Showing posts with label শ্রাদ্ধ. Show all posts
Showing posts with label শ্রাদ্ধ. Show all posts

Saturday, 29 August 2020

শ্রাদ্ধ কতদিনে করতে হবে ?



শ্রাদ্ধ কতদিনে করতে হবে ?

কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কতদিন পর তার আত্মার মুক্তির জন্য শ্রাদ্ধ শান্তি করতে হবে, এটা নিয়ে সমাজে বেশ দ্বিধাবিভক্ত মত আছে। এই নানা মতের কারণ, মনু সংহিতার একটি শ্লোক, যে শ্লোকে বলা আছে,

“শুধ্যেদ্বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপ।

বৈশ্যপঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি।।“ (মনু সংহিতা- ৫/৮৩)

অর্থাৎ জন্ম বা মরণে ব্রাহ্মণের দশদিন, ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশ দিন, বৈশ্যের পঞ্চদশ দিন এবং শূদ্রের একমাস অর্থাৎ ত্রিশ দিন অশৌচ থাকে; ইহার পর শুদ্ধ হয়”।

মনুর রেফারেন্স দিয়ে পুরোহিত দর্পনেও একথা বলা আছে।

কিন্তু আমি আগেই প্রমান করে দিয়েছি যে, মনু সংহিতা হিন্দু ধর্মের কোনো প্রামান্য গ্রন্থ নয়; এ সম্পর্কে আমার

“স্বায়ম্ভূব মনু কে আর কেনোই বা লিখা হয়েছিলো মনু সংহিতা” নামের একটি প্রবন্ধ আছে, যারা সেটা পড়েছেন, তারা বিষয়টি জানেন; আর যারা এখনও সেটা পড়েন নি, সেটা পড়লে জানতে ও বুঝতে পারবেন।

যা হোক, মনু সংহিতার এই শ্লোকে বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের ১২ দিন; বৈশ্যের ১৫ দিন এবং শুদ্রের ৩০ দিন অশৌচ থাকে। কিন্তু মনু সংহিতারই অপর একটি শ্লোকে বলা আছে,

“সপিণ্ডের মৃত্যু হলে দশ দিন অশৌচ হবে”- ৫/৫৯

যে গ্রন্থে একই বিষয়ে দুই ধরণের কথা থাকে, সেই গ্রন্থে যে ভেজাল আছে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু মনুসংহিতার এই একই কথা (৫/৫৯) বলা আছে গরুর পুরাণে, সেখানে বলা আছে,

“সপিণ্ডদিগের মরণাশৌচ দশাহ”- ৬/১০

অর্থাৎ অশৌচ পালন করতে হবে ১০ দিন।

এখানে সপিণ্ড মানে যারা পিণ্ডদানের অধিকারী।

মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কয়টি পিণ্ড দিতে হবে, তার থেকেও কতদিন অশৌচ পালন করতে হবে, তার একটি নির্দেশনা আছে।

এটা প্রচলিত মত এবং সবাই জানে যে, মৃতের উদ্দেশ্যে ১০ দিনে ১০টি পিণ্ড দিতে হয়। এই ১০ দিনে ১০টি পিণ্ড দিয়ে একাদশতম দিনে শ্রাদ্ধ করাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ১০টি পিণ্ড দিয়ে ১৫ বা ৩০ তম দিনে শ্রাদ্ধ করলে আত্মা এই বাকি দিনগুলোতে ক্ষুধায় কষ্ট পায়, মৃতের আত্মার শান্তির জন্যই তো এত কিছু, তাহলে ১০ দিনে ১০ টি পিণ্ড দিয়ে একাদশতম দিনে শ্রাদ্ধ না করে ১৫ বা ৩০ তম দিনে শ্রাদ্ধ করার কি কোনো যুক্তি আছে ?

একাদশতম দিনেই যে শ্রাদ্ধ শান্তি করতে হবে, এর একটি জোরালো প্রমান আছে বরাহ পুরাণের একটি মন্ত্রে, সেখানে বলা আছে,

“একাদশ দিনে যথাবিধি একোদ্দিষ্ট বিধিক পিণ্ডদান করিবে, অনন্তর স্নানান্তর শুচি হবে। মনুষ্যগণের মধ্যে বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র, এই চারি বর্ণের একোদ্দিষ্ট একইরূপ।” – (১৮৮/৬,৭)

এছাড়াও কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার র্থ ও ১০ম দিনে বিশেষ পিণ্ড দিতে হয়, একে বলে পূরক পিণ্ড। এ থেকেও প্রমাণিত যে ১০ম দিনে পূরক পিণ্ড দিয়ে এগারোতম দিনেই শ্রাদ্ধশান্তি করতে হবে।

