Thursday, 1 October 2020

পরিণত বয়সে- বীর্যপাত, বীর্যের ক্ষয় নয়, বীর্যের ব্যালান্স


পরিণত বয়সে- বীর্যপাত, বীর্যের ক্ষয় নয়, বীর্যের ব্যালান্স :

বেশ কিছুদিন ধরে খেয়াল করছি ফটোপোস্টের বক্তব্যগুলো একটি গোষ্ঠী লাগাতারভাবে প্রচার করে যাচ্ছে। এদের সাথে আমি সম্পূর্ণভাবে একমত না হলেও, এটা আমি বলছি না যে অবৈধ যৌনসঙ্গ বা শুধুমাত্র দৈহিক সুখলাভের জন্য বীর্যক্ষয় করা উচিত। তবে এর কিছু বাস্তবতা আছে, যে বাস্তবতা না মানলে পুরুষেরা নানারকম সমস্যায় পড়বে, তাতে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে এবং অন্যান্য উন্নতি ব্যাহত হবে।

ছোটবেলা থেকেই নানাজনের কাছে নানাভাবে শুনতে শুনতে এটা আমাদের মাথায় সেট হয়ে যায় যে, বীর্যক্ষয়ে দেহের ভয়াবহ ক্ষতি হয়, পড়াশোনা হয় না, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এতকিছু এতবার জানা বা শোনার পরও ছেলেরা যখন নিজেকে আটকাতে পারে না, হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যক্ষয় করে ফেলে, তখন তাকে গ্রাস করে এক ভয়াবহ বিষণ্নতা, এক অপরাধবোধ, যা তাকে প্রায় মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তোলে এবং সে বার বার প্রতিজ্ঞা করে যে এই কাজ সে আর কখনো করবে না, কিন্তু তার শরীর কয়েকদিন পরেই তাকে আবার সেই কাজ করতে বাধ্য করে। সে আবারও সেই একই কাজ করে এবং একইভাবে অনুতপ্ত হয় এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, যা তাকে শারীরিকভাবেও বিপর্যস্ত করে। এই ঘটনা একজন ছেলের জীবনে বার বার ঘটতে থাকে এবং এ সম্পর্কে ভুল শিক্ষার ফলে সে বার বার নিজের ক্ষতি করতে থাকে।

বাস্তবে কোনো পুরুষের পক্ষে বীর্যকে রক্ষা করা সম্ভব নয়, যে এটা রক্ষা করতে পারবে- হয় সে নপুংসক, নয়তো সাধক ব্রহ্মচারী মহাপুরুষ, বাস্তবে যারা সমাজের কোনো উপকারে লাগে না।

ছোটবেলা থেকেই আমি পড়ার পাগল, আমার আশেপাশের এমন কোনো বই পুস্তক বা পেপার পত্রিকা থাকবে না, যেগুলো আমার পড়ার বাইরে, তো ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পর একবার গেলাম চট্টগ্রামে, সেখানে আমার কাজিন আগে থেকেই চাকরি করতো। আমার কাজিন ছিলো বি.এ পাশ, তারও বিভিন্ন প্রকার বই পুস্তক পড়ার অভ্যাস ছিলো। তো তার বইয়ের তাকে দেখলাম যৌনতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি বই। যৌনতা তো পুরুষের কাছে এমনিই আকর্ষণের বিষয়, যার ব্যতিক্রম আমিও নই, আরও কারো পক্ষে হওয়াও সম্ভব নয়, আগেই বলেছি- যৌনতা যদি কারো কাছে ভালো না লাগে, হয় সে নপুংসক, নয় তো সাধক ব্রহ্মচারী, বাস্তবে সমাজের যাদের কোনো ভূমিকাই নেই।

যা হোক, বই পড়া শুরু করলাম এবং তার বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিসঙ্গত আলোচনা বেশ ভালোই লাগলো, সেই বইয়ে লেখক বলেছেন, অনেক মানুষ বাল্যকালের অর্জিত ধারণায় মনে করে যে বীর্যক্ষয় করলে শরীরের নানাবিধ ক্ষতি হয়, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যদি এটি সত্য হতো, তাহলে বিবাহিত পুরুষরা তো মাটির সাথে মিশে যেতো। কারণ, একজন বিবাহিত যুবক প্রায় প্রতিদিনই বীর্যক্ষয় করে, কোনো কোনো দিন একাধিকবারও করে। যুক্তিটি আমার মনে খাটলো এবং চিন্তা করে দেখলাম সত্যি তাই তো।

বয়ঃসন্ধিকালে পুরুষের দেহে টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপত্তি হয়, যা একজন বালককে পুরুষের রূপান্তরিত করে, এই টেস্টোস্টেরন হরমোনই পুরুষের দেহে বীর্যের উৎপন্ন করে। পুরুষের প্রজনন তন্ত্রের মধ্যে বীর্যথলি নামক একটি প্রত্যঙ্গ আছে, সেই বীর্যথলি যখন ভরে উঠে, তখন পুরুষেরা ভীষণ উত্তেজনা বোধ করে, তখন নিজেকে শান্ত করার জন্য ঐ পুরুষকে বীর্যপাত ঘটাতে হয়, যদি কেউ কোনো সংস্কার বশত হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত না ঘটায়, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে তার বীর্যপাত ঘটে যায়, একজন সক্ষম ও সুস্থ পুরুষের এ থেকে কোনো পরিত্রাণ নেই, বলা যায় এটাই তার নিয়তি।

তবে যে ছেলে রেগুলার বিভিন্ন প্রকার যোগ ব্যায়াম করে বা যেভাবেই হোক কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করে, সে তার এই বীর্যের উৎপাতকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়; কারণ যোগ ব্যায়াম বা যেকোনো প্রকার শারীরিক পরিশ্রম করার ফলে দেহের ধারণ ক্ষমতা বেড়ে যায়। কিন্তু সাধারণভাবে কারো পক্ষে বীর্যের উৎপাতকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যদি কেউ হস্তমৈথুন না করে তার স্বপ্নদোষ ঘ'টে তার বীর্যপাত হবেই।

যদি কোনো অবিবাহিত যুবক এই প্রতিজ্ঞা করে বসে যে সে কখনো বীর্যপাত করবে না, তাহলে তার ঘুম ঠিকমতো হবে না, আর ঘুম ঠিকমতো না হলে তার প্রতিদিনের সমস্ত কাজ, যেমন- চাকরি বা পড়াশোনা বা যেখানে কঠিন মনোযোগ দিতে হয়, সেসব কাজে সে খারাপ করতে থাকবে, এভাবে সে আস্তে আস্তে নিজের ক্ষতি নিজে করতে থাকবে, ফলে তার জীবনের সার্বