Showing posts with label নিরামিষ-আমিষ. Show all posts
Showing posts with label নিরামিষ-আমিষ. Show all posts

Thursday, 27 August 2020

সাত্ত্বিক মানে কি নিরামিষ খাবার ?



সাত্ত্বিক মানে কি নিরামিষ খাবার ?

কিছু কিছু দিব্যজ্ঞানীর অত্যাচারে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। এরা মনে করে, সাত্ত্বিক মানে নিরামিষ খাবার; এছাড়া এরা আরও মনে করে যে ধর্ম পালন করতে হলে নিরামিষ খাবারই খেতে হবে, আমিষ খাবার খাওয়া যাবে না; শুধু তাই নয়, এরপর এরা প্রশ্ন করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে কি মাছ মাংস নিবেদন করা সম্ভব ? তার মানে, এদের শেষ কথা হচ্ছে- ধর্মকর্ম করতে গেলে নিরামিষ খেতেই হবে আর এই নিরামিষ খেতে খেতে কাম-ক্রোধ ত্যাগ ক'রে হীন দুর্বল হয়ে মুসলমানদের হাতে মার খেয়ে হয় জন্মভূমি ত্যাগ করতে হবে, না হয় মরতে হবে। এদেরকে আমি জিজ্ঞেস করছি, এই যদি হয় শেষ পরিণতি, তাহলে সেই ধর্ম পালনের প্রয়োজনীয়তা কী, যে ধর্ম মানুষকে আত্মরক্ষা করার পথ দেখায় না বা আত্মরক্ষা করার শক্তি অর্জন করতে দেয় না ?

নিরামিষ খাবারের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে আমি নিরামিষ খাবারের সম্পূ্র্ণ বিরুদ্ধে, এই বিষয়টি আমার বিভিন্ন লেখায় অনেকবার প্রকাশ করেছি, আমার এসব লেখা পড়ে ঐ দিব্যজ্ঞানীরা আমাকে পরামর্শ দেয়, আপনি গীতার অমুক অমুক শ্লোক পড়ে দেখেন, সেখানে বলা আছে সাত্ত্বিক, তামসিক রাজসিক খাবারের কথা, এছাড়াও অমুক শ্লোকে দেখেন, সেখানে বলা আছে, কৃষ্ণকে পত্র পুষ্প ও ফল নিবেদন করার কথা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথম কথা হলো, নিরামিষ খাবারের এই নিয়ম হিন্দু ধর্মের কোনো বৈশিষ্ট্য নয়, এটি জৈন মতবাদের একটি বৈশিষ্ট্য; এই জৈন মতবাদ থেকে এটি চৈতন্যদেব এর বৈষ্ণব মতবাদে অনুপ্রবেশ করেছে, যে বৈষ্ণব মতবাদের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো কান্নাকাটি করা, এজন্যই তাদের কাছে নিরামিষ খাবার আদর্শ; কারণ অপরের হাতে বিশেষ করে মুসলমানদের হাতে ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে মার না খেলে আপনি কাঁদবেন কিভাবে ?  একটা কথা খুব ভালো করে স্মরণে রাখবেন, চৈতন্যদেবের আগে হিন্দু সমাজে নিরামিষ বলে কোনো কিছু ছিলো না।

যারা আমাকে গীতা পড়ার পরামর্শ দেয়, তাদেরকে বলছি- গীতার সকাম কর্ম ও নিষ্কাম কর্মের সঠিক ব্যাখ্যা আমিই প্রথম ফেসবুকে লিখেছি; যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও ব্যাসদেব কিভাবে গীতা লিখলো, সেই ব্যাখ্যা আমিই প্রথম দিয়েছি; সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও, এখানে ধর্ম বলতে আসলে কোন ধর্মকে বোঝানো হয়েছে, সেই ব্যাখ্যাও আমিই প্রথম দিয়েছি: কৃষ্ণের জীবনে রাধার কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও গীতা মাহাত্ম্যে রাধা কোথা থেকে এলো, সেটাও আমি প্রথম বলেছি; সত্ত্ব, তমঃ ও রজঃগুনেরর ব্যাখ্যা আমিই প্রথম দিয়েছি; এসব ছাড়াও সনাতন ধর্মের অনেক ধর্মতত্ত্ব আমি প্রকাশ করেছি বা ধর্মের ব্যাখ্যা আমি দিয়েছি, যা অসংখ্য মানুষকে হিন্দু ধর্মকে সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে, এসব কথা কিন্তু কেউ আগে বলতে পারে নি এবং হাজার হাজার লোক সেগুলো পড়েছে, কারো ক্ষমতা হয় নি সেগুলোর বিরোধিতা করার। 

আবার অনেক সময় এমনও হয়েছে, কারো কমেন্টের জবাব দেওয়ার জন্য জাস্ট অনুমান করে কমনসেন্স থেকে হয়তো একটি পোস্ট লিখেছি, পরে ধর্মগ্রন্থ পড়তে গিয়ে দেখেছি- সেই কথাগুলোই লিখা আছে। তখন আমি নিজেই অবাক হয়েছি যে, সেই ধর্মগ্রন্থ পড়ার আগেই সেগুলো আমি কিভাবে লিখতে পারলাম ? এছাড়াও সব সময় ই মাত্র ২৫ বা ৩০% আইডিয়া নিয়ে আমি একটা পোস্ট লিখা শুরু করি, লিখতে লিখতেই বাকি আইডিয়াগুলো আসে এবং সেভাবেই পোস্টটি শেষ করি, তারপর সেই পোস্ট যে কোন অবস্থায় পৌঁছায়, তার সাক্ষী তো আপনারা নিজেই এবং একটি পোস্ট লিখা শেষে আমার এই উপলব্ধি হয় যে, সেগুলো হয়তো ঈশ্বরই আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে; কারণ, ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না থাকলে ওগুলো যে আমার পক্ষে লিখা সম্ভব নয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝি।

এর আগে, বহু হিন্দু নামধারী নাস্তিক এবং আস্তিকরা, হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে আমাকে ঠেকানোর বহু চেষ্টা করেছে, ঈশ্বরের কৃপা ও ইচ্ছায় বিজ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক জবাব দিয়ে সকল ক্ষেত্রেই আমি উত্তীর্ণ হয়েছি এবং সেই সব বিষয় লক্ষ লক্ষ মানুষ জানতে পেরেছে। আমার জ্ঞানের বিষয়ে কোনো সংশয় থাকলে এবং আমার পরীক্ষা নিতে চাইলে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যে কোনো প্রশ্ন করে আপনিও চেষ্টা করতে পারেন আমাকে ঠেকাতে; কে জানে, হয়তো আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমিও শিখতে পারবো নতুন কিছু এবং আপনার প্রশ্নের কারণেই আরও লক্ষ লক্ষ লোক  জানতে পারবে সেই নতুন তথ্য। আমি বিশ্বাস করি, প্রশ্ন যতই কঠিন হোক না কেনো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবশ্যই আমাকে পার করবেন।

যা হোক, ফিরে যাই নিরামিষ খাবারে, আমি নিরামিষ খাবারের পক্ষপাতী নই, এই কথা বিভিন্ন পোস্টে মাঝে মাঝে প্রকাশ পেলে যেসব দিব্যজ্ঞানীর কমেন্ট আমার পোস্টে আসে, দেখে নিন, সেরকম দুটি কমেন্ট-

কমলাক্ষ গিরীধারী দাস • Friends with DebasishSarker

“সনাতন ধর্মের সকল স্তরে সকল মাছ মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে। গীতার ৩য় অধ্যায় এর ১২,১৩, ৭তম,৯ম অধ্যায়, মনুসংহিতার ৫ম অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোক গুলো পডুন। ভগবান মাছ মাংস ছেড়ে বিষ্ণু প্রসাদ খেতে বলেছেন। ভগবানের র্নিদেশ সব ক্ষেত্রে মানা উচিত। হোটেলে, ক্লাবে, টিউশন ঘরে আহার না করলে মৃত্যু হয় না। তবে আপনার লেখার কিছু অংশ বাস্তবতার সাথে মিললেও ভগবানের র্নিদেশ মানা উচিত।”

Arjun Chandra Das 

kabarer moddhe o dhorm oache. jemon gita ache sresto ahar sattik,mane niramish.

এই দুটি কমেন্ট এসেছিল, আমার- গরুর মাংস খেলে হিন্দুদের জাত যায়, না ধর্ম নষ্ট হয়- পোস্টে, যেখানে আমি বলেছিলাম, খাবারে মধ্যে কোনো ধর্ম নেই এবং এটাও বুঝিয়েছিলাম যে, নিরামিষ খাবারের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

খাবার-দাবার সম্পর্কে গীতায় কী বলা আছে, সেটা বলার আগে এই দিব্যজ্ঞানীর কমেন্টের পোস্টমর্টেমটা একটু করে নিই।

দিব্যজ্ঞানী কমলাক্ষ গিরীধারী দাস প্রথমেই বলেছে, “সনাতন ধর্মের সকল স্তরে সকল মাছ মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে।” 

যদি স্তরগুলো উল্লেখ করতেন, তাহলে খুশি হতাম।

সবগুলো স্তর উল্লেখ না করলেও সে কিছু কিছু রেফারেন্স দিয়েছে, দেখা যাক সেখানে আসলে কী বলা হয়েছে, গিরিধারী আমাকে গীতার ৩য় অধ্যায় এর ১২,১৩, ৭তম, ৯ম অধ্যায়, মনুসংহিতার ৫ম অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোক গুলো পড়তে বলেছে। এখানে নাকি ভগবান মাছ মাংস ছেড়ে বিষ্ণু প্রসাদ খেতে বলেছেন!

গীতার ৩য় অধ্যায়ের ১২ নং শ্লোকে বলা হয়েছে,

ইস্টান ভোগান হি বো দেবা দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ।

তৈর্দত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুঙক্তে স্তেন এব সঃ।।

এর অর্থ- যজ্ঞের ফলে সন্তুষ্ট হয়ে দেবতারা তোমাদের বাঞ্ছিত ভোগ্যবস্তু প্রদান করেন। কিন্তু দেবতাদের প্রদত্ত বস্তু তাদেরকে নিবেদন না করে যে ভোগ করে সে নিশ্চয় চোর।

এর সরল মানে হলো, দেবতারাই আমাদেরকে আমাদের ভোগ্যবস্তু প্রদান করে, তাই তাদের নিবেদন করে আমাদের খাদ্য গ্রহন করা উচিত। এখানে কি বলা আছে যে, কোন খাদ্য তাদেরকে নিবেদন করতে হবে ? যেহেতু বলা নেই যে কোন খাদ্য তাদেরকে নিবেদন করতে হবে, সেহেতু আমরা যা খাবো, সেটাই আমাদেরকে নিবেদন করতে হবে। এখন আমরা কী খাবো সেটা বলা আছে আমাদের শাস্ত্রে- এভাবে, 

“জীবস্য জীবস্মৃতম”

এর মানে হলো এক জীব খাদ্যরূপে অপরজীবকে গ্রহন করবে। এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম, নাকি ? এই নিয়মকে অস্বীকার করে কেউ কি বাঁচতে পারে, না আপনি বাঁচতে পারবেন ? 

এরপর গীতার ৩/১৩ নং শ্লোকে বলা আছে, 

যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ।

ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ।।

এর অর্থ- ভগবদ্ভক্তেরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন, কারণ তারা যজ্ঞাবিশিষ্ট অন্নাদি গ্রহণ করেন। যারা কেবল স্বার্থপর হয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তির জন্য অন্নাদি পাক করে, তারা কেবল পাপই ভোজন করে।

এখানে প্রথম যে কথা বলা হয়েছে, তা হলো- ভগবদ্ভক্ত অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরা সকল রকম পাপ থেকে মুক্ত হন। দ্বিতীয় কথা হলো- খাবার দাবারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলাসিতাকে পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এখানে কী বলা আছে, কোনো খাবার আমাদেরকে খেতে হবে ?

এরপর গিরিধারী তার কমেন্ট বলেছে ৭ তম, এটা বলতে সে যদি বোঝায়, আগেরগুলোর মতোই ৩ অধ্যায়ের ৭ নং শ্লোক, তাহলে বলছি, সেখানে খাবার-দাবার নিয়ে কিছু বলা নেই। বিশ্বাস না হলে গীতা খুলে দেখে নিতে পারেন।

এরপর গিরিধারী বলেছে ৯ম অধ্যায়ের কথা, এই অধ্যায়ের নাম রাজগুহ্য যোগ, এই পুরো অধ্যায়েও খাবার-দাবারের ব্যাপারে কিছু বলা নেই, শুধু ২৬ নং শ্লোকে বলা আছে, 

পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।

তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।।

এর অর্থ- যে বিশুদ্ধচিত্ত নিষ্কামভক্ত ভক্তি সহকারে আমাকে পত্র পুষ্প ফল ও জল অর্পন করে, আমি তার সেই ভক্তিপ্লুত উপহার প্রীতি সহকারে গ্রহণ করি।

গীতার এই শ্লোকটিকে কোনো কোনো নিরামিষভোজী, নিরামিষ যে খেতেই হবে তার অকাট্য প্রমান হিসেবে পেশ করে, কিন্তু তারা তলিয়ে দেখে না যে, যে শরবতের কথা তারা বলছে, সেই শরবতে লবন না চিনি মেশানো আছে ?

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, পত্র পুষ্প ফল ও জল তাকে অর্পন করতে, কিন্তু তিনি কি তার ভক্তদেরকে এগুলোই বা শুধু এগুলোই খেতে বলেছেন ? যদি শ্রীকৃষ্ণ তার ভক্তদেরকে এগুলোই খেতে বলে থাকে, তাহলে তো আমাদেরকে শুধু পত্র পুষ্প ফল ও জল খেয়েই থাকতে হবে। ফল ও জল না হয় খাওয়া যায় বা যাবে, কিন্তু পত্র ও পুষ্প অর্থাৎ পাতা ও ফুল কিভাবে খাওয়া যাবে ? কিছু কিছু সবজিজাত পাতা ও ফুল অবশ্য মানুষ খায়, কিন্তু সেগুলো কি মানুষ কোনো দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে ? করে না। তার মানে, যে পাতা ও ফুলের কথা বলা হয়েছে সেগুলো মানুষের খাদ্য নয়। এখন নিরামিষ ভোজীদের জন্য বাকি থাকলো ফল ও জল; এখন আপনারাই বলেন, আপনারা কি শুধু ফল ও জল খেয়ে থাকেন, অন্য কিছুও খান ?

গীতা শুধু পড়লেই হয় না, গীতার বাণীর মর্মকে উপলব্ধি করতে হয়। যেমন- এক জায়গায় বলা হয়েছে, কাম ক্রোধ নরকের দ্বার। তার মানে কি কাম ক্রোধকে ত্যাগ করতে বলা হয়েছে ? কাম ক্রোধকে কন্ট্রোল করতে বলা হয়েছে, যাতে তার দ্বারা কোনো অনর্থ না ঘটে। শ্রীকৃষ্ণ যদি কামকে ত্যাগ করতেন তাহলে কি তিনি বিয়ে করতেন ? ক্রোধকে ত্যাগ করলে কি তিনি শিশুপালকে হত্যা করতেন ? এভাবেই পত্র পুষ্প ফুল ও জল শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করার বিষয়টি হলো প্রতীকী, এর মাধ্যমে শুধুমাত্র সেগুলোই আমাদেরকে খেতে বলা হয় নি, বলা হয়েছে, দিনে অন্তত একবার হলেও তার উদ্দেশ্যে সেগুলো নিবেদন করে যেন তাকে স্মরণ করি; পত্র পুষ্প ফুল ও জল হলো শ্রদ্ধা প্রর্দশনের একটি মাধ্যম মাত্র, যেমন- শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধে বা মৃত কোনো বিখ্যাত মানুষের মূর্তির বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।

আপনারা অনেকেই হয়তো করে থাকেন বা কাউকে করতে দেখেছেন যে, ভাত খাওয়ার পূর্বে কেউ কেউ গ্লাস থেকে হাতে জল নিয়ে থালার চারপাশে বৃত্তের মতো জল দিয়ে ভাতকে প্রণাম করে খাওয়া শুরু করে, এটাও এক প্রকারের নিবেদন এবং উপরের শ্লোকে জল নিবেদনের যে কথা বলা হয়েছে, এটাও তার এক প্রকারের রূপ।

এরপর গিরিধারী, মনুসংহিতার ৫ম অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোকের কথা বলেছে, অনেকের মতো হয়তো এই দিব্যজ্ঞানীও জানে না যে, মনুসংহিতা হিন্দু ধর্মের কোনো গ্রন্থ নয়, এটা সিন্ধু সভ্যতার এক রাজা স্বায়ম্ভূব, যে চালাকি করে নিজের নামের সাথে মনু লাগিয়ে নিজকে ব্রহ্মার মানসপুত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং রাজ্য পরিচালনার জন্য একটি সংবিধান রচনা করে যার নাম মনুসংহিতা। হিন্দু ধর্মের কোনো গ্রন্থ না হলেও অনেক মূল্যবান গ্রন্থের মতো এটিও একটি গ্রন্থ, তাই এই গ্রন্থের যা ভালো তা যেমন অনায়াসে গ্রহন করা যায়, তেমনি যা ভালো নয়, তাকেও অনায়াসে ছুঁড়ে ফেলা যায়, এতে কোনো পাপ নেই বা পাপ হবে না।

প্রথম দিব্যজ্ঞানী গিরিধারীর রেফারেন্স এর ব্যাখ্যা এতক্ষণ দিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিব্যজ্ঞানী Arjun Chandra Das আমার কথাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছে, “খাবারের মধ্যেও ধর্ম আছে, যেমন গীতায় আছে, শ্রেষ্ঠ আহার সাত্ত্বিক, মানে নিরামিষ।”

এই বিষয়টাই আজকের পোস্টের বিষয়বস্তু, তাই এটা নিয়ে আর আলাদা করে কিছু বলছি না। খাবার দাবার নিয়ে গীতায় কী বলা আছে, সেই আলোচনা করবো পোস্টের শেষে, তার আগে একটু দেখে নিন, নিরামিষ খাবার সম্পর্কে হিন্দু ত্রাতা ড. রাধেশ্যাম ব্রহ্মচারী তার “বিপথগামী হিন্দুধর্ম ও হিন্দুর ভবিষ্যৎ” পুস্তিকায় কী বলেছেন-

“গুপ্তযুগের আগে হিন্দুধর্ম ছিলো যজ্ঞ ও পশুবলির ধর্ম, হিন্দুরা ছিলো একটি মাংসাহারী জাতি। শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন ক্ষত্রিয়। মনুসংহিতা অনুসারে এই ক্ষত্রিয়দের সমস্ত রকম পানাহার বৈধ। বাল্মীকি রামায়নে অন্তত ১৫ জায়গায় বলা আছে, বনবাসকালে রাম বন্য প্রাণী শিকার করে নিয়মিত তার মাংস আহার করতেন। কোথাও আছে শ্রীরাম বন্যহরিণ বা বরাহ শিকার করে তা পুড়িয়ে স্ত্রী সীতা, বনের মুনি ঋষিগণ এবং ভাই লক্ষ্মণের সাথে আহার করছেন। আবার কোথাও কোথাও বড় একটা গোসাপ পুড়িয়ে তা আহার করছেন।

গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস পরিচালনা করছে একটি শক্তিশালী নিরামিষভোজী গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী, তাদের প্রকাশিত বাল্মীকি রামায়নের যে যে শ্লোকে- রাম, সীতার মাংস খাওয়া পরিষ্কার বর্ণনা আছে, সেখানে পাদটীকা ছাপিয়ে দিয়ে বলেছে, এই শ্লোকে মাংসের বদলে অমুক অমুক মূল বুঝতে হবে। কারণ, তাদের মতে রামের পক্ষে মাংস খাওয়া অসম্ভব এক ব্যাপার।

অহিংসার কথা বললেও বৌদ্ধরা মাংস খাওয়ার বিরোধী নয়। এখনো তারা গরুসহ সকল প্রাণীর মাংস খায়। বৌদ্ধদের মতে প্রাণী হত্যা করা পাপ, কিন্তু অন্যের হত্যা করা প্রাণীর মাংস খাওয়া পাপ নয়। অহিংসা তত্ত্বের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধের মৃত্যু হয়েছিলো বাসি শুকরে মাংস খেয়ে।” 

যা হোক, আবার নিজের কথা শুরু করছি, এতে গীতার উদাহরণ দেওয়ার আগে রামায়ণ নিয়ে একটু আলোচনা করি, একটু আগেই পড়লেন যে, বাল্মীকি রামায়নে অন্তত ১৫ জায়গায় বলা আছে, বনবাসকালে রাম বন্য প্রাণী স্বীকার করে নিয়মিত তার মাংসা আহার করতেন। কিন্তু নিরামিষভোজীরা সেই রামায়ন নতুন করে প্রিন্ট করতে গিয়ে রাম সীতার সেই মাংস খাওয়ার শ্লোকের অর্থ পাল্টে দেওয়ার জন্য বলেছে, এই শ্লোকে মাংসের বদলে অমুক অমুক মূল বুঝতে হবে, এখন আপনারাই বোঝার চেষ্টা করুন প্রকৃত ব্যাপারটা আসলে কী ? এছাড়াও সংস্কৃত মহাভারতে বলা আছে, ভীম ছিলেন মাংসলোভী পেটুক। তাহলে ভীম কি একাই মাংস খেতো, না অন্যরাও খেতো ?

এবার রামায়নের একটা ঘটনা বলি, কমনসেন্স দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। আপনারা অনেকেই জানেন যে, সীতার আবদার মেটাতে গিয়ে এক হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে রাম সীতাকে একা ফেলে দূরে চলে যায়, অনেকক্ষণ রাম আর ফিরছে না বলে, সীতা লক্ষণকে আবার রামের খোঁজে পাঠায়, এই ফাঁকে সীতাকে একা পেয়ে রাবন তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, সীতা কেনো রামকে হরিণকে ধরতে বা শিকার করতে পাঠিয়েছিলো ? সীতার কি তখন হরিণ পোষার শখ হয়েছিলো ? কারো কারো এটাও মনে হতে পারে, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, সীতা তখন ছিলো জঙ্গলে, তখন তার হরিণ পোষার মতো কোনো বিলাসিতা ছিলো, শুধু তাই নয়, পোষা হরিণের মতো সীতা সেই জঙ্গলে যখন তখন হরিণ দেখতে পেতো। তাহলে সীতা কেনো হরিণটি চেয়েছিলো ? কেউ কেউ বলতে পারে, সেটা ছিলো সোনার হরিণ। কিন্তু আপনার কমনসেন্স কী বলে, সোনার হরিণ বলে কি কিছু হয় ? রাম সীতার হরিণের মাংস খাওয়াকে আড়াল করার জন্য আমাদের নিরামিষভোজী রামায়ণ অনুবাদকেরা বাস্তব হরিণকে সোনার হরিণ বানিয়ে দিয়ে আমাদের চোখে ধুলা দিয়েছে, আর সেই ধুলাকে এখন পর্যন্ত আমরা চোখ থেকে সরাতে পারি নি।

যা হোক, এটা পরিষ্কার যে, সীতা হরিণের মাংস খাওয়ার জন্যই রামকে হরিণ ধরে আনতে বলেছিলো এবং রাম সীতা লক্ষণ যে বনে পশুর মাংস খেতো, সেটা মূল রামায়ণের অন্তত ১৫ জায়গায় বলা আছে, যেটা একটু আগেই আপনারা জেনেছেন। তাছাড়া এটাও জেনেছেন যে, মনুসংহিতা অনুসারে ক্ষত্রিয়দের জন্য সমস্ত রকম পানাহার ছিলো বৈধ, তাই এটা ভুলে যাবেন না যে, রাম ছিলো ক্ষত্রিয় এমনকি কৃষ্ণও ছিলো ক্ষত্রিয়, তাই তাদের খাদ্যের মেনুটা কীরকম ছিলো, সেটা একটু কল্পনা করে নিন। শুধু তাই নয়, সংস্কৃত মহাভারতের অনেক জায়গায় পাণ্ডবদের মাংস খাওয়ার অনেক ঘটনা আছে এবং যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মাংস খাওয়ার প্রভূত ব্যবস্থা ছিলো, সেখানে নিমন্ত্রিত ছিলো কৃষ্ণও। এছাড়াও এক জায়গায় কৃষ্ণ ও অর্জুন মিলে বনে গিয়ে শিকার করছেন, এমন বর্ণনাও আছে।

এখন দেখা যাক, গীতায় খাবার সম্পর্কে কী বলা আছে ?

গীতার ১৭/৮ শ্লোকে বলা আছে,

“আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।” 

এর অর্থ - আয়ু, বল, রোগহীনতা, চিত্ত প্রসন্নতা ও রুচি বর্ধনকারী রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, এবং প্রীতিকর খাদ্য সাত্ত্বিক ব্যক্তিগনের প্রিয়। 

এখানে কি বলা আছে যে, সাত্ত্বিক মানে নিরামিষ খাবার ? এখানে শুধু সাত্ত্বিক খাবারের বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে এবং কোন ধরণের খাবার সাত্ত্বিক লোকজন পছন্দ করেন সেই বিষয়ে বলা আছে।

এরপর দেখুন রাজসিক আহার বলতে কী বোঝানো হয়েছে,

“কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরূক্ষবিদাহিনঃ।

আহারা রাজসসেষ্ট্যা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।” (১৭/৯)

এর অর্থ - অতি কটু, অতি অম্ল, অতি লবনাক্ত, অতি উষ্ণ, তীক্ষ্ণ বিদাহী এবং দুঃখ, শোক ও রোগ উৎপাদনকারী।

এখন আপনারাই বলেন, এই ধরণের খাবার কি সাধারণত কেউ খায় ? আর এখানেও কি বলা আছে যে রাজসিক খাবার কী কী ? এরপর দেখুন তামসিক আহারের ব্যাপারটা আসলে কী ?

“যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ ষৎ।

উচ্ছষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।” (গীতা, ১৭/১০)

এর অর্থ - যে খাদ্য অনেক আগে রান্না করা হয়েছে, যার রস শুকিয়ে গেছে, যা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র, তা তামসিক ।

এখন আপনারাই বলেন, এই ধরণের খাবার কি সাধারণত কেউ কখনো খায় ? আর এখানেও কি বলা হয়েছে, তামসিক খাবার কোনগুলো ? এখানেও শুধু তামসিক খাবারের বৈশিষ্ট্যের কথা ই বলা হয়েছে।

এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ গীতার ৯/২৭ নং শ্লোকে বলেছেন, তুমি যাহা কিছু ভোজন করো, তাহা আমাকে সমর্পণ অর্থাত নিবেদন করো।

এ থেকে বোঝা যায়, শাস্ত্রে নিষিদ্ধ বস্তু ছাড়া সকল কিছুই হিন্দুরা খেতে পারবে এবং সেগুলো শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদনও করতে পারবে।

আপনারা অনেকেই জানেন, স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে আমেরিকার শিকাগোতে যে বিশ্ব ধর্মসম্মেলন হয়েছিলো, তাতে যোগ দিতে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেই সময় চার বছর তিনি আমেরিকায় ছিলেন, সেই সময় যাদের বাড়িতে তিনি আশ্রয় পেয়েছিলেন, তারা যা খেতো, স্বামীজীকেও তাই খেতে হতো। অনেকেই জানেন যে, হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে খাওয়া নিয়ে অনেক বাছ বিচার থাকলেও খ্রিষ্টানদের মধ্যে তা নেই, তারা গরু শুয়োর সহ যা খাওয়া যায়- সবই খায়, স্বামীজীকেও সেই চার বছর সেই সব খাবারই খেতে হয়েছিলো। আমেরিকায় এবং পরে ইউরোপ ভ্রমণের সময় স্বামীজী এসব খাবার খেলেও দেশে ফিরে তিনি কখনো হিন্দু শাস্ত্রে নিষিদ্ধ কোনো খাবার খান নি; তার মানে তিনি সেসব খাবার খেয়েছিলেন আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বিপদে পড়ে; তাই এটা মনে রাখতে হবে যে স্বামীজীর ঐ ঘটনা কোনো আদর্শ নয় যে, তার অনুসরণে অন্য হিন্দুরাও গরুর মাংস খেতে পারবে। কিন্তু তিনি আবার নিরামিষভোজীও ছিলেন না, মাছ মাংস খেয়ে গেছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত। শাস্ত্র না পড়েই যারা মনে করেন যে, হিন্দু ধর্মে নিরামিষ খাবারের কথা বলা আছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করছি, আপনার কি মনে হয়, হিন্দু শাস্ত্র সম্পর্কে স্বামীজীর কম জ্ঞান ছিলো ? স্বামীজী জানতেন যে, হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও নিরামিষ খাবারের কথা বলা নেই, তাই তিনি নিরামিষ খেতেন না, শুধু তাই নয়, স্বামীজী আরো জানতেন যে, নিরামিষ খাবারের কুফল কতটা, তাই তিনি বলেছেন, 

“অহিংসার নামে অস্ত্র ত্যাগ এবং নিরামিষ আহার হিন্দু জাতির পতন ও হাজার বছরের পরাধীনতার অন্যতম কারণ।”

নিরামিষ ভোজী বড় জোর একটা হাতি হতে পারে, যে হাতির অনেক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তাকে কেউ বনের রাজা বলে না, যে হাতিকে মাহুত লোহার অঙ্কুশ দিয়ে খোঁচা মারতে পারে আর তাকে নিজের মতো করে চালনা করতে পারে। কিন্ত বনের রাজা হয় আমিষ ভোজী বাঘ বা সিংহই, যাকে নিজের মতো করে চালনা করার কথা কেউ ভাবে না।

লড়াইয়ের ময়দানে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে গেলে যে ক্ষিপ্রতা, সাহস ও তাৎক্ষণিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দরকার তার জন্য আমিষ বা এ্যানিমাল প্রোটিন একান্তভাবে দরকার। একারণে পৃথিবীর কোনো দেশের সামরিক বাহিনীতে নিরামিষের কোনো স্থান নেই।

তাই আমি মনে করি, নিরামিষ প্রথার স্থান কোনো বাড়িতে হওয়াও উচিত নয়, যদি আমরা নিজেরা লড়াই করে টিকে থাকতে চাই। আর যদি আপনি মার খেতে চান, দেশ থেকে বিতাড়িত হতে চান বা মরতে চান, তাহলে আপনার জন্য চৈতন্যদেবের আদর্শ এবং নিরামিষ খাবারই উত্তম। এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আসলে আপনি কী চান ? টিকে থাকতে চান, বাঁচতে চান; না মার খেতে, বিতাড়িত হতে এবং মরতে চান ? 

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 30 July 2020

প্রসঙ্গ : মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য


প্রসঙ্গ : মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য
Ankan Dutta,
মানুষের নিরঙ্কুশ নিরামিষ আহারের পক্ষে আপনি অনেক বক বকাইছেন। আপনার প্রতিটি পয়েন্টের জবাব দেওয়ার আগে, একটি বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করছি, আপনি মাংসাসী প্রাণীদেরকে সম্পূর্ণ আমিষভোজী হিসেবে বিবেচনা করেছেন, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আমিষভোজী মানুষকে আপনি সম্পূর্ণ আমিষভোজী হিসেবে বিবেচনা করলেন কেনো ? মানুষ কি সম্পূর্ণ আমিষভোজী যে তাদের দেহের সিস্টেম সম্পূর্ণ মাংসাশী প্রাণীদের মতো হবে ?

একবেলায় পূর্ণ আহার করলে জলসহ একজন মানুষ গড়ে এক কেজি খাবার খায়, এই এককেজি খাদ্যের মধ্যে প্রাণীজ আমিষের পরিমাণ কতটুকু ? দরিদ্র বা নিম্নবিত্তরা তো প্রতিদিন মাছ মাংস কিনতেই পারে না, তাই তাদের অনেক বেলা যায় নিরঙ্কুশ নিরামিষ। মধ্যবিত্তরা প্রতিদিন মোটামুটি মাছ মাংস খেলেও, এর পরিমাণ গড়ে প্রতি বেলায় ১০০ গ্রামও নয়, বড়জোর এটা ৬০/৭০ গ্রাম হতে পারে; এর মধ্যে হিন্দুদের তো আবার মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষ্যে নিরামিষ খেতেই হয়, তাই তাদের প্রাণীজ আমিষ গ্রহনের গড় হার আরও কম। উচ্চবিত্তরা প্রতিদিন মাছ মাংস খেতে পারলেও বিভিন্ন রোগ ব্যাধির কারণে তারা খাসি গরুর লাল মাংস এবং ডিমকে এড়িয়ে চলে, ফলে তাদেরও প্রাণীজ আমিষ গ্রহণের হার গড়ে প্রতিবেলায় ১০০ গ্রামের বেশি নয়, আর এই ধরণের উচ্চবিত্তের সংখ্যা সমাজে খুব বেশিও নয়। ফলে দেখা যাচ্ছে- একজন আমিষভোজী মানুষও প্রতিদিন যা খাবার খায়, তার ৯০ থেকে ৯৩ ভাগ খায় তথাকথিত নিরামিষ অর্থাৎ শাক সবজি, এই ধরণের খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষদের বডি সিস্টেমের মধ্যে আপনি মাংসাশী প্রাণীদের মতো বডি সিস্টেম খুঁজছেন ?

যা হোক, মানুষকে সম্পূর্ণ নিরামিষাশী প্রাণী বলার আগে, মানুষের উৎপত্তির পর তাদের খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসটা সংক্ষেপে জেনে নেওয়া দরকার-

অতীতে, গুহায় বাসকালে মানুষ- বাঘ, সিংহ প্রভৃতি হিংস্র প্রাণীর মাংসও খেয়েছে। আমরা হোমোস্যাপিয়েন্স প্রজাতির মানুষ, আমাদের উৎপত্তি আফ্রিকায়। আমাদের উৎপত্তির প্রায় একই সময়ে ইউরোপে উৎপত্তি হয়েছিলো নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষের। কিন্তু হোমোস্যাপিয়েন্সরা ইউরোপে ঢুকে পড়লে নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষদের সাথে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয় এবং হোমোস্যাপিয়েন্সরা নিয়ানডার্থালদেরকে সেই যুদ্ধে পরাজিত ক'রে হত্যা ক'রে খেয়ে ফেলে। এরপর পৃথিবী থেকে নিয়ানডার্থাল প্রজাতির মানুষই বিলুপ্ত হয়ে যায়।

জঙ্গলে ও গুহায় বাস করার সময় এবং কৃষিভিত্তিক সভ্যতা সৃষ্টির আগে পৃথিবীতে হত্যাই হতো নিহতদের মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে। বাঘ সিংহরা যদি মানুষকে হত্যা করতে পারতো, তাহলে তারা মানুষের মাংস খেতো, আর মানুষ যদি বাঘ সিংহকে হত্যা করতে পারতো, তাহলে মানুষ বাঘ সিংহের মাংস খেতো। সেই সময়ে বাঘ সিংহকে হিংস্র বলার কোনো সুযোগ নেই, কারণ, মানুষও বাঘ সিংহের মতো একই রকম হিংস্র ছিলো, আর সবারই বাস ছিলো জঙ্গলে। সুতরাং মানুষরূপী প্রাণী কর্তৃক পশুদেরকে হত্যা করে খাওয়া এবং পশু কর্তৃক মানুষের নিহত হয়ে তাদের পেটে যাওয়া, মানুষের উৎপত্তি থেকে শুরু করে কৃষিভিত্তিক সভ্যতা শুরুর আগে পর্যন্ত ছিলো নরম্যাল ব্যাপার।

শুরু থেকেই মানুষ স্বভাববশতই আরামপ্রিয় এবং ঝুঁকিহীন জীবন যাপনে আগ্রহী। কৃষি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর মানুষ দেখলো যে, খাদ্য যোগানে পশু শিকার করতে গেলে যে পরিশ্রম এবং জীবনের ঝুঁকি, মাটি থেকে খাবার উৎপাদনে জীবনে ঝুঁকি তো নেই ই, অতটা পরিশ্রমও নেই। এই উপলব্ধি থেকেই মানুষ আস্তে আস্তে কৃষিভিত্তিক জীবন যাপনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার এই উন্নয়ন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এক সাথে হয় নি, এই দৌড়ে কোনো এলাকা এগিয়ে গেছে আবার কোনো এলাকা ছিলো অনেক পিছিয়ে। এই যেমন এখনও অস্ট্রেলিয়ার পাশের পাপুয়া নিউগিনি এবং ব্রাজিলের অ্যামাজন বনের আদিবাসী মানুষের জীবন যাপন আধুনিক উন্নত সভ্যতা থেকে প্রায় কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে আছে। এই আদিম মানুষদের মতো, ১৮৬০ সালে ফিজির আদিবাসীরা এক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারককে হত্যা করে তাকে পুড়িয়ে তার মাংস খেয়ে ফেলেছিলো, জোরপূর্বক কাউকে হত্যা করে মাংস খাওয়ার সেই ঘটনা ই ফিজির শেষ মানুষ খাওয়া ঘটনা, এরপর ব্রিটিশদের প্রভাবে তারা সভ্য হতে শুরু করে এবং মানুষের মাংস খাওয়ার ঘটনা আর ঘটে নি। কিন্তু ফিজি দ্বীপপুঞ্জের কিছু কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী এখনও পরলোকগত পিতা মাতার মাংস খায়। শুধু তাই নয় অস্ট্রেলিয়ার আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন জেমসকুকের দলবলকে তাহিতি দ্বীপের আদিবাসীরা হত্যা করে খেয়ে ফেলেছিলো। তার মানে মানুষ যে অন্যান্য প্রাণীর মাংস খেতো বা খায়, সেটা তো নরম্যাল ব্যাপার, মানুষ প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত মানুষের মাংসও ব্যাপকভাবে খেয়েছে।

সকল প্রকার প্রাণীর মাংস খেয়ে শুরু হওয়া মানুষের প্রজাতির যাত্রায়, কৃষিকাজের যুগে এসে প্রাণীজ আমিষের উপর নির্ভরতা অনেকখানি কমে যায়। আর স্বভাবতই কম ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষ হিংস্র প্রাণী শিকার করে তার মাংস খাওয়ার পরিবর্তে হিংস্র নয় এমন প্রাণী শিকার করা শুরু করে, যেমন গরু ছাগল জাতীয় তৃণভোজী প্রাণী; শুধু তাই নয়, এরা হিংস্র নয় বলে, শিকার করার সময় এদেরকে জীবিত ধরতে পারলে তাদেরকে ধরে এনে বাড়িতে পালন শুরু করে এবং প্রয়োজন মতো সময়ে এদেরকে হত্যা করে মাংস খাওয়া শুরু করে। এভাবেই কৃষি সভ্যতা শুরুর আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো পশুপালন সভ্যতা। যে সভ্যতা বর্তমানে অনেক উন্নত হয়েছে আধুনিক মানুষের হাত ধরে, প্রাচীন কালের মতো নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এখনও আমরা পশু পালন করি এবং কৃষি কাজ করি। সুতরাং মানুষকে নিরঙ্কুশ নিরামিষ প্রমাণ করার আগে শুরু থেকেই মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তনের ইতিহাসটা জেনে নিয়ে কথা বলা উচিত নয় কি ?

