Showing posts with label আর্য সমাজী. Show all posts
Showing posts with label আর্য সমাজী. Show all posts

Thursday, 1 October 2020

পরিণত বয়সে বীর্যপাত- সমস্যা, না সামাধান ?

পরিণত বয়সে বীর্যপাত- সমস্যা, না সামাধান ?

সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজদের অকারণ বীর্যধারণের মাতামাতির বিরুদ্ধে আমি একটি প্রবন্ধে এ কথা বলেছি যে- পরিণত বয়সে প্রয়োজনে বীর্যপাত কোনো সমস্যাই নয়, বরং এটা দেহের জন্য নানাভাবে উপকারী বা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান। আমার প্রায় সব পাঠকই বিষয়টি মেনে নিয়েছে, কিন্তু আর্য সমাজের অবাস্তব থিয়োরি দ্বারা প্রভাবিত #Anonno_Asim এর মাথায় আমার ঐ প্রবন্ধটি মনে হয় বাজ ফেলেছে, তাই সে আমার বক্তব্যের বিরুদ্ধে একটি প্রবন্ধ লিখে পোস্ট করেছে, যা ফটো আকারে আমার এই প্রবন্ধের সাথে যুক্ত করে দিয়েছি, তার বক্তব্যকে খণ্ডন করবো আমার এই প্রবন্ধে-

দিব্যজ্ঞানী #Anonno_Asim তার পোস্টের শুরুতেই বলেছে,

"পোষ্ট দাতা #Rupok_Ray ব্রহ্মচর্য বলতে কি বুঝে সেটা সে নিজেও বোধগম্য নয়। বোধগম্য হবেই বা কিভাবে যে হস্তমৈথুন নামক ভয়ানক অভ্যাসের সাফাই গাইছে সে কিভাবে সংযম নামক জিনিটা বুঝবে।"

-ব্রহ্মে বিচরণ করাই হলো ব্রহ্মচর্য, কিন্তু বর্তমানে সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজরা ব্রহ্মচর্য বলতে আমাদের পাবলিকের মাথায় ঢুকিয়েছে বীর্যকে ধারণ করা, যেন বীর্যকে ধারণ করে তারা জগতের বিশাল কল্যান করে ফেলবে! তাই যেহেতু তারা বীর্যকে ধারণ করে, সেহেতু তারা নিজেদেরকে ভাবে উর্ধ্ব জগতের মানুষ, তাই যারা বীর্যকে ধারণ করে না, তারা হলো বীর্যধারকদের কাছে কামিনীকাঞ্চণে বশীভূত নিম্নস্তরের খুবই সাধারণ মানুষ। আর একারণে তথাকথিত বীর্যধারক ব্রহ্মচারীদের কাছে, বিয়ে-শাদী করা, সন্তানের জন্ম দেওয়া মানুষেরা হলো ইতরশ্রেণীর মানুষ, আর ইতরশ্রেণীর মানুষের যৌনতায় জন্ম নিয়েও তারা হলো দেবতাশ্রেণীর মানুষ ! এ প্রসঙ্গে আমি শুধু একটি কথা ই বলবো- বীর্যধারণ যদি খুবই গুগরুত্বপূর্ণ হতো, তাহলে মহামুনি বেদব্যাস- ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের জন্মের জন্য নিজের বীর্য ত্যাগ করতো না, আর বৈদিক ঋষিরা বিয়ে করে সন্তানের জন্ম দিতো না। চৈতন্যদেবের অনুসারী সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-মহারাজদের ভাব দেখলে মনে হয়, এরা এক একজন বেদব্যাসের চেয়েও বড় মুনি এবং বেদ রচয়িতা ঋষিদের চেয়েও বড় ঋষি।

যা হোক, পরিণত বয়সে প্রয়োজনে হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত যে ভয়ানক কিছু নয়, সেটা বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা বার বার প্রমাণিত হয়েছে, এই প্রবন্ধে সেগুলোই আজ আলোচিত হবে, তার আগে হস্তমৈথুনের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া যাক-

অতি প্রাচীনকাল থেকেই হস্তমৈথুন মানব সমাজের একটি অঙ্গ হয়ে আছে । পুরুষের হস্তমৈথুনের পাথরে আঁকা ছবি অনেক পাওয়া গেছে । চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মাল্টার একটি মন্দিরে হস্তমৈথুন রত একজন নারীর একটি পোড়ামাটির মূর্তি পাওয়া গেছে।

প্রাচীন সুমেরীয়রা হস্তমৈথুন কে যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসাবে চর্চা করত । পুং হস্তমৈথুন প্রাচীন মিশরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখনকার ফারাওদের নীলনদের তীরে বছরের একটি বিশেষ সময়ে হস্তমৈথুন করা বাধ্যতামূলক ছিল ।

প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থ কামসুত্রতেও হস্তমৈথুনের উল্লেখ আছে। প্রাচীন গ্রীকরা হস্তমৈথুনকে যৌন হতাশা থেকে মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলে মনে করত । প্রাচীন গ্রীসে মেয়েদের হিস্টিরিয়ার চিকিৎসা হস্তমৈথুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা হতো । কিন্তু ১৭১৬ সালে এটাকে ভয়াবহ পাপ হিসেবে আখ্যায়িত করে লিফলেট প্রচার করা হয় এবং বলা হয় এটা করলে যৌনশক্তি লোপ, গনোরিয়া এবং মৃগী রোগ দেখা দেয় । ১৭৬০ সালে Samuel-Auguste Tissot. নামের এক ব্যক্তি একে মানবদেহের প্রতি ভয়াবহ ক্ষতিকর এবং অসংখ্য রোগ সৃষ্টিকারী হিসাবে বর্ণনা ক'রে L’Onanisme নামে একটি বই লিখে । কিন্তু এসব ভ্রান্ত ধারনার অবসান ঘটতে শুরু করে যখন ১৮৯৭ সালে H. Havelock Ellis, তার বিখ্যাত বই Studies in the Psychology of Sex নামক বই লেখেন । তারপর থেকেই মানুষ এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে।

এতক্ষণ আমি হস্তমৈথুনের যে ইতিহাস বললাম, সেটা সত্য কি না, তা প্রমাণ পাবেন নিচের এই লিঙ্কে ক্লিক করে-

http://shadhinbangla24.com/bn/news/317578?fbclid=IwAR1_XRbC6s59Z-DnxBrgGvB2fu8DyFUFI-M6mpV9axeWCRva8aMkfQxjhBc

বর্তমান সময়ে যুবসমাজের মাথায় হস্তমৈথুন ভয়াবহ রূপ নিয়ে পরিচিতি পেয়েছে হাটে বাজারে যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধ বিক্রেতা হকারদের মাধ্যমে, যেহেতু বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত কোনো পু্রুষ হস্তমৈথুন না করে থাকতে পারে না, আবার অনেকে দৈহিক সুখের নেশাতেও দিনের পর দিন হস্তমৈথুন করে থাকে, সেহেতু হকাররা পুরুষের এই স্বভাবকে কাজে লাগিয়ে প্রচার করে যে হস্তমৈথুন করার ফলে তারা এক সময় যৌনশক্তিহীন হয়ে পড়বে, বিয়ের পর সহবাসের মাধ্যমে স্ত্রীকে খুশি করতে পারবে না, স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে, দিনের পর দিন এসব শুনতে শুনতে পুরুষেরা ভয় পেয়ে যায়, বাস্তবেও তারা দেখে হস্তমৈথুন করতে গেলে খুব তাড়াতাড়ি তাদের বীর্যপাত হয়ে যাচ্ছে, এমনকি ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হয়েও তাদের শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা ধরে নেয়ে সত্যিই হস্তমৈথুন খুব খারাপ একটি বদঅভ্যাস, তাই এতদিন যা করার করেছে, আর করবে না, এখন ঔষধ খেয়ে যৌনশক্তিকে ঠিক রাখতে হবে, যাতে বিয়ের পর স্ত্রীর কাছে লজ্জা পেতে না হয়, এই সিদ্ধান্ত থেকেই সে দ্বারস্থ হয় ঐসব হকারদের বা কোনো যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধ বিক্রেতা কোম্পানির কাছে, আর এতেই তারা তাদের ভুল প্রচারের ফসল ঘরে তুলে নিজেদের পকেট ভরাতে পারে।

কিন্তু বিয়ের পূর্বের এই দ্রুত বীর্যপাত যে কোনো রোগ বা সমস্যা ই নয়, সেটা আপনি বুঝতে পারবেন, এই বিষয়ে কোনো শিক্ষিত ডাক্তারের সাথে কথা বলতে গেলে, তারা একবাক্যে বলবে, এটা কোনো সমস্যা ই নয়, বিয়ের পর এমনি ই সব ঠিক হয়ে যাবে, বাস্তবে ঠিক হয় ও। বিয়ের মূল উদ্দেশ্যে যেহেতু যৌনতা, তাই বিয়ের পর এটা নিয়ে সব পুরুষই এই টেনশনে থাকে যে, সে ঠিক মতো পারবে তো, আর এতেই তার দ্রুত বীর্যপাত হয়ে যায়, কিন্তু কিছুদিন যেতেই যখন যৌনতা সাধারণ বিষয় হয়ে উঠে, এটা নিয়ে আর কোনো টেনশন থাকে না, তখন আস্তে আস্তে সময় বৃদ্ধি হতে থাকে এবং এক সময় মনে হয়, তাড়াতাড়ি হয় না কেনো ? তবে এটা সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরের জন্য প্রযোজ্য, যারা শারীরিকভাবে দুর্বল, নিয়মিত ব্যায়াম বা খেলাধুলা করে না, তারা যতই ভালো খাবার খাক, বিয়ের পর যৌনশক্তির সমস্যায় কিছু না কিছু ভুগবেই, সেক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ভারতের অ্যাপেলো গ্লেনিগলস হসপিটালের বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট ডা. ত্রিদিবেশ মণ্ডল বলেছেন, " হস্তমৈথুন দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সমাজে একটি ক্ষতিকারক এবং অনৈতিক জিনিস হিসাবে বিবেচিত হয়। তবে এখন এটি গৃহীত হয়েছে যে এটি মোটেই সত্য নয়।"

যা হোক, প্রবন্ধের এক স্থানে #Anonno_Asim বলেছে,

"মিসেস রুপশ্রী রায়/রুপক রায় ব্রহ্মচর্য মানে সারাজিবন বিয়ে না করে থাকা না বা ব্রহ্মচারী হয়ে থাকা নয় বা আপনার কথা নুপুংস হয়ে যাওয়াও নয়। ব্রহ্মচর্য মানে একটা নির্দিষ্ট বয়স অব্দি অর্থ্যাৎ বিয়ে হবার আগ পর্যন্ত বীর্যকে ধারন করা আর সংযমের সহিত জীবন ধারন করা।"

-ওরে বলদা, আমি তো আমার সেই পোস্টের শিরোনামেই সেই কথা বলে দিয়েছি যে, পরিণত বয়সে বীর্যপাত, আমি কি আমার প্রবন্ধে অপরিণত বয়সে বীর্যপাতের পক্ষে সাফাই গেয়েছি ? যারা বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী, তারা কথা বুঝে কথা বলে, আপনার মতো একটু গুতা খেয়েই ছাগলের মতো লাফায় না।

এরপর #Anonno_Asim বলেছে,

"আর আপনি আপানার লিখাতে বলেছেন যুবক বয়সে হস্তমৈথুন কোন ক্ষতিকর নয় ইহা খুব উপকারি,শরিরের জন্য খুব ভাল স্বাস্থের জন্য ভাল,যুবক বয়সে হস্তমৈথুন না করলে স্বাস্থের ক্ষতি হয়,আপনি তো মিয়া দেখি বিজ্ঞনের উপরে ডক্টরেট করা।তা এই থিওরি টা কোন বিজ্ঞানির থেকে ধার করা যে যুবক বয়সে উত্তেজনা হলে হস্তমৈথুন উপাকারি.?"

-দেহে প্রবল যৌনউত্তেজনা শুরু হলে, তা প্রশমনে হস্তমৈথুন যে কোনো খারাপ বিষয় নয়, তা দেহের জন্য উপকারী ই, তা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে নানাভাবে প্রমাণিত, এর জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডক্টরেট হওয়ার দরকার নেই, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান এবং নিজের শরীরের বাস্তবতা চিন্তা করলেও বোঝা যায়। আলোচনার সকল স্তরে এই কথাটা মনে রাখবেন যে, আমি কিন্তু বলেছি- পরিণত বয়সে প্রয়োজনে হস্তমৈথুনের কথা; হস্তমৈথুন আপনি যখনই করবেন, তখনই সুখ অনুভব করবেন, যে কারণে যুবক যুবতীরা খেয়ালের বশে হস্তমৈথুন করে থাকে, কিন্তু শারীরিক চাহিদা সৃষ্টি না হলে হস্তমৈথুন করে চুড়ান্ত সুখ যেমন আপনি কখনোই পাবেন না, তেমনি এই ধরণের চাহিদাবিহীন হস্তমৈথুনে আপনার শরীরের ক্ষতিই হবে।

প্রয়োজনে হস্তমৈথুন করলে আপনি কী ধরণের শারীরিক ও মানসিক উপকার পেতে পারেন, সেগুলো দেখে নিন নিচে-

সুস্থ থাকতে সপ্তাহে কতবার বীর্যপাত করা উচিত?

এই প্রশ্নের জবাবে পূর্বোল্লিখিত অ্যাপেলো গ্লেনিগলস হসপিটালের বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট ডা. ত্রিদিবেশ মণ্ডল বলেছেন, "সহবাস বা মৈথুনের মাধ্যমে প্রতিদিনই করতে পারেন। তবে সপ্তাহে একদিন করার তুলনায় যাঁরা রোজ বা সপ্তাহে তিন-চারদিন করেন তাঁদের শরীর বেশি ভাল থাকে।"

এছাড়াও প্রায় সকল বিশেষজ্ঞ বলেন যে- হস্তমৈথুন শরীর এবং স্বাস্থ্যের জন্য একটি মনোরম, উপকারী অভিজ্ঞতা। এর মাধ্যমে যে সকল উপকার পাওয়া যায়, সেগুলো হলো-

১. ক্যান্সার থেকে রক্ষা : এক্সএনইউএমএক্স- এ অস্ট্রেলিয়ায় করা একটি গবেষণা অনুসারে সপ্তাহে একাধিকবার বীর্যপাত করা পুরুষদের প্রেস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে, এই একই ধরণের কথা বলেছে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত ক্যান্সার এপিডেমিওলজি কেন্দ্র, তারা জোর দিয়ে বলেছে- ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে পাঁচ বারের বেশি বীর্যপাত ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

২. শক্তি দেয় : বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের যৌনাঙ্গের পেশীসহ অন্যান্য পেশী দুর্বল হয়ে পড়ে। নিয়মিত যৌনক্রিয়া বা হস্তমৈথুন এই পেশীগুলোকে সবল রাখে। এটি ইরেক্টাইল ডিসফাংশন এবং মূত্রত্যাগের অনিয়মকে প্রতিরোধ করে। ইরেক্টাইল ডিসফাংশন হলো যৌন উত্তেজনা না আসা। অর্থাৎ আপনি যদি দীর্ঘদিন যৌনক্রিয়া না করেন, তখন দেখবেন যখন প্রয়োজনে যৌনক্রিয়া করতে চাইছেন, তখন উত্তেজনা না আসায় যৌনক্রিয়াই করতে পারছেন না। ব্যাপারটি এমন- কাজ না করে ফেলে রাখলে যেমন অস্ত্রপাতি ভোঁতা হয়ে যায়, তার ধার থাকে না বা তা কাজের উপযোগী থাকে না, তেমনি যৌনতাও, আপনি যদি রেগুলার এটার প্রয়োগ না করেন, এক সময় এটাও তার কার্যকারিতা হারাবে।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি : হরমোন থেরাপিস্ট জেনিফার লণ্ড বলেছেন, বীর্যপাত কর্টিসোল হরমোনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে।

৪. মেজাজে ফুরফুরে ভাব আনতে সাহায্য করে : বীর্যপাতে- দেহে ডোপামিন বা অক্সিটোসিনের তো নিউরো রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ ঘটে, যা মানুষকে সুখী করে বা সন্তুষ্টি প্রদান করে। গ্লোরিয়া ব্র্যাম নামের এক যৌন বিজ্ঞানী বলেছেন, ডোপামিন নিঃসরণের একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলো হস্তমৈথুন বা বীর্যপাত।

৫. মানসিক চাপ কমায় : এ প্রসঙ্গে ড. হল নামের একজন যৌনবিজ্ঞানী বলেছেন- আপনি যদি কখনো প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন, তখন হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত আপনাকে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে পারে।

৬. ঋতুস্রাবজনিত ব্যথা কমায় : ঋতুস্রাবজনিত ব্যথায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভোগে অবিবাহিত মেয়েরা, যেহেতু তারা যৌনক্রিয়া করে না। বিবাহিত নারী, যারা রেগুলার যৌনক্রিয়া করে তারা এই সমস্যায় তেমন ভোগেই না। এসব ক্ষেত্রে যৌনক্রিয়ার সুযোগহীন নারী যদি হস্তমৈথুন মাধ্যমে তাদের আর্গাজম ঘটায়, তারা এই সমস্যাকে অনেক খানি ই কমিয়ে আনতে পারে।

৭. ভালো ঘুমে সাহায্য করে : নানা কারণে মানুষ অনিদ্রায় ভুগে থাকে, আর অনিদ্রা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর একটি ব্যাপার। বিবাহিতরা এই অনিদ্রা থেকে খুব সহজেই মুক্তি পারে যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে; কারণ, যৌনক্রিয়ায় পরিশ্রম হয়, শরীরের ক্যালোরি ক্ষয় হয় এবং পেশীগুলোর ব্যায়াম হয়। কিন্তু যারা সিঙ্গেল, তারা হস্তমৈথুন করেও এই একই ধরণের শারীরিক উপকার পেতে পারে।

এতক্ষণ আমি হস্তমৈথুন বা বীর্যপাতের যেসব উপকারিতার কথা বললাম, সেগুলোর সত্যাসত্যের প্রমাণ পাবেন নিচের এই লিঙ্কে-

https://www.1faydalari.com/bn/masturbasyonun-faydasi/

এছাড়াও ঘুমের মধ্যে যদি কেউ প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করে এবং স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্যপাত না ঘটে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব হস্তমৈথুনের মাধ্যে বীর্যপাত করিয়ে ফেলাই ভালো, না হলে ভালো ঘুম তো হবেই না, এর সাথে জননাঙ্গের এলাকায় ব্যথাসহ নানা ধরণের শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

সুতরাং চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে পরিণত বয়সে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পরিমাণে হস্তমৈথুন শরীরের পক্ষে ভালোই। অল্প ক্ষেত্রে শারীরিক বা মানসিক কোন ক্ষতিসাধন করে না। তবে মনে রাখতে হবে Excess is everything bad.

এডাল্ট বয়সে নারী ও পুরুষের জন্য যৌনতা একটি স্বাভাবিক বিষয়, এই বয়সে যদি তারা যৌনক্রিয়া না করে, তাহলেই নানা ধরণের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখী হয়। ২৫ এর পর কোনো নারী যদি বৈধ যৌনক্রিয়ার করার পর্যাপ্ত সুযোগ না পায়, সেই নারীর শুধু চেহারার উজ্জ্বলতা ই নষ্ট হয় না, সে নানা ধরণের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখী হয়। প্রবাসীদের স্ত্রীদের মধ্যে এই ধরণের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা বেশি দেখা যায়। যেকোনো ডাক্তারের সাথে কথা বললেই আমার এই কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেন। এই সমস্যা থেকে তারা মুক্তি পেতে পারেন হস্তমৈথুনের মাধ্যমে নিজেদের অর্গাজম ঘটিয়ে।

#Anonno_Asim, আপনি আপনার পোস্টে টেস্টোস্টেরন হরমোন প্রসঙ্গে বলেছেন, এটা একজন পুরুষকে পুরুষ বানায়, এই কথা আমিই প্রথম বলেছি আমার এ সম্পর্কিত আগের পোস্টে; যা হোক, এ প্রসঙ্গে আপনি টেস্টোস্টেরণ হরমোন কী, পুরুষের শরীরে এর ভূমিকা কী, এসম্পর্কে নানা কথা বলে শেষে প্রশ্ন করেছেন-এটা এমন একটি হরমোন যা দ্বারা আপনার পুরুষত্ব প্রকাশ পায় আর সেটাই যদি আপনি নষ্ট করেন তো আপনি বিয়ের পর স্ত্রী সঙ্গই করবেন কিভাবে আর সুস্থ,জ্ঞানী সন্তানই বা কিভাবে জন্ম দিবেন.?

আমার পোস্টে আমি বরাবরই কিন্তু বলেছি পরিণত বয়সে শারীরিক উত্তেজনায় বীর্যপাত করার কথা, অপরিণত বয়সে নয়, সেটা কি আপনার মাথায় ঢোকে না ?

