি হিসেবে- সাপ, ময়ূর, সিংহ, ইঁদুর, পেঁচা, হাঁস এবং কলা গাছসহ নব পত্রিকার নামে নানা গাছপালার উপাদান। এভাবে দুর্গা পূজা এক মহাপূজা যা প্রতিনিধিত্ব করে সমাজের বিন্দু থেকে সিন্ধু সকল কিছুর।

আপনারা শুনে থাকবেন যে দুর্গা পূজায় বেশ্যার ঘরের মাটি লাগে, এর মানে হলো দুর্গাপূজা করতে গেলে সমাজের উচ্চ শ্রেণী থেকে শুরু করে একেবারে সমাজের নিম্ন দলিতশ্রেণী, যারা অস্পৃশ্য, এমনকি যারা যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়ে সমাজের চোখে ঘৃণিত, দুর্গাপূজা করতে গেলে তাদেরকেও ঘৃণা বা অবহেলা করা যাবে না। সমাজ ও প্রকৃতির সব কিছুকে নিয়ে দুর্গাপূজা এভাবে এক মহাশক্তির ও মহা আয়োজনের পূজা।

এতসব তথ্য তো সাধারণ মানুষ আর জানে না, আর আমাদের শাস্ত্রজ্ঞানী ব্রাহ্মণ সমাজও তাদের প্রতিপত্তি খর্ব হবে ভেবে সাধারণ মানুষকে এসব জ্ঞান দেয় নি। এই প্রেক্ষাপটে - মা, বাবার সাথে তাদের ছেলে মেয়েরা পূজা দেখতে গিয়ে তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করেছে বা এখনও করে যে, লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ, দুর্গার কে হয় ? মা, বাবাও জানে না আসল ঘটনা, কিন্তু ছেলে মেয়েদেরকে তো উত্তর কিছু একটা দিতে হবে, তাই তারা সহজ সমাধান হিসেবে বলে দিয়েছে এবং এখনও বলে ওরা মা দুর্গার ছেলে মেয়ে। ব্যস, সমস্যার সমাধান।এভাবেই কার্তিক, গণেশের সাথে সাথে লক্ষ্মী এবং সরস্বতী যারা দেবী হিসেবে দুর্গার সিনিয়র তারাও দুর্গার মেয়ে হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, দুর্গা কেনো অসুরকে মেরেছে, ছোট বেলায় এর একটা ব্যাখ্যা শুনেছিলাম এরকম:

অসুর হলো দুর্গার ভাগিনা, আর ভাগিনা হয়ে অসুর তার মামী দুর্গাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো, এজন্যই ক্ষেপে গিয়ে দুর্গা অসুরকে মেরে ফেলেছে। হিন্দু সমাজের অজ্ঞানতার অবস্থাটা একবার কল্পনা করুন।

যা হোক, ফিরে যাই যোগমায়ার গল্পে, কংসের অত্যাচার থেকে পৃথিবীবাসীকে বাঁচানোর জন্য বিষ্ণু, কংসকে বিনাশের প্ল্যান ক’রে প্রাকৃতিক নিয়মে তার বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়; খেয়াল করুন ধ্বংসের দেবতা যদি আলাদা কেউ হতো তাহলে কিন্তু এই দায়িত্ব পড়তো গিয়ে শিবের উপর; কারণ আমাদের স্থূল বিশ্বাস মতে ধ্বংসের মন্ত্রণালয়ের মালিক হচ্ছে মহাদেব শিব। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব আসলে আলাদা আলাদা কেউ নন, একই শক্তির আলাদা আলাদা নাম মাত্র, আর এই শক্তির উৎস হলো পরমব্রহ্ম, যিনি হলেন প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা।

কংসের হাতে দেবকীর সন্তানকে হত্যা এবং অষ্টমগর্ভে কৃষ্ণরূপে তার নিজের জন্ম, সব কিছুই ছিলো বিষ্ণুর সেই প্ল্যানেরই অংশ। তাছাড়া কী দরকার ছিলো কংসকে ঐ দৈববানী শোনানোর যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে কংসের মৃত্যু হবে ? এই দৈববাণীর শোনানোর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো অত্যাচারিত মথুরাবাসীকে এই বার্তা দেওয়া যে তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে একজন আসছে। কিন্তু কেনো দেবকীর অষ্টম সন্তানের হাতে কংসের মৃত্যু হবে, কেনো প্রথম সন্তানের হাতে নয় ? 

অষ্টম সন্তানের কথা বলে কংসকে তার অত্যাচারী রূপ আরো বেশি করে মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো। কেননা, কংসের নিয়তি নির্ধারণ করেই বিষ্ণু তাকে দৈববানী শুনিয়ে দিয়েছিলো এবং বিষ্ণু জানতো যে এই দৈববাণী শুনে কংস তো শুধরাবেই না, উল্টো তার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে এবং পৃথিবীতে তার নিজের আগমনের একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেটা প্রতিটি মহামানবের আবির্ভাবের  ক্ষেত্রে হয়েছে।

কংসের কারাগারে একে একে দেবকীর টি সন্তান নিহত হলে ৭ম সন্তান হিসেবে বিষ্ণুর আংশিক অবতার বলরাম আসেন এবং সেখানে তার জন্ম হলে তার কংসের হাতে তার মৃ্ত্যু হবে এজন্য গর্ভাবস্থাতেই বিষ্ণু তার নারী শক্তি যোগমায়ার বলে বসুদেবের আরেক স্ত্রী রোহিনীর গর্ভে সেই ৭ম সন্তানকে স্থানান্তরিত করে। ফলে সন্তানের জন্ম না হওয়ায় কংস মনে করে দেবকীর ৭ম গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। বলরামকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখার কী প্রয়োজন ছিলো ? প্রয়োজন ছিলো গোকূলে কৃষ্ণের বাল্যকালে কৃষ্ণের মাথার উপর ছাতা হয়ে কাউকে থেকে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার, যেহেতু গোকূলে কৃষ্ণের আপন রক্ত বলতে কেউ ছিলো না। খেয়াল করুন, গোকূলে কৃষ্ণ লালিত পালিত হয়েছে তার পালক পিতা মাতার কাছে, সেখানে বলরামই ছিলো তার একমাত্র রক্তের সম্পর্কের কেউ, যে ছিলো কৃষ্ণের বড় ভাই, যে বড় ভাইরা ছোটদেরকে শত বিপদের মাঝেও আগলে রাখে, বলরামের ভূমিকা ছিলো সেটাই এবং এই কারণেই বলরামের জন্ম নিয়ে এত নাটক করতে হয় বিষ্ণুকে। 

৭ম গর্ভে বলরামের জন্মের পর আসে অষ্টম গর্ভে পূর্ণ শক্তি নিয়ে বিষ্ণুর নিজের জন্ম নেওয়ার সময়। এই একই সময় বিষ্ণু জন্ম নেয় দেবকীর কোলে আর অন্য দিকে গোকূলে নন্দপত্নী যশোদার গর্ভ থেকে জন্ম নেয় বিষ্ণুর নারী শক্তি যোগমায়া। তারপর বিষ্ণু পরিকল্পনা মতো ঝড়-বৃষ্টির দুর্যোগের রাত সৃষ্টি করে কংসসহ কারারক্ষী সবাইকে গভীর ঘুমে অচেতন করিয়ে কৃষ্ণ ও যোগমায়ার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করে। তারপরও কংস তাকে হত্যা করতে গেলে কংসের হাত থেকে ফসকে উপরে উঠে গিয়ে বলে, তোমাকে যে মারবে সে এখন গোকূলে বাড়ছে, বলেই  সে শুন্যে মিলিয়ে যায়। পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে সদ্যজাত একটি সাধারণ  শিশুর পক্ষে এভাবে    হাত  ফসকে উপরে উঠে যাওয়া এবং কথা বলা অসম্ভব। কিন্তু ঐ কন্যা কোনো সাধারণ শিশু ছিলো না, তাই  তার পক্ষে ঐসব ঘটনা ঘটানো  সম্ভব হয়েছে, যেমন সম্ভব হয়েছে শিশু কৃষ্ণের দ্বারা অসম্ভব রকমের সব কাণ্ড ঘটানো।