আপনি আপনার প্রবন্ধের শুরুতেই মানুষের সহজাত খাবার প্রবৃত্তির উদাহরণে মানুষের বাচ্চা ও বাঘের বাচ্চার উদাহরণ দিয়েছেন। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি গড়ে উঠে কিভাবে ? যেকোনো প্রাণী জন্মের পর থেকে তার পিতা মাতার মধ্যে যে আচরণ দেখে, সেটাই তার সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে গড়ে উঠে। কোনো মানব সন্তান কি তার জন্মের পর তার পিতা মাতাকে কোনো খরগোশের বাচ্চাকে জীবন্ত খেয়ে ফেলতে দেখে যে তার মধ্যে ঐ ধরণের সহজাত প্রবৃত্তি গড়ে উঠবে ? কোনো কথা বলার সময় আগে পিছে বহু চিন্তা-ভাবনা করে তারপর কথা বলতে হয়, না হলে কথায় যেমন মানুষ হাতি পায়, তেমনি কথা বলার জন্যই কিন্তু মানুষ পিষে যায় হাতির পায়, তাই কথা বলার সময় খুব সাবধানে ভেবে চিন্তে বলা উচিত নয় কি ?

একটি বাঘের বাচ্চা জন্মের পর থেকেই দেখে, তার মা অন্যান্য প্রাণীদেরকে হত্যা করে নিজে খাচ্ছে, তাই বাঘের বাচ্চাও সেটা শিখে ফেলে, যা তার সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে গড়ে উঠে। কিন্তু মানব সন্তান দেখে, তার পিতা মাতা বাজার থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনে এনে রান্না করে তারপর খায় এবং তাকে খাওয়ায়, তাই মানব সন্তানের সহজাত প্রবৃত্তি কখনো বাঘের বাচ্চার মতো হবে না, এটা তো গেলো প্র্যাকটিক্যাল হ্যাবিট; সহজাত প্রবৃত্তির পেছনে যেকোনো প্রজাতির প্রাণীর ডিএনএতে অবস্থিত জিনও ভূমিকা পালন করে, তাই কোনো প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি হঠাৎ করেই গড়ে উঠে না। মাংস রান্না করে খাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, যেটা বহ শত বছর ধরে প্র্যাকটিসের ফলে গড়ে উঠেছে, এখন যে মানুষ আমিষভোজী, তার খাবার টেবিলে অনেকগুলো নিরামিষ পদের সাথে যদি মাছ মাংসের একাধিক পদ পরিবেশন করা হয়, তাহলে সে কোনটাকে বেটার মনে করবে ? অবশ্যই মাছ মাংসের আইটেম, আর এটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। শিশুকে দিয়ে সহজাত প্রবৃত্তির বিচার করা যায় না; কারণ, সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রকাশ করার জন্য যে বুদ্ধি এবং শারীরিক শক্তি দরকার, তা শিশুর থাকে না।

মানুষকে ভেজিটেরিয়ান প্রমাণ করতে আপনি আপনার ২ নং পয়েন্টে বলেছেন- ছুঁচালো এবং চ্যাপ্টা দুই ধরণের দাঁতই মানুষের রয়েছে, কিন্তু মানুষের ছুঁচালো দাঁত, মাংসাশী প্রাণীদের তুলনায় দুর্বল এবং মানুষের চ্যাপ্টা দাঁত অনেক বেশি শক্তিশালী। এর কারণ হলো লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ কাঁচা মাংস চিবিয়ে খায় নি এবং মানুষের হাত থাকায় কোনো জীবন্ত প্রাণীকে ধরে তার মাংসও মানুষকে দাঁত দিয়ে ছিড়তে হয় নি। প্রস্তর যুগে মানুষ কাঁচা মাংস খেলেও, তা হাত দিয়ে মুখে তুলে খেয়েছে, ফলে মানুষের ছুঁচালো দাঁতের ব্যবহার কম হয়েছে, যেকারণে ছুঁচালো দাঁতগুলো দুর্বল হয়ে গেছে, অন্যদিকে রান্নাকৃত রেডি খাবার লক্ষ লক্ষ বছর ধরে খাবার ফলে মানুষের চ্যাপ্টা দাঁত অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে, এগুলো তো বিবর্তনেরই কথা, বিবর্তনের এই বিষয়টা স্বীকার করেন, আর মানুষ যে হান্ড্রেড পার্সেন্ট মাংসাশী থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কারণে আস্তে আস্তে খাদ্য তালিকায় নিরামিষ যুক্ত করেছে, সেটা স্বীকার করেন না কেনো ? যে কোনো খাদ্যদ্রব্য রান্না করার ফলে সেই খাদ্যের হার্ডনেস কমে যায় এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই ধরণের রান্না করা খাবার খেয়েই মানুষের ছুঁচালো দাঁতের শক্তি কমে গেছে, এর মানে এই নয় যে সেগুলো কম শক্ত খাবার খাওয়ার জন্য শুরু থেকেই তৈরি। আর আপনার কিভাবে মনে হলো যে পেয়ারা ও আখ, রান্না করার মাংসের চেয়ে কম শক্ত ? আপনার বাড়িতে যদি ৪/৫ বছরের কোনো বাচ্চা থাকে, তাহলে তাকে একটি আখের টুকরা এবং রান্না করা কয়েক টুকরা মুরগী বা খাসি ভেড়ার মাংস খেতে দিয়েন, আর লক্ষ্য করেন, সে কোনটা খেতে পারে, তাহলেই আপনি বুঝবেন, কোন খাবার আসলে শক্ত ?

৩ নং পয়েন্টে আপনি বলেছেন- তৃণভোজী এবং মানুষ উভয়েরই পাচননালী শরীরের থেকে ৫ থেকে ৮ গুন বড়, অন্যদিকে মাংসাশী প্রাণীর পাচননালী তার শরীরের থেকে মাত্র ৩ গুন বড়।

-শুরুতেই তো প্রমাণ করে দিয়েছি যে, মানুষ যা খায়, তার প্রায় ৯০ থেকে ৯৩ শতাংশ হলো উদ্ভিজ্জাত খাদ্য, তাহলে তৃণভোজী প্রাণীদের সাথে মানুষের পাচননালীর মিল থাকবে না কেনো ?

এই পয়েন্টেই আপনি বলেছেন- মানুষের পাচক রস তুলনামূলকভাবে মাংসাশী প্রাণীর প্রাণীর তুলনায় দুর্বল।

- মাংসাশী প্রাণীরা কাঁচা মাংস খায়, সেই মাংস হজম করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়, তাই তাদের পাচক রস যে অনেক শক্তিশালী হবে, সেটা তো নরম্যাল ব্যাপার। এর বিপরীতে মানুষ উদ্ভিজ্জাত খাবারই খায় ৯০ থেকে ৯৩ শতাংশ এবং যেটুকু প্রাণীজ জাত খাবার খায়, তার প্রায় ৮০ভাগ মাছ, যেটা উদ্ভিজ্জাত খাবারের মতোই খুবই সহজপাচ্য, আর বাকি যে ২০ শতাংশ মানুষ মাংস খায়, সেটাও রান্না করার ফলে তার হার্ডনেস অনেকখানিই কমে যায়, ফলে এটাও সহজ পাচ্য হয়ে উঠে, আর একারণেই মানুষের পাচক রস, মাংসাশী প্রাণীদের তুলনায় অনেক অনেক দুর্বল হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

এই পাচক রসের ভিত্তিতেই আপনি জোর দিয়ে বলেছেন- এই ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্র কোনোভাবেই মাংস গ্রহণের জন্য উপযোগী নয় বা বলা যেতে পারে পারফেক্ট নয়।

-আপনার এই কথা সত্য হতো, যদি মানুষ, মাংসাশী প্রাণীদের মতো হান্ড্রেড পার্সেন্ট কাঁচা মাংসভোজী হতো, তারা কোনোভাবেই উদ্ভিজ্জাত খাবার বা মাছ না খেতো। কিন্তু আপনার তো এই ধারণাই নেই যে- মানুষ তার টোটাল খাবারের মাত্র ২% এর মতো মাংস খায়, আর সেটাও খায় রান্না করে, কাঁচা নয়। সুতরাং নিরামিষ আহারের পক্ষে আপনার পৌষ্টিকতন্ত্র থিয়োরি যে একটা বলদের গু, সেটা কিন্তু প্রমাণিত।

এছাড়াও ৪ নং পয়েন্টে, মাংসের এসিডিটির ব্যাপার টেনে এনে মাংস খাওয়াকে মানুষের পক্ষে যেরকম বিপজ্জনক প্রমাণ করার অপচেষ্টা করেছেন, সেটা যদি সত্য হতো, মানুষ মাংস খেতো আর টুপটাপ করে মরতো, কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটে না। খ্রিষ্টান বৌদ্ধ ইহুদিরা মুসলমানদের চেয়ে বেশি মাংস খায়, কিন্তু তারা সেটি খায় প্রক্রিয়াজাত করে চর্বিমুক্ত করার পর সুপারস্টোর থেকে কিনে, যে মাংস খুব ক্ষতির কারণ নয়; যেকারণে তাদের গড় আয়ু এখনই প্রায় ৮৫/৯০ বছর এবং সেটা প্রতিবছর বাড়ছে। এর বিপরীতে বাঙ্গালি মুসলমানরা খায় জবাই করা টাটকা খাসি গরুর লাল মাংস যেটা ভয়াবহ ক্ষতিকর ব্যাপার; কারণ, এগুলো চর্বিমুক্ত করা হয় না, এসব মাংস খেয়ে তারা হার্ট, ব্লাড প্রেসারের রোগে ভুগে এবং আকস্মিকভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ে, কিন্তু তারা মাংসের এসিডিটির কারণে পেটে গ্যাস জমে মরে না, যেমনটা আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছন।

৫, ৬ এবং ৭ নং পয়েন্টে বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের সাথে তৃণভোজী প্রাণীর যে মিল আপনি দেখিয়েছেন, সেটা সত্য। এর কারণ আমার উপলব্ধিতে আছে, যেটা আপনার নেই; আর সেই কারণটি হলো- তৃণভোজী প্রাণীর সাথে মানুষের খাদ্যভ্যাসের মিল প্রায় ৯৮%। তাহলে প্রায় সব ক্ষেত্রে মানুষের সাথে তৃণভোজী প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের মিল থাকবে না কেনো ?

শেষের দিকে আপনি বলেছেন, মানুষের শরীরের জন্য যা প্রয়োজন, তা নিরামিষ আহার থেকেই পাওয়া যায়, এটা আমিও অস্বীকার করি না, যেকারণে তৃণভোজী প্রাণীরা লতা পাতা খেয়েই দিব্যি বহাল তবিয়তে টিকে আছে এবং মাংসাশী প্রাণীদের খাবার হয়ে মাংসাশী প্রাণীদেরকেও টিকিয়ে রেখেছে। প্রকৃতি নামের ঈশ্বর, পৃথিবীতে তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মাংসাশী প্রাণীদেরকে সৃষ্টি করেছে, যে কারণে তৃনভোজী প্রাণীরা হলো মাংসাশী প্রাণীদের খাদ্য। তৃণভোজী প্রাণীরা নিরীহ হয়, তারা কাউকে আক্রমন করে না, কারণ লতা পাতা খেয়ে জীবন ধারণের জন্য তাদের সে মন মানসিকতা থাকে না, তাই মাংসাশী প্রাণীদের দ্বারা নিহত হওয়াই তাদের নিয়তি। তৃণভোজীরা মাংসাশী প্রাণীদের দ্বারা নিহত হয়, এই ঘটনাটা প্রমাণ করে যে তৃণভোজীরা দুর্বল, আর দুর্বলেরা সবলের দ্বারা অত্যাচারিত হয় এবং হবে, প্রকৃতির এই নিয়ম সর্বত্র প্রযোজ্য, এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও। এখন আপনি কি চান, মানুষকে- নিরামিষ খাইয়ে, দুর্বল করে, আমিষভোজী মানুষদের দ্বারা নিরামিষভোজীদেরকে অত্যাচারিত করতে, তাদেরকে বিলুপ্ত করতে ? যারা মানুষের নিরঙ্কুশ নিরামিষ ভোজনের পক্ষে কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্য যা ই হোক, তারা কিন্তু নিরামিষভোজীদের বিলুপ্তির পক্ষেই কাজ করছে।

নিরামিষ আহার থেকে মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপাদানই পাওয়া সম্ভব, কিন্তু তা মানুষের আত্মরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নয়, মানুষের নিরামিষ খাওয়ার পক্ষে আমার আপত্তিটা এখানেই। আমি চাই, হিন্দুরা আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নির্যাতনমুক্তভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচুক, কেউ মারতে আসলে তাদেরকে মার দিক; মুসলমানদের হাতে মার খেয়ে, জমি জমা বাড়ি ঘর হারিয়ে আমি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে চাই না যে- আমার উপর এই ধরণের নির্যাতন হয়েছে, আমি এর বিচার চাই। কারণ, বিচার চায় দুর্বলেরা। আমি কাউকে আক্রমন করবো না, কিন্তু আমার মধ্যে আমি সেই শক্তি সঞ্চয় করে রাখবো যে, কেউ আমাকে মারতে এলে, আমার জমি জমা বাড়ি ঘর দখল করতে এলে, আমার বাড়ির মেয়েদের দিকে নজর দিলে, তার হাত পা ভেঙ্গে দেবো এবং এই শক্তি ও মানসিকতার অর্জন, নিরঙ্কুশ নিরামিষ খেলে কখনোই হবে না, যেটা আমরা আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখতে পাই। মানুষের আত্মরক্ষা আসলে যতটা দৈহিক শক্তির উপর নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে মানসিকতার উপর, যে মানসিকতা অর্জন হয় প্রাণীজ আমিষ খেলে, নিরামিষ খেলে নয়; যেকারণে একটি সিংহের চেয়ে পাঁচগুন বেশি বড় দেহ ও বেশি শক্তি নিয়েও একটি মহিষ, সিংহের থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না, সিংহের ভয়ে পালায়, সিংহের খাবারে পরিণত হয়।

একেবারে শেষে আপনি প্রোটিন সাপ্লেমেন্টের মাধ্যমে বডি বিল্ডিং এর কথা বলেছেন না, মহিষের মতো বিশাল শরীর বানিয়ে কী লাভ, যদি সেই শরীর ও শক্তি দিয়ে নিজের আত্মরক্ষা করতে না পারেন বা কারো উপকারে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে না পারেন ? প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের উপাদানগুলো প্রাণীজ উৎস থেকে সংগৃহীত নয়, ফলে এগুলো খেলে হয়তো শরীর বাড়বে, শরীরে শক্তিও আসবে, কিন্তু সেই শক্তি ব্যবহার করার জন্য যে মানসিকতা দরকার, সেটাই তো আসবে না। তাই সিংহকে দেখে মহিষ যেমন ভয় পায়, বিশাল শরীর নিয়ে ছোট্ট সিংহের ভয়ে দৌড়ে পালায়, প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট খেয়ে বডি বানানোদের অবস্থাও হবে সেই রকম। কারণ, প্রাণীজ আমিষ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্যই হলো- আক্রমন প্রতিহত করে আক্রমন করার মানসিকতা অর্জন করানো, যেটা পৃথিবীতে টিকে থাকার মূল ফ্যাক্ট, আর পৃথিবীতে টিকে থাকা-ই হলো সবকিছুর চুড়ান্ত কথা। কারণ, আপনি টিকে আছেন বলেই নিরামিষ আহারের পক্ষে এসব কুযুক্তিকে তুলে ধরতে পেরেছেন; আর আমি টিকে আছি বলেই, এসবের প্রতিবাদে আপনাকে থাপড়াতে উদ্যত হয়েছি।

শেষে, আপনার মতোই সবার উদ্দেশ্যে আমি বলছি- এখন সিদ্ধান্ত আপনার, প্রাণীজ আমিষ খেয়ে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখবেন, না নিরামিষ খেয়ে নিজেদেরকে বিলুপ্ত করবেন ।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

---------
বি.দ্র # আমিষ নিরামিষ প্রসঙ্গে আপনাকে একটা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, আপনি যেহেতু নিরামিষ এবং প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট খেয়ে বডি বানানোতে বিশ্বাসী, সেহেতু আপনার এই মূহর্তের একটি ছবি, যে ছবিতে ফটোশপের মাধ্যমে তারিখ লিখে দেবেন, তারপর আপনি কত বছর সময় নিতে চান, তত বছর নেবেন এবং তারপর আপনার শক্তির এবং আমার আমিষ ভোজী কোনো এক ভক্তের শক্তির পরীক্ষা হবে, তারপর বোঝা যাবে যে আমিষ খেয়ে বানানো বডির শক্তি বেশি, না নিরামিষ+প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট খেয়ে বানানোর বডির শক্তি বেশি ? যদি আপনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেন, তাহলে আপনার বর্তমান ছবির উপর তারিখ এবং ফোন নং লিখে দেবেন, তার কয় বছর সময় নিতে চান, তা বলবেন, এই সময় শেষে আপনার সাথে আমি যোগাযোগ করবো আপনার শক্তি পরীক্ষার জন্য, এবং এও বলে রাখছি আপনার সাথে শক্তি পরীক্ষায় আমি যাবো না; কারণ, নানা কারণে হিন্দুসমাজের স্বার্থেই আমাকে হাইড থাকতে হয়, সমগ্র বাংলা জুড়ে আমার অনেক ভক্ত অনুরাগী আছে, যারা আমাদের কথামতো শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুযায়ী চলে, তাদেরই কোনো একজনকে পাঠাবো আপনার দেওয়া ঠিকানা মোতাবেক, যদি নিরামিষ এবং প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের উপর এই আত্মবিশ্বাস থাকে, তাহলে আমার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহন কইরেন।

Wednesday, 22 July 2020

আমিষ নিরামিষ প্রসঙ্গে Sodkirti Das এর মন্তব্যের জবাব :


আমিষ নিরামিষ প্রসঙ্গে Sodkirti Das এর মন্তব্যের জবাব :

আমার প্রবন্ধের জবাবে আপনি যে প্রবন্ধ লিখেছেন, সবই প্রায় আপনার মনগড়া কথা। আপনার মতো বৈষ্ণবদের এই সব মনগড়া কথা বাঙ্গালি হিন্দুরা প্রায় ৪০০ বছর ধরে শুনে আসছে, তাই দয়া করে এবার শাস্ত্রসম্মত কথা বলতে শিখুন; কারণ, এখন আর সেই দিন নেই যে- আপনারা যা বলবেন, লোকজন তাই বিশ্বাস করবে।

আপনি বলেছেন- "পিয়াজ রসুন ও মুসুরী ডাল আসুরিকভাবাপন্ন লোকদের খাবার।"

-আপনার এই কথার শাস্ত্রীয় রেফারেন্স কী ?

