Showing posts with label শ্রী কৃষ্ণ. Show all posts
Showing posts with label শ্রী কৃষ্ণ. Show all posts

Thursday, 1 October 2020

রাধাষ্টমীর ব্রত পালনের তথাকথিত ফল এবং বাস্তবতা :

রাধাষ্টমীর ব্রত পালনের তথাকথিত ফল এবং বাস্তবতা :

যারা মিথ্যা বলে এবং মিথ্যা আশ্বাস দেয়, তারাই বেশি বলে বা বাড়িয়ে বলে; কারণ, তারা জানে সত্য কথা বললে লোকজন তাদেরকে গ্রহণ করবে না, তাই তারা এমন কথা বলে যাতে লোকে প্রলোভনে পড়ে এবং তাদের প্রোডাক্ট কিনে বা তাদেরকে গ্রহন করে। ফটোপোস্টে দেখুন সেরকমই কিছু বিষয় তুলে ধরে মানুষ প্রলোভিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে মানুষ সবকিছু ছেড়ে রাধাকে এ্যাকসেপ্ট করে। কিন্তু মিথ্যা আশ্বাসে মেয়েরা বা নারী স্বভাবের মানুষই বিশ্বাস করতে পারে, কারণ, মেয়েরা প্রকৃত সত্য এবং বাস্তব কথাবার্তাকে কম পছন্দ করে, বিপরীতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বেশি বিশ্বাস করে; কিন্তু কোনো প্রকৃত পুরুষ মিথ্যা আশ্বাসে কখনো ভুলে না, তাদেরকে ভোলানো যায় না। তাই রাধার ভক্তদের এই অপচেষ্টা একেবারে ব্যর্থ বলবো না, তবে বেশির ভাগই ব্যর্থ।

ফটোপোস্টের শুরুতেই দেখুন পদ্মপুরাণ ব্রহ্মখণ্ড ৭/৮ এর রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়েছে- একহাজার একাদশী পালন করলে যে ফল লাভ হয়, এক রাধাষ্টমী পালন করলে তার চেয়ে শতগুন বেশী ফল লাভ হয়।

এখন বাস্তবতার নিরীখে এই তথ্যটি বিচার করে দেখা যাক-

এক বছরে একাদশী থাকে ২৬টি, এই হিসেবে সাড়ে ৩৮ বছর ধরে একাদশী পালন করলে একাদশী হবে ১০০১টি। এক রাধাষ্টমী পালন করলে নাকি এর শতগুন বেশী ফল লাভ হয়। তার মানে ৩ হাজার ৮৫০ বছর ধরে কোনো এক লোক যদি একাদশী পালন করে, তাহলে সে ফল লাভ করবে, এক রাধাষ্টমী পালন করলেই তার নাকি সেই ফল লাভ হবে। এই জন্যই এক কবি বলে গিয়েছেন, "যে কহে বিস্তর মিছা, সে কহে বিস্তর।"

যা হোক, একাদশী পালন করে আমরা ভাবি যে আমাদের পূণ্য হচ্ছে, এটা বিশ্বাসের ব্যাপার। কিন্তু একাদশী পালন করার কিছু বাস্তব শারীরিক উপকারিতা আছে, যেমন- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, যার ফলে স্ট্রোকে ঝুঁকি কমে, পাকস্থলীর যাবতীয় রোগের উপশম হয়, হজমশক্তি বাড়ে, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় যেসব শারীরিক ও মানসিক সমস্যা বাড়ে একাদশীর উপবাসের ফলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে। এক রাধাষ্টমীর উপবাস করলে কোনো লোকের ৩৮৫০ বছর ধরে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণের দরকার নেই, মানুষের যে সাধারণ গড় আয়ু, যেমন ৭০/৮০ বছর, এই সময় ধরে তার এসব নিয়ন্ত্রণে থাকবে তো ? যদি থাকে তাহলে আমি রাধাষ্টমী পালন করতে রাজী।

এরপর যে বাকোয়াজ ঝাড়া হয়েছে, সেটা হলো- রাধাষ্টমী পালনের ফলে মানুষের কোটি জন্মের পাপরাশি বিনষ্ট হয়।

কোনো আত্মার তো এক কোটি জন্মই হয় না। কোনো আত্মার জন্ম হয় সর্বোচ্চ ৮৪ লক্ষ বার, এর মধ্যে মানুষ হিসেবে জন্ম মাত্র ৪ লক্ষ বার। তাহলে কোটি জন্মের কথা আসছে কোথা থেকে ? কোনো কথা বলার সময় একটু হিসেব করে বলা দরকার যে, সেটা বাজেকথা হয়ে যাচ্ছে না তো ?

এরপর বলা হয়েছে-

সুমেরু পর্বত সমান সোনা দান করলে যে ফল লাভ হয়, একটিমাত্র রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার শতগুন আধিক ফল লাভ হয়।

-যে ব্যক্তি এসব বাল ছাল লিখেছে, তার কোনো ধারণাই নেই যে সুমেরু পর্বত কত বড় ? সারা পৃথিবীতে যত সোনা আছে সমস্ত একত্রিত করলেও সুমেরু পর্বতের সমান হবে না। আর এত সোনা যার কাছে থাকবে সে নিশ্চয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হবে। এই পরিমান ধন দান করে সে পৃথিবীর বহু মানুষের উপকার করতে পারবে, এতে তার যে পুন্য হবে, তার চেয়ে শতগুন পূন্য নাকি হবে একটিমাত্র রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে ! 

এতগুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার, সনাতন ধর্মের প্রধান প্রধান যে গ্রন্থগুলো, যেমন- গীতা, বেদ, উপনিষদ, এসবে নেই কেনো ? দেশের গুরুত্বপূর্ণ আইনের বিধান কি, দেশের সংবিধান ছাড়া আইনের কোনো চটি বইয়ে থাকে ? আর আইনের কোনো চটি বইয়ে যদি এই রকম কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকেও, কিন্তু সেটা যদি সংবিধান মোতাবেক না হয়, তাহলে সেটা হাইকোর্ট বা সুপ্রীমকোর্ট মানতে বাধ্য কী ?

এরপর দুটি ধারায় যে বলা হয়েছে-

২. গঙ্গা ইত্যাদি সমস্ত পবিত্র তীর্থে স্নান করে যে ফল লাভ হয়, একমাত্র রাধাষ্টমী পালন করলে সেই ফল লাভ হয়।

৩. যে মূর্খ রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে না, সে শতকোটি কল্পেও নরক থেকে নিস্তার পেতে পারে না।

এসব সম্পর্কেও দেশের সংবিধান আইন সম্পর্কে উপরে যা বললাম, সেই একই কথা প্রযোজ্য, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার, অথচ সনাতন ধর্মের প্রধানগ্রন্থগুলোতে তার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত নেই, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক ? নিশ্চয় স্বাভাবিক নয়, আর যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটাই মিথ্যা।

সুতরাং এই রাধাষ্টমী সম্পর্কে ফটোপোস্টে যা বাজে বকা হয়েছে, তার যে কোনো ভিত্তি নেই, সেটা আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি বলে আমি মনে করছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 24 September 2020

রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?


রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থে প্রশ্ন করেছেন- এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে, আর আমি আজকে প্রশ্ন করছি- রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?

#Rayon_Chakrabarty নামে এক বইপোকা আছে, যার কাজ শুধু বই পড়ে পড়ে কোন বইয়ে কোন তথ্য আছে, সেটা প্রকাশ করা; অবশ্য এটা একদিক থেকে ভালো দিক যে- বিভিন্ন তথ্য যেহেতু সে প্রকাশ করে, সেহেতু বিষয়গুলো অনেকে জানতে পারে এবং সেগুলো নিয়ে নানারকম আলোচনা হয় ও লোকজন প্রকৃত সত্যের দিকে ধাবিত হতে পারে। কিন্তু এই বইপোকার সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা কম বা বলতে গেলে একেবারেই নেই। সে, যে গ্রন্থে যে তথ্য পায়, সেটাকেই সে সত্য মনে করে এবং সেটাকেই প্রচার করে, সেই তথ্য দ্বারা সমাজের উপকার হচ্ছে, না অপকার হচ্ছে, সেটা তার দেখার বিষয় নয়, তার ভিডিওগুলো দেখলে আমার এই কথা ই মনে হয়। এই বই পোকা আবার অনূকূল ঠাকুরের ভক্ত বা অনুসারী, যে অনুকূলকে তার ভক্ত শিষ্যরা পূর্ণব্রহ্ম বলে মনে করে, যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন; জগতে পূর্ণব্রহ্ম একজনই, তিনি হলেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, অন্য কারো পূর্ণব্রহ্ম হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই; কারণ, পূর্ণব্রহ্ম হওয়ার জন্য যে ক্ষমতা থাকতে হয়, সেটা শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কারো কাছে ছিলো না এবং কারো মধ্যে সেটা থাকাও সম্ভব নয়। কিন্তু এ নিয়ে এই বইপোকাকে কখনো কিছু বলতে শুনি নি, আর এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে যে তার জ্ঞান বুদ্ধি সবকিছু অর্থহীন।

শ্রীকৃষ্ণের যে প্রামাণ্য জীবনী- হরিবংশ এবং মহাভারত, সেখানে রাধার নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি হরিবংশ এবং মহাভারত একে অপরের পরিপূরক গ্রন্থ, শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে যে তথ্য হরিবংশে আছে, সেটা মহাভারতে নেই, আবার মহাভারতে যে তথ্য আছে, সেটা হরিবংশে নেই। এজন্য হরিবংশে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে বাল্যলীলার সবকিছু আছে, কিন্তু মহাভারতে আছে তার বাল্য ও কৈশোর লীলার পরবর্তী ঘটনাগুলো।

কোনো নারী যদি কোনো ব্যক্তির জীবনে থেকে থাকে, আর সেই ব্যক্তিকে নিয়ে যদি একাধিক গ্রন্থ থাকে, তাহলে বিভিন্ন গ্রন্থে সেই নারীর কাহিনী থাকবে, এককথায় ঐ নারীকে নিয়ে ঐ ব্যক্তির জীবনে অনেক বাস্তব ঘটনা থাকবে, যেটা প্রমাণ করবে যে -ঐ ব্যক্তির জীবনে ঐ নারীর অস্তিত্ব ছিলো। কিন্তু কৃষ্ণের জীবনে রাধাকে নিয়ে এমন কোনো ঘটনা বাস্তবিক আকারে নেই, যেটা প্রমাণ করে যে কৃষ্ণের জীবনে রাধা নামক কোনো নারীর অস্তিত্ব ছিলো, যার সাথে কৃষ্ণের প্রেম ভালোবাসা বা যৌনতার সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু এই বইপোকা সে সব বিষয় বিবেচনা না ক'রে কোথায় কোথায় রাধার নাম আছে, সেসব তথ্য তুলে ধরে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে- শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব আছে। এ সম্পর্কে একটি ভিডিও সে নেটে ছেড়েছে, তার লিঙ্ক এই প্রবন্ধের সাথে যুক্ত করে দিয়েছি, প্রয়োজনে সেটা দেখে নিতে পারেন, তার ভিডিওতে সে যেসব তথ্য দিয়েছে, সেগুলো আমি খণ্ডন করবো আজকের এ প্রবন্ধে-

আমি একটা কথা প্রায়ই বলি যে- গীতার সাতশত শ্লোক ছাড়া সনাতনী ধর্মীয় প্রায় সমস্ত গ্রন্থ কোনো না কোনোভাবে বিকৃত এবং কোনো কোনো গ্রন্থ তো অর্বাচীনদের দ্বারা লিখিত হয়ে সনাতন ধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত লাভ করে ফেলেছে, তাই এই সব গ্রন্থের কোনো একটির তথ্যের ভিত্তিতে কোনোভাবেই কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না; কোনো একটি গ্রন্থের তথ্যকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার আগে, পূর্বাপর সমস্ত তথ্যকে যাচাই বাছাই করে অর্থাৎ ক্রস চেক করে দেখতে হবে যে ঐ তথ্যটি সত্যই সঠিক কি না, তারপর সেটাকে গ্রহন করতে হবে।

বর্তমানে বৈষ্ণব মতবাদের গ্রন্থ ছাড়া প্রায় সমস্ত সনাতনী গ্রন্থ বেদব্যাসের নামে চলে, যেটা মোটেই সত্য নয়। ভাগবতে যে বলা হয়েছে অষ্টাদশ পুরাণ বেদব্যাস রচিত, সেটাও সত্য নয়। কারণ, অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের নামও আছে, কিন্তু কোনোভাবেই ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের মতো একটি- উদ্ভট, অবাস্তব ও অশ্লীল কাহিনীর বর্ণনা সমৃদ্ধ পুরাণ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ সম্পূর্ণ লম্পট চরিত্র, যে বেদব্যাসের হাতে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর হিসেবে বর্ণিত, সেই বেদব্যাসের হাতে এই পুরাণ কিছুতেই রচিত হতে পারে না। এই ভাগবতেই গৌতমবুদ্ধকে অবতার বলা হয়েছে, যে গৌতমবুদ্ধের জন্ম, বেদব্যাসের অন্তত ২৭০০ বছর পর, তাহলে সেই ভাগবত কিভাবে বেদব্যাসের হাতে রচিত হয়। তাছাড়াও এমন কাহিনি প্রচলিত আছে যে- ভাগবত রচনা ক'রে বেদব্যাস, তার পুত্র শুকদেবকে শোনান; শুকদেব, রাজা পরীক্ষিতকে শোনান, কিন্তু মহাভারতের একটি তথ্যে আছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগেই শুকদেব মারা গেছে, তাহলে সেই শুকদেব কিভাবে পরীক্ষিতকে ভাগবতের কাহিনী শোনায় ?

এই ভাগবতেই আছে রাসের নামে কৃষ্ণের যৌণলীলার কাহিনী, কিন্তু রাসের সময় কৃষ্ণের বয়স ছিলো মাত্র ৭ বা আট বছর, এই বয়সী একটি শিশু কিভাবে যুবতী নারীদের সাথে যৌণক্রিয়া করতে পারে, বা তার মাথায় এই ধরণের চিন্তা আসতে পারে ? যদি বলেন যে ঈশ্বরের পক্ষে সবই সম্ভব আর তার যৌণতার খুবই প্রয়োজন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ, ২৯ বছর বয়সে রুক্মিণীকে বিয়ে করতেন না, অনেক আগেই করতেন, আর তখন রুক্মিণীকে না পেলে, যদি রাধার সাথে শ্রীকৃষ্ণের কোনো সম্পর্ক থাকতো, তাহলে রাধাকেই বিয়ে করতেন; আর অবতারগণ এসেছিলেন যেহেতু লোকশিক্ষা দিতে, সেহেতু তারা এমন কোনো আদর্শ সৃষ্টি করবেন না, যে আদর্শের উদাহরণে তারা লম্পট হিসেবে আখ্যায়িত হবেন। তাই বিভিন্ন গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের জীবনে যেসব যৌনক্রিয়া বা লাম্পট্যের ঘটনা আছে, সেগুলো যে সত্য নয়, এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এসব সনাতনধর্ম ও কৃষ্ণ বিরোধীদের মিথ্যা প্রচারণার অংশ মাত্র।

যা হোক, এই বই পোকা, রাধার অস্তিত্ব বা কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণে যেসব রেফারেন্স দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো- নারায়ণ গীতি স্তোত্রের ১০ নং শ্লোক, সেখানে বলা হয়েছে-

"রাধাধর মধু রসিকা রজনী-কর-কূল-তিলকাঃ।

নারায়ণ নারায়ণ জয় গোবিন্দ হরে।

নারায়ণ নারায়ণ জয় গোপাল হরে।"

এটা কোনো সংস্কৃত শ্লোক নয়, এটি সম্পূর্ণ বাংলা শ্লোক, যা বৈষ্ণবদের দ্বারা রচিত, যে বৈষ্ণবদের কোনো কথাকে বিশ্বাস করা যায় না, এরা সনাতন ধর্মের সমস্ত সিস্টেমকে ধ্বংস করেছে, করছে।

এরপর ঐ যুক্তিহীন বই পোকা, সৌভাগ্যলক্ষ্মী তন্ত্র ১৩/৩ এর একটি রেফারেন্স দিয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয়েছে রাধানাথ। নাথ মানে স্বামী, তাই রাধানাথ মানে রাধার স্বামী। কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ছাড়া অন্য কোথাও বলা হয় নি যে শ্রীকৃষ্ণ রাধার স্বামী, আর আগেই বলেছি- ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বেদব্যাসের হাতে রচিত নয়, তাই এই তথ্য সম্বলিত সৌভাগ্যলকক্ষ্মী তন্ত্রের তথ্য যে মনগড়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এরপর মৎস্য পুরাণ ১৩/৩৮ এর একটি রেফারেন্স দিয়ে স্থূলচিন্তক এই বই পোকা বলেছে- "গঙ্গাপারে রতিপ্রিয়া, শিবকুণ্ডে শিবানন্দা, দেবিকাতটে নন্দিনী, দ্বারবতীতে রুক্মিণী, বৃন্দাবনে রাধা, মথুরায় দেবকী।"

-কিন্তু এই সকল নারী কি কৃষ্ণের সঙ্গিনী বা শয্যা সঙ্গিনী ? যদি তাই হয় তাহলে যে বলা হয়েছে মথুরায় দেবকী, তাহলে কি দেবকীও কৃষ্ণের শয্যা সঙ্গিনী ? নিশ্চয় নয়; কারণ, দেবকী হলেন শ্রীকৃষ্ণের জন্মদাত্রী মা। তাহলে নিশ্চয় এই শ্লোকটি দিয়ে যেসব নারীর কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে দিয়ে কৃষ্ণের শয্যাসঙ্গিনীর কথা বলা হয় নি, কোন নারী কোথায় ছিলো, সেটা বোঝাতে এই শ্লোকটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূত্রে রাধা যে বৃন্দাবনে ছিলো, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। কৃষ্ণের ছোটবেলার সঙ্গী সাথীদের মধ্যে যে রাধা বলে একজন ছিলো, সেটা তো আমি অস্বীকার করি না, আমি যেটা অস্বীকার করি, সেটা হলো যুবক কৃষ্ণের সাথে যুবতী রাধার যে প্রেম-ভালোবাসার কথা বলা হয়, সেটা। মৎস্যপুরাণের এই শ্লোকটি কি রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম ভালোবাসাকে প্রমাণ করে ? কোথাও রাধার নাম থাকলেই যে সেটা কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে, ব্যাপারটা তো এমনও নয়।

এরপর রায়ণের দেওয়া একটি রেফারেন্স হলো- অচ্যুতাষ্টকম এর ৪ নং শ্লোক, যেখানে বলা আছে, "দেবকীতনয় দুঃখদবাগ্নে, রাধিকারমণ রম্য-সুমূর্ত্তে।"

-এই গ্রন্থটি কার লেখা ? এটি কি বেদব্যাস রচিত ? কমা (,) এবং হাইফেন (-) দ্বারা লিখিত শ্লোকটি যে আধুনিক যুগে কারো দ্বারা রচিত, সেটা নিয়ে কি আর বেশি কিছু বলার দরকার আছে ? প্রাচীন বাংলা বা সংস্কৃত ভাষায় কমা, হাইফেন বলে কিছু ছিলো না, এগুলো গদ্য লিখার সুবিধার্থে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ইংরেজি থেকে ধার করেন। এই সব বিরামচিহ্ন সহযোগে লিখিত শ্লোকে রাধিকারমণ শব্দ ব্যবহার করে শ্রীকৃষ্ণকে রাধার সেক্স পার্টনার প্রমাণ করা চেষ্টা করা হয়েছে, এই সব রচনার উদ্দেশ্য কী ? রায়ণ তার ভিডিওর এক স্থানে বলেছে, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ব্রহ্মার পৌরহিত্যে রাধা ও কৃষ্ণের বিয়ে হয়েছে, তাহলে তাদের মধ্যে যৌনসম্পর্ক হলে সমস্যা কী ? 