এ থেকে স্পষ্ট এবং প্রমাণিত যে সকলের জন্য মরণাশৌচ ১০ দিন এবং এগারোতম দিনেই শ্রাদ্ধ বা মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণের ভোগ দিয়ে লোকজনকে অন্ন ও জল দান করতে হবে।

ফটোপোস্টের একটিতে প্রশ্ন করা হয়েছে, শ্রাদ্ধে আমিষ খাওয়া যায় কি না ? হ্যাঁ যায়।

আশা করছি শ্রাদ্ধ সম্পর্কিত আমার এই প্রবন্ধটি শ্রাদ্ধের দিন সম্পর্কিত বিভ্রান্তি দূরীকরণে সাহায্য করবে।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 24 July 2020

শ্রাদ্ধের কি কোন ভূমিকা আছে ?


#Shib_Shankar_Dhar,

শ্রাদ্ধের অবশ্যই ভিত্তি আছে, এ ব্যাপারে সনাতন ধর্মের অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থে কী বলা আছে, সেসব বিষয়ে অত ডিটেইলসে না গিয়ে সনাতন ধর্মের সর্বোচ্চ গ্রন্থ গীতা, সেই গীতাতে কী বলা হয়েছে, শুধু সেই বিষয়টিই এখানে আলোচনা করবো -

গীতার ১ম অধ্যায়ের ৩৯, ৪০ ও ৪১ নং শ্লোকে বলা হয়েছে,

"কূলক্ষয় হইলে সনাতন কূলধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম নষ্ট হইলে অধর্ম সমস্ত কূলকেই দূষিত করিয়া থাকে। কূল অধর্মগ্রস্ত হইলে কূলস্ত্রীগণ ভ্রষ্টা হয়। ভ্রষ্টা স্ত্রীগণ হইতে বর্ণসঙ্কর জন্মগ্রহন করে। বর্ণসঙ্কর কূলনাশকারীদের এবং কূলের নরকের কারণ হয়। শ্রাদ্ধ তর্পনাদি লোপ পাওয়ায় পিতৃপুরুষগণও নরকে পতিত হয়।"

এর মধ্যে ৪১ নং শ্লোকে স্পষ্ট বলা হয়েছে- শ্রাদ্ধ তর্পনাদি লোপ পাওয়ায় পিতৃপুরুষগণ নরকে পতিত হয়।

পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতির জন্য শ্রাদ্ধ যে গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারে গীতা মাহাত্ম্যের ৬৩ এবং ৬৪ নং শ্লোকও উল্লেখ করা যায়, যেখানে বলা হয়েছে-

"পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধে যিনি গীতা পাঠ করেন, তাঁহার পূর্বপুরুষগণ অতীব সন্তুষ্ট হইয়া নরক হইতে উদ্ধার পাইয়া স্বর্গে গমন করেন। গীতা পাঠের ফলে পূর্বপুরুষগণ সন্তুষ্ট হন এবং শ্রাদ্ধে তৃপ্তিলাভ করিয়া পুত্রগণকে আশীর্বাদ করিতে করিতে পিতৃলোকে চলিয়া যান।"

সুতরাং সনাতন ধর্মের সর্বোচ্চ গ্রন্থ গীতার ভাষ্যমতে- পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতির জন্য তাদের উদ্দেশ্যে পিণ্ড দিতে হবে এবং শ্রাদ্ধ করতে হবে।

পৃথিবীতে সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যই হলো নিজের আত্মার সদগতির জন্য পিণ্ডপ্রাপ্তি ও শ্রাদ্ধ করার জন্য লোক পৃথিবীতে রেখে যাওয়া। পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ করার জন্য যদি কোনো সন্তান না থাকে সেই ব্যক্তি স্বর্গে স্থান পায় না, সরাসরি নরকে যায়; এজন্যই মহাভারতে বলা হয়েছে- নিঃসন্তানের উপবাস, দান সবই ব্যর্থ, তার স্বর্গপ্রাপ্তিও হয় না।

পিতা মাতার মাধ্যমে আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি, পিতা মাতা সব সময়ই আমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল চান, তাই সন্তান হিসেবে আমাদেরও উচিত পিতা মাতার আত্মার যাতে সদগতি হয় তার ব্যবস্থা করা, সেই ব্যবস্থারই প্রথম ধাপ হলো পিতা মাতার মৃত্যুর পর তাদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ করা।

যারা সনাতনী হিন্দু, তারা সবাই এই নিয়ম পালন করে, পিতা মাতার মৃত্যুর পর পিণ্ডদান করে এবং নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করে লোকজনকে অন্ন জল প্রদান করে। কিন্তু হিন্দু সমাজের অন্তর্গত বৈষ্ণব সমাজের সদস্যরা পিতা মাতার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ করে না, তারা চৈতন্যদেবকে মহাপ্রভু মনে ক'রে, তার নামে ভোগ দিয়ে, লোকজনকে খাইয়ে যাবতীয় দায় দায়িত্ব সারে; যার কোনো শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি বা ভিত্তি নেই। অথচ বৈষ্ণব মতবাদের প্রবর্তক চৈতন্যদেব নিজে তার পিতার মৃত্যুর পর বৈদিক মতে শ্রাদ্ধ করেছিলেন এবং গয়ায় গিয়ে পিণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রথা বর্তমান বৈষ্ণব সমাজে নেই। শ্রাদ্ধ ও তর্পন না করলে যেখানে পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতি হয় না, তারা নরকে পতিত হয়, সেখানে বৈষ্ণব সমাজ, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নামে চৈতন্যদেবের উদ্দেশ্যে ভোগ দিয়ে কি নিজেদের বা নিজেদের পূর্বপুরুষদের আত্মার কোনো সদগতি করতে পারবে ?

এই প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন- গীতায় যেখানে বলা হয়েছে যে, শাদ্ধ না করলে পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতি হয় না, তারা নরকে পতিত হয়, সেখানে শ্রাদ্ধ না করা বৈষ্ণব সমাজের সদস্যদের আত্মার সদগতি কী ?

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Tuesday, 2 June 2020

স্বর্গপ্রাপ্তি এবং পুনর্জন্মে শ্রাদ্ধের ভূমিকা কী ?


স্বর্গপ্রাপ্তি এবং পুনর্জন্মে শ্রাদ্ধের ভূমিকা কী ?

গীতার ১/৪১ এবং গীতা মাহাত্ম্যের ৬৩ ও ৬৪ নং শ্লোক অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ না করলে সে স্বর্গে যেতে পারে না, সরাসরি নরকে পতিত হয়। একটি প্রবন্ধে আমি এই কথা বলার পর #Arjun_Das প্রশ্ন তুলেছে- মৃত্যুর পর তো আত্মা কর্মফল অনুযায়ী জন্মগ্রহন করে, তাহলে শ্রাদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা কী, আর শ্রাদ্ধ করলেই যদি স্বর্গে যায়, তাহলে কর্মফলের ভূমিকা কী ?

#Arjun_Das,

কোনো মৃত ব্যক্তি পৃথিবীতে তার যে বংশধর রেখে যায়, সেটাও তার কর্ম এবং তারা যে আচরণ করে, তাদের সেই কর্মের ফল তাকেও ভোগ করতে হয়। এজন্য পৃথিবীতে পূর্ণ আয়ু ভোগ করে যাওয়া কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর সাথে সাথেই স্বর্গে বা নরকে যায় না, মৃত্যুর পর প্রথমে যায় যমরাজের অধীন পিতৃলোকে, সেখানে সে পৃথিবীতে তার রেখে যাওয়া বংশধরদের তৃতীয় প্রজন্মের কোনো একব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করে। সেই তৃতীয় প্রজন্মের কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে পিতৃলোকে অবস্থিত সিনিয়র আত্মাটি মুক্ত হয়ে তার নিজের এবং তার পরবর্তী তিন প্রজন্মের বংশধরদের কর্মফলের ভিত্তিতে সে স্বর্গে বা নরকে যায় এবং স্বর্গ-নরক ভোগ শেষে সামগ্রিক কর্মফলের ভিত্তিতে পুনরায় পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করে।

