Friday, 10 July 2020

শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান স্ত্রী কয়জন ? ( পর্ব- ১ )


তথাকথিত নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধারকৃত শ্রীকৃষ্ণের ১৬,১০০ স্ত্রী : ইতিহাস, না কল্পকাহিনী ?

শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহ সম্পর্কে প্রচলিত গল্প এই যে, শ্রীকৃষ্ণের প্রধান মহিষী বা স্ত্রী ছিলো ৮ জন এবং আসামের রাজা নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার করা স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো ১৬,১০০ জন; সব মিলিয়ে শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রীর সংখ্যা ১৬,১০৮।

এই কথা শুনেলই তো প্রথমত যেকোনো হিন্দুর মাথা হেট হয়ে যায়, হিন্দু ধর্মের প্রধান পুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে তাদের আর কোনো গর্ব করার জায়গা থাকে না। আর এই তথ্যকে সামনে এনে মুসলমানরাও যুক্তি দেখায় যে, কৃষ্ণ যদি ১৬ হাজার বিয়ে করতে পারে, তাহলে আমরা চারটা বিয়ে করতে পারবো না কেনো ? আর প্রকৃত তথ্য না জেনে, এইসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বা শ্রীকৃষ্ণের বহু বিবাহের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে আমরা হিন্দুরাও নানা রকম ন্যায় ও যুক্তি সঙ্গত গল্পের অবতারণা করার চেষ্টা করে থাকি, বাস্তবে যার কোনো প্রয়োজনই নেই; কারণ, শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী ছিলো মাত্র এক জন, সে রুক্মিনী। অপর ১৬,১০৭ জন সম্পর্কে যে গল্প, তা যে ডাহা মিথ্যা, তা এই পোস্ট পড়ার পর বুঝতে পারবেন।

বিষ্ণু পুরাণের ৪ অংশের ১৫ নং অধ্যায়ের ১৯ নং শ্লোকে আছে,

“ভগবতোহপ্যত্র মর্ত্যলোকেহবতীর্ণস্য। ষোড়শসহস্রাষণ্যেকোত্তরশতা ধিকানি স্ত্রীণামভবন।।

এর সরল অর্থ শ্রীকৃষ্ণের ষোলহাজার একশত স্ত্রী।

কিন্তু বিষ্ণুপুরাণের ৫ অংশের ২৮ নং অধ্যায়ে বলা আছে,

“অন্যাশ্চ ভার্যাঃ কৃষ্ণস্য বভূবুঃ সপ্ত শোভনাঃ”
“ষোড়শাসন্ সহস্রাণি স্ত্রীণামন্যানি চক্রিণঃ।”


এই দুই শ্লোকের অর্থ হলো কৃষ্ণের মোট স্ত্রীর সংখ্যা ষোল হাজার সাত জন।

এর মধ্যে ষোল হাজার বা ষোল হাজার একশ জন হলো হলো কথিত নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধারকৃত নারী। এই কাহিনীর সূত্রপাত বিষ্ণুপুরাণে এবং তারপর তার বিস্তৃতি ভাগবত পুরাণে। না বুঝে পুরাণকে যেহেতু আমরা হিন্দুরা- বেদ, গীতার পরেই স্থান দিয়ে এসেছি, সেহেতু পুরাণে উল্লিখিত এই সব ঘটনাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমাদের হিন্দুদের ছিলো না, আর পুরাণের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো জ্ঞানী লোকও খুব কম ছিলো, তাই এই ঘটনাগুলো ডালপালা মেলে কৃষ্ণ চরিত্রকে হাজার হাজার বছর ধরে কলুষিত করেছে এবং হিন্দু সমাজ ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

মূল আলোচনার পূর্বে ভাগবত পুরাণ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার, তাহলে বুঝতে পারবেন যে ভাগবত পুরাণ কী জিনিস, আর এই ভাগবত পুরাণের উদ্দেশ্যটা কী ?