আমার ধারণা, রায়ণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ঠিকমতো পড়ে নি, পড়লে জানতো পারতো যে, যখন রাধা ও কৃষ্ণের বিয়ে দেখানো হয়েছে ঐ পুরাণে, তার অনেক আগে থেকে রাধা ও কৃষ্ণের যৌনতার কথা বলা হয়েছে, নিশ্চয় বিয়ের আগে যৌনতা ভালো কোনো বিষয় বা ভালো কোনো উদাহরণ নয় মানুষের জন্য, যেহেতু কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিলো লোকশিক্ষা দিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর রাধার সাথে যদি কৃষ্ণের বিবাহই হয়, তাহলে সেটা হরিবংশে বা মহাভারতে উল্লেখ নেই কেনো ? বিয়ে কোনো মানুষের জীবনে সাধারণ ঘটনা নয়, ভীষণ উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা, যে ঘটনা মানুষের সারাজীবনে নানাভাবে প্রভাব ফেলে, সেই বিয়ের ঘটনা, কৃষ্ণের উল্লেখযোগ্য দুটি জীবনীর একটিতেও নেই, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক ? এর চেয়েও এখানে বড় প্রশ্ন হলো- কৃষ্ণ, ১০+ বছর বয়সে বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় চলে যান, পরে আর কোনো দিন বৃন্দাবনে ফিরে যান নি, রাধারও বৃন্দাবনের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে, যুবক কৃষ্ণের সাথে যুবতী রাধার দেখা হয়েছিলো কখন, আর তাদের মধ্যে প্রেম বা বিয়েও হয়েছিলো কখন ? আগেই বলেছি, বিয়ে কোনো মানুষের জীবনে সাধারণ ঘটনা নয়, বলরামের সাথে রেবতীর এবং কৃষ্ণের সাথে রুক্মিনীর বিয়ে মহাধুমধামে সকল আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে হয়েছিলো, রাধা ও কৃষ্ণের বিয়েতে কে কে উপস্থিত ছিলো ? কে কন্যাদান করেছিলো ? শুধু হুট করে একটি কথা বললেই হয় না, সেই কথার সাপেক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রমাণও থাকতে হয়। আর যেটা বাস্তব ঘটনা তার সাপেক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রমাণ থাকেও। রাধার সাথে কৃষ্ণের বিয়ের ঘটনা যেহেতু বাস্তব নয়, তাই একটি উদ্ভট ও অশ্লীল পুরাণ ব্যতীত, তার স্বপক্ষে কোথাও কোনো যুক্তি বা বাস্তব ঘটনার প্রমাণ নেই।

এরপর রাধাতন্ত্র এর ১৬/৭ নং শ্লোকের রেফারেন্স রায়ণ দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, "রাধিকা কৃষ্ণ বল্লভা"

-যেখানে হরিবংশ এবং মহাভারতে রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম বিবাহ যৌনতার বিষয়ে কিছু বলা হয় নি, এমনকি গৌতমবুদ্ধের জন্মের পর রচিত ভাগবতেও রাধা সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই; কারণ, ঐ সময় রাধার কাল্পনিক কাহিনীর ডালপালাগুলো মেলে নি, সেখানে রাধাতন্ত্র নামে এই গ্রন্থটি কে রচনা করলো, এটি কার হতে রচিত হলো ? রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম বিবাহ যৌনতার কথা প্রথম পাওয়া যায় ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে, বিশেষজ্ঞদের মতে যেটা কোনোভাবেই ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের আগের রচিত নয়, যার কাহিনীর উপর ভিত্তি করে সংস্কৃত কবি জয়দেব রচনা করে গীত গোবিন্দ, বাংলা কবি বড়ুচণ্ডীদাস লিখে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, আর চৈতন্য পূর্ববর্তী মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবিরা লিখে বৈষ্ণব পদাবলী, সুতরাং কৃষ্ণের সাথে রাধার নাম জড়িয়ে লেখা রাধাতন্ত্র যে চৈতন্যপন্থীদের হাতে রচিত, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে ? আর চৈতন্যপন্থীরা তো বরাবরই মূর্খ, এরা প্রকৃত সত্যকে ধরতে পারে না, আর প্রকৃত সত্যকে বোঝেও না। এজন্যই তো এরা হরিবাসর বা হরিসভার নামে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সম্পর্কিত লীলাকীর্তনের প্রচার করে হিন্দুসমাজটাকে রসাতলে নিয় গেছে, যাচ্ছে। এদের হাতে রচিত গ্রন্থ দ্বারা আপনি কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, আপনার জ্ঞান বুদ্ধি বা সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা যে কতটুকু, সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন ?

এরপর যমুনাষ্টকস্তোত্র ৬ নং শ্লোকের রেফারেন্স দিয়ে "রাধিকাঙ্গ" শব্দ দ্বারা আপনি রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতেই কি প্রমাণ হয় যে- শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধা আছে ?

এরপর গর্গসংহিতা দ্বারকাখণ্ড ১৭/১৮ শ্লোকের রেফারেন্স দিয়ে রায়ণ দেখিয়েছে-

"রুক্মিণী কহিলেন, হে বৃষভানুনন্দিনী রাধে! তুমি ধন্যা, তোমার ভক্তিভাবে এই কৃষ্ণ বশীভূত হইয়াছেন। যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে, সেই কৃষ্ণ তোমারই কথা সর্বদা কহিয়া থাকেন।"

-এখন বাস্তবতার দৃষ্টিতে এই দৃশ্যটির কথা কল্পনা করুন। যদি কোনো পুরুষ সব সময় কোনো নারীর কথা ভাবে, তার কথা বলে, তাহলে এটাই প্রমাণ হয় যে, সেই পুরুষ, সেই নারীর প্রেমে উন্মত্ত। এই ধরণের কোনো পুরুষের প্রতি, তার স্ত্রীর প্রেম-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-ভক্তি কিছুই থাকতে পারে না। সেই নারী, সব সময় তার স্বামীকে নিয়ে বিরক্তিতে থাকবে, স্বামীর সাথে ঝগড়াঝাটি করবে, প্রয়োজনে মারপিটও করবে, যেহেতু তার স্বামী তাকে ছাড়া অন্য নারীকে নিয়ে ভাবছে, তার কথা বলছে। এই পরিস্থিতিতে সেই নারী কি, তার স্বামীর গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে এই ধরণের কথা বলতে পারে যে- তুমি ধন্যা, তোমার প্রেমে আমার স্বামী বশ হয়েছে ? 

পৃথিবীর এমন কোনো নারী নেই যে, তার প্রেমিকের স্ত্রীর সাথে নিজে গিয়ে দেখা করার সাহস রাখে। এসব ক্ষেত্রে স্বামীর লুচ্চামি টের পেলে, স্ত্রীরাই খোঁজ নিয়ে তার স্বামীর প্রেমিকার সাথে দেখা করে তাকে সাইজ করে, তার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না, আর বলে না যে- তুমি ধন্যা। বরং এমন কথা বলে যে, তুই যদি আমার স্বামীর দিকে নজর দিস, তোর চোখ আমি তুলে নেবো, আর যদি আমার স্বামীর দিকে দিকে হাত বাড়াস তোর হাত আমি ভেঙ্গে ফেলবো বা কেটে নেবো। এছাড়াও কৃষ্ণ যদি সব সময় রাধার কথাই ভাবে, রাধার কথাই বলে থাকে, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মীদের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার ভাবনা ভেবেছে কখন, আর তার জন্য কাজ করেছে কখন, এটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে- শ্রীকৃষ্ণের পৃথিবীতে অবতরণের উদ্দেশ্যই হলো দৃষ্কুতকারীদেরকে বিনাশ করে, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা, প্রেম করা নয়।

আচ্ছা, যদি ধরেও নিই যে গর্গসংহিতার বর্ণনাটি সত্য, তাহলে এটা প্রমাণ হয়ে যে- নিজের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও রাধার দিকে মন দেওয়ায় কৃষ্ণ লম্পট। তো ঘটনাটি সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, গর্গসংহিতার রেফারেন্স টেনে এনে আপনি কি কৃষ্ণকে লম্পট প্রমাণ করতে চাইছেন না ? যদি তাই হয়, সনাতন ধর্ম ও সমাজের ব্যাপারে আপনার উদ্দেশ্য কি সৎ ? আপনার পিতার জীবনে যদি কোনো নারী কেলেঙ্কারী থাকে, সেটাকে আপনার চাপা দেওয়া উচিত, না প্রকাশ করা উচিত ? আর যদি আপনার পিতার জীবনে কোনো নারী কেলেঙ্কারী না থাকে, কিন্তু কেউ যদি সেরকম কোনো কথা বলে, তাহলে আপনার কী করা উচিত ? তাকে দমন করা, না তার প্রশংসা করা ? যদি আপনি আপনার পিতার আদর্শ পুত্র হন, আপনি চেষ্টা করবেন জন মানসে আপনার পিতার একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে, যদি কোনো স্ক্যান্ডাল তার জীবনে থেকে থাকে, সেগুলোকে চাপা দিতে। আর এর বিপরীত কিছু করে যদি আপনি আপনার পিতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন, তাহলে আপনি আদর্শ পুত্র নয়, আপনি কুলাঙ্গার। 

শ্রীকৃষ্ণ হলেন এই জগতের পিতা, সেই কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণের অপচেষ্টা করতে গিয়ে গর্গসংহিতার রেফারেন্স তুলে ধরে আপনি কি সেই কুলাঙ্গার পুত্রের ভূমিকা পালন করেন নি বা করছেন না ?

এছাড়াও রুক্মিণী যদি বলে থাকেন- "যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে", এটা শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাবের বহু পরে মোটামুটি আধুনিক যুগের কথা হতে পারে, কোনোভাবেই শ্রীকৃষ্ণের যৌবন কালের কথা নয়; কারণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বপর্যন্ত অখণ্ডভারতের বেশির ভাগ মানুষ শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান বা ঈশ্বর মনে করতো না, তাই যে কৌরবদের এত কুকীর্তি দেশজুড়ে পরিচিত ছিলো, সেই কৌরবপক্ষে দেশের অধিকাংশ রাজা যোগ দিয়েছিলো, যার ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নেওয়া মোট ১৮ অক্ষৌহিনী সৈন্যের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে ছিলো মাত্র ৭ অক্ষৌহিনী সৈন্য। বর্তমানেও যেখানে প্রায় সব হিন্দু বিশ্বাস করে যে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর, তারপরও পৃথিবীর প্রায় ৮০% মানুষ শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করে না। আর সেই সময় শ্রীকৃষ্ণের যখন যৌবন কাল, তখন রুক্মিণী এই কথা বলতে পারেন না যে- যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে! কারণ, মর্ত্যের তখন অর্ধেক লোকও কৃষ্ণের কথা কীর্তন করতো না। এই তথ্য থেকে এটা প্রমাণ হয় যে, হয় গর্গসংহিতাকে বিকৃত করে রুক্মিণী ও রাধা সংক্রান্ত এই কথাগুলো চৈতন্য আন্দোলনের পর ঢুকানো হয়েছে, না হয় গর্গসংহিতা নাম দিয়ে কোনো চৈতন্যপন্থী এই গ্রন্থ রচনা করে তাকে সনাতনী শাস্ত্র বলে চালিয়ে দিয়েছে।

যা হোক- এইসব চুলচেরা বিশ্লেষণে, বাস্তবতার নিরীখে, গর্গসংহিতার এই বর্ণনাটি যে কোনোভাবেই সত্য হতে পারে না, এটি প্রমাণিত, তাই এর কোনো মূল্য নেই।

এরপর নারদপাঞ্চরাত্র-২/৩/৫০,৫১ তে বলা হয়েছে,

"রাধিকার উপাখ্যান অপূর্ব, গোপনীয়, সুদুর্লভ, সদ্যোমুক্তিপ্রদ, পবিত্র, বেদের সারভূত ও পুণ্যপ্রদ।"

-তো রাধিকার উপাখ্যান মানেই তো ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বর্ণিত রাধা ও কৃষ্ণের অবৈধ, অনৈতিক, পরকীয়া প্রেম ও যৌনতা; কারণ, উভয়েরই স্বামী ও স্ত্রী আছে, চটিগল্প হিসেবে এটা অবশ্যই অপূর্ব, গোপনীয় নয় মোটেই, সুদুর্লভও নয়, সদ্যমুক্তিপ্রদ কিভাবে হতে পারে, সেটা আমার বোধের অতীত, আর এটা যদি পবিত্র হয়, পৃথিবীতে অপবিত্র সম্পর্ক বলে কিছু নাই; আর এটা যদি পূণ্যপ্রদ হয়, তাহলে পৃথিবীতে পাপ বলেও আর কিছু নাই; এছাড়াও এটা যদি বেদের সারভূত হয়, তাহলে বেদে রাধা ও কৃষ্ণ সম্পর্কিত কোনো উপাখ্যান পর্যন্ত নেই কেনো? বেদে শ্রীকৃষ্ণের নাম পর্যন্ত নেই, এক স্থানে কৃষ্ণ শব্দটি আছে, কিন্তু সেটা কোনো একজন ঋষির নাম হিসেবে, পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ হিসেবে নয়। আবার বেদে কয়েক জায়গায় অবশ্য- রাধা, রাধস টাইপের কিছু শব্দ আছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো দিয়ে কোনো মানবীকে বোঝায় না, বোঝায় ধন সম্পদ, তাই রাধার ভক্তরা বেদের সেই শব্দের কথা বলে আবার রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না, তাহলে আপনাদের মুখ কিন্তু কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

যা হোক, নারদপাঞ্চরাত্র নামের এই বালছাল কে লিখেছে ? যেখানে শিবের মুখ দিয়ে কৃষ্ণের কাল্পনিক লাম্পট্যকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে কৃষ্ণের চরিত্রকে কলুষিত করার অপচেষ্টা করেছে ? শ্রীকৃষ্ণ যেখানে ঈশ্বর হিসেবে সনাতনধর্মীয় গ্রন্থে প্রমাণিত, সেখানে এই সব বাল ছাল লিখে কি শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে কলঙ্কিত করা যাবে, আর সেগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে ? এগুলোকে বিশ্বাস করতে পারে রায়ণের মতো স্থিরবুদ্ধির কিছু লোকজন, যাদের সত্য মিথ্যা বোঝার কোনো ক্ষমতা নেই, বইয়ে যা পড়ে সেটাকেই সত্য বলে ধরে নিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করে।

এরপর পদ্মপুরাণ পাতাল খণ্ড ৩৮/১২০ এ বলা হয়েছে-

"তাঁহার প্রিয়তমা কৃষ্ণবল্লভা রাধিকাই আদ্যা প্রকৃতি। সেই রাধিকার কোটি কোটি কলাংশ হইতেই ত্রিগুণময়ী দুর্গা প্রভৃতি দেবীগণের উৎপত্তি। ঐ রাধিকার পাদধূলি স্পর্শে কোটি বিষ্ণুর উৎপত্তি হইয়া থাকে।"

পদ্মপুরাণের এই শ্লোকগুলো যিনি লিখেছেন, হয় তার সনাতনধর্মীয় দেবতত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা ছিলো না, নয় তো ইচ্ছে করেই রাধাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে এই বিকৃতি তিনি ঘটিয়েছেন। সাধারণভাবেই আমরা জানি যে- আদ্যাশক্তি হলেন মহামায়া, যিনি দেবীদুর্গা, যার আরেক রূপের নাম মহাকালী। সৃষ্টির মূল হলেন বিষ্ণু, বিষ্ণুর ধ্বংসকারী রূপের নাম শিব এবং শিবের নারী শক্তি হলেন দুর্গা বা কালী যিনি মহামায়া নামে পরিচিতা, যাকে বলা হয় আদ্যাশক্তি। পদ্মপুরাণের এই শ্লোকে রাধাকে আদ্যাশক্তি বানিয়ে তার কোটি কোটি কলাংশ হতে দেবীগণের উৎপত্তি দেখানো হয়েছে এবং রাধিকার পাদধূলি থেকেই নাকি কোটির বিষ্ণুর উৎপত্তি হয়েছে। তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে- রাধিকার পাদধূলি থেকে যদি কোটি বিষ্ণুর উৎপত্তি হয়, তাহলে আমরা তো এক বিষ্ণুকে চিনি বা জানি, অন্য বিষ্ণুগণ কোথায়, কী করছে ? আর আদ্যাশক্তি শব্দটির দিকে খেয়াল করুন, এর মধ্যে শক্তির একটি ব্যাপার আছে, যে শক্তির পরিচয় আমরা দুর্গা বা কালীর মধ্যে দেখতে পাই, রাধার মধ্যে কি সেই শক্তির কোনো ব্যাপার আছে ? যদি না থাকে তাহল তাকে আদ্যাশক্তি বলা হচ্ছে কেনো ?

শ্রীকৃষ্ণের এক লীলায়- ব্রহ্মা একবার, শ্রীকৃষ্ণের সকল সঙ্গী সাথীকে ঘুমে অচেতন করে চুরি করে নিয়ে যায়। এটা বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণ একাই তার সকল সঙ্গী সাথীতে রূপান্তরিত হয়ে সব জায়গায় বিরাজ করতে থাকে, এভাবে এক বছর কেটে গেলে ব্রহ্মা বৃন্দাবনে এসে দেখে শ্রীকৃ্ষ্ণ আগের মতোই সে তার সঙ্গী সাথী দেরকে নিয়ে খেলাধূলা করছে। এটা দেখে ব্রহ্মা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে এটা কিভাবে সম্ভব ? ব্রহ্মার উপস্থিতিতেই হাজার হাজার ব্রহ্মা চারদিক থেকে আসতে থাকে, এটা দেখে আরও অবাক হয়ে ব্রহ্মা বলে- আমিই তো ব্রহ্মা, তাহলে এত সব ব্রহ্মা কোথা থেকে আসছে ?

এরপর শ্রীকৃষ্ণ, নিজেকে বিষ্ণুতে পরিণত করে বলে- চতুর্মুখী ব্রহ্মা, তুমি তো কেবল একটি ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা, কিন্তু এই সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে, যাদের রচয়িতারা তোমার থেকেও বহুগুণ বেশি জ্ঞানী ও শক্তিশালী, আর তারা সবাই আমার অধীনস্থ, আমার নির্দেশেই তারা কাজ করে এবং আমিই সেই সবগুলো ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক; আজ তোমার অবস্থান তোমাকে বোঝানোর জন্য সেই সকল ব্রহ্মাকে এখানে আহ্বান করেছি, যাদেরকে তুমি তোমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছো। এরপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের নিকট ক্ষমা নিয়ে ফিরে যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের খেলার সঙ্গীসাথীদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেরত দিয়ে যায়।

এছাড়াও গীতার ৯/১৭ তে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ।

যার অর্থ : আমিই এই জগতের পিতা মাতা, বিধাতা ও পিতামহ।

গীতার এই বাণী এবং শ্রীকৃষ্ণের ঐ লীলা থেকে বোঝা যায়, শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণুই এই মহাবিশ্বের মূল, তিনিই সবার সৃষ্টিকর্তা বা নিয়ন্তা। অথচ পদ্মপুরাণ মতে- এই বিষ্ণুর মতো কোটিকোটি বিষ্ণু নাকি রাধিকার পাদধূলি থেকে উৎপন্ন ! স্বল্পমাত্রা গাঁজা অবশ্যই উপকারী, কিন্তু বেশি মাত্রা গাঁজা এই রকম অসম্ভব এবং অবাস্তব সব কল্পনার জন্ম দিয়ে থাকে, যার জন্য বলা হয়- গাঁজার নৌকা পাহাড় বাইয়া যায়। পদ্মপুরাণের লেখক বা এর বিকৃতকারীরা নিশ্চয় অধিক মাত্রায় গাঁজা সেবনে অভ্যস্ত ছিলেন। না হলে যে বিষ্ণু সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক, সেই রকম কোটি কোটি বিষ্ণুর জন্মদাতা রাধা, এক কৃষ্ণের সাথে মিলনের ক্ষমতা রাখে না, তাকে সারাজীবন ধরে কৃষ্ণ বিরহে পুড়তে হয় ? ব্যাপারটা এমন- হাজার হাজার মন চাউলের মালিক সারা বছর ধরে এক প্লেট ভাতের জন্য ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই সে সেটা পাচ্ছে না, ব্যাপারটি বাস্তব ? এই ব্যাপার যদি বাস্তব না হয়, তাহলে রাধার পাদধূলি থেকে কোটি কোটি না হোক, অন্তত একজন বিষ্ণুর উৎপত্তিও সম্পূর্ণ অবাস্তব, সেই সাথে অবাস্তব রাধার কোটি কোটি কলাংশ হতে দেবীগণের উৎপত্তির বিষয়টিও। এবং এসব কারণেই পদ্মপুরাণের ঐ শ্লোকের বক্তব্য সম্পূর্ণ- মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং অবাস্তব; যাকে রায়ণের মতো বইপোকারা বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু যুক্তিবাদীদের পক্ষে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

এরপর স্কন্দপুরাণ, প্রভাষখণ্ড, দ্বারকামহাত্ম্য- ১২/৩০ নং শ্লোকে "রাধোবাচ" শব্দ দ্বারা রায়ণ রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, যদিও এতে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, কিন্তু তাতেই কি শ্রীকৃষ্ণের পাশে বা শ্রীকৃ্ষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় ?

এরপর স্কন্ধপুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, শ্রীভাগবত মাহাত্ম্য ২/১১ এর রেফারেন্সে বলা হয়েছে- "কালিন্দী বলিলেন- আত্মারাম কৃষ্ণের আত্মা রাধিকা, আমি তাঁহার দাসী, তাঁহার দাস্য প্রভাবেই কাতরতা আমাকে স্পর্শ করিতে অসমর্থ।"

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে এই কালিন্দী শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান ৮ স্ত্রীর একজন, আমি কৃষ্ণের জীবনে রুক্মিণী ছাড়া অন্য কোনো নারীকে স্বীকার করি না, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে কালিন্দী, কৃষ্ণের স্ত্রী, তার মানে কৃষ্ণের জীবনে রুক্মিণীর মতোই কালিন্দীরও প্রভাব ছিলো। সেই কালিন্দী যদি রাধার দাসী নিজেকে মনে করে, যেকারণে কোনো প্রকার কাতরতা তাকে স্পর্শ করতে না পারে, তাহলে তার বাস্তবায়ণের জন্য তো রাধাকে দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের বাসভবনে থাকতে হবে, এরকম ঘটনার উল্লেখ কি কোথাও আছে যে- রাধা, দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের বাসভবনে গিয়ে বাস করেছে ?