যা হোক, যোগমায়ার মাধ্যমে কংস যখন জেনেই যায় যে গোকূলে তার শত্রু বেড়ে উঠছে,  তারপরও কংস, গোকূলে কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য প্রকাশ্য কোনো পদক্ষেপ সম্ভবত এজন্য নিতে পারে নি যে, আগের অষ্টম সন্তানের হাতে মৃত্যুর দৈববানীটা ছিলো প্রকাশ্যে, সেটা কংস ছাড়াও দেবকী, বসুদেব সহ অনেকে শুনেছিলো, তাই তাদেরকে বন্দী করে তাদের সদ্যজাত সন্তানদেরকে হত্যা করাটাকে এক রাজার আত্মরক্ষা হিসেবে প্রজারা মেনে নিয়েছিলো, কিন্তু যোগমায়ার দৈববানী শুনেছিলো মাত্র তিন জন- কংস, দেবকী ও বসুদেব। যেহেতু যোগমায়ার দৈববানী কংস ছাড়া কারাগারের বাইরে আর কোনো প্রজা জানতো না, তাই ঐ দৈববানীর উপর ভিত্তি করে দেবকীর অষ্টম সন্তানকে খুঁজে বের করে হত্যা করার অভিযান গোকূলে পরিচালনা করলে সেটা রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে কংস সম্ভবত প্রকাশ্য অভিযান পরিচালনা না করে গোপন অনেকগুলো অভিযান পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত সবই ব্যর্থ হয়।

যা হোক, একদিন বয়সী যোগমায়ার গল্প কংসের কারাগারেই শেষ। কিন্তু বিষ্ণুর নারী শক্তি এই যোগমায়া, পরে, কারগার থেকে বসুদেব ও দেবকী মুক্ত হলে বসুদেবের ঔরসে বসুদেবের অপর স্ত্রী, যার গর্ভে বলরামের জন্ম হয়েছিলো, সেই রোহিনীর গর্ভে জন্ম নেয় এবং তার নাম হয় সুভদ্রা, যে সুভদ্রার সাথে অর্জুনের বিয়ে হয় এবং যার গর্ভে অভিমন্যুর জন্ম হয়।

 সুতরাং যেসব নারীবাদী এই বলে বিলাপ করছে যে, কৃষ্ণের জন্মের রাতে এক কন্যাকে বলি দিয়ে এক পুত্রকে বাঁচানো হয়েছে, তারা প্রকৃতপক্ষে জানেই না যে যোগমায়া আসলে কে ? তার জন্মের কী উদ্দেশ্যে ছিলো ? আ কে ই বা তাকে জন্ম দিয়েছিলো ? 

যোগমায়া এবং কৃষ্ণ আলাদা কেউ নয়, এঁরা অভিন্ন; বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার হলেন শ্রীকৃষ্ণ, আর বিষ্ণুর নারী শক্তি হলেন যোগমায়া। তাই বিষ্ণু যখন মানবরূপে পৃথিবীতে আসেন, তখন তার লীলাতে ভূমিকা রাখতে যোগমায়াও আসেন পৃথিবীতে, যেমন কৃষ্ণের জন্মের রাতে এসে কংসকে ধোকা দিয়েছেন, তেমনি পরে আবার সুভদ্রা হিসেবে জন্ম নিয়ে অভিমন্যুর জন্ম দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন। একই সময়ে এই যোগমায়াই আবার ভীষ্মক রাজার কন্যা রুক্মিণী হয়ে জন্ম নিয়ে কৃষ্ণকে বিবাহ করে তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সুতরাং যোগমায়াকে একজন সাধারণ নারী এবং শ্রীকৃষ্ণকে একজন সাধারণ পুরুষ বিবেচনা করে, এক কন্যার বলিদানে এক পুত্রকে বাঁচানো হয়েছে বলে পুরুষতন্ত্রকে হয়তো বিদ্ধ করা যায়, কিন্তু তাতে বাস্তব জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে না।

শেষে আরেকটি তথ্য দিয়ে রাখি- এই যোগমায়াই আসলে দেবী দু্র্গা

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 6 August 2020

কার আদর্শ আপনার জন্য অনুসরণীয় ?


কার আদর্শ আপনার জন্য অনুসরণীয় ?

যেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়, সেদিন দুই লক্ষ করসেবক সেখানে উপস্থিত ছিলো। মানে দুই লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ শক্তিতে ভাঙা সম্ভব হয় বাবরি মসজিদ, একটি অন্যায়ের জবাব দেওয়া হয়। এই দুই লক্ষ মানুষ ছিলো কোনো না কোনো পিতা মাতার সন্তান। মানে কোনো না কোনো পিতা মাতা তাদেরকে জন্ম দিয়েছিলো বলেই তারা অমন একটি মহৎ ও পুন্যবান কাজে অংশ নিতে পেরেছিলেন, যার ফলে একটি অন্যায়কে পরাজিত করে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার পথ প্রশস্ত হয়। এই দুই লক্ষ করসেবকের পিতা যদি চৈতন্যদেবের আদর্শকে অনুসরণ করে বিয়ে না করতো বা বিয়ের করলেও স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যেতো, তাহলে কি আজ বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা হতো ?

অবতার বা প্রকৃতই যারা মহাপুরুষ তাদের আদর্শ সব সময় সব স্থানেই অনুসরণীয়, যেমন- রামকৃষ্ণের আদর্শ। তাঁরা বিয়ে করেছেন, সংসার করেছেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছেন, ভবিষ্যত সমাজের জন্য বা সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সন্তানেরও জন্ম দিয়েছেন। এঁরাই আমাদের আদর্শ আর অনুসরণীয়ও, চৈতন্যদেব এবং তার মতো যেসব ব্যক্তি, যারা বিয়ে করে নি, সংসার করে নি, সন্তানের জন্ম দেয় নি- তারা নয়; কারণ, এদের পথ হলো- ধ্বংস ও বিলুপ্তির পথ, যে পথে কোনো কিছু অর্জন হয় না, যে পথে শুধুই হারাতে হয়।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

বসুদেব ও বাসুদেবের মধ্যে পার্থক্য কী ?


বসুদেব ও বাসুদেবের মধ্যে পার্থক্য কী ?

Ramesh Debnath,
আপনার মস্তিষ্ক যে সুস্থ নয়, সেটা সম্ভবত আপনি জানেন না। কিন্তু আমরা, যারা আপনার পোস্ট রেগুলার ফেসবুকে দেখতে বাধ্য হই, তারা বুঝতে পারি। কারণ, আপনি অকারণে কোনো কোনো পোস্টে এমন স্ট্যাটাস দেন, যার কোনো অর্থই নেই।

কোনো কিছু লিখার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বোঝানো। আপনার লিখা পড়ে কেউ যদি বা অনেকেই যদি কিছু বুঝতে না পারে, তাহলে আপনার লিখার উদ্দেশ্য কী ? প্রতিটি মানুষ সাধারণ জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন, তাই তাদেরকে যদি কোনো কিছু বুঝিয়ে বলা যায়, সেটা যতই জটিল হোক, তারা সেটা বুঝবে, যদি কোনো বিষয় বেশি জটিল হয়, তাহলে তার জন্য সহজ উদাহরণ ব্যবহার করতে হবে, যে দায়িত্বটা লেখকের। তাই যেকোনো ভাবেই হোক, কেউ যদি তার পাঠকদেরকে বিষয়টি বোঝাতে ব্যর্থ হয়, সে লেখকই নয়, তার লেখা ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছুতে মন দেওয়া উচিত। এ পর্যন্ত আপনার অনেক স্ট্যাটাস দেখেছি, যেগুলোর কোনো মাথামুণ্ডু নেই, তারপরও সেগুলো ইগনোর করেছি, কিন্তু আজ আর ইগনোর করতে পারলাম না, বিষয়টার গুরুত্বের কারণে। কোন বিষয়ে কথা বলছি, সেটা নিশ্চয় ফটোপোস্ট দেখে বুঝতে পারছেন ?