বাংলায় দুই ধরণের ভাগবত পুরাণ পাওয়া যায়, একটা হলো সুবোধচন্দ্রের ভাগবত, অন্যটা বেনী মাধব শীলের ভাগবত। দুই ভাগবতের কাহিনী মোটামুটি একই। কিন্তু সুবোধ চন্দ্রের ভাগবতে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে এমন অশ্লীল যে, তা কাউকে পড়ে শোনানো যায় না এবং নিজে পড়লেও সেক্স স্টোরি পড়ার ফিলিংস পাওয়া যায়।

সুবোধ চন্দ্রের ভাগবতে কৃষ্ণের রাসলীলা একটা সেক্স পার্টি, যেখানে নয় লক্ষ পুরুষ এবং নয় লক্ষ নারী নগ্ন হয়ে একত্রে কামলীলায় মেতে উঠে। এর মধ্যে কৃষ্ণও আছে। কিন্তু কোথাও এই কথা বলা নেই যে, রাসলীলার সময় কৃষ্ণের বয়স ছিলো মাত্র ৮, তাই তার পক্ষে ঐ ধরণের যৌনলীলায় অংশ গ্রহন করা সম্ভবই ছিলো না। আর বস্ত্রহরণ পর্বে কৃষ্ণ তো একটা মহা লম্পট, যার উদ্দেশ্যই মনে হবে মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখা। এমনভাবে বর্ণনা করে সুবোধের ভাগবত পুরাণ লেখা। আমি ভেবে অবাক হই যে, শত শত নয়, হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দুরা এসব গো গ্রাসে গিলে আসছে, আর কেউ এর প্রতিবাদ করে বলে নি যে, না, কৃষ্ণ চরিত্র এমন হতেই পারে না; এমন কি কেউ এমন প্রশ্নও তুলে নি যে, ৭/৮ বছর বয়সী একজন বালকের পক্ষে এই রকম যৌন সম্পর্কিত ব্যাপারে জড়ানো কিভাবে সম্ভব ? এর বিপরীতে সবাই সরল বিশ্বাসে ভাগবত পুরাণের কাহিনীকে বিশ্বাস করে এসেছে এবং হিন্দু সমাজকে দিনের পর দিন রসাতলে নিয়ে গেছে।

আগেই বলেছি, সুবোধের ভাগবত এবং বেণীমাধবের ভাগবতের কাহিনী প্রায় সেম। কিন্তু বেণী মাধবের ভাগবতের বর্ণনায়, সুবোধের ভাগবতের তুলনায় অশ্লীলতা কিছুটা কম। কিন্তু রাসলীলা এবং বস্ত্রহরণের ঘটনা একই, উভয়ক্ষেত্রেই কৃষ্ণ যৌনতার জ্বরে আক্রান্ত। তার মানে প্রকৃত সত্য উভয় ভাগবতেই অনুপস্থিত এবং উভয় ভাগবতের উদ্দেশ্যই হলো কৃষ্ণ চরিত্রকে কলুষিত করা। গোপীদের কাপড় চুরির তথাকথিত ঘটনার সময় কৃষ্ণের বয়স যে মাত্র ৭ এবং রাসলীলা সময় তার বয়স মাত্র ৮, এমন তথ্যকে আড়াল করে উভয় ভাগবতেই কৃষ্ণকে পূর্ণ যুবক হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফলে এই ভাগবতগুলো পড়ে হিন্দুরা প্রকৃত সত্যকে জানতে পারে না, এইদিক থেকে বিবেচনা করলে ভাগবতের প্রায় সমস্ত কাহিনী মিথ্যা বা মিথ্যার আড়ালে সত্যকে গোপন করা।

এমন ভাগবতকে আমরা হিন্দুরা ধর্ম পুস্তক জ্ঞান করে পূজা করে আসছি, হিন্দু ধর্ম ও সমাজের পতন কি আর এমনি এমনি ?

যা হোক, কৃষ্ণের ষোল হাজার একশ স্ত্রীর কাহিনী এই সব ভাগবতের মাধ্যমেই লোক সমাজে প্রচারিত, যে ভাগবতের উদ্দেশ্য হলো কৃষ্ণ চরিত্রকে মহান করে তোলা নয়, তাকে ছোট করা; আর যারা ভাগবতকে ধর্ম পুস্তক মনে করে তাদের পক্ষে এসব ঘটনাকে অস্বীকার করার কোনো উপায়ও থাকে না। কিন্তু হিন্দু ধর্ম বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়ে, কৃষ্ণের তথাকথিত সেই ষোল হাজার একশ স্ত্রীর ঘটনাকে গ্রহনযোগ্য করে তোলার জন্য আমরা নানারকম ব্যাখ্যা হাজির করার চেষ্টা করে যুক্তি দিই, সত্য কথা বলতে কি, প্রকৃত সত্যকে না জেনে এই ধরণের যুক্তি আমার আগের পোস্টগুলোতে আমিইও দেবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রকৃত সত্য জানলে এই ধরণের কোনো যুক্তি দেবার প্রয়োজন ই পড়বে না, সেই সত্যই আজ তুলে ধরবে আপনাদের সম্মুখে।