এছাড়াও যেকোনো স্ত্রী, নিজেকেই তার স্বামীর আত্মা মনে করে, অন্য কোনো নারীকে নয়। যদি কোনো নারী এটা জানতে পারে যে, তার স্বামীর আত্মা অন্য কোনো নারী, তাহলে সেই নারীর পক্ষে সেটা সহ্য করা অসম্ভব, সেক্ষেত্রে গর্গসংহিতা প্রসঙ্গে রুক্মিণী ও রাধার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে উপরে যা বলেছি, সেই একই কথা এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার মানে কালিন্দী ও রাধা সম্পর্কে এই পুরাণে যা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

এরপর বরাহপুরাণের ১৬৪/৩৩,৩৪ নং শ্লোকে যে রাধাকুণ্ড এবং অরিষ্টকুণ্ডের কথা বলা হয়েছে, তার কাহিনী হলো- কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে, তখন কংসের নির্দেশে অরিষ্টাসুর নামে এক বিশালাকৃতির ষাঁড়, কৃষ্ণকে হত্যার জন্য বৃন্দাবনে কৃষ্ণের পাড়ায় গিয়ে তাণ্ডব শুরু করে। এই সংবাদ পেয়ে কৃষ্ণ নিজের পাড়ায় উপস্খিত হয়ে বিশালাকৃতির ঐ ষাঁড়কে হত্যা করে। কিন্তু যেহেতু এটি ছিলো ষাঁড় অর্থাৎ গরু, সেহেতু রাধা এবং তার সখীরা কৃষ্ণকে বলে, এই অরিষ্টাসুরকে হত্যার জন্য তার গোহত্যা পাপ হয়েছে, এই পাপমোচনের জন্য তাকে পৃথিবীর সমস্ত পবিত্র নদীতে গিয়ে স্নান করতে হবে। কৃষ্ণ বলে ঠিক আছে, সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে সমস্ত পবিত্র নদীতে স্নান করার পরিবর্তে সব পবিত্র নদীকে এখানে এনে স্নান করে নেবো। এরপর কৃষ্ণ তার পা দিয়ে মাটিতে একটা আঘাত করে, ফলে একটি পুকুর বা কুণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতে শুরু করলে পবিত্র নদীরূপ দেবী, যেমন- গঙ্গা, কাবেরি, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, যমুনা- সেখানে উপস্থিত হয় এবং সবাই জলরূপে ঐ পুকুরে পতিত হয়, এভাবে ঐ পুকুরটি জলে ভরে উঠে, তাতে শ্রীকৃষ্ণ স্নান করে রাধা এবং তার সখীদের দাবী মতো নিজেকে পাপ মুক্ত করে এবং শ্রীকৃষ্ণ ঐ কুণ্ডের নাম দেয় শ্যামকুণ্ড।

তারপর শ্রীকৃষ্ণ, রাধা এবং সঙ্গিনীদের বলে অরিষ্টাসুরের পক্ষ নিয়ে কথা বলে তোমরাও পাপ করেছো, এই কুণ্ডে স্নান করে তোমরাও পাপমুক্ত হয়। জবাবে শ্রীকৃষ্ণের চিরশত্রু রাধা বলে, তুমি স্নান করেছো বলে ঐ কুণ্ডের জল অপবিত্র হয়ে গেছে, আমরা নিজেরাই আরেকটি কুণ্ড বানিয়ে নিয়ে তাতে স্নান করবো। তারপর রাধা এবং সখীরা অরিষ্টাসুরের তাণ্ডবে তার পায়ের আঘাতে যেখানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো, সেখান থেকে আরো মাটি খুঁড়ে তুলে ফেলে ছোটখাটো একটি পুকুর বানিয়ে ফেলে, কিন্তু জল পাবে কোথা থেকে ? কৃষ্ণের এই প্রশ্নের জবাবে রাধা বলে পাশের যমুনা নদী থেকে তারা কলসী দিয়ে জল এনে এই পুকুর ভরাবে। এর পর তারা কয়েকজনে মিলে কয়েক কলসী জল এনে ঐ পুকুরে ঢালেও, কিন্তু তারা বুঝতে পারে এইভাবে পুকুর ভরাতে গেলে তাদের সারাজীবন লেগে যাবে, এই ভেবে যখন তারা হতাশ হয়ে বসে পড়ে, তখন কৃষ্ণের নির্দেশে পূর্বোক্ত ৬ জন দেবী আবার জলরূপে রাধারকুণ্ডে পতিত হয়। তখন কৃষ্ণ বলে তোমার কুণ্ড তো আমার কুণ্ডের চেয়ে বেশী সুন্দর, এই বলে কৃষ্ণ রাধাকুণ্ডে নেমে পড়ে এবং বলে প্রতিদিন সে এই কুণ্ডে নেমে স্নান করবে, এর ফলে রাধাও আগের ঝগড়াঝাটি ভুলে কৃষ্ণকে বলে তোমার কুণ্ডও খুব সুন্দর, আমিও তোমার কুণ্ডে নেমে প্রতিদিন স্নান করবো। এই ভাবে সৃষ্টি হয় শ্যামকুণ্ড ও রাধাকুণ্ড, যেটা শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের ঘটনা। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালে বৃন্দাবনে কৃষ্ণের সমবয়সীদের মধ্যে যে রাধা নামে কেউ ছিলো সেটা তো আমি অস্বীকার করি না, যেটা আগেই বলেছি। আমার আপত্তি শুধু যুবক কৃষ্ণের পাশে যুবতী রাধাকে দাঁড় করিয়ে কৃষ্ণের স্বর্গীয় মহিমাকে কলঙ্কিত করায়।

যা হোক, বরাহ পুরাণের এই ঘটনাটি কি প্রমাণ করে যে যুবক কৃষ্ণের জীবনে যুবতী রাধার কোনো অস্তিত্ব আছে বা কৃষ্ণের সাথে রাধার প্রেম ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিলো ?

শেষে দেবীভাগবতের একটি রেফারেন্স দিয়ে লেখাটি শেষ করবো, ইচ্ছে করেই এই আলোচনাটিকে আমি শেষে রেখেছি, বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে-

দেবীভাগবতের ৯/৫০/১৬ তে বলা হয়েছে- রাধিকার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না। সুতরাং সকল বৈষ্ণবেরই রাধার পূজা করা অবশ্য কর্তব্য। এই অনুবাদ যে ভুল বা সঠিক নয়, এমনটি বলা যাবে না; কারণ, শ্লোকের মধ্যেই বলা আছে, "বৈষ্ণবৈঃ সকলৈস্তস্মাং কর্ত্তবং রাধিকার্চ্চনম।"

বৈষ্ণব শব্দের উৎপত্তির দুটো সোর্স আছে, প্রথমত যারা বিষ্ণুর ভক্ত, তাদরেকে বলে বৈষ্ণব; দ্বিতীয়ত যারা চৈতন্যদেবের অনুসারী, তাদেরকে বলে বৈষ্ণব বা বৈরাগী। যদি এই শ্লোকটি বিষ্ণুর ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলা হতো, তাহলে এখানে বৈষ্ণব শব্দটাই ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়তো না; কারণ, থিয়োরি অনুযায়ী সকল সনাতনী ই বিষ্ণুর ভক্ত, সেই হিসেবে সবাই বৈষ্ণব, আর বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট কোনো কাহিনীতে রাধার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শ্লোকটি শুধুমাত্র চৈতন্যদেবের অনুসারী বৈষ্ণবদের উদ্দেশ্যে রচিত, যেকারণে বলা হয়েছে- "রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না। সুতরাং সকল বৈষ্ণবেরই রাধার পূজা করা অবশ্য কর্তব্য।" এ থেকে এটা প্রমাণ হয় যে- দেবী ভাগবতের এই শ্লোকটি কোনো চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবের হাতে রচিত, না হলে- যে রাধার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে শুধু কালিমালিপ্তই করা হয়, সেই রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না, এমন কথা বলতে পারতো না।

সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত জ্ঞান হলো গীতা, আর সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত বিষয় হলো শ্রীকৃষ্ণ, যেকারণে গীতায় বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকে জানা ই হলো চুড়ান্ত জ্ঞান। এই চুড়ান্ত শ্রীকৃষ্ণের পূজা রাধার পূজা ব্যতীত হবে না, যদি এটা সত্য হতো, তাহল নিশ্চয় সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত থিয়োরি গীতায় অবশ্যই এ ব্যাপারে কিছু না কিছু বলা থাকতো বা ইঙ্গিত থাকতো, কিন্তু সেরকম কি কিছু আছে ? নেই। তাহলে সনাতন ধর্মের শেষ কথা গীতায়, যেখানে শ্রীকৃষ্ণের পূজার আগে রাধার বা অন্য কারো পূজার বিষয়ে কিছু বলা নেই, সেখানে দেবী ভাগবত নামের একটি পুরাণ, যার মূল বর্ণিত বিষয় হলো দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা, সেখানে হুট করে দু একটি শ্লোকে এরকম কথা বলা কি অযৌক্তিক বা অসঙ্গত নয় ?

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনী মোটামুটি কমবেশি সবাই জানে। সেখানে কোনো এক অখ্যাত লেখকের অখ্যাত গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যদি এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কিন্তু সেই তথ্য যদি আগের জানা তথ্যগুলোর সাথে ম্যাচ না করে, তাহলে লোকজন সেই অখ্যাত লেখকের অখ্যাত গ্রন্থের কথাকে বিশ্বাস করবে ? দেবী ভাগবতে রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার ব্যাপারটাও সেরকম। যে শ্রীকৃষ্ণ মানবের মুক্তিদাতা, তার সম্পর্কে এতবড় একটি তথ্য, সনাতন ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থ, যেমন- গীতা, বেদ, মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদ কোথাও নেই, আছে এক অপ্রচলিত পুরাণে, তাহলে সেই কথা কি মেনে নেওয়া যায় ?

গীতার শেষ উপদেশ হিসেবে অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৫৭ এবং ৬৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

"তুমি মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পন করিয়া, মৎপরায়ণ হইয়া, সাম্যবুদ্ধির যোগ অবলম্বন করিয়া সর্বদা আমাতে চিত্ত রাখো এবং যথাধিকার কর্ম করিতে থাকো। তুমি একমাত্র আমাতেই মন দাও, আমাকে ভক্তি করো, আমাকে পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো, … তুমি নিশ্চয় আমাকেই পাইবে।"

কৃষ্ণের জীবনে রাধা যদি এত গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হতো এবং রাধাকে পূজা না করলে যদি শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার না থাকতো, তাহলে কি কৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার এই উপদেশগুলো দিতেন ? আর রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজা ফলবান না হলে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর নয়, রাধাই পরমেশ্বরী হয়; কিন্তু রাধার পরমেশ্বর হওয়ার পেছনে সনাতন ধর্মের প্রামান্য কোনো গ্রন্থে কি তার কোনো রেফারেন্স আছে ? নাই। তাহলে দেবীভাগবতের এই সব কথা যে ভিত্তিহীন, সেটা কি এখনও চোখে আঙ্গুলের গুতা দিয়ে রায়ণ এবং রায়ণের মতোদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে ?

শুধু দেবী ভাগবতের এই শ্লোকটি নয়, সনাতন ধর্মীয় যেসব গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের পাশে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, সেসবই যে চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের কারসাজি সেটা বোঝানোর জন্যই দেবী ভাগবতের এই আলোচনাটিকে আমি শেষে রেখেছিলাম।

যে ভিডিও বক্তব্যর উপর ভিত্তি করে এই প্রবন্ধটি লিখেছি, তার লিঙ্ক-

https://www.youtube.com/watch?v=5hsoW2kwWYc&feature=share&fbclid=IwAR0-pNFbdJHnpDVrwovS_7mrojMgBOrmTaKdqVyGVkpwzCcSLWmAKwqrxX8

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 28 August 2020

রাধার পোস্টমর্টেম :



রাধার পোস্টমর্টেম :

ফটোপোস্টে রাধা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, এখানে শুধু সে সম্পর্কেই কথা বলবো।

দেখুন, শুরুতেই বলা হয়েছে, "শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছে অপ্রাকৃত পুরুষ এবং রাধারানী হচ্ছে অপ্রাকৃত প্রকৃতি।"

এই কথাটা পুরোটাই ভুল।

প্রকৃতি শব্দটা এসেছে প্রকৃত থেকে, যার একটি অর্থ বাস্তব; প্রকৃতি শব্দের বিবর্তিত রূপ হলো প্রাকৃত এবং প্রকৃত বা প্রাকৃত এর বিপরীত শব্দ হলো অপ্রকৃত বা অপ্রাকৃত, এর মানে হলো অবাস্তব। শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলেন, তাই তিনি বাস্তব বা প্রকৃত, তিনি কোনোভাবেই অপ্রাকৃত নন। একইভাবে রাধাও পৃথিবীতে এসেছিলো, তাই সেও প্রকৃত, রাধা অপ্রাকৃত নয়।

ইংরেজিতে ন্যাচার বলতে যা বুঝি, বাংলায় প্রকৃতি বলতে আসলে তাই বোঝায়। এই প্রকৃতি অর্থাৎ পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ পৃথিবীর উপরস্থ সকল প্রাণীর জন্ম দিয়ে থাকে, জন্ম দেওয়া যেহেতু নারীর স্বভাব, তাই নারী বলতে প্রকৃতি বা প্রকৃতি বলতে নারীকে বোঝানো হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণ গীতার ১৪/৩,৪ নং শ্লোকে বলেছেন-

"মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম তস্মিন গর্ভং দধাম্যহম্।

সম্ভবঃ সর্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত।।"

এর অর্থ - হে ভারত, প্রকৃতি সংজ্ঞক ব্রহ্ম আমার যোনি স্বরূপ এবং সেই ব্রহ্মে আমি গর্ভাধান করি, যার ফলে সমস্ত জীবের জন্ম হয়।

এবং

"সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।

তাসাং ব্রহ্ম মহদযোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা।।"

এর অর্থ - হে কৌন্তেয়, সকল যোনিতে যে সমস্ত মূর্তি প্রকাশিত হয়, ব্রহ্মরূপী যোনিই তাদের জননী স্বরূপা এবং আমি তাদের বীজ প্রদানকারী পিতা।

এর সরল অর্থ হলো- প্রকৃতি স্বরূপ যোনীতে শ্রীকৃষ্ণ বীজ প্রদান করেন, তাই শ্রীকৃষ্ণ পুরুষ এবং জগতের পিতা; ফলে শ্রীকৃষ্ণ অপ্রাকৃত পুরুষ নয়, প্রকৃত পুরুষ; এবং রাধা, শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত প্রকৃতি নয়, প্রকৃতি হলো এই জগত।

এরপর বলা হয়েছে, 

"শ্রীমতি রাধারানীর অন্তরের ভাব হচ্ছে মাধুর্য প্রেমের পূর্ণতা এবং এই মাধুর্য প্রেম হচ্ছে পাঁচটি অপ্রাকৃত (শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মাধুর্য) রসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং কৃষ্ণপ্রেমের সর্বোত্তম প্রকাশ।"

এখানে- শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য এবং মাধুর্যকে পাঁচটি অপ্রাকৃত রস বলা হয়েছে। কিন্তু এগুলো আসলে অপ্রাকৃত নয়, প্রকৃত রস।

পিতা মাতার সাথে সন্তানের যে ভাব বা সম্পর্ক, তাকে বলে শান্ত।

ভৃত্য বা চাকরের প্রতি মালিকের যে ভাব বা সম্পর্ক তাকে বলে দাস্য।

বন্ধুর সাথে কোনো ব্যক্তির যে ভাব বা সম্পর্ক তাকে বলে সখ্য।

সন্তানের প্রতি পিতা মাতার যে ভালোবাসা তাকে বলে বাৎসল্য।

আর স্ত্রী বা প্রেমিকার সাথে কোনো পুরুষের যে সম্পর্ক তাকে বলে মাধুর্য্য, মধুর থেকে মাধুর্য্য শব্দটি এসেছে।

এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখি- প্রেম এবং ভালোবাসা একই অর্থ প্রকাশ করে না। কোনো পুরুষের সাথে তার স্ত্রী বা প্রেমিকার যে সম্পর্ক তাকেই বলে প্রেম; আর বাকি সমস্ত মানুষের সাথে তার যে সম্পর্ক তাকে বলে ভালোবাসা, এই ভালোবাসারই বিভিন্ন রূপ হলো- শান্ত, দাস্য, সখ্য এবং বাৎসল্য রস।

এই সব তত্ত্ব থেকে এটা পরিষ্কার যে- কোনো পুরুষের সাথে মধুর বা মাধুর্য্য রসের সম্পর্ক হতে পারে একমাত্র তার প্রেমিকা বা স্ত্রীর, যার সাথে তার যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে। ফটোপোস্টে যে বলা হয়েছে- "শ্রীমতি রাধারানীর অন্তরের ভাব হচ্ছে মাধুর্য প্রেমের পূর্ণতা … এবং কৃষ্ণপ্রেমের সর্বোত্তম প্রকাশ।" এটা বলে আসলে এটা বোঝানো হচ্ছে যে রাধার সাথে কৃষ্ণের যৌন সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধার যৌনসম্পর্ক থাকবে কেনো, রাধা কি শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী ? মোটেই নয়। পুরাণ মতে রাধা আয়ান ঘোষের স্ত্রী, তাহলে অন্যের স্ত্রীর সাথে কোনো পুরুষের যে প্রেম তাকে কী বলে ? পরকীয়া প্রেম। এর মানে-"শ্রীমতি রাধারানীর অন্তরের ভাব হচ্ছে মাধুর্য প্রেমের পূর্ণতা … এবং কৃষ্ণপ্রেমের সর্বোত্তম প্রকাশ।" এটা বলে আসলে এটাই বোঝানো হচ্চে যে- রাধা একজন চরিত্রহীনা নারী; যে নিজের স্বামী ছাড়াও অপর পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখে।

এরপর ফটোপোস্টে বলা হয়েছে, "প্রকৃতপক্ষে রাধারাণী হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তি"

-এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার; রাধা, শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তি নয়, শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তি হলেন যোগমায়া, যে কথা শ্রীকৃষ্ণ নিজে বলেছেন গীতার ৭/২৫ নং শ্লোকে, দেখুন নিচে-

"নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ।

মূঢ়োহয়ং নাভিজানাতি লোকো মামজমব্যয়ম।।"

এর অর্থ - আমি মূঢ় ও বুদ্ধিহীন ব্যক্তিদের কাছে কখনও প্রকাশিত হই না। তাদের কাছে আমি আমার অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়ার দ্বারা আবৃত থাকি। তাই তারা আমার অজ ও অব্যয় স্বরূপকে জানতে পারে না।

শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্পষ্ট করে বললেন যে, তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির নাম যোগমায়া; অথচ কিছু মূর্খ, যারা কোনো দিন গীতা ভালো করে পড়ে না, পড়লেও বুঝে না, তারা শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তিকে রাধা বলে প্রচার করে হিন্দু ধর্মের সর্বনাশ করে যাচ্ছে।

ফটোপোস্টের শেষের দিকে বলা হয়েছে- রাধা নিত্যকাল ধরে শ্রীকৃ্ষ্ণের আনন্দ বর্ধন করেন।

এই কথাতে এটিই প্রমাণ হচ্ছে যে- পুরুষের আনন্দ বর্ধনের জন্য একজন করে পরকীয়া প্রেমিকা থাকা দরকার, কিন্তু সমাজ সংসার কি এটা মেনে নেবে ? নেবে না। তাহলে সমাজ সংসার যা মানবে না, এমন অবাস্তব বিষয় কি সনাতন ধর্মে থাকতে পারে ? পারে না। কারণ, বাস্তবতা ই হলো সনাতন ধর্ম।

ফটো পোস্টের একেবারে শেষে বলা হয়েছে- শ্রীকৃষ্ণকে পরম আনন্দে মগ্ন রেখেছেন বলে তাঁর নাম রাধা।

এরা একবার বলে- রাসমণ্ডলে আবির্ভূত হয়ে কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন বলে তার নাম রাধা; এখানে আবার বলছে, শ্রীকৃষ্ণকে আনন্দে মগ্ন রেখেছেন বলে তার নাম রাধা ! আসলে প্রকৃত সত্যিটা কী ? দুই রকম তথ্য তো সত্য হতে পারে না। সত্য এক। রাধা সম্পর্কে নানারকম মত এটাই প্রমাণ করে যে, যুবক কৃষ্ণের সাথে যুবতী রাধা সম্পর্কিত যেসব কথাবার্তা তা সবই গালগল্প, বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি নেই। রাধা সম্পর্কে প্রকৃত সত্য হলো এটাই যে- বৃন্দাবনে, কৃষ্ণের বাল্যকালে, কৃষ্ণের খেলার সাথীদের মধ্যে রাধা বলে একজন ছিলো; কৃষ্ণ, ১০ বছর দুই মাস বয়সে কংসকে হত্যার জন্য বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় চলে গেলে যার সাথে কৃষ্ণের দেখা সাক্ষাত শেষ হয়ে যায়।

আশা করছি- রাধার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে খারাপ দেখানোর এই অপচেষ্টার জবাব, আমার পাঠক বন্ধুদের মুখে তুলে দিতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 14 August 2020

গীতায়- "আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই" ব'লে শ্রীকৃষ্ণ আসলে কী বুঝিয়েছেন ?


গীতায়- "আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই" ব'লে শ্রীকৃষ্ণ আসলে কী বুঝিয়েছেন ?

সাধারণভাবে কোনো প্রাণী বা জীবসত্ত্বার জন্ম হলো পৃথিবীতে তার আগমন এবং মৃত্যু হলো পৃথিবী থেকে তার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়া, এই জন্ম সাধারণভাবে চলমান প্রাণীদের ক্ষেত্রে নারী গর্ভের মাধ্যমে এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ফলের মধ্যেকার বীজ এবং নানা ধরণের অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে হয়ে থাকে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে জন্ম ও মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই ( গীতা, ৪/৬); আমি জন্মরহিত (গীতা, ১০/৩); এর কারণ কী ?

জন্ম ও মৃত্যু যেকোনো জীবের জন্য একটি সাধারণ প্রক্রিয়া, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন গীতায় বলেন যে- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই, আমি জন্মরহিত- তখনই, শ্রীকৃষ্ণ যে সাধারণ কেউ নয়, সে কথাই প্রমাণ করে।

গীতার চতুর্থ অধ্যায়, জ্ঞানযোগের শুরুতেই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, এই জ্ঞানযোগ আমি সূর্যকে বলেছিলাম, সূর্য মনুকে বলেছিলো, মনু ইক্ষাকুকে বলেছিলো। তখন অর্জুন জিজ্ঞেস করেন, আপনার জন্ম পরে, সূর্যের জন্ম আগে, তাহলে আমি কিভাবে বুঝবো যে আপনি তা সূর্যদেবকে বলেছিলেন ?