বিষয়টি সহজ করে বোঝানোর জন্য কিছু কল্পিত নামের আশ্রয় নিচ্ছি। ধরা যাক- কোনো এক ব্যক্তির নাম A, তার ছেলের নাম B, B এর ছেলের নাম C, C এর ছেলের নাম D। এখন A মারা যাওয়ার সাথে সাথে তার কর্মফল অনুযায়ী সে স্বর্গে বা নরকে যাবে না। পৃথিবীতে তার তৃতীয় বংশধর D মারা যাওয়া পর্যন্ত সে পিতৃলোকে অবস্থান করবে, যখন D মারা যাবে, তখন A, পিতৃলোক থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের এবং B,C,D এর কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গে বা নরকে যাবে এবং তার স্বর্গ বা নরক ভোগ শেষে নিজের এবং পৃথিবীতে তার রেখে যাওয়া তিন পুরুষের কর্মফল অনুযায়ী সে পৃথিবীতে পরের বার জন্ম লাভ করবে। এজন্য গীতা মাহাত্ম্যের ৬৪ নং শ্লোকে বলা হয়েছে- 'শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে গীতা পাঠের ফলে পিতা সন্তুষ্ট হন এবং পুত্রগণকে আশীর্বাদ করিতে করিতে পিতৃলোকে চলিয়া যান।' এই তথ্য থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট যে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ না করা পর্যন্ত তার আত্মা পৃথিবী থেকে মুক্তি পায় না; ক্ষুধায় আত্মা যাতে কষ্ট না পায়, সেজন্যই শ্রাদ্ধ করার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিদিন তাকে পিণ্ড প্রদান করতে হয়।

কোনো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে যদি বিধি মোতাবেক শ্রাদ্ধ করা না হয়, তাহলে তার পিতৃলোকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সে সরাসরি নরকে যাবে এবং নরক ভোগ শেষে তার নিজের এবং তার বংশধরদের কর্মফল অনুযায়ী পরের বার জন্ম নিয়ে সে কর্মফল ভোগ করবে। কিন্তু শ্রাদ্ধ করার ফলে পিতৃলোকের মাধ্যমে নরকে গেলেও, পৃথিবীতে তার বংশধরগণ যদি তাদের স্মরণে প্রতিবছর তাদের মৃত্যু তিথিতে গীতা পাঠ করে এবং লোকজনকে অন্ন-জল সেবা দেয়, যা প্রথম বছরের শ্রাদ্ধের ন্যায় তুল্য ক্রিয়া-কর্ম, তাহলেও নরকে পতিত পিতৃপুরুষ স্বর্গে স্থান পেতে পারে, যে কথা বলা হয়েছে গীতা মাহাত্ম্যের ৬৩ নং শ্লোকে, এভাবে- "পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধে যিনি গীতা পাঠ করেন, তাঁহার পূর্বপুরুষগণ অতীব সন্তুষ্ট হইয়া নরক হইতে উদ্ধার পাইয়া স্বর্গে গমন করেন।"

তার মানে কোনো ব্যক্তির শুধু নিজের কর্মফল দ্বারা স্বর্গ ভোগ বা পরের জন্মে ভালো ভাগ্য নিয়ে জন্ম নেওয়া সম্ভব নয়, পৃথিবীতে তার রেখে যাওয়া বংশধরদের কর্মও তাদেরকে ভোগ করতে হবে। এজন্য সন্তানকে সুশিক্ষার সাথে সাথে প্রকৃত সনাতন ধর্মীয় শিক্ষাও প্রদান করতে হবে, যাতে তারা গর্বিত সনাতনী হিসেবে জীবনকে অতিবাহিত করে; কারণ, ধর্ম শিক্ষার অভাবে বংশের কোনো একজন যদি সনাতন ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য কোনো মতবাদে দীক্ষিত হয়, সেই বংশের পূর্বপুরুষদের নরক বাস নিশ্চিত; কারণ, সে তার বংশধরদেরকে সুশিক্ষা প্রদান না করেই মারা গেছে, যার কারণে তার বংশ থেকে শ্রাদ্ধ তর্পন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যে কথা বলা হয়েছে, গীতার ১/৪১ নং শ্লোকে, এভাবে- 'কূলনাশকারীরা কূলের নরকের কারণ হয়, শ্রাদ্ধ তর্পনাদি লোপ পাওয়া তাহাদের পিতৃগপুরুষগণও নরকে পতিত হয়।'

তাই শুধু মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করলেই সে স্বর্গে যাবে না, তবে শ্রাদ্ধ, স্বর্গে যাবার অনেকগুলো শর্তের মধ্যে একটি শর্ত। শ্রাদ্ধ করলে মৃতব্যক্তি প্রথমে পিতৃলোকে যাবে, পিতৃলোক থেকে স্বর্গে যাবার চান্স আছে, কিন্তু শ্রাদ্ধ না করলে মৃত ব্যক্তি পিতৃলোকেও যাবে না, সরাসরি যাবে নরকে। আবার শ্রাদ্ধ করে পিতৃলোকে যাবার পর নরকে গেলেও পৃথিবীতে তার রেখে যাওয়া বংশধরেরা যদি সৎকর্মের মাধ্যমে সনাতনধর্ম মতে জীবন যাপন করে, পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর গীতা পাঠ বা তর্পন করে, যেটা প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে পিতৃপক্ষে করতে হয়, তাহলেও নরকে পতিত পিতৃপুরুষগণের স্বর্গে যাবার চান্স আছে।