নরকাসুরের জন্ম বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিভিন্ন পুরাণে বলা হয়েছে,

বিষ্ণু যখন বরাহ অবতার রূপ ধারণ করে জলমগ্ন পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, তখন পৃথিবী ও বরাহের সংস্পর্শে নরকাসুরের জন্ম, এই সূত্রে পৃথিবী মানে Earth হলো নরকের মা। এখন বলেন, বাস্তবে এটা কি সম্ভব ? পৃথিবী কি মানুষ, যে সে সরাসরি কোনো মানব সন্তানের জন্ম দেবে ? নরকাসুরের জন্মের এই অবাস্তব কাহিনীই বলে দেয় যে, নরকের ঘটনা সম্পূর্ণ বানানো, বাস্তবে কোনো দিন নরকাসুর ছিলোই না, তাই তার ১৬,১০০ মেয়েকে বন্দী করে রাখা, কৃষ্ণের গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে আনা এবং বিয়ে করা সম্পূর্ণই কাল্পনিক। তাছাড়াও যদি ধরে নিই যে, বরাহ অবতার ও পৃথিবীর সংস্পর্শে কোনোভাবে নরকাসুরের জন্ম হয়েছিলো, তাহলেও কি কৃষ্ণের সময় পর্যন্ত নরকের বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলো ? বরাহ অবতার বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার রূপ ধারণের ঘটনা, যেটা ঘটেছিলো সত্য যুগে, আর কৃষ্ণ, বিষ্ণুর নবম অবতার, এই দীর্ঘ সময় কি নরকাসুর জীবিত থেকে রাজত্ব করে যাচ্ছিলো ?

তবে নরকাসুরের ঘটনা পুরানে আছে এবং সে যে মহাদেবের বর লাভের পর ষোল হাজার মেয়েকে বন্দী করে রেখে তাদেরকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলো, সে কথাও বলা আছে; এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষ্ণ যদি নরকাসুরকে না মারে, তাহলে মারলো কে ?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বোঝা দরকার যে, কৃষ্ণ হলো ঐতিহাসিক চরিত্র আর নরকাসুর হলো পৌরাণিক চরিত্র; পৌরাণিক চরিত্র মানেই কাল্পনিক, আর পৌরাণিক কাহিনীগুলো বানানো শুধুমাত্র লোক শিক্ষার জন্য। সুতরাং কাল্পনিক চরিত্রের সাথে বাস্তব চরিত্রের দেখা সাক্ষাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। পৌরাণিক চরিত্রের বিনাশ পৌরাণিক চরিত্র দিয়েই করতে হয়, তাই পৌরাণিক কাহিনী মতে, শিব, নরকাসুরকে হত্যা করে। সুতরাং নরকাসুরের কাহিনীর সাথে কৃষ্ণের কোনো সংযোগই নেই, তাই কাল্পনিক নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া ষোলহাজার নারীও কাল্পনিক।

আর একটা ঐতিহাসিক তথ্য এখানে জেনে রাখেন, কৃষ্ণের সময় নরকাসুরের রাজত্ব বলে যা বলা হয়, সেই প্রাগজ্যোতিষপুর বা বর্তমানের আসামের রাজা ছিলো ভগদত্ত নামের এক ব্যক্তি, যে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলো এবং অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করে মারা যায়।

কৃষ্ণের জীবনে যে এই ধরণের কোনো ঘটনা, কখনোই ঘটে নি, তার আরেকটা প্রমাণ হলো- মহাভারতে এই ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই, যেমন উল্লেখ নেই রাধার। যদি কৃষ্ণ এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতো, তাহলে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময়, সেখানে উপস্থিত শিশুপাল, যে ছিলো কৃষ্ণের প্রধান শত্রু ও সমালোচক, সে কৃষ্ণ নিন্দার সময় এই ষোলহাজার একশ মেয়ের ঘটনার কথা অবশ্যই উল্লেখ করতো, কিন্তু শিশুপালও তা উল্লেখ করে নি, যেমন শিশুপাল উল্লেখ করে নি রাধার কথা। কারণ, কৃষ্ণের জীবনে রাধা বলে যেমন কেউ ছিলো না, তেমনি তার জীবনে ষোল হাজার একশ মেয়েকে উদ্ধার ও বিয়ে করার ঘটনাও ঘটে নি।