গীতার ৭/১৯ নং শ্লোকের সমালোচনা করতে গিয়ে আপনি সিদ্ধান্তে এসেছেন যে- পিতা ও পুত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এবং এ প্রসঙ্গে শেষে প্রশ্ন করেছেন যে- তবে কি কৃষ্ণই দৈবকীর স্বামী ?

শ্রীকৃষ্ণের নাম বাসুদেব। কোনো পিতা মাতা তাদের সন্তানের যে নাম রাখে, সেটা সাধারণ মানুষের কাছে পিতা মাতার ইচ্ছা বলে মনে হলেও এর পেছনে কাজ করে ঈশ্বরের গোপন উদ্দেশ্য। কারণ, একটি নাম একটি ব্যক্তির জীবনে তার কাজ কর্ম ও মন মানসিকতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই ব্যক্তির যে নাম- তার পেছনে ঈশ্বরের গোপন উদ্দেশ্যে এবং সেই নামের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। অনেক সময় পিতা মাতার নামের সাদৃশ্যে রাখা হয় সন্তানের নাম, আবার বড় ভাই বোনদের নামের সাথে মিল রেখেও ছোট ভাই বোনের নাম রাখা হয়। কিন্তু আমার নাম উত্তম, যে নামের সাথে আমার পিতা মাতা বা অন্য ভাইবোনদের নামের কোনো সাদৃশ্য নেই। আমার এই নামের পেছনে ঈশ্বরের হয়তো এই উদ্দেশ্য ছিলো যে- আমাকে দিয়ে তিনি জগতের উত্তম কাজগুলো করাবেন, বাস্তবে আমি করছিও তাই এবং আমার নামের প্রভাবের কারণেই কোনো দিন আমি এমন কাজ করি নি বা করতে পারি নি, যার জন্য লোকে আমার বদনাম করতে পারে। তাই যেকোনো ব্যক্তির নাম একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, নামের এই গুরুত্ব জ্যোতিষ শাস্ত্র দ্বারাও প্রমাণিত। তাহলে শ্রীকৃষ্ণের নাম যে বাসুদেব, সেটার কি কোনো অর্থ নেই ? তিনি পৃথিবীতে বসুদেবের পুত্র বলেই কি বাসুদেব। বাসুদেব নামের কি অন্য কোনো গভীর তাৎপর্য নেই ?

বাসুদেব এর দুটি অংশ, বাসু আর দেব। দেব শব্দে বোঝায় দেবতা, আর বাসু শব্দটি এসেছে বাস করা থেকে। তার মানে যে দেবতা বাস করেন, তিনিই বাসুদেব; তিনি কোথায় বাস করেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়- সবার হৃদয়ে, যেহেতু তিনি অন্তর্যামী। তার মানে সবার হৃদয়ে যিনি বাস করেন তিনিই বাসুদেব। আর গীতা দ্বারা প্রমাণিত যে শ্রীকৃষ্ণই সবার হৃদয়ে বাস করেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ হলেন বাসুদেব। শ্রীকৃষ্ণের নাম বাসুদেব, তিনি শুধু বসুদেবের পুত্র বলে নয়। তিনি সবার হৃদয়ে বাস করেন বলেই তিনি বাসুদেব।

রমেশ দেবনাথকে বলছি- উপরের আলোচনা দ্বারা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণের পিতার নাম বাসুদেব নয়, বসুদেব। তাই গীতার ৭/১৯ নং শ্লোক দ্বারা একই সাথে পিতা ও পুত্রকে বোঝানো হয় নি, বাসুদেব দ্বারা শ্রীকৃষ্ণকেই বোঝানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আপনি আরো বলেছেন- "অর্থকারী বাসুদেব শব্দটাকে অভেদ করে দেখিয়েছে", আমি তো বুঝতিই পারছি না এখানে কোন অর্থকারী বাসুদেব শব্দকে অভেদ করে দেখিয়েছে ? আপনার সমস্যাই হলো এটা- যা বলেন, তা ক্লিয়ার করে বলতে পারেন না। আর যখন কোনো বক্তব্য ক্লিয়ার হয় না, সেটা নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। আপনি নিজেই বাসুদেবের পিতার নাম যে বসুদেব, সেটা জানেন না; আবার অর্থকারী উপর দোষ চাপাচ্ছেন এবং নিজের সেই ভুল উপলব্ধি দিয়ে প্রশ্ন করছেন- তবে কি কৃষ্ণই দৈবকীর স্বামী ? বসুদেবের স্ত্রীর নাম যে দৈবকী নয়, দেবকী; সেটাও তো আপনি ঠিক মতো জানেন না। এমন অল্পজ্ঞান নিয়ে আপনি কেনো আসেন ফেসবুকে ধর্ম প্রচার করতে ? আপনার প্রচারে যে সাধারণ হিন্দুরা বিভ্রান্ত হতে পারে, সেটা কি আপনি জানেন ?

গীতার এই শ্লোক মতে- বাসুদেব অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই সব। এই সূত্রে শ্রীকৃষ্ণই বসুদেব, আবার শ্রীকৃষ্ণই দেবকী, শ্রীকৃষ্ণই আমি, শ্রীকৃষ্ণই আপনি; অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই সবকিছু বা সবাই। আপনি যদি এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি করে থাকেন, তাহলেও তো দেবকীর স্বামী শ্রীকৃষ্ণ হয় না, আবার বসুদেব আর বাসুদেব্ও এক হয় না। তাহলে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি করেছেন ?

আমি নিশ্চিত জানি, আমার এই প্রবন্ধের জবাব আপনি এমন মন্তব্য করবেন, যার কোনো অর্থই নেই। কিন্তু আপনার সব ছাগলামি মন্তব্যের জবাব আমি দেবো না, দেবো শুধু সেটার, যার দ্বারা হিন্দু সমাজে বিভ্রান্ত সৃষ্টি হতে পারে, যেমন আজকের বিষয়টি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ

Tuesday, 4 August 2020

অশৌচ চলাকালীন মন্দিরে পূজা বা প্রবেশ করা যাবে কি না ?


অশৌচ চলাকালীন মন্দিরে পূজা বা প্রবেশ করা যাবে কি না ?

কারো জন্ম হলে যে অশৌচ পালন করা হয়, তাকে বলে জননাশৌচ। মরণাশৌচ শোকের হলেও জননাশৌচ আনন্দের। তাই এতে সদ্য জাত শিশুর পিতা মাতা এবং শিশুর দেখা শোনার কাজে নিয়োজিত কেউ ছাড়া অন্য কারো কোনো অশৌচ হয় না। এই অশৌচে পিতা মাতাকে যা পালন করতে হবে, তা হলো- যেহেতু তারা সদ্যজাত শিশুর জন্মে আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকে এবং মা তো সব সময় শিশুর কাছে থাকেই এবং বাবাও যখন তখন শিশুকে কোলে নেয় বা আদর করে এবং এই সময় যেহেতু শিশুকে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মধ্যে রাখা যায় না বা স্বাভাবিকভাবেই সেটা সম্ভব নয়, তাই শুধু পিতা মাতাকেই নয়, যারাই শিশুটিকে দেখা শোনার জন্য সর্বদা নিয়োজিত থাকবে, তাদেরকেই পরিবারের বা অন্য লোকজনের সাথে মেলামেশায় একটু সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে, যাতে তাদের মাধ্যমে কোনো রোগ জীবানু অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে না পড়ে।