এর জবাবে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, আমার এবং তোমার বহুবার জন্ম হয়ে গিয়েছে, আমি সেই সবই জানি, কিন্তু তুমি তা জানো না।

এইখানেই আসলে ঈশ্বর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য। সাধারণ মানুষের তার পূর্বজন্মের কথা সাধারণভাবে মনে থাকে না, কিন্তু ঈশ্বরের তা মনে থাকে, যেহেতু তিনি সর্বজ্ঞানী। এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 

"আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই। আমি সকলের ঈশ্বর, আমি নিজ প্রকৃতিতে আশ্রয় করিয়া নিজ মায়াবলে নিজেকে সৃষ্টি করিয়া থাকি (গীতা, ৪/৬); এবং কখন তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, সেকথা বলেছেন, গীতার ৪/৭ নং শ্লোকে এভাবে-

"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজামহ্যম।।"

এর অর্থ- যখনই ধর্মের গ্লানি অর্থাৎ অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি করিয়া থাকি।

ঈশ্বরের এই নিজেকে সৃষ্টির রূপই হলো অবতারগণ। তাই কোনো অবতারের জন্ম কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণশক্তি ভগবান বিষ্ণু, যখন দেবকীর গর্ভের মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবকে দর্শন দিয়ে তাদেরকে একথা জানিয়েছিলেন যে, তিনি আসতে যাচ্ছেন তাদের পুত্ররূপে।

সাধারণ মানুষের জন্ম তার নিজের হাতে থাকে না, তাই সে পরিকল্পনা করে তার জন্ম কোনো নির্দিষ্ট পিতা-মাতা বা নির্দিষ্ট পরিবার বা নির্দিষ্ট স্থানে ঘটাতে পারে না। কিন্তু ঈশ্বর তার জন্ম নিজের পরিকল্পনা মতোই ঘটাতে পারেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ তার আগমনী বার্তা তাঁর জন্মের অন্তত ১০ বছর পূর্বে দেবকী ও বসুদেবের বিয়ের সময়ই দৈব বাণীতে ঘোষণা করে তিনি কংসকে সাবধান করেছিলেন এবং সেই মতোই তিনি দেবকীর গর্ভের মাধ্যমে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন; সাধারণ মানুষের জন্ম এবং ঈশ্বরের জন্মের মধ্যে আসলে পার্থক্য এটাই, ঈশ্বর জন্ম নেন তার নিজের পরিকল্পনা মতো, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্ম তার নিজের হাতে নেই, থাকলে- কেউ, দরিদ্র পরিবারে, দরিদ্র দেশে, বিশেষ করে অনেকে মুসলিম সমাজে জন্ম নিয়ে বাল্যকালেই কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজের লিঙ্গঅগ্রচর্ম হারাতো না বা বোরকা নামক বস্তায় বন্দী হতো না।

তাই আমার জন্ম নেই বলতে শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়েছেন, সাধারণ জীব যেমন তার জন্মের সাথে সাথে পৃথিবীতে তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করে এবং মৃত্যুর সাথে সাথে যেমন তার বিলুপ্তিও ঘোষিত হয়; ঈশ্বরের জন্ম ও মৃত্যু আসলে সেরকম কোনো ব্যাপার নয়; পৃথিবীতে ঈশ্বরের জন্ম ও মৃত্যু ঘটে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায়, বিগত সময়ের যেসব জন্মের কথা তাঁর স্মরণেও থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের যা মনে থাকে না। অবতার হিসেবে পৃথিবীতে ঈশ্বরের এই যে বার বার জন্ম ও মৃত্যু, যেটা প্রকৃতপক্ষে জন্ম ও মৃত্যু নয়, যেটা প্রকৃতপক্ষে শুধু মর্ত্যে প্রাণীরূপ ধারণের জন্য তাঁর আসা ও যাওয়া, এটাকে বোঝাতেই শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলেছেন- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই; আর আগেই বলেছি, কোনো প্রাণীর মৃত্যু হলে পৃথিবী থেকে সেই প্রাণীর বিলুপ্তি ঘোষিত হয়, কিন্তু অবতাররূপী ভগবান বা ঈশ্বরের প্রার্থিব দেহ ত্যাগের সাথে সাথেই তাদের বিলুপ্তি ঘোষিত হয় না, তারা আবার ফিরে আসেন নতুন কোনো রূপ নিয়ে, তাই পৃথিবীতে তাদের আবির্ভাব ও তিরোভাব আসলে তাদের জন্ম ও মৃত্যু নয়, এটা জাস্ট যাওয়া ও আসা মাত্র, যে কথা শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন এভাবে- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই।

আমার জন্ম ও মৃ্ত্যু নেই, এই কথা বলার মাধ্যমেও আসলে শ্রীকৃষ্ণ প্রমাণ দিয়েছেন যে তিনি ঈশ্বর, সাধারণ কোনো মানুষ নন; কারণ, কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কি এই কথা বলা সম্ভব যে- তার মৃত্যু নেই ? 

পৃথিবীতে বর্তমানে যাদের অস্তিত্ব আছে, তাদের সবারই জন্ম হয়েছে, কিন্তু কেউ বলতে পারবে না যে তার মৃত্যু নেই বা মৃত্যু হবে না; কারণ, মরতে সবাইকে হবেই। কিন্তু যখন কেউ বলে যে তার জন্ম ও মৃত্যু নেই, তখন বুঝতে হবে যে এটা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয় বা এই কথা যিনি বলছেন, তিনি সাধারণ কেউ নন। তিনি অবতাররূপে ভগবান বা ঈশ্বর।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 12 August 2020

শ্রীকৃষ্ণের এই বৃক্ষবিলাসের কারণ বা প্রকৃত ঘটনা কী ?


শ্রীকৃষ্ণের এই বৃক্ষবিলাসের কারণ বা প্রকৃত ঘটনা কী ?

এই পোস্টের সাথে ফটো আকারে যে ছবিটি দিয়েছি, সেটা দেখলে যে কারো মনে হবে, এই ছবিতে উল্লিখিত পুরুষ একজন লম্পট; কারণ, গাছে উঠে সে নদীতে স্নানরতমেয়েদের নগ্ন শরীর দেখছে। শুধু তাই নয়, তাদের কাপড়গুলো পর্যন্ত সে চুরি করে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখেছে, যাতে মেয়েরা তাকে দেখে, চাইলেও পোষাক দিয়ে নিজেদের শরীর ঢাকতে না পারে। এই ছবিটি, কৃষ্ণ চরিত্রকে কলুষিত করার জন্য মুসলমানদের এক প্রধান অস্ত্র।

ছবিটি দেখে আপাত দৃষ্টিতে কৃষ্ণকে লম্পট মনে হলেও প্রকৃত ঘটনা বা প্রকৃত সত্যটা আসলে কী ?

শুরু থেকেই আমাদের হিন্দু ধর্ম প্রচারিত হয়েছে কিছু নির্বোধ ব্যক্তির মাধ্যমে, যাদের উদ্দেশ্য হিন্দু সমাজ ও ধর্মের কল্যাণ করা ছিলো না, উদ্দেশ্য ছিলো বিজনেস।

ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় মেলায় গিয়ে ক্যালেন্ডার সাইজের পোস্টারে শ্রীকৃষ্ণের এই বৃক্ষবিলাসের ছবি দেখেছি, কিন্তু কোনো ছবির নিচে শ্রীকৃষ্ণের এই ঘটনা ঘটানোর বিস্তারিত বা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেখি নি, আর হিন্দু সমাজে সেই ব্যবস্থাও নেই যে, ছোটবেলা থেকেই হিন্দু ছেলে মেয়েরা ধর্মীয় জ্ঞান নিয়ে বড় হবে। তাহলে হিন্দুধর্ম নিয়ে মুসলমানদের সমালোচনার বা প্রশ্নের জবাব হিন্দু ছেলে মেয়েরা দেবে কিভাবে ? এই যথোপযুক্ত জবাব দিতে না পেরেই হিন্দু ছেলে মেয়েরা মুসলমানদের কাছে ছোট হয়, কেউ কেউ হিন্দু ধর্ম নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং মুসলমানদের প্রশ্ন জিহাদের মুখে পড়ে আস্তে আস্তে হিন্দুধর্মের মহাসাগর থেকে উঠে ইসলামের নোংরা নর্দমার দিকে এগিয়ে যায়।

যা হোক, এবার দেখা যাক শ্রীকৃষ্ণের এই বৃক্ষবিলাসের ঘটনার পেছনের ঘটনা কী ছিলো এবং তার উদ্দেশ্যই বা কী ?

প্রাচীন কালে লোকবসতি কম থাকায়, কোনো পুরুষের চোখে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম ছিলো ব’লে, মেয়েরা নদী বা পুকুরে নগ্ন হয়ে স্নান করতো। এই সময় তারা তাদের পরিধেয় পোষাক নদী বা পুকুরের পাড়ে রেখে জলে নামতো। স্নান শেষে সেই পোষাক পড়ে আবার বাড়ি ফিরে যেতো। অনেকক্ষেত্রে দারিদ্রতার কারণে, একাধিক শাড়ি না থাকায় মেয়েরা সব সময় জলে কাপড় না ভিজিয়েও স্নান শেষে সেই একই কাপড় পড়তো, এই কারণেও তারা নদী বা পুকুরের পাড়ে কাপড় খুলে রেখে জলে নামতো। আবার গ্রামের কোনো কোনো দুষ্টু ছেলে মেয়ের ছিলো বা এখনও আছে, সময়ে অসময়ে বা বিশেষ করে বিকেলে খেলার শেষে স্নান করার বাতিক, কিন্তু অসময়ের স্নান, জ্বর-সর্দির কারণ ব’লে এই বিষয়ে মায়েদের ছিলো বা আছে স্নান না করার বা বেশি সময় ধরে স্নান না করার কঠোর নীতি; তাই মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যও অনেক ছেলে মেয়ে পরিধেয় পোষাক খুলে রেখে ইচ্ছে মতো জলে ডুবে, আবার শুকনো জামা কাপড় পরে শিষ্ট বালক-বালিকা হয়ে বাড়িতে ফিরে যেতো; ছোট বেলায় এই ধরণের ঘটনা আমি এবং অমার খেলার সঙ্গী সাথীরা নিজেরাই ঘটিয়েছি বহুবার। লাজ লজ্জার বালাই না থাকা এবং অল্পবুদ্ধির কারণে ছোট ছেলে মেয়েদের এই অপরাধ না হয় ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু যুবতী মেয়েদের বেলায় এই রীতি কিভাবে চিরকালীন রীতি হতে পারে ? তাই এটা বন্ধে হস্তক্ষেপ করেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

যা হোক, যুবতী মেয়েদের এই নগ্ন হয়ে স্নান করার রীতি সভ্যতার শুরু থেকে চলে আসছিলো শ্রীকৃষ্ণের সময় পর্যন্ত। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন লীলার মাধ্যমে লোক শিক্ষার জন্য পৃথিবীতে এলেন, তখন তিনি মেয়েদের এই আচার পরিবর্তনে উদ্যোগী হলেন।

একদিন কিছু যুবতী মেয়ে নগ্ন হয়ে স্নান করতে জলে নেমেছে, এমন সময় তিনি তার অলৌকিক শক্তি ও মায়া বলে সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গার একটি গাছের ডালে উপস্থিত হলেন, যেখানে মেয়েরা ইতোমধ্যে কাপড় চোপড় খুলে নদীতে স্নান করতে নেমেছে এবং তার অলৌকিক শক্তির বলেই শাড়ি-কাপড়গুলো তুলে নিয়ে গাছের ডালে রেখে দিলেন।

স্নান শেষে মেয়েরা যখন উঠতে যাবে তখন দেখে তাদের কোনো কাপড় চোপড় নেই। এরপর তারা এদিক ওদিক তাকিয়ে উপরে দেখে, কৃষ্ণ গাছের ডালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে আর কাপড়-চোপড়গুলো তার আশে পাশের ডালে ঝুলানো।

মেয়েরা, কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কেনো এটা করেছো ? আমরা এখন বাড়ি যাবো কিভাবে ? আমাদের পোষাকগুলো দাও। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েরা হঠাৎ কোনো কারণে নগ্ন বা উলঙ্গ হয়ে পড়লে তাদের হাত দ্বারা তাদের স্তন ঢাকার চেষ্টাকরে, এই ছবিটিতে সেরকমই দেখা যাচ্ছে।

যা হোক, মেয়েদের প্রশ্নের জবাবে শ্রীকৃষ্ণ বলে, তোমরা নগ্ন হয়ে জলে নেমেছো কেনো? জানো না, জলে বরুনদেবরূপী নারায়ণ বাস করে ? তোমরা যখন নগ্ন হয়ে জলে নামো তখন তার অস্বস্তি হয়। এরপর আর কখনো নগ্ন হয়ে জলে নামবে না।

মেয়েরা সেটা স্বীকার করে নেয় এবং কাপড় চোপড় প’রে যে যার বাড়ি ফিরে যায়। এর পর থেকেই শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষেরাও কেউ কখনো নগ্ন হয়ে জলে নামে না।

এমনকি এই আধুনিক যুগে, টিউবওয়েল এবং ডিপ টিউবওয়েল কল্যানে যেখানে পুকুর-নদীর মতো খোলা জলে স্নান করার রীতি প্রায় উঠেই গেছে, স্নান করার জন্য যেখানে বাথরুম রীতির কালচার গড়ে উঠেছে, যে বাথরুমের ভেতর নগ্ন হলেও দেখার কেউ নেই, সেই বাথরুমের ভেতরও, এখনও অনেক মানুষ সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে স্নান করতে ইতস্তত বোধ করে, কারণটা আর কিছুই নয়; কারণটা, ঐ, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা।

এখন ছবির প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম মানসিকতার বিচার বিশ্লেষণ করা যাক।

ছবি দেখেই, আগে পিছে কোনো কিছু চিন্তা না করে মুসলমানরা সরাসরি বলে দেয়, কৃষ্ণ একটা লম্পট, সে মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখার জন্যই এটা করেছে। মুসলিমরা তো হিন্দুদের চিরশত্রু, তাই তারা এমনটা বলবে, এটাই স্বাভাবিক । কারণ, এভাবে তারা হিন্দু ধর্মকে যত ছোট করতে পারবে তত ইসলামের লাভ। কিন্তু এর যথোপযুক্ত জবাব, আমাদের মুখে যাদের তুলে দেওয়ার কথা ছিলো, সেই হিন্দু ধর্মীয় আশ্রম এবং আমাদের সাধু-সন্ন্যাসী-মহারাজরা তা করে নি বলেই আমাদের হিন্দুসমাজের আজ এই দুর্দশা।

উপরে যে কাহিনী বললাম, সেটাই হলো এই ঘটনার মূল কাহিনী। কিন্তু মুসলিম শাসনামলে লিখা “ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ” এবং এবং সুবোধ চন্দ্রের লিখা “শ্রীমদ্ভভাগবত পুরাণ” এ এই ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সেটা পড়লে কৃষ্ণকে আপনার লম্পট মনে হবেই; কারণ, সেখানে ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেন শ্রীকৃষ্ণের একমাত্র উদ্দেশ্য নগ্ন মেয়েদের শরীর দেখা! তাই এই সব গ্রন্থকে ধর্মগ্রন্থ মনে করার কোনো কারণ নেই এবং তাতে যা লিখা আছে, তাকে বেদ বাক্য মনে করে তার সকল কথা বিশ্বাস করারও কোনো কারণ নেই। আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, শুধু গীতা ছাড়া মধ্যযুগে বাংলায় অনুবাদ হওয়া সকল হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ কোনো না কোনোভাবে বিকৃত, তাই সেগুলো পড়ার সময় কমনসেন্সটাকে কাজে লাগিয়ে দেখতে হবে যে, সেখানে যা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবে সম্ভব কিনা ?

যেমন- ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এবং সুবোধের ভাগবতে কৃষ্ণের এই লীলার বর্ণনা মোটামুটি প্রায় এই রকম :

৮/১০ জন যুবতী মেয়ে তাদের সকল কাপড় চোপড় এবং কাত্যায়নী পূজা উপলক্ষে রাখা প্রসাদ নদীর পাড়ে রেখে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে জলে নেমে খুব আনন্দ সহকারে জলকেলিতে মেতে উঠেছে, এমন সময় সেখানে কৃষ্ণ ও বলরাম উপস্থিত হয়ে হৈ চৈ করে তাদের রাখা সকল প্রসাদ খেয়ে ফেলে এবং শাড়ীগুলো চুরি করে গাছে উঠে বসে বাঁশি বাজাতে শুরু করে, আর অন্যদিকে বলরাম অন্যদের নিয়ে মাঠে রাখা গরু বাছুরের দেখা শোনার উদ্দেশ্যে স্থান ত্যাগ করে। এর বহুক্ষণ পর জলে নেমে সাঁতার কাটতে কাটতে মেয়েদের যখন ঠাণ্ডা লেগে যায়, তখন তারা কূলে উঠার সময় দেখে যে তাদের পোষাক নেই এবং তারপর তারা এদিক ওদিক তাকিয়ে গাছের ডালে দেখতে পায় কৃষ্ণকে এবং তাদের পোষাকগুলোকে।

এখন প্রাকটিক্যাল ভিউতে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করুন। ধরুন, কিছু মেয়ে তাদের যাবতীয় পোষাক, নদী বা পুকুরের পাড়ে খুলে রেখে জলে স্নান করতে নেমেছে। এরপর সেখানে কোনো দুষ্টু ছেলের দল এসে তাদের রাখা সব প্রসাদ হৈ চৈ করে খেয়ে, তাদের সব পোষাক নিয়ে- সেখানেরই, যেখান থেকে মেয়েদের স্নান দেখা যায় এবং এমন দূরত্বে যে স্বাভাবিকভাবে কথা বার্তা বললে শোনা যায়, সেই দূরত্বের একটা গাছের ডালে উঠে বসেছে; সেখানে কিন্তু একটা মেয়ে ছিলো না, ছিলো কমপক্ষে ৮/১০ জন, তাহলে এই ঘটনা কি কারোরই চোখে পড়বে না ? যদি কোনো মেয়ের চোখে এই ঘটনাটা ধরা পড়তো তাহলে কিন্তু পরের ঘটনা- গাছের ডালে পোষাগুলো সুন্দর করে এক একটা করে রেখে মনের সুখে বাঁশি বাজানো সম্ভব হতো না। কোনো মেয়ের চোখে সেখানে কারো আগমন যেমন চোখে পড়ে নি, তেমনি কেউ পোষাকগুলো চুরি করতেও দেখে নি, এই তথ্য কিন্তু এটা প্রমান করে যে, কৃষ্ণ সাধারণ মানুষের মতো সেখানে উপস্থিত হয়ে কাপড়গুলো চুরি করে গাছের ডালে উঠে বসে নি, সে অলৌকিক শক্তির বলেই ঐ গাছের ডালে উপস্থিত হয়েছে এবং কাপড়গুলোকে তুলে গাছের ডালে রেখে দিয়েছে, যেটা একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পক্ষে সম্ভব, যদিও শ্রীকৃষ্ণের অনেক অলৌকিক ক্ষমতা এবং ঘটনার কাহিনী আছে, সেগুলো ছাড়া এই ঘটনাও কিন্তু এটা প্রমান করে যে, শ্রীকৃষ্ণই সর্বশক্তিমান এবং তিনি ই পৃথিবীর সকল প্রাণীর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা।

অনেকে মনে করে, শ্রীকৃষ্ণের এই বৃক্ষ বিলাসের ঘটনা রাধা এবং তার সখীদের নিয়ে। এখন এই প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এটা কতদূর সত্য হতে পারে ?