আপনার মতো গুটিকতক বৈষ্ণব, যাদের সংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ০.০০১%ও নয়, তারা ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত লোক রান্নায় পেঁয়াজ রসুন ব্যবহার করে এবং নানাভাবে তা খায়, সেই সাথে মসুরির ডালও খায়, তাহলে এরা কি সবাই আসুরিক ভাবসম্পন্ন অসুর ? ধরে নিলাম তারা আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষ তথা অসুর, আর আপনারা বৈষ্ণবরা, দেবতা; তো আপনারা এ পর্যন্ত জগতের কোন কল্যানটা করেছেন ? অসুরদের থেকে ভিক্ষা নিয়ে তো আপনাদের জীবন চলে, আধুনিক বিজ্ঞানের সবকিছু তো আপনার মতে যারা অসুর, তাদেরই দান, আর যে দান করে সে দেবতা, যে ভিক্ষা করে সে নয়; বৈষ্ণব শাস্ত্রমতে বৈষ্ণবরা যে ভিক্ষুক জাতি, ভিক্ষা ছাড়া এদের কোনো কর্ম নেই, স্ত্রী নেই, সংসার নেই, সন্তান নেই, সেটা কি আপনি জানেন ? নিজে বিয়ে শাদী করে সংসার করেছেন, স্ত্রীর সাথে শুয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, আর নিজেকে মহান বৈষ্ণব ভাবছেন, তাই না ? আপনার কর্ম অনুযায়ী ই আপনি বৈষ্ণব নন, তাই হয়তো আপনাকে ভিক্ষা করে খেতে হয় না, কিন্তু মনে রাখবেন আপনার মতে- যারা পেঁয়াজ রসুন খেয়ে অসুর, তাদের কাছেই আপনার প্রতিদিনের জীবন যাত্রার ঋণ ১০০% ।
পেঁয়াজ রসুন নিয়ে যখন আপনার এত আপত্তি, তখন আপনাকে এখনই দেখাই যে এটি কত উপকারী একটি সবজি-

আধুনিক বিজ্ঞানের মতে- পেঁয়াজে ৮৬.৮ শতাংশ পানি, ১.২ শতাংশ প্রোটিন, ১১.৬ শতাংশ শর্করা, ০.১৮ শতাংশ ক্যালসিয়াম, ০.০৪ শতাংশ ফসফরাস ও ০.৭ শতাংশ লোহা থাকে। এছাড়াও রয়েছে খাদ্য আঁশ, ভিটামিন এ, বি ও সি। অল্প পরিমাণে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম , অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস কোরাসিটিন এবং সালফারও । তাই স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের অভিমত, প্রতিদিন ১০০ গ্রাম থেকে ১৫০ গ্রাম পর্যন্ত পেঁয়াজ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। একারণেই যারা কুসংস্কারবশত পেঁয়াজ খায় না, তারা এসব উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হয়।

পেঁয়াজ খেলে কী কী শারীরিক উপকার হয়, সেগুলো দেখে নিন নিচে-

১) কাঁচা পেঁয়াজ এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং হার্টকে সুস্থ রাখে, ফলে অকাল মৃত্যু ঝুঁকি কমে।

২) কাঁচা পেঁয়াজের ভিটামিন সি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এই ভিটামিন সি ত্বক ও চুলকে ভালো রাখে।

৩) পেঁয়াজ দেহের বিভিন্ন ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৪) পেঁয়াজ রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, রক্তে শর্করার মাত্রাকে বাড়তে দেয় না। সেই সঙ্গে ইনসুলিনের ঘাটতি যাতে দেখা না দেয়, সেদিকেও খেয়াল রাখে, ফলে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধির সুযোগই থাকে না।

৫) পেঁয়াজের রস এবং মধু মিশ্রণ করে খেলে জ্বর, সাধারণ ঠান্ডা, এলার্জি ইত্যাদি নিরাময় হয়।

৬) নাক থেকে রক্তপাত বন্ধ করার জন্যে কাঁচা পেয়াজ সাহায্য করে।

৭) পেঁয়াজ বিষণ্নতা কমায়, ঘুমে সাহায্য করে এবং ক্ষুধা বাড়ায়।

৮) পেঁয়াজ স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটায়, ফলে একাধিক ব্রেন ডিজিজ হওয়ার আশঙ্কা কমে।

৯) পেঁয়াজের মধ্যে এ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল এবং এ্যান্টি ভাইরাল বৈশিষ্ট্য আছে যা জীবাণু প্রতিরোধ করে এবং কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার ফলে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয় এবং দাঁত ও মাড়ির রোগ দূর হয়।

এবার দেখা যাক রসুনের উপকারিতা কী ?

রসুনের মধ্যে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন A,B,C,D, ক্যালসিয়াম, কপার, পটাসিয়াম আয়রন, ফসফরাস, ও ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম ও ফাইবার । এছাড়াও আমাদের শরীরে যা দরকার মোটামুটি সবই পাওয়া যায় রসুনের মধ্যে |

ফলে মানুষের দেহে এমন কোনও রোগ বালাই নেই যার প্রতিষেধক হিসেবে রসুন কাজ করে না । রসুনের মধ্যে সকল রোগ আরোগ্য করার উপায় সৃষ্টিকারী উৎস বিদ্যমান । হার্ট সুস্থ রাখা থেকে শুরু করে ওজন কমানো পর্যন্ত রসুনের ভূমিকা রয়েছে । গবেষকদের মতে খালি পেটে রসুন খাওয়া হলে হজমের গণ্ডগোল রোধ হয় ।
রান্নায় ব্যবহার ছাড়াও রসুনে অনেক রকমের ঔষধীয় গুনাগুন আছে | প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় রসুনের ব্যবহার চলে আসছে | আসুন দেখে নিই রসুনের গুণাগুণগুলো-

১) রসুন খুব নিউট্রিসাস‚ কিন্তু এতে খুব কম ক্যালোরি থাকে।

২) রসুনের সাপ্লিমেন্ট বা কাঁচা রসুন খেলে ফ্লু এবং কমন কোল্ড তাড়াতাড়ি সেরে যায় | এর কারণ রসুন খেলে ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যায় |

৩) রসুন রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, ফলে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ যেমন হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমে। রসুন খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে তাই ক্রনিক ডিসিজ কম হয়, ফলে কারো দীর্ঘজীবি হওয়ার সম্ভবনা অনেকেটাই বেড়ে যায় |

৪) নিয়মিত রসুন খেলে শরীরে খারাপ Cholesterol কমে যায় এবং ভালো Cholesterol এর বৃদ্ধি হয়, এতে হার্ট সুস্থ থাকে, ফলে অকালমৃত্যু রোধ হয় |

৫) রসুনে উপস্থিত অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ‘সেল ড্যামেজ' এবং ‘এজিং‘ রোধ করে, ফলে মানুষ তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায় না বা জবুথবু হয়ে পড়ে না | রসুন খাওয়ার ফলে অ্যালঝাইমারস ডিসিজ এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় |

৮) রসুনে উপস্থিত সালফার, অরগ্যান ড্যামেজ থেকে এবং শরীরকে বিষাক্ত lead থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য ক'রে শরীরকে ডিটক্সিফাই করতে সাহায্য করে, যার ফলে শরীর নানা রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকে |

৯) রসুন মহিলাদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ঠিক রাখে, যা যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে | এর ফলে ঋতুস্রাব এবং হাড় সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটা কমে যায় |

১০) রসুনে অ্যান্টি ভাইরাল এবং অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টি আছে, তাই দ্রুত স্কিন ইনফেকশন সারিয়ে তোলে ।

যা হোক, বৈষ্ণব মতবাদে জীবহত্যা মহাপাপ, যদিও কোনো বৈষ্ণবের ক্ষমতা নেই জীবহত্যা না করে জীবন যাপন করার। সংসার করতে গেলে মশা, মাছি, তেলোপোকা, ইঁদুর, কীটপতঙ্গ বাধ্যতামূলক মারতেই হয়। সেই প্রাচীন কাল থেকেই প্রায় সব হিন্দু গরু পালন করে, বৈষ্ণবরাও এর বাইরে নয়, ইদানিং অনেক বৈষ্ণব- মুরগী, হাঁস, খাসি, ভেড়াও পালন করে; প্রায় সব বৈষ্ণব নামধারী হিন্দু- মুরগী, হাঁস, খাসি, ভেড়ার মাংসও খায়, আর যে ব্যক্তি যে জীবকে খায়, সেই ব্যক্তি সেই জীবের হত্যার কারক। এছাড়াও শাস্ত্র মেনে হিন্দুরা গরুর মাংস না খেলেও, পালন করা গরু তারা মুসলমানদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়, আর মুসলমানরা সেই গরুকে হত্যা করে তার মাংস খায়। এতে মুসলমানদের গোহত্যাজনিত যে পাপ হয়, তার অর্ধেক ভাগিদার হয় ঐ মুসলমানদের কাছে যে হিন্দু গরু বিক্রি করেছে, তার। জীবহত্যা যদি পাপ বা মহাপাপ হয়, তাহলে প্রায় সব হিন্দু শুধু অন্যান্য প্রাণী হত্যাজনিত পাপই করছে না, তারা গোহত্যাজনিত পাপেও অভিযুক্ত। শাস্ত্র বলছে অকারণে জীব হত্যা করা যাবে না বা দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত নয়, এমন পশুর মাংস খাওয়া যাবে না। তার মানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত পশুর মাংস খাওয়া যাবে, যদিও তাতে জীব হত্যা করতেই হবে। নিজেকে অহিংস রাখার জন্য না হয় জীব হত্যা না করা হলো, কিন্তু পেঁয়াজ রসুনের দোষটা কী ? এগুলো তো আর চলমান জীব নয়। অন্যান্য সবজির মতো এগুলোও সাধারণ সবজি; আদা, মরিচ, আলু খাওয়া গেলে পেঁয়াজ রসুনে সমস্যা কোথায় ? পেঁয়াজ রসুন বৈষ্ণবদের পাছা কবে কিভাবে মারলো, যে তাকে একেবারে খাবার পাত থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে ?
যা হোক, এরপর আপনি বলেছেন- "সব খাবারেই কম বেশী আমিষ থাকেই এবং বৈষ্ণবগন সব খাবার পূজার বেদীতে ভগবানকে নিবেদন করে । তারপর সেই প্রসাদ গ্রহন করেন।"

-এই কথা তো আমরাই বলি যে সব খাবারেই আমিষ থাকে, তাহলে স্পেশিয়ালি মাছ মাংসকে নিষিদ্ধ করার কারণটা কী ? জীব হত্যা করতে হয় বলে না হয় প্রাণীজ আমিষ বাদ, কিন্তু পেঁয়াজ রসুন দোষটা করলো কোথায় ? পেঁয়াজ রসুন ভগবানকে নিবেদন করলে ভগবান যদি রাগ করে থাকে, তাহলে পেঁয়াজ রসুনকে ভগবান সৃষ্টি করেছে কেনো ? পেঁয়াজ রসুন বা প্রাণীজ আমিষ ভগবানকে নিবেদন করা যাবে না, এটা আসলে বৈষ্ণবদের মনগড়া তথ্য, যার কোনো শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই এবং তা আপনি কখনো শাস্ত্র থেকে প্রমাণ করতে পারবেন না।
এরপর আহার্য বস্তুর শুদ্ধতা প্রসঙ্গে বেদ গীতার রেফারেন্স দিয়ে আপনি বলেছেন- আহার্য বস্তু শুদ্ধ হয় যজ্ঞ অনুশীলনের দ্বারা অর্থাৎ , ভগবানকে নিবেদন করার মাধ্যমে। এবং আহার্যদ্রব্য যদি শুদ্ধ হয় , তা হলে সেই আহার্য গ্রহণের ফলে জীবের সত্তা শুদ্ধ, সত্তা শুদ্ধ হওয়ার ফলে ভগবৎস্মৃতি শুদ্ধ হয় । সেই শুদ্ধস্মৃতির ফলে সে জড়জাগতিক সমস্ত দুঃখময় বন্ধন দশা থেকে প্রকৃত মুক্তি লাভকরে।

-বেদের যুগে যজ্ঞে কি পশু হত্যা করে তার মাংস নিবেদন করা হতো না ? বেদে এমন অনেক রেফারেন্স আছে, যেখানে পশু হত্যা করে তার মাংস নিবেদন করার কথা বলা আছে। তার মানে যজ্ঞের মাধ্যমে পশুর মাংসও শুদ্ধ হয়, আর সেই শুদ্ধ মাংস খেলে কোনো সমস্যা নেই, তাতেও জীবের সত্ত্বা শুদ্ধ হয়, সত্তা শুদ্ধ হওয়ার ফলে ভগবৎস্মৃতি শুদ্ধ হয় । সেই শুদ্ধস্মৃতির ফলে সে জড়জাগতিক সমস্ত দুঃখময় বন্ধন দশা থেকে প্রকৃত মুক্তি লাভ করে। আপনার কথাতেই তো প্রমাণ হচ্ছে যে- প্রাণীজ আমিষে কোনো সমস্যা নেই, যদি সেটা যজ্ঞের মাধ্যমে ভগবানকে নিবেদন করা হয়, তাহলে আপনি আমিষ আহারের বিরোধিতা করছেন কেনো ?

এরপর আপনি আবার সেই ভাঙ্গা ঢোল বাজিয়েছেন এই বলে যে- "মাছ মাংস পিঁয়াজ রসুন মসুর ডালের মত আমিষ বস্তু ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন যোগ্য নয় । এইরকম আমিষ খাদ্য অপবিত্র বা অমেধ্য বস্তু । যারা ভগবদ্ভক্তির প্রতি আগ্রহী নয় , সেই তামসিক শ্রেণীর মানুষদের কাছে আমিষ বস্তু প্রিয় হয়, “অমেধ্যং তামস প্রিয়ং”।

-এখানে আপনি বলেছেন, আমিষ খাদ্য অমেধ্য অর্থাৎ অপবিত্র, তাহলে দেখা যাক অমেধ্য শব্দটি গীতার যে শ্লোকে আছে, সেখানে আসলে কী বলা হয়েছে ?

গীতার সেই ১৭/১০ নং শ্লোকটি হলো-

“যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ ষৎ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।”

এর অর্থ- যে খাদ্য অনেক আগে রান্না করা হয়েছে, যার রস শুকিয়ে গেছে, যা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র, তা তামসিক লোকেদের প্রিয় ।

-এখানে কি বলা আছে যে- মাছ মাংস পিঁয়াজ রসুন মসুর ডালের মত আমিষ জাতীয় খাবার অপবিত্র বা অমেধ্য বস্তু ?

আপনাদের সমস্যা কি জানেন ? আপনারা শাস্ত্র ঠিকই পড়েন, কিন্তু শাস্ত্রের বাণী ঠিকমতো বোঝেন কি বোঝেন না, সেটা জানি না, কিন্তু যখন শাস্ত্রকে ব্যাখ্যা করেন, তখন নিজে যা বিশ্বাস করেন, তাকে শাস্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেন বা করতে চান। গীতায় যেখানে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে যে- যে খাদ্য অনেক আগে রান্না করা হয়েছে, যার রস শুকিয়ে গেছে, যা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র, তা তামসিক লোকেদের প্রিয় । অথচ আপনি বলছেন- মাছ মাংস পিঁয়াজ রসুন মসুর ডালের মত আমিষ হলো তামসিক শ্রেণীর মানুষদের কাছে প্রিয় , এরপর আবার পাণ্ডিত্য দেখাতে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় বলেছেন “অমেধ্যং তামস প্রিয়ং” ! যেন দুচারটা সংস্কৃত বললেই লোকজন ধরে নেবে যে আপনি অনেক ভালো শাস্ত্র বোঝেন, তাই আপনার কথা অভ্রান্ত ! শোনেন, সেই দিন এখন আর নেই, গত ছয় বছরে অনেক হিন্দু পাড়ায় অনেক ছেলে মেয়েকে অনলাইনের মাধ্যমেই আমি তৈরি করেছি, যারা আপনার মতো বৈষ্ণবদের কথাকে শুধু চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে না, তাদেরকে ধরে জ্ঞান দ্বারা থাপড়াতেও পারে।

যা হোক, এরপর আপনি- সত্ব গুনের আহার হল, বিভিন্ন শাক, সবজি, আতপ অন্ন, সাগু, ফল মুল, দুধ ঘি, ছানা- এই ধরণের কিছু বাল ছাল বকেছেন, যেগুলোর জবাব আগেই দিয়েছি, তাই সেই প্রসঙ্গ আর তুললাম না। কিন্তু এসব বলা শেষে গীতার রেফারেন্স দিয়ে আপনি বলেছেন-“ তুমি যা কিছু আহার কর সে সমস্তই আমাকে অর্পণ করে গ্রহণ কর"- (গীতা ৯/২৭ ) । ভগবান তো এখানে বলে নি যে- তুমি এটা খাও বা ওটা খাও। কিন্তু এর পর আবার এক জায়গায় বলেছেন- "তবে কলির প্রভাবে আজকের মানুষ মাছ মাংসকে প্রিয় খাদ্য বলে মনে করছে । কিন্তু তা ভগবানকে নিবেদন করার নির্দেশ কোথাও দেওয়া হয়নি ।"

-তাহলে আপনাকে এটাও বলতে হবে যে- বিভিন্ন শাক, সবজি, আতপ অন্ন, সাগু, দুধ, ঘি, ছানা- এগুলো ভগবানকে নিবেদন করতে কোথায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ? আবার এ প্রসঙ্গে গীতার 'পত্রং পুষ্পং ফলং' এর উদাহরণ কিন্তু দিতে যাবেন না; কারণ, এখানে শুধু পাতা, ফুল এবং ফলের কথা কিন্তু বলা হয়েছে, অন্য কিছুর নয়।

এরপর আপনি বলেছেন-বনের রাজা মাংসাশী বাঘ বা সিংহ হল কথার কথা, সবল নিরামিষ আহারী হাতির কাছে এরা ইঁদুর তুল্য।

- এই ইঁদুর তুল্য বাঘ সিংহই হলো কিন্তু শিকারী, আর মস্ত হাতি তার শিকার; আমিষ খাওয়ার গুন বা উপকারিতা আর নিরামিষ খাওয়ার অপকারিতার ব্যপারটা বুঝতে পারছেন ? এছাড়াও শুনে রাখুন, যারা নিরামিষভোজী প্রাণী, তারাই অন্যের বশ্যতা স্বীকার করে বা করতে বাধ্য হয়, যেকারণে হাতি বিশাল দেহ আর প্রচুর শক্তি নিয়েও ক্ষুদ্র মানুষের পোষ মেনে দাসে পরিণত হয়, কিন্তু আমিষখেকো বাঘ সিংহের শরীর খুব বড় নয়, আবার শক্তিতেও তারা যে প্রাণীকূলে শ্রেষ্ঠ, সেটাও নয়, তারপরও কোনো বাঘ সিংহকে মানুষের পোষ মেনে মানুষের দাস হতে দেখেছেন ? আজ নিরামিষ খাওয়া নিয়ে যতই গর্ব করেন, মনে রাখবেন, এই নিরামিষই একদিন আপনাদেরকে অন্যের দাস বানাবে।

এছাড়াও আপনি বললেন না, মাংসাষী বাঘ সিংহ বনের রাজা, এটা হলো কথার কথা, তেমনি আপনি যে বলেছেন- মাছ - মাংসভোজী বাঙ্গালীদের তুলনায় নিরামিষভোজী মারাঠী , গুজরাটী , রাজস্থানীরা অনেক বেশী সবল ও স্বাস্থ্যবান- এটাও আসলে কথার কথা। নিরামিষ খেয়েই মারাঠী, গুজরাটি, রাজস্থানীরা যদি অনেক বেশী সবল ও স্বাস্থ্যবান হতো অর্থাৎ এই থিয়োরি যদি সত্য হতো, তাহলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যারা মাছ মাংস খায় না, তাদেরকে বাধ্যতামূলক প্রতিদিন ৪টি করে ডিম খেতে সরকার নির্দেশ দিতো না।

এরপর যে বলেছেন- অতএব শরীরের পুষ্টি ও সবলতা মাছ মাংস খাওয়ার উপর নির্ভর করে না ।

-এ প্রসঙ্গে বলছি, শরীরের পুষ্টি ও সবলতা পুরোপুরি মাছ মাংসের উপর নির্ভর না করলেও যুদ্ধ করার শক্তি এবং আক্রমন প্রতিহত করার মানসিকতা কেবল মাছ মাংসের উপরই নির্ভর করে, আর এটাতো চিরন্তন সত্য যে, যারা আক্রমন করে না বা সেই মানসিকতা রাখে না, তারাই অন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সুতরাং যারা নিরামিষ খাবে, হয় তারা অন্যদের আক্রমনে বিলুপ্ত হবে, অথবা যৌনশক্তির অভাবে সন্তানের জন্মহার কমে গিয়ে বিলুপ্ত হবে, তার মানে এদের বিলুপ্তি নিশ্চিত।

এরপর প্রবন্ধের একজায়গায় আপনি বলেছেন- মানুষ, রক্ত মাংস যুক্ত অমেধ্য বস্তুকে আহার করে জীবনের মাঝামাঝি থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ঘর আর হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতেই থাকে।

-আপনার এই কথা প্রযোজ্য মুসলমানদের ক্ষেত্রে, যারা খাসি ও গরুর মাংসের মতো ক্ষতিকর মাংস পেলেই খায় বা পরবে খায়। লাল মাংসের ক্ষতিকর দিকের কারণেই মুসলমানরা ৩৫/৪০ বছর বয়সের পর থেকেই নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ঘর আর হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে, আর অকালে মরতে থাকে। কিন্তু হিন্দুরা, যারা শখের বসে সপ্তাহে একদিন বা মাসে একদিন বা মাঝে মাঝে হাঁস মুরগী কবুতর জাতীয় পাখির মাংস খায়, তারা কোনো শারীরিক সমস্যায় পড়বে না, বরং তারা শারীরিক উপকারিতা ই পাবে। কিন্তু একদিন খাক বা একবেলা খাক, কেউ যদি খাসির লাল মাংস খায়, সে অবশ্যই একটু হলেও নিজের ক্ষতি করবে; কারণ, লাল মাংস শরীরের জন্য সর্বদায় ক্ষতিকর। যুবক বয়সে এটার ক্ষতিকর দিক শরীর সামলে উঠতে পারলেও বা জোয়ারের কারণে নদীর খানাখন্দ চোখে না পড়লেও, ৪৫/৫০ এর পর শরীর এই ক্ষতি কিছুতেই সহ্য করতে পারে না, তাই ঐ বয়সের পর লাল মাংস সর্বদায় পরিত্যাজ্য। যেকারণে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা ৫০ এর পর লাল মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে এবং নিরামিষের দিকে ঝুঁকছে, যেটা ঐ বয়সের জন্য সঠিক। কিন্তু যুবক বয়সে নিরামিষ খাওয়া বা বাল্যকাল থেকেই নিরামিষ খাওয়া এককথায় বংশসহ আত্মহত্যার শামিল; কেননা, আজ হোক বা কাল হোক ঐ বংশের বিলুপ্তি ঘটবেই, এটা ঘটবে সন্তান জন্মদানের অক্ষমতায় বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন শিশুর মৃত্যু হয়ে বা চৈতন্যদেবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐ বাড়ির ছেলের সংসার ত্যাগের মাধ্যমে, ঘটনা যেদিক থেকেই ঘটুক নিরামিষভোজীর পরিবারের বংশের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।

নিরামিষভোজী ব্যক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে রোগব্যধি মুক্ত মনে হলেও ৪০ বছরের পর এদের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠে। ৪০ এর পর এদের না থাকে উদ্যম, না থাকে সাহস, আর না থাকে শক্তি, এরা তখন জবুথবু মাংসপিণ্ড মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এই ধরণের মানুষদের দেখা যায়, যাদেরকে দেখে জবুথবু মাংসপিণ্ড ছাড়া আমার অন্য কিছুই মনে হয় নি। এই ধরণের লোকদের নিয়ে কি কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে ?