হিন্দু সমাজে আঁতুড় ঘর নামে একটা ব্যাপার আছে, যাতে, কোনো মহিলার বাচ্চা হলে তাকে ৬ দিন (এলাকা ভেদে ২/১ দিন পার্থক্য হতে পারে) ঐ ঘরে আলাদাভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয় এবং আঁতুড় ঘরে কাটানো সময় শেষের পরের দিনের দিন কামানের মাধ্যমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তাকে বাড়ির অন্যদের সাথে মিশতে দেওয়া হয়; এটা এইজন্যই করা হয়, যাতে মা ও শিশুর দ্বারা রোগ জীবানু অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে না পারে এবং আঁতুড় ঘর থেকে বের হওয়ার পর ঐ ঘরে থাকা সব কাপড় চোপড় পুড়িয়ে ফেলা হয়, এটাও করা হয় রোগ জীবানু নাশের জন্য। বর্তমানে বেশিরভাগ ছেলে মেয়ের জন্ম হচ্ছে হাসপাতালে বা ক্লিনিকে এবং সেখানেই মা ও শিশুর চিকিৎসার সুবিধার্থে বেশ কয়েকদিন রাখা হচ্ছে; যদি ৫/৬ দিন সেখানে রাখতে বাধ্য হতে হয়, তাহলে বাড়িতে আর আলাদা করে আঁতুড় ঘর বানানোর প্রয়োজন নেই, কামানের দিন হসপিটাল বা ক্লিনিক থেকে বাড়িতে এনে কামান দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বাড়িতে তুললেই হবে।

জননাশৌচের মূল কথা হলো- সদ্যজাত শিশু এবং তার মায়ের দ্বারা কোনো রোগ জীবানু যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করা, এখানে আর অন্য কোনো ব্যাপার নেই, একারণেই জননাশৌচ হবে শুধু পিতা মাতার, এই কথাটিই বলা আছে মনুসংসহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের ৬২ নং শ্লোকে এই ভাবে-

"সর্বেষাং শাবমাশৌচং মাতাপিত্রোস্তু সূতকম্।
সূতকং মাতুরেব স্যাদুপস্পৃশ্য পিতা শুচিঃ।।

এর অর্থ- মৃত্যুজনিত অশৌচে অঙ্গাস্পৃশ্যত্বরূপ অশৌচ সকলেরই সমান। কিন্তু জন্ম সম্পর্কিত অশৌচে মাতা ও পিতার মাত্র সূতক অর্থাৎ অঙ্গাস্পৃশ্যত্ব হয়; ঐ অস্পৃশ্যত্যরূপ অশৌচ মাতার দশরাত্রি হয়ে থাকে, কিন্তু পিতা স্নান করলেই সেই অস্পৃশ্যতা দূর হবে।

যদিও আমি মনে করি না যে মনুসংহিতা হিন্দু ধর্মের কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থ, তারপরও যেহেতু হিন্দু সমাজের বহু নিয়ম কানুন মনুসংহিতার থেকে উদ্ভূত, তাই মনুসংহিতাকে কিছুটা পাত্তা দিতেই হয়। এছাড়াও যে বিষয়গুলো ভালো এবং যুক্তিসম্মত, সেটা আমরা যেকোনো গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করতেই পারি।

অশৌচের মধ্যে পূজা পার্বন করা যাবে কি না বা মন্দিরের প্রবেশ করা যাবে কি না, এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন ফটোপোস্টে উত্থাপিত হয়েছে, এ সম্পর্কে বলছি-

বাড়িতে কেউ মারা গেলে তার উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ বা ভোগ পর্যন্ত প্রতিদিন গীতা পাঠ করা হয়; গীতা হলো হিন্দুধর্মের প্রধান গ্রন্থ, যে গীতা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখের বাণী এবং যে গীতার জ্ঞানকে অবলম্বণ করে শ্রীকৃষ্ণ ত্রিলোক পালন করে থাকেন, সেই গীতা যখন বাড়িতে মৃত্যুজনিত অশৌচ, যে অশৌচ শুধু বাড়ির লোকজনকেই নয়, বংশের এমনকি আত্মীয় স্বজনদের কাউকে স্পর্শ করে, সেই অশৌচে যদি গীতা স্পর্শ বা পাঠ করা যায়, তাহলে অন্যান্য দেব-দেবীর পূজা করা যাবে না কেনো ? কোনো দেব-দেবী কি শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে বড় ? অশৌচে যেখানে গীতা পাঠ করা যায় অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের পূজা ও আরাধনা করা যায়, সেখানে অন্য দেব-দেবী তো তুচ্ছ ব্যাপার। তবে অশৌচের মধ্যে এই পূজা প্রার্থনা শুধু বাড়ির মন্দির এবং বাড়িতে স্থাপিত দেব-দেবীদের জন্য প্রযোজ্য, যেহেতু সেটা বাড়ির সীমানার মধ্যেই অবস্থিত, তাই বাড়ি অশৌচ হলে বাড়ির মধ্যে স্থাপিত মন্দিরও অশৌচ।

কিন্তু সাধারণভাবে মন্দির একটি পবিত্র জায়গা, তাই আমরা সব সময় স্নান করে পবিত্র হয়ে মন্দিরে যাওয়ার চেষ্টা করি, এটা মন্দিরের শুচিতা এবং পবিত্রতার জন্য প্রয়োজন, যাতে মন্দির সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে এবং লোকজন মন্দিরে গিয়ে যাতে পবিত্রতারভাব অনুভব করে, তাই অশৌচ অবস্থায় পাড়ার বা গ্রামের মন্দিরে না যাওয়াই ভালো, এতে মন্দিরের পবিত্রভাব বজায় থাকে এবং যা তা অবস্থায় মন্দিরে যেতে না পারায় মন্দিরের গুরুত্ব বজায় থাকে এবং মন্দিরের প্রতি সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা তা হারায় না বা বজায় থাকে, যেটা সমাজ ও মন্দিরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উপরের আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে- গৃহে স্থাপিত মন্দিরে অশৌচ অবস্থায় পূজা করা যাবে, কিন্তু পাড়ার বা গ্রামের সার্বজনীন মন্দিরে করা যাবে না। এটা মরণাশৌচের ক্ষেত্রে; কিন্তু জননাশৌচের ক্ষেত্রে যেহেতু শুধু প্রসূতি মাতারই কেবল অশৌচ হয়, তাই বাড়ির অন্য সকল সদস্য যেকোনো প্রকার মন্দিরে যেতে পারবে এবং পূজা অর্চনা করতে পারবে। এই সময় প্রসূতি মায়ের কোনো রকম পূজা অর্চনা করার দরকার নেই; কারণ, তিনি কষ্ট করে একটি সন্তানের জন্ম দিয়ে সমাজের যে পরিমাণ উপকার করেছেন, তা যেকোনো প্রকার দেব-দেবীকে পূজা দেওয়ার চেয়ে হাজার গুন বেশি পূণ্যের কাজ; তাই সন্তান জন্মদানকালীন অসুবিধার সময় কোনো প্রসূতি মাতার কোনো রকম ধর্মকার্য করার প্রয়োজন নেই।

আশা করছি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বিষয়টি বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 30 July 2020

পৌরাণিক কাহিনীগুলো আসলে কী ?


পৌরাণিক কাহিনীগুলো আসলে কী ?

পুরাণে বেশ কিছু চরিত্রকে খারাপ হিসেবে, অর্থাৎ ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; এদের মধ্যে প্রধান হলো ইন্দ্র এবং ইন্দ্রের সাথে রয়েছে সূর্য পত্নী- সংজ্ঞা, রাহু, কেতু, মঙ্গল, রাহু-কেতুর মা সিমহিকা, নরকাসুর, অন্ধক, জলন্ধর, প্রহ্লাদের বাবা হিরণ্যক শিপু, অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য এবং অসংখ্য অসুর; এদের মধ্যে ইন্দ্র হলো দেবরাজ, অর্থাৎ সে দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, অন্যরা দেবতাদের শত্রু অসুর; এই অসুরদের ভিলেন চরিত্র নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই, কিন্তু দেবতা হয়েও ইন্দ্রের ভিলেনের মতো চরিত্র কেনো, এই প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত জবাব অনেকের কাছেই নেই, তাই ইন্দ্রের চরিত্র প্রসঙ্গে হিন্দুরা, মুসলমানদের কাছে হেয় হয়, ইন্দ্রের প্রসঙ্গ তুললেই হিন্দুদের মুখের কথা হারিয়ে যায়।