এপ্রসঙ্গে এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, স্টার জলসায় প্রচারিত মহাভারতে কিন্তু শিশুপাল- রাধা ও নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়েদের কথা বলেছে, এই সিরিয়াল দেখে এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, এগুলো সত্য। স্টার পরিবার, কৃষ্ণ সম্পর্কিত প্রচলিত মিথগুলোকেই তুলে এনেছে, তারা কোনো কিছু বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দর্শক হারাতে চায় নি। তাই স্টার জলসার মহাভারত, প্রকৃত মহাভারতের হুবহু নির্মান নয়, অনুষ্ঠানকে জাঁকজমক করার জন্য তারা শুধু প্রচলিত গল্পকেই প্রাধান্য দেয় নি, নানা রকম স্বাধীনতা নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা বলতে পারি, মূল মহাভারতে রুক্মিণীকে বিয়ে করার জন্য কৃ্ষ্ণ একাই যায়, পিছনে কিছু যাদব বাহিনী ছিলো, কিন্তু স্টার জলসার মহাভারতে এখানে অর্জুনের একটা ভূমিকা দেখানো হয়েছে, যা সত্য নয়। এই একই কথা প্রযোজ্য স্টার জলসায় প্রচারিত ভক্তের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে, এরাও কৃষ্ণ সম্পর্কে প্রচলিত ঘটনাগুলোকেই তুলে ধরেছে, গবেষণা করে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার ইচ্ছা এদের নেই, তাই এখানে যেমন রাধাকে দেখতে পেয়েছেন, তেমনি, কৃষ্ণের বহুবিবাহকেও দেখেছেন। কিন্তু এগুলোকে বিশ্বাস করে ঠকবেন না বলেই আশা করছি।

যা হোক, অনেকে, কৃষ্ণের এই ষোল হাজার একশ মেয়েকে উদ্ধার সম্পর্কিত কিছু ভৌগোলিক ঘটনার কথা বলতে পারে, যেমন একটি জায়গার নাম আছে অশ্বক্লান্ত, বলা হয়, কৃষ্ণ, মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে ফেরার সময় সেই জায়গায় তার রথের ঘোড়ারা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো বলে, কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলো, এই ভাবে সেই জায়গার নাম হয় অশ্বক্লান্ত।

আসলে পুরাণে লেখা কাহিনীর প্রভাবে এই নামকরণগুলো ঘটেছে এবং এই ভাবে নামকরণ অসম্ভব কিছু নয়, যেখানে পুরাণ লিখিত হয়েছে হাজার হাজার বছর আগে। এইসব পুরাণের প্রভাবে যেখানে হিন্দুদের চিন্তাধারাই বদলে গেছে, তারা কাল্পনিক ঘটনাকে সত্য বলে মনে করেছে, সেখানে পুরাণে লেখা কাহিনীর প্রভাবে কোনো এক জায়গার নামকরণ হওয়া, এ আর অসম্ভব কী ?

কৃষ্ণের এই ষোলহাজার বিয়ে সংক্রান্ত বিষ্ণুপুরাণের আরেকটি আজগুবি তথ্য, যা আমরা বিশ্বাস করে এসেছি, তা হলো কৃষ্ণের ছিলো ১ লক্ষ ৮০ হাজার পুত্র। আবার এও বলা হয় কৃষ্ণের প্রত্যেক স্ত্রীর ছিলো ১০টি করে পুত্র, একটি করে কন্যা; এই সূত্রে কৃষ্ণের পুত্র কন্যা হওয়া সম্ভব ১,৭৭,১৮৮ জন। পুরাণ রচয়িতাদের মাথা যে ঠিক ছিলো না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত; কারণ, তারা কৃষ্ণের প্রধান স্ত্রী ৮ জন বললেও, নাম দিয়েছে ২১ জনের, এই সূত্রে আবার কৃষ্ণের সন্তান সংখ্যা হয় ১,৭৭,৩৩১ জন। কৃষ্ণ জীবিত ছিলেন ১২৫ বছর, ২৯ বছর বয়সে সে রুক্মিনীকে বিয়ে করে, এর পর থেকে যদি তার সন্তান জন্মানো শুরু করে তাহলে সে সন্তান জন্ম দিয়েছে ৯৫ বছর ধরে, বাস্তবে যেটা অসম্ভব, তারপরও তর্কের খাতিরে সেটাকে সম্ভব বলে ধরে নিলে প্রতিবছর কৃষ্ণ জন্ম দিতো ১৮৬৬ জন সন্তানের, এভাবে প্রতিদিন জন্ম হতো ৫ জনেরও বেশি সন্তানের। এটা কি কখনো সম্ভব ?

প্রকৃত সত্যকে না জেনে বা বোঝার চেষ্টা না করে আমরা কৃষ্ণের ষোল হাজার স্ত্রীকে স্বীকার করে নিয়ে বলি, তারা ছিলো লক্ষ্মীর অংশ বা অবতার এবং কৃষ্ণ একই সাথে সব স্ত্রীর কাছে থাকতে পারতো, তাকে পালা করে কোনো স্ত্রীর কাছে থাকতো হতো না। এভাবে হয়তো কৃষ্ণের পক্ষে থাকা অবশ্যই সম্ভব এবং এভাবে সব স্ত্রীর কাছে প্রতি রাতে থাকলে এক জীবনে অবশ্যই এতগুলো সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কৃষ্ণের এতগুলো সন্তান এবং স্ত্রীর কেউ কার্যক্ষেত্রে উপস্থিত নেই কেনো ? তারা বাস্তবে থাকলে তাদের অস্তিত্বের কোনো প্রমান কি কোথাও থাকতো না ?

উইকিপিডিয়া তো কৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান ৮ স্ত্রী এবং তাদের ছেলে মেয়েদের নামও লিখে রেখেছে। এই তালিকায়, অন্য সাত স্ত্রীর সন্তানদের কথা না হয় বাদ ই দিলাম, কৃষ্ণ ও রুক্মিনীর ছেলে প্রদুম্ন ছাড়াও অন্য ১০ জনের নাম আছে। তাহলে প্রদুম্ন ছাড়া অন্য কোনো পুত্রের নাম বা তার কাজের কোনো কিছুর উল্লেখ শুধু মহাভারতেই নয়, অন্য কোনো পুরাণেও উল্লেখ নেই কেনো ? রুক্মিনীর যদি ১০ পুত্র থাকে, তাহলে তো প্রদুম্নের মতো তাদেরও সমান গুরুত্ব কৃষ্ণের কাছে থাকা উচিত ছিলো। অথচ কৃষ্ণ বলেছে শুধু প্রদুম্নের কথা, কারণটা কী ? কারণটা হলো কৃষ্ণের পুত্র ছিলো একজনই সেটা প্রদুম্ন, আর প্রদুম্নের মা রুক্মিনীই ছিলো কৃষ্ণের একমাত্র স্ত্রী।

কৃষ্ণের স্ত্রী সম্পর্কে উইকিপিডিয়া, যার তথ্য পৃথিবীর কোটি কোটি লোক বিশ্বাস করে, তার দ্বিচারিতার ব্যাপারটা এবার একটু লক্ষ্য করুন :

একটু আগেই বলেছি, কৃষ্ণের প্রধান ৮ স্ত্রী এবং তাদের প্রত্যকের ১০ টি পুত্র এবং একটি করে কন্যার কথা উইকিপিডিয়া তাদের সাইটে লিখে রেখেছে, সেই সাথে আরও যা যা লিখে রেখেছে দেখুন,

“কৃষ্ণ বিদর্ভ রাজ্যের রাজকন্যা রুক্মিণীকে তাঁর অনুরোধে শিশুপালের সাথে অনুষ্ঠেয় বিবাহ মণ্ডপ থেকে হরণ করে নিয়ে এসে বিবাহ করেন। এরপরই কৃষ্ণ ১৬১০০ নারীকে নরকাসুর নামক অসুরের কারাগার থেকে উদ্ধার করে তাদের সম্মান রক্ষার্থে তাদের বিবাহ করেন।[৫৩][৫৪] কৃষ্ণের মহিষীদের মধ্যে আটজন ছিলেন প্রধান, যাদের অষ্টভার্যা নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা হলেন রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, কালিন্দি, মিত্রবৃন্দা, নগ্নাজিতি, ভদ্রা এবং লক্ষণা।[৫৫][৫৬][৫৭] কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে সমস্ত বন্দী নারীদের মুক্ত করেন। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে বন্দী নারীদের সমাজে কোন সম্মান ছিল না এবং তাদের বিবাহের কোন উপায় ছিল না কারণ তারা ইতিপূর্বে নরকাসুরের অধীনে ছিল।… শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই ৷ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর রচিত কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহের ভিত্তিহীন তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেওয়া আছে ৷ কৃষ্ণচরিত্রে দেখা যায় যে, কৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী শুধু পুরাণের একটি অংশে সীমাবদ্ধ ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অন্য কোনো কার্যক্ষেত্রে এসবের উল্লেখ নেই ৷ তিনি এটাকে নেহাতই উপকথা বা গল্প বলে উল্লেখ করেন ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনচরিতে রুক্মিনী ভিন্ন অন্য কোনো পত্নীর কার্যক্রম দেখা যায় না।”