নিরামিষ খাওয়ার প্র্যাকটিক্যাল ক্ষতিকর দিক কী, এবার সে সম্পর্কে দুটি ঘটনা বলছি-

আমার মা খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ, আমার বাল্যকালে তিনি যখন এক বৈষ্ণব গুরুর কাছে দীক্ষা নেন, তখন থেকেই প্রথমে বৃহস্পতি ও রবিবার তিনি মাছ খাওয়া ছাড়েন, এর পর আস্তে আস্তে সব বারেই তিনি মাছ খাওয়া ছাড়েন এবং এক পর্যায়ে নিরঙ্কুশ নিরামিষে চলে যান। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে বাড়িতে মাছ মাংস রান্না করলেও তিনি সেটা সহ্য করতে পারেন না, এ সম্পর্কে নানা বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন, এটা নিয়ে মাঝে মাঝেই আমাদের সাথে তার মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটি হতে থাকে। এভাবে বছর বিশেক চলার পর তিনি ভয়াবহ রোগের কবলে পড়েন, পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় তার যক্ষা হয়েছে এবং এর ফলে ঘাড়ের একটি হাড় প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গেছে, ঘাড় নিয়ে তার প্রচুর ব্যথা, ঘাড়ের নার্ভ সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ায় এক পর্যায়ে তিনি সম্পূর্ণ চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েন।।

এই পরিস্থিতিতে আমার মায়ের চিকিৎসা করানো হয় ঢাকার নিউরোসায়েন্স হসপিটালে, ডাক্তাররা মায়ের নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের কথা জানতে পারে এবং তাঁকে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন নিরামিষ না খেতে, মাকে সুস্থ করে তোলা এবং বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে আমার ছোটবোন জোর করে মাকে মাছ খাওয়ায়, বেঁচে থাকা এবং সুস্থ থাকার লোভে মা ও মাছ খেতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে আমাদের প্রায় ১ লক্ষ টাকা খরচ করে মা সুস্থ হয়ে উঠে।

কিন্তু ঐ যে মাথার উপর বসে আছে চৈতন্যদেব এবং তার নিরামিষ থিয়োরি। এর ফলে কয়েক মাস যেতে না যেতে আমার মা আবার নিরামিষ খেতে শুরু করে, জীবনের শেষ বছরগুলোতে মা যে আবার আমাদেরকে ভোগাবে, এ ব্যাপারে আমার কোনোই সন্দেহ নেই।

আমার গ্রাম সম্পর্কীয় আরেক কাকা, মাত্র বছর দশেক হয়েছিলো নিরামিষ খাচ্ছে। এর মধ্যেই তার যক্ষা ধরা পড়ে। চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করে তুলে তার ছেলেরা। এই কাকা মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে ধর্ম বিষয়ে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করতে, একদিন সে বললো, আমার কেনো যক্ষা হবে, সেটাই তো বুঝলাম না। আমি বললাম- নিরামিষ কতদিন হলো খাচ্ছেন ? বললো- ১০ বছর। আমি বললাম- এটাই কারণ।

আমার আরেক গ্রাম সম্পর্কীয় কাকাতো ভাই এবং তার স্ত্রী, বহু বছর ধরে নিরঙ্কুশ নিরামিষ খায়, তার নিরামিষ ভাবনা এমনই প্রখর যে, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আমিষ খায় এবং তা বাড়িতে রান্না করে ব'লে, সে নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে গিয়ে ভাড়া থাকতে চায়। আমার এই কাকাতো ভাইয়ের দুই দুইটি পুত্র সন্তান এক বছর বয়সের মধ্যে রোগে ভুগে মারা গেছে; কারণ, তারা ছিলো দুর্বল ডিম্বানু ও শুক্রানুর তৈরি, ফলে তাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিলো, দেহে কোনো এ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করে নি।

সুতরাং কাদেরকে নিয়ে হসপিটালে বেশি দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, সেটা সম্ভবত আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।
সুস্থ থাকার জন্য মানুষকে আমিষ কমিয়ে নিরামিষ বেশি খেতে হবে পঞ্চাশের পর, আবার সুস্থ থাকার জন্য মানুষকে নিরামিষের চেয়ে বেশি আমিষ খেতে হবে জন্ম থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের আগে।

প্রবন্ধের এক স্থানে আপনি বলেছেন- "প্রকৃতিতে আমরা দুই ধরনের জীব দেখতে পাই।মাংশাসী ও শাকাহারী।মাংশাসীরা যেমন বাঘ,সিংহ শাক-সবজি খায় না, তেমনই হাতি,গন্ডার,ঘোড়া,হরিণ -এরা অন্য প্রাণীর মাংস খায় না, শুধু শাক-সবজি ফলমূল খায়।বৈজ্ঞানিকভাবে যদি আমরা বিচার করি তাহলে দেখি শাকাহারী প্রাণীদের সাথে মানুষের মিল বেশি।"

-আপনি এই কথা কেনো বললেন যে শাকাহারী প্রাণীদের সাথে মানুষের মিল বেশি ? কেনো বলতে পারলেন না যে মানুষ সম্পূর্ণ শাকাহারি প্রাণী ?

পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব এবং বিবর্তনের ইতিহাস জানেন ? মানুষ যখন জঙ্গলে বাস করতো, তখন মাঝে মাঝে জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীদের সাথে মানুষের লড়াই হতো, এই লড়াইয়ে যে জিততো, সে পরাজিতদের মাংস খেতো। এই সূত্রে আপনার পূর্বপুরুষও শুধু মাছ নয় বা খাসি ভেড়া নয়, বাঘ সিংহের মাংসও খেয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন কৃষিজীবি হয়েছে, তখন বাঘ সিংহের সাথে লড়াইটা কমে গিয়েছে, ফলে মানুষের মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমে গিয়েছে, আর একারণেই শাকাহারি বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে গ্রো করেছে। এখন বুঝতে পারছেন তো যে মানুষের মধ্যে শাকাহারি বৈশিষ্ট্য কেনো বেশি ? কেনো মানুষ সম্পূর্ণ শাকাহারি প্রাণীর মতো নয় ?

প্রবন্ধের শেষের দিকে আপনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন- #কেন ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও মহর্ষি মনু মাছ মাংস খেতে নিষেধ করেছেন ?

- শ্রীকৃষ্ণ যে মাছ মাংস খেতে নিষেধ করেছেন, এর শাস্ত্রীয় প্রমাণ আপনি দিতে পারবেন ? যদি না পারেন তাহলে এসব বাকোয়াজ কথা বার্তা বলা বন্ধ করুন, না হলে শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করার জন্য হাতের কাছে পেলে কিন্তু ছোট বড় মানবো না।

যা হোক, এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি নিজেই বলেছেন- কারন মাছ - মাংস রজ ও তমোগুণের সঞ্চারক অখাদ্য।
গীতা দ্বারা প্রমাণ করতে পারবেন যে মাছ মাংস রজ ও তমোগুনের সঞ্চারক খাদ্য ? যদি না পারেন, তাহলে আগের অনুচ্ছেদে যা বললাম, সেটা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।

আপনি আরো বলেছেন- "মানুষ আজ উগ্র প্রকৃতির হয়েছে , বিশ্বযুদ্ধ বাধাতে চাইছে , সর্বত্র উচ্ছৃঙ্খলতা, মহামারী চলছে । এর মূলেও আমিষ বস্তুর প্রতিক্রিয়া অনস্বীকার্য।"

-আর যারা এসব করছে তারা মুসলমান, যে মুসলমানদের দ্বারা হিন্দুরা প্রায় এক হাজার বছর ধরে নির্যাতিত নিপীড়িত, এই মুসলমানদেরকে ঠেকানোর জন্যই হিন্দুদেরকে তলোয়ার ধরতে হবে, যেটা নিরামিষ খেয়ে হবে না, তার জন্য প্রাণীজ আমিষ খেতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে সবার জন্য নিরামিষ খাবার চালু করার পেছনে আপনার উদ্দেশ্য কী, হিন্দুদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, না তাদেরকে বিলুপ্ত করা ?

এরপর আপনি বলেছেন- "পশু - পাখি মাছ ব্যাঙ ও কীট - পতঙ্গের রক্তমাংস হাড় — এগুলি শাস্ত্রে অমেধ্য বা অপবিত্র বলা হয়েছে ।"

-এতই যদি শাস্ত্র সম্পর্কে আপনার জ্ঞান, তাহলে এই কথা কোথায় বলা হয়েছে, তার রেফারেন্স দেন নি কেনো ? এতে কি বোঝা যায় না যে- আপনার সব কথা, আপনার মনগড়া ?

শেষে বলেছেন- "শ্ৰীমনুসংহিতার নির্দেশ অনুসারে , যদি কেউ এই জন্মে মাছ মাংস খেতে চায়, তবে জন্মান্তর চক্রে যখন সে অনুরূপ একটি দেহ লাভ করবে , তখন অনুরূপভাবেই নিজের রক্ত মাংস হাড় হৃৎপিণ্ডটাকে অপরকে খাদ্যরূপে নিবেদন করতে বাধ্য হতে হবে।"

আপনি কি মনে করেছেন, কোনো আত্মাকে যখন পৃথিবীতে সৃষ্টি করা হয়, তখন তাকে প্রথমবারেই মানুষরূপে সৃষ্টি করা হয় ? ৮০ লক্ষবার বিভিন্ন উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পশু পাখি রূপে জন্ম নেওয়ার পর আত্মা মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্ম নেয়। তার মানে মানুষ হিসেবে যে আত্মা পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, সে কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সকল প্রাণীর সুখ দুঃখকে ভোগ করেই এসেছে, এখন অন্যান্য প্রাণীরূপে সে যাদের কারণে দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে, তারা কি তার কারণে আবার দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে না ? এমন না হলে কর্মের ভিত্তিতে ফল, শাস্ত্রের সেই ব্যাখ্যা কি মিথ্যা হয়ে যাবে না ?
আপনি মনুসংহিতার রেফারেন্স দিয়েছেন না, এবার মনুসংহিতা থেকে আপনাকেও কিছু রেফারেন্স দিচ্ছি এবং তা মাংস খাওয়ার পক্ষে-

"জগতে যা কিছু পদার্থ আছে, তা প্রাণীই হোক বা উদ্ভিদ হোক, সে সবই ব্রহ্মা জীবের অন্ন বলে নির্দেশ দিয়েছেন।

অতএব প্রাণধারণের জন্য স্থাবর জঙ্গম সবকিছুই জীবগণের ভোজ্য।"-(মনুসংহিতা, ৫/২৮)

"হস্তবিশিষ্ট মানুষেরা হস্তবিহীন মাছ প্রভূতি আহার করে।"-(মনুসংহিতা, ৫/২৯)

"যজ্ঞ করে মাংস ভোজন করবে কারণ যজ্ঞের হুতাবশিষ্ট যে মাংস তার ভোজনকে দৈব প্রবৃত্তি বলে।" -(মনুসংহিতা, ৫/৩১)

"যে মানুষ শ্রাদ্ধে দেবলোকে ও পিতৃলোকে যথাবিধি মাংস নিবেদন করে ঐ মাংস ভোজন না করে, সে মৃত্যুর পর একুশ পশুযোনি প্রাপ্ত হয়।"-(মনুসংহিতা, ৫/৩৫)

"শাশ্বত বৈদিক বিধি আশ্রয় করে মন্ত্রসংস্কৃত পশুর মাংস খাওয়ায় কোনো বাধা নেই।"-(মনুসংহিতা, ৫/৩৬)
"যজ্ঞের অঙ্গস্বরূপ যে পশুবধ, তা সিদ্ধ করার জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজেই পশুসমূহ সৃষ্টি করেছেন, আর যজ্ঞ এই সমগ্র জগতের ভূতি বা পুষ্টির সাধক। সেই কারণে যজ্ঞে যে পশুবধ, তা বধই নয়, এই রকম পশুবধে কোনো পাপ নেই।"-(মনুসংহিতা, ৫/৩৯)

"এই স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগতে বেদবিহিত যে পশু হিংসা নিয়ত আছে অর্থাৎ অনাদিকাল থেকে চলে আসছে, তাকে অহিংসা বলেই জানতে হবে।"-(মনুসংহিতা, ৫/৪৪)

এছাড়াও নিজের দেহকে অন্যের খাদ্য হতে দিতে আপনার এত আপত্তি কিসের ? মুনি ঋষিদের দেওয়া বিধানকে বাদ দিয়ে আপনারা বৈষ্ণবরাই তো মৃত দেহকে আগুনে পোড়ানোর পরিবর্তে মাটিতে পুঁতে রাখার বিধান তৈরি করেছেন। মাটিতে পুঁতে রাখলে লাশ কি পোকা মাকড়ে খায় না ? পরের জন্মের কথা বাদ দেন, আপনার দেহ এই জন্মেই যে পোকা মাকড়ে খাবে, সেই বিষয়ে আগে চিন্তা করেন।

শেষে আপনার উদ্দেশ্যে শুধু এই কথাটিই বলছি- আমি যা বলি, সেটা শাস্ত্র থেকেই বলি এবং সেটা যে শাস্ত্র সম্মত তা প্রমাণ করার ক্ষমতা আমার আছে, বৈষ্ণবদের মতো আমি মনগড়া কথা ব'লে তা শাস্ত্রের কথা বলে চালাই না।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Saturday, 18 July 2020

#Sodkirti_Das এর মিথ্যা প্রচারণার জবাব :


Sodkirti Das এর মিথ্যা প্রচারণার জবাব :

আমার একটি প্রবন্ধের জবাবে Sodkirti Das একটি প্রবন্ধ অনলাইনে ছেড়েছে, যার কিছু অংশ আমি এই প্রবন্ধের সাথে ফটো হিসেবে যুক্ত করে দিয়েছি, এই প্রবন্ধের প্রথমেই সে নিরামিষ আহারকে সাত্ত্বিক হিসেবে উল্লেখ করেছে, এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে যে সে কত বড় মূর্খ; কারণ, সাত্ত্বিকতা মানুষের বৈশিষ্ট্য, খাবার দাবারের নয়। আমার এই কথার প্রমাণ আছে গীতার ১৭/৪ নং শ্লোকে, যেখানে বলা হয়েছে,

“যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।”

এর অর্থ- সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা দেবতাদের পূজা করে, রাজসিক ব্যক্তিরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে এবং তামসিক ব্যক্তিরা ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে।

অর্থাৎ এই শ্লোক দ্বারা প্রমাণিত যে- সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক দ্বারা ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, কোনো খাদ্যদ্রব্যকে বোঝায় না। এই মূর্খকে আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, যদি আপনি শাস্ত্র দ্বারা প্রমাণ করতে পারেন যে সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক দ্বারা খাবারের বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, তাহলে আমি আপনার শিষ্যত্ব গ্রহণ করবো। আর যদি প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে আপনাকে আমার শিষ্য হওয়ার শর্ত আমি দিচ্ছি না; কারণ, আপনার মতো মূর্খ ব্যক্তিকে আমি শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাই না। আমার শিষ্যরা হয় এবং হবে যুক্তিবাদী, আপনার মতো অন্ধবিশ্বাসী নয়।

এরপর সে কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নিরামিষ আহারের প্রসঙ্গ টেনে নিরামিষ আহারের ফলে যে শরীর দুর্বল হয়, সেই ব্যাপারকে টিটকারী করেছে। এই প্রসঙ্গে বলছি-

সুস্থ থাকা কাকে বলে জানেন ? শরীরে কোনো রোগ ব্যাধি না থাকা এবং রাস্তা দিয়ে জবুথবু হয়ে হেঁটে যাওয়াকে সুস্থ থাকা বলে না। শক্তসামর্থ্য দেহই সুস্থ দেহ। যারা বহু বছর যাবৎ নিরামিষ খায়, তারা গড়পড়তা দেড় মন ওজন মাটি থেকে নিজের ঘাড় বা মাথার উপর তুলতে পারবে না, আর কোনোরকমে তুলতে পারলেও বেশি দূর নিয়ে যেতে পারবে না, আর কিছু দূর নিয়ে গেলেও এমন হাঁপাতে লাগবে যে মনে হবে দম ফেল করে মারা যাবে। এটাকে আপনি সুস্থ থাকা বলেন ?

আপনি নিজেও তো তৃণভোজী, তো দেড় মন ওজন নিয়ে যা করতে বললাম, সেটা একটু করে দেখেন তো বা আপনার ইসকনিদেরকে একটু করতে বলেন তো, তারপর দেখবেন আপনি বা ওরা প্রকৃতপক্ষেই সুস্থ কি না ? আর আমার পূর্ণ যৌবনে আমি যখন দুই মন ওজনের ধানের বস্তা বাড়ি থেকে ঘাড়ে নিয়ে রাস্তা দিয়ে তা ভাঙানোর জন্য মিলে হেঁটে যেতাম, তখন লোকের মনে হতো ঘাড়ে করে আমি একটা মুড়ির বস্তা নিয়ে যাচ্ছি।

যা হোক, নিরামিষ খেলে আবার নাকি দীর্ঘজীবন পাওয়া যায়! শক্তিহীনতার কারণে যে জীবনের বেঁচে থাকারই কোনো নিশ্চয়তা নেই, তার নাকি আবার দীর্ঘজীবন ! শেয়ালের মতো ১০০ বছর বাঁচার চেয়ে সিংহের মতো ১ বছর বাঁচা অনেক গৌরবের, সেটা জানেন ? যৌবন বয়সে ১০ বছর লাগাতার যদি কোনো পুরুষ নিরামিষ খায়, তার যৌনশক্তি লুপ্ত হয়ে যাবে, সে আর তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, তার স্ত্রী গোপনে হয় অন্য পুরুষের সাথ বিছানায় সময় কাটাবে, আর না হয় কোনো মুসলমানের সাথে পালিয়ে যাবে, সমাজে এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে, নিরামিষ খেকোদের এই জীবনকে আপনি জীবন বলেন ?