এই সমস্যা থেকে আপনি তখনই মুক্তি পাবেন, যখন জানবেন যে পৌরাণিক কাহিনীগুলো আসলে কী ?
পৌরাণিক কাহিনীগুলো হলো পৃথিবীর সকল ঘটনার সার সংক্ষেপ; অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন ঘটনা ঘটে নি বা ভবিষ্যতে ঘটবে না, যেগুলো কোনো না কোনো ইঙ্গিত পুরাণে নেই। পুরাণের ঘটনাগুলো কাল্পনিক এবং এই কাল্পনিক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে পুরাণ রচয়িতা মুনি ঋষিরা মানুষকে এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, কোন পরিস্থিতিতে কোন ব্যবস্থা নিতে হবে বা কোন ব্যবস্থা নিলে কোন পরিস্থিতিকে এড়ানো যাবে।

মানুষের জীবনে নানা ঘটনা ঘটে থাকে, এগুলোর কিছু ঘটায় ভালো মানুষেরা, কিছু ঘটায় খারাপ মানুষেরা; এভাবে জগতে মানুষ দুই প্রকার- ভালো ও খারাপ; ভালো মানুষেরা দেব বা দেবতা স্বভাবের, আর খারাপ মানুষগুলো অসুর স্বভাবের। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই দুই শ্রেণীর মানুষ পৃথিবীতে আছে এবং সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত তা থাকবে।

গল্প-সিনেমায় যেমন নায়কের ক্ষমতার প্রকাশ ঘটানোর জন্য ভিলেনদেরক দুর্ধর্ষ খারাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়, তেমনি পৌরাণিক কাহিনীগুলোর গল্পকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং দেবতাদের ক্ষমতার প্রকাশ দেখানোর জন্য ইন্দ্রসহ কিছু চরিত্রকে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন কৃষ্ণের সাথে ইন্দ্রের যদি শত্রুতা না থাকতো এবং কৃষ্ণ যদি ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করতে উদ্যোগী না হতো, তাহলে কিন্তু পৃথিবীবাসী কৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বত উত্তোলনের লীলা কখনোই দেখতে পেতো না এবং মানুষ, কৃষ্ণের এই ক্ষমতার প্রদর্শন থেকে বঞ্চিত হতো; আমরা কৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বত উত্তোলনের ঘটনার কথা জানি শুধু ইন্দ্রের কারণে।

একইভাবে স্বর্গীয় বা দেব-দেবীদের কাহিনীর মধ্যে দেবরাজ ইন্দ্রকে ভিলেন হিসেবে তুলে ধরে তাকে দিয়ে নানারকম দুষ্কর্ম করানোর কারণ হচ্ছে অন্যান্য দেব-দেবীর সাথে তার দ্বন্দ্ব ঘটিয়ে সেই সব দেব-দেবীর ক্ষমতার প্রকাশ ঘটানো।

এছাড়াও ইন্দ্র কিছু খারাপ ঘটনা ঘটিয়েছে দেবতাদের ভালোর জন্যই, যেমন- গৌতমের স্ত্রী অহল্যার সাথে সেক্স, যদিও হিন্দুধর্ম বিদ্বেষীরা একে ধর্ষণ বলতেই মজা পায়. কিন্তু আসল ঘটনা হলো- গৌতম মুনি তার তপস্যার ফলে এমন শক্তি অর্জন করতে যাচ্ছিলো, যে শক্তি দিয়ে সে স্বর্গ অধিকার করতে পারতো, যদি গৌতম মুনি এটা করতে পারতো, তাহলে দেবতাদের বাসস্থান ও অস্তিত্ব বিপন্ন হতো; তাই স্বর্গের রাজা হিসেবে ইন্দ্রকে গৌতম মুনির ছদ্মবেশে ঐ ঘটনা ঘটাতে হয়, যাতে গৌতম মুনি ক্রোধিত হয় এবং ক্রোধের বশে অভিশাপ বাণী উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে গৌতম মুনির ঐ তপস্যার শক্তি ব্যর্থ হয় এবং দেবতারা তাদের বাসস্থান রক্ষা করতে সমর্থ হয়। ইন্দ্রের এই দুষ্কর্ম বা কর্মের পেছনে যে সকল দেবতার সমর্থন ছিলো, তার প্রমান হলো গৌতম মুনির অভিশাপে ইন্দ্র তার পুরুষত্ব হারালে সকল দেবতা মিলে তার পুরুষত্ব আবার ফিরিয়ে দেয়। "দেবরাজ ইন্দ্রের অহল্যা ধর্ষণ! প্রকৃত ঘটনাটা কী ?" নামে আমার এক পোস্টে এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে, সেটা যারা পড়েছেন, তারা বিষয়টি জানেন, আর যারা এখনও সেটা পড়েন নি, সেটা পড়ে ঘটনার মূল কারণ জানবেন বলে আশা রাখি।

হিন্দু ধর্ম বিদ্বেষীরা আরেকটা অভিযোগ করে যে, বিষ্ণু, জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দাকে ধর্ষণ করেছে; পোরাণিক কাহিনী মতে এই ঘটনাটির ডিটেইলস হলো-

শিবের মস্তকস্থিত ক্রোধ অগ্নিরূপে সমুদ্রের জলে নিক্ষিপ্ত বা পতিত হলে, তা থেকে এক পুত্রের জন্ম হয়, যাকে সমুদ্রের দেবতা লালন পালন করে বড় করে, এই পুত্রের নামই জলন্ধর। যৌবনে পদার্পন করলে জলন্ধর, শিবের স্ত্রী বলে কল্পিত পার্বতীকে কামনা করে, কিন্তু এতে যে বিপদ আছে, সেটাও জলন্ধর ভালো করেই জানতো, তাই সে প্ল্যান করে কালনেমী দানবের কন্যা বৃন্দাকে বিয়ে করে, যে বৃন্দার উপর এই বর ছিলো যে, সে যতদিন তার সতীত্বকে রক্ষা করতে পারবে, ততদিন তার স্বামীর মৃত্যু হবে না। বৃন্দাকে বিয়ের করার পর জলন্ধর যখন নিশ্চিত হলো যে কেউ তাকে হত্যা করতে পারবে না, তখন সে ইচ্ছে মতো দেবতা ও দানবদের উপর অত্যাচার শুরু করলো, তার এই অত্যাচার থেকে সকলকে রক্ষা করার জন্য, বিষ্ণু, জলন্ধরের রূপ ধরে বৃন্দার কাছে যায় এবং বৃন্দাকে স্পর্শ করে তার সতীত্ব নাশ করে, এর ফলেই শিব , জলন্ধরকে হত্যা করতে সমর্থ হয়। বৃন্দা যখন বিষ্ণূর এই ছদ্মবেশের ঘটনা জানতে পারে, তখন সে বিষ্ণুকে পাথরে পরিণত হওয়ার অভিশাপ দেয়, যার ফলে বিষ্ণু শালগ্রাম শিলায় পরিণত হয়, যাকে নারায়ণ শিলাও বলা হয়। কিন্তু বৃন্দা যখন অন্যান্য দেবতার নিকট থেকে জলন্ধরকে হত্যার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তখন বৃন্দা, বিষ্ণুকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করে দেয় এবং প্রাণ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিষ্ণু, বৃন্দাকে এই আশীর্বাদ দেয় যে, তার দেহত্যাগের পর তার চিতার ছাইভস্ম থেকে এক গাছের জন্ম হবে, যার নাম হবে তুলসী, যার মধ্যে স্বয়ং তিনি অর্থাত বিষ্ণু বাস করবেন এবং গাছ রূপেই তুলসী জগতে পূজিতা হবেন; এরপর বৃন্দা নিজেকে জ্বলন্ত চিতায় আহুতি দিয়ে নিজের প্রাণ ত্যাগ করে, যার চিতার ছাই থেকে অনেকগুলো তুলসী গাছের জন্ম হয় এবং এক বনে পরিণত হয়, যেই বনের নাম বৃন্দাবন। বৃন্দার বন বলেই আসলে কৃষ্ণের বাল্যলীলার ঐ স্থানের নাম বৃন্দাবন।

এই ভাবে দেবতারা যে দু একটি ঘটনা ঘটিয়েছে, সাধারণ দৃষ্টিতে যেগুলোকে খারাপ বলে অনেকে মনে করে, সেগুলো ঘটানোর পেছনে আসলে ছিলো কোনো মহৎ উদ্দেশ্য, সেই ব্যাপারগুলোকে না বুঝে, হিন্দুধর্ম বিদ্বেষীরা তো বটেই, আমাদের হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে মন্তব্য করে যে- ইন্দ্রের চরিত্র তো খারাপ, বিষ্ণু অমন কাজ কেনো করলো ? ইত্যাদি ইত্যাদি। আর মুসলমানরা ডাইরেক্ট বলে ইন্দ্র ও বিষ্ণু ধর্ষক, এছাড়াও তারা কোনো ক্লু পেলেই দেব-দেবীদের চরিত্রে কালিমা লেপন করতে ছাড়ে না। কিন্তু তারা এটা বোঝে না যে মুহম্মদের চরিত্রের মতো দেব-দেবীদের চরিত্র ঐতিহাসিক নয়, তাই মুহম্মদের ধর্ষণের সাথে, দেবতাদের ধর্ষণে অনেক পার্থক্য আছে। কারণ, মুহম্মদ যাদেরকে ধর্ষণ করেছে, সেগুলো বাস্তব, কিন্তু দেবতারা যাদেরকে ধর্ষণ করেছে বলে বলা হয়, সেগুলো শুধুই গল্প, সেই ঘটনাগুলো কখনোই বাস্তব পৃথিবীতে ঘটে নি; কিন্তু এই কাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো না কোনো শিক্ষা; তাই এগুলোর মূল রহস্য বুঝতে পারলে মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত।

শুরুতেই বলেছি, পৌরাণিক কাহিনীগুলো হলো পৃথিবীর সকল ঘটনার সার সংক্ষেপ, পৃথিবীতে যেমন খুন ধর্ষণ অপহরণসহ নানা অপরাধের ঘটনা রয়েছে, তেমনি পৌরাণিক কাহিনীগুলোতেও পৃথিবীর ঘটনার প্রতীকী হিসেবে এই ঘটনাগুলো রয়েছে। কেননা, আমাদের মুনি ঋষিরা তো আর মুহম্মদের মতো মূর্খ বা অবাস্তব চিন্তাধারার মানুষ ছিলো না যে, ভালো কাজের দায় শুধু আল্লার উপর বর্তাবে, আর খারাপ কাজের দায় শয়তানের উপর? আর এই একটি তথ্যের ভিত্তিতেই যে আল্লার সর্বশক্তিমানত্ব খারিজ হয়ে যায়, সেটা মূর্খ মুসলমানেরা বুঝবে কিভাবে ? কেননা, ভালো কাজের মালিক আল্লা, আর খারাপ কাজের মালিক শয়তান হলে, আল্লা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক এবং সবকিছুর স্রষ্টা হয় না, তাহলে এই আল্লা সর্বশক্তিমান হয় কিভাবে ? কিন্তু হিন্দুর ঈশ্বর জগতের ভালো মন্দ সবকিছুকেই স্বীকার করে, এজন্যই তিনি গীতায় বলেছেন, জগতের সবকিছুই আমি বা এমন কিছু নেই যা আমি নই, দুর্যোধনও আমি আবার অর্জুনও আমি।

হিন্দুধর্ম হলো বাস্তবতার ধর্ম এবং বাস্তবতাকে স্বীকার করে বলেই হিন্দুধর্ম কোনো কিছুকেই অস্বীকার করে না। আর বাস্তবতার প্রতিফলন হলো পৌরাণিক কাহিনীগুলো, তাই পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে খুন-ধর্ষণ-অপহরণের মতো ঘটনাগুলো এসেছে, অসুররা যে খুন-ধর্ষণ-অপহরণের মতো ঘটনা ঘটাবে তাতে তো কোনো সন্দেহ বা সমস্যা নেই, কিন্তু দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ইন্দ্র যখন এই ধরণের ঘটনা ঘটায় তখন, খালি চোখে কিছু প্রশ্ন তোলাই যায়, সেটা হলো- দেবরাজ ইন্দ্র এই ধরণের ঘটনা ঘটাবে কেনো ?

দেবরাজ ইন্দ্র হলো পৃথিবীর খল রাজাদের প্রতীক, যারা দেবতার মতো শক্তিশালী কিন্তু মন দুষ্টবুদ্ধিতে পূর্ণ। খল রাজারা যেমন নিজের রাজ্য বাঁচাতে অনেকে নানারকম ছলা করা করে এবং ভোগ বিলাস করতে ছাড়ে না, ইন্দ্রের চরিত্রও তেমন।

তাই পৌরাণিক দেবতাদেরকে, তাদের কিছু কর্মের জন্য, যারা তাদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখে বা তাদের সমালোচনা করে; তারা আসলে হিন্দুধর্মের সামগ্রিকতাকে বুঝে না বা সেটাকে উপলব্ধি করতে পারে না; তাই তারা দেবতাদের সমালোচনা করে তাদের মূর্খতাকে প্রকাশ করে মাত্র।

আশা করছি দেব-দেবীদের গল্পগুলো যে আসলে কী এবং সেগুলো কেনো লিখা হয়েছিলো, সেই বিষয়টা আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি, কিন্তু পুরাণগুলোতে যে অশ্লীলতা এবং উদ্ভট কাহিনী যুক্ত হয়েছে , সেটা প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে নানা জনের হাতে বিকৃতির ফল। এই বিকৃতিটা ঘটেছে এভাবে-

আগে থেকেই প্রচলিত পুরাণের কাহিনীগুলো বেদব্যাসের হাতে লিপিবদ্ধ হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশ হওয়ার পর, নানা জনের প্রয়োজনে সেই গ্রন্থগুলো কপি হতে শুরু করে, এই কাজের জন্য প্রাচীনযুগেই লিপিকার নামে একটি পেশার উদ্ভব হয়েছিলো, যাদের কাজ ছিলো- কারো প্রয়োজনে, মূল মালিকের নিকট থেকে কোনো একটি গ্রন্থ নিয়ে, সেই গ্রন্থ হাতে লিখে, নতুন একটি গ্রন্থ তৈরি করে নতুন মালিককে দেওয়া, এই কাজ তারাই করতো, যাদের হাতের লেখা ভালো ছিলো এবং যারা কিছু পড়াশোনা জানতো, এই লিপিকারদের কেউ কেউ গ্রন্থ কপি করার সময় তাতে অনেক সময় কিছু তথ্য সংযোজন বিয়োজন করতো, যার খবর জানতো না গ্রন্থের পুরাতন বা নতুন মালিকদের কেউই। এই বিকৃত গ্রন্থ থেকে পরে আরো কপি হতো এবং তা থেকে আরো, এভাবে গ্রন্থের বিকৃতি ঘটেছে ভারতে ইংরেজ আগমনের পর ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে, এজন্যই গনেশের মাথা কাটার ঘটনা আপনি যতগুলো পুরাণে পাবেন, দেখবেন সবগুলোই ভিন্ন কাহিনী। তাই পুরাণের অশ্লীল এবং উদ্ভটকাহিনী নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার কিছু নেই; কারণ, সেগুলো সনাতন ধর্মের অংশ নয়, সেগুলো পুরাণ বিকৃতির ফসল।

আশা করছি বিষয়টি আমার বন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 29 July 2020

মহাভারত কি গোমাংস ভক্ষণকে সমর্থন করে ?


মহাভারত কি গোমাংস ভক্ষণকে সমর্থন করে ?

মহাভারতে রাজা রন্তিদেবের একটি কাহিনী আছে, যেখানে বলা হয়েছে, রাজা রন্তিদেব যজ্ঞে গরুকে ছেদন করাতে, গরুদের চামড়া খুলে কোনো একটি জায়গায় স্তুপীকৃত করে রাখায়, সেইসব চামড়া থেকে রস নির্গত হয়ে প্রবাহিত হওয়ায় একটি নদীর সৃষ্টি হয়, যার নাম চর্ম্মন্বতী নদী। রাহুল সাংকৃত্যয়ণ এর একটি বই, সম্ভবত "সিন্ধু থেকে গঙ্গা"তেও এরকম একটি কাহিনী পড়েছিলাম। এই রেফারেন্সগুলো এই প্রমাণ দেয় যে, অতীতে এক সময় গরুর মাংস খাওয়া হতো।

শুধু গরু কেনো, অতীতে, গুহায় বাসকালে মানুষ- বাঘ, সিংহ প্রভূতি হিংস্র প্রাণীর মাংসও খেয়েছে। আমরা হোমোস্যাপিয়েন্স প্রজাতির মানুষ, আমাদের উৎপত্তি আফ্রিকায়। আমাদের উৎপত্তির প্রায় একই সময়ে ইউরোপে উৎপত্তি হয়েছিলো নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষ। কিন্তু হোমোস্যাপিয়েন্সরা ইউরোপে ঢুকে পড়লে নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষদের সাথে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয় এবং হোমোস্যাপিয়েন্সরা নিয়ানডার্থালদেরকে সেই যুদ্ধে পরাজিত ক'রে হত্যা ক'রে খেয়ে ফেলে। এরপর পৃথিবী থেকে নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

জঙ্গলে ও গুহায় বাস করা কালে এবং কৃষিভিত্তিক সভ্যতা সৃষ্টির আগে পৃথিবীতে হত্যাই হতো নিহতদের মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে। বাঘ সিংহরা যদি মানুষকে হত্যা করতে পারতো, তাহলে তারা মানুষের মাংস খেতো, আর মানুষ যদি বাঘ সিংহকে হত্যা করতে পারতো, তাহলে মানুষ বাঘ সিংহের মাংস খেতো। সেই সময়ে বাঘ সিংহকে হিংস্র বলার কোনো সুযোগ নেই, কারণ, মানুষও বাঘ সিংহের মতো একই রকম হিংস্র ছিলো, আর সবারই বাস ছিলো জঙ্গলে। সুতরাং মানুষরূপী প্রাণী কর্তৃক পশুদেরকে হত্যা করে খাওয়া এবং পশু কর্তৃক মানুষের নিহত হয়ে তাদের পেটে যাওয়া, মানুষের উৎপত্তি থেকে শুরু করে কৃষিভিত্তিক সভ্যতা শুরুর আগে পর্যন্ত ছিলো নরম্যাল ব্যাপার।

শুরু থেকেই মানুষ ছিলো স্বভাববশতই আরামপ্রিয় এবং ঝুঁকিহীন জীবন যাপনে আগ্রহী। কৃষি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর মানুষ দেখলো যে, খাদ্য যোগানে পশু শিকার করতে গেলে যে পরিশ্রম এবং জীবনের ঝুঁকি, মাটি থেকে খাবার উৎপাদনে জীবনে ঝুঁকি তো নেই ই, অতটা পরিশ্রমও নেই। এই উপলব্ধি থেকেই মানুষ আস্তে আস্তে কৃষিভিত্তিক জীবন যাপনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার এই উন্নয়ন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এক সাথে হয় নি, এই দৌড়ে কোনো এলাকা এগিয়ে গেছে আবার কোনো এলাকা ছিলো অনেক পিছিয়ে। এই যেমন এখনও অস্ট্রেলিয়ার পাশের পাপুয়া নিউগিনির মানুষের জীবন যাপন আধুনিক উন্নত সভ্যতা থেকে প্রায় কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে আছে। ১৮৬০ সালে ফিজির আদিবাসীরা এক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারককে হত্যা করে তাকে পুড়িয়ে তার মাংস খেয়ে ফেলেছিলো, জোরপূর্বক কাউকে হত্যা করে মাংস খাওয়ার সেই ঘটনা ই ফিজির শেষ মানুষ খাওয়া ঘটনা, এরপর ব্রিটিশদের প্রভাবে তারা সভ্য হতে শুরু করে এবং মানুষে মাংস খাওয়ার ঘটনা আর ঘটে নি। কিন্তু ফিজি দ্বীপপুঞ্জের কিছু কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী এখনও পরলোকগত পিতা মাতার মাংস খায়। শুধু তাই নয় অস্ট্রেলিয়ার আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন জেমসকুকের দলবলকে তাহিতি দ্বীপের আদিবাসীরা হত্যা করে খেয়ে ফেলেছিলো। তার মানে মানুষ যে অন্যান্য প্রাণীর মাংস খেতো বা খায়, সেটা তো নরম্যাল ব্যাপার, মানুষ প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত মানুষের মাংসও ব্যাপকভাবে খেয়েছে। এই মানুষ প্রাচীন কালে যদি গরুর মাংস খায়, সেটা কোনো ঘটনা নাকি ?

এখন দেখা যাক, মহাভারতে গরুর মাংস খাওয়ার ঘটনাটির উল্লেখ কিভাবে আছে ?

এই প্রবন্ধের সাথে আমি যে ফটোদুটি যুক্ত করেছি, সেগুলো কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদিত মহাভারত থেকে নেওয়া, যে মহাভারত সংস্কৃত মহভারতের হুবহু গদ্য অনুবাদ, মানে এই মহাভারতই সবচেয়ে অথেন্টিক।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, এই মহাভারতের অনুবাদ সম্পর্কে আরেকটি তথ্য পাঠকবন্ধুদেরকে দিয়ে রাখি।

এটা কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত নামে পরিচিত হলেও, এটির অনুবাদক কিন্তু কালীপ্রসন্ন সিংহ নয়। কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন জমিদারের ছেলে জমিদার। তিনি কিছু বেতনভূক্ত সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিয়োগ করেছিলেন মহাভারত অনুবাদের জন্য, কালী প্রসন্ন সিংহের হয়ে তারাই এই কাজটি করে দিয়েছিলেন, এজন্য শুরু থেকেই এটা কালীপ্রসন্ন সিংহের নামেই চলে। কালী প্রসন্ন সিংহের এই অনুবাদের জন্য ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাভারত অনুবাদে হাত দিয়েও সেটা আর এগিয়ে নিয়ে যান নি।

যা হোক, এই অনুবাদের একটি স্থানে লিখা হয়েছে- "পূর্ব্বকালে মহাত্মা রন্তিদেব স্বীয় যজ্ঞে গো সমুদায়কে পশুরূপে কল্পিত করিয়া ছেদন করাতে উহাদের চর্ম্মরসে চর্ম্মন্বতী নদী প্রবাহিত হইয়াছে। এক্ষণে উহারা যজ্ঞীয় পশুত্বে কল্পিত হয় না। উহারা এক্ষণে দানের বিষয় হইয়াছে।"

ভালো করে খেয়াল করুন, শুরুতেই বলা হয়েছে "পূর্ব্বকালে", এই পূর্বকালে, কত পূর্বে ? যখন গরু, দেবতা হিসেবে কল্পিত হয় নি, তখন; তার মানে বেদ সম্পূর্ণভাবে রচিত হওয়ারও পূর্বে। কারণ, যখন থেকে বেদে গরুকে দেবতা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, তখন থেকে গোহত্যাকে নিষেধ করা হয়েছে এবং তখন থেকে গরুকে সাধারণ পশু হিসেবে কল্পনা না করে তাদেরকে দানের বিষয় হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এবং তারপর থেকে যজ্ঞে আর পশু হিসেবে গরুকে হত্যা করা হয় না।

তাহলে ঘটনা কী দাঁড়ালো, মহাভারতে কি গো হত্যা করে তার মাংস খাওয়াকে সমর্থন করা হয়েছে ? প্রাচীনকালে রন্তিদেব নামে কোনো এক রাজা কী করতো, সেই বিষয়টি মহাভারতে বলা হয়েছে।