চার বেদ, ১২ টি উপনিষদগীতার ১৮টি অধ্যায়ের ৭০০ শ্লোক, বিষ্ণু পুরাণ এবং বেদব্যাসের মহাভারত - যেটা শ্রীকৃষ্ণের প্রামান্য জীবনী- কোথাও রাধার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু যেহেতু কৃষ্ণ প্রায় ১০ বছর গোকুলে ছিলো এবং গোকূল বৃন্দাবনের পাশে অবস্থিত এবং যেহতেু বলা হয় রাধার জন্ম বৃন্দাবনে, সেহেতু কৃষ্ণের বাল্যকালের খেলার সাথীদের মধ্যে রাধা বলে কেউ থাকলেও থাকতে পারে এবং কৃষ্ণের জীবনে এই রাধা উল্লেখযোগ্য ছিলো না বলেই হয়তো মহাভারতে রাধার কোনো উল্লেখ নেই; কেননা, বৃন্দাবন ছেড়ে আসার পর কৃষ্ণ তার ১২৫ বছরের জীবনে আর কখনো বৃন্দাবন ফিরে যান নি। ধারণা করা হয় কৃষ্ণের ৭ বছর বয়সে রাধার সাথে তার দেখা বা চেনা জানা হয় এবং কৃষ্ণের বৃন্দাবন ছাড়ার সময় অর্থাৎ ১০ বছর ২ মাস বয়স পর্যন্ত রাধা, কৃষ্ণের দেখা পায়। এখন এই ১০ বছর বয়সের মধ্যে যদি কৃষ্ণের এই বৃক্ষবিলাসের ঘটনা ঘটে তাহলে সাধারণত ছবিতে যে সব উন্নতবক্ষা মেয়েদেরকে দেখানো হয়েছে, যারা হাত দিয়ে তাদের বিশাল বড় বড় স্তন ঢেকে কৃষ্ণের সাথে কথা বলছে, সেটা কি সম্ভব ? ৮/৯ বা ১০ বছরের মেয়েদের কি এত বড় স্তন থাকে ? এ থেকে প্রমান হয় যে, এই ঘটনার মধ্যে রাধা ছিলো না। আর জলে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখেই যখন নিজেদের বুক আড়াল করা সম্ভব তখন মেয়েরা হাত দিয়ে বুক আড়াল করে কৃষ্ণের সাথে কথা বলতে যাবে কেনো ? এটাও প্রমান করে যে, মেয়েরা জলে গলা পর্যন্ত ডুবে থেকেই কৃষ্ণের সাথে কথা বলেছিলো। সুতরাং এই ঘটনার সাপেক্ষে, মুসলমানদের যে অভিযোগ, কৃষ্ণের উদ্দেশ্য ছিলো নগ্ন মেয়েদের শরীর দেখা, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব।

এই বৃক্ষবিলাসের আরও কিছু ছবি আপনারা দেখে থাকতে পারেন, যাতে দেখানো হয়েছে কিছু মেয়ে জলে গলা বা বুক পর্যন্ত ডুবে আছে এবং কিছু মেয়ে জল থেকে ডাঙ্গায় উঠে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বা কৃষ্ণের সাথে কথা বলছে। ভারতীয় সংস্কৃতির একটা মেয়ের পক্ষে, এইভাবে খোলা জায়গায় একটা পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কি সম্ভব, যেখানে জলে নামলেই নিজের লজ্জাস্থানগুলোক আড়াল করা যায় ? এই ঘটনাও প্রমান করে, এই ধরণের ছবিগুলো ছিলো শিল্পীদের শুধুই কষ্ট কল্পনা।

মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়, মুসলিম শাসকদেরকে খুশি করার অংশ হিসেবে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে কৃষ্ণ চরিত্রকে কলুষিত করার জন্য এসব ছবি তৈরি করা হয়েছে এবং প্রচার করা হয়েছে, আর আমরা হিন্দুরা মুসলমানদের এসব ষড়যন্ত্র না বুঝে, প্রকৃত ঘটনা না জেনে বা জেনেও প্রচার না করে মুসলমানদের সেই উদ্দেশ্যকেই সাধন করে চলেছি। এখন সময় এসেছে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার, যেটা হিন্দুধর্ম ও সমাজ রক্ষার একমাত্র পথ।

শ্রীকৃষ্ণের এই ছবি নিয়ে মুসলমানরা যতই লম্ফ ঝম্প করুক, আসল ঘটনা না জেনে, না বুঝে বা জেনে-বুঝেই যতই তারা শুধু মাত্র বলার জন্য কৃষ্ণকে লম্পট বলুক, তা থেকেও কিন্তু এটা প্রমানিত হয় না যে কৃষ্ণ ধর্ষক। কিন্তু ইসলামের নবী মুহম্মদ কিন্তু একজন সাক্ষাত ধর্ষক; সে ঋতুচক্র বিহীন আয়েশাকে, আয়েশার নয় বছর বয়সে ধর্ষণ করেছে, যেদিন রিহানা ও সাফিয়ার গোত্র-পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়, সেদিনই মুহম্মদ ধর্ষণ করেছে রিহানা ও সাফিয়াকে। বিশ্বাস না হলে ৮০০ কুরাইজার গণহত্যা এবং খয়বরের যুদ্ধের ইতিহাস পড়ে দেখুন।

শেষে একটা তথ্য দিয়ে রাখি, শ্রীকৃষ্ণের প্রামাণ্য জীবনী হরিবংশে এই লীলার কোনো উল্লেখ নেই, মূল সংস্কৃত ভাগবতে এর একটু উল্লেখ আছে, যা সুবোধ এবং বেণীমাধবের ভাগবতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে; সবদিক বিচারে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণের জীবনে এই ধরণের কোনো লীলাই নেই, তাই এই ঘটনার মধ্যে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। তারপরও লিপিকারগণ কৃষ্ণের জীবনীর মধ্যে এই লীলাটি যুক্ত করেছে জলে নগ্ন হয়ে স্নান না করার শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং লীলাটি যেহেতু সমাজে প্রচার হয়ে গেছে, তাই সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই লীলার বিষয়টি আলোচনা করা হলো।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং নীল কেনো ?


ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের  গায়ের রং নীল কেনো ?

সাতটি মূল রং এর মধ্যে নীল রং হলো শান্ত স্নিগ্ধতার প্রতীক। সমুদ্রের জলের রং নীল, যে সমুদ্রকে বলা হয় অসীম সমুদ্র; আকাশের রংও নীল, যে আকাশের কোনো সীমা পরিসীমা নেই।

বিষ্ণু হলেন ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের একটির নাম, যার কাজ হলো সৃষ্টিকে পালন করা। কাউকে লালন পালন করতে হলে শান্ত ও স্নিগ্ধ হতে হয়, এককথায় ভদ্র ও ভালো আচরণের হতে হয়, না হলে একটি ছোট্ট বাচ্চা, যে সব দিক থেকে অসহায়, সেও তার কাছে থাকতে চায় না বা চাইবে না। ভদ্র আচরণ অর্থাৎ সুশাসন দিতে না পারলে প্রজাগনও সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে চায় না বা রাখে না, যদিও সরকার প্রাণপনে চেষ্টা করে ক্ষমতার চেয়ারে টিকে থাকতে; কিন্তু সরকার টিকে থাকবে কি না, সেটা নির্ভর করে জনগনের সাথে তাদের ব্যবহার কিরূপ, জনগনকে তারা কতটা ভালোভাবে রাখতে পারে তার উপর। তার মানে বিষ্ণুর পালনকারী রূপের সাথে তার নীল রং এর বৈশিষ্ট্য শান্ত ও স্নিগ্ধরূপের একটা ভারসাম্য রয়েছে।

আগেই বলেছি, বিষ্ণু, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের একটি নাম, তার মানে বিষ্ণুই ঈশ্বর। আর ঈশ্বর যে সর্বত্র বিরাজিত, সে কথা বলা আছে হিন্দু শাস্ত্রের “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” এই কথার মাধ্যমে। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজিত, অর্থাৎ ঈশ্বর অসীম; আবার নীল আকাশও অসীম। অর্থাৎ বিষ্ণুর গায়ের রং নীল দ্বারা ঈশ্বরের অসীমত্বকে বোঝায়, যার কোনো সীমা পরিসীমা বা লিমিটেশন নেই।

পৃথিবীতে বিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ অবতার হলেন শ্রীকৃষ্ণ, সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রংও নীল হওয়া দরকার, কিন্তু মানুষের গায়ের রং যেহেতু নীল হয় না, হয় কালো বা ফর্সা, সেহেতু কৃষ্ণের গায়ের রং কালো বা শ্যামলা, এজন্যই কৃষ্ণের আরেক নাম শ্যাম; তাছাড়া কালো শব্দের সমার্থক শব্দও কৃষ্ণ। আবার পৃথিবীতে কালোই একমাত্র রং, যে রং অন্য সব রংকে শোষণ বা আকর্ষণ করে। কৃষ্ণ শব্দের আধ্যাত্মিক অর্থও হলো- 'আকর্ষণ করেন যিনি'। মানুষ সাধারণভাবে ফর্সার ভক্ত, তাই যখন কেউ কৃষ্ণের মূর্তি তৈরি করে বা ছবি আঁকে, তখন অনেকেই তাকে কালো হিসেবে চিত্রিত না করে নীল হিসেবে চিত্রিত করে, যেহেতু শাস্ত্রীয় কারণেই কৃষ্ণকে ফর্সা হিসেবে চিত্রিত করা যায় না।

বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং নীল কেনো, আশা করছি- আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বিষয়টি বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Monday, 10 August 2020

কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রে ‘রাধা’ কেনো ?


কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রে ‘রাধা’ কেনো ?

যুবতী রাধার সাথে যুবক কৃষ্ণের প্রেমের কোনো ঘটনার প্রমান, হিন্দু শাস্ত্রের প্রামান্য কোনো গ্রন্থ, যেমন- চার বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, ১২টি উপনিষদ, মূল সংস্কৃত ভাগবত, বেদব্যাসের নামে চালানো ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ছাড়া বেদব্যাস প্রণীত  অন্য ১৭টি পুরাণ এবং ৬টি মহাপুরাণের কোথাও নেই; আছে ভারতের মুসলিম শাসনামলে লেখা বেদব্যাসের নামে চলা ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে, জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দে’, বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে এবং কয়েকজন বৈষ্ণব কবির লেখা বৈষ্ণব পদাবলীতে। এসব থেকে বোঝা যায়, কৃষ্ণের জন্ম প্রায় ৫ হাজার দুইশ বছর আগে হলেও, রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেমের জন্ম আসলে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের পর ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ রচনার মাধ্যমে।

শ্রীকৃষ্ণ হলেন হিন্দুধর্মের প্রধান পুরুষ, এই কৃষ্ণের চরিত্রকে খারাপ দেখিয়ে, হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাসকে খেয়ে ফেলে, হিন্দুধর্মকে বিলুপ্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মুসলমান শাসকরা বেদব্যাসের নাম ব্যবহার করে কোনো হিন্দু ব্রাহ্মণকে দিয়েই রচনা করায় ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, এই পুরাণে কৃষ্ণ চরিত্রকে সম্পূর্ণ লম্পটভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে সম্পূর্ণ অনৈতিক পরকীয়া প্রেম ও যৌনতায় লিপ্ত।

যেহেতু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বেদব্যাসের নাম দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিলো, সেহেতু বেদব্যাস প্রণীত ২৪টি পুরাণের মধ্যে এই পুরাণ খুব সহজেই মিশে যায় এবং লোকজন এটা বিশ্বাস করা শুরু করে যে, সত্যিই রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম ছিলো; এর ফলে মুসলমানদের এই ষড়যন্ত্রকে বুঝতে না পেরে,ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বিষয়বস্তু, রাধা কৃষ্ণের প্রেমকে ভিত্তি করে সংস্কৃত ভাষার কবি জয়দেব লিখে ‘গীত গোবিন্দ’, এবং তারপর একই ভুল ক’রে বড়ুচণ্ডীদাস লিখে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’। 

এরপর আবির্ভাব ঘটে চৈতন্যদেবের এবং তিনি রাধা কৃষ্ণের প্রেমকে সত্য মনে করে নিজেকে রাধা কৃষ্ণের যুগল অবতার হিসেবে তুলে ধরেন এবং তার কয়েকজন অনুসারী কবি, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে পুঁজি করে রচনা করে বৈষ্ণব পদাবলী; এসবের মাধ্যমে রাধা কৃষ্ণের প্রেমের ৪০০ বছরের এই মিথ্যা কাহিনী হিন্দুদের মাথায় শেকড় গেড়ে বসে, যা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে হিন্দু সমাজকে; কারণ, রাধা হচ্ছে হিন্দুধর্ম ও সমাজের জন্য একটি স্লো পয়জন ।

হিন্দুশাস্ত্রের প্রাচীন কোনো গ্রন্থে রাধার উল্লেখ না থাকলেও, বৈষ্ণবদের মূল ভিত যেহেতু রাধা-কৃষ্ণ, সেহেতু তারা রাধার অস্তিত্বকে শাস্ত্রের মাধ্যমে প্রমান করার জন্য দুটি খেলা খেলে, খেলা দুটি হলো- গীতামাহাত্ম্যে এবং কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রে রাধাকে ঢোকানো।

গীতা মাহাত্ম্যে রাধাকে যে বাইরে থেকে ঢোকানো, এ ব্যাপারে বিস্তারিত প্রমান দিয়ে লেখা আমার একটি পোস্ট আছে, যারা পড়েছেন তারা বিষয়টি জানেন, তাই সে ব্যাপারে এখানে আর কিছু বলবো না, এখানে আজ ব্যাখ্যা করবো- কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রে রাধা আসলে এলো কোথা থেকে- এই বিষয়টি।

কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রে রাধার ফাঁকি আসলে কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রেই আছে, শুধু একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই তা চোখে পড়বে, তাই নিচে গভীর দৃষ্টি দিয়ে পড়ুন মন্ত্রটা:

হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপথে।

গোপেশ গোপীকা কান্ত রাধা কান্ত নমহস্তুতে ।। ১

ওঁ ব্রহ্মণ্য দেবায় গো ব্রহ্মণ্য হিতায় চ।

জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গোবিন্দায় বাসুদেবায় নমো নমঃ ।। ২

এখন প্রথম দুই চরণ এবং শেষ দুই চরণের পার্থক্যটা খেয়াল করুন। ভালো করে লক্ষ্য করুন, শেষ দুই চরণ পুরোটাই সংস্কৃত এবং প্রথম দুই চরণ- ‘নমহস্তুতে’ শব্দ ছাড়া পুরোটাই বাংলা। কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্র, কৃষ্ণের লীলা প্রকাশের পর সেই মহাভারতের যুগ থেকেই আছে, তাই সেটা পুরোটা সংস্কৃতে হওয়ায় স্বাভাবিক এবং তাই আছে এবং সেটা হলো-

ওঁ ব্রহ্মণ্য দেবায় গো ব্রহ্মণ্য হিতায় চ।

জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গোবিন্দায় বাসুদেবায় নমো নমঃ ।। ২

কিন্তু এর আগে- হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপথে। গোপেশ গোপীকা কান্ত রাধা কান্ত নমহস্তুতে - এলো কোথা থেকে ? এটাই হলো বৈষ্ণবদের খেলা। তারা রাধার অস্তিত্বকে প্রমান করতে গিয়ে সংস্কৃত কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্রের আগে নিজেদের রচিত মন্ত্র জুড়ে দিয়েছে; কিন্তু অপরাধীরা যেমন অপরাধের সূত্র তাদের অপর্কমের সাথে রেখে যায়, তেমনি বৈষ্ণবরাও তাদের অপরাধের সূত্র, তাদের রচিত শ্লোকের মধ্যে রেখে দিয়েছে, আর সেটা হলো- মন্ত্রটা সংস্কৃতে না লিখে বাংলায় লিখে। 

খেয়াল করুন- হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপথে। গোপেশ গোপীকা কান্ত রাধা কান্ত নমহস্তুতে- এর প্রত্যেকটা শব্দ বাংলা এবং এই শ্লোকের- ‘রাধা কান্ত’ শব্দের মাধ্যমে তারা কৃষ্ণকে, রাধার স্বামী বানিয়ে দিয়েছে; কারণ, কান্ত শব্দের অর্থ স্বামী। বৈষ্ণবদের অপরাধের মাত্রাটা খেয়াল করুন, অস্তিত্বহীন রাধাকে তারা শুধু কৃষ্ণের অনৈতিক প্রেমিকা হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় নি, রাধাকে কৃষ্ণের স্ত্রীও বানিয়ে দিয়েছে, বাস্তবে যার ভিত্তিই নেই; কারণ, কৃষ্ণের ১০ বছর ২ মাস বয়সের পরবর্তী ১১৫ বছরের জীবনে রাধা বলে কেউ ছিলোই না।

সুতরাং কৃষ্ণকে প্রণাম করতে হলে প্রচলিত কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্র থেকে প্রথম দুই চরণ বাদ দিয়ে-

ওঁ ব্রহ্মণ্য দেবায় গো ব্রহ্মণ্য হিতায় চ।

জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গোবিন্দায় বাসুদেবায় নমো নমঃ ।। ২

এটা বলতে হবে। এছাড়াও গীতা মাহাত্ম্যের ৬ নং শ্লোকটিকে কৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটি হলো-

সারথ্যমর্জুনস্যাদৌ কুর্বন্ গীতামৃতং দদৌ।

লোকত্রয়োপকারায় তস্মৈ কৃষ্ণাত্মনে নমঃ।

এর অর্থ হলো- যিনি অর্জুনের সারথি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে জগতের উপকারার্থে গীতা রূপ অমৃত দান করেছেন, সেই পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণকে নমস্কার করি। 

আশা করছি, উপরের এই আলোচনার মাধ্যমে- কৃষ্ণ প্রণাম রাধা কিভাবে এলো এবং প্রকৃত কৃষ্ণপ্রণাম মন্ত্র কোনগুলো হওয়া উচিত, তা আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

শ্রীকৃষ্ণ যদি ঈশ্বর হন, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে তার কাজ কী ?


শ্রীকৃষ্ণ যদি ঈশ্বর হন, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে তার কাজ কী ?

কেউ কেউ প্রশ্ন করে, শ্রীকৃষ্ণ যদি ঈশ্বর হয়, তাহলে তার যুদ্ধ লাগিয়ে কুরুক্ষেত্রেই ঐ বিধ্বংস ঘটানোর দরকার কী ? শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু ঈশ্বর, সে চাইলেই তো মূহুর্তের মধ্যে পাপীদেরকে মেরে ফেলতে পারতো বা কোনো মহামারী সৃষ্টি করে সবাইকে বিনাশ করতে পারতো ? 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ দিকে ঠিক এই ধরণের প্রশ্নই শ্রীকৃষ্ণকে করেছিলো বলরাম, যে কেনো সে ঐ ধরণের বিধ্বংস বা হিংসা ঘটালো ? শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিয়েছিলেন, “মানুষ যে জিনিসের মূল্য পরিশোধ করে না, তার মূল্যই সে বুঝতে পারে না। আজ ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ অনেক রক্ত দিয়েছে, এই ধর্মবোধ, পৃথিবী থেকে সহজে বিনাশ হবে না।” ঐ ধরণের বিধ্বংসের দরকার এজন্যই ছিলো যে, প্রকৃতির নিয়ম মেনেই তাকে অধর্মের বিনাশ ঘটাতে হবে। আর যুদ্ধের কারণ হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছেন, তার সহজরূপ হলো- ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য যদি লোকজন ত্যাগ স্বীকার না করে, তাহলে তার কোনো মূল্য লোকজনের কাছ থাকবে না বা তারা তার কোনো মূল্য দেবে না। যেমন- বিনা পয়সায় অর্জিত বস্তুর মূল্য কারো কাছে থাকে না বা কেউ তার মূল্য দেয় না। এজন্যই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ধর্ম প্রতিষ্ঠার রক্তমূল্য, শ্রীকৃষ্ণ, লোকজনের কাছ থেকে নিয়েছেন।

আবার, যুদ্ধ শেষে দ্রৌপদীও, শ্রীকৃষ্ণকে সেই একই ধরণের প্রশ্ন করেছিলো-  তিনি তো ঈশ্বর, তাহলে কেনো তিনি মানুষের মন পরিবর্তন না করে এই বিধ্বংস ঘটালেন ?

শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিয়েছিলেন, জন্ম নেওয়ার পর মানুষ স্বতন্ত্র হয়ে যায়, কোনো অলৌকিক শক্তি তার ইচ্ছার উপর দিয়ে আর কিছু করতে পারে না। তাই একবার যাকে যে অবস্থায় সৃষ্টি করা হয়েছে, সেইভাবেই তাকে তার কাজ করতে দিতে হয় এবং এভাবেই সে এক সময় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, এজন্যই এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

সুতরাং, শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর হয়েও যুদ্ধ যে এমনি এমনি ঘটান নি, বাস্তব কারণেই যুদ্ধ ঘটিয়েছেন, আশা করছি, আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে তা ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

২০২০ সালের জন্মাষ্টমী কেনো শ্রাবণ মাসে এবং স্মার্ত ও গোস্বামী মত কী ?


২০২০ সালের জন্মাষ্টমী কেনো শ্রাবণ মাসে এবং স্মার্ত ও গোস্বামী মত কী ?

সাধারণভাবে আমরা জানি যে- শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, এজন্যই শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব অনুষ্ঠানের নাম জন্মাষ্টমী। অষ্টমী তিথি, চান্দ্র মাসের একটি সময়ের নাম, যে চান্দ্রমাসকে সাধারণভাবে গণনা করা হয় ২৯ দিনে এবং বছর হয় ৩৫৪ দিনে। অন্যদিকে সৌর বছর হয় সাধারণভাবে ৩৬৫ দিনে। ধর্মীয় পর্ব বা অনুষ্ঠানগুলো চান্দ্রমাস অনুযায়ী হয়, কিন্তু চান্দ্র বছর যেহেতু সৌর বছরের চেয়ে সাধারণভাবে ১১ দিন আগেই শেষ হয়ে যায়, তাই সৌরবছরের গণনায় চান্দ্র মাসের তিথিগুলো প্রতিবছর ১১ দিন করে সামনে এগিয়ে আসে। এজন্যই প্রতিবছর শুধু দুর্গাপূজা নয়, সব পূজা ই ১১ দিন করে সামনে এগিয়ে আসার কথা। আমাদের পূজা পার্বনের মতো মুসলমানদের ঈদসহ অন্যান্য পর্বও চান্দ্র মাস অনুযায়ী হয় বলে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। যেকারণে ঈদসহ অন্যান্য মুসলিম উৎসব সারা বছর ধরে ঘুরতে থাকে। আমাদের পূজা পার্বনের অবস্থাও হতো এরকমই যদি আমাদের মলমাস সিস্টেম না থাকতো।

সৌরবছর এবং চন্দ্রবছরের মধ্যে সাধারণভাবে ১১ দিনের পার্থক্যের কারণে ৩২ সৌর মাসে যতদিন হয়, ঠিক প্রায় ততদিনই হয় ৩৩ চান্দ্র মাসে, ৩২ সৌর মাসে ২/১ দিন বেশি থাকে। একারণে প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর ৩২ সৌর মাসের দিন সংখ্যার সাথে ৩৩ চান্দ্র মাসের দিনসংখ্যার ব্যালান্স করা হয়। এই ব্যালান্স করতে গিয়ে ১টি চান্দ্র মাসের দিন সংখ্যা বাদ দেওয়ার পরও যে দুই এক দিন বেশি থাকে, সেই ২/১ দিন কে বাংলা কোনো মাসের সাথে যোগ করে দেওয়া হয়, যে কারণে কোনো বছর আষাঢ় মাস হয় ৩২ দিনে বা অন্যান্য মাসও দু একদিন বেশি হয় এবং নানা নিয়ম কানুনের উপর ভিত্তি করে বাংলা কোন মাসকে সেই বছর মলমাস ঘোষণা করা হয়, যে মাসে কোনো শুভ কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। 