আমার পাড়ার এক কাকাতো ভাই, বিয়ের আগে থেকেই নিরামিষ খায়, বিয়ের পর তার স্ত্রীও তার সাথে নিরামিষ খেতে বাধ্য হয়। এদের এক পুত্র জন্মে, যে ১ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে মারা যায়, তার দু তিন বছর আরেকটি পুত্র জন্মে, এক বছরের মাথায় সেও একইভাবে মারা যায়। সাধারণ অর্থে এদের মৃত্যুর কারণ কী জানেন ? দীর্ঘদিন নিরামিষ খাওয়ার ফলে ওদের ডিম্বানু ও শুক্রানু এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, তার দ্বারা সন্তানের জন্ম হলেও সেই সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হচ্ছে, তাই সামান্য জ্বর সর্দিকেও প্রতিরোধ করতে পারছে না, দেহে সামান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় দেহে কোনো এ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করে নি, ফলে দুই দুই পুত্রসন্তান এক বছরের মাথায় মারা গেছে, এটাকে কি আপনি বেঁচে থাকা বলেন ?

নিরামিষ খেলেও যে জ্ঞানী হয়, তা প্রমাণ করার জন্য আপনি কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম দিয়েছেন, আপনি কি শিউর যে উনারা সত্যিই নিরামিষাসী ছিলেন ? এর রেফারেন্স হিসেবে আপনি নাম দিয়েছেন- "বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্বসভ্যতা" নামক একটি গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, যেটা ইসকন কর্তৃক প্রকাশিত। এই বইয়ের যে ম্যাক্সিমাম তথ্য ভুল এবং মিথ্যা, সেটা কি আপনি জানেন ? এক বিজ্ঞানের ছাত্র এই বইটি পড়ে লিখেছে- এটি কুকুরের বিষ্ঠাকে অমৃতরূপে উপস্থাপনের অপচেষ্টা, এছাড়াও এই বইটি যে বলদের গু, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করে পড়তে পারেন এই প্রবন্ধটি-

https://thenewse.com/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D/

যা হোক, যে বিখ্যাত ব্যক্তিদের আপনি লিস্ট দিয়েছেন তার মধ্যে আছে বুদ্ধদেবের নাম। বুদ্ধদেব যে নিরামিষভোজী ছিলেন, সে ব্যাপারে আপনি কি নিশ্চিত ? বুদ্ধদেব যদি নিরামিষভোজী হতেন, তাহলে তার অনুসারী বৌদ্ধরা নিরামিষ খায় না কেনো; যেমন খায় চৈতন্যের অনুসারীরা, চৈতন্য নিরামিষ খেতো বলে ? কোনো বৌদ্ধকে কখনো চিরকালীণ নিরামিষভোজী হতে দেখেছেন ? আপনি কি জানেন, বুদ্ধদেবের মৃত্যু হয়েছিলো শুকরের বাসি মাংস খেয়ে ? যে ব্যক্তি মাংস খেয়ে মরলো, তাকে আপনি বলছেন নিরামিষভোজী ! আপনারা এমন মিথ্যুক কেনো ? এই মিথ্যাচার করে আপনারা জগতের কোন কল্যান করবেন ?

যা হোক, আপনার লিস্টের মধ্যে নিরামিষভোজী হিসেবে আপনি লিখেছেন মাহাত্মাগান্ধীর নাম, হ্যাঁ, এই লোক মহান বৈষ্ণব ছিলেন, সেই একই কারণে ছিলেন মহান নপুংসক। এখানে নপুংসক মানে সন্তান জন্মদানে অক্ষম নয়, উল্টো বুঝবেন না, নপুংসক মানে অপদার্থ ব্যক্তি, যাদের দ্বারা কোনো উপকার হয় না, শুধু ক্ষতিই হয়। তো এই গান্ধীর কারণে ভারত তথা হিন্দুদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সেই ইতিহাস আপনি জানেন ? এই হারামজাদার কারণে ভারত তার ৩০% ভূমি হারিয়েছে, এর কারণে ১৯৪৬-১৯৫০ সালের মধ্যে নিহত হয়েছে লক্ষ লক্ষ হিন্দু শিখ; ভারত ভাগের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর যে নির্যাতন চলছে, তার মূল কারণ এই পাপাত্মা গান্ধী, আর এই অপদার্থকে আপনি জ্ঞানী বলছেন ? আমি নিশ্চিত এই পাপাত্মা গান্ধী যদি নিরামিষ ভোজী না হতো, তাহলে ভারত তথা হিন্দুদের ইতিহাস আজ অন্য রকম হতো।

আপনি আপনার লিস্টে অনেক ব্যক্তিদের নাম দিয়েছেন নিরামিষ ভোজী হিসেবে, সবার কাহিনী এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই সর্বমোট তিনটি রেফারেন্স আলোচনা করে এই পোস্টে বুঝিয়ে দিলাম যে আপনার দেওয়া তথ্য কতখানি সত্য; কারণ, এটা কিন্তু চিরন্তন সত্য যে, যে একটি মিথ্যা তথ্য দিতে পারে বা বলতে পারে, সে কিন্তু হাজারটা মিথ্যা বলতে পারে। যা হোক, নিরামিষভোজীদের মধ্যে আপনি রেখেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত মুনি ঋষিদের নাম, এখন দেখা যাক মুনি ঋষিরা সত্যিই নিরামিষ ভোজী ছিলেন কি না ?

রামায়ণে- বনবাসকালে রাম সীতা লক্ষ্মণ যে বিভিন্ন পশু হত্যা করে তাদের মাংস খেতেন, বাল্মীকি রামায়ণের বহু জায়গায় তা বলা আছে; শুধু যে রাম লক্ষ্মণ সীতা ই মাংস খেতেন, তাই নয়, খেতেন ভরতও, তার প্রমান আছে, রাজশেখর বসু অনূদিত বাল্মীকি রামায়ণের পৃষ্ঠা ১২৯ এ; সেখানে, রামের সাথে দেখা করে তাকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভরত বনের মধ্যে এলে, গুহ নামক একব্যক্তির জনপদের কাছে ভরত শিবির ফেলে বিশ্রামের জন্য, খবর এবং পরিচয় পেয়ে সেই গুহ, মৎস্য-মাংস-মধু উপহার নিয়ে ভরতের সাথ দেখা করতে যায়।

সেগুলো যদি না খাওয়া হয়, তাহলে সেগুলো উপহার নিয়ে যাবে কেনো ?

গুহ এর ওখান থেকে ভরত যায় ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রমে, সেখানে ভরতের সাথের সকল সৈন্যসামন্তকে বলা হয়,

"সুরাং সুরাপাঃ পিবত পায়সং চ বুভূক্ষিতাঃ।
মাংসানি চ সুমেধ্যানি ভক্ষ্যন্তাং যো যদিচ্ছসি।।-(৯১/৫২)

এর অর্থ- “সূরাপায়ীগন সূরা পান করো, বুভূক্ষিতগণ পায়স ও সুসংস্কৃত মাংস যা ইচ্ছা হয় খাও” (পৃষ্ঠা-১৩২)।

অনেক কিছুর সাথে এখানে ভরতের লোকজনের আপ্যায়ণের জন্য ছিলো- ছাগ ও বরাহের মাংস, মৃগ, ময়ূর ও কুক্কুটের(মুরগী) মাংস (পৃষ্ঠা-১৩৩)।

এই তথ্যে এখানে পরিষ্কার যে, সেকালে ঋষিরাও মাংস খেতেন, কেউ নিরামিষভোজী ছিলেন না; কারণ, যে যা খায় না, সে তা অন্যদেরকে নিবেদন করতে পারে না। এই কারণেই নিরামিষভোজীরা মনে করে দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে কি মাছ মাংস নিবেদন করা সম্ভব, যেহেতু তারা মাছ মাংস খায় ? কিন্তু গীতায় যে বলা হয়েছে, 'তুমি যা কিছু আহার করো, তা আমাকে নিবেদন করো' (৯/২৭) এবং আমরা যখন- "ওঁ শ্রী জনার্দনায় নমঃ" বলে যা খাই, তা যে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হয়, সেটা ঐ সব তৃণভোজী ছাগলদের বোধে আসে না।

রামায়ণের পর এবার আসি মহাভারতের কাহিনীতে-

মহাভারতের সভাপর্ব, যে পর্বে যুধিষ্ঠির, ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করাকালে রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলো, সেই সময়ের খাবার-দাবারের বর্ণনাতে বলা হয়েছে-

"যুধিষ্ঠির ঘৃত ও মধু মিশ্রিত পায়স, ফলমূল, বরাহ ও হরিণের মাংস, তিল মিশ্রিত অন্ন প্রভূতি বিবিধ ভোজ্য দিয়ে দশ হাজার ব্রাহ্মণ ভোজন করালেন এবং তাদের উত্তম বসন, মাল্য ও বহু সহস্র গাভী দান করলেন। তারপর গীত বাদ্য সহকারে দেবপূজা ও বিগ্রহ স্থাপন করে সভায় প্রবেশ করলেন।… নানাদেশ থেকে আগত ঋষি ও নৃপতিদের সঙ্গে পাণ্ডবগণ সেই সভায় আনন্দে বাস করতে লাগলেন।"

এখানে লক্ষ্যণীয় যে ঋষিরাও কিন্তু বরাহ ও হরিণের মাংস খেতো।

এটা ছাড়াও খাবার-দাবারের আরেকটি বর্ণনা আছে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের কন্যা উত্তরার সাথে অর্জুনের পুত্র অভিমন্যুর বিবাহের ঘটনায়, সেখানকার বর্ণনা এরকম-

"অর্জুনের প্রস্তাবে বিরাট সম্মত হলেন, যুধিষ্ঠিরও অনুমোদন করলেন। তারপর সকলে বিরাটরাজ্যের অন্তর্গত উপপ্লব্য নগরে গেলেন এবং আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন। দ্বারকা থেকে কৃষ্ণ বলরাম কৃতবর্মা ও সাত্যকি, সুভদ্রা ও অভিমন্যুকে নিয়ে এলেন। ইন্দ্রসেন প্রভূতি ভৃত্যরাও পাণ্ডবদের রথ নিয়ে এল। এক অক্ষৌহিনী সৈন্যসহ দ্রুপদ রাজা, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, শিখণ্ডী ও ধৃষ্টদ্যুম্ন এলেন। মহাসমারোহে বিবাহের উৎসব অনুষ্ঠিত হলো। শত শত মৃগ ও অন্যান্য পশু নিহত হলো।.. জনার্দন কৃষ্ণের সম্মুখে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ যথাবিধি সম্পন্ন হলো।"

এই দুটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে মহাভারত যুগের মানুষের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো এবং সেই সাথে এটাও প্রমাণিত যে সেই সময় নিরামিষ খাবার বলে কিছু ছিলো না এবং পাণ্ডবরা ছিলো আমিষভোজী; আর সেই সাথে এটাও স্পষ্ট যে- উপরে বর্ণিত দুটি বড় ঘটনায় যেহেতু কৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন সেহেতু তিনিও সকলের মতো সকলের সাথে একই ধরণের খাবার খেয়েছেন, সুতরাং কৃষ্ণ নিরামিষ খান নি, তিনিও সকলের মতো আমিষ খাবারও খেয়েছেন। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণ যে বনে পশু শিকারও করেছেন সেটাও আছে মহাভারতের আদি পর্বের সুভদ্রাহরণপর্বাধ্যায়ে, সেখানে বলা আছে,

"সৈন্যদল বেষ্টিত হয়ে যদুবীরগণের সঙ্গে কৃষ্ণ বলরাম নানাবিধ মহার্ঘ যৌতুক নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে এলেন। অনেক দিন আনন্দ যাপন করে সকলে ফিরে গেলেন, কেবল কৃষ্ণ রইলেন। তিনি যমুনা তীরে অর্জুনের সঙ্গে মৃগয়া করে মৃগ বরাহ মারতে লাগলেন।"

মহাভারতের আরেকটি ঘটনায়, বনপর্বের দুর্বাসার পারণ অধ্যায়ে ১০ হাজার শিষ্য নিয়ে ঋষি দুর্বাসা যুধিষ্ঠিরের পর্ণ কুটিরে উপস্থিত হয়ে ভোজন দাবী করেন, এই পাণ্ডবরা যে নিরামিষী ছিলো না সেটা তো আগের আলোচনাতেই প্রমাণিত হয়েছে। তো যারা নিরামিষভোজী নয়, তাদের গৃহে গিয়ে কি নিরঙ্কুশ নিরামিষভোজীরা নিরামিষ আহার পেতে পারে ? আর ঋষি দুর্বাসা যদি নিরামিষ ভোজীই হতেন, তাহলে তিনি কি আমিষভোজী পাণ্ডবদের কুটিরে গিয়ে ভোজন দাবী করতেন ?

শুধু তাই নয়, হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে যে আমিষ আহার চালু ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায় নিচের এই তথ্যে-

মহাভারতের সভাপর্বের "ধৃতরাষ্ট্র-শকুনি-দুর্যোধন-সংবাদ" অধ্যায়ে ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে বলছে-

"পুত্র, তোমার শোকের কারণ কী? মহৎ ঐশ্বর্য আর রাজচ্ছত্র তোমাকে আমি দিয়েছি, তোমার ভ্রাতা আর বন্ধুরা তোমার অহিত করেন না, তুমি উত্তম বসন পরছো, সমাংস অন্ন খাচ্ছো, উৎকৃষ্ট অশ্ব, মহার্ঘ শয্যা মনোরমা নারীবৃন্দ, উত্তম বাসগৃহ ও বিহারস্থানও তোমার আছে, তবে তুমি দীনের ন্যায় শোক করছো কেনো ?"

এখানে খেয়াল করুন, ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে বলছে- "সমাংস অন্ন খাচ্ছো", তার মানে হস্তিনাপুরের রাজ পরিবারে মাংস খাওয়া ছিলো সাধারণ বিষয়।

কাম্যক বনে পাণ্ডবদের কাছে যাওয়ার আগে ঋষি দুর্বাসা এই দুর্যোধনের প্রাসাদেই কয়েকদিন ছিলেন এবং দুর্যোধনের পরামর্শেই মূলত যুধিষ্ঠিরকে বিপদে ফেলার জন্য ঋষি দুর্বাসা কাম্যক বনে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে ভোজন দাবী করেন, তাহলে আমিষভোজী দুর্যোধনের কাছে কি ঋষি দুর্বাসা নিরামিষ খেতেন, না পেতেন ?

কাম্যক বনের ঐ ঘটনায় ১০ হাজার শিষ্য সহ ঋষি দুর্বাসার ভোজন প্রস্তুত সম্ভব নয় বলে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দ্রৌপদী কৃষ্ণকে স্মরণ করে, সাথে সাথে কৃষ্ণ, দ্রৌপদীর পর্ণকুটিরে উপস্থিত হয়ে নিজে ক্ষুধার্ত বলে কিছু ভোজন দাবী করে, এতে দ্রৌপদী বলে- আমি না খাওয়া পর্যন্ত কিছু অন্ন অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু আমি তো খেয়ে ফেলেছি, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কৃষ্ণ বলে- দেখি তোমার পাত্র, সেখানে কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। এরপর দেখে পাত্রে একটি ভাত অবশিষ্ট আছে, কৃষ্ণ সেটাই খেয়ে তৃপ্তির সাথে ঢেঁকুর তুলেন, সাথে সাথে উপস্থিত ঋষি দুর্বাসা এবং তার শিষ্যদের পেট ভরে যায়, তারা সন্তুষ্ট চিত্তে, সেখান থেকে প্রস্থান করেন।

এই কাহিনী থেকে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার যে, রাজসূয় যজ্ঞ এবং উত্তরার বিয়ের ঘটনায় আমিষ খাবারের আয়োজন থাকলেও কৃষ্ণ সেগুলো খেয়েছিলেন কি না তার স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই, যেহেতু কৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত ছিলেন, সেহেতু তিনিও মুনি ঋষি সহ সবার সাথে ঐসব আমিষ খাবার খেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু কাম্যকবনের ঘটনায় কৃষ্ণ কিন্তু দ্রৌপদীর রান্না করা খাবার থেকেই একটি অন্ন খেয়েছিলো, যে দ্রৌপদী নিরামিষ খেতেন না, যার হাড়ি পাতিলও নিরামিষী ছিলো না। তাহলে এখানে কী প্রমাণ হয়, শ্রীকৃষ্ণ কি নিরামিষভোজী ছিলেন ?

শ্রীকৃষ্ণ যে অহিংস নয়, সেটা তার জীবনের নানা বধের ঘটনায়, যেমন- কংস, শিশুপাল দ্বারা যেমন প্রমাণিত, তেমনি কৃষ্ণ যে নিরামিষী ছিলেন না, সেটাও মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাস দ্বারা প্রমাণিত; অথচ এই কৃষ্ণকে ভোগ নিবেদন প্রসঙ্গে দিব্যজ্ঞানীরা প্রশ্ন করে- ভগবানকে কি মাছ মাংস নিবেদন করা সম্ভব ?

শেষে Sodkirti Das এর উদ্দেশ্যে বলছি- আপনি বলেছেন সমস্ত মুনি ঋষিরা নিরামিষী ছিলেন, কিন্তু আমি রামায়ণ মহাভারত থেকে প্রমাণ করে দিলাম যে মুনি ঋষিরা নিরামিষভোজী ছিলেন না। আর আপনার মতে- এই নিরামিষ খাওয়া ব্যক্তিদের নাম আপনি যে বই থেকে নিয়েছেন, সেই "বিজ্ঞান সনাতনধর্ম বিশ্বসভ্যতা" যে কোনো অথেন্টিক রেফারেন্স নয়, সেটা, উপরে যে লিঙ্ক দিয়েছি, সেই আলোচনাতেই কিন্তু প্রমাণিত, যে আলোচনা বলছে- উক্ত পুস্তকের বেশির ভাগ তথ্য ভুল বা মিথ্যা, এখন সেই পুস্তকের তথ্যকে অনুসরণ করে, আপনি ভুল, না সঠিক পথে আছেন, এবার সেটা স্বয়ং বিচার করুন।

শেষ আরেকটা কথা, আমার কথা পছন্দ না হলে আমাকে গালাগালি করে কোনো লাভ নেই, যেটা বিশেষ করে আর্য সমাজী, মুসলমান এবং ইসকনিরা করে; কারণ, আমাকে গালি দিলেই মিথ্যা কখনো সত্য হয়ে যাবে না। আমাকে গালি দিলে আমার মুখ থেকে আরো দ্বিগুন বেগে শব্দ তীর নিক্ষিপ্ত হবে, যেটা আপনার পক্ষে হয়তো সহ্য করা সম্ভব হবে না; কারণ, আমাকে কেউ কলসীর কানা মারলে আমি তাকে প্রেম দিই না। তাই গালাগালি বাদ দিয়ে আমার বলা পয়েন্টগুলো যুক্তিসঙ্গতভাবে খণ্ডণ করুন, বলা তো যায় না, আপনার মুখে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা শুনে আমার মত বদলে আমিও আপনার ভক্ত বা শিষ্য হয়ে যেতে পারি, তাতে আপনারই লাভ; কারণ, আমার মেধা ও জ্ঞান যার পক্ষে যাবে, তার যেমন লাভ সুনিশ্চিত, তেমনি যার বিপক্ষে যাবে তারও ধ্বংস সুনিশ্চিত। এবার আবার স্বয়ং বিচার করুন, কোন পথ আপনার জন্য মঙ্গলজনক, আমাকে গালাগাল করা, না শাস্ত্র, যুক্তি ও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কথা বলা ও কাজ করা ?