এ প্রসঙ্গে আপনি আরো বলেছেন- হস্তমৈথুন এর জন্য তো এমনি ই নপুংসক হয়ে যাবেন।

- প্রাপ্ত বয়স্ক হলে কোনো পুরুষ যদি তার সঙ্গিনীর সঙ্গে যৌনক্রিয়া না করে বা হস্তমৈথুন না ক'রে, এই শক্তিটাকে দমন করে, তাহলে বেশ কয়েক বছর পর সে এমনিতেই যৌনক্ষমতাহীন নপুংসকে পরিণত হবে। আর এটা হবে তার যৌনশক্তিকে ব্যবহার না করার জন্য। পরিণত বয়সে বীর্যপাত, সেটা যেভাবেই হোক, মানুষের যৌনক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে এবং মানুষকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখে। একটা কথা মনে রাখবেন, যতদিন কোনো মানুষ যৌনজীবনে ফিট, ততদিনই সে সকল কাজে সক্ষম, কিন্তু যখনই তার যৌনজীবন শেষ হয়ে যাবে, তখনই সে বৃদ্ধ। আর মানুষের এই কর্মক্ষমতাকে ধরে রাখার একমাত্র উপায় হলো রেগুলার যেকোনো উপায়ে বীর্যপাত ঘটানো।

এরপর আপনি স্বরূপানন্দ,প্রনবানন্দ বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ,চৈতন্য দেব প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছেন - এনারা বিয়ে না করে সমাজ,দেশ,মানুষের হিতার্তে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, এটাই তাঁদের ভুল, এজন্য তাঁদের অনুসারি কম ?

-আপনি যাদের কথা উল্লেখ করললেন, বাস্তবে, সমাজে কি এদের কোনো উপকারি ভূমিকা আছে ? চাণক্য নীতি অনুসারে পুত্রহীন পরিবারকে যেমন শূন্য বা ভ্যালুলেস বিবেচনা করা হয়, তেমনি যে ব্যক্তি সন্তানের জন্ম দেয় নি, সেও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মূল্যহীন। আমরা হিন্দুরা নির্বোধ বলেই এদেরকে আমরা মহাপুরুষ মনে করি, এদেরকে শ্রদ্ধা বা পূজা করে নিজেদের সর্বনাশ করি। বাংলায় এত এত মহাপুরুষ, তা সত্ত্বেও বাংলার হিন্দুদের এই দুর্দশা কেনো ? কেনো বাংলার হিন্দুদেরকে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে দেশান্তরিত ও ধর্মান্তরিত হতে হচ্ছে ? হচ্ছে এই কারণেই যে এরা মহাপুরুষ নয়, অধমপুরুষ বা নপুংসক। সমাজে- এদের উপকারী যে ভাব, সেটা আধ্যাত্মিক, বাস্তবিক নয়। প্রণবানন্দের সংগঠন ভারত সেবাশ্রম সংঘ, হিন্দু যুবকদেরকে নিরামিষ খাইয়ে তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হীনদুর্বল বানাচ্ছে; তাই যদি না হয়, তাহলে ভারত সেবাশ্রম সংঘের ছাত্রাবাসে থাকা কোনো যুবক কি আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কিছু করে হিন্দু জাতির মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছে ?

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশন তো সর্বধর্ম সমন্বয়ের নামে মাঝে মাঝে সভা করে হিন্দু যুবক যুবতীদেরকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে উৎসাহিত করে, এটা হিন্দুসমাজের জন্য উপকারী, না ক্ষতিকর সংগঠন ?

চৈতন্যদেবের আদর্শে এ পর্যন্ত শত শত যুবক- বিয়ে করে নি, সন্তানের জন্ম দেয় নি, তারা সংসার ত্যাগ করে বৈরাগী হয়ে ভিক্ষা করে জীবন অতিবাহিত করেছে, করছে; এদের দ্বারা সমাজের কী উপকার হয়েছে ?

ধরে নিলাম, এদের সম্পর্কে আমার যে অভিমত বা ধারণা তা ভুল, তাহলে এত সব বীর্যধারণকারী আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ বাংলায় থাকতে- আজকে বাংলার হিন্দুদের পায়ের তলায় মাটি নেই কেনো ? কেনো আমরা এই ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি যে- বাংলার হিন্দুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ? এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখানে সুরক্ষিত থাকবে না, হয় তারা ইসলামে কনভার্ট হতে বাধ্য হবে, নয় তারা নিহত হবে, কেনো এই ভাবনা আমাদেরকে গ্রাস করছে ?

আমি যা বলি, তা দূরদৃষ্টিতে সঠিক কি না, তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি, যদি আপনার মাথায় মাল থাকে, তাহলে ঠিক বুঝতে পারবেন-

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলায় এমন কোনো হিন্দু ছিলো না যে- সে, রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমকে স্বীকার করতো না। যদিও এ নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন জাগতো, কিন্তু খোলাখুলি এটার বিরোধিতা করার মতো জ্ঞান বা সাহস কারোরই ছিলো না। ২০১৬ সালে প্রথম আমি, এই যুবক শ্রীকৃষ্ণের জীবনে যুবতী রাধা বলে যে কেউ নেই, সেই মত প্রকাশ করি, আর এতে প্রায় সমস্ত হিন্দুর একটি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস, যা প্রায় ৮০০ বছর ধরে চালু ছিলো, তা ধ্বসে পড়ে এবং আজ পর্যন্ত কেউ আমার এই মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে নি। 

আপনি আমাকে ফেসবুক ফণ্ডিত বলে টিটকারী মারতেই পারেন, কিন্তু তাতে আমার পাণ্ডিত্যের কোনো ক্ষতি হবে না বা কেউ আমার পাণ্ডিত্যের উপর মাস্তানিও করতে পারবে না। একটা কথা মনে রাখবেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবদ্দশায় অখণ্ড ভারতের বেশির ভাগ লোক শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করতো না, তাতে শ্রীকৃষ্ণ যে ঈশ্বর নয়, সেটা প্রমাণ হয় নি। বরং যত সময় গড়িয়েছে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক মহিমার প্রকাশ ততবেশি বৃদ্ধি এবং প্রচারিত হয়েছে। একইভাব আপনিও আমার পাণ্ডিত্যকে স্বীকার করতে না পারেন, তাতে আমার পাণ্ডিত্যের প্রভাব বা মহিমা কমে যাবে না, বরং তা বাড়ছে এবং বাড়বে; কারণ, প্রকৃত সত্য আমার জ্ঞানের আধার।

এরপর অনুকূল, হরিচাঁদ বিষয়ে আপনি যে বলেছেন- "পঁচা খাবারে মাছির একটু উৎপাত বেশিই হয়।আশা করি বুঝছেন।" এর দ্বারা আপনি বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। আমি আমার ঐ পোস্টে বলেছি- সম্পূর্ণ ভ্রান্ত থিয়োরি হওয়া সত্ত্বেও শুধু একটি সঠিক কাজ, বিয়ে করা এবং সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই আজ অনুকূল, হরিচাঁদের রমরমা। আর আমার এই কথার দ্বারা তাদেরকে আমি সমর্থন করি নি, বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছি মাত্র।

আর আমি যে অনুকূলকে আমার গুরুদেব মানি না, সেটা আমার পোস্ট রেগুলার পড়লে বুঝতে পারতেন। অনুকূলের সৎসঙ্গকে আমি বলি অসৎসঙ্গ, আর তার সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করাও আমার একটি লক্ষ্য, কিন্তু এটা এত সহজে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না, শুধু তার উত্তরাধিকারী রেখে যাওয়ার জন্যই। কারো বীর্য যখন সন্তানের জন্ম দেয়, সেটা তার শক্তিতে পরিণত হয়। অনুকূল, হরিচাঁদ সেই শক্তির চারা রোপন করে গেছে; অন্যান্য বলদের মতো নিজের আদর্শকে ধরে রাখার জন্য অন্য মানুষের বীর্যের শক্তির উপর নির্ভর করে নি। অনুকূল যে মুসলমানদের ভয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়েছে, এটা তার ভুল আদর্শের ফলে, যে ভুল আদর্শের বিরুদ্ধেই আমার লড়াই। আপনি যদি আপনার পিতার আদর্শ সন্তান হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আপনার পিতার শক্তি, আর আপনার মতো শক্তির জন্ম হয়েছিলো আপনার পিতার বীর্যক্ষয়ের ফলেই, কথাটা মনে রাখবেন। অনুকূল আর হরিচাঁদ বীর্যক্ষয় করেছিলো বলেই আজ তাদের অনুসারীর সংখ্যা লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি, সেই তুলনায় অন্যদের অনুসারীদের সংখ্যা তো হাতে গোনা যাবে। এই তথ্যগুলো কী প্রমাণ করে, বীর্যক্ষয়ের শক্তি নাই ?

এরপর আপনি বলেছেন- "যা হোক পারলে সবাইকে হস্তমৈথুন, বীর্যক্ষয়ের ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরে নিরুৎসাহিত করুন হস্তমৈথুন করার প্রশ্রয় নয়।"

-আমি চাই মানুষের সার্বিক কল্যান, তাই যেটা বাস্তব এবং উপকারী, সেই উপদেশই আমি মানুষকে সব সময় দিই, সেটা যারা গ্রহন করবে, নিশ্চয় তারা উপকৃত হবে; ক্ষুধা লাগলে মানুষকে যেমন খেতেই হবে, তেমনি পায়খানা চাপলে তাকে মল ত্যাগ করতেই হবে, একইভাবে উত্তেজনা প্রবল হলে তাকে তার প্রশমন করতেই হবে, সঙ্গিনী থাকলে হয় সঙ্গিনীর কাছে গিয়ে, নয়তো নিজের হাত ব্যবহার করে, এটাই বাস্তবতা; এই বাস্তবতা যে না মানবে সে হবে নপুংসক বা দিব্যজ্ঞানী, যার দ্বারা সমাজের বিন্দুমাত্র উপকার হবে না; কারণ, সে নিজেই সুস্থ নয়, এই ধরণের দু চার জন ব্যক্তির মনোরঞ্জনের জন্য আপনার মতো নির্বোধের কথা আমি শুনবো, সেটা আপনি ভাবলেন কিভাবে ? বীর্যধারণের পক্ষে তো খুব সাফাই গাইছেন, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে আপনি উত্তেজনার বশে কখনো হস্তমৈথুন করেন নি ? ভণ্ড কোথাকার ?

এরপর বিবাহিত জীবনে বীর্যক্ষয়ের কথা বলতে গিয়ে মনু সংহিতার রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন- মাসে একবার স্ত্রী সহবাস করার নিয়ম। আপনি যদিও মনুসংহিতার সব রেফারেন্স মানেন না, যেটা আপনার পছন্দ হয়, সেটা মানেন, আর যেটা পছন্দ হয় না, সেটাকে গঙ্গা জলে চুবিয়ে আনতে বলেন। যা হোক, আমি চাই আপনি বিয়ের পর মনু সংহিতার এই রেফারেন্সটা মেনে চলবেন, যাতে আপনার স্ত্রী পরপুরুষের সাথে সেক্স করার একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পায় যে, তার স্বামী তাকে প্রয়োজন মতো সময় দেয় না বা তার স্বামীর কোনো যৌনশক্তি নেই; কেননা, যার যৌনশক্তি আছে, তার পক্ষে তো স্ত্রী কাছে থাকলে সহবাসের জন্য ৩০ দিন ধৈর্য ধরা সম্ভব নয়, এটা সম্ভব একমাত্র নপুংসকদের জন্যই। তাই আমি চাই মনুর বিধান মতো আপনি ৩০ দিন পর পর যৌনমিলনে যাবেন, আর এর ফাঁকে আপনার স্ত্রী যদি আপনাকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি চলে না যায়, তাহলে পরপুরুষ দ্বারা তার দেহের চাহিদা মেটাক এবং পরের বাচ্চা, আপনাকে দিয়ে মানুষ করাক; কেননা, আপনাদের মতো দিব্যজ্ঞানী এবং নপুংসকদের তো এটাই একমাত্র শাস্তি।

এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন- স্বামী স্ত্রীর সম্মতিতে এর অধিকবারও সহবাসের নিয়ম আছে ?

-এই অধিকবারটা কত ? বিয়ের পর একজন সক্ষম পুরুষ প্রায় প্রতিদিনই দুই তিনবার যৌনমিলন করে এবং এভাবে চলে প্রায় ২/৩ মাস, বীর্যক্ষয় যদি এতই ক্ষতির কারণ হয়, সেই সময় তো ঐ পুরুষের শেষ হয়ে যাবার কথা; কিন্তু তা হয় না, প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিয়ের পর পুরুষেরা স্বাস্থ্যবান হয়, এটা কেনো এবং কিভাবে ? আর স্বামী স্ত্রীরা নিজের সম্মতিতে সহবাস করে, না জোর ক'রে করে ? বলদ, কথা বলাটাও শিখতে হয়।

এরপর বলেছিস- তয় বীর্যক্ষয় টা একমাত্র সন্তান জন্ম দেয়াতেই ব্যবহারের বিধান আছে।

-সন্তান জন্মদান ছাড়া যদি বীর্যক্ষয় না করা যায়, তাহলে তোর মনুসংহিতায় যে মাসে একবার স্ত্রী সহবাসের নিয়ম আছে, সেই সহবাস কিভাবে হবে ? বীর্যপাত ছাড়া তো কোনো পুরুষের সাটিসফেকশন আসবে না এবং এটা প্রমাণিত যে, যৌনক্রিয়ার সময় বীর্যপাতে যত দেরী হয়, পুরুষরা তত হিংস্র হয়ে উঠে; আর বীর্যপাত ছাড়া কোনো সক্ষম পুরুষের পক্ষে তো যৌনক্রিয়া শেষ করাও সম্ভব নয়। তাহলে বীর্যপাতহীন এই সহবাসের ধরণটা কী ? ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দিবি, না হলে যদি তোকে কোনো দিন হাতের কাছে পাই, থাপড়িয়ে তোর দাঁত ভেঙ্গে দেবো, কথাটা মনে রাখিস।

এছাড়াও সন্তানের জন্ম ছাড়া যদি বীর্যপাতের কোনো বিধান না থাকে, তাহলে মানুষকে একটি সন্তানের জন্য শুধু মাত্র একবারই বীর্যপাত করতে হবে, সেই একবারেই যে সে তার স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার করতে পারবে, তার গ্যারান্টি কী ? বিজ্ঞানের এত উন্নতির পরেও পৃথিবীর কোনো মানুষ তো আজ পর্যন্ত জানে না যে- মাসের মধ্যে কোন দিন নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বানু, নারীর জড়ায়ুতে এসে উপস্থিত থাকে শুক্রানুর সাথে মিলনের জন্য। তাই কোনো মানুষের পক্ষে এটা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় যে সে একবার বীর্যপাত করেই তার স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার করতে পারবে। একবার বীর্যপাতের ফলেই অবশ্য যেকোনো নারীর গর্ভসঞ্চার হয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ জানে না, সেই দিনটি মাসিক চক্রের কোন দিন, মানুষ একটা ধারণা নিয়ে যোনীগর্ভে বীর্যপাত করতে থাকে, বেশ কয়েকবার বীর্যপাতের ফলে হয়তো কোনো বারে সেটা লেগে যায়, কিন্তু সেটা দৈবের খেলা, মানুষের এখানে কিছু করার নেই।

আর শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের জন্যই যদি বীর্যক্ষয় করার বিধান থাকে, তাহলে প্রতিমাসে একবার করে স্ত্রী সহবাসের কথা বলছিস কেনো ? বীর্যপাতহীন স্ত্রী সহবাস কি সম্ভব ? আর তোর মহাপুরুষেরা কি তোর মনুর ঐ বিধান মতে মাসে একবারও বীর্যপাতহীন স্ত্রী সহবাস করতো ? বা সন্তানের জন্মের জন্যও কি তারা স্ত্রী গ্রহণ করে তার যোনীতে বীর্যপাত করেছে ?

তোর ক্ষমতাই নেই আমার এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার, তাই তোর কাছে তা আশাও করি না। আর কথা প্রসঙ্গে কথা বাড়াতে আমার কোনো আপত্তি নেই; কারণ, আমি কথা বলতে জানি এবং সেটা যুক্তিযুক্তভাবেই। তুই তো আমাকে অনুরোধ করেছিস, এসব প্রচার থাকতে দূরে থাকতে, কিন্তু আমি তোকে আদেশ দিচ্ছি, আমার প্রচারের পথে এসব ভুল ভাল পোস্ট লিখে কখনো আমার সময় নষ্ট করবি না, আর সেগুলোর দ্বারা মানুষকে বিভ্রান্ত করবি না। আমার পোস্টের প্রচারকে তুই কোনোরকমেই বাধাগ্রস্ত করতে পারবি না; কারণ, সেই ক্ষমতা তোর নেই, তাই এটা নিয়ে কোনো কথা বললাম না।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

অথর্ববেদ চতুর্থস্থানীয় বেদ, প্রকৃত বেদ নয় :

অথর্ববেদ চতুর্থস্থানীয় বেদ, প্রকৃত বেদ নয় :

#Anonno_Asim,

আপনার এই কাউন্টার পোস্টটা যথাসময়ে আমার নজরে আসে নি ব'লে, যথা সময়ে তার উত্তর দিতে পারি নি। কারণ, কারো নজরে আনার জন্য কিভাবে পোস্ট করতে হয়, সেটা আপনি জানেন না, তাই আমার নজরে আপনার পোস্ট না আসার যে ব্যর্থতা, সেটা আপনার।

যা হোক, কাউন্টার পোস্টের প্রথম প্যারাতেই আপনি লিখেছেন,

" প্রথমত ভাই আমি কোন আর্যসমাজীর নই।বেদে পক্ষে আছি দেখেই আপনি আমায় আর্য সমাজির লোক বানাচ্ছেন.?. ইহা হাস্যকর।

- আমার এক পরিচিত ব্যক্তি বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল হলো দুইটা- একটা আওয়ামীলীগ, অন্যটা এন্টি আওয়ামী লীগ। এর সরল মানে হলো একদল আওয়ামী লীগের পক্ষে, অন্যদলগুলো যে নামেরই হোক না কেনো, তারা আওয়ামীলীগের বিপক্ষে। আপনি আর্য সমাজিদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলবেন, আর যদি কেউ আপনাকে আর্য সমাজি বলে ধরে নেয়, সেটা হাস্যকর হবে কেনো ? 

হিজড়াদের মতো ঢং করে কথা বললে লোকে আপনাকে হিজড়াই বলবে। যদি নিজেকে হিজড়া প্রমাণ করতে না চান প্রথমে ঐ ঢং ছাড়ুন, মানে বলতে চাইছি নিজেকে আর্য সমাজী হিসেবে পরিচিত করতে না চাইলে প্রথমে ওদের সুরে কথা বলা ছাড়ুন। তবে আপনার এই নিজেকে আর্য সমাজী হিসেবে স্বীকার করতে না চাওয়া একটা বিষয় প্রমাণ করে যে- আর্য সমাজীদেরকে আমি ঠিক মতো পঁচাতে পেরেছি, তাই কেউ নিজেকে আর আর্য সমাজী বলে পরিচয় দিতে চাইছে না; আর্য সমাজীরা বর্তমানে বর্জ্য সমাজী।

তারপর আপনি বলেছেন-

"যেকোন সনাতনী আর্য আর সে বেদকে সাপোর্ট করবে যদি সে আপনার মত ফেসবুক পন্ডিত না হয়ে অন্তত শাস্ত্র পড়েন আর বুঝেন।"

-ফেসবুক হোক, আর বাস্তবে মাঠে হোক যেখানেই পণ্ডিতি দেখানো হোক না কেনো শাস্ত্রজ্ঞান অবশ্যই প্রয়োজন। আপনার শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় যেমন আপনার পোস্ট, তেমনি আমার শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় হলো আমার পোস্ট, আর আমার এই পোস্টেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে- কে কতটা শাস্ত্র জানে বা বোঝে। আর নিজে যে কাজটা করেন, সেটা নিয়ে অন্যকে টিটকারী মারেন কিভাবে ? আপনার পোস্টে কি আপনি নিজের পাণ্ডিত্যকে জাহির করার চেষ্টা করেন নি বা করেন না ? তাহলে ফেসবুক পণ্ডিত বলে আমাকে বা অন্য টিটকারী মারা কেনো ?