এখন দিন সংখ্যাকে ব্যালান্স করার জন্য কল্পনায় যে চান্দ্রমাসকে ধরে নেওয়া হয়েছিলো, হিসেব মতো তাতেও তো তিথি নক্ষত্র এবং সেই তিথিতে পূজা পার্বণ ছিলো, সেগুলো যাবে কোথায় ? সেগুলোকে রেগুলার চান্দ্রমাসের ভিত্তিতে সৌরমাসেই ফেলে দেওয়া হয়, যার কারণে সকল প্রকার পূজা পার্বন এক ধাক্কায় প্রায় এক মাস পিছিয়ে যায় এবং চান্দ্র বছরের নিয়ম অনুযায়ী পরের বছর আবার ১১ দিন করে সামনে আসতে থাকে। তবে প্রতিবছরই যে মুসলমানদের ঈদের মতো আমাদের পূজা পার্বন ১১দিন করে সামনে এগিয়ে আসবে এবং তিন বছর পর আবার এক মাস পিছিয়ে গিয়ে আবার ১১ দিন করে সামনে আসতে থাকবে এমনটা নয়, আগেই বলেছি নানা হিসেব নিকেশের উপর ভিত্তি করে এই দিনগুলো ঠিক করা হয়, যেটা বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে এককথায় অসম্ভব। কারণ, এগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষের উচ্চমাত্রার হিসেবে নিকেশ এবং জ্ঞানের ফসল, তাই সাধারণ বুদ্ধিতে এগুলো বোঝার চেষ্টা করা বৃথা। সাধারণ বুদ্ধিতে শুধু এটুকু জানাই যথেষ্ট যে- মলমাস সিস্টেমের কারণে পূজা বা হিন্দু উৎসরগুলোর দিন তারিখ প্রতিবছরই পাল্টায়, যে কারণে ভাদ্রমাসের জন্মাষ্টমী, কোনো কোনো বছর শ্রাবণ মাসেও হয়, যেমন হচ্ছে এই বছর ২০২০ সালে। এই একই কারণেই আশ্বিন মাসের দুর্গার অকাল বোধন কোনো বছর কার্তিক মাসে গিয়ে হয়। তবে এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে- প্রতিবছর বিভিন্ন পূজাপার্বণ ভিন্ন ভিন্ন তারিখে অনুষ্ঠিত হলেও, Earlier এবং Later এর সময়ের ব্যবধান কখনো এক মাসের বেশি হয় না এবং এটাই হলো মুনি ঋষিদের মলমাসের জ্ঞানের ফল।

এ বছরের জন্মাষ্টমী উদযাপিত হবে দুই দিন- প্রথম দিন অর্থাৎ ১১ তারিখ স্মার্ত মতে, দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ১২ তারিখ গোস্বামী মতে। গোস্বামী মত হলো বৈষ্ণব মত, যে বৈষ্ণবেরা সনাতন ধর্মের প্রায় সমস্ত সিস্টেমে নাক গলিয়ে সনাতন ধর্মকে বৈষ্ণব মতবাদে কনভার্ট করার চেষ্টা করছে। তাই দেখা যায় গোস্বামী মতে একাদশীর দিনও কখনো কখনো আলাদা হয়।

স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়ণ করে যারা পণ্ডিত, তাদেরকে বলে স্মার্ত পণ্ডিত, তারা যে মত প্রকাশ করে তাই স্মার্ত নামে পরিচিত। এই স্মার্ত মতই হলো সনাতন ধর্মের প্রকৃত মত। অপরদিকে গোস্বামী মত হলো বৈষ্ণবদের একটি মনগড়া মত। তাই সনাতনীদের উচিত, সকল ক্ষেত্রে স্মার্ত পণ্ডিতদের বিধি নিষেধকে ফলো করা।

জন্মাষ্টমী এলেই অনেকে প্রশ্ন তুলে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিন তো আছে, কিন্তু উনার মৃত্যু দিন কবে ? তাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি আজকে-

প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের বাস্তব সম্মত বিচার বিশ্লেষণ করে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তারিখ পাওয়া যাচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১৮ আগস্ট বর্তমান সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১ ভাদ্র, কিন্তু প্রাচীন কালে যেহেতু চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী হিসেব করা হতো, যে চান্দ্রবর্ষে তিথি অনুযায়ী দিনের হিসেব করা হতো, সেহেতু এটা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের তিরোধান দিবস পাওয়া যাচ্ছে ৩১০১ খ্রিষ্টপূর্বের ১৮ ফেব্রুয়ারি, এই হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের ধরাধামে অবস্থান কাল হলো- ১২৫ বছর ৬ মাস।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Friday, 10 July 2020

রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, সত্য না কল্পকাহিনী ?


রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, সত্য না কল্পকাহিনী ?


মূল সংস্কৃত ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ, চার বেদ, ১২টি উপনিষদ, গীতার ১৮টি অধ্যায়ের ৭০০ শ্লোক এবং বিষ্ণু পুরান, এককথায় হিন্দু শাস্ত্রের প্রামাণ্য কোনো গ্রন্থে- কোথাও রাধার কোনো উল্লেখ নেই। এই সমস্ত বিষয়, বিচার-বিশ্লেষণ করে, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, তার ‍"কৃষ্ণ চরিত্র‍" গ্রন্থে এক বিশাল প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন,

"তাহা হইলে, এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে ?"

রাধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে যথেষ্ট কালিমা লেপন করা হয়। কৃষ্ণকে বিশ্বপ্রেমিক প্রমাণ করতে বলা হয় কৃষ্ণলীলা; আবার কেউ কেউ নিজেদের লাম্পট্যকে ঢাকা দেওয়ার জন্য কৃষ্ণের উদাহরণ টেনে অপরকে প্রশ্ন করে বলে, "কৃষ্ণ করলে লীলা, আর আমরা করলে বিলা ?" এই ব্যাপারটি এতদূর গড়িয়েছে যে, এ নিয়ে গানও বানানো হয়েছে -

"কৃষ্ণ, করলে লীলা, আমরা করলে বিলা‍" -শিরোনামে।

পশ্চিমবঙ্গের এক গায়ক তো তার গানে বলেছে,

"যমুনারও ঘাটে যাইও না গো রাধা
ওইখানেতে বইস্যা আছে, কানু হারামজাদা।‍"


এগুলো ছাড়াও রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে সমগ্র বাংলা এলাকায় আরো অনেক গান কবিতা আছে, যেগুলোর বেশির ভাগই আদি রসাত্মক এবং যেগুলো কৃষ্ণ চরিত্রের নেগেটিভ দিকই প্রকাশ করে।

এছাড়াও বলা হয়, কৃষ্ণ শুধু রাধার সাথেই প্রেম করে নি, সে নাকি প্রেম করেছে, রাধার সখীদেরও সাথে। রাধার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেও তো এই ব্যপারটা একেবারে অসম্ভব। কারণ, কৃষ্ণ রাধার সাথে প্রেম করাকালীন, রাধার সখীদের সাথেও প্রেম করবে, আর সেটা রাধা মেনে নেবে, এই তত্ত্ব শুধু নির্বোধদের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব। কারণ-  বিশ্বাস না হলে, আপনি যদি পুরুষ হন, একই সাথে, একে অপরের বান্ধবী, এমন ২/৩ জন মেয়ের সাথে প্রেম করে দেখেন আর তারপর তাদের হাই হিলের আঘাতে আপনার শরীরের অবস্থা দেখেন, তাহলেই নিজের অবস্থা দেখেই বুঝতে পারবেন, রাধার সাথে প্রেম করা কালীন, কৃষ্ণ, রাধার অন্য সখীদের সাথেও প্রেম করেছিলো কি না ?

এবার বঙ্কিমচন্দ্রের সেই লাখ টাকার প্রশ্নে ফিরে যাই, "তাহা হইলে, এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে ?"

ব্যাকরণ দিয়েই শুরু করি, যিনি আরাধনা করেন, তাকে এক কথায় বলা হয় রাধা। এই সূত্রে পৃথিবীর সমস্ত নর-নারী, যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভজনা বা আরাধনা করেন, তারা রাধা। যদিও এটা রাধার অস্তিত্বকে স্বীকারকারী মানুষের বানানো ব্যাখ্যা, শাস্ত্রে এরকম কিছু নেই; তবু দেখা যাক রাধা শব্দটি নারীবাচক হলো কিভাবে ?

জীবাত্মা বা মানুষ- যখন, পরমাত্মা বা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে, তখন শক্তিশালী ভগবানের কাছে মানুষ- হীন, দুর্বল ও অসহায়। মেয়েরা অন্যভাবে নেবেন না, আমাদের সামাজিক বাস্তবতাতেও শক্তিশালী পুরুষের কাছে নারীরা এমনই- হীন, দুর্বল ও অসহায়। এভাবে দুর্বল ও অসহায় মানুষ, যারা নারীর প্রতীক, তাদের বোঝাতে রাধা শব্দটি নারীবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু একজন পুরুষ এবং তার ভজনা বা আরাধনাকারীরা যেহেতু রাধা এবং কার্যকারিতার দিক থেকে রাধা যেহেতু একটি স্ত্রীবাচক শব্দ, তাই পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার এই আত্মসমর্পণ, কৃষ্ণের প্রতি রাধার আত্মসমর্পনের রূপ পেয়েছে এবং বিরহের প্রচণ্ড ব্যাকুলতা ছাড়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা যেহেতু সম্ভব নয়, তাই রাধা রূপী জীবাত্মা, ক্রমে ক্রমে ভক্ত মানসে নারীরূপী রাধায় পরিণত হয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আর আমরা সনাতন ধর্মীরা যেহেতু, বেদ- পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের রূপ ও তাদের কার্যপ্রণালীকে কল্পনায় নিয়ে ঐসব দেবতাদের মূর্তি তৈরি করতে খুব পারদর্শী, সেহেতু আধ্যাত্মিকভাবে প্রতীকী রাধাকে খুব সহজেই রক্ত মাংসের নারী বানিয়ে কৃষ্ণের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি।

মহাভারত, যা প্রায় ৫ হাজার বছর আগে লেখা, যা কৃষ্ণের প্রামান্য জীবনী, তাতে রাধার কোনো উল্লেখ নেই; সুতরাং গীতাতেও রাধার কথা থাকা সম্ভব নয়। এমন কি বিষ্ণু পুরান, যে বিষ্ণুই কৃষ্ণরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, সেই পুরানেও রাধার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানের মতো কিছু অর্বাচীন বা নতুন পুরানে রাধা উল্লেখ আছে, এর কারণ কী ? এছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলী, যা রাধার, কৃষ্ণের প্রতি প্রেম বিরহ নিয়ে লেখা একাধিক কবির পদ্য এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, যা মূলত একটি যাত্রাপালা, যাতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম একেবারে মাখামাখি, কৃষ্ণকে নিয়ে এসব রস সাহিত্য সৃষ্টিরই বা কারণ কী ?

কিছু আধুনিক পুরান এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে রাধার উপস্থিতিকে প্রামান্য করার জন্যও অবতারণা করা হয়েছে নতুন কাহিনীর। যার বিস্তৃতি স্বর্গ থেকে মর্ত্য পর্যন্ত। এই কাহিনী অনুসারে, পৃথিবীতে রাধার বিয়ে হয়েছিলো নাকি আয়ান ঘোষ নামের এক ব্যক্তির সাথে, এই আয়ান ঘোষ নাকি ছিলো আবার নপুংসক এবং ছিলো কৃষ্ণের মামা। কৃষ্ণ যেহেতু জন্মের পর এক ঘোষ পরিবারে লালিত পালিত হয়েছিলো, তাই কাহিনীটি খুব সহজেই মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলো। এই সূত্রে রাধা ও কৃষ্ণের সম্পর্ক আবার মামী ও ভাগনা। মামীর সাথে ভাগনার প্রেম, এটাও আবার এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা, যার কালিমা লেপন করা হয় কৃষ্ণের চরিত্রে।

আয়ান ঘোষ কেনো নপুংসক হলো এবং কৃষ্ণ কেনো মামীর সাথে প্রেম করতে গেলো, এই ব্যাখ্যাকে যুক্তিসংগত করার জন্য এই কাহিনীতে আছে একটি স্বর্গীয় অধ্যায়,  সেটি এরকম-

ভগবান বিষ্ণু, যিনি নারায়ণ নামেও পরিচিত, তার নারী শক্তি লক্ষ্মী। এজন্যই বলা হয় লক্ষ্মী-নারায়ণ, অর্থাৎ এরা এক জুটি। স্বর্গের কোনো এক দেবতা, বিষ্ণুর নিকট থেকে, যেকোনোভাবেই হোক - এই বর পায় যে, পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার পর, সে বিষ্ণুর কথিত স্ত্রী বা নারীশক্তি লক্ষ্মীকে বিয়ে করতে পারবে; কেননা, সেই সময় লক্ষ্মীও নারী রূপে পৃথিবীতে জন্ম নেবে। বিষ্ণুর স্ত্রী এই লক্ষ্মীই হলো রাধা এবং সেই দেবতা হলো আয়ান ঘোষ।

এখন, আয়ান ঘোষরূপী ঐ সাধারণ দেবতা এবং রাধারূপী লক্ষ্মীর মধ্যে বিবাহ হলে তো দুজনের মধ্যে যৌনসম্পর্ক অনিবার্য। কিন্তু বিষ্ণু, যিনি ভগবান, তার স্ত্রীর সাথে তো অন্য কোনো দেবতার যৌন সম্পর্ক হতে পারে না, আবার বিষ্ণু নিজেই যেহেতু সৃষ্টিকর্তা এবং আয়ান ঘোষ হিসেবে ঐ দেবতাকে পৃথিবীতে সৃষ্টি করার দায়িত্বও তারই, তাই বিষ্ণু, আয়ান ঘোষকে পৃথিবীতে জন্ম দিলেন যৌন ক্ষমতাহীনভাবে, যাতে সে রাধা অর্থাৎ লক্ষ্মীর সাথে বিয়ের পর কোনো যৌনসম্পর্ক স্থাপন না করতে পারে। এই সময় বিষ্ণুও পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন কৃষ্ণ রূপে এবং রাধার সাথে লীলা করলেন।

হিন্দু ধর্মের গ্রন্থের বহর এত বিশাল যে, এক জীবনে এর সবকিছু আয়ত্ব করা খুব কম হিন্দুর পক্ষেই সম্ভব। হিন্দু সমাজের এই দুর্বলতার সুযোগে এই ধরণের কাল্পনিক কাহিনীগুলো হিন্দু সমাজে ভাইরাসের মতো খুব দ্রুত ছড়িয়েছে, আর ১৮৬০/৭০ সালের আগে, বঙ্কিমচন্দ্রের মতো এই কাহিনীগুলোর সত্যতা খুঁজে দেখারও কেউ তেমন চেষ্টা করে নি। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, বঙ্কিমচন্দ্রের ঐ লাখ টাকার প্রশ্নের পর দেড়শ বছর কেটে গেলেও, কোনো হিন্দু ধর্মগুরু প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে হিন্দু সমাজের এই ক্ষতগুলোকে সারানোর চেষ্টা করে নি। তাদের শুধু লক্ষ্য ছিলো এবং এখনও আছে, শিষ্য সংখ্যা বাড়িয়ে তাদের টাকা দিয়ে নিজের পকেট ভরানো আর আশ্রমের বাড়-বাড়ন্ত আরো বৃদ্ধি করা। রামকৃষ্ণ মিশনের বয়স প্রায় ১২০ বছর, ভারত সেবাশ্রম সংঘের বয়স প্রায় ৮০ বছর, এই সংগঠনগুলো কি কখনো এগুলো নিয়ে কিছু ভেবেছে, না এ বিষয়ে কোনো কাজ করেছে ?

আর ইসকন ! ইসকনের বয়স প্রায় ৫০ হলেও, ওরা হিন্দু ধর্মের এই সব ক্ষত সংস্কার করার পরিবর্তে, সাধারণ হিন্দুদের ভেতরে রোপন করা ভ্রান্ত বিশ্বাসকে সার জল দিয়ে লালন করে, তাদের পকেট ফাঁকা করতেই বেশি ব্যস্ত।

মূল মহাভারতে রাধা না থাকলেও, ২০১৩/১৪ সালে স্টার জলসা যে মহাভারত দেখিয়েছে, তাতে রাধাকে দেখানো হয়েছে- যদিও বালিকা অবস্থায় এবং খুব কম সময়ের জন্য। কিন্তু মূলে না থাকলে, এখানে রাধা এলো কোথা থেকে ? শুনেছি, এর পেছনেও ছিলো ইসকনের হাত। ইসকন ছিলো নাকি এই মহাভারতের এক ফাইন্যান্সার। আর ইসকনের মূল পুঁজি যেহেতু রাধা-কৃষ্ণ এবং রাধা-কৃষ্ণকে অবলম্বন করেই ইসকন যেহেতু গত ৫০ বছর ধরে তার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তাই ইসকন মহাভারতের নির্মাতাদেরকে বাধ্য করেছে কাহিনীতে রাধার উপস্থিতি রাখতে। না হলে তাদের বিজনেসের ভিত্তি নাকি ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো।

এখন দেখা যাক, হিন্দু শাস্ত্রের তথাকথিত আধ্যাত্মিক প্রতীকী রাধা কিভাবে জলজ্যান্ত মানুষে পরিণত হলো-

এই ঘটনাগুলো ঘটেছে, ভারতে মুসলিম শাসন আসার পর হিন্দু সমাজকে ধ্বংস করতে, হিন্দুধর্মকে বিকৃত এবং হিন্দু দেবতাদের চরিত্র কালিমালিপ্ত করার পরিকল্পানার অংশ হিসেবে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানসহ অশ্লীলপুরানগুলো, যেগুলোতে রাধার উপস্থিতি আছে, সেগুলো এই সময়ে, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়, মুসলিম শাসকদেরকে খুশি করার জন্য লেখা।

বৈষ্ণব পদাবলী, যেখানে রাধার উপস্থিতি সবচেয়ে উজ্জ্বল, সেগুলো চৈতন্যদেবের সময়ে এবং তার কিছু পরে লেখা। এগুলো মোটামুটি অশ্লীলতা মুক্ত, কিন্তু রাধা এখানে সম্পূর্ণভাবে রক্ত মাংসের মানুষ;  তথাকথিত পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার প্রেম, এই পদাবলী লেখকদের হাতে পুরুষের প্রতি নারীর প্রেমে পরিণত হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, যেটা লেখা হয় ১৩৫০ থেকে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। বড়ু চন্ডীদাস নামে এক কবির লেখা এই কাব্যে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। কৃষ্ণ, এই কাব্যে সম্পূর্ণ এক লম্পট চরিত্র। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, যৌনতা নিয়ে আগে লেখা পুরানগুলো থেকে রসদ নিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস যে এই কাব্য লিখেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হিন্দু কবিরাই কেনো তাদের ধর্মের প্রধান পুরুষ, কৃষ্ণকে নিয়ে এমন লেখা লিখলো ?

মধ্যযুগের সব মুসলিম শাসকদের সভায় হিন্দু কবি ছিলো। ইসলামে যেহেতু কবিতা লিখা নিষেধ, তাই কোনো মুসলমানকে কবিতা লিখতে বলে বা তার কাব্য প্রতিভাকে বিকশিত করে, কোনো মুসলমান শাসক পাপের ভাগী হতে চাইতো না। এজন্য মুসলিম শাসকদের শাসন কার্যের কোথাও হিন্দুদের কোনো জায়গা না হলেও এবং তারা পাইকারিভাবে জোর জবরদস্তি করে সাধারণ গরীব হিন্দুদের মুসলমান বানালেও বা বানাতে চেষ্টা করলেও, জিজিয়া করের জন্য ধনী হিন্দুদের এবং কোনো কোনো মুসলিম শাসক ব্রাহ্মণ টাইপের জ্ঞানী হিন্দু পণ্ডিতদের হিন্দুত্ব টিকিয়ে রাখতো রাজসভায় কাব্য আলোচনা এবং তা থেকে রস আস্বাদনের জন্য। এভাবে যে সব হিন্দু, রাজসভায় কবি হিসেবে নিয়োগ পেতো, ধর্মের উপর জোর জবরদস্তি না করার জন্য তারা মুসলমান শাসকদের উপর থাকতো খুবই কৃতজ্ঞ এবং অনুগত। এই কবিদেরকে, তাদের পৃষ্ঠপোষক মুসলমান শাসকের ফরমায়েশ এবং পছন্দ অনুযায়ী কবিতা লিখতে হতো। এই পছন্দকে পাত্তা দিতে গিয়ে এবং মুসলমান শাসকদেরকে খুশি করতে গিয়েই হিন্দু কবিরা তাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থগুলো সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করার সময় বিকৃত করেছে। কারণ, ঐ কবিদের পৃষ্ঠপোষক, মুসলমান শাসকদের খুশির উপরই নির্ভর ছিলো ঐ সব দুর্বল বেতন ভোগী হিন্দু কবিদের জীবন জীবিকা। একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, বাংলা সাহিত্যের যত হিন্দু ধর্মীয় পুস্তক, সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই করা হয়েছে, মধ্যযুগের এই মুসলিম শাসনের সময়।

উদাহরণস্বরূপ, কৃত্তিবাসী রামায়ণের ব্যাপারে একটু আলোচনা করছি; সংস্কৃত রামায়ণে, সীতাকে যখন রাবন ধরে নিয়ে যায়; তখন সীতা, রাবনের সাথে ভয়ংকরভাবে সাহসের সাথে তর্ক বিতর্ক করে। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে ঐ সময়ে সীতা একজন ভীরু ও দুর্বল মহিলা। কৃত্তিবাসী রামায়নে রামের চরিত্রও দুর্বল করে দেখানো হয়েছে এবং তাকে নপুংসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কেননা, কৃত্তিবাসী রামায়ণে, রামের চরিত্র নিয়ে এই প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে যে, রাম-সীতা বনে ১২ বছর এক সাথে থাকার পরেও কেনো সীতা গর্ভবতী হলো না ? কিন্তু সংস্কৃত রামায়ণের এই তথ্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে, বনবাসে যাওয়ার আগেই রাম সীতা প্রতিজ্ঞা করেছিলো, বনে গিয়ে তারা কোনো ভোগ-বিলাসে মত্ত হবে না; তারা বনবাস কালীন ব্রহ্মচর্য পালন করবে। তো যারা ব্রহ্মচর্য পালন করবে, তাদের সন্তান হবে কিভাবে ? এইভাবে মুসলিম আমলে অনুবাদিত প্রত্যেকটি গ্রন্থ, সেটা ভারতের যে আঞ্চলিক ভাষাতেই হোক, তাকে কিছু না কিছু বিকৃত করা হয়েছেই। রামায়ণ সম্পর্কে আরও একটা তথ্য এ প্রসঙ্গে আপনাদেরকে জানিয়ে রাখি, বলা হয় রামের জন্মের ৬ হাজার বা ৬০ হাজার বছর পূর্বে বাল্মীকি মুনি রামায়ণ রচনা করেন। এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার। বাল্মীকি মুনি, রামের সমসাময়িক এবং লংকার যুদ্ধ শেষে রাম অযোধ্যায় ফিরে আসার পর রামায়ণ লেখা শুরু হয়। এটা আমার মত নয়, হিন্দু ধর্মের বই পুস্তক নিয়ে যিনি বহু গবেষণা করেছেন এবং ‍"হিন্দু ধর্ম, ভদ্রলোকের ধর্ম‍" এই পরম সত্য যার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে, সেই ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, রামায়ণ রচনার সময় নিয়ে উপরের ঐ মত ব্যক্ত করেছেন।