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 16 July 2020

Sodkirti Das এর তমঃ, রজঃ ও সত্ত্ব গুণের জ্ঞান !


Sodkirti Das এর তমঃ, রজঃ ও সত্ত্ব গুণের জ্ঞান !

Sodkirti Das আমাদেরকে সত্ত্ব, তম ও রজগুনের জ্ঞান প্রদান করিয়াছেন, আসুন আমরা সেই জ্ঞান গ্রহন করে নিজেদেরকে আলোকিত করি।

এই আলোচনায় যাবো একটু পরে, তার আগে Sodkirti Das এর কাছে আমার একটি প্রশ্ন- গোঁড়া বৈষ্ণবরা মসুর ডাল খায় না কেনো ?

বৈষ্ণবপন্থীরা আমিষ খায় না ব'লে, আমরাই তো তাদের কাছে এই প্রশ্ন করি যে- শুধু মাছ মাংস, ডিমেই আমিষ নেই, অন্যান্য খাবারেও আমিষ আছে, তাহলে আমিষ আহার ত্যাগ হলো কোথায় ?

তাদের কাছে এর জবাব হলো- তোরা এসব বুঝবি না।

হ্যাঁ, এটা আমরা বুঝি না, যেমন আমরা বুঝি না, যে মাছ ছুঁলে বা মাছ মাংসের কড়াই হাড়িতে রান্না করা খাবার খেলে বা আমিষ বাসনপত্রের সাথে তাদের নিরামিষ বাসনপত্রের স্পর্শ লাগলে যে বৈষ্ণবদের জাত থাকে না, সেই বৈষ্ণবরা আবার মাছের বাসস্থান নদীর জলকে কিভাবে পবিত্র মনে করে, সেই জলে কিভাবে স্নান করে বা সেই জলকে কিভাবে বিভিন্ন পূজায় ব্যবহার করে ? এসব আমাদের বোধের বাইরে।

আবার এটাও বুঝি না- আমিষভোজীরা, নিরামিষ বাসনপত্রে রান্না করে দিলেও নিরামিষভোজীরা খায় না, যেকারণে প্রায় সব নিরামিষভোজী নিজে রান্না করে খায়, সেই নিরামিষভোজীরা বাজার থেকে মুসলমানদের কাছ থেকে কিনে আনা শাকসবজি ফল চাল ডাল কিভাবে খায় ? মাছ মাংস ডিম খাওয়া হিন্দুর চেয়ে মনে হয় গরু খাওয়া মুসলমানেরা, নিরামিষভোজীদের কাছে বেশি পবিত্র।

যা হোক, বর্তমানে অনেক বৈষ্ণব বাড়িতেই এক বা একাধিক গোঁড়া বৈষ্ণব মহিলা আছে, যারা কারো হাতেই খায় না, সম্পূর্ণ নিজে রান্না করে খায়, এই বৃদ্ধারা যখন অতিবৃদ্ধা হয়ে নিজে আর রান্না করতে পারে না, রোগব্যাধিতে বিপর্যস্ত হয়ে শুধু বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তখন এই বৃদ্ধারা কিন্তু আমিষভোজী ছেলের বউ বা আমিষভোজী মেয়ের হাতে রান্না ঠিকই খায় বা খেতে বাধ্য হয়, তাহলে তার সারাজীবনের যে সাধনা, কোনো আমিষভোজীর হাতে খাবে না, সেটা গেলো কোথায় ? যারা বাস্তবতাকে বুঝে না বা স্বীকার করে না, প্রকৃতি তাদেরকে ঠিক এই ভাবেই শাস্তি দেয়, তারা যা করতে চায় না, প্রকৃতি তাদেরকে শেষ পর্যন্ত সেটাই করতে বাধ্য করে।

যা হোক, #Sodkirti_Das তার প্রবন্ধের এই অংশের এক জায়গায় বলেছে- চাল ডাল ও শাকসবজিতে প্রচুর আমিষ থাকে।

-প্রচুর কাকে বলে জানেন ? যখন কোনো কিছুতে কোনো জিনিস ম্যাক্সিমাম পরিমাণ থাকে, তখন তাকে প্রচুর বলে। শাকসবজি চাল ডালে যদি প্রচুর পরিমাণ আমিষ থাকতো, তাহলে তো আমিষ জাতীয় খাদ্য হিসেবে মাছ মাংস ডিমের কেউ উদাহরণই দিতো না। এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা শুনে রাখুন- বনের হাতি, জিরাফ, মহিষেরা সারাদিন লতা পাতা খায়, এরা প্রচুর শক্তিশালী হয়, বিশাল আকৃতিরও হয়, দীর্ঘদিন বাঁচেও; তারপরও এরা কেউ বনের রাজা হতে পারে নি, বনের রাজা হয়েছে বাঘ বা সিংহ, যারা মাংসাশী প্রাণী। এর মানে হলো রাজা বা নেতা হওয়ার জন্য যে মানসিক বৈশিষ্ট্যের দরকার, যে যোগ্যতা দরকার, সেটা নিরামিষ খেলে অর্জন হয় না, তার জন্য প্রাণীজ আমিষ খেতে হয়। প্রকৃতির দিকে তাকালেও দেখা যায়- একটি মহিষের যা শক্তি, তা দিয়ে সে একসাথে দুই তিনটা সিংহের সাথে ফাইট করতে পারে, কিন্তু তারপরও চার পাঁচটি সিংহ মিলে এক দেড়শকে মহিষকে তাড়া করে নিয়ে যায় বা চার পাঁচটি সিংহের আক্রমনে এক দেড়শ মহিষ ভয়ে পালাতে থাকে, কেনো জানেন ? নিরামিষ খেলে, কারো আক্রমনকে প্রতিহত করার যে মানসিকতা দরকার, সেটাই থাকে না, তাহলে সেই শক্তির কি মূল্য, যে শক্তি প্রয়োজনের সময় ব্যবহার হয় না ? যুদ্ধ, আত্মরক্ষা বা টিকে থাকার প্রশ্নে নিরামিষ খাবার এখানেই ব্যর্থ, এই খাবার খেয়ে মুখে বড় বড় কথা বলা যায়, কিন্তু নিজেকে রক্ষা করা যায় না, শক্তির মুখে পড়লে ভয়ে পালাতে হয়।

যা হোক, এরপর Sodkirti Das তার প্রবন্ধের এক স্থানে বলেছে-

"গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, আমাদের প্রতিদিনের আহার্য খাদ্যও তিন গুনের দ্বারা প্রভাবিত।

১) তমোগুনের আহার হল বাসি পচা শুটকি, বেজী, সাপ, শামুক, কাকড়া, চিকা, ইদুর, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি। এগুলো পাজাড়ীরা খায় বা খেতো।

২)রজগুনের আহার হলো অতি স্বাদযুক্ত বড় বড় মাছের তরকারী, মাংস, বিরানী ইত্যাদি।

৩)সত্বগুনের আহার হল, বিভিন্ন শাক, সবজি যে কোনো অন্ন, সাগু, ফল মূল, দুধ, ঘি, ছানা দ্বারা তৈরী খাদ্য ইত্যাদি।"

-এখন দেখা যাক গীতায় সত্ত্ব, তমঃ ও রজগুন বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে ?

সত্ত্ব, তমঃ, রজঃ- এগুলো হলো গুন বা বৈশিষ্ট্য, যা জীবের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় এবং এই শব্দগুলো থেকে উদ্ভূত সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজসিক শব্দ দ্বারা কোনো ব্যক্তি বিশেষকে বোঝায় এবং একারণেই এগুলো কোনো বস্তু বা পদার্থের গুন নয়, তাই এই শব্দগুলো থেকে উদ্ভূত সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজসিক শব্দ দ্বারা কোনো বস্তু বা খাদ্যদ্রব্যকে বোঝায় না।

এই বিষয়টি আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবো যদি গীতার কয়েকটি শ্লোকের অর্থ ভালোভাবে বুঝতে পারি।

গীতার ১৭/৪ নং শ্লোকে বলা হয়েছে,

“যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।” -১৭/৪

এর অর্থ- সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা দেবতাদের পূজা করে, রাজসিক ব্যক্তিরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে এবং তামসিক ব্যক্তিরা ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে।

এখানে- সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক শব্দ দ্বারা সবক্ষেত্রেই ব্যক্তি বিশেষকে বোঝানো হয়েছে, কোনো খাদ্য বা বস্তুকে বোঝানো হয় নি।

এরপর গীতার ১৭/৮ শ্লোকে বলা হয়েছে,

“আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।”

এর অর্থ- যে সমস্ত আহার- আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম, সেগুলি সাত্ত্বিক লোকেদের প্রিয়।

মানে সাত্ত্বিক লোকেরা কোন ধরণের খাবার পছন্দ করে, এখানে সেই কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হিন্দু সমাজের কিছু কিছু দিব্যজ্ঞানী, এই শ্লোকের দ্বারা মনে করে যে, গীতায় সাত্ত্বিক আহারের কথা বলা হয়েছে এবং সাত্ত্বিক মানে নিরামিষ! যেমন দিব্যজ্ঞানী Sodkirti Das সাত্ত্বিক আহার বলতে বোঝে- বিভিন্ন শাক, সবজি যে কোনো অন্ন, সাগু, ফল মূল, দুধ, ঘি, ছানা দ্বারা তৈরী খাদ্য ইত্যাদি।" কিন্তু গীতায় কি বলা হয়েছে যে কোন কোন বা কোন ধরণের খাবার সাত্ত্বিক ?

যারা সাত্ত্বিক মানে নিরামিষ বুঝে থাক, তাদেরকে বলছি-

তুই নিরামিষ খাবি খা, কেউ তো তোকে আমিষ খেতে বাধ্য করছে না। কিন্তু গীতায় সাত্ত্বিক শব্দ দ্বারা নিরামিষ আহারের কথা বুঝিয়েছে, এটা তোকে কোন বলদে বুঝিয়েছে, আর গীতার বাণীর এরকম অপব্যাখ্যা করতে তোকে কে করতে বলেছে ?

সাত্ত্বিক বলতে যে কোনো দ্রব্য বা বস্তুকে বোঝায় না এবং সাত্ত্বিক বলতে যে সত্ত্ব গুন বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে বোঝায়, সেটা তো উপরেই উল্লেখ করেছি।

এই একই কথা প্রযোজ্য গীতার ১৭/৯ শ্লোকের ক্ষেত্রেও-

“কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরূক্ষবিদাহিনঃ।
আহারা রাজসসেষ্ট্যা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।”

এর অর্থ- যে সমস্ত আহার অতি তিক্ত, অতি অম্ল, অতি লবনাক্ত, অতি উষ্ণ, অতি তীক্ষ্ণ, অতি শুষ্ক, অতি প্রদাহকর এবং দুঃখ, শোক ও রোগ উৎপাদনকারী, সেগুলি রাজসিক ব্যক্তিদের প্রিয়।

-এখানে রাজসিক ব্যক্তিরা কোন ধরণের খাবার পছন্দ করে, সে কথা বলা হয়েছে, অথচ দিব্যজ্ঞানী Sodkirti Das রজঃগুনের খাবার বলত বোঝে- অতি স্বাদযুক্ত বড় বড় মাছের তরকারী, মাংস, বিরানী ইত্যাদি। এই সব মনগড়া কথা অন্য কাউকে, অন্য কোথাও গিয়ে বলিস, যেখানে আমার নজর পৌঁছাবে না, ফেসবুকের মতো পাবলিক ফোরামে কখনো বলিস না; কারণ, এসব অশাস্ত্রীয় কথাবার্তাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে না দেওয়ার জন্য পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ আমাকে সেই জ্ঞান এবং লেখার জন্য সেই সময়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

যা হোক, এরপর তামসিক বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিদের প্রিয় খাবার সম্পর্কে গীতার ১৭/১০ শ্লোকে বলা হয়েছে,

“যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ ষৎ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।”

এর অর্থ- যে খাদ্য অনেক আগে রান্না করা হয়েছে, যার রস শুকিয়ে গেছে, যা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র, তা তামসিক লোকদের প্রিয় ।

অর্থাৎ এই দুটো শ্লোকে বলা হয়েছে- রাজসিক এবং তামসিক ব্যক্তিরা কোন কোন ধরণের খাবার পছন্দ করে এবং বলা হয় নি যে কোন কোনো খাবার রাজসিক বা তামসিক ? অথচ দিব্যজ্ঞানী Sodkirti Das তমঃগুনের খাবার বলতে বোঝে- বাসি পচা শুটকি, বেজী, সাপ, শামুক, কাকড়া, চিকা, ইদুর, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি। এগুলো আবার নাকি পাজাড়ীরা খায় বা খেতো।

যা হোক, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বর্তমানের কোনো সুস্থ ব্যক্তি কি এই তামসিক বা রাজসিক বৈশিষ্ট্যের খাবার খায় ? খায় না। তার মানে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এমন ধরণের খাবার খাই যেগুলো সাত্ত্বিক লোকেদের প্রিয়। এর মানে কি এই যে, আমরা সবাই সত্ত্বঃগুন সম্পন্ন মানুষ ? নিশ্চয় নয়। পৃথিবীর সব লোক যদি সত্ত্বগুন সম্পন্ন মানুষ হতো, তাহলে কি পৃথিবীতে এত অধর্ম থাকতো, না হতো ? থাকতোও না আর হতোও না।

পৃথিবীর যেখানেই মুসলমান, সেখানেই অধর্ম, অর্থাৎ- মিথ্যাচার, দুর্নীতি, ছলনা, কপটতা এবং হানাহানিতে পূর্ণ; এসব তামসিক লোকেদের কাজ, তার মানে মুসলমানরা সব সময়, তামসিক লোকেদের প্রিয় খাদ্য বলে গীতায় যা বলা হয়েছে- যে খাদ্য অনেক আগে রান্না করা হয়েছে, যার রস শুকিয়ে গেছে, যা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র।- সেসব খাবার খায় ? খায় না। এ থেকেও এটা স্পষ্ট যে, তামসিক শব্দ দ্বারা কোনো খাদ্য বা বস্তুকে নির্দেশ করা হয় নি, এই একই কথা প্রযোজ্য রাজসিক শব্দের ক্ষেত্রেও।

এই অংশের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে, গীতায় খাবার দাবার সম্পর্কে বলা হয়েছে- সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক ব্যাক্তিরা কোন ধরণের খাবার খায়; বলা হয় নি যে কোন খাবার সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক? আর এসব বলা হবেই বা কেনো, আগেই তো বলেছি, এই তিনটি শব্দ দ্বারা কিছু গুন বা বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যেগুলো মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কোনো বস্তু বা দ্রব্যের বেলায় নয়।

তারপরও কিছু কিছু দিব্যজ্ঞানী গীতার এই শ্লোক-

“পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।।”- ৯/২৬

অর্থ: যে বিশুদ্ধচিত্ত নিষ্কামভক্ত ভক্তি সহকারে আমাকে পত্র পুষ্প ফল ও জল অর্পন করে, আমি তার সেই ভক্তিপ্লুত উপহার প্রীতি সহকারে গ্রহণ করি।

-উল্লেখ করে বলবে যে, গীতায় শ্রীকৃষ্ণকে- পত্র, পুষ্প, ফল নিবেদন করতে বলা হয়েছে, এর মানে তাকে নিরামিষ খাবার নিবেদন করতে হবে।

এইসব দিব্যজ্ঞানীদের জন্য নিচের এই আলোচনা:

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, পত্র পুষ্প ফল ও জল তাকে অর্পন করতে, কিন্তু তিনি কি তার ভক্তদেরকে এগুলোই বা শুধু এগুলোই খেতে বলেছেন ? যদি শ্রীকৃষ্ণ তার ভক্তদেরকে এগুলোই খেতে বলে থাকেন, তাহলে তো আমাদেরকে শুধু পত্র পুষ্প ফল ও জল খেয়েই বেঁচে থাকতে হবে। ফল ও জল না হয় খাওয়া যায় বা যাবে, কিন্তু পত্র ও পুষ্প অর্থাৎ পাতা ও ফুল কিভাবে খাওয়া যাবে ? কিছু কিছু সবজিজাত পাতা ও ফুল অবশ্য মানুষ খায়, কিন্তু সেগুলো কি মানুষ কোনো দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে ? করে না। তার মানে, যে পাতা ও ফুলের কথা গীতায় বলা হয়েছে সেগুলো মানুষের খাদ্য নয়। এখন নিরামিষভোজীদের জন্য বাকি থাকলো ফল ও জল; এখন আপনারাই বলেন, আপনারা কি শুধু ফল ও জল খেয়ে থাকেন, অন্য কিছুও খান ?

গীতা শুধু পড়লেই হয় না, গীতার বাণীর মর্মকে উপলব্ধি করতে হয়। যেমন- এক জায়গায় বলা হয়েছে, কাম ক্রোধ নরকের দ্বার। তার মানে কি কাম ক্রোধকে ত্যাগ করতে বলা হয়েছে ? না, কাম ক্রোধকে কন্ট্রোল করতে বলা হয়েছে, যাতে তার দ্বারা কোনো অনর্থ না ঘটে। শ্রীকৃষ্ণ যদি কামকে ত্যাগ করতেন তাহলে কি তিনি বিয়ে করতেন ? ক্রোধকে ত্যাগ করলে কি তিনি শিশুপালকে হত্যা করতেন ? এভাবেই পত্র পুষ্প ফুল ও জল শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করার বিষয়টি হলো প্রতীকী, এর মাধ্যমে শুধুমাত্র সেগুলোই আমাদেরকে খেতে বলা হয় নি, বলা হয়েছে, দিনে অন্তত একবার হলেও তার উদ্দেশ্যে সেগুলো নিবেদন করে যেন তাকে স্মরণ করি; পত্র পুষ্প ফুল ও জল হলো শ্রদ্ধা প্রর্দশনের একটি মাধ্যম মাত্র, যেমন- শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধে বা মৃত কোনো বিখ্যাত মানুষের মূর্তির বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।

আপনারা অনেকেই হয়তো করে থাকেন বা কাউকে করতে দেখেছেন যে, ভাত খাওয়ার পূর্বে কেউ কেউ গ্লাস থেকে হাতে জল নিয়ে থালার চারপাশে বৃত্তের মতো জল দিয়ে ভাতকে প্রণাম করে খাওয়া শুরু করে, এটাও এক প্রকারের নিবেদন এবং উপরের শ্লোকে জল নিবেদনের যে কথা বলা হয়েছে, এটাও তার এক প্রকারের রূপ।

আশা করছি- দিব্যজ্ঞানী Sodkirti Das এর সত্ত্ব, তমঃ ও রজঃ গুন সম্পর্কে করা মিথ্যাচারের জবাব দিয়ে এর প্রকৃত ব্যাপারটা আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

সত্ত্ব, তমঃ ও রজঃ গুন সম্পর্কে -"সত্ত্ব, তমঃ ও রজঃ গুন বলতে আসলে কী বোঝায় ?" শিরোনামে আমার আরও একটি প্রবন্ধ আছে, সেটা পড়লে এই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাবেন বলে আমি মনে করি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রী কৃষ্ণ।

Thursday, 28 May 2020

মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাস


মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাস :

বৈষ্ণব সমাজের বহুল মিথ্যা প্রচারণার ফলে প্রায় সব হিন্দুই বিশ্বাস করে যে, ধর্ম কর্ম করতে হলে নিরামিষ খেতে হবে বা মাছ মাংস খেলে ধর্ম কর্ম হবে না বা ধর্ম কর্ম করা যাবে না। কিন্তু আল্টিমেট বিচারে নিরঙ্কুশ নিরামিষ খাওয়া যেহেতু একটি অবাস্তব থিয়োরি, সেহেতু কোনো গৃহী হিন্দুর পক্ষেই সম্পূর্ণ নিরামিষী হওয়া সম্ভব নয়, তাই তারা বাস্তব কারণেই মাছ মাংস খেতে বাধ্য হয় এবং পূজা পার্বন উপলক্ষ্যে বা একাদশীর উপবাস উপলক্ষ্যে দুই একদিন নিরামিষ খেয়ে ভণ্ডামী করে, পরে আবার মাছ মাংস খায় এবং অপরাধবোধে ভোগে; এভাবে বৈষ্ণব সমাজ, পুরো হিন্দু সমাজকে একটি দ্বিধা-সংকোচের মধ্যে ফেলে রেখেছে।

হিন্দু শাস্ত্রে যে নিরামিষ খাওয়ার কোনো বিধান নেই, এই কথা আমি আমার বহু পোস্টে বহুবার বলেছি, শাস্ত্র থেকে তার প্রমাণও দিয়েছি, রামায়ণ ঘেঁটেও দেখিয়েছি রাম-সীতা-লক্ষ্মণ, বনবাসকালে বনে পশু শিকার করে তার মাংস খেতো, কিন্তু তারপরও কিছু দিব্যজ্ঞানীর মাথায় এটা ঢোকেই না, তারা হিন্দু জাতিকে নিরামিষই খাওয়াবে, আর মুসলমানদের হাতে হিন্দুদের ধন-সম্পদ ঘর বাড়ি আর নারী তুলে দেওয়াবে।

গীতায় বর্ণিত সাত্ত্বিক মানে যে নিরামিষ খাবার নয় এবং রামায়ণেও যে নিরামিষ খাবারের কোনো ব্যাপার নেই, এসব ব্যাপারে আগে আমি আলোচনা করেছি; প্রসঙ্গ উপস্থিত হওয়ায়, আজ আলোচনা করে দেখাচ্ছি মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে-

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাসকৃত মহাভারতের গদ্য অনুবাদক রাজ শেখর বসু, তার গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন,  "ভীম মাংসলোভী পেটুক ছিলেন", সুতরাং ভীমের অন্যান্য ভাই যে মাংস খেতো এবং রাজ পরিবারে যে মাংস রান্না হতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এছাড়াও হস্তিনাপুরের রাজ মাতা সত্যবতী ছিলেন জেলের মেয়ে, আর জেলের মেয়ে যে মাছ খাবে, সেটা তো নরম্যাল ব্যাপার।

মহাভারতের সভাপর্বের "ধৃতরাষ্ট্র-শকুনি-দুর্যোধন-সংবাদ" অধ্যায়ে ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে বলছে-

"পুত্র, তোমার শোকের কারণ কী? মহৎ ঐশ্বর্য আর রাজচ্ছত্র তোমাকে আমি দিয়েছি, তোমার ভ্রাতা আর বন্ধুরা তোমার অহিত করেন না, তুমি উত্তম বসন পরছো, সমাংস অন্ন খাচ্ছো, উৎকৃষ্ট অশ্ব, মহার্ঘ শয্যা মনোরমা নারীবৃন্দ, উত্তম বাসগৃহ ও বিহারস্থানও তোমার আছে, তবে তুমি দীনের ন্যায় শোক করছো কেনো ?"

এখানে খেয়াল করুন, ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে বলছে- "সমাংস অন্ন খাচ্ছো", তার মানে হস্তিনাপুরের রাজ পরিবারে মাংস খাওয়া ছিলো সাধারণ বিষয়।

বনপর্বে "যুধিষ্ঠিরাদির তীর্থযাত্রা" অধ্যায়ে বলা আছে-
"উপস্থিত সকল লোককে যুধিষ্ঠির বললেন, ' যে ব্রাহ্মণ ও যতিগণ ভিক্ষাভোজী, যারা ক্ষুধা তৃষ্ণা পথশ্রম আর শীতের কষ্ট সইতে পারেন না, তাঁরা নিবৃত্ত হন, যারা মিষ্টভোজী, বিবিধ পক্বান্ন লেহ্য পেয় মাংস প্রভৃতি খেতে চান, যাঁরা পাচকের পেছনে থাকেন, তাঁরাও আমার সঙ্গে যাবেন না।"

খেয়াল করুন, যুধিষ্ঠির বলছে, "বিবিধ পক্বান্ন লেহ্য পেয় মাংস প্রভৃতি যারা খেতে চান", এর মানে হলো মহাভারতের যুগে মাংস খাওয়া কোনো ব্যাপারই ছিলো না।

যা হোক, উপরে বর্ণিত এই ধরণের ছোটখাটো ঘটনা ছাড়াও মহাভারতে বর্ণিত দুটি বড় ঘটনার দিকে তাকালে মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আমরা কিছু ধারণা পাবো।

মহাভারতের সভাপর্ব, যে পর্বে যুধিষ্ঠির, ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করাকালে রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলো, সেই সময়ের খাবার দাবারের বর্ণনাতে বলা হয়েছে-

"যুধিষ্ঠির ঘৃত ও মধু মিশ্রিত পায়স, ফলমূল, বরাহ ও হরিণের মাংস, তিল মিশ্রিত অন্ন প্রভূতি বিবিধ ভোজ্য দিয়ে দশ হাজার ব্রাহ্মণ ভোজন করালেন এবং তাদের উত্তম বসন, মাল্য ও বহু সহস্র গাভী দান করলেন। তারপর গীত বাদ্য সহকারে দেবপূজা ও বিগ্রহ স্থাপন করে সভায় প্রবেশ করলেন।… নানাদেশ থেকে আগত ঋষি ও নৃপতিদের সঙ্গে পাণ্ডবগণ সেই সভায় আনন্দে বাস করতে লাগলেন।"

এখানে লক্ষ্যণীয় যে ঋষিরাও কিন্তু বরাহ ও হরিণের মাংস খেতো।

এটা ছাড়াও খাবার-দাবারের আরেকটি বর্ণনা আছে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের কন্যা উত্তরার সাথে অর্জুনের পুত্র অভিমন্যুর বিবাহের ঘটনায়, সেখানকার বর্ণনা এরকম-

"অর্জুনের প্রস্তাবে বিরাট সম্মত হলেন, যুধিষ্ঠিরও অনুমোদন করলেন। তারপর সকলে বিরাটরাজ্যের অন্তর্গত উপপ্লব্য নগরে গেলেন এবং আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন। দ্বারকা থেকে কৃষ্ণ বলরাম কৃতবর্মা ও সাত্যকি, সুভদ্রা ও অভিমন্যুকে নিয়ে এলেন। ইন্দ্রসেন প্রভূতি ভৃত্যরাও পাণ্ডবদের রথ নিয়ে এল। এক অক্ষৌহিনী সৈন্যসহ দ্রুপদ রাজা, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, শিখণ্ডী ও ধৃষ্টদ্যুম্ন এলেন। মহাসমারোহে বিবাহের উৎসব অনুষ্ঠিত হলো। শত শত মৃগ ও অন্যান্য পশু নিহত হলো।.. জনার্দন কৃষ্ণের সম্মুখে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ যথাবিধি সম্পন্ন হলো।"

এই দুটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে মহাভারত যুগের মানুষের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো এবং সেই সাথে এটাও প্রমাণিত যে সেই সময় নিরামিষ খাবার বলে কিছু ছিলো না; আর সেই সাথে এটাও স্পষ্ট যে- উপরে বর্ণিত দুটি বড় ঘটনায় যেহেতু কৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন সেহেতু তিনিও সকলের মতো সকলের সাথে একই ধরণের খাবার খেয়েছেন, সুতরাং কৃষ্ণ নিরামিষ খান নি, তিনিও সকলের মতো আমিষ খাবারও খেয়েছেন। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণ যে বনে পশু শিকারও করেছেন সেটাও আছে মহাভারতের আদি পর্বের সুভদ্রাহরণপর্বাধ্যায়ে, সেখানে বলা আছে,

"সৈন্যদল বেষ্টিত হয়ে যদুবীরগণের সঙ্গে কৃষ্ণ বলরাম নানাবিধ মহার্ঘ যৌতুক নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে এলেন। অনেক দিন আনন্দ যাপন করে সকলে ফিরে গেলেন, কেবল কৃষ্ণ রইলেন। তিনি যমুনা তীরে অর্জুনের সঙ্গে মৃগয়া করে মৃগ বরাহ মারতে লাগলেন।"

সুতরাং কৃষ্ণ যে অহিংস নয়, সেটা তার জীবনের নানা ঘটনায় যেমন প্রমাণিত, তেমনি কৃষ্ণ যে নিরামিষী ছিলেন না, সেটাও মহাভারত যুগের খাদ্যাভ্যাস দ্বারা প্রমাণিত; অথচ এই কৃষ্ণকে ভোগ নিবেদন প্রসঙ্গে দিব্যজ্ঞানীরা প্রশ্ন করে- ভগবানকে কি মাছ মাংস নিবেদন করা সম্ভব ?

ভগবানকে মাছ মাংস নিবেদন করা সম্ভব কি না, আশা করছি সেই প্রশ্নের জবাব আমার বন্ধুরা পেয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

সংস্কৃত রামায়ণ অনুসারে রাম-সীতা, লক্ষ্মণের মাংস খাওয়ার প্রমাণ


সংস্কৃত রামায়ণ অনুসারে রাম-সীতা, লক্ষ্মণের মাংস খাওয়ার প্রমাণ :

বাল্মীকি রামায়ণে বেশ কয়েক জায়গায় স্পষ্ট করে লিখা আছে যে, বনবাস কালে রাম সীতা লক্ষ্মণ বিভিন্ন প্রাণী হত্যা করে তার মাংস খেতেন, কিন্তু এই কথা বললেই কিছু কিছু দিব্যজ্ঞানীর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে, সত্য বোঝা ও বলার জন্য তারা আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলে গালাগালি করে বা করবে; কিন্তু কুকুরের ঘেউ ঘেউ করা দেখে হাতি যেমন পাত্তা দেয় না, তেমনি আমিও ঐসব গালাগালিকে কেয়ার করি না; এ প্রসঙ্গে দিব্যজ্ঞানীরা জেনে রাখুক- কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি সত্য বলা এবং সত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবো না; কারণ, আমি মনে করি সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার জন্য ঈশ্বর আমাকে তৈরি করেছেন, তাই সেই কাজ আমি করে যাবো। তবে দিব্যজ্ঞানীদের যদি সেই শাস্ত্রজ্ঞান থেকে, তাহলে হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে রেফারেন্স দিয়ে আমার যুক্তি খণ্ডন করতে পারে বা আমার কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে, কোনো মনগড়া বিশ্বাস গ্রহনযোগ্য নয়।

যা হোক, শুরু করছি, আজকের মূল প্রসঙ্গ-

অযোধ্যাকাণ্ডের ১৪ নং উপাখ্যান (শৃঙ্গবেরপুর- নিষাদরাজ গৃহ) সর্গ : ৪৯-৫২ তে এক জায়গায় রাম তার পিতার প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র, যে রামকে বনে ছাড়তে গিয়েছিলো, তাকে বলছে, “আবার আমি কবে পিতা মাতার সঙ্গে মিলিত হয়ে সরযুতটের পুষ্পিত বনে মৃগয়া করবো ?” (রাজশেখর বসুর রামায়ণ, পৃষ্ঠা ১০৬)

যারা জানেন না, তাদের জন্য বলছি- মৃগয়া মানে শিকার করা, আর এই শব্দটি এসেছে মৃগ থেকে যার অর্থ হরিণ। প্রাচীন কালের রাজারা শুধু হরিণকেই শিকার করতো, তাই হরিণের প্রতিশব্দ মৃগ থেকে মৃগয়া শব্দের উৎপত্তি। আর রাজারা অন্যান্য হিংস্র প্রাণী বীরত্ব দেখানোর জন্য শিকার করলেও তৃণভোজী প্রাণী কিন্তু শিকার করতো শুধু মাত্র খাওয়ার উদ্দেশ্যে। তাহলে রামের মৃগয়া করার উদ্দেশ্যটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ?  না পারলেও একটু পরেই সেটা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। কা্রণ, এই উপাখ্যানেরই শেষের দিকে, উল্লিখিত পুস্তকের পৃষ্ঠা ১০৯ তে, সীতা গঙ্গার কাছে প্রার্থনা করে বলছে, আমরা যদি ঠিকঠাক মতো বনবাস শেষ করে রাজ্যে ফিরে যেতে পারি, তাহলে, “তোমাকে সহস্র ঘট সূরা এবং মাংসযুক্ত অন্নের ভোগ দেবো।”

যে মাংস খায় না, তার পক্ষে কি মাংসের ভোগ দেওয়া সম্ভব ?

এই পৃষ্ঠাতেই এই উপাখ্যানের একেবারে শেষ অনুচ্ছেদে বলা আছে,

“কিছুকক্ষণ পর তারা সমৃদ্ধ শস্যসম্পন্ন বৎস্যদেশে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাম লক্ষ্মণ- বরাহ (শুকর), ঋষ্য, পৃষত (কৃষ্ণসার হরিণ) এবং মহারুরু (শম্বর, এটা আমার অচেনা) এই চার প্রকার পশু বধ করে, তাদের পবিত্র মাংস নিয়ে ক্ষুধিত হয়ে সায়ংকালে বাসের নিমিত্তে বনে প্রবেশ করলেন।”

রাম-লক্ষ্মণ-সীতা যদি মাংসই না খায়,  তাহলে তারা এই পশুগুলো হত্যা করলো কেনো ?

এরপর অযোধ্যাকাণ্ডের ১৫ নং উপাখ্যান, উক্ত পুস্তকের পৃষ্ঠা নং ১১১ তে বলা আছে, “এক ক্রোশ গিয়ে দুই ভ্রাতা বহু প্রকার পবিত্র মৃগ বধ করে এনে যমুনা তীরস্থ বনে ভোজন করলেন।”

এবং পৃষ্ঠা ১১২ তে বলা আছে- রাম, লক্ষ্মণকে বলছে,

“অতএব তুমি মৃগ বধ কর নিয়ে এসো। লক্ষ্মণ পবিত্র মৃগ বধ করে এনে তার মাংস অগ্নিপক্ব ও শোনিত শূন্য করে রামকে দিলেন।”

শুধু যে রাম লক্ষ্মণ সীতা ই মাংস খেতো, তাই নয়, খেতো ভরতও, তার প্রমান আছে, পৃষ্ঠা ১২৯ এ; সেখানে, রামের সাথে দেখা করে তাকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভরত বনের মধ্যে এলে, গুহ নামক একব্যক্তির জনপদের কাছে ভরত শিবির ফেলে বিশ্রামের জন্য, খবর এবং পরিচয় পেয়ে সেই গুহ, মৎস্য-মাংস-মধু উপহার নিয়ে ভরতের সাথ দেখা করতে যায়।

সেগুলো যদি না খাওয়া হয়, তাহলে সেগুলো উপহার নিয়ে যাবে কেনো ?

গুহ এর ওখান থেকে ভরত যায় ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রমে, সেখান ভরতের সাথের সকল সৈন্যসামন্তকে বলা হয়, “সূরাপায়িগন সূরা পান করো,  বুভূক্ষিতগণ পায়স ও সুসংস্কৃত মাংস যা ইচ্ছা হয় খাও”(পৃষ্ঠা-১৩২)।অনেক কিছুর সাথে এখানে ভরতের লোকজনের আপ্যায়ণের জন্য ছিলো- ছাগ ও বরাহের মাংস, মৃগ, ময়ূর ও কুক্কুটের(মুরগী) মাংস (পৃষ্ঠা-১৩৩)। এই তথ্যে এখানে পরিষ্কার যে, সেকালে ঋষিরাও মাংস খেতো, কেউ নিরামিষ ভোজী ছিলো না।

এরপর অরণ্যকাণ্ডের ১১ নং উপাখ্যান “মায়া মৃগ ও মারীচ বধ”, যে উপাখ্যানের ঘটনায় একটি সুন্দর হরিণ দেখে সীতা রামকে সেই হরিণ ধরে আনার জন্য বলেছিলো, সেই হরিণ ছিলো আসলেই একটি মায়া হরিণ, কিন্তু প্রচলিত ধারণা মতো সোনার হরিণ নয়, রামকে বিভ্রান্ত করার জন্য মারীচ এই হরিণের রূপ ধরেছিলো। যা হোক, এই উপাখ্যানের শেষে বলা আছে, শেষ পর্যন্ত সেই মায়া হরিণকে না পেয়ে “রাম অন্য মৃগ বধ করে মাংস নিয়ে আশ্রমের দিকে চললেন (পৃষ্ঠা-১৭৮)।”

রাম সীতা যদি মাংসই না খায়, তাহলে রাম, সীতার সেই পছন্দের হরিণকে ধরতে না পেরে অন্য হরিণ বধ করলো কেনো ?

শুধু তাই নয়, রাবন যখন সীতাকে অপহরণ করতে ছদ্মবেশে গেছে, তখন রাবনকে সীতা চিনতে না পেরে বলছে,

“আপনি একটু বিশ্রাম করুন, আমার স্বামী শীঘ্রই রুরু (হরিণ), গোধা (গোসাপ) বরাহ প্রভূতি পশু বধ করে নিয়ে আসবেন।”(পৃষ্ঠা-১৮২)

রাম সীতা যদি মাংসই না খায় তাহলে রাম এই পশুগুলো শিকার করবে কেনো এবং কেনো সীতা, একজন অতিথিকে মাংস খাওয়ানোর কথা বলবে ?

তাছাড়া,  সীতা যে হরিণ শিকারের জন্য রামকে পাঠায়, যে সময় সে রাবন কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলো, সেটা কিন্তু তারা খাওয়ার জন্যই শিকার করতে চেয়েছিলো; কারণ, হরিণ ধরে পোষার মতো শখ তো সেই সময় সীতার ছিলো না। কিন্তু সীতার হরিণ ধরতে চাওয়ার কারণ তো পাবলিককে নিরামিষ আকারে বোঝাতে হবে যে কেনো সীতা, রামকে হরিণ ধরতে পাঠিয়েছিলো ? তাই কৌশলে সেই মায়া হরিণকে নিরামিষবাদীরা সোনার হরিণ বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সোনার হরিণ বলে যে বাস্তবে কিছু হয় না, সেটা আমাদের বাঙ্গালি হিন্দুদের মাথায় গত ৫/৬ শ বছরেও ধরা পড়ে নি।

এরপর সুন্দরকাণ্ডের ৭ নং উপাখ্যান, ‘সীতা হনুমান সংবাদ’ এ, হনুমান, সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে রামের কী অবস্থা সেটা তাকে বোঝানোর জন্য বলছে, “তিনি মাংস খান না, মদ্য পান করেন না, কেবল বিহিত বন্য ফলমুল খান।” (পৃষ্ঠা-২৭৭)

সীতার শোকে রাম যে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে সেই কথা ই হনুমান এখানে সীতাকে বোঝাচ্ছে।

আশা করছি, রাম-সীতা যে নিরামিষভোজী ছিলো না, সেই বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তারপরও যদি দিব্যজ্ঞানীদের মতো আপনার এই ধারণা থাকে যে- না, রাম সীতার পক্ষে মাংস খাওয়া অসম্ভব। তাহলে রাজশেখর বসুর অনুবাদ করা এই রামায়ণটি আপনাকে কালেক্ট করে পড়তে হবে। কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলতে পারেন যে, রাজশেখর বসুই যে রামায়ণের সঠিক অনুবাদ করেছে, তার নিশ্চয়তা কী ? তাহলে তো আপনাকে এটা পড়তেই হবে। কারণ, পড়ার পরই আপনি বুঝতে পারবেন, অনুবাদ কী এবং অনুবাদ করা কাকে বলে ?

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।