সনাতন ধর্ম মতে, যেকোনো ব্যক্তি, তার পরবর্তী তিন প্রজন্ম পর্যন্ত তাদের সুকর্ম এবং কুকর্মের জন্য দায়ী। এজন্য সন্তানদেরকে ধর্মের মাধ্যমে সুশিক্ষা দেওয়া খুবই জরুরী। নিজের শ্রাদ্ধ যেহেতু নিজে করা যায় না, তাই শ্রাদ্ধ হলো বংশধরদের কর্ম, যে কর্মের ফল মৃত ব্যক্তি ভোগ করে; তাই যেকোনো আত্মা শুধু তার নিজের কর্মফল অনুযায়ী পরের বার জন্ম লাভ করে না, এতে তার বংশধরদের কর্মও জড়িত, যার সাথে জড়িত তাদের কৃত শ্রাদ্ধও।
আবার শুধু বংশধরদের দ্বারা কৃত শ্রাদ্ধ দ্বারাই কেউ স্বর্গ লাভ করতে পারে না, আগেই বলেছি, বংশধরদের দ্বারা কৃত শ্রাদ্ধ, স্বর্গ প্রাপ্তির অনেকগুলো শর্তের মধ্যে একটি; যেমন পরীক্ষায় পাস করার প্রথম শর্ত হলো- পরীক্ষায় বসা। কেউ নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে যদি পরীক্ষায় না বসে, সারা বছর দিন রাত পড়াশোনা করে, পরীক্ষার জন্য ফর্মফিলাপ করেও কোনো লাভ নেই, কারণ সে পরীক্ষায় পাস করার প্রথম শর্ত পরীক্ষাতেই বসে নি। তেমনি স্বর্গ প্রাপ্তির প্রথম শর্ত, বংশধরদের দ্বারা কৃত শ্রাদ্ধ, এর সাথে নিজের কর্মফল তো অবশ্যই জড়িত।

আশা করছি- উপরের আলোচনা থেকে অর্জুন দাস তার প্রশ্নের জবাব পেয়েছে এবং অর্জুন দাসের সৌজন্যে আমার অনেক সনাতনী বন্ধু জন্ম-মৃত্যু চক্রের একটি গোপন ও জটিল বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পেরেছে, যা তাদেরকে সনাতনী জীবন সঠিকভাবে যাপন করতে সাহায্য করবে এবং এই বিষয়টি স্মরণে রেখে সন্তানদেরকে সঠিক সনাতনী শিক্ষা প্রদান করবে, যাতে তারা সনাতন ধর্ম থেকে বিচ্যুত না হয়।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Sunday, 10 May 2020

প্রসঙ্গ : শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া বা না খাওয়া


২০১৬ সালে গ্রামের বাড়িতে আসার পর হঠাৎ একদিন কানে এলো শ্রাদ্ধ বাড়িতে নাকি বৈষ্ণব বা বৈরাগীদের খাওয়া নিষেধ। হয়তো এটা অনেক আগে থেকেই প্রচার হচ্ছে, দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকায় হয়তো সেটা আমার কানে আসে নি। যা হোক, এটা বুঝতে আমার দেরি হলো না যে- গ্রামে মাঝে মাঝে যেসব অল্পশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত বা মূর্খ বৈষ্ণব গুরুরা আসে, তাদেরই প্রচার এটা। তাই এটা শোনার পরই আমি আমার অনুগত কিছু ছেলে পেলেকে বলে রাখলাম, এই গুরুরা যদি গ্রামে আসে, তাহলে আমাকে জানাস, তারপর দেখবো তার বিদ্যার দৌড় কতদূর। কিন্তু তার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো গুরুর সাক্ষাত আমি পাই নি, তাই বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে ডিসকাস করার সুযোগও হয়ে উঠে নি।