ইসকনের প্রভুপাদ নিশ্চয় নিরামিষ খেতো এবং ধরে নিলাম যে তার দাদু মাছ মাংস খেতো, যেটা অসম্ভব কিছু নয়। এখন প্রভুপাদের জীবনী লিখতে গিয়ে তো তার দাদুর কথা লিখতেই হবে, এখন প্রভুপাদের জীবনীতে যদি লেখা হয় যে প্রভুপাদের দাদু মাছ মাংস খেতো, এর মানে কি প্রভুপাদও মাছ মাংস খেতো ? নিশ্চয় নয়। মহাভারত শুধু বিশাল কাহিনী নয়, এটি একটি বিশাল ব্যাপারও, এই বিশালত্বে নানা কাহিনী নানা ভাবে এসেছে, সেখানে যদি কোনো প্রসঙ্গে প্রাচীন কালের রাজা রন্তিদেবের কথা বলা হয়ে থাকে এবং তার সম্পর্কে যদি বলা হয় যে যজ্ঞে সে গো হত্যা করতো এবং অতিথিদেরকে গো মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করতো, তাহলে সমস্যা কোথায় ? গরু তো একটা সাধারণ তৃণভোজী প্রাণী, মানুষ এক সময় বাঘ সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীকে হত্যা করে খেয়েছে, এমনকি মানুষ, মানুষের মাংসও খেয়েছে, যেগুলো সবই অতীত, তাহলে কোনো এক অতীতে রন্তিদেব গোহত্যা করেছে এবং তার মাংস দিয়ে অতিথিদেরকে আপ্যায়ণ করেছে, এটা কি খুব বড় কোনো মাথা ব্যথার বিষয় ?

রন্তিদেবের কাহিনীতে আর একটি বিষয় লক্ষণীয়, সেখানে বলা হয়েছে- অতিথিরা যে রাত্রি রন্তিদেবের গৃহে বাস করিত, সেই রাত্রিতে তথায় বিংশতি সহস্র একশত গো ছেদন করা হইত।" তারপরও নাকি পাচকেরা পর্যাপ্ত মাংস খেতে পেতো না !

এই বিষয়টি যে প্রক্ষিপ্ত বা অতিরঞ্জিত, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমরা জানি যে বেদব্যাস মাত্র ২৪ হাজার শ্লোকে মহাভারত রচনা করেন, কিন্তু বর্তমানে মহাভারতে শ্লোকের সংখ্যা এক লক্ষ, ফলে মহাভারতের কাহিনীতে যে কত বেনোজল ঢুকে স্থান করে নিয়েছে, সেটা একবার কল্পনা করুন; এই ২০ হাজার ১০০ গো ছেদনও আমার মতে সেকরমকই একটি বেনো জল। কারণ যে কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক গরুর অনায়াসে চার পাঁচ মন মাংস হয়, ধরে নিলাম একটি গরু থেকে গড়ে ৪ মন মাংস পাওয়া যায়, এই হিসেবে ২০,১০০ টি গরুর মাংস হবে ৮০,৪০০ মন, কেজির হিসেবে তা ৩২ লক্ষ ১৬ হাজার কেজি, প্রতিটি মানুষ গড়ে ২৫০ গ্রাম করে মাংস খেলে, এক বেলায় এই মাংস খেতে লোক লাগবে ১ কোটি ২৮ লক্ষ ৬৪ হাজার জন। অতিথিরা রন্তিদেবের গৃহে তিন বেলা খেলেও এই পরিমান মাংস খেতে লোক লাগবে প্রায় ৪৩ লক্ষ, এটা যে সময়ের ঘটনা সেই সময় সারা ভারত মিলেও ৪৩ লক্ষ লোক ছিলো না। আর ঘটনাটি মহাভারতে এমনভাবে লিখা হয়েছে যেন যখনই অতিথিরা রন্তিদেবের গৃহে আসতো, তখনই তারা সংখ্যায় ঠিক এই ৪০/৪৫ লক্ষই হতো এবং গুনে গুনে ঠিক ২০,১০০টি গরুই কাটা হতো তাদের খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে ? এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ই সন্দেহজনক ব্যাপার। বাড়িতে অতিথিরা আসবে, এটা একটা নরম্যাল ব্যাপার, কিন্তু তাদের সংখ্যা তো কখনো নির্দিষ্ট হতে পারে না। একেকদিন, একেক সময় বা একেক বছর তো অতিথিদের সংখ্যা কম বেশি হবেই, তাদের জন্য খাবার দাবারের আয়োজনও নিশ্চয় কমবেশি হবে, তাহলে নির্দিষ্ট করে গরুর সংখ্যা ২০,১০০টি বলা হলো কেনো ? সুতরাং ২০,১০০ গরুর ব্যাপারটি যে মিথ্যা, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আর যজ্ঞে রন্তিদেবের কাটা গরুর চামড়ার রস থেকে যে চর্ম্মন্বতী নদীর উৎপত্তি হয়েছে, এটি নিয়ে আমার ঘোর সংশয় আছে। কারণ, নদীর উৎপত্তি হয় পাহাড় পর্বত থেকে, আর সেই নদীর প্রবাহ ঠিক রেখে জীবিত থাকতে হলে তার নিয়মিত জলপ্রবাহ দরকার, যেটা পাহাড়-পর্বত ছাড়া সম্ভব নয়। তাহলে প্রাচীনকালে কোনো এক স্থানে স্তুপীকৃত পচা চামড়ার রস থেকে উৎপন্ন নদী কিভাবে তার প্রবাহ ঠিক রাখলো এবং দীর্ঘসময় ধরে জীবিত থাকলো, যা ইতিহাসে স্থান পেয়ে গেছে ?

সব মিলিয়ে- রন্তিদেব, তার গো হত্যা এবং তার দ্বারা অতিথি আপ্যায়ণ, পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে সন্দেহজনক, আর সন্দেহ নিশ্চয়তায় পরিণত হয়, যখন জানি যে মহাভারতের ৭৬ হাজার শ্লোকই প্রক্ষিপ্ত।
সনাতন ধর্মে কাহিনীর শেষ নেই, তাই যদি দেখা যায়, কোনো একটি কাহিনী অপর কাহিনীর সাথে ম্যাচ করছে না, তখনই বুঝে নিতে হবে যে এতে কোনো না কোনো ভেজাল আছে। যেমন- বেদে, গো হত্যা নিষেধ, কিন্তু রন্তিদেব, তার যজ্ঞে গো হত্যা করছে। আবার বলা হচ্ছে, সেই সময় গরুকে পশু হিসেবে কল্পনা করা হতো, কিন্তু বর্তমানে তা আর হয় না। তার মানে এটাও হতে পারে যে রন্তিদেবের সময় যজ্ঞ চালু হলেও যজ্ঞে গরুকে হত্যা করার নিয়ম ছিলো, কিন্তু পরে গরুকে দেবতার মর্যাদা দান করায় আর যজ্ঞে গরু হত্যা করা হয় না। একটু আগে পিছে ভেবে নিলে এই কাহিনীটা মানান সই, কিন্তু অতিথিদের জন্য সব সময় নির্দিষ্ট সংখ্যা ২০,১০০টি গরু হত্যা, এটা কিছুতেই সুস্থ মস্তিষ্কে মেনে নেওয়া যায় না; কারণ, অতিথিদের সংখ্যা কম বেশি হতে পারে, তাই তাদের জন্য আয়োজনও কম বেশি হবে এবং গরুর চামড়ার রস থেকে যে চর্ম্মন্বতী নদীর উৎপত্তি এটাও ভৌগোলিক কারণেই বিশ্বাস করা যায় না।

সুতরাং মহাভারতের কাহিনীতে রন্তিদেবের কাহিনী থাকলেই যে সেটা অথেন্টিক, এমনটা নয়; আবার রন্তিদেব অতিথিদের জন্য গরু মাংস খাওয়ার ব্যবস্থা করলেই যে মহাভারত, গরুর মাংস ভক্ষণকে সমর্থন করছে, ব্যাপারটি তেমনও নয়।

আশা করছি উপরের আলোচনা থেকে মহাভারতে গরুর মাংস ভক্ষণের প্রকৃত রহস্যটি আমার বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।