এরপর আপনি বলেছেন,

"Satya Sandhyani Biswanath অন্যের (রুপক রায় দার) পোষ্ট কপি করে না দিয়ে নিজে লিখুন, অন্তত কিছু বুঝতে বা জানতে পারবেন।"

-আপনাকে কে বললো যে সত্য সন্ধানী বিশ্বনাথ আর রূপক রায় আলাদা ব্যক্তি ? রূপক রায় বর্তমানে কোনো একজন ব্যক্তি নয়, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ব্র্যান্ড; যে প্রতিষ্ঠানের বহু সদস্য আছে, যারা নিজ দায়িত্বেই রূপক রায় ব্র্যান্ডের পক্ষে প্রচারের কাজ করে, তাই এখানে কপি পেস্টের কোনো ব্যাপার নেই, ব্যাপার আছে শুধু প্রচারের।

তারপর মূল প্রসঙ্গে আপনি বলেছেন,

"আপনি একটা নাস্তিক, কারণ স্মৃতি শাস্ত্র বলে, যে ব্যক্তি বেদের নিন্দা অর্থাৎ অপমান করে,(বেদ) ত্যাগ ও (বেদ) বিরুদ্ধ আচরণ করে তাহাকে "নাস্তিক" বলে।"- মনুসংহিতা-২/১১

-নিন্দা কাকে বলে, জানেন তো ? যে যা নয়, তার সম্পর্কে যদি সেটা বলা বা প্রচার করা হয়, তাহলে সেটা হয় নিন্দা। আমি বেদ ত্যাগ করেছি, সেটা কি আপনি আমার কোনো পোস্টের রেফারেন্স দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন ? আমি বেদকে সনাতন ধর্মের ভিত্তি মনে করি, যদি আমি বেদকে ত্যাগ করতাম, তাহলে কি এই কথা বলতে পারতাম ? আপনারা আর্য সমাজীরা আসলে তাদের বিরুদ্ধেই মনুসংহিতার এই বাণীকে প্রয়োগ করে তাদেরকেই বেদ বিরোধী তকমা দেন, যারা বেদের নয়, আপনাদের কথার বিরোধিতা করে; কারণ, আপনারা নিজেদেরকে মনে করে বেদের একমাত্র পার্থিব এজেন্ট। যা হোক, মনুসংহিতার এই রেফারেন্সকে অবলম্বন করেছেন, তার মানে মনুসংহিতা আপনার কাছে সনাতন ধর্মের প্রামাণ্য গ্রন্থ, আপনার এই স্ট্যান্ডার্ড যেন মনুসংহিতার সকল রেফারেন্সের বেলায় ঠিক থাকে।

এরপর আপনি বলেছেন-

"আমি আগের পোষ্টে যাষ্ট অথর্ব বেদ থেকে প্রমান করে দিয়েছিলাম যে বেদ পরমাত্মা থেকে সৃষ্টি আর বেদ স্বয়ং ঈশ্বরের বাণী।কিন্তু উনি ওটা না মেনে পণ্ডিতি করে অর্থব বেদকেই সরাসরি অস্বিকার করেছে।ইহা অতিব হাস্যকর। উনি মনুর-১/২৩ শ্লোক দেখিয়ে প্রমান রেখেছেন অর্থব বেদ বেদের অংশ নয়। কিন্তু এটা উনার অলীক কল্পনা বই কিছুনা। কারণ মনু বলেছে স্মৃতি আর শ্রুতির বিরোধ হলে শ্রুতিই প্রামান্য বলে গণ্য। তাই তার ওই মনুর-১/২৩ শ্লোক গ্রহণীয় নয়।ওটা গঙ্গা জলে চুবিয়ে আনুন গিয়ে।"

-মনু যদি বলে থাকে যে, শ্রুতি (বেদ) আর স্মৃতি (অন্যান্য+মনুসংহিতা)র মধ্যে বিরোধ হলে শ্রুতিই প্রামান্য বলে গণ্য হবে, এতকিছুর রেফারেন্স দিয়েছেন, তো এর রেফারেন্স দেন নি কেনো ? রেফারেন্স দিলে একটু গবেষণা করে দেখতাম, কোনো লোক কিভাবে নিজের কথাকেই মিথ্যা বলে স্বীকার করে। আপনার কাছে মনুসংহিতার ২/১১ সঠিক, কিন্তু ১/২৩ ঠিক নয়; ব্যাপারটি স্ববিরোধী হয়ে গেলো না ? আর যার ভিত্তিতে স্ববিরোধী অবস্থানে আছেন, সেটারও রেফারেন্স দিতে পারেন নি, আপনার কথাকে সঠিক বলে ধরে নিই কিভাবে ? ফেসবুক পণ্ডিত বলে আমাকে খোঁটা দিচ্ছেন, কিন্তু নিজের পণ্ডিতিও কী প্রমাণ করতে পারছেন বা পেরেছেন ?

এরপর বলেছেন,

"চলুন অথর্ব বেদ যে বেদেরই চার খন্ডের একটি এটা দেখে আসি। উনি গীতা থেকেও একটা প্রমান দিয়েছেন। চলুন আমি গীতার জন্মদাতা উপনিষদ হতে ঘুরে আসি, #ছান্দোগ্য_উপনিষদ-৩/৪/১ অথর্ববেদোক্ত মন্ত্র রাশিই মধুকর।"

-এখানে আপনি বলেছেন, ছান্দোগ্য উপনিষদের ৩/৪/১ এ বলা আছে, "অথর্ববেদোক্ত মন্ত্র রাশিই মধুকর।" তাহলে দেখা যাক এই মন্ত্রে আসলেই কী বলা আছে-

এই মন্ত্রটি হলো- "মধুনাড্যোহথর্বাঙ্গিরস এব মধুকৃত" যার অর্থ হলো- অথর্বাঙ্গিরস মন্ত্রসমূহই মধুকর।

-অথর্ব একজন ঋষি এবং আঙ্গিরসও একজন ঋষি, এদের উভয়ের কার্য একই প্রকারের বলে দুজনের নাম একসাথে যুক্ত হয়ে অথর্বাঙ্গিরস হয়েছে, ঋগ্বেদে উল্লিখিত এদের মন্ত্রই যে শ্রুতিমধুর, এখানে সেই কথা বলা হয়েছে। এখানে কোথায় বলা আছে যে অথর্ববেদোক্ত মন্ত্ররাশিই মধুকর ? বাস্তবে যদি এই কথা বলাও হতো, তাহলে তিন বেদের মধ্যে প্রধান যে বেদ, সেই ঋগ্বেদকেও কি ছোট করা হতো না ? শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করে কিভাবে কোনো বিষয়কে নিজের মতে এনে প্রচার করতে হয়, তাতে যে আপনারা বিশেষজ্ঞ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যা হোক, ছান্দোগ্য উপনিষদের একটি মন্ত্রের বিকৃত ব্যাখ্যার পর, অপর মন্ত্রের কী হাল করেছেন, এবার সেটা দেখাচ্ছি-

ছান্দোগ্যোপনিষদ এর ৭/১/২ এর রেফারেন্স দিয়ে আপনি বলেছেন, এখানে নাকি লিখা আছে,

"হে ভগবান আমি ঋগ্বেদ অবগত আছি।হে ভগবান আমি যজুর্বেদ,সামবেদ,চথুর্থ স্থানীয় অথর্ববেদ ...... অবগত আছি।"

কিন্তু এই মন্ত্রের অর্থে লিখা রয়েছে, "নারদ বলিলেন- ভগবান, ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ চতুর্থস্থানীয় অথর্ববেদ, ইতিহাস পুরাণ নামক পঞ্চম বেদ… আমি এই সবই জানি।"

এখানে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এর পর সরাসরি কেনো বলা হলো না যে অথর্ববেদ, কেনো বলা হলো চতুর্থস্থানীয় অথর্ববেদ ? এর কারণ হলো অথর্ববেদ, অন্য তিনিটি বেদের পর্যায়ে পড়ে না, বেদের পরিশিষ্ট হিসেবে একে চতুর্থ বেদ হিসেবে আমরা ধরে নিয়েছি, যেকারণে ইতিহাস পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। এই রেফারেন্সের ভিত্তিতে যদি আমরা অথর্ববেদকে চতুর্থ বেদ হিসেবে ধরে নিই, তাহলে রামায়ণ-মহাভারত এবং পুরাণগুলোকেও পঞ্চম বেদ হিসেবে ধরে নয়, স্বীকার করে নিতে হবে; তাহলে আর প্রচলিতভাবে বেদ চারটি একথা বলা যাবে না, বলতে হবে- বেদ ৫টি। তাহলে আপনারা কি এখন এই কথা বলবেন যে- বেদ ৫টি ?

সত্যিই শাস্ত্রের বিকৃত ব্যাখ্যার প্রচারে আপনাদের যে প্রতিভা, তাতে আমি মুগ্ধ।

যা হোক, এরপর মহাভারত শান্তিপর্বের যে রেফারেন্স দিয়েছেন, তার শ্লোক উল্লেখ করেন নি বলে বুঝতে পারছি না যে এখানে আসলেই কী বলা আছে। তাই এটা নিয়ে আর কিছু বললাম না, শুধু এই কথা বলছি যে, যে একটি মিথ্যা তথ্য দিতে পারে, সে যে ১০০টা তথ্যও মিথ্যা দিতে পারে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংস্কৃত শ্লোকসহ বাংলা অনুবাদের মহাভারত সবার কাছে নেই, তাই সবার পক্ষে মহাভারতের ঐ রেফারেন্সের ক্রসচেক করা সম্ভব না হলেও গীতা কিন্তু সবার কাছেই আছে, তাই আপনার দেওয়া গীতার শ্লোক দিয়েই প্রমাণ হবে যে, মহাভারতের ঔ শ্লোকের রেফারেন্স আপনি সত্য বলেছেন কি না ?

গীতার ১৫/১৫ রেফারেন্স দিয়ে আপনি বলেছেন, এখানে নাকি বলা আছে-

"চারবেদের একমাত্র জ্ঞাতব্য আমিই।আমি বেদান্তের সৃষ্টিকর্তা এবং আমিই বেদজ্ঞ।"

কিন্তু এই মন্ত্রটি হলো- "বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ বেদবিদেব চাহম" এবং এর অনুবাদ হলো- আমিই বেদসমূহের একমাত্র জ্ঞাতব্য, আমিই বেতান্তের অর্থ প্রকাশক এবং আমিই বেদবেত্তা।

এখানে কি বলা আছে যে চারবেদের একমাত্র জ্ঞাতব্য আমিই ? এখানে বলা হয়েছে বেদসমূহ। আর গীতার ৯/১৭ নং শ্লোকেই তো বলা হয়েছে বেদ তিনটি, যথা- ঋক, সাম ও যজুর্বেদ।

আপনার ধান্ধাবাজি সত্যিই মনোমুগ্ধকর।

সুতরাং উপনিষদ, বেদ, গীতা, কোনোটি দ্বারাই প্রমাণ হয় না যে বেদ চারটি, আর আমি যে প্রশ্ন তুলবো, আমার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সেটা আপনি কেনো, পুরো আর্য সমাজ মিলেও সমাধান করতে পারবে না।

এরপর আপনি ঋগ্বেদের ১০/১৮/২ নং মন্ত্রের রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন, পবিত্র বেদে পরমাত্মা বলেছে...

"শুদ্ধ এবং পবিত্র হও তথা পরোপকারময় জীবনযুক্ত হও।" কিন্তু বাস্তবে এই মন্ত্রে বলা আছে- "তোমরা শুদ্ধ পবিত্র ও যজ্ঞানুষ্ঠানকারী হও।" এটা যদি পরমাত্মার বাণী হয়, তাহলে এর আগের মন্ত্রে যে বলা আছে, "আমাদের সন্তানসন্তুতি বা লোকজনকে হিংসা করো না।" এটা পরমাত্মার বাণী কিভাবে হয় ? বেদ যদি সরাসরি পরমাত্মার বাণী হয়, তাহলে বেদের সকল কথা ই তো পরমাত্মার বাণী হবে, তাই না ? তাহলে আমাকে বোঝান, "আমাদের সন্তানসন্তুতি বা লোকজনকে হিংসা করো না।" ব'লে পরমাত্মা এখানে কী বলেছেন বা কী বুঝিয়েছেন ?

এই মন্ত্রটি মৃত্যু দেবতার উদ্দেশ্যে সংকুষুক ঋষি লিখেছেন, সেখানে তিনি মানবের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "তোমরা মৃত্যুর পথ ছেড়ে যাও, তাহলে উৎকৃষ্ট ও অতিদীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হবে, তোমাদের গৃহ- সন্তানসন্ততি ও ধনে পরিপূর্ণ হবে। তোমরা শুদ্ধ পবিত্র ও যজ্ঞানুষ্ঠানকারী হও।"

মূলত সংকুষুক ঋষি এখানে- মানুষ যেন দীর্ঘায়ু হয়, তারা যেন ধন-সম্পত্তিতে এবং সন্তানে সুখী হয়, সেজন্য মানুষদেরকে উপদেশ দিয়েছেন শুদ্ধ পবিত্র ও যজ্ঞানুষ্ঠানকারী হতে। এখানে পরমাত্মার বাণীর কিছু নেই।

তাছাড়াও Devas বা সংস্কৃত 'উত দেবা' শব্দের অর্থ যে- মনস্বী বিদ্বান ব্যক্তি, মহাপুরুষ বা আচার্য, সেটা আপনি আর্য সমাজ কর্তৃক প্রকাশিত কোনো পুস্তক ছাড়া অন্য কোনো গ্রন্থ থেকে রেফারেন্স দিয়ে প্রমাণ করবেন। যদি না পারেন…। আর একটা শব্দের যে অনেকগুলো অর্থ থাকে, সেটা আমি জানি; কারণ, আমি বাংলাসাহিত্যে মাস্টার্স করা লোক। এই যেমন আপনার নাম অসীম, অসীম শব্দের একটা অর্থ কিন্তু শূন্য বা জিরো, এই হিসেবে তো আমরা ধরেই নিতে পারি যে আপনি শূন্য বা একটা খালি কলসী, যার ভেতরে কোনো মাল নেই ?

আর অথর্ববেদ সম্পর্কে আপনার নিজের ধারণাই তো ভূল, আপনি আবার আমার ধারণাকে ভুল বলেন কিভাবে ? আবার দাবী করছেন, আমার ভুল ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়েছেন ? খালি কলসী এখন দেখছি সত্যিই বাজে বেশী।

এছাড়াও একেবারে শেষে যে বলেছেন- 

ঘোমটার নিচে খেমটা ড্যান্স না দিয়ে বোরকা খুলে বাইরে বেরোন।

এর মানেটা কী ? একটা উদাহরণ দিতে গেলেও যে প্রাসঙ্গিকভাবে দিতে হয়, সেই কমনসেন্স কি আপনার আছে ? এই যে আপনার পোস্টের জবাব আমি পোস্ট লিখে পাবলিকলি দিয়ে আপনাকে ন্যাংটা করছি, এতেই কি প্রমাণ হয় না যে- আমি ঘোমটার নিচে বা বোরকার মধ্যে নেই ?

ওঁ নমঃ শিবায়, জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ- এসব আমার সমাপ্তিসূচক শ্লোগান, যখন এসব নিজের পোস্টে ব্যবহার করা শুরু করেছেন, তখন আপনার নিয়তি কী, সেটা বুঝতে পারছেন ? থাক আর বললাম না; কারণ, যদি মরদ হন, তাহলে অর্ধেকেই বুঝে যাবেন। কারণ, কথায় বলে- অর্ধেক বললেই মর্দে বোঝে।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 26 August 2020

বহু দেবতা বা ঔঁ এর মাধ্যমে মানুষ আসলে কার উপাসনা করে ?



বহু দেবতা বা ঔঁ এর মাধ্যমে মানুষ আসলে কার উপাসনা করে ?

Raj AB Barman,

সনাতন ধর্মের তত্ত্বকে বুঝতে বা উপলব্ধি করতে ইসলাম প্রভাবিত মন নিয়ে করলে চলবে না; কারণ, ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, ওটা ব্যক্তিগত মতবাদ, যে মতবাদ জগত ও জীবনের সকল রহস্যকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

সনাতন ধর্মে বহু দেব-দেবীর পূজা প্রচলিত, এর মানে এই নয় যে হিন্দুরা আলাদা আলাদা ঈশ্বরের উপাসনা করে। সকল দেব-দেবীর মাধ্যমে হিন্দুরা এক ঈশ্বরেরই পূজা করে, যে কথা বলা হয়েছে, গীতায়, এই ভাবে-

"যে যে ভক্ত ভক্তিযুক্ত হইয়া যে যে দেবমূর্তি অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি সেই সকল ভক্তের সেই সেই দেবমূর্তিতে ভক্তি অচলা করিয়া দিই। সেই ভক্তি নিয়া, সে সেই দেবমূর্তি অর্চনা করিয়া থাকে এবং সেই দেবতার নিকট ইইতে নিজ কাম্যবস্তু লাভ করিয়া থাকে, প্রকৃতপক্ষে আমিই সেই কামনা পূর্ণ করিয়া থাকি।"- (গীতা, ৭/২১,২২)

এবং

"হে অর্জুন, যাঁহারা শ্রদ্ধা করিয়া অন্য দেবতার পূজা করে, তাঁহারাও না জানিয়া আমাকেই পূজা করে।"- (গীতা, ৯/২৩)

সুতরাং বহু দেবতার পূজা করলেও হিন্দুরা যে সেই সব দেতার মাধ্যমে এক ঈশ্বরেরই পূজা করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই সব কথা শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলেছেন, এখন শ্রীকৃষ্ণই যে ঈশ্বর, তার প্রমাণ কী ?

শ্রীকৃষ্ণ যে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ঈশ্বর, সেটা তার জীবনের নানা ঘটনায় প্রমাণিত। এ সম্পর্কে আমার অন্য প্রবন্ধ আছে, সেটা পড়া থাকলে জানেন বা না পড়া থাকলে পড়লে জানবেন, সেই একই কথা গীতাতেও বলা আছে, দেখুন নিচে-

"আমিই এই জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা ও পিতামহ।… আমিই ব্রহ্মবাচক ওঙ্কার এবং আমিই ঋক সাম যজুঃ প্রভৃতি সকল বেদ।"- (গীতা, ৯/১৭)

গীতায় এই রকম বহু শ্লোক আছে, যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর এবং আমার অনেক প্রবন্ধে এই বিষয় সম্পর্কে আলোচনাও করেছি, তাই এখানে সেই বিষয় আর আলোচনা করছি না।

কিন্তু এখানে সমস্যা হলো- আর্য সমাজীরা তো বিশ্বাসই করে না যে গীতায় সাতশত শ্লোক আছে, তারা বলে গীতা নাকি ৭০ শ্লোকের এবং এ সম্পর্কে নানা কুযুক্তিও তারা হাজির করে। ব্যাপারটা -যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা নয়- যা অপছন্দ করি, তা পুরোটাই অস্বীকার। এ থেকে আমার ধারণা, পছন্দ না হলে আর্য সমাজীরা নিজের পিতা মাতাকেও অস্বীকার করবে।

এই আর্য সমাজী, তার পোস্টে বলেছে- এক ঈশ্বর/পিতা ঔঁ কেই উপাসনা করো। এই ঔঁ যে কী বা কে, তা দেখে বা বুঝে নিন নিচে-

গীতার ১৭/২৩ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন "ওঁ তৎ সৎ" এই তিন প্রকারে পরমব্রহ্মের নাম নির্দেশ করা হয়েছে। সুতরাং ওঁ দ্বারা যে পরমব্রহ্মকে বোঝায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আবার গীতার ১০ম অধ্যায়ের ২৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, বাক্যসমূহের মধ্যে আমি একাক্ষর, ওঁ-কার। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই যে ওঁ-কার বা শ্রীকৃষ্ণই যে পরমব্রহ্ম, সেটা এই শ্লোক দ্বারা প্রমাণিত। 

এছাড়াও ওঁ উচ্চারণ করলেই যে শ্রীকৃষ্ণ স্মরণ করা হয়, সে কথা শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, গীতার ৮/১২-১৩ নং শ্লোকে, এভাবে-

"… আত্মসমাধিরূপ যোগে অবস্থিত হইয়া, ওঁ- এই ব্রহ্মাত্মক একাক্ষর উচ্চারণপূর্বক আমাকে স্মরণ করিতে করিতে যে যোগী দেহত্যাগ করেন, তিনি পরমগতি লাভ করেন।"

গীতার এই তিনটি রেফারেন্স থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ওঁ দ্বারা পরমব্রহ্ম বা ব্রহ্ম বা শ্রীকৃষ্ণকে বোঝায়।

সুতরাং হিন্দুরা বহু দেবতার পূজা করুক বা ঔঁ-কেই উপাসনা করুক, তারা যে এক ঈশ্বরেরই পূজা করে সেটা প্রমাণিত। যদিও আমি জানি যে- এই সব তথ্য প্রমাণ আর্য সমাজীদের মাথায় ঢুকবে না; কারণ, তারা তো আর্য নয়, বর্জ্য, আর বর্জ্য সেটাই, যেটা ভ্যালুলেস।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ

Thursday, 16 July 2020

নমস্কার- ব্যক্তিকে নয়, ঈশ্বরকে:


নমস্কার- ব্যক্তিকে নয়, ঈশ্বরকে:

২০১৬ সালে আমি একটি প্রবন্ধে বলেছিলাম- নমস্কার নয়, বলুন জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃষ্ণ। সেই প্রবন্ধে আমি এই মত প্রকাশ করেছিলাম যে, কাউকে নমস্কার বললে কাজের কাজ আসলে কিছুই হয় না, কিন্তু এর কিছু ক্ষতিকর দিক আছে, যা জাতি হিসেবে আমাদেরকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, তাই এই সম্বোধনের পরিবর্তে আমরা যদি একে অপরকে জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃষ্ণ বলি এবং জবাবে দ্বিতীয় ব্যক্তিও যদি জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃষ্ণ বলে, তাহলে আমরা যেমন দিনে অন্তত কয়েকবার ভগবানের নাম অভ্যাসবশতই নিতে পারবো, তেমনি এই দুই জনের জয় হলে আমরা সনাতনীরা সকল প্রকার সমস্যা থেকে মুক্ত হবে।

সম্প্রতি সেই প্রবন্ধের বিরুদ্ধে এবং হিন্দু সমাজে প্রচলিত আরো কিছু সম্বোধনকে বাতিল করে দিয়ে আর্য সমাজীরা সকল ক্ষেত্রে সম্বোধন হিসেবে নমস্কারকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার উদ্দেশ্যে নেটে এ সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধ এবং ইউটিউবে একটি ভিডিও ছেড়েছে। সেই প্রবন্ধ এবং ভিডিওতে মূলত একই তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে এবং একই রকম কথা বলা হয়েছে, তাদের সেই ভুল ব্যাখ্যায় কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই আমার এই প্রবন্ধটি লেখা, তাদের দেওয়া রেফারেন্স দিয়ে এখানে আমি প্রমাণ করে দেবো যে- নমস্কার শুধু ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই করা যাবে, কোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্যে নয়।

যা হোক, নমস্কার যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তা প্রমাণ করার জন্য, আর্য সমাজীরা বেদের মন্ত্রের অর্থকে বিকৃত করে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের ইচ্ছেমতো বেদের মন্ত্রের অর্থ করেছে, আর্য সমাজীদের পোস্টের স্ন্যাপশট আমার এই প্রবন্ধের সাথে যুক্ত করে দিয়েছি, সেখানে দেখুন, যজুর্বেদের ১৬/৩২ নং মন্ত্রের অর্থ হিসেবে তারা লিখেছে- নমস্তে জ্যেষ্ঠদেরকে, নমস্তে কণিষ্ঠদেরকে, নমস্তে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ধনী গরীব, জ্ঞানী স্বল্পজ্ঞানী সকলকে।

কিন্তু এই মন্ত্রটির প্রকৃত অর্থ- জ্যেষ্ঠ ও কণিষ্ঠরূপী রুদ্রকে নমস্কার, পূ্র্ব ও পশ্চাৎ জাত-রূপী রুদ্রকে নমস্কার, তির্যক আদি রূপে ও অবুৎপন্ন ইন্দ্রিয়ে জাত রূপী রুদ্রকে নমস্কার, গাভী প্রভৃতির পশ্চাদ্ভাগে ও বৃক্ষাদিমূলে জাতরূপী রুদ্রকে নমস্কার।

মন্ত্রের কোনো শব্দে রুদ্র শব্দটি না থাকলেও, এর অর্থে রুদ্র ব্যবহার করা হয়েছে এজন্য যে- আর্য সমাজীদের বেদ অনুবাদক ড. তুলসীরাম, তার অনুবাদেই বলেছেন, এই মন্ত্রটি- কুৎসা ঋষি, রুদ্র দেবতার উদ্দেশ্যে রচনা করেছেন। শুধু এই মন্ত্রটিই নয়, যজুর্বেদের ১৬ অধ্যায়ের সবগুলো মন্ত্রই রুদ্রদেবের উদ্দেশ্যে রচিত, তাহলে এই মন্ত্রের নমস্কার রুদ্রদেবের উদ্দেশ্যে হবে না কেনো ? আর জ্যেষ্ঠ কণিষ্ঠ ইত্যাদি রুদ্র এজন্যই বলা হয়েছে যে, আমার জানি গীতার ভাষ্যমতে রুদ্রগণ হলেন এগারোজন, আর সংখ্যায় একাধিক হলে বর্ণনার খাতিরে কাউকে ছোট বা কাউকে বড় বলে তো ধরে নিতেই হয়। এই মন্ত্রটি যে রুদ্রদেবের উদ্দেশ্যে রচিত, সেটা বিশ্বাস না হলে আপনারা যেকোনো বাংলা বেদ খুল দেখে নিতে পারেন। অর্থাৎ এখানে যে মন্ত্রে রুদ্রদেবকে নমস্কার করতে বলা হয়েছে, সেখানে আর্য সমাজীরা বলছে- এই নমস্কার নাকি- জ্যেষ্ঠ, কণিষ্ঠ, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ধনী, গরীব, জ্ঞানী এবং স্বল্পজ্ঞানী সকলকে করতে বলা হয়েছে ! আর্য সমাজীদের গুরু দয়ানন্দই তো বিভিন্ন শ্লোকের অর্থ পাল্টে দিয়ে তা নিজের মতে আনার অপচেষ্টা করেছে, তাহলে তার শিষ্যরা তা করবে না কেনো ?

এখানে আর একটা কথা না বললেই নয়, আর্য সমাজীরা তো বলে- বেদের সকল মন্ত্র সরাসরি ঈশ্বের বাণী, তাহলে এই মন্ত্র অনুযায়ী রুদ্রদেবকে কি ঈশ্বর নমস্কার করেছে ? ঈশ্বরের কি কাউকে নমস্কার করার প্রয়োজন রয়েছে ? এছাড়াও আর্য সমাজীদের মতে- ঐ মন্ত্রে যদি জ্যেষ্ঠ কণিষ্ঠ নির্বিশেষে সবাইকে নমস্কার করার কথা বলা হয়, আর বেদ যদি সরাসরি ঈশ্বরের বাণী হয়, তাহলে কি ঈশ্বরই মানুষকে নমস্কার করেছে ? ঈশ্বরের কি মানুষকে নমস্কার করার কোনো দরকার আছে ? প্রচলিত এবং আর্যসমাজীদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে যে আমি বলেছি- বেদ সরাসরি ঈশ্বরের বাণী নয়, এটা ঋষিদের উপলব্ধিজাত বাণী, ঋষিগণ বেদের মন্ত্রের মাধ্যমে দেব-দেবী ও ঈশ্বরের নিকট স্তবস্তুতি করেছেন, এখন এই বিষয়টি শুধু এই মন্ত্রের মাধ্যমেই নয়, বেদের সকল মন্ত্রের মাধ্যমে মিলিয়ে দেখুন।

যা হোক, এরপর আর্য সমাজীরা চুতর্বেদ শতকম থেকে যে রেফারেন্স দিয়েছে, ফটোপোস্টে খেয়াল করে দেখুন, সেখানেও বলা হয়েছে- হে পরমেশ্বর, তোমাকে নমস্কার। তার মানে এখানে ঈশ্বরকেই নমস্কার করা হয়েছে।

এছাড়াও আর্য সমাজীদের মতেই, অথর্ববেদের ১০ম কাণ্ডের ৮ম সূক্তের ১ম মন্ত্রে যদি বলা হয়- যিনি ভূতকাল, ভবিষ্যৎকালের এবং নিখিল জগতের অধিষ্ঠাতা, সুখ যাঁহার স্বরূপ সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মকে নমস্তে।- তাহলে এখানে কি পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে নমস্কার করার কথা বলা হচ্ছে না ?

এরপর অথর্ববেদের ১০ম কাণ্ডের ৭ম সূক্তের ৩২ নং মন্ত্রে যদি বলা হয়- " ভূমি যাঁহার পদমূল সদৃশ, অন্তরিক্ষ যাঁহার উদর সদৃশ এবং দ্যুলোককে যিনি মস্তক সদৃশ সৃষ্টি করিয়াছেন সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মকে নমস্তে।"- তাহলে এখানে কার উদ্দেশ্যে নমস্কার করার কথা বলা হলো, মানুষকে, না ঈশ্বরকে ?

এরপর অথর্ববেদের ১০ম কাণ্ডের ৭ম সূক্তের ৩৩ নং মন্ত্রে যদি বলা হয়- "যিনি বার বার নব নব সূর্য ও চন্দ্রকে নেত্র সদৃশ এবং অগ্নিকে মুখ সদৃশ সৃষ্টি করিয়াছেন সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মকে নমস্তে।"- তাহলে কি এর দ্বারা ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে নমস্কার করা বোঝায় না ?

এছাড়াও অথর্ববেদের ১০ম কাণ্ডের ৭ম সূক্তের ৩৪ নং মন্ত্রে যদি বলা হয়- "বায়ু যাঁহার প্রাণ আপান সদৃশ, রশ্মিসমূহ যাঁহার দৃষ্টি স্বরূপ এবংসমূহ যাঁজার প্রজ্ঞাসদৃশ সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মকে নমস্তে।"- তাহলে এখানে যে ঈশ্বরকেই নমস্কার করা বোঝাচ্ছে, সেটা তো একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝবে।

এছাড়াও যজুর্বেদের ১৬/৪১ নং মন্ত্রে যদি বলা হয়- "কল্যান ও সুখের কারণকে নমস্তে। কল্যানদাতা ও সুখ দাতাকে নমস্তে। কল্যানময় ও সুখময়কে নমস্তে।"- তাহলে এখানেও কি ঈশ্বরকেই নমস্কার করার কথা বলা হচ্ছে না, যেহেতু ঈশ্বরই হলো- কল্যান ও সুখের কারণ, কল্যানদাতা ও সুখ দাতা এবং কল্যানময় ও সুখময় ?

এরপর আর্য সমাজীরা, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ২য় অধ্যায়ের ১৭ নং শ্লোকের রেফারেন্স দিয়েছে, সেখানেও বলা হয়েছে- যোগ যেমন পরমাত্মা দর্শনের সাধন বা উপায়, নমস্কারাদিও অনুরূপ বলিয়া তাঁহাকে নমস্কার জানাই।

- এখানে বলা হলো যোগ এবং নমস্কার একই রকম ব্যাপার এবং এই দুটো দিয়েই পরমাত্মা দর্শন করা যায়, তাই তাঁহাকে নমস্কার জানাই, তাহলে এই তাঁহাকে বা তিনিটা কে ? এই তিনিই পরমাত্মা বা ঈশ্বর, সুতরাং এখানেও নমস্কার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত।

এরপর আর্যসমাজীদের দেওয়া রেফারেন্স অনুযায়ী ই, গীতার ১১/৩৭ নং শ্লোকে অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন, "তুমি ব্রহ্মারও গুরু এবং আদি কর্তা, তাই তোমাকে সমস্ত জগত নমস্কার করিবে না কেনো ?" এখানেও শ্রীকৃষ্ণরূপী ঈশ্বরকেও নমস্কার করার কথাই বলা হয়েছে। এছাড়াও গীতার ১১/৩৯, ৪০ নং শ্লোকে, অর্জুন যে শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন, "তোমাকে সহস্রবার নমস্কার করি, আবার পুনঃ পুনঃ তোমাকে নমস্কার করি। তোমাকে সম্মুখে পশ্চাতে সর্বদিকে নমস্কার করি।" এর দ্বারা কি কোনো মানুষকে নমস্কার করার কথা বলা হয়েছে ? এখানেও তো ঈশ্বরকেই নমস্কার করার কথা বোঝাচ্ছে।

যা হোক, নমস্কার কাকে বা কার উদ্দেশ্যে সে সম্পর্কে এত এত রেফারেন্স জানার পরও আর্য সমাজীরা বলেছে- "তাহলে আমরা জানলাম নমস্কার শব্দটি 'কাওকে' সম্বোধন করার সময় ব্যবহৃত হয়।" এই 'কাওকে' বলতে তারা আবার বোঝে সর্বশ্রেণীর মানুষকে! একেই বুঝি বলে সাতকাণ্ড রামায়ণ পরার পর বুঝলাম সীতা হলো রামের মাসী। আর্য সমাজীদের জ্ঞান এই রকমই, হাঁটুর নিচে। এরা শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ে, কিন্তু সেগুলোর তেমন কিছুই বোঝে না। ঐ এক দয়ানন্দ যা বলে গেছে, এদের সকল চিন্তা-ভাবনা ঐদিকেই ধাবিত হয়, কিন্তু দয়ানন্দ যে মহর্ষি অর্থাৎ মহাজ্ঞানী নয়, সে নিজেই ভুল আর বিকৃতির মহাসাগর, সেটাকে তারা বিবেচনায় নেয় না। আসলে যার যেমন চিন্তার পরিধি, সে তো তেমনই চিন্তা করবে।

যা হোক, আর্য সমাজীরা অন্তত আমার একটি কথাকে স্বীকার করেছে যে- নমস্কার মানে নত হওয়া, সম্মান করা; তার মানে নমস্কার বলতে বোঝায় নত হয়ে সম্মান করা, আর এখানেই আমার আপত্তি, কাউকে সম্মান জানাবো ঠিকই, কিন্তু সেটা নত হয়ে নয়, মাথা উঁচু করেই সম্মান জানাবো। আর কাউকে সম্মান জানানোর পদ্ধতিই হলো- কারো সাথে দেখা হলেই মুখ ফুটে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা, এটা যেকোনো বাক্য বা যেকোনো শব্দ হলেও হয়। এই থিম থেকেই ইংরেজরা ব্যবহার করে 'হাই' বা 'হ্যালো'; মুসলমানরা ব্যবহার করে আসসালামু ওয়ালাইকুম; সনাতনীরা সাধারণভাবে ব্যবহার করে নমস্কার; সানতনীদের বিভিন্ন ভাগ আবার ব্যবহার করে যথাক্রমে- হরে কৃষ্ণ, জয়গুরু, জয় নিতাই, রাধে রাধে, শিব শিব, ভারতের হিন্দি বলয়ে ব্যবহার হয় জয় শ্রীরাম, কোথাও কোথাও জয় শ্রীকৃষ্ণ। এই সবগুলোই সম্বোধন, উদ্দেশ্য একই, তাহলো একে অপরের সাথে কানেক্টিভিটি তৈরি করা। আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, বিপরীত দিক থেকে কেউ যদি আসে, তাকে যদি আপনি কিছু বলেন, তাহলে তার সাথে আপনার একটি যোগাযোগ তৈরি হবে; আর যদি কিছু না বলেন, আপনার সাথে তার তো কোনো কানেকটিভিটি তৈরি হবে না, আপনার বয়সে বড় হলে সে আপনাকে বেয়াদব বা উদ্ধত মনে করবে। এজন্যই বড়দেরকে সম্মান জানিয়ে তাদের সাথে কানেক্টিভিটি তৈরি করার জন্যই কোনো না কোনো সম্ভাষণের প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই বিভিন্ন জন তাদের পছন্দমতো বিভিন্ন সম্ভাষণ ব্যবহার করে।

এখানেই আমার বক্তব্য হচ্ছে- আমি এমন কিছু বলে সম্বোধন করবো, যাতে আমার সেই কানেক্টিভিটি রক্ষা হয় এবং একই সাথে ভগবানের নামও করা হয়। তাহলে একদিক থেকে যেমন আমার সমাজ রক্ষা হচ্ছে, তেমনি ধর্মও রক্ষা হচ্ছে। নমস্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- কারো ভেতরে অবস্থিত ঈশ্বরকে সম্মান জানানো, আর ঈশ্বর যেহেতু সর্বশক্তিমান, সেহেতু তার কাছে নত হতেই হয়, আর অহম ত্যাগ করার জন্য হাতজোড় করতেই হয়, এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এই আভিধানিক অর্থ কয়জন বুঝে নমস্কার দেয় ? যদি কেউ আভিধানিক অর্থ বুঝে কাউকে নমস্কার দেয়, তাহলে ঠিক আছে; কিন্তু সে যদি আভিধানিক অর্থ না বুঝে এমনি এমনি কাউকে নমস্কার দেয়, তাহলে যে নমস্কার দেবে এবং যে নেবে, উভয়েরই তো পাপ হবে। কারণ, শাস্ত্র বলছে- নমস্কার শুধু ঈশ্বরকেই করা যায়, এখন আভিধানিক অর্থ না বুঝে আমি যদি কাউকে নমস্কার দিই, তাহলে তাকে তো ঈশ্বর বানিয়ে ফেললাম; নিজের বাপকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বাবা বলে ডাকলে যেমন নিজের বাপ খুশি হবে না, তেমনি ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কাউকে ঈশ্বরের সম্মান দিলে ঈশ্বরও আপনার উপর খুশি হবে না, তাহলে সেটা- পাপ কি না বলেন ?

গীতায় বলা হয়েছে- সকল দেব-দেবীর পূজা ঈশ্বরের কাছেই যায়। এর মানে হলো, আপনি যে দেব-দেবীরই পূজা করেন না কেনো, শেষ পর্যন্ত সেটা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাবে এবং সেই দেব-দেবীর মাধ্যমে ঈশ্বর তার ফল আপনাকে দেবে। কিন্তু এই ফল পাওয়ার জন্য আপনাকে এই মনোভাব নিয়ে পূজাটি করতে হবে যে- আমি, সরস্বতী বা লক্ষ্মী বা কার্তিক বা গণেশ বা কালী বা দুর্গার মাধ্যমে আসলে ঈশ্বরেরই পূজা করছি, তাহলে আপনার পূজা সার্থক এবং তার ফল আপনি নিশ্চিতভাবে পাবেন। কিন্তু এটা না জেনে কেউ যদি বিদ্যার সবর্ময় দেবী হিসেবে সরস্বতী বা ধনের সর্বময় দেবী হিসেবে লক্ষ্মীকে পূজা করে, তাহলে তার কি কোনো মূল্য আছে ? পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি বা ইচ্ছা ব্যতীত কোনো দেব-দেবীর কি ক্ষমতা আছে কারো জন্য কিছু করার ? নাই। দেব-দেবীর পূজার ফল পেতে হলে যেমন এটা জেনে পূজা করতে হবে যে এই দেব বা দেবীর মাধ্যমে আমি আসলে ঈশ্বরের পূজা করছি, তেমনি নমস্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ- আপনার হৃদয়ে অবস্থিত ঈশ্বরকে আমি সম্মান জানাচ্ছি আপনার মাধ্যমে- এটা জেনে বা বুঝে যদি কেউ কাউকে নমস্কার করে এবং যাকে নমস্কার করা হচ্ছে সেও যদি সেটা বোঝে, তাহলেই কেবল পাপমুক্ত হবে নমস্কার সম্বোধন; কারণ, তাতে দাতা ও গ্রহিতা উভয়েই বুঝতে পারবে যে- আসলে তাকে নয়, তার ভেতরের ঈশ্বরকে সম্মান দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু এটা যদি দাতা বুঝে, কিন্তু গ্রহিতা না বুঝে, তাহলে গ্রহিতা তো ঈশ্বরের স্থানে বসে যাবে, আর সাধারণ মানুষকে ঈশ্বরের স্থানে বসানোর পাপ হবে নমস্কার দাতার, আর না বুঝে নিজেকে ঈশ্বরের স্থানে মেনে নেওয়ায়, পাপ হবে নমস্কার গ্রহিতারও। আবার দাতা ও গ্রহিতা কেউই যদি নমস্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ না বুঝে একে অপরকে নমস্কার দেয়, তাহলে উভয়েই নিজেদেরকে ঈশ্বরের স্থানে মেনে নেওয়ায় পাপ হবে দুজনেরই। তাহলে এখন আপনারাই বলেন না বুঝে নমস্কার দেওয়া নিরাপদ কি না বা বুদ্ধিমানের কাজ কি না ? যদি কাউকে নমস্কার দেওয়া হয় তাহলে তাকে আগে বোঝাতে হবে নমস্কার দেওয়ার আভিধানিক অর্থ, তারপর তাকে তা দিতে হবে এবং তখন সেটা সঠিক হবে। নমস্কারের আভিধানিক অর্থ না বুঝে একে অপরকে নমস্কার দেওয়া মানে নিজের পাপকে বাড়ানো। আর বর্তমান হিন্দু সমাজের ০.৫% মানুষও নমস্কারের আভিধানিক অর্থ জানে না, তাহলে প্রায় সব হিন্দুকে নমস্কার বলার পরামর্শ দেওয়া কি তাদেরকে পাপের পথে ঠেলে দেওয়া নয় ?

বেদের গায়ত্রী মন্ত্র অবশ্যই মহামন্ত্র, কিন্তু সেটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, উচ্চস্তরের সাধকদের জন্য, তাই গায়ত্রী মন্ত্রের ফল একমাত্র তারাই পেতে পারে; একারণেই সাধারণের জন্য মহামন্ত্র হলো হরে কৃষ্ণ হরে রাম, যার ফল পাওয়ার জন্য কোনো উচ্চস্তরের জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই উচ্চস্তরের সাধক হওয়ারও। একইভাবে সাধারণ মানুষদের ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে সম্মান জানানোর জন্য নমস্কার শব্দের দূরুহ আভিধানিক অর্থকেও জানার বা ধারণ করার প্রয়োজন নেই, কারো জয় চাইলেই তাকে সম্মান জানানো হয়, একই সাথে তার জয়ও কামনা করা হয়, এসব বিবেচনা করেই হিন্দুদের মধ্যে সম্বোধন হিসেবে আমার আবিষ্কার- জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃষ্ণ; কারণ, বর্তমানে হিন্দু জাতি রয়েছে সবচেয়ে সমস্যা সঙ্কুল অবস্থায়, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ হতে পারে শুধু রাম বা শ্রীকৃষ্ণের যোদ্ধা আদর্শকে নিজের মধ্য ধারণ করলেই। আর এর সহজ উপায় হলো- জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃ্ষ্ণ বলে উনাদেরকে স্মরণ করা, ফলে তাদের আদর্শ এমনিতেই আপনার মধ্যে সঞ্চারিত হবে, আর এর ফলে আপনি যেমন বিপদ আপদে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন, তেমনি পারবেন সমাজ এবং ধর্মকেও রক্ষা করতে। আর এটাও প্র্যাকটিক্যাল ব্যাপার যে জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃষ্ণ বলার মাধ্যমে মানুষের মনে ও দেহে একটা জোশ আসে, যে জোশ নমস্কার বলার মাধ্যমে আসে না। আর এই জোশ ই হলো জগতে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার একমাত্র উপায়, যদি আপনি সেটাকে উপলব্ধি করে থাকেন।

আশা করছি- সনাতনীদের মধ্যে পারস্পারিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে, কেনো নমস্কারের পরিবর্তে জয় শ্রীরাম বা জয় শ্রীকৃ্ষ্ণ বলতে হবে, সেটা আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 9 July 2020

Tusar Sarker এবং শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ :


#Tusar_Sarker এবং শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ :


"আমরা সনাতনী" গ্রুপের মডারেটর Tusar Sarker গত ১৯.৮.১৮ তারিখে "শ্রী কৃষ্ণ ছাড়াও সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী যারা বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন" নামে একটি পোস্ট করে এটা প্রমান করার চেষ্টা করেছে যে, শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক অর্জুনকে বিশ্বরূপ প্রদর্শন কোনো ঘটনা নয়, একজন মুনিও কাউকে অমন বিশ্বরূপ দেখাতে পারে।

তার এই পোস্টের উদ্দেশ্য যে শ্রীকৃষ্ণকে ছোট করা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তুষার সরকার, তার বিশ্বরূপের রেফারেন্স হিসেবে- কূর্ম পুরান, বৃহৎ সংহিতা, গনেশ গীতা, চণ্ডী, বরাহ পুরান, বায়ু পুরান, বামন পুরান, পদ্ম পুরান, লিঙ্গ পুরানের নাম উল্লেখ করেছে; কিন্তু তুষার সরকারের সম্ভবত জানা নেই যে গীতার ৭০০ শ্লোক ছাড়া হিন্দু ধর্মের সমস্ত গ্রন্থ কোনো না কোনো ভাবে বিকৃত, পুরানগুলো তো বিকৃতির মহারাজা; তাই কোনো সিদ্ধান্ত পুরানের রেফারেন্সের উপর নেওয়া উচিত নয়, আর তা সঠিকও নয়। গীতার ৭০০ শ্লোকের বাইরে কোনো রেফারেন্স দিতে হলে আগে পিছে বহু চিন্তা করে, ঘটনা পর্যায় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর তা বলতে বা দিতে হবে, না হলে সেই রেফারেন্স যে অন্তঃসার শুন্য বা মিথ্যা প্রমানিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ কী এবং তিনি কে, এই বিষয়টি ভালো মতো জানা থাকলে সম্ভবত তুষার এই পোস্ট লিখতো না; এ প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে বলে নিই বেদব্যাসকৃত পুরানগুলো কিভাবে বিকৃত হয়েছে।

বেদব্যাসের হাতে- বেদ, মহাভারতসহ পুরাণগুলো লিপিবদ্ধ হওয়ার পর, বিভিন্ন ব্যক্তির প্রয়োজনে সেগুলো কপি হতে শুরু করে। তথন তো আর ছাপাখানা ছিলো না, তাই গ্রন্থগুলো কপি হতো হাতে লিখে, যাদের হাতের লেখা ভালো ছিলো তারা এই কাজ পেতো এবং এদেরকে বলা হতো লিপিকার। কোনো এক ব্যক্তি, হয়তো তার নিজের প্রয়োজনে বেদব্যাসের নিকট থেকে মূল পাণ্ডুলিপি নিয়ে কোনো এক লিপিকরকে দিয়েছে কপি করার জন্য, সেই লিপিকর যখন সেটা কপি করেছে, তখন তার মধ্যে নিজের মেধা ও বুদ্ধিমতো কিছু সংযোজন বিয়োজন করে ছেড়ে দিয়েছে। লিপিকারদের এই কারসাজিকে বুঝতে না পেরে এই বিকৃত পাণ্ডুলিপিকেই পাণ্ডুলিপির নতুন মালিক সঠিক বলে জেনেছে এবং সেই পাণ্ডুলিপি হতে যখন নতুন আরেকটি পাণ্ডুলিপি হয়েছে, তখন তাতেও লিপিকাররা সেই একই ঘটনা ঘটিয়েছে। সব লিপকিার যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা বলছি না, তবে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন লিপিকার এই ঘটনা যে ঘটিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কারণ, মানুষ হচ্ছে অত্যন্ত ধান্ধাবাজ এবং কতৃত্বপরায়ণ প্রাণী। কোথাও কোনো ক্ষমতা খাটানোর সুযোগ থাকলে মানুষ তা খাটাবেই।

কপি করার সময় সংযোজন বিয়োজন করে বড় বড় গ্রন্থের মধ্যে বিকৃতি ঘটানো তো খূব সহজ ব্যাপার, যেখানে সেই সুযোগ নেই, কাব্যপ্রতিভাসম্পন্ন অখ্যাত মানুষেরা সেখানেও কিছু করার চেষ্টা করেছে এই কামনায় যে, তবু যেন তাদের কিছু লেখা মানুষ পড়ে; যেমন- মধ্যযুগে চণ্ডীদাস ছিলো বৈষ্ণব পদাবলীর একজন বিখ্যাত কবি, তার নাম নকল করে বহু কবি বৈষ্ণব পদাবলী লিখেছে, এই আশায় যে চণ্ডীদাস নাম দেখলেও কিছু লোকে তার কবিতা পড়বে। এই চণ্ডীদাস সমস্যা বাংলা সাহিত্যের একটি বিশাল সমস্যা, প্রকৃতপক্ষে চণ্ডীদাস কয়জন বা প্রকৃত চণ্ডীদাস কে, তা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীদের এক বিশাল গবেষণা চালাতে হয়। জানলে অবাকও হতে পারেন যে, প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজের নামে না চালিয়ে "ভানুসিংহ" নামের ছদ্মবেশে 'ভানুসিংহের পদাবলী' নামে এক ধরণের বৈষ্ণব কবিতা লিখে তাদের পারিবারিক পত্রিকায় ছাপাতেন, এই আশঙ্কায় যে রবীন্দ্রনাথ নাম দেখলে কেউ তার কবিতা পড়বে না, তার পরিবর্তে 'ভানুসিংহ' নাম দেখলে, এটা মধ্যযুগের কোনো কবি ভেবে তার কবিতা কেউ পড়লেও পড়তেও পারে।

লেখকদের এই চিরন্তন আকুতি, তার লেখা সবাই পড়ুক, তাতে তার নিজের নাম থাক বা না থাক। বাংলা ফেসবুক জগতে হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে যত লেখা আছে, তার ৭৫% লেখা আমার নিজের, কপি করে কেউ সেগুলো নিজের নামে চালায়, কেউ আমার কাছে ঋণ স্বীকার করে, যে যেভাবেই চালাক ফেসবুকের পাতায় আমার লেখা নজরে পড়লেই এক ধরণের সুখ লাগে যে লোকজন আমার লেখা পড়ছে, পছন্দ করছে। কেউ যদি একান্তই আমার লেখা তার নিজের নামে না চালায়, আমি তার প্রতি খুব একটা রুষ্ট হই না।

যা হোক, লিপিকররা তাদের নিজের কথা অন্যদেরক পড়ানোর জন্য নানাভাবে হিন্দুধর্মের গ্রন্থগুলোতে বিকৃত করেছে এবং এই বিকৃতি চলেছে প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে, সুতরাং পুরানগুলো প্রকৃত অবস্থা কী, সেটা একবার কল্পনা করুন, আর ভাবুন, সেই পুরানগুলোর কোনো তথ্য বিনা সংকোচে বিশ্বাস বা গ্রহন করা সম্ভব কি না। পুরানগুলো যে নানাভাবে বিকৃত তার একটা বাস্তব উদহারন দিচ্ছি, তাতে কোনো পুরান না পড়েও আপনি এগুলোর বিকৃতিটাকে ধরতে পারবেন, শিব কর্তুক গনেশের মাথা কাটার ঘটনা আপনি যতগুলো পুরানে পাবেন, দেখবেন ততগুলোই ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীতে ভরপুর, তাহলে কোনটা সত্য? সত্য সব সময় একটাই হয়, মিথ্যারই বহু রূপ থাকে, পুরানের গল্পগুলোর বহুরূপই প্রমাণ করে যে, পুরানের গল্পগুলি নানা ভাবে বিকৃত।

১৮০০ সালের পর ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পুরানগুলো নানা ভাবে বিকৃত হয়েছে, সুতরাং পুরানগুলোর কোনো রেফারেন্স বিনা প্রশ্নে মেনে নেওযা সম্ভব নয়, আর সেই পুরানের রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে তুষার সরকার, বিশ্বরূপ প্রসঙ্গে কৃষ্ণকে ছোট করার অপপ্রয়াস করছে, আসলে এর পেছনে তুষার সরকারের উদ্দেশ্যটা কী ?

এবার আসি কৃষ্ণ- কী এবং কে সেই প্রসঙ্গে।

দেব-দেবীদের প্রকৃত পরিচয় এবং অবতার তত্ত্বের রহস্য লোকজন সঠিকভাবে জানে না বলেই তারা নানাভাবে নানাভাগে বিভক্ত এবং একেকজন একেক দেব-দেবীর ভক্ত বা অনুসারী। অথচ গীতার মধ্যেই স্পষ্ট করে বলা আছে যে, সমস্ত দেব-দেবীর অবস্থান শ্রীকৃষ্ণে এবং শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি ছাড়া কোনো দেব-দেবী তার ভক্তদের জন্য কিছু করতে পারে না।

দেখুন নিচের দুটি শ্লোক-

"যেহপ্যন্যদেবতাভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ।
তেহপি মামেব কৌন্তেয় যজন্ত্যবিধিপূর্বকম।।" - (গীতা, ৯/২৩)

এর অর্থ- হে কৌন্তেয়, যারা অন্য দেবতাদের ভক্ত এবং শ্রদ্ধা সহকারে তাদের পূজা করে, প্রকৃতপক্ষে তারা অবিধি পূর্বক আমারই পূজা করে

এবং

"স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে।
লভতে চ ততঃ কামান্ময়ৈব বিহিতান্ হিতান্।"- ৭/২২

এর অর্থ: সেই পুরুষ শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেব বিগ্রহের পূজায় তৎপর হন এবং সেই দেবতার মাধ্যমে আমারই দ্বারা বিহিত কাম্য বস্তু অবশ্য লাভ করেন।

তার মানে দেব-দেবীরা যা করছে, তা কৃষ্ণের অনুমতি এবং ক্ষমতার বলেই করছে, এখন সেই দেব-দেবী যদি কাউকে কোনো ঘটনাক্রমে বিশ্বরূপ দেখিয়েই থাকে, তাতে সমস্যা কী ? তারা তো আর নিজের ক্ষমতা বলে কিছু করছে না, যা করছে তা কৃষ্ণের অনুমতি এবং ক্ষমতার বলেই করছে।

উপরে যা বলেছি, তাতেই তুষার সরকারের পোস্টের জবাব দেওয়া হয়ে গেছে, তারপরও তুষারের রেফারেন্সগুলোকে একটি একটি করে বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছি যে, যারা যারা যারা বিশ্বরূপ দেখিয়েছে, তারা আসলে কে ?

তুষার তার প্রথম রেফারেন্সে বলেছে,

"দক্ষের কন্যা সতী জন্মের পরেই দক্ষকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন"

দক্ষ ও সতীর ঘটনা বাস্তব পৃথিবীতে কখনো ঘটে নি, বিশ্বসৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য সমস্ত দেব-দেবীর মতো দক্ষ এবং সতীও মুনি ঋষিদের কল্পনা। এই সতী মহাদেবের নারী শক্তি হিসেবে কল্পিত, অর্থাৎ সতীও যা মহাদেবও তাই, আর মহাদেবই যে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, সে কথা বলা আছে গীতার নিচের এই শ্লোকে-

“রুদ্রানাং শঙ্করশ্চাস্মি”- (গীতা, ১০/২৩)

এর অর্থ : রূদ্রদের মধ্যে আমি শিব।

সুতরাং সতীর বিশ্বরূপ দেখানো শ্রীকৃষ্ণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কিছু নয়।

দেব-দেবীদেরকে কাল্পনিক বলায় যাদের মাথার চান্দি গরম হয়ে গেছে, তাদের জন্য বলছি- কোনো কিছু কাল্পনিক মানেই তা অস্তিত্বহীন বা শক্তিহীন নয়। সব সময় বাস্তবের আগেই সৃষ্টি হয় কল্পনা এবং কল্পনা থেকেই বাস্তবের সৃষ্টি। পৃথিবীতে যা কিছু মানুষ তৈরি করেছে, তার সমস্ত কিছু আগে মানুষ তার কল্পনায় সৃষ্টি করেছে, পরে তা বাস্তব রূপ লাভ করেছে। বিষয়টা আরেকটু ক্লিয়ার করে দিচ্ছি-

গাণিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক সময়ই আমরা এক্স, ওয়াই জেডকে ধরে নিই, এই XYZ কিন্তু পুরোটাই কল্পনা; কিন্তু অঙ্কের শেষে আমরা এগুলোর কিছু মান পাই, যা XYZ এর শক্তি এবং ঐ অঙ্কের ভিত্তি; একইভাবে বিশ্বসৃষ্টির গানিতিক রহস্যকে সমাধান করার জন্য মুনি ঋষিদের কল্পিত বিভিন্ন দেব-দেবীও প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি এবং বিশ্বসৃষ্টির ভিত্তি।

যা হোক, তুষার তার দ্বিতীয় রেফারেন্সে বলেছে,

"বৃহৎ সংহিতায় ইন্দ্রের বিশ্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছে"

কিন্তু ইন্দ্রই যে শ্রীকৃষ্ণ, তা বলা আছে, গীতার ১০ম অধ্যায়ের ২২ নং শ্লোকে, সেখানে বলা আছে,

"দেবানামস্মি বাসবঃ"

এর অর্থ- সমস্ত দেবতাদের মধ্যে আমি ইন্দ্র।

এখানে বাসব মানে ইন্দ্র।

সুতরাং ইন্দ্র বিশ্বরূপ দেখালে তাতে সমস্যা কী ?

তুষার তার তৃতীয় রেফারেন্স বলেছে,

"গণেশ রাজা বরেণ্যকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন"

শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের ছবি ভালো করে দেখলে দেখবেন, তার মধ্যে গণেশের ছবিও আছে, তার মানে গণেশই শ্রীকৃষ্ণ; সুতরাং গণেশ বিশ্বরূপ দেখাতেই পারে, কোনো সমস্যা নেই।

৪র্থ এবং ৫ম রেফারেন্সে তুষার বলেছে,

"ব্রহ্মা চন্ডিকে স্তুতি করে বলছেনঃ

-হে দেবী, তুমিই সবকিছু ধারণ কর, তুমি জগৎ সৃষ্টি কর, তুমিই পালন কর, তুমিই প্রলকালে গ্রাস কর। (চণ্ডীঃ ১/৬৮-৬৯)

- এই জগতে আমি একাই, আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে? এই দুষ্ট দেখো- আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে। (চণ্ডী - ১০/৮)

এই চণ্ডী হলো দেবী পার্বতীরই এক রূপ, আর পার্বতী হলো শিব বা মহাদেবের নারী শক্তি, তার মানে পার্বতীই হলো চণ্ডী এবং চণ্ডী ই হলো মহাদেব বা শিব; আর শিব ই যে কৃষ্ণ সেটা তো গীতার ১০/২৩ নং শ্লোকে-“রুদ্রানাং শঙ্করশ্চাস্মি”- এর মধ্যেই বলা আছে, সুতরাং দেবী চণ্ডীরও বিশ্বরূপ দেখাতে তো কোনো সমস্যা নেই।
এই একই কথা প্রযোজ্য তুষারের ৫ম, ষষ্ঠ, ও ৭ম রেফারেন্সে যেখানে শিবের বিশ্বরূপের কথা বলা হয়েছে।
অষ্টম রেফারেন্সে তুষার ব্রহ্মার বিশ্বরূপের কথা বলতে গিয়ে বলেছে,

>> পদ্মপুরাণে ব্রহ্মার বিশ্বরূপের বর্ণনাঃ
- হে বিভু, আমি দেখছি তোমার অনেক মুখ, তুমি যজ্ঞের গতি, তুমি পুরাণ পুরুষ, তুমি ব্রহ্মা, ঈশ, জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা। প্রপিতামহ, তোমাকে নমস্কার।

(পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ডঃ ৩৪/১০০)

শিব যেমন কৃষ্ণ, তেমনি ব্রহ্মাও যে কৃষ্ণই সে কথা বলা আছে গীতার ১১/১৫ নং শ্লোকে, সেখানে বলা আছে-

"পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহেসর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্ ।"
ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনন্থম্ ঋষীংশ্চ সর্বানুরাগাংশ্চ দিব্যান্।।- (গীতা, ১১/১৫)

এর অর্থ: হে দেব, আপনার দেহে আমি সমস্ত দেবতা, বিবিধ প্রাণীদের, পদ্মের আসনে অবস্থিত ব্রহ্মা, মহাদেব, সমস্ত ঋষিগণ এবং দিব্যসর্পসমূহ দেখছি।

সুতরাং ব্রহ্মা যদি কাউকে বিশ্বরূপ দেখায়, সেটা কৃষ্ণই দেখিয়েছেন এবং এতে সনাতন ধর্মের মূল থিয়োরির কোনো ব্রেক হয় নি।

তুষার তার নবম রেফারেন্সে আবার গণেশের কথা বলেছে, গণেশ বিষয়ে উপরে একবার বলেছি, তাই আর তার পুনরু্ল্লেখ করলাম না।

দশম রেফারেন্সে তুষার কার্তিকের বিশ্বরূপের কথা বলেছে, কিন্তু কার্তিকই যে শ্রীকৃষ্ণ, সে কথা মনে হয় তুষার জানে না, দেখে নিন নিচের শ্লোক-

“সেনানীনামহং স্কন্দঃ”- (গীতা, ১০/২৪)

এর অর্থ- সেনাপতিদের মধ্যে আমি কার্তিক।

সুতরাং কার্তিকের বিশ্বরূপ দেখাতে সমস্যা কোথায় ?

একাদশ রেফারেন্সে তুষার নারায়ণের বিশ্বরূপের কথা বলতে গিয়ে বলেছে,

"অনন্তর হরি মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেন। মুনিবর ভগবান দধিচী নারায়ন শরীর মধ্যে পৃথক পৃথক দেবতা, কোটি কোটি রুদ্র এবং কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড অবলোকন করলেন।" (৫৮;৫৯)

নারায়ণ ই যে কৃষ্ণ, সেটা তো সবাই কম বেশি জানে, সুতরাং নারায়ণের বিশ্বরূপ প্রদর্শন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এর পর তুষার দধীচি মুনির বিশ্বরূপের কথা বলতে গিয়ে বলেছে-

অতঃপর দধীচি মুনি মুনি বললেন -
- হে মহাবাহো! বিচারপূর্বক প্রতিভা দ্বারা মায়া ত্যাগ করুন, হে মাধব! বিজ্ঞানসহস্র নিতান্ত দূর্বিজ্ঞেয়। হে অনিন্দিত! আমি তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দান করিতেছি, তুমি আমার শরীর মধ্যে তোমা সহ সমস্ত জগৎ ব্রহ্মা, রুদ্র এই সকল অবলোকন করো। (৬২;৬৩)

শ্লোকগুলোতে দধীচি মুনি বিশ্বরূপ কে মায়ার সাথে তুলোনা করেছেন এমনকি তিনি নিজেও বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। অতঃএব বিশ্বরূপ প্রদর্শন একজন মুনির পক্ষেও সম্ভব।

এখানে খেয়াল করুন, দধীচি মুনি দিব্যদৃষ্টি দান করছে নারায়ণকে, এই পুরান লেখক হয়তো খেয়াল করে নি যে, তার বক্তব্যে- সৃষ্টি, তার স্রষ্টার চেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে; সকল পুরান যে ভয়াবহরকমভাবে বিকৃত এই ঘটনাটি তার আরেকটি প্রমান, সৃষ্টি কখনো তার স্রষ্টার চেয়ে বড় হতে পারে না, কিন্তু এখানে সৃষ্টি (দধীচি মুনি), স্রষ্টার (নারায়ণ) চেয়ে বড়! এই পুরানের রেফারেন্স দিয়ে তুষার বলেছে বিশ্বরূপ একজন মুনির পক্ষেও দেখানো সম্ভব এবং এই কথা বলে সে কৃষ্ণকে ছোট করার চেষ্টা করেছে, আমি তুষারকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কৃষ্ণকে ছোট করে কাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন, বা আপনার প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কী ?

এখন দেখা যাক দধীচি মুনি কে এবং তিনি কৃষ্ণের শক্তির বাইরে কি না ?

লিঙ্গ পুরানের রেফারেন্সে তুষার দধীচি মুনি কর্তৃক নারায়নকে দিব্যদৃষ্টি দানের কথা বলেছে, হিন্দু শাস্ত্রের ইতিহাসে এই দিব্যদৃষ্টি দানের মাত্র দুটি ঘটনা আছে, প্রথমটা শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে দৃষ্টি দান, যার মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্র কিছুক্ষণের জন্য হলেও শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পেয়েছিলো; দ্বিতীয় ঘটনাটি বেদব্যাস কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রের অনুচর সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি দান, যার মাধ্যমে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত না থেকেও যুদ্ধের ঘটনা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করেছিলো। এই দিব্যদৃষ্টি দানের ক্ষমতা দধীচি মুনির ছিলো, তার মানে দধীচি মুনির বিশেষ ক্ষমতা ছিলো; এছাড়াও আমরা জানি সব মুনি ঋষিরা বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ এবং মুনি ও ঋষি প্রায় সমার্থক শব্দ। এখন দেখা যাক এই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় কিছু বলেছেন কি না ?
গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৪১ নং শ্লোকের অর্থ হলো- এই পৃথিবীতে যা কিছু ঐশ্বর্যযুক্ত, শ্রীসম্পন্ন অথবা শক্তিসম্পন্ন দেখবে, তা ই আমার শক্তির অংশ হতে উদ্ভূত বলে জানবে।

তার মানে দধীচি মুনির বিশ্বরূপ দেখানোর শক্তি শ্রীকৃষ্ণের নিয়ন্ত্রণ বা তার শক্তির বাইরে কিছু নয়, তাহলে দধীচি মুনির বিশ্বরূপ দেখানোতে প্রব্লেমটা কোথায় ?

এছাড়াও একটু আগেই বলেছি মুনি ও ঋষি প্রায় সমার্থক শব্দ, এখন ঋষিদের সম্পর্কে গীতায় কী বলা আছে সেটা দেখা যাক-

গীতার একাদশতম অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোকে অর্জুন বলেছেন, "হে প্রভু, আমি তোমার দেহের মধ্যে সমস্ত দেবতা, নানাবিধ প্রাণী, পুন্যাত্মা ঋষিবৃন্দ, সর্পকূল এবং কমলসানস্থ ব্রহ্মাকে দেখছি।"

এখন মুনি ও ঋষি যদি একই ধরণের ব্যক্তি হন, তাহলে দধীচি মুনির অবস্থান শ্রীকৃষ্ণে এবং এই দধীচি মুনি যদি বিশ্বরূপ দেখানই, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে ?
আবার মুনি ও ঋষি যদি আলাদা ধরণের ব্যক্তিও হন, তাহলে গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু বলেছেন যে মুনীদের আমি ব্যাস (গীতা, ১০/৩৭) এবং "সিদ্ধপুরুষদের মধ্যে আমি কপিল মুনি" (গীতা, ১০/২৬), আবার যেহেতু গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৪০ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, " আমার বিভূতিসমূহের শেষ নেই, আমার যা কিছু বিভূতির কথা তোমাকে বললাম, তা আমার বিভূতিসমূহের সংক্ষেপ মাত্র।" তার মানে একজন ঋষির কথা বললেও শ্রীকৃষ্ণ সকল ঋষির কথা বলেছেন এবং একজন মুনির কথা বললেও সকল মুনির কথা বলেছেন এবং যেহেতু গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৩৯ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, এই বিশ্ব চরাচরের কোনো কিছুই আমা ছাড়া হইতে পারে না" সেহেতু এটা পরিষ্কার যে দধীচি মুনিও শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ নয়, তাহলে সেই দধীচি মুনির বিশ্বরূপ দেখাতে দোষ কোথায় ?

উপরের এই সকল আলোচনা শেষে এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, একজন মুনিও বিশ্বরূপ দেখাতে পারে বলে তুষার সরকার শ্রীকৃষ্ণকে যে অবজ্ঞা করেছে, এটা গীতা সম্পর্কে তার অজ্ঞতা এবং শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কে ও কী, তা না জানার অর্থাৎ তার মূর্খতারই ফল।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

নিচে দেখে নিন তুষার সরকারের পুরো স্ট্যাটাসটি।
একাএকাএএশ্রী কৃষ্ণ ছাড়াও সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী যারা বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন-
>> দক্ষের কন্যা সতী জন্মের পরেই দক্ষকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ
(কূর্মপুরাণ, পূর্বভাগঃ ১২/৫২-৫৩,৫৮)
>> বৃহৎ সংহিতায় ইন্দ্রের বিশ্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছেঃ
(বৃহৎ সংহিতাঃ ৪৩/৫৪-৫৫)
>> গণেশ রাজা বরেণ্যকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ
(গণেশ গীতাঃ ৮/৬-৭)
>> ব্রহ্মা চন্ডিকে স্তুতি করে বলছেনঃ
-হে দেবী, তুমিই সবকিছু ধারণ কর, তুমি জগৎ সৃষ্টি কর, তুমিই পালন কর, তুমিই প্রলকালে গ্রাস কর।
(চণ্ডীঃ ১/৬৮-৬৯)
- এই জগতে আমি একাই, আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে? এই দুষ্ট দেখো- আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে।
(চণ্ডী - ১০/৮)
>>বরাহ পুরাণে শিবের বিশ্বরূপ প্রদর্শিত হয়েছেঃ
- শিব এখানে প্রোদেশ প্রমাণমাত্র হয়েও শতশীর্ষ, শত উদর বিশিষ্, সহস্র বাহু, সহস্র পদ, সহস্র চক্ষু, সহস্র মস্তক ও সহস্র মুখ সমন্বিত। অণু থেকে ক্ষুদ্র হয়েও সর্ববৃহৎ।
(বরাহ পুরাণ - ১/৯/৬৮)
>> বায়ু পুরাণেও শিবের বিশ্বমূর্তি বর্ণিত হয়েছেঃ
- শিবের উৎপত্তি অব্যাক্ত, তার দেহ ব্যাক্ত অর্থাৎ প্রকাশিত। তার দেহের অন্তর্গতসমূহ কাল। অগ্নি তাঁর মুখ, চন্দ্র ও সূর্য তার নেত্রদ্বয়, দিকসমূহ তাঁর কর্ণ, বায়ু তার ঘ্রাণ, বেদ তার বাক্য, অন্তরীক্ষ শরীর, পৃথিবী পদদ্বয়, তারকাগণ রোমকূপ।
(বায়ু পুরাণঃ ১/৯/৬৮)
>> বামন পূরাণেও শিবের বিশ্বরূপ পাওয়া যায়ঃ
- তুমিই বিষ্ণু, তুমিই ব্রহ্মা, তুমিই মৃত্যু, তুমিই বরদ, তুমি সূর্য ও চন্দ্র, তুমি ভূমি, তুমি জল, তুমি যজ্ঞ, নিয়ম, তুমি অতীত, ভবিষ্যৎ, তুমি আদি ও অন্ত, তুমি সূক্ষ্ম ও স্থুল, তুমিই (বিরাট) পুরুষ।
(বামন পুরাণঃ ৫৪/৯৬-৯৯)
>> পদ্মপুরাণে ব্রহ্মার বিশ্বরূপের বর্ণনাঃ
- হে বিভু, আমি দেখছি তোমার অনেক মুখ, তুমি যজ্ঞের গতি, তুমি পুরাণ পুরুষ, তুমি ব্রহ্মা, ঈশ, জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা। প্রপিতামহ, তোমাকে নমস্কার।
(পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ডঃ ৩৪/১০০)
>> গণেশ গীতাতে গণেশকে ব্রহ্মস্বরূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গণেশ নিজের স্বরূপ বর্ণনা করছেন এভাবে:
- হে রাজন। শিব, বিষ্ণু, শক্তি এবং সূর্যে যে ভেদবুদ্ধি সে আমারই সৃষ্টি, যেহেতু আমিই জগৎ সৃষ্টি করি, হে প্রিয়। আমিই মহা বিষ্ণু, আমিই সদাশিব, আমিই মহাশক্তি, আমিই অর্যমা।
(গণেশ গীতাঃ ১/২০-২২)
>> মহাভারতের মার্কেণ্ডেয়-কৃত কার্তিকেয় স্তবে কার্তিকেয়ে বিশ্বমূর্তিরূপে বন্দিত হয়েছেনঃ
- তুমি পদ্মপলাশলোচন, তুমি অরবিন্দতুল্যমুখ-বিশিষ্ট, তোমার সহস্র বদন,সহস্র বাহু, তুমি লোকপাল, শ্রেষ্ঠ হরি, সকল দেব ও অসুরগণের আবাধ্য।
( মহাভাঃ বনপর্বঃ ২৩১, অঃ৪৩)
>> লিঙ্গপুরাণ পূর্বভাগের ৩৬ তম অধ্যায়ে এরকম বর্ননা এসেছে। শ্রীবিষ্ণু ব্রাহ্মণবেশে দধীচি মুনির নিকট এসে বললেন - আমি আপনার নিকট বর প্রার্থনা করি আমাকে বর প্রদান করুন। দধীচি মুনি বললেন রুদ্রদেবের অনুগ্রহে ভূত ভবিষ্যত আমি জানি। আপনাকে আমি চিনিতে পারিয়াছি আপনি স্বরূপে ফিরে আসুন। আপনি কৃপা করে বলুন শিব আরাধনা পরায়ন ব্যক্তির কোন ভীতি থাকে? আমি কাহারও সমীপে ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ছদ্মবেশ ত্যাগ করে বললেন - হে বিপ্র আমি জানি তুমি কাহারো নিকট ভয় পাও না তবুও তুমি সভামধ্যে ক্ষুপভূপতিকে বলো আমি ভয় পাইতেছি। তখন মহামুনি বললেন আমি ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ক্ষুব্ধ হইয়া মহামুনিকে চক্র উত্তোলন করে মারতে উদ্যত হলেন। তখন মুনির সহিত ভয়ানক যুদ্ধ বাধলো। অতপর বিষ্ণু মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেনঃ
- অনন্তর হরি মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেন। মুনিবর ভগবান দধিচী নারায়ন শরীর মধ্যে পৃথক পৃথক দেবতা, কোটি কোটি রুদ্র এবং কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড অবলোকন করলেন।
(৫৮;৫৯)
অতঃপর দধীচি মুনি মুনি বললেন -
- হে মহাবাহো! বিচারপূর্বক প্রতিভা দ্বারা মায়া ত্যাগ করুন, হে মাধব! বিজ্ঞানসহস্র নিতান্ত দূর্বিজ্ঞেয়। হে অনিন্দিত! আমি তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দান করিতেছি, তুমি আমার শরীর মধ্যে তোমা সহ সমস্ত জগৎ ব্রহ্মা, রুদ্র এই সকল অবলোকন করো। (৬২;৬৩)
শ্লোকগুলোতে দধীচি মুনি বিশ্বরূপ কে মায়ার সাথে তুলোনা করেছেন এমনকি তিনি নিজেও বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। অতঃএব বিশ্বরূপ প্রদর্শন একজন মুনির পক্ষেও সম্ভব।

Monday, 8 June 2020

Back to Vedas এর গীতা নিয়ে চুলকানির জবাব


Back to Vedas এর গীতা নিয়ে চুলকানির জবাব :

এরা প্রশ্ন তুলেছে, গীতার মধ্যে সঞ্জয় ও ধৃতরাষ্ট্র চরিত্রের উপস্থিতি কেনো ? কারণ, সঞ্জয় ও ধৃতরাষ্ট্রের মুখে যে সব কথাবার্তা বসানো হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই উপনিষদের কথা নয়, যেহেতু গীতা মাহাত্ম্যে বলা হয়েছে, গীতা হলো উপনিষদের সার, সেই উপনিষদরূপ গাভীর দোগ্ধা হলেন শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন হলেন তার বাছুর। তাই গীতার সব কথা হতে হবে উপনিষদ থেকে, এখানে সঞ্জয় ও ধৃতরাষ্ট্রের মুখে বলা বাণীগুলো গীতার কথা নয়। এছাড়াও গীতার শেষ অধ্যায়ে নাকি বলা আছে যে- শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের মুখের কথাই কেবল গীতা, তাই গীতা হিসেবে সঞ্জয় ও ধৃতরাষ্ট্রের কথাগুলোকে তারা মানতে নারাজ। অথচ গীতার ১৮/৭০ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "যিনি আমাদের এই ধর্ম সংবাদ অধ্যয়ন করিবেন, তিনি জ্ঞান যজ্ঞ দ্বারা আমাকেই পূজা করিলেন, ইহাই আমি মনে করি।" এখানে কি বলা আছে যে, অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথাই শুধু গীতা ? আর অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথাই যদি শুধু গীতা হয়, তাতেই বা সমস্যা কী ?

একটা গল্প বলতে গেলে, তাতে নানা চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়ে গল্পটাকে রসমধুর করে উপস্থাপন করতে হয়, যাতে পাঠকরা সেটা সহজে বোঝে এবং পাঠকদের কাছে তা হৃদয়গ্রাহী হয়। শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথনকে পাঠকদের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য এবং অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে এইসব গুরুগম্ভীর কথাবার্তা কিভাবে শুরু হলো, সেটা বোঝানোর জন্যই ধৃতরাষ্ট্র এবং সঞ্জয়ের কথোপকথন দ্বারা কাহিনীর শুরু করা হয়েছে। অথচ -যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা- এর মতো, গীতাকে অপছন্দ ব'লে, আর্য সমাজীরা এর মধ্যে অযথা নানা কল্পিত ভুল তুলে ধ'রে, সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে গীতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, এদের উদ্দেশ্যটা কী ?

আমরা প্রায় সবাই ঈশপের গল্প সম্পর্কে জানি, তিনি পশু পাখির মাধ্যমে একটি গল্প ব'লে, শেষে একটা নীতি কথা দিতেন, যেটা ঐ গল্পের শিক্ষা এবং আমরা কথায় কথায় বা উদাহরণে শুধু সেই নীতিকথাটাই উল্লেখ করি, আর যাদের জানা আছে, তারা মূল গল্পটা বুঝে যায়। যেমন এক বাঘ স্রোতস্বিনী নদীর তীরে নেমে জল খাচ্ছিলো, তো তার ভাটিতে এক ভেড়াও জল খাচ্ছিলো, এমন সময় বাঘটি, ভেড়াটিকে বললো, তুই কিন্তু আমার খাওয়ার জল ঘোলা করছিস। ভেড়া উত্তর দিলো, আমি তো আপনার ভাটিতে অবস্থান করছি, তাহলে আমার ঘোলা করা জল আপনার দিকে যাবে কেনো ? এতে ক্ষেপে গিয়ে বাঘ বললো, তুই আমার সাথে ঝগড়া করছিস, এই বলে সেই বাঘ, ভেড়াটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাকে হত্যা করে তার মাংস খেলো। এই গল্পের নীতি কথা হলো- দুর্জনের ছলের অভাব হয় না।

খারাপ লোকের জন্য কারণের অভাব হয় না, এটা আমরা সবাই জানি, তারা চাইলেই যেকোনো একটি অজুহাত খাড়া করতে পারে। এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য ঈশপ মহাশয় বাঘ ও ভেড়া নামক দুটি চরিত্রের আশ্রয় নিলেন কেনো ? আসলে তিনি চেয়েছেন গল্পটি এমনভাবে উপস্থাপন করতে, যাতে সবার হৃদয়গ্রাহী হয়, এবং গল্পটা মনে রাখা সবার জন্য সহজ হয়। একারণেই গীতার শুরুটা করা হয়েছে ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়ের কথোপকথনের মাধ্যমে, যাতে গীতার জ্ঞান, অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ কোনো প্রেক্ষাপটে দিলেন, সেটা বোঝা সবার জন্য সহজ হয়। এই ছোট্ট একটি বিষয় নিয়ে আর্য সমাজীদের এত মাথা ব্যথা কেনো ? নাকি তারা ভাববার জন্য অন্য কোনো বিষয় পায় না ?

এরপর আর্য সমাজীদের মাথা ব্যথা হলো- শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ কে কে দেখেছে, সেটা নিয়ে!
তাদের বক্তব্য হচ্ছে- শ্রীকৃষ্ণ যেখানে অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখানোর জন্য দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছে, সেখানে অর্জুন ছাড়া অন্য কেউ সেই বিশ্বরূপ দর্শন করে কিভাবে, যেখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, " ইহার পূর্বে তুমি ছাড়া অপর কেউ আমার এই রূপ দেখে নি (গীতা, ১১/৪৭) বা তুমি ছাড়া অপর কেহ আমার এই রূপ দর্শন করিতে সক্ষম নয় ( গীতা, ১১/৪৮) ? এ প্রসঙ্গে আর্য সমাজীদের অভিযোগ হলো- অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের আগেই সঞ্জয় সেটা দেখতে শুরু করেছে, এটা কিভাবে সম্ভব হলো ?

টেলিভিশনের পর্দায় আমরা যখন নাটক, সিরিয়াল ও সিনেমা দেখি, তখন সেখানে একটি দৃশ্যাবলি বা সিকোয়েন্সের পর আরেকটা দৃশ্যাবলি বা সিকোয়েন্স দেখি। কিন্তু বাস্তবে যে সিকোয়েন্সটা আগে দেখেছি, সেটা আগে এবং যে সিকোয়েন্সটা পরে দেখেছি, সেটা পরে ঘটেছে, না একই সাথে ঘটেছে ? বাস্তবে কোনো কাহিনীর অনেকগুলি ঘটনা একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঘটে থাকে বা ঘটতে পারে, দেখানোর এবং দর্শকদের কাহিনী বোঝার সুবিধার্থে একটির পর একটি সিকোয়েন্সকে সেট করা হয়, যা মোটেই সময়ের ভিত্তিতে বাস্তব নয়, কারণ প্রকৃতপক্ষে ঘটনাগুলো হয়তো একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঘটেছে, কিন্তু আমরা দেখছি বা দেখাচ্ছি একটির পর একটা।

পুস্তক আকারে কোনো গল্প পরিবেশন করতে গেলেও এই একই ঘটনা ঘটাতে হয়, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে একই সময়ে ঘটা ঘটনাগুলোকে একটির পর একটি লিখতে হয়, যেটা ঘটেছে গীতার ক্ষেত্রেও।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরুর মূহুর্তে বেদব্যাস যান হস্তিনাপুরের রাজ প্রাসাদে এবং সেখানে গিয়ে সঞ্জয়কে তিনি দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেন, যাতে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সরাসরি দেখে ধৃতরাষ্ট্রকে তা বর্ণনা করতে পারে। ফলে কুরুক্ষেত্রে ঘটা সকল ঘটনা ই সঞ্জয়ের দেখার ক্ষমতার মধ্যে ছিলো। এই কারণে ১১/৮ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যখন অর্জুনকে বলেন, আমার যৌগৈশ্বর্য রূপ দেখো এবং তারপরই যখন তাঁর বিশ্বরূপ প্রদর্শন করতে শুরু করেন, ঠিক তখনই সঞ্জয়ও তা দেখতে শুরু করে। লিখন পদ্ধতির দুর্বলতার কারণে যেহেতু একই সাথে দুটি ঘটনার বর্ণনা করা যায় না, সেহেতু গীতায় সঞ্জয়ের বর্ণনাটা আগে করা হয়েছে, যেখানে সঞ্জয় একই সাথে শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ এবং সেই বিশ্বরূপ দেখে অর্জুনের যে অভিব্যক্তি, সেই অভিব্যক্তিকেও বর্ণনা করেছে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। এর মানে হলো- সঞ্জয়- অর্জুনসহ শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখেছে, আর অর্জুন দেখেছে শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ। ফলে দুজনের দর্শিত বিষয় একই নয়, আলাদা; সঞ্জয় দেখেছে বেশি, অর্জুন কম। এই প্রসঙ্গে আর্য সমাজীরা যে বলেছে, অর্জুনের পূর্বেই সঞ্জয়, শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখেছে, ব্যাপারটা তেমন নয়, বিশ্বরূপ অর্জুনই দেখেছে, লাইভে যুক্ত থাকার কারণে একই সময়ে সেটা সঞ্জয় দেখেছে মাত্র এবং সঞ্জয় ঐ সময়ে যা দেখেছে, সেটার বর্ণনা গীতায় জাস্ট অর্জুনের বর্ণনার আগে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে মাত্র।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি উদাহরণ দিই- স্মার্ট ফোন আবিষ্কারের আগে টিভির লাইভ সম্প্রচার একটি বিশাল ব্যাপার থাকলেও স্মার্ট ফোনের কল্যানে যেকোনো অনুষ্ঠানের লাইভ সম্প্রচার এখন ছেলে খেলা মাত্র। ধরুন, পড়ার মোড়ে আপনি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখছেন, সেখানে একটি মেয়ের নাচ ভালো লেগে যাওয়ায় তা আপনি ফেসবুকে লাইভ করা শুরু করলেন, তাহলে আপনার ফেসবুক আইডির সাথে যারা যুক্ত, তারা যদি ঐ মূহুর্তে অনলাইনে থাকে, তারা কিন্তু সবাই আপনার সাথে সাথেই ঐ মেয়েটির নাচ দেখতে পাবে। এখন বলেন, আপনি এবং আপনার বন্ধুরা একই সময়ে একই সাথে অনুষ্ঠানটি দেখলেন কি না ? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও এই একই ঘটনা ঘটেছিলো, যখন যেখানে যা ঘটেছে, সেই সবই একই সময়ে সঞ্জয়ও দেখেছে। এখানে কুরুক্ষেত্রের মাঠে উপস্থিত অর্জুন এবং হস্তিনাপুরের প্রাসাদে উপস্থিত সঞ্জয়ের দেখার মধ্যে কোনো আগে পরে নেই।

আর্য সমাজীদের এর পরের অভিযোগ হচ্ছে- যে বিশ্বরূপ অর্জুনের একার দেখার কথা, সেই বিশ্বরূপ অন্যরা দেখলো কিভাবে ?

-অন্যরা অর্থাৎ সঞ্জয় বিশ্বরূপ দেখেছে অর্জুনের সাথে লাইভে যুক্ত থাকার কারণে; যেমন কোনো একটি ঘটনা যদি লাইভ সম্প্রচার করা হয়, ঐ সময় যতজন ঐ চ্যানেলটির সম্প্রচার দেখবে, ততজনই ঐ ঘটনাটি দেখতে পাবে।

শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখে অর্জুন যে বলেছে, "তোমার ঐ অদ্ভূত উগ্ররূপ দেখিয়া ত্রিলোক ভীত হইতেছে এবং আমিও ভীত হইতেছি"(গীতা-১১/২০), এটা আসলে অর্জুনে ধারণা, যা সত্য নয়। কারণ, বিশ্বরূপে শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত অদ্ভূত ও উগ্ররূপ দেখে অর্জুন একইসাথে হতবিহ্বল এবং ভয় পেয়ে গিয়েছিলো, তাই অর্জুন সেই সময় মনে করেছিলো, সেই সময় সে যেমন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখছিলো, অন্যরাও হয়তো সেই বিশ্বরূপ দেখছে। আর আকস্মিক ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনায় মানুষের এরকম ভুল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। ফলে সরাসরি অর্জুন এবং সঞ্জয় ছাড়া অন্য কেউ বিশ্বরূপ দেখে নি, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত অন্য কেউ শ্রীকৃষ্ণের এই বিশ্বরূপ দর্শন করে নি, এজন্য কৌরবপক্ষের কারো এই বিশ্বরূপ দেখার কোনো প্রশ্নই নেই। তাছাড়া শ্রীকৃষ্ণ যে স্বয়ং ঈশ্বর, এর প্রমাণ, পূর্বে- ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং দুর্যোধন নিজেও পেয়েছিলো, যখন শ্রীকৃষ্ণ শান্তিপ্রস্তাব নিয়ে হস্তিনাপুর গেলে শকুনি ও দুর্যোধন মিলে শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার চেষ্টা করেছিলো, তাতেও দুর্যোধনের হুঁশ ফিরে নি, তাই কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত দুর্যোধনও যদি শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখতো তাতে দুর্যোধন যে যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করতো, এর কোনো গ্যারান্টি ছিলো না।

তাই গীতায় যে কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা আছে আর্য সমাজীদের মাথায়, সেটা আমার বন্ধুদেরকে উপরের প্রবন্ধ দ্বারা বোঝাতে পেরেছি বলে আমি মনে করছি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Wednesday, 27 May 2020

গীতায় কি দীক্ষা, গুরু পূজা ও অবতারের উল্লেখ আছে?