যা হোক, শ্রান্ধ বাড়িতে বৈষ্ণবদের খাওয়া নিষেধ, যেহেতু এই বিষয়টি সমাজে প্রচার হয়ে গেছে, সেহেতু এটার সাইড এফেক্টও সমাজে পড়তে শুরু করেছে। যেমন- ২০১৮ সালে আমাদের গ্রামে একজন জন্মসূত্রে নমঃশুদ্র মারা গেলো, তার ছেলেরা এটা জানতো যে বৈষ্ণবদের নিমন্ত্রণ করলে তারা খাবে না, তাই বৈষ্ণবদেরকে বাদ দিয়ে গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো, এভাবে তারা অনুষ্ঠান পার করলো, এই বিষয়টি আমার কানে এলো অনুষ্ঠান পার হয়ে যাবার পর, তাই সেটাতে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারলাম না। এই ঘটনার পর গ্রামের এক কায়স্থ পরিবার, এক বৈষ্ণবকে ধরে বললো, আমরা কেউ মারা গেলে আমাদের বাড়িতে তো আপনারা খাবেন না, এটা নিয়ে সেই বৈষ্ণব অপদস্থ হলো। গ্রামে যেহেতু- দাস, মহন্ত, রায়, সরকার, মণ্ডল, শীল, পাল, ঘোষ পদবীর লোকজনের একত্রে বসবাস এবং দাস, মহন্ত ছাড়া অন্য সবাই অবৈষ্ণব, সেহেতু গ্রামে শ্রাদ্ধের সংখ্যা বেশি এবং সেই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে, রাত পোহালেই মুখ দেখাদেখির কারণে, অবৈষ্ণবরা, বৈষ্ণবদের নিমন্ত্রণ করে থাকে এবং সেই শ্রাদ্ধ বাড়ির খাওয়ার অনুষ্ঠানে বৈষ্ণব বাড়ির মহিলারা একদম না গেলেও, শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া উচিত কি উচিত না, এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে চক্ষু লজ্জার খাতিরে বৈষ্ণব বাড়ির অনেক পুরুষই যেতে বাধ্য হয় এবং খেতেও বাধ্য হয়। বৈষ্ণবদের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটাতে এবং তাদেরকে খাওয়াতে অনেক অবৈষ্ণব আবার আগের দিন শ্রাদ্ধ করে পরের দিন চৈতন্যদেব মানে তথাকথিত মহাপ্রভুর ভোগ দেয়, এর ফলে সারা গ্রামবাসীকে তারা একসাথে খাওয়াতে পারে এবং তৃপ্তিবোধ করে।

এই শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া উচিত কি উচিত না, এই বিষয়টি ক্লিয়ার করতেই আমার আজকের এই প্রবন্ধের অবতারণা।

যা হোক, শ্রাদ্ধবাড়িতে খাওয়ার অপকারিতা বোঝাতে বৈষ্ণব গুরুরা যে গল্পটি বলে, সেটি হলো-

এক সন্ন্যাসী পদব্রজে কোথাও যাচ্ছিলো, রাতে সে এক ব্রাহ্মণ বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে, খাওয়া দাওয়া করে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ব্রাহ্মণ বাড়ির ঠাকুরঘরে ঠাকুরের মূর্তিতে ছিলো নানারকম সোনার অলংকার। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই ব্রাহ্মণ দেখে সেই সন্ন্যাসী আর নেই, ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেখে ঠাকুরের মূর্তিতে সোনার অলঙ্কারও নেই। সেই সন্ন্যাসীই সেই অলঙ্কারগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে, এটা ধরে নিয়ে সেই ব্রাহ্মণ, সেই সন্ন্যাসীকে ধরার জন্য দিকে দিকে কয়েকজন লোক পাঠায়।

ইতোমধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর সেই সন্ন্যাসীর সম্বিত ফিরে আসে এবং সে ভাবতে লাগে, আমি সোনার অলঙ্কারগুলো চুরি করে আনলাম কেনো, এটা তো আমার কর্ম নয়। এই ভেবেই সে সেই ব্রাহ্মণের বাড়ির দিকে আবার হাঁটতে শুরু করে, ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণের পাঠানো লোকও তাকে দেখতে পায়, তারা সেই সন্ন্যাসীকে নিয়ে ব্রাহ্মণের বাড়িতে ফিরে আসে।

দেবমূর্তির সোনার অলঙ্কার সন্ন্যাসী চুরি করে নিয়ে গেছে, এই খবর গ্রামের মধ্যে প্রচার হওয়ার পর দলে দলে লোক ব্রাহ্মণের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় এবং তারা নানা আলোচনা সমালোচনার মাঝে সেই সন্ন্যাসীকে আসতে দেখে, তাকে মারতে উদ্যত হয়। এতে সন্ন্যাসী বলে, আমিই সোনার অলঙ্কারগুলো চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই এবং এরা আমাকে ধরে আনে নি, আমি স্বেচ্ছায় ফিরে এসেছি, আমার আশ্রয়দাতা ব্রাহ্মণের কাছে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে, সেগুলো জিজ্ঞেস করার পর আপনারা যা খুশি শাস্তি আমাকে দিতে পারেন।

সবাই সন্ন্যাসীর কথা শুনতে আগ্রহী হয় এবং এতে সন্ন্যাসী সেই ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস করে, গতকাল রাতে আপনি যে আমাকে খাবার দাবার দিয়েছেন, সেগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা ?