-উইকিপিডিয়া একবার কৃষ্ণের তথাকথিকত সর্বমোট ১৬,১০৮ স্ত্রীর কথা ঘটা করে বলছে, পরে আবার বলছে, “শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই।”

আবার এও বলেছে,

“বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর রচিত কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহের ভিত্তিহীন তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেওয়া আছে ৷ কৃষ্ণচরিত্রে দেখা যায় যে, কৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী শুধু পুরাণের একটি অংশে সীমাবদ্ধ ৷ শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অন্য কোনো কার্যক্ষেত্রে এসবের উল্লেখ নেই।”

মানুষ আশা এবং বিশ্বাস করে, উইকি যখন কিছু লিখবে, তখন গবেষণা করে সত্য কথাটাই লিখবে, কিন্তু তারাই যদি এইভাবে দুরকম কথা বলে, মানুষ কিসের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেবে বা সত্য জানবে ? মিথ্যা দিয়ে সত্যকে যতই আড়াল করার চেষ্টা হোক না কেনো, সত্য কোনো না কোনো দিক দিয়ে উঁকি মারবেই, এভাবেই হয়তো কৃষ্ণের স্ত্রী সম্পর্কে সত্য উঁকি দিয়েছে উইকির এই তথ্যে যে, “শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক ভিত্তি নেই।”

ভিত্তি থাকবে কিভাবে ? ঘটনা সত্য হলেই তো তার ভিত্তি থাকবে। ঘটনা মিথ্যা বলেই তো তার কোনো ভিত্তি নেই এবং এভাবে হাজারো মিথ্যার আড়ালে প্রকৃত সত্য সন্ধানীদের জন্য উইকির পেজে উঁকি দিচ্ছে একটি সত্য যে,

“শ্রীকৃষ্ণের ১৬০০০ এর অধিক পত্নী ও অষ্টভার্যা সম্পর্কে সঠিক কোনো ভিত্তি নেই।”

তার মানে এই ব্যাপারগুলো পুরোটাই মিথ্যা। কারণ, কৃষ্ণের স্ত্রী ছিলেন একজনই, সে রুক্মিণী এবং রুক্মিণীর ১০টি নয়, পুত্র ছিলো একটি ই সে প্রদুম্ন, আর প্রদুম্নের পুত্র পুরাণে উল্লিখিত বীর অনিরুদ্ধ।

যার অস্তিত্ব থাকে, সে এভাবেই তার অস্তিত্বের প্রমাণ রেখে যায়, কৃষ্ণের সব স্ত্রী ও পুত্রের কথা না হয় বাদ ই দিলাম, পুরাণ বা উইকি যে বলেছে, রুক্মিনী ও কৃষ্ণের আরো ১০ পুত্র ছিলো, তারা কে কোথায় ? কোথাও তাদের কোনো কথা নেই কেনো ? যে প্রশ্নটা আগেও করেছি। এদের উল্লেখ নেই, এই কারণে যে প্রদুম্ন ভিন্ন কৃষ্ণের কোনো পুত্রই ছিলো না। আর অন্য কোনো পুত্র না থাকাটা এটা প্রমান করে যে, প্রদুম্নের মা রুক্মিনী ছাড়া কৃষ্ণের অন্য কোনো স্ত্রীই ছিলো না।

সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের বহুবিবাহ নিয়ে যে প্রচলিত গল্প, তা যে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বানোয়াট, আশা করছি তা আমার পাঠক বন্ধুদের কাছে ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

No comments:

Post a Comment