যা হোক, ইংরেজরা, মুসলমানদের মতো সরাসরি হিন্দুদের জীবন ও ধর্মে আঘাত না করলেও, হিন্দু সংস্কৃতিকে সুকৌশলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা হিসেবে খ্রিষ্টান সমাজের অনুরূপ ক’রে রাজা রাম মোহন রায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদু প্রিন্স দ্বারাকানাথের মাধ্যমে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করে। ব্র্রাহ্মদের আচার আচরণ খ্রিষ্টানদের মতো হওয়ায়, সেই সময়ের নিষ্ঠাবান হিন্দুরা ব্রাহ্মদেরকে খ্রিষ্টানই মনে করতো। এই ব্রাহ্মসমাজের নেতাদের পরামর্শে ইংরেজরা বেদকে বিকৃত করার পরিকল্পনা করে। ইতোমধ্যে বাংলায় তারা ছাপাখানা স্থাপন করে ফেলেছিলো এবং সেখান থেকে প্রথম মুদ্রিত বই রূপে বাইবেল প্রকাশ করেছিলো। এরপর তারা বেদ প্রিন্ট করে। সেই সময় অথর্ববেদের শেষের দিকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে কয়েকটি দুর্বল শ্লোক যুক্ত করে এবং তার মধ্যে আল্লাহ, মুহম্মদ এরকম কয়েকটি ইসলামিক শব্দটি ঢুকিয়ে দেয়; যেগুলোর মাধ্যমে জাকির নায়েক প্রমান করার চেষ্টা করে যে বেদ এ মুহম্মদের কথা বলা আছে এবং মুহম্মদই কল্কি অবতার, সুতরাং জাকির এর মতে হিন্দুদের উচিত, হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যাওয়া। এছাড়াও অনেকে জানেন যে,  ভবিষ্য পুরান লেখা হয়েছিলো সম্রাট আকবরের সময়ে এবং তাতেও ইসলামের এই সব বিষয় ঢুকানো আছে, যা দ্বারা জাকির হিন্দুদেরকে বিভ্রান্ত করছে, আর মূল বিষয় না জেনে হিন্দুরাও আমাদের ধর্মগুরুদের উদাসীনতায় বিভ্রান্ত হচ্ছি।

এই বিভ্রান্তি এড়াতে, হিন্দু ধর্মের মুল বিষয়গুলো জানতে হলে পড়তে হবে সংস্কৃত গ্রন্থগুলো এবং তাও যথেষ্ট সতর্ক হয়ে- কারণ, ইংরেজ আমলে প্রথম প্রিন্ট হওয়া সংস্কৃত গ্রন্থগুলো হানড্রেড পার্সেন্ট অবিকৃত নয়।

এভাবে মুসলিম আমলে অনুবাদিত এবং ইংরেজ আমলে ছাপা হওয়া গ্রন্থগুলোতে হিন্দু ধর্মের প্রধান দেব-দেবী ও দেব পুরুষদের চরিত্রকে সুকৌশলে বিকৃত করে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে।

এবার যাওয়া যাক, স্টার জলসায় প্রচারিত মহাভারত অনুসারে, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের যৌক্তিকতা প্রমানে। এতে, কৃষ্ণের বেড়ে উঠার স্থান, গোকুলের পাশের বৃন্দাবনে, কৃষ্ণের বছর বয়সের সময় রাধার সাথে তার দেখা হয় এবং কৃষ্ণের ১০ বছর ২ মাস বয়সের সময়, কৃষ্ণ, কংসকে হত্যা করার জন্য গোকূল-বৃন্দাবনের সকল মায়া ত্যাগ করে মথুরা চলে যায়। পরে কৃষ্ণ আর কোনোদিন বৃন্দাবনে যায় নি, আর রাধার সাথে তার দেখাও হয় নি। রাধা, কৃষ্ণের সমবয়সী হলেও থেকে ১০ বছরের মধ্যে দুজনের দেখা সাক্ষাৎ। এই বয়সে দুজনে বালক বালিকার মধ্যে প্রেম-যৌনতার অনুভূতি কাজ করবে, না খেলার অনুভূতি কাজ করবে ?  ১০ বছর বয়সে কোনো মেয়ের ঋতুচক্রও শুরু হয় না, আর ইস্টোজেন হরমোনের প্রভাবে ঋতুচক্র শুরু না হলে কোনো মেয়ের মধ্যে প্রেমের অনুভুতি জাগতেই পারে না, যেমন টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাবে কেনো ছেলের শরীরে বীর্যের উৎপত্তি না হলে, তার মধ্যেও প্রেমের অনুভূতির সৃষ্টি হবে না। খুব এ্যাডভান্স হলেও একটি মেয়ের প্রেমে পড়তে বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১৪/১৫ এবং ছেলের ১৭/১৮। রাধা কৃষ্ণের প্রেমের ক্ষেত্রে এই বাইলোজিক্যাল সায়েন্সও কি মেলে ?

এরপর উপরে আয়ান ঘোষ সম্বলিত স্বর্গমর্তের যে কাহিনী বলেছি, সেটা একবার স্মরণ করুন। বিষ্ণু যদি কৃষ্ণ হয়ে রাধাকে সঙ্গ দিতেই পৃথিবীতে আসে, তাহলে মাত্র ১০ বছর বয়সে কৃষ্ণ, রাধাকে ত্যাগ করে চলে গেলো কেনো ? পরে তার সাথে আর দেখা করতে এলো না কেনো ? বা কৃষ্ণ, রাধাকে বিয়েই বা করলো না কেনো ?

যে ঘটনা মিথ্যা, তার মধ্যে কোনো না কোনো ফাঁকফোঁকর থাকবেই। এই ফাঁকটা ধরতে পারলেই আপনি বুঝতে পারবেন, কৃষ্ণের প্রেমিকা হিসেবে পৃথিবীতে রাধা বলে আসলে কেউ কখনো ছিলো না। হিন্দুদের উপলব্ধির ভুলে তথাকথিত আধ্যাত্মিক রাধা যখন রক্ত মাংসের রাধায় পরিণত হয়, তখন এই রাধা গিয়ে পড়ে মুসলিম শাসকদের যাঁতাকলে এবং তার সাথে সাথে পিষ্ট হয় কৃষ্ণও ।

এখানে আরো একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, সারা ভারতের মধ্যে বৃন্দাবনের পর রাধার প্রভাব সবচেয়ে বেশী বাঙ্গালিদের মধ্যে এবং তারপর উড়িয়া বিহারীদের মধ্যে। এর মূল কারণ মধ্যযুগের বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যাত্রাপালা, এরপর বাংলায় চৈতন্যদেবের আবির্ভাব এবং তার প্রভাবে বৈষ্ণব পদাবলী । কিন্তু সারাভারত বাদ দিয়ে বাংলার বাইরে হিন্দি এলাকা হওয়া সত্ত্বেও মথুরার বৃন্দাবনে রাধার ঐ বিস্ময়কর প্রভাব পড়লো কিভাবে ?

প্রাচীন যুগে এক কৃষ্ণভক্ত রাজা,  তার মায়ের নির্দেশে, মথুরা-বৃন্দাবনে প্রথম কয়েকটি মন্দির নির্মান করেছিলো। আমার ধারণা, তখন সেই মন্দিরগুলোতে শুধু কৃষ্ণকেই পূজা করা হতো, যেহেতু মূল মহাভারতে রাধার কোনো উল্লেখ ছিলো না। এছাড়াও বৃন্দাবনে এমন কিছু প্রাচীন মন্দির আছে, যেগুলো কৃষ্ণকে নয়, হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেবতাদেরকে রিপ্রেজেন্ট করে। মুসলিম শাসনামলে বৃন্দাবনের প্রায় সকল মন্দিরই ধ্বংস করা হয় এবং সেগুলোকে তখন আর পুণনির্মান করতেও দেওয়া হয় নি। ইংরেজরা ভারতে আসার পর, হিন্দুদের ধর্মীয় মুক্তি ঘটলে সোমনাথ মন্দির সহ সকল ভগ্ন মন্দির পুননির্মান করা হয় এবং এর পর বেশ কিছু বাঙ্গালি- বিহারী উদ্যোক্তা, যারা চৈতন্যদেবের গভীর অনুরাগী, তারা বৃন্দাবনে মন্দির নির্মান করে এবং সেই মন্দিরগুলোতে কৃষ্ণের পাশে রাধাকে বসিয়ে, স্বামী-স্ত্রীর যুগল রূপকে সুড়সুড়ি দিয়ে, রাধা-কৃষ্ণের যুগল রূপের পূজা করতে শুরু করে, যাতে তীর্থ দর্শনে স্বামী-স্ত্রী এক সাথে যায় এবং তাদের মন্দিরের বিজনেসটা ভালো হয়। কিন্তু রাধা-কৃষ্ণ কি স্বামী-স্ত্রী ছিলো ? এছাড়াও চৈতন্যদেব, রাধা কৃষ্ণের যুগল অবতার ব‌'লে যে একটা ধারণা তার ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত আছে, বৃন্দাবনের মন্দিরগুলোতে কৃষ্ণের পাশে রাধার শক্ত অবস্থানের এটাও একটা কারণ।

বৃন্দাবনের আশে পাশের গ্রামগুলোতে রাধার স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে অনেক লোককথা রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, এমনও হতে পারে, রাধা নামের কোনো এক মহিলার জন্ম ঐ এলাকাতে কোনো এক সময় হয়েছিলো। দেবতা হিসেবেই কৃষ্ণের প্রতি ছিলো যার অগাধ প্রেম ও ভক্তি; যেমন নিকট অতীতে ছিলো মীরা বাই নামের এক মহিলার, যে কৃষ্ণ প্রেমে পাগল হয়ে বহু গান লিখে বিখ্যাত হয়ে গেছে, এমনকি সেই মহিলা অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে পর্যন্ত করে নি। এখন কি এই মীরাকেও কৃষ্ণের সাথে যুক্ত করে দুজনকে এক সাথে যৌন লীলায় ভাসাবো ? আবারও কি আমরা লিখবো নতুন কোনো পুরাণ ?

এমনও হতে পারে, রাধা নামের কোনো মেয়ে কৃষ্ণের সময়েই বৃন্দাবনে জন্মেছিলো। কৃষ্ণের সাথে সে খেলাধুলাও করেছিলো। কৃষ্ণের সময় তো অনেকেই বৃন্দাবন-গোকুলে জন্ম নিয়েছিলো, তাদের সবার নাম কি আর মূল মহাভারতে আছে ? উল্লেখযোগ্য না হওয়ায় অন্যান্যদের মতো হয়তো রাধার নামও চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু কৃষ্ণ বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর হয়তো বাল্যকালের খেলার স্মৃতি স্মরণ করে যৌবনে বয়সে কৃষ্ণের জন্য রাধার প্রেম জেগে উঠে, আর সেই কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে চারেদিকে। এটা অসম্ভব কিছু নয়; কারণ, কৃষ্ণ ছিলো সেই সময়ের সুপার হিরো। একবার ভাবুন, যে ছেলে মাত্র বছর বয়সে কালীয় নাগের মতো একটা ভয়ংকর সাপকে তার অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারা বশ করতে পারে, বছর বয়সে নিজের কণিষ্ঠা আঙ্গুলের উপর গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরে রাখতে পারে, দেবরাজ ইন্দ্রকে যে পরাজিত করতে পারে, কংসের মতো শক্তিশালী রাজাকে যে কুস্তি লড়ে পরাজিত করে হত্যা ক’রে অলৌকিকভাবে নিজের পিতা-মাতাকে জল্লাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে, সে সব কথাকে মনে করে যেকোনো মেয়ের মধ্যে যে প্রেম জেগে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য কী ? কিন্তু রাধার এই এক তরফা প্রেমের সাথে কৃষ্ণের কি কোনো যোগাযোগ আছে ? আর কৃষ্ণের চরিত্রকে, সেই রাধার মাধ্যমে কলুষিত করারও কি কোনো সুযোগ আছে?  একদমই নেই, যেহেতু রাধার সাথে কৃষ্ণের পরে আর দেখাই হয় নি।

আজও ঋত্বিকের মতো সুপারস্টারদের প্রেমে সারা বিশ্বের হাজার হাজার মেয়ে হাবুডুবু খায়। প্রেম, বিয়ে দূরে থাক, তাদের মধ্যে কেউ যদি তাকে একবার স্বচক্ষে দেখারও সুযোগ পায়, তাতেও সে নিজেকে ধন্য মনে করে বা করবে। আর সকল নীতি নৈতিকতাকে শিকোয় তুলে রেখে, ঋত্বিকের সাথে একটা রাত কাটাতে চায়, এমন মেয়েও আছে শত শত। ঋত্বিকের মতো সুপারস্টারদের প্রতি মেয়েদের এই যে প্রেম, ভালোবাসা; এটা কি ঋত্বিকের দোষ, নাকি অর্জন ? কৃষ্ণও ছিলো এরকমই, তার সময়ের সুপার হিরো। সুতরাং কৃষ্ণের প্রতি রাধা বা মীরার ওই রকম প্রেম থাকতেই পারে, তাতে তো কৃষ্ণের কিছু করার নেই। আর কৃষ্ণ সেরকম কিছু করেও নি।

এসব বিষয় থেকে দুটো সিদ্ধান্তে আসা যায়, কৃষ্ণের বাল্যকালে রাধা বলে কোনো মেয়ে থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু কৃষ্ণের জীবনে সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিলো না। তাই মহাভারতে তার ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই। এই সূত্রে রাধার বাল্যকালটা ঐতিহাসিক চরিত্র হতে পারে, কিন্তু তাতে কৃষ্ণ চরিত্র কলুষিত হয় না। কারণ, তার সাথে কৃষ্ণের পরবর্তীতে আর দেখা সাক্ষাৎ হয় নি। কিন্তু মধ্যযুগের আবিষ্কার যে যৌবনবতী রাধা, সেটা কিছুতেই ঐতিহাসিক চরিত্র হতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারণ, তা না হলে দ্বারকায় কৃষ্ণের রাজ্য পরিচালনা, মহাভারতের যুদ্ধ এবং কৃষ্ণের বিবাহিত জীবনে এই রাধার কোনো না কোনো ছাপ বা প্রভাব থাকতো। কিন্তু তা কি কোথাও আছে ?

কৃষ্ণ কোনো দিন কারো সাথে অন্যায় করে নি এবং কাউকে কোনো দিন কোনো প্রকারে দুঃখ দেয় নি। খেয়াল করুন, মহাভারতের যুদ্ধের আগে, কৃষ্ণ, যাতে যুদ্ধ না হয়, সেজন্য সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে হস্তিনাপুর রাজসভায় যায় এবং তখন তাকে দুর্যোধন বন্দি করার চেষ্টা করে। নিরপেক্ষতার স্বার্থে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সেই দুর্যোধনকেও কৃষ্ণ তার নারায়নী সেনা দিয়ে দিয়েছিলো এবং নিজে অস্ত্রহীন হয়ে পাণ্ডবদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলো। একবার আঙ্গুল কেটে গেলে, দ্রৌপদী, তারশাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙ্গুলে বেঁধে দিয়েছিলো, তার বিনিময়ে কৃষ্ণ হস্তিনাপুরের রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টার সময়, সেখানে উপস্থিত না থেকেও শত শত হাত শাড়ির মাধ্যমে দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেছিলো। শুধু তাই নয়, পাণ্ডবদের দ্বিতীয় বনবাসের সময়, ভাতের হাঁড়িতে পড়ে থাকা শুধু মাত্র একটি ভাত খেয়ে কৃষ্ণ অলৌকিকভাবে, খেতে বসা উপস্থিত সকল সাধু-সন্ন্যাসীদের পেট ভরিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট চিত্তে বিদায় করতে দ্রৌপদী ও যুধিষ্ঠিরকে সাহায্য করেছিলো।

শ্রদ্ধা ভক্তি নিয়ে স্মরণ করলে যে কৃষ্ণ, তার ভক্তের প্রতি এমনভাবে সাড়া দেয়, সেই কৃষ্ণকে, চৈতন্যদেব প্রভাবিত বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা, এত ডেকেও কেনো তার সাড়া পায় না ? এখানে বলে রাখি, বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধার সাথে কৃষ্ণের কোনো মিলন নেই, এখানে রাধার শুধুই বিরহ আর কৃষ্ণকে পাওয়ার ব্যাকুলতা।

এসব বিষয় বিবেচনা করলে, এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, কৃষ্ণের সাথে যৌবনবতী রাধা, কবিদের উপলব্ধির ভুল আর শুধুই কষ্ট কল্পনা। বাস্তবে বৃন্দাবনে কৃষ্ণের বাল্যকালে কোনো রাধা থেকে থাকলেও, তার সাথে যুবক কৃষ্ণের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এজন্যই রাধা কৃষ্ণের প্রেম, কোনো প্রকারেই ঐতিহাসিক নয়, সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

জয় শ্রীকৃষ্ণ।

বি.দ্র : একটি ফটো পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়েছে রুক্মিণী দেবী ও শ্রীকৃষ্ণ, অনেকে বলে থাকেন, কৃষ্ণের সাথে এটা যে রুক্মিণী, তার প্রমাণ কী ?

যারা এই ধরণের প্রশ্ন করে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনার ঠাকুরদাদার জীবনে যদি দ্বিতীয় কোনো নারীর অস্তিত্ব না থাকে এবং আপনার ঠাকুরদাদার ছবির সাথে যদি কোনো নারীর ছবি থাকে, সেটা যে আপনার ঠাকুরমার ছবি, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে ?

এই সূত্রে, কৃষ্ণের জীবনে যদি রাধা বা অন্য কোনো নারীর কোনো অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে কেউ যদি কৃষ্ণের ছবির সাথে অন্তরঙ্গভাবে কোনো নারীর ছবি জুড়ে দেয়, সে যে কৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিণী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ আছে ? নেই। এইভাবেই কৃষ্ণের সাথে থাকা নারী হলেন কৃষ্ণপ্রিয়া দেবী রুক্মিণী

শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান স্ত্রী কয়জন ? ( পর্ব- ১ )


তথাকথিত নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধারকৃত শ্রীকৃষ্ণের ১৬,১০০ স্ত্রী : ইতিহাস, না কল্পকাহিনী ?

শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহ সম্পর্কে প্রচলিত গল্প এই যে, শ্রীকৃষ্ণের প্রধান মহিষী বা স্ত্রী ছিলো ৮ জন এবং আসামের রাজা নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার করা স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো ১৬,১০০ জন; সব মিলিয়ে শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রীর সংখ্যা ১৬,১০৮।

এই কথা শুনেলই তো প্রথমত যেকোনো হিন্দুর মাথা হেট হয়ে যায়, হিন্দু ধর্মের প্রধান পুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে তাদের আর কোনো গর্ব করার জায়গা থাকে না। আর এই তথ্যকে সামনে এনে মুসলমানরাও যুক্তি দেখায় যে, কৃষ্ণ যদি ১৬ হাজার বিয়ে করতে পারে, তাহলে আমরা চারটা বিয়ে করতে পারবো না কেনো ? আর প্রকৃত তথ্য না জেনে, এইসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বা শ্রীকৃষ্ণের বহু বিবাহের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে আমরা হিন্দুরাও নানা রকম ন্যায় ও যুক্তি সঙ্গত গল্পের অবতারণা করার চেষ্টা করে থাকি, বাস্তবে যার কোনো প্রয়োজনই নেই; কারণ, শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী ছিলো মাত্র এক জন, সে রুক্মিনী। অপর ১৬,১০৭ জন সম্পর্কে যে গল্প, তা যে ডাহা মিথ্যা, তা এই পোস্ট পড়ার পর বুঝতে পারবেন।

বিষ্ণু পুরাণের ৪ অংশের ১৫ নং অধ্যায়ের ১৯ নং শ্লোকে আছে,

“ভগবতোহপ্যত্র মর্ত্যলোকেহবতীর্ণস্য। ষোড়শসহস্রাষণ্যেকোত্তরশতা ধিকানি স্ত্রীণামভবন।।

এর সরল অর্থ শ্রীকৃষ্ণের ষোলহাজার একশত স্ত্রী।

কিন্তু বিষ্ণুপুরাণের ৫ অংশের ২৮ নং অধ্যায়ে বলা আছে,

“অন্যাশ্চ ভার্যাঃ কৃষ্ণস্য বভূবুঃ সপ্ত শোভনাঃ”
“ষোড়শাসন্ সহস্রাণি স্ত্রীণামন্যানি চক্রিণঃ।”


এই দুই শ্লোকের অর্থ হলো কৃষ্ণের মোট স্ত্রীর সংখ্যা ষোল হাজার সাত জন।

এর মধ্যে ষোল হাজার বা ষোল হাজার একশ জন হলো হলো কথিত নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধারকৃত নারী। এই কাহিনীর সূত্রপাত বিষ্ণুপুরাণে এবং তারপর তার বিস্তৃতি ভাগবত পুরাণে। না বুঝে পুরাণকে যেহেতু আমরা হিন্দুরা- বেদ, গীতার পরেই স্থান দিয়ে এসেছি, সেহেতু পুরাণে উল্লিখিত এই সব ঘটনাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমাদের হিন্দুদের ছিলো না, আর পুরাণের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো জ্ঞানী লোকও খুব কম ছিলো, তাই এই ঘটনাগুলো ডালপালা মেলে কৃষ্ণ চরিত্রকে হাজার হাজার বছর ধরে কলুষিত করেছে এবং হিন্দু সমাজ ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

মূল আলোচনার পূর্বে ভাগবত পুরাণ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার, তাহলে বুঝতে পারবেন যে ভাগবত পুরাণ কী জিনিস, আর এই ভাগবত পুরাণের উদ্দেশ্যটা কী ?