#Dev_Kumar_Akash,

সনাতন ধর্ম বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে, সেই বিষয়টা আরো ভালো ভাবে জানা উচিত বা সেই বিষয়কে কি আরো ভালো করে উপলব্ধি করা উচিত নয় ?

গীতার রেফারেন্স দিয়ে তুমি বলেছো- "গীতার কোথাও গুরু দীক্ষা বা গুরু পূজার কথা বলা নেই। বলা হয়েছে তত্ত্বদর্শি জ্ঞানীর কাছে যেতে।"

তুমি কি মনে করো গীতার সাতশত শ্লোকের মাধ্যমে সব বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলা সম্ভব ? সব কিছু বিস্তারিত বলতে গেলে কি গীতা সাতশত শ্লোকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতো ? তখন তো এটা সাত লক্ষ শ্লোকে পৌঁছে যেতো। তুমি কি জানো না, গীতা মাহাত্ম্যে বলা হয়েছে- এটা বেদ উপনিষদের সার ? এই কথাতেই তো প্রমাণিত যে গীতায় কোনো বিষয়ের বিস্তারিত থাকবে না, থাকবে বিষয় বা ঘটনার ইঙ্গিত মাত্র। এই বিষয়টা বোঝার মতো জ্ঞান কি তোমার আছে ? আমার তো মনে হয় নেই, থাকলে অযথা মূর্খের মতো সনাতন ধর্মেরর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফটর ফটর করে সাধারণ হিন্দুদেরকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করতে না।

গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ৩৪ নং শ্লোকে বলা হয়েছে-

"তদ্বিদ্ধি প্রণিপপাতেন, পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্ততত্ত্বদর্শিনঃ।।"

এর অর্থ হিসেবে শ্রীজগদীশ চন্দ্র ঘোষ তার গীতায় লিখেছেন,

"গুরু চরণে দণ্ডবৎ প্রণাম দ্বারা, নানা বিষয় প্রশ্ন দ্বারা এবং গুরুসেবা দ্বারা সেই জ্ঞান লাভ কর। জ্ঞানী তত্ত্বদদর্শী গুরুগণ তোমাকে সেই জ্ঞান উপদেশ করিবেন।"

বাংলাদেশের ইলা প্রকাশনীর একটি ছোট গীতাতেও এর অর্থ লিথা হয়েছে,

"সেই জ্ঞান পাইতে হলে গুরুকে প্রণাম করিয়া, সেবা করিয়া তাহাকে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করো। জ্ঞানী তত্ত্বদর্শী গুরু তোমাকে সেই জ্ঞান উপদেশ করিবেন।"

এ্ই শ্লোকের অর্থে কী বলা হয়েছে, সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা কি তোমার আছে ?

এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- জ্ঞানের জন্য তত্ত্বদর্শী গুরুর সেবা করে তাকে প্রশ্ন করতে।

এবার আসি দীক্ষার ব্যাপারে।

"দীক্ষা" মানে কী ? দীক্ষার অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি হলো- উপদেশ। আর উপদেশ তার কাছ থেকে্ই নেওয়া হয়, যাকে পথপ্রদর্শক বলে মানা হয়; তো যিনি পথপ্রদর্শক, তিনি গুরু নয়তো কী ?

গীতার ৪/৩৪ নং শ্লোকের, "উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং" বাক্যের অর্থই হলো- 'তোমাকে জ্ঞান উপদেশ করিবেন''। এর মানে হলো- যার কাছ থেকে উপদেশ নেওয়া হয় তিনিই গুরু এবং সাধারণ একজন ব্যক্তি যখন কারো নিকট থেকে ধর্মীয় বিষয়ে উপদেশ নেন, তখন উপদেশ দাতা, সেই সাধারণ ব্যক্তির গুরুতে পরিণত হন। এই শ্লোকের "উপদেক্ষ্যন্তি" শব্দের মধ্যেই দীক্ষার ব্যাপারটি লুকিয়ে আছে।

সাধারণভভাবে দীক্ষা মানে উপদেশ এবং উপদেশদাতাই দীক্ষা গুরু। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- গুরু ধরার জন্য যে আনুষ্ঠানিকতা বা কাউকে গুরু হিসেবে স্বীকার করার জন্য যে অনুষ্ঠান, তার কি কোনো প্রয়োজন আছে ?
প্রকৃতির একটি নিয়ম হলো- যে ব্যক্তি, যে জিনিস যত সহজে এবং যত দ্রুত লাভ করবে, সেই ব্যক্তি, সেই জিনিস, তত দ্রুত হারাবে। একারণেই মুসলমানদের "কবুল" বলে হওয়া বিয়ে "তালাক" বললেই শেষ হয়ে যায়, আর তিনদিন ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে হওয়া হিন্দু বিবাহ আমৃত্যু টিকে থাকে; এর মূল কারণই হলো হিন্দুদেরে বিবাহ যেমন সহজে হয় না, তেমনি তা সহজে ভাঙ্গেও না বা কখনো ভাঙ্গে না ।

এ্ছাড়াও আমরা অনেকের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখে থাকি, কিন্তু তাকেই শিক্ষক বলে মানি বা স্যার বলে সম্বোধন করি, যাদের কাছে আমরা স্কুল কলেজে পড়ি বা প্রাইভেট পড়ি।এই ব্যাপারগুলো আমাদেরকে এটা শিক্ষা দেয় যে- যেকোনো ঘটনা ঘটানোর জন্য আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন রয়েছে, না হলে সেই ব্যাপারটির গুরুত্ব আমাদের কাছে হালকা হয়ে যায় এবং সেটা আমাদের কাছে এক সময় মূল্য হারায়। যেমন অনলাইনে আামি সনাতন ধর্ম বিষয়ে নানা কিছু লিখে হিন্দুদেরকে জ্ঞান দিই ব'লে, অনেকেই আমাকে গুরু বলে মানে, এদের মধ্যে যারা আমার সাথে সার্বক্ষণিক থাকে বা আমার সাথে যোগাযোগ রাখে, তাদের মধ্যে হয়তো সেই ফিলিংস বজায় থাকে, কিন্তু যাদের সাথে কোনো কারণে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তারা কিন্তু আমাকে আর সেভাবে মনে রাখে না বা রাখতে পারে না। এই ব্যাপারটি এজন্যই ঘটে যে, তাদের সাথে আমার যে গুরু শিষ্যেরে মতো সম্পর্ক, সেই সম্পর্কটি আনুষ্ঠানিক নয়, অনানুষ্ঠানিক। কিন্তু এই সম্পর্কটি যদি আনুষ্ঠানিক হতো, তারা কিন্তু কখনোই আমাকে ভুলতে পারতো না। এজন্যই যেকোনো সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকততার প্রয়োজন রয়েছে, এই বোধ থেকেই উৎপত্তি দীক্ষা অনুষ্ঠানের।

সুতরাং গুরু দীক্ষার ব্যাপারটা যে বাস্তবসম্মত, সেটা প্রমাণিত। এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে- গুরুকে পূজা করা যাবে কি না ?

গুরুকে প্রণাম করতে হবে, তার সেবা করতে হবে, এটা গীতার নির্দেশ, না হলে গুরুর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করা যাবে না; কারণ, কথায় বলে- বিনয়ে বিদ্যা। কিন্তু কোনো মানুষকে যেহেতু দেবতার আসনে বসিয়ে দেবতাদের মতো পূজা করা যাবে না, তাই গুরুকেও পূজা করা যাবে না। গুরুকে দেবতার আসনে বসিয়ে যারা পূজা করে,, সেই ভুল বা পাপ সেই শিষ্যদের নয়, সেই ভুল বা পাপ সেই গুরুর, যার ভুল শিক্ষায় শিক্ষিত সেই শিষ্যরা।
গুরুকে শ্রদ্ধা করা যাবে, সম্মান করা যাবে, ভক্তি করা যাবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে দেবতার মতো ফুল জল দিয়ে পূজা করা যাবে না, এমন ভুল কথা তো গীতায় থাকতে পারে না, তাই এই ব্যাপারে আমি তোমার সাথে একমত।

এরপর আাসি অবতারের প্রশ্নে। তুমি কি শিউর যে গীতায় কোনো অবতারের কথা বলা নেই ?

তোমাকে আগেই বলেছি- গীতা হলো সনাতন ধর্মের সারগ্রন্থ, এখানে কোনো বিষয়ের ডিটেইলস নেই, আছে শুধুমাত্র বিষয়ের ইঙ্গিত।

গীতার ৪/৭,৮ নং শ্লোকে, "যদা যদা হি ধর্মস্য … সম্ভবামি যুগে যুগে"র মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অবতারতত্ত্বের কথা বলেছেন, এর মাধ্যমে তিনি যে নিজেও অবতার, সেটা স্বীকার করেছেন এবং অন্যান্য অবতারণের মধ্যে একজন প্রধান অবতার রামের কথা বলেছেন গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৩১ নং শ্লোকে, "রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্" অর্থাৎ অস্ত্রধারীদের মধ্যে আমি রাম, এই কথা বলার মাধ্যমে। আর পুরাণসমূহে সকল অবতারের কথা যিনি বলেছেন, সেই বেদব্যাস মুনিও যে স্বয়ং তিনিই অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ, সেটা তিনি বলেছেন গীতার ১০/৩৭ নং শ্লোকে, "মুনিনামপ্যহং ব্যাসঃ" অর্থাৎ, মুনিগণের মধ্যে আমি ব্যাস, এই কথা বলার মাধ্যমে। তাহলে গীতায় অবতার বা অবতার তত্ত্বের কথা উল্লেখ থাকলো না কিভাবে ?

শোনো, অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করছি, ফেসবুকে তুমি সনাতন ধর্ম সম্পর্কে যা তা বলে যাচ্ছো, যার বেশির ভা্গেরই কোনো ভিত্তি নেই, যার প্রমাণ আজকের এই প্রবন্ধে দিয়ে দিলাম। আমি তোমাকে প্রথমত অনুরোধ করছি, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নিজের ভুল উপলব্ধিকে ফেসবুকে প্রচার না করতে, আমার অনুরোধের যদি তোমার কাছে কোনো মূল্য না খাকে, তাহলে তোমাকে হুমকি দিয়ে বলছি- এসব বাল ছালের প্রচার বন্ধ কর। না হলে সনাতন ধর্মের ব্যাপারে আমি যে কাউকে ছাড় দেওয়ার লোক নই, সেটা তুই হাড়ে হাড়ে নয় কোষে কোষে টের পাবি।

আশা করছি, কী বলছি, তা বুঝতে পেরেছিস।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ কি ঈশ্বর নন ?


যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ কি ঈশ্বর নন ?

Susanta Das এর উদ্দেশ্যে বলছি,

তুমি তো এক পাতা বাংলা ই শুদ্ধ করে লিখতে পারে না, তুমি এসেছো আমার জ্ঞানের সমালোচনা করতে ! পোষ্ট (পোস্ট), কারন (কারণ), প্রমান (প্রমাণ), সন্জয় (সঞ্জয়), দারকা (দ্বারকা), শখা (সখা), আচরন (আচরণ), যোগি (যোগী)- এই বানানগুলো আগে শুদ্ধ করে লিখতে শেখো, অনুচ্ছেদের মধ্যে বিরামচিহ্নের ব্যবহার শেখো, বাক্যগুলো সঠিকভাবে লিখতে শেখো; "শ্রী কৃষ্ণ" নয়, "শ্রীকৃষ্ণ", এটা আগে জানো; তারপর এসো আমার জ্ঞানের সমালোচনা করতে; কারণ, তখন সেটা কিছুটা গ্রহনযোগ্য হবে।

তোমার রেফারেন্সগুলোর জবাব পরে দিচ্ছি, তার আগে বলছি- তুমি যদি 'যোগ' শব্দের অর্থ জানতে এবং বেদব্যাস আসলে কে, এটা জানতে, আমার বিশ্বাস তুমি এই কমেন্ট করতে না।

লোকজনকে প্রকৃত সত্য জানানোর জন্যই, আমার ধারণা, ঈশ্বর আমাকে সৃষ্টি করেছেন; এ কারণেই হাইস্কুল পাশ করার পর থেকেই আমি জাত শিক্ষক; আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি লোকজনকে প্রকৃত সত্য জানাতে বা শেখাতে; এর বাইরে যারা আমার কাছে জানতে চায়, তাদেরকে তো আমি শেখাই ই, আর যারা আমার জ্ঞানের সমালোচনা করে, তাদেরকেও আমি উচিত শিক্ষা দিই, যেটা আজ তোমাকে দেবো।

তুমি প্রথমেই উল্লেখ করেছো গীতার ৩/৩০ নং শ্লোকের কথা এবং তুমি বলেছো, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর নয়, দেখা যাক সেই শ্লোক এবং তার অর্থ-

"ময়ি সর্বাণি কর্মাণি সংন্যস্যাধ্যাত্মচেতসা।
নিরাশীর্নির্মমো ভুত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বর।।"

বাজারে প্রচলিত ছোটখাটো গীতায় নানারকম ছোটোখাটো ভুল ত্রুটি আছে এবং ইসকনের গীতাও উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনুবাদিত, তাই কোনো শ্লোকের অনুবাদ আমি ইসকনের গীতা থেকে বা বাজারে প্রচলিত ছোটো গীতা থেকে দেবো না, আমার বিচারে- ছোট হোক বা বড় হোক- গীতার শুদ্ধ অনুবাদ হলো জগদীশ চন্দ্র ঘোষের অনুবাদ করা গীতা, সেখান থেকেই আমি এই পোস্টে উল্লিখিত শ্লোকগুলোর অনুবাদ তুলে দেবো। যা হোক, ৩/৩০ নং শ্লোকের অনুবাদ জগদীশ চন্দ্র ঘোষ লিখেছেন,

"আমাতে সমস্ত কর্ম বিবেকবুদ্ধি দ্বারা সমর্পণ করিয়া নিষ্কাম মমতাশুন্য এবং শোকশুন্য হইয়া যুদ্ধ কর।"

- এই শ্লোকটি কিভাবে প্রমাণ করে যে শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর নয় ? বরং সবকিছু শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অর্পণ করার কথা বলায়, এটাই তো প্রমাণ হচ্ছে যে শ্রীকৃষ্ণই ঈশ্বর।

দ্বিতীয় রেফারেন্স দিতে গিয়ে তুমি বলেছো, "যোগ এর মাধ্যমে তিনি ঐশ্বরিক যোগ দেখিয়েছেন তার প্রমাণ গীতা ৯/৫ দেখুন।"

উপরেই বলেছি, তুমি যদি 'যোগ' শব্দের অর্থ জানতে তাহলে শ্রীকৃষ্ণকে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য ক'রে নিজের পাপ বাড়াতে না।

গণিতের ক্ষেত্রে 'যোগ' এর অর্থ 'প্লাস' বলতে যা বোঝায তা। কিন্তু 'যোগ' এর সাধারণ অর্থগুলো হলো- মিলন, সংসর্গ, সংস্রব, সহযোগিতা, ধ্যান, উপায়, অবলম্বন, মারফত, সাধনার পন্থা, সময়, শুভ কাল, ঔষধ, সুবিধা, সংকলন, সমষ্টি; আবার জ্যোতিষ শাস্ত্রের ক্ষেত্রে 'যোগ' মানে সম্ভাবনা; কিন্তু গীতায় যোগ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে অঘটন ঘটানোর ক্ষমতা হিসেবে। জগদীশ চন্দ্র ঘোষের গীতা বের করে গবেষণা শুরু করুন আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেন।

গীতার ৯/৫ নং শ্লোকে ব্যবহৃত হয়েছে "পশ্য মে যোগশ্বৈরম" শব্দগুচ্ছটি; এর অর্থ হলো- তুমি আমার ঐশ্বরিক যোগ দর্শন করো।

এই যোগকে সাধারণ অর্থে ধরে নিয়ে মূর্খরা মনে করে- শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একজন মানুষ, খুব বেশি হলে বিষ্ণুর কালো চুল থেকে সৃষ্টি হওয়া একজন অংশ অবতার, যিনি তার যোগশক্তির দ্বারা কিছু অলৌকিক কাজ কারবার দেখিয়েছে, তাই শ্রীকৃষ্ণকে একজন যোগী পুরুষ বলা যায়, কোনোভাবেই শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর নয় !

একটু আগেই বলেছি, গীতায় যোগ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে অঘটন ঘটনার ক্ষমতা হিসেবে এবং গীতায় "যোগশ্বৈরম" শব্দটি ব্যবহার করে এটা বলে দেওয়া হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ হলেন যোগের ঈশ্বর অর্থাৎ যোগ সম্পর্কিত ক্ষমতায় শ্রীকৃষ্ণ হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহলে সমস্যা কোথায় ? যোগের ক্ষমতা প্রদর্শনে শ্রীকৃষ্ণের তুলনায় শ্রেষ্ঠ কে বা শ্রীকৃষ্ণের তুল্য পৃথিবীতে আর কে আছে ?

Susanta অবশ্য দিব্যদৃষ্টি দানের ঘটনায় শ্রীকৃষ্ণের সাথে ব্যাসদেবের তুলনা করেছে, এ প্রসঙ্গেও আগে বলেছি সুশান্ত যদি জানতো যে ব্যাসদেব আসলে কে, তাহলে সে এই কথা বলতোই না। গীতার ১০ম অধ্যায়ের ৩৭ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "মুনিনামপ্যহং ব্যাসঃ", এর অর্থ হলো- মুনিদের মধ্যে আমি ব্যাস। তো যেখানে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন আমিই ব্যাসদেব, তাহলে ব্যাসদেবের সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করতে সমস্যা কোথায় ? শুধু দিব্যদৃষ্টি প্রদানই নয়, শ্রীকৃষ্ণ, হস্তিনাপুরের রাজসভায় জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে কিছুক্ষণের জন্য দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন, ৭ বছর বয়সে হাতের কণিষ্ঠা আঙ্গুলের উপর গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরেছিলেন, এগুলো ছাড়া্ও সমগ্র জীবনে শ্রীকৃষ্ণ বহু অলৌকিক লীলা দেখিয়েছেন, পৃথিবীতে জন্মগ্রহনকারী আর কে শ্রীকৃষ্ণের মতো এরকম অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করতে পেরেছে ? সুশান্তকে বলছি শ্রীকৃষ্ণের মতো অলৌকিক লীলা প্রদর্শনকারী আরো দু চারজনের নাম বলতে, যদি তা না পারে, তাহলে তাকে বলছি এই সব ঘেউ ঘেউ বন্ধ করতে; যদি তা না করে এবং এভাবে শ্রীকৃষ্ণকে অপমান করে কথা বলে, সামনে পেলে ওকে এমন মার মারবো যে, ও ওর বাপের নয়, নিজের নামই ভুলে যাবে।

যা হোক, শ্রীকৃষ্ণকে এক সাধারণ যোগী পুরুষ প্রমাণ করতে এরপর সুশান্ত উল্লেখ করেছে গীতার ১৮/৭৮ নং শ্লোকের কথা, যেখানে সঞ্জয় শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে বলেছেন- "যোগেশ্বরঃ"; তো সমস্যা কী ? যোগ মানে তো আগেই বলেছি যে- অঘটন ঘটনার ক্ষমতা, তো যোগেশ্বর মানে- অঘটনা ঘটনার ক্ষমতার ঈশ্বর, তার মানে শ্রীকৃষ্ণই ঘটনা ঘটানোর দিক থেকে সর্বশক্তিমান, আর যিনি সর্বশক্তিমান, তিনিই তো ঈশ্বর।

এরপর সুশান্তের অভিযোগ হলো অনুগীতা মোতাবেক শ্রীকৃষ্ণ দ্বিতীয়বার অর্জুনকে দিব্যচক্ষু দান করতে পারে নি।
বিষয়টি এখানে দিব্যচৃক্ষু হবে না, হবে গীতার জ্ঞান। গীতার জ্ঞান দিতে দিতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দিয়েছিলেন তার বিশ্বরূপ দর্শনের জন্য। সুতরাং সমগ্র ব্যাপারটা হলো গীতার জ্ঞান এবং এর অংশ বিশেষ হলো দিব্যদৃষ্টি; কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণের কাছে পুনরায় এই গীতার জ্ঞানের আবদার করেছিলেন বলে মহাভারত দাবী করেছে।

এটার দুই রকম ব্যাখ্যা আছে। অনুগীতাকে স্বীকার করে নিয়ে প্রথম ব্যাখ্যায় বলছি- শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কিত যোগেশ্বর ব্যাপারটি বোঝানোর জন্য কিন্তু আমি এ প্রবন্ধটি লিখেছি, এটা পড়ার পরও কেউ যদি ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এবং একই বিষয়ে আবার প্রশ্ন করে, তাহলে কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ হবে এবং সে যদি আমার একান্ত অনুগত ভক্তও হয়, যার উপর আমি রাগ করতে পারবো না, তাহলে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমি কিন্তু কোনো না কোনো অজুহাত দেবো, যাতে আমাকে ঐ কষ্ট আবার স্বীকার করতে না হয়; অসময়ে এবং অস্থানে পুনরায় গীতার জ্ঞান প্রদানের অনুরোধ করায়, বিরক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ আসলে অর্জুনকে যোগের ব্যাপারটি বলে এড়িয়ে গেছেন মাত্র। তাছাড়া গীতার জ্ঞান অর্জুনকে দেওযার প্রয়োজন ছিলো তাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার জন্য, সেটা হয়ে গিয়েছিলো, তাই পুনরায় সেই ব্যাপারটি ঘটানোর আর কোনো প্রয়োজন ছিলো না; কারণ, শ্রীকৃষ্ণ তার সমগ্র জীবনে কোনো কথা দুই বার বলেন নি, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন নি; তিনি যেহেতু ঈশ্বর এবং সর্বজ্ঞানী, সেহেতু তিনি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জানতেন, তাই তাঁর পক্ষে নিজের কথা ও কাজে স্থির থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো।

ঈশ্বর হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ যে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণই জানতেন, সেটা আমি বলছি না, বলছে গীতা, দেখুন নিচের এই শ্লোক-

"বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন।
ভবিষ্যাণি চ ভূতানি মাং তু বেদ ন কশ্চন।।- (গীতা, ৭/২৬)

এর অর্থ : হে অর্জুন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে আমি অবগত।

শ্রীকৃষ্ণ যদি ঈশ্বর না হন, তাহলে তিনি কিভাবে এই কথা বলতে পারেন ? আর তিনি যে অযথা বুলি ঝাড়েন নি, তার প্রমাণ তো তাঁর সমগ্র জীবনীর অসংখ্য অলৌকিক ঘটনাতেই রয়েছে।

অনুগীতা সম্পর্কে পরের যে ব্যাখ্যা, তাতে শুধু এই উপাখ্যানই নয়, মহাভারতের মূল কাহিনী ছাড়া সমস্ত উপাখ্যানকেই পরিত্যাগ করা যায়; কারণ, বর্তমান মহভারতের আদি পর্বেই বলা আছে- বেদব্যাস মাত্র ২৪ হাজার শ্লোকে এই সংহিতা রচনা করেছেন, তার সাথে বেদব্যাস হয়তো আরো দু চারটি উপাখ্যান রচনা করে জুড়ে দিয়েছিলেন, এই উপাখ্যান বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে মূল ২৪ হাজার শ্লোকের মহাভারত কিভাবে ১ লক্ষ শ্লোকে উন্নীত হলো, সে সম্পর্কে রাজ শেখর বসু, তার অনুবাদিত মহাভারত গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন,

"মহাভারত সংহিতা গ্রন্থ, এতে বহু রচয়িতার হাত আছে এবং একই ঘটনার বিভিন্ন কিংবদন্তী গ্রথিত হয়েছে। মূল আখ্যান সম্ভবত একজনেরই রচনা, কিন্তু পরে বহু লেখক তাতে যোগ করেছেন। এমন আশা করা যায় না যে তারা প্রত্যেকে সতর্ক হয়ে একটি পূর্ব নির্ধারিত বিরাট পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ গড়বেন, মূল প্ল্যান থেকে কোথাও বিচ্যুত হবেন না।"

রাজশেখর বসু আরো বলেছেন, "বর্তমান মহাভারতের সমস্তটা এক কালে রচিত না হলেও এবং তাতে বহু লোকের হাত থাকলেও সমগ্র রচনাই এখন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের নামেই চলে।"

এতে বোঝা যাচ্ছে মহাভারতের বিভিন্ন উপাখ্যান, বিভিন্ন লোক, বিভিন্ন সময় লিখে মহাভারতের সাথে জুড়ে দিয়েছে, সুতরাং অনুগীতা সম্পর্কিত উপাখ্যানটি যে মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই, তাই এই উপাখ্যানগুলির উপর ভিত্তি করে কৃষ্ণের কাজ ও কথা সম্পর্কে সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না বা উচিতও নয়।

এই তথ্যগুলি যদি সুশান্ত জানতো, তাহলে সে মহাভারতের অনুগীতা উপাখ্যানের উপর ভিত্তি করে- কৃষ্ণ ঈশ্বর নয়- এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করতোই না।

শ্রীকৃষ্ণ, গীতার কয়েকটি শ্লোক, যেমন- হে অর্জুন, ঈশ্বর সর্ব জীবের হৃদয়ে অবস্থান করিয়া মায়া দ্বারা যন্ত্র চালিত পুতুলের ন্যায় ভ্রমণ করাইতেছেন (গীতা, ১৮/৬১)- দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নিজেকে না বুঝিয়ে পরোক্ষভাবে নিজেকে বুঝিয়েছেন, এগুলোর দ্বারাও কিছু মূর্খ এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, গীতার শ্রীকৃষ্ণ যোগী পুরুষ, তিনি ঈশ্বর নন, তিনি যোগের দ্বারা যুক্ত হয়ে অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন, যেই যোগের দ্বারা যুক্ত হতে না পারায় অনুগীতা মোতাবেক তিনি আর অর্জুনকে গীতার জ্ঞান পুনরায় দিতে পারেন নি!

এই প্রবন্ধে আমি শুরুর দিকে সরাসরি যা বলেছি, তা সুশান্তকে উদ্দেশ্য করে বলেছি; কিন্তু পরে কিছু অনুচ্ছেদে সুশান্তকে ডাইরেক্ট না বলে ইনডাইরেক্ট বলেছি, তার মানে কি আমি সুশান্তকে সেটা বলি নি ?

যা হোক, গীতায় শ্রীকৃষ্ণ, পরোক্ষভাবে কয়েকটি শ্লোকে নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে প্রকাশ করলেও প্রত্যক্ষভাবে নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে প্রকাশ করেছেন অসংখ্য শ্লোকে, যেগুলো কৃষ্ণ বিরোধীদের চোখে পড়ে না, নিচে সেরকম কিছু শ্লোকের বাংলা অনুবাদ কৃষ্ণ ভক্তদের জন্য উল্লেখ করছি-

গীতার ৭ম অধ্যায়ের ১ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"হে অর্জুন, তুমি আমাতে নিবিষ্ট চিত্ত ও একমাত্র আমার শরণাপন্ন হইয়া যোগযুক্ত হইলে যেভাবে আমার সমগ্রস্বরূপ জানিতে পারিবে, তাহা বলিতেছি শোনো।"

'একমাত্র আমার শরণাপন্ন হইয়া যোগযুক্ত'  হওয়ার কথা বলে শ্রীকৃষ্ণ কি এটা বোঝান নি যে তিনিই ঈশ্বর ?

৬ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "আমিই জগতের সৃষ্টি ও প্রলয়ের কারণ।"

৭ নং শ্লোকে বলেছেন, "আমাতেই এই সমস্ত জগৎ গাঁথা রহিয়াছে।"

১০ নং শ্লোকে বলেছেন, "আমাকে সর্বভূতের সনাতন বীজ বলিয়া জানিবে।"

সুশান্তদের মতো মূর্খদের জন্য এই ৭ম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আরো কিছু বলেছেন, সেগুলো আলোচনা করবো এই প্রবন্ধের শেষে, এখন ৯ম অধ্যায়ে যাই-

৯ম অধ্যায়ের ২৩ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"যাহারা অন্য দেবতার পূজা করে, তাহারাও না জানিয়া আমাকেই পূজা করে।"

২৪ নং শ্লোকে বলেছেন, "আমিই সর্বযজ্ঞের ভোক্তা ও ফলদাতা।"

২৭ নং শ্লোকে বলেছেন, "তুমি যাহা যাহা কার্য করো- ভোজন, হোম, দান, তপস্যা সেসব আমাতেই অর্পণ করো।

৩৪ নং শ্লোকে বলেছেন, "তুমি সর্বদা আমাতে মন দাও, আমাকে ভক্তি করো, আমার উদ্দেশ্যেই যজ্ঞ করো, আমাকেই নমস্কার করো।"

১০ম অধ্যায়ের ৮ নং শ্লোকে বলেছেন, "আমি সমস্ত জগতের উৎপত্তির কারণ, আমা হতেই সমস্ত জগত প্রবর্তিত হয়।"

২০ নং শ্লোকে বলেছেন, "সর্বভূতের হৃদয়ে অবস্থিত আত্মা আমিই, আমিই সর্বভূতের উৎপত্তি, স্থিতি ও সংহারস্বরূপ।"

৩৯ নং শ্লোকে বলেছেন, "সর্বভূতের যাহা বীজস্বরূপ তাহাই আমি। এই বিশ্বচরাচরে কোনো কিছুই আমা ছাড়া হইতে পারে না।"

এছাড়াও চতুর্দশ অধ্যায়ের ২৭ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "আমি অব্যয় অমৃতস্ববরূপ ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা; শাশ্বত ধর্ম, ঐকান্তিক সুখ- এই সকলেরই একমাত্র আশ্রয় বা প্রতিষ্ঠা আমিই।"

পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "আমি সকল প্রাণীর হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে আছি, আমা হতেই প্রাণীগণের স্মৃতি ও জ্ঞান হয় এবং আমা হতেই প্রাণীগণের স্মৃতি ও জ্ঞানের বিলোপ সাধিত হয়;

এরপর অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৫৭ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "তুমি মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া, মৎপরায়ন হইয়া, সাম্য বুদ্ধির যোগ অবলম্বন করিয়া, সর্বদা আমাতে চিত্ত রাখো এবং যথাধিকার কর্ম করিতে থাকো।"

৬৫ নং শ্লোকে বলেছেন, "তুমি একমাত্র আমাতেই মন দাও, আমাকে ভক্তি করো, আমাকে পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো।"

৬৬ নং শ্লোকে বলেছেন, "তুমি একমাত্র আমার শরণ লও।"

শ্রীকৃষ্ণের এই সব ডাইরেক্ট স্পিচে কি প্রমাণ হয় না যে শ্রীকৃষ্ণই ঈশ্বর ? এরকম অসংখ্য ডাইরেক্ট স্পিচ বাদ দিয়ে দু' একটি ইনডাইরেক্ট স্পিচ নিয়ে বালার্যদের এত লাফালাফি কেনো ?

আর্য, যাদের বলদামির কারণে লোকজন এখন তাদেরকে বালার্য বলে সম্বোধন করে, তারা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মানে না, তাদের স্বরূপ কী, সে সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই গীতাতে বলেছেন, দেখুন নিচের কয়েকটি শ্লোক-

"ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়া প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।।"- (গীতা, ৭/১৫)

এর অর্থ- পাপিষ্ঠ ও বিবেকহীন নরাধমেরা মায়া দ্বারা হতজ্ঞান হইয়া অসুর স্বভাব প্রাপ্ত হওয়ায় আমাকে ভজনা করে না।

সুশান্তর মতো কেনো কিছু ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করে না, সে কথা শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলে গেছেন, দেখুন নিচের এই শ্লোক-

"অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ।
পরং ভাবমজানন্তো মমাব্যয়মনুত্তমম।"।- (গীতা, ৭/২৪)

এর অর্থ- অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ আমার পরমভাব না জানিয়া অব্যক্তরূপ আমি ব্যক্তিরূপে জন্ম লইয়া থাকি, এরূপ বিবেচনা করে।

এই মূর্খতার জন্যই সুশান্ত এবং তার মতোরা মনে করে যে শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর নয়, একজন যোগী পুরুষ মাত্র!
যারা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর হিসেবে মানে না তাদের মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই, এই সূত্রে সুশান্ত এবং তার মতোদের কোনো পারলৌকিক মুক্তি নেই; তবে সুশান্তদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই; কেননা, গীতার ১০ম অধ্যায়ের ১০ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তাদের পথ দেখিয়ে বলেছেন-

"যে সব ভক্ত সর্বদা আমাতে মন রাখিয়া আমার ভজনা করেন, আমি সেই সব ব্যক্তিকে সেইরূপ বুদ্ধিযোগ প্রদান করি, যাহা দ্বারা তাহারা আমাকে লাভ করিয়া থাকেন।"

শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সুশান্তর মন নেই, তাই সে মূর্খ; সুতরাং সুশান্তরা যদি পরমপ্রভু শ্রীকৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে তারা নিশ্চয় শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারবে এবং বুঝতে পারবে যে যারা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে

করে তারাই প্রকৃত জ্ঞানী, তারা সুশান্তর মতো কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বে অবিশ্বাসী ইতর শ্রেণীর পশু নয়।

আশা করছি- এই প্রবন্ধ পড়ার পর দুর্যোধনের উত্তরসূরী সুশান্তরা শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান এবং শ্রীকৃষ্ণকে অপমান করে কথা বলায় উচিত শিক্ষা পেয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

গীতায় শ্রীকৃষ্ণ "আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই- বলে আসলে কী বুঝিয়েছেন ?"


#Acharya_shubhash_Shastri,

যেহেতু আপনি বেদের সাথে সাথে গীতাও মানেন, যার প্রমাণ আমার কাছে আছে, যেটা ফটো হিসেবে এই প্রবন্ধের সাথে পোস্ট করেছি, সেহেতু আপনাকে প্রশ্ন করছি- আপনার কথার প্রমাণ কি  আপনি গীতা থেকে দিতে পারবেন ?

আমি জানি আর্যরা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর হিসেবে এবং অন্যান্য অবতারগণকে ভগবান হিসেবে স্বীকার করে না এবং বাঙ্গালি আর্যদের গুরু হিসেবে আপনিও এর ব্যতিক্রম নন এবং সেকারণেই আপনি উক্ত মন্তব্যটি করেছেন, তাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ, আপনি গীতার আলোকে আপনার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেবেন এবং শ্রীকৃষ্ণ গীতায় কেনো বলেছেন যে আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই, সেই ব্যাখ্যাটিও দেবেন। এ প্রসঙ্গে আমার পাঠকরা দেখে নিন- গীতায় শ্রীকৃষ্ণ

"আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই- বলে  আসলে কী বুঝিয়েছেন ?"

সাধারণভাবে কোনো প্রাণী বা জীবসত্ত্বার জন্ম হলো পৃথিবীতে তার আগমন এবং মৃত্যু হলো পৃথিবী থেকে তার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়া, এই জন্ম সাধারণভাবে চলমান প্রাণীদের ক্ষেত্রে নারী গর্ভের মাধ্যমে এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ফলের মধ্যেকার বীজ এবং নানা ধরণের অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে হয়ে থাকে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে জন্ম ও মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই ( গীতা, ৪/৬); আমি জন্মরহিত (গীতা, ১০/৩); এর কারণ কী ?

জন্ম ও মৃত্যু যেকোনো জীবের জন্য একটি সাধারণ প্রক্রিয়া, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন গীতায় বলেন যে- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই, আমি জন্মরহিত- তখনই, শ্রীকৃষ্ণ যে সাধারণ কেউ নয়, সে কথাই প্রমাণ করে।

গীতার চতুর্থ অধ্যায়, জ্ঞানযোগের শুরুতেই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, এই জ্ঞানযোগ আমি সূর্যকে বলেছিলাম, সূর্য মনুকে বলেছিলো, মনু ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলো। তখন অর্জুন জিজ্ঞেস করেন, আপনার জন্ম পরে, সূর্যের জন্ম আগে, তাহলে আমি কিভাবে বুঝবো যে আপনি তা সূর্যদেবকে বলেছিলেন ?

এর জবাবে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, আমার এবং তোমার বহুবার জন্ম হয়ে গিয়েছে, আমি সেই সবই জানি, কিন্তু তুমি তা জানো না।

এইখানেই আসলে ঈশ্বর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য। সাধারণ মানুষের তার পূর্বজন্মের কথা সাধারণভাবে মনে থাকে না, কিন্তু ঈশ্বরের তা মনে থাকে, যেহেতু তিনি সর্বজ্ঞানী। এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
"আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই। আমি সকলের ঈশ্বর, আমি নিজ প্রকৃতিতে আশ্রয় করিয়া নিজ মায়াবলে নিজেকে সৃষ্টি করিয়া থাকি (গীতা, ৪/৬); এবং কখন তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, সেকথা বলেছেন, গীতার ৪/৭ নং শ্লোকে এভাবে-

"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজামহ্যম।।"

এর অর্থ- যখনই ধর্মের গ্লানি অর্থাৎ অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি করিয়া থাকি।

ঈশ্বরের এই নিজেকে সৃষ্টির রূপই হলো অবতারগণ। তাই কোনো অবতারের জন্ম কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণশক্তি ভগবান বিষ্ণু, যখন দেবকীর গর্ভের মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবকে দর্শন দিয়ে তাদেরকে একথা জানিয়েছিলেন যে, তিনি আসতে যাচ্ছেন তাদের পুত্ররূপে।

সাধারণ মানুষের জন্ম তার নিজের হাতে থাকে না, তাই সে পরিকল্পনা করে তার জন্ম কোনো নির্দিষ্ট পিতা-মাতা বা নির্দিষ্ট পরিবার বা নির্দিষ্ট স্থানে ঘটাতে পারে না। কিন্তু ঈশ্বর তার জন্ম নিজের পরিকল্পনা মতোই ঘটাতে পারেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ তার আগমনী বার্তা তাঁর জন্মের অন্তত ১০ বছর পূর্বে দেবকী ও বসুদেবের বিয়ের সময়ই দৈব বাণীতে ঘোষণা করে তিনি কংসকে সাবধান করেছিলেন এবং সেই মতোই তিনি দেবকীর গর্ভের মাধ্যমে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন; সাধারণ মানুষের জন্ম এবং ঈশ্বরের জন্মের মধ্যে আসলে পার্থক্য এটাই, ঈশ্বর জন্ম নেন তার নিজের পরিকল্পনা মতো, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্ম তার নিজের হাতে নেই, থাকলে- কেউ, দরিদ্র পরিবারে, দরিদ্র দেশে, বিশেষ করে অনেকে মুসলিম সমাজে জন্ম নিয়ে বাল্যকালেই কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজের লিঙ্গঅগ্রচর্ম হারাতো না বা বোরকা নামক বস্তায় বন্দী হতো না।

তাই আমার জন্ম নেই বলতে শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়েছেন, সাধারণ জীব যেমন তার জন্মের সাথে সাথে পৃথিবীতে তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করে এবং মৃত্যুর সাথে সাথে যেমন তার বিলুপ্তিও ঘোষিত হয়; ঈশ্বরের জন্ম ও মৃত্যু আসলে সেরকম কোনো ব্যাপার নয়; পৃথিবীতে ঈশ্বরের জন্ম ও মৃত্যু ঘটে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায়, বিগত সময়ের যেসব জন্মের কথা তাঁর স্মরণেও থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের যা মনে থাকে না। অবতার হিসেবে পৃথিবীতে ঈশ্বরের এই যে বার বার জন্ম ও মৃত্যু, যেটা প্রকৃতপক্ষে জন্ম ও মৃত্যু নয়, যেটা প্রকৃতপক্ষে শুধু মর্ত্যে প্রাণীরূপ ধারণের জন্য তাঁর আসা ও যাওয়া, এটাকে বোঝাতেই শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলেছেন- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই; আর আগেই বলেছি, কোনো প্রাণীর মৃত্যু হলে পৃথিবী থেকে সেই প্রাণীর বিলুপ্তি ঘোষিত হয়, কিন্তু অবতাররূপী ভগবান বা ঈশ্বরের প্রার্থিব দেহ ত্যাগের সাথে সাথেই তাদের বিলুপ্তি ঘোষিত হয় না, তারা আবার ফিরে আসেন নতুন কোনো রূপ নিয়ে, তাই পৃথিবীতে তাদের আবির্ভাব ও তিরোভাব আসলে তাদের জন্ম ও মৃত্যু নয়, এটা জাস্ট যাওয়া ও আসা মাত্র, যে কথা শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন এভাবে- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই।

আমার জন্ম ও মৃ্ত্যু নেই, এই কথা বলার মাধ্যমেও আসলে শ্রীকৃষ্ণ প্রমাণ দিয়েছেন যে তিনি ঈশ্বর, সাধারণ কোনো মানুষ নন; কারণ, কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কি এই কথা বলা সম্ভব যে- তার মৃত্যু নেই ?

পৃথিবীতে বর্তমানে যাদের অস্তিত্ব আছে, তাদের সবারই জন্ম হয়েছে, কিন্তু কেউ বলতে পারবে না যে তার মৃত্যু নেই বা মৃত্যু হবে না; কারণ, মরতে সবাইকে হবেই। কিন্তু যখন কেউ বলে যে তার জন্ম ও মৃত্যু নেই, তখন বুঝতে হবে যে এটা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয় বা এই কথা যিনি বলছেন, তিনি সাধারণ কেউ নন। কিন্তু এই বিষয়টিই ঢোকে না আর্য নামক কিছু মূর্খের মাথায়, যারা মানসিকভাবে পড়ে আছে সেই বেদ উপনিষদের যুগে!
একটা বিষয় আমার মাথায় ঢোকে না, যে আর্যরা দাবী করে তারা এত জ্ঞানী, ধর্ম সম্পর্কে তারা এত জানে, তাহলে তারা সনাতন ধর্ম সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখে সেগুলো ফেসবুক ইন্টারনেটে প্রকাশ বা প্রচার করে না কেনো ? নিজস্ব তাগিদে মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে জানানোর বিষয়টি না হয় বাদই দিলাম, জাকির নায়েক মার্কা মুসলমানরা যখন বেদ নিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার চালায়, সেই সব কটূক্তির জবাব দিতেও কেনো কোনো আর্য কলম ধরে না ? আমার পোস্টের কমেন্টে এসে আমাকে মূর্খ বললেই যেমন আমি মূর্খ প্রমাণিত হয়ে যাবো না, তেমনি সে কথা কেউ বিশ্বাসও করবে না। যখন আপনি আমার কথার ভুল নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন এবং সে ব্যাপারে সঠিক যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করতে পারবেন, তখনই প্রমাণিত হবে যে আমি মূর্খ, আর আপনি জ্ঞানী; এর বাইরে আমার ব্যাপারে যদি কোনো কথা বলেন, সেটা হবে রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরের ঘেউ ঘেউ, এখন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিন নিজেদেরকে কী প্রমাণ করতে চান- মূর্খ, জ্ঞানী, না রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুর ?

আশা করছি, আমি কী বলছি সেটা যেমন আর্যরা বুঝতে পেরেছে, তেমনি এক আর্যের প্রশ্ন- আমার জন্ম ও মৃত্যু নেই- বলতে শ্রীকৃষ্ণ কী বুঝিয়েছেন, সেটাও আমার বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।