ব্রাহ্মণ বলে- গতকাল আমি এক বাড়িতে শ্রাদ্ধ করেছি, সেখান থেকেই ওগুলো পেয়েছি।

সন্ন্যাসী বলে- সেই শ্রাদ্ধ কার ছিলো ?

ব্রাহ্মণ বলে- সেই লোক খুব ভালো ছিলো না, সে এক চোর ছিলো, মাঝে মাঝে চুরি করতো।

সন্ন্যাসী বলে- আমার এই মতি বিভ্রমের কারণ এটাই। শ্রাদ্ধবাড়ির অন্ন আমাকে খাইয়েছেন এবং সেই শ্রাদ্ধ ছিলো এক চোরের। এই কারণেই চৌর্যবৃত্তি আমার ভেতরে জেগে উঠেছে এবং আমি চুরি করতে বাধ্য হয়েছি।

এটা শুনে ব্রাহ্মণ তার ভুল বুঝতে পারে।

এই গল্প ব'লে, বক্তারা এটা বোঝাতে চায় যে, শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া যাবে না, খেলে যে লোকের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হয়েছে, তার কর্মফলের ভাগ নিতে হবে এবং এই গল্পের মধ্যে চোরকে আনার উদ্দেশ্য হলো সাধারণ হিন্দুদের মনে গল্পের গভীর একটা প্রভাব ফেলা এবং এটা বিশ্বাস করানো যে শ্রাদ্ধ বাড়িতে খেলে চোর হয়ে যেতে হবে।

এখন এই গল্পের পোস্টমর্টেম করে দেখাচ্ছি যে এই গল্পটা আসলে সত্য কি না এবং এই গল্পের বিষয়বস্তু বাস্তব হতে পারে কি না ?

যারা এই গল্পটি বলে, তাদের কেউ কেউ বলে এটি পুরাণের গল্প, কিন্তু কোন পুরাণের গল্প সেটা বলে না বা বলতে পারে না, আবার কেউ বলে এই ঘটনাটি বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার। ফলে শুরুতেই গল্পের সোর্স নিয়ে একটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়, যেটি ইঙ্গিত করে যে গল্পটি মিথ্যা হতে পারে।

এই গল্পের ফোকাস পয়েন্ট দুটি- একটি হলো চোর ব্যক্তির শ্রাদ্ধ, অন্যটি হলো শ্রাদ্ধবাড়ির খাবার খেলে মৃত ব্যক্তির কর্মফলের ভাগ নিতে হয়।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে- যাদের শ্রাদ্ধ করা হয়, তারা সবাই কি চোর ? নিশ্চয় নয়। যাদের শ্রাদ্ধ করা হয়, তাদের মধ্যে ভালো মন্দ সব ধরণের মানুষই আছে এবং যে বৈষ্ণবরা মনে করে শ্রাদ্ধ বাড়িতে খেলে তাদের ধর্ম নষ্ট নষ্ট হবে বা তাদের আত্মার অধঃপতন হবে, তারাও কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে না যে তারাও সবাই ১০০% ভালো মানুষ। তাহলে শ্রাদ্ধ বাড়িতে খেলে যদি মৃতব্যক্তির কর্মফলের ভাগ নিতে হয়, তাহলে ভালো কর্ম বা খারাপ কর্ম উভয়েরই ভাগ পাওয়া যাবে এবং সমাজে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি, এই সূত্রে গড়ে সুকর্মের ফলই বেশি পাওয়া যাবে, তাহলে সমস্যা কোথায় ?

শ্রাদ্ধবাড়িতে খেলে কর্মফলের ভাগ নিতে হয়, এটা ধরে নিয়ে উপরের অনুচ্ছদটি লিখলাম, কিন্তু বাস্তবে কারো কর্মের ফল কেউ নেয় না বা নিতে পারে না, যার কর্মফল তাকেই ভোগ করতে হয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে মৃতব্যক্তির পুত্ররা কী জন্য শ্রাদ্ধ করে এবং কী জন্য শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে গ্রামবাসী বা আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায় ?
শ্রাদ্ধ হলো পিতৃঋণ পরিশোধের উপায়ের একটি অংশ এবং মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক মঙ্গলের একটি উপায়। মৃত ব্যক্তির আত্মার সদগতির জন্য তার পুত্রদেরকে এই শ্রাদ্ধ করতে হয়। কারণ, কোনো ব্যক্তির সন্তান যদি না থাকে এবং তার মৃত্যুর পর তার উদ্দেশ্যে যদি পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান না করা হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির আত্মার সদগতি হয় না বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই মৃত ব্যক্তির আত্মার সদগতির জন্য পিণ্ডদান এবং শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করলেই হয়, তাহলে লোকজনকে খাওয়ানোর দরকারটা কী ?

লোকজনকে খাওয়ানো আসলে সামাজিক সহযোগিতার প্রতিদান। কোনো বাড়ির কোনো লোক মারা গেলে সেই বাড়ির লোকজন একা একা তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে পারে না, পাড়ার বা গ্রামের সকলে মিলে তাকে সমাধিস্থ বা দাহ করতে কেউ প্রত্যক্ষভাবে কেউ পরোক্ষভাবে সহায়তা করে, আবার কেউ শোকগ্রস্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মানসিক শক্তি যোগায়। এই যে পাড়া প্রতিবেশি বা গ্রামবাসী বা আত্মীয় স্বজনদের সহানুভূতি বা সহযোগিতার মনোভাব, এই মনোভাবেরই প্রতিদান দেওয়া হয় তাদেরকে একবেলা ভরপেট খাইয়ে, যেহেতু কোনো কিছু খাওয়ানোর মাধ্যমেই লোকজনকে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট করা যায় এবং তাদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা আদায় করা যায় এবং এইভাবে একবেলা খেয়ে লোকজন যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র কন্যাদের উপর সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তাদের আশীর্বাদ ঐ পরিবারের এবং ঐ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের উপর বর্ষিত হয়, যেটা মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য কল্যানকর এবং মৃত ব্যক্তির স্বর্গ প্রাপ্তি এবং আত্মার উন্নতির জন্য সহায়ক।

তাই শ্রাদ্ধবাড়িতে খেলে মৃত ব্যক্তির কর্মফলের ভাগ নিতে হয়, এটা একটা বোগাস কথা। কারো কর্মফলের ভাগ কাউকে নিতে হয় না। বরং বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে লোকজনকে সেবা দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে, তাদের আশীর্বাদ মৃত ব্যক্তি এবং তার পরিবারের উপর বর্ষিত হয়, যেটা মৃত ব্যক্তির পুত্র কন্যারা তাদের পূর্বপুরুষ এবং নিজেদের জন্য অর্জন করে, এই সিস্টেমের মাধ্যমে তারা কারো কাছ থেকে তাদের পূণ্যকে ছিনতাই করে না বা কাউকে তাদের পিতার কর্মফলকে চাপিয়ে দেয় না।

শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া উচিত কি উচিত নয়, এই প্রশ্ন আমাকে একজন করলে তাকে আমি বলেছিলাম, শ্রাদ্ধ: বাড়িতে খেলে কী হয়, সেটা জানার আগে, আগে শোন, শ্রাদ্ধবাড়িতে না খেলে কী হয় ? শ্রাদ্ধ বাড়িতে না খেলে প্রতিবেশী বা শুভানুধ্যায়ীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়, যেটা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, শ্রাদ্ধ বলে যে লোকের নিমন্ত্রণ রক্ষা করা হলো না, সে লোক যেমন আপনাকে আর আগের মতো সুনজরে দেখবে না, তেমনি আপনার মঙ্গল কামনাও করবে না এবং আপনার বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে তাকে নিমন্ত্রণ দিলেও সে আসবে না, এভাবে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হবে, সামাজিক বন্ধনগুলো শিথিল হবে, বিপদে আপদে একে অপরকে সহযোগিতা করবে না, এভাবে হিন্দু সমাজ আস্তে আস্তে ক্ষতির মুখে পড়ে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে।

তাই শ্রাদ্ধ বাড়ির খাওয়া না খাওয়া নিয়ে অবাস্তব বৈষ্ণব মতবাদের ধারক বাহক বৈষ্ণবগুরুদের কোনো কথা কানে না নিয়ে নির্দ্বিধায় শ্রাদ্ধবাড়িতে যান এবং খান, এতেই আপনার মঙ্গল, সমাজের মঙ্গল, যা সনাতন ধর্মের রীতি এবং যা বেদদ্রষ্টা মুনি-ঋষিদের বিধান।

শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া উচিত কি উচিত নয়, এই সমস্যার সমাধান, আশা করছি উপরের আলোচনা থেকে আমার বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।