বাংলায় দুই ধরণের ভাগবত পুরাণ পাওয়া যায়, একটা হলো সুবোধচন্দ্রের ভাগবত, অন্যটা বেনী মাধব শীলের ভাগবত। দুই ভাগবতের কাহিনী মোটামুটি একই। কিন্তু সুবোধ চন্দ্রের ভাগবতে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে এমন অশ্লীল যে, তা কাউকে পড়ে শোনানো যায় না এবং নিজে পড়লেও সেক্স স্টোরি পড়ার ফিলিংস পাওয়া যায়।

সুবোধ চন্দ্রের ভাগবতে কৃষ্ণের রাসলীলা একটা সেক্স পার্টি, যেখানে নয় লক্ষ পুরুষ এবং নয় লক্ষ নারী নগ্ন হয়ে একত্রে কামলীলায় মেতে উঠে। এর মধ্যে কৃষ্ণও আছে। কিন্তু কোথাও এই কথা বলা নেই যে, রাসলীলার সময় কৃষ্ণের বয়স ছিলো মাত্র ৮, তাই তার পক্ষে ঐ ধরণের যৌনলীলায় অংশ গ্রহন করা সম্ভবই ছিলো না। আর বস্ত্রহরণ পর্বে কৃষ্ণ তো একটা মহা লম্পট, যার উদ্দেশ্যই মনে হবে মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখা। এমনভাবে বর্ণনা করে সুবোধের ভাগবত পুরাণ লেখা। আমি ভেবে অবাক হই যে, শত শত নয়, হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দুরা এসব গো গ্রাসে গিলে আসছে, আর কেউ এর প্রতিবাদ করে বলে নি যে, না, কৃষ্ণ চরিত্র এমন হতেই পারে না; এমন কি কেউ এমন প্রশ্নও তুলে নি যে, ৭/৮ বছর বয়সী একজন বালকের পক্ষে এই রকম যৌন সম্পর্কিত ব্যাপারে জড়ানো কিভাবে সম্ভব ? এর বিপরীতে সবাই সরল বিশ্বাসে ভাগবত পুরাণের কাহিনীকে বিশ্বাস করে এসেছে এবং হিন্দু সমাজকে দিনের পর দিন রসাতলে নিয়ে গেছে।

আগেই বলেছি, সুবোধের ভাগবত এবং বেণীমাধবের ভাগবতের কাহিনী প্রায় সেম। কিন্তু বেণী মাধবের ভাগবতের বর্ণনায়, সুবোধের ভাগবতের তুলনায় অশ্লীলতা কিছুটা কম। কিন্তু রাসলীলা এবং বস্ত্রহরণের ঘটনা একই, উভয়ক্ষেত্রেই কৃষ্ণ যৌনতার জ্বরে আক্রান্ত। তার মানে প্রকৃত সত্য উভয় ভাগবতেই অনুপস্থিত এবং উভয় ভাগবতের উদ্দেশ্যই হলো কৃষ্ণ চরিত্রকে কলুষিত করা। গোপীদের কাপড় চুরির তথাকথিত ঘটনার সময় কৃষ্ণের বয়স যে মাত্র ৭ এবং রাসলীলা সময় তার বয়স মাত্র ৮, এমন তথ্যকে আড়াল করে উভয় ভাগবতেই কৃষ্ণকে পূর্ণ যুবক হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফলে এই ভাগবতগুলো পড়ে হিন্দুরা প্রকৃত সত্যকে জানতে পারে না, এইদিক থেকে বিবেচনা করলে ভাগবতের প্রায় সমস্ত কাহিনী মিথ্যা বা মিথ্যার আড়ালে সত্যকে গোপন করা।

এমন ভাগবতকে আমরা হিন্দুরা ধর্ম পুস্তক জ্ঞান করে পূজা করে আসছি, হিন্দু ধর্ম ও সমাজের পতন কি আর এমনি এমনি ?

যা হোক, কৃষ্ণের ষোল হাজার একশ স্ত্রীর কাহিনী এই সব ভাগবতের মাধ্যমেই লোক সমাজে প্রচারিত, যে ভাগবতের উদ্দেশ্য হলো কৃষ্ণ চরিত্রকে মহান করে তোলা নয়, তাকে ছোট করা; আর যারা ভাগবতকে ধর্ম পুস্তক মনে করে তাদের পক্ষে এসব ঘটনাকে অস্বীকার করার কোনো উপায়ও থাকে না। কিন্তু হিন্দু ধর্ম বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়ে, কৃষ্ণের তথাকথিত সেই ষোল হাজার একশ স্ত্রীর ঘটনাকে গ্রহনযোগ্য করে তোলার জন্য আমরা নানারকম ব্যাখ্যা হাজির করার চেষ্টা করে যুক্তি দিই, সত্য কথা বলতে কি, প্রকৃত সত্যকে না জেনে এই ধরণের যুক্তি আমার আগের পোস্টগুলোতে আমিইও দেবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রকৃত সত্য জানলে এই ধরণের কোনো যুক্তি দেবার প্রয়োজন ই পড়বে না, সেই সত্যই আজ তুলে ধরবে আপনাদের সম্মুখে।

নরকাসুরের জন্ম বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিভিন্ন পুরাণে বলা হয়েছে,

বিষ্ণু যখন বরাহ অবতার রূপ ধারণ করে জলমগ্ন পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, তখন পৃথিবী ও বরাহের সংস্পর্শে নরকাসুরের জন্ম, এই সূত্রে পৃথিবী মানে Earth হলো নরকের মা। এখন বলেন, বাস্তবে এটা কি সম্ভব ? পৃথিবী কি মানুষ, যে সে সরাসরি কোনো মানব সন্তানের জন্ম দেবে ? নরকাসুরের জন্মের এই অবাস্তব কাহিনীই বলে দেয় যে, নরকের ঘটনা সম্পূর্ণ বানানো, বাস্তবে কোনো দিন নরকাসুর ছিলোই না, তাই তার ১৬,১০০ মেয়েকে বন্দী করে রাখা, কৃষ্ণের গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে আনা এবং বিয়ে করা সম্পূর্ণই কাল্পনিক। তাছাড়াও যদি ধরে নিই যে, বরাহ অবতার ও পৃথিবীর সংস্পর্শে কোনোভাবে নরকাসুরের জন্ম হয়েছিলো, তাহলেও কি কৃষ্ণের সময় পর্যন্ত নরকের বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলো ? বরাহ অবতার বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার রূপ ধারণের ঘটনা, যেটা ঘটেছিলো সত্য যুগে, আর কৃষ্ণ, বিষ্ণুর নবম অবতার, এই দীর্ঘ সময় কি নরকাসুর জীবিত থেকে রাজত্ব করে যাচ্ছিলো ?

তবে নরকাসুরের ঘটনা পুরানে আছে এবং সে যে মহাদেবের বর লাভের পর ষোল হাজার মেয়েকে বন্দী করে রেখে তাদেরকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলো, সে কথাও বলা আছে; এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষ্ণ যদি নরকাসুরকে না মারে, তাহলে মারলো কে ?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বোঝা দরকার যে, কৃষ্ণ হলো ঐতিহাসিক চরিত্র আর নরকাসুর হলো পৌরাণিক চরিত্র; পৌরাণিক চরিত্র মানেই কাল্পনিক, আর পৌরাণিক কাহিনীগুলো বানানো শুধুমাত্র লোক শিক্ষার জন্য। সুতরাং কাল্পনিক চরিত্রের সাথে বাস্তব চরিত্রের দেখা সাক্ষাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। পৌরাণিক চরিত্রের বিনাশ পৌরাণিক চরিত্র দিয়েই করতে হয়, তাই পৌরাণিক কাহিনী মতে, শিব, নরকাসুরকে হত্যা করে। সুতরাং নরকাসুরের কাহিনীর সাথে কৃষ্ণের কোনো সংযোগই নেই, তাই কাল্পনিক নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া ষোলহাজার নারীও কাল্পনিক।

আর একটা ঐতিহাসিক তথ্য এখানে জেনে রাখেন, কৃষ্ণের সময় নরকাসুরের রাজত্ব বলে যা বলা হয়, সেই প্রাগজ্যোতিষপুর বা বর্তমানের আসামের রাজা ছিলো ভগদত্ত নামের এক ব্যক্তি, যে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলো এবং অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করে মারা যায়।

কৃষ্ণের জীবনে যে এই ধরণের কোনো ঘটনা, কখনোই ঘটে নি, তার আরেকটা প্রমাণ হলো- মহাভারতে এই ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই, যেমন উল্লেখ নেই রাধার। যদি কৃষ্ণ এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতো, তাহলে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময়, সেখানে উপস্থিত শিশুপাল, যে ছিলো কৃষ্ণের প্রধান শত্রু ও সমালোচক, সে কৃষ্ণ নিন্দার সময় এই ষোলহাজার একশ মেয়ের ঘটনার কথা অবশ্যই উল্লেখ করতো, কিন্তু শিশুপালও তা উল্লেখ করে নি, যেমন শিশুপাল উল্লেখ করে নি রাধার কথা। কারণ, কৃষ্ণের জীবনে রাধা বলে যেমন কেউ ছিলো না, তেমনি তার জীবনে ষোল হাজার একশ মেয়েকে উদ্ধার ও বিয়ে করার ঘটনাও ঘটে নি।

এপ্রসঙ্গে এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, স্টার জলসায় প্রচারিত মহাভারতে কিন্তু শিশুপাল- রাধা ও নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়েদের কথা বলেছে, এই সিরিয়াল দেখে এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, এগুলো সত্য। স্টার পরিবার, কৃষ্ণ সম্পর্কিত প্রচলিত মিথগুলোকেই তুলে এনেছে, তারা কোনো কিছু বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দর্শক হারাতে চায় নি। তাই স্টার জলসার মহাভারত, প্রকৃত মহাভারতের হুবহু নির্মান নয়, অনুষ্ঠানকে জাঁকজমক করার জন্য তারা শুধু প্রচলিত গল্পকেই প্রাধান্য দেয় নি, নানা রকম স্বাধীনতা নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা বলতে পারি, মূল মহাভারতে রুক্মিণীকে বিয়ে করার জন্য কৃ্ষ্ণ একাই যায়, পিছনে কিছু যাদব বাহিনী ছিলো, কিন্তু স্টার জলসার মহাভারতে এখানে অর্জুনের একটা ভূমিকা দেখানো হয়েছে, যা সত্য নয়। এই একই কথা প্রযোজ্য স্টার জলসায় প্রচারিত ভক্তের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে, এরাও কৃষ্ণ সম্পর্কে প্রচলিত ঘটনাগুলোকেই তুলে ধরেছে, গবেষণা করে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার ইচ্ছা এদের নেই, তাই এখানে যেমন রাধাকে দেখতে পেয়েছেন, তেমনি, কৃষ্ণের বহুবিবাহকেও দেখেছেন। কিন্তু এগুলোকে বিশ্বাস করে ঠকবেন না বলেই আশা করছি।

যা হোক, অনেকে, কৃষ্ণের এই ষোল হাজার একশ মেয়েকে উদ্ধার সম্পর্কিত কিছু ভৌগোলিক ঘটনার কথা বলতে পারে, যেমন একটি জায়গার নাম আছে অশ্বক্লান্ত, বলা হয়, কৃষ্ণ, মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে ফেরার সময় সেই জায়গায় তার রথের ঘোড়ারা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো বলে, কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলো, এই ভাবে সেই জায়গার নাম হয় অশ্বক্লান্ত।

আসলে পুরাণে লেখা কাহিনীর প্রভাবে এই নামকরণগুলো ঘটেছে এবং এই ভাবে নামকরণ অসম্ভব কিছু নয়, যেখানে পুরাণ লিখিত হয়েছে হাজার হাজার বছর আগে। এইসব পুরাণের প্রভাবে যেখানে হিন্দুদের চিন্তাধারাই বদলে গেছে, তারা কাল্পনিক ঘটনাকে সত্য বলে মনে করেছে, সেখানে পুরাণে লেখা কাহিনীর প্রভাবে কোনো এক জায়গার নামকরণ হওয়া, এ আর অসম্ভব কী ?

কৃষ্ণের এই ষোলহাজার বিয়ে সংক্রান্ত বিষ্ণুপুরাণের আরেকটি আজগুবি তথ্য, যা আমরা বিশ্বাস করে এসেছি, তা হলো কৃষ্ণের ছিলো ১ লক্ষ ৮০ হাজার পুত্র। আবার এও বলা হয় কৃষ্ণের প্রত্যেক স্ত্রীর ছিলো ১০টি করে পুত্র, একটি করে কন্যা; এই সূত্রে কৃষ্ণের পুত্র কন্যা হওয়া সম্ভব ১,৭৭,১৮৮ জন। পুরাণ রচয়িতাদের মাথা যে ঠিক ছিলো না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত; কারণ, তারা কৃষ্ণের প্রধান স্ত্রী ৮ জন বললেও, নাম দিয়েছে ২১ জনের, এই সূত্রে আবার কৃষ্ণের সন্তান সংখ্যা হয় ১,৭৭,৩৩১ জন। কৃষ্ণ জীবিত ছিলেন ১২৫ বছর, ২৯ বছর বয়সে সে রুক্মিনীকে বিয়ে করে, এর পর থেকে যদি তার সন্তান জন্মানো শুরু করে তাহলে সে সন্তান জন্ম দিয়েছে ৯৫ বছর ধরে, বাস্তবে যেটা অসম্ভব, তারপরও তর্কের খাতিরে সেটাকে সম্ভব বলে ধরে নিলে প্রতিবছর কৃষ্ণ জন্ম দিতো ১৮৬৬ জন সন্তানের, এভাবে প্রতিদিন জন্ম হতো ৫ জনেরও বেশি সন্তানের। এটা কি কখনো সম্ভব ?

প্রকৃত সত্যকে না জেনে বা বোঝার চেষ্টা না করে আমরা কৃষ্ণের ষোল হাজার স্ত্রীকে স্বীকার করে নিয়ে বলি, তারা ছিলো লক্ষ্মীর অংশ বা অবতার এবং কৃষ্ণ একই সাথে সব স্ত্রীর কাছে থাকতে পারতো, তাকে পালা করে কোনো স্ত্রীর কাছে থাকতো হতো না। এভাবে হয়তো কৃষ্ণের পক্ষে থাকা অবশ্যই সম্ভব এবং এভাবে সব স্ত্রীর কাছে প্রতি রাতে থাকলে এক জীবনে অবশ্যই এতগুলো সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কৃষ্ণের এতগুলো সন্তান এবং স্ত্রীর কেউ কার্যক্ষেত্রে উপস্থিত নেই কেনো ? তারা বাস্তবে থাকলে তাদের অস্তিত্বের কোনো প্রমান কি কোথাও থাকতো না ?

উইকিপিডিয়া তো কৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান ৮ স্ত্রী এবং তাদের ছেলে মেয়েদের নামও লিখে রেখেছে। এই তালিকায়, অন্য সাত স্ত্রীর সন্তানদের কথা না হয় বাদ ই দিলাম, কৃষ্ণ ও রুক্মিনীর ছেলে প্রদুম্ন ছাড়াও অন্য ১০ জনের নাম আছে। তাহলে প্রদুম্ন ছাড়া অন্য কোনো পুত্রের নাম বা তার কাজের কোনো কিছুর উল্লেখ শুধু মহাভারতেই নয়, অন্য কোনো পুরাণেও উল্লেখ নেই কেনো ? রুক্মিনীর যদি ১০ পুত্র থাকে, তাহলে তো প্রদুম্নের মতো তাদেরও সমান গুরুত্ব কৃষ্ণের কাছে থাকা উচিত ছিলো। অথচ কৃষ্ণ বলেছে শুধু প্রদুম্নের কথা, কারণটা কী ? কারণটা হলো কৃষ্ণের পুত্র ছিলো একজনই সেটা প্রদুম্ন, আর প্রদুম্নের মা রুক্মিনীই ছিলো কৃষ্ণের একমাত্র স্ত্রী।

কৃষ্ণের স্ত্রী সম্পর্কে উইকিপিডিয়া, যার তথ্য পৃথিবীর কোটি কোটি লোক বিশ্বাস করে, তার দ্বিচারিতার ব্যাপারটা এবার একটু লক্ষ্য করুন :

একটু আগেই বলেছি, কৃষ্ণের প্রধান ৮ স্ত্রী এবং তাদের প্রত্যকের ১০ টি পুত্র এবং একটি করে কন্যার কথা উইকিপিডিয়া তাদের সাইটে লিখে রেখেছে, সেই সাথে আরও যা যা লিখে রেখেছে দেখুন,

“কৃষ্ণ বিদর্ভ রাজ্যের রাজকন্যা রুক্মিণীকে তাঁর অনুরোধে শিশুপালের সাথে অনুষ্ঠেয় বিবাহ মণ্ডপ থেকে হরণ করে নিয়ে এসে বিবাহ করেন। এরপরই কৃষ্ণ ১৬১০০ নারীকে নরকাসুর নামক অসুরের কারাগার থেকে উদ্ধার করে তাদের সম্মান রক্ষার্থে তাদের বিবাহ করেন।[৫৩][৫৪] কৃষ্ণের মহিষীদের মধ্যে আটজন ছিলেন প্রধান, যাদের অষ্টভার্যা নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা হলেন রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, কালিন্দি, মিত্রবৃন্দা, নগ্নাজিতি, ভদ্রা এবং লক্ষণা।[৫৫][৫৬][৫৭] কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে সমস্ত বন্দী নারীদের মুক্ত করেন। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে বন্দী নারীদের সমাজে কোন সম্মান ছিল না এবং তাদের বিবাহের কোন উপায় ছিল না কারণ তারা ইতিপূর্বে নরকাসুরের অধীনে ছিল।… শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই ৷ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর রচিত কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহের ভিত্তিহীন তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেওয়া আছে ৷ কৃষ্ণচরিত্রে দেখা যায় যে, কৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী শুধু পুরাণের একটি অংশে সীমাবদ্ধ ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অন্য কোনো কার্যক্ষেত্রে এসবের উল্লেখ নেই ৷ তিনি এটাকে নেহাতই উপকথা বা গল্প বলে উল্লেখ করেন ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনচরিতে রুক্মিনী ভিন্ন অন্য কোনো পত্নীর কার্যক্রম দেখা যায় না।”

-উইকিপিডিয়া একবার কৃষ্ণের তথাকথিকত সর্বমোট ১৬,১০৮ স্ত্রীর কথা ঘটা করে বলছে, পরে আবার বলছে, “শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই।”

আবার এও বলেছে,

“বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর রচিত কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহের ভিত্তিহীন তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেওয়া আছে ৷ কৃষ্ণচরিত্রে দেখা যায় যে, কৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী শুধু পুরাণের একটি অংশে সীমাবদ্ধ ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অন্য কোনো কার্যক্ষেত্রে এসবের উল্লেখ নেই।”

মানুষ আশা এবং বিশ্বাস করে, উইকি যখন কিছু লিখবে, তখন গবেষণা করে সত্য কথাটাই লিখবে, কিন্তু তারাই যদি এইভাবে দুরকম কথা বলে, মানুষ কিসের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেবে বা সত্য জানবে ? মিথ্যা দিয়ে সত্যকে যতই আড়াল করার চেষ্টা হোক না কেনো, সত্য কোনো না কোনো দিক দিয়ে উঁকি মারবেই, এভাবেই হয়তো কৃষ্ণের স্ত্রী সম্পর্কে সত্য উঁকি দিয়েছে উইকির এই তথ্যে যে, “শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই।”

ভিত্তি থাকবে কিভাবে ? ঘটনা সত্য হলেই তো তার ভিত্তি থাকবে। ঘটনা মিথ্যা বলেই তো তার কোনো ভিত্তি নেই এবং এভাবে হাজারো মিথ্যার আড়ালে প্রকৃত সত্য সন্ধানীদের জন্য উইকির পেজে উঁকি দিচ্ছে একটি সত্য যে,

“শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ এর অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক কোনো ভিত্তি নেই।”

তার মানে এই ব্যাপারগুলো পুরোটাই মিথ্যা। কারণ, কৃষ্ণের স্ত্রী ছিলেন একজনই, সে রুক্মিণী এবং রুক্মিণীর ১০টি নয়, পুত্র ছিলো একটি ই সে প্রদুম্ন, আর প্রদুম্নের পুত্র পুরাণে উল্লিখিত বীর অনিরুদ্ধ।

যার অস্তিত্ব থাকে, সে এভাবেই তার অস্তিত্বের প্রমাণ রেখে যায়, কৃষ্ণের সব স্ত্রী ও পুত্রের কথা না হয় বাদ ই দিলাম, পুরাণ বা উইকি যে বলেছে, রুক্মিনী ও কৃষ্ণের আরো ১০ পুত্র ছিলো, তারা কে কোথায় ? কোথাও তাদের কোনো কথা নেই কেনো ? যে প্রশ্নটা আগেও করেছি। এদের উল্লেখ নেই, এই কারণে যে প্রদুম্ন ভিন্ন কৃষ্ণের কোনো পুত্রই ছিলো না। আর অন্য কোনো পুত্র না থাকাটা এটা প্রমান করে যে, প্রদুম্নের মা রুক্মিনী ছাড়া কৃষ্ণের অন্য কোনো স্ত্রীই ছিলো না।

সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহ নিয়ে যে প্রচলিত গল্প, তা যে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বানোয়াট, আশা করছি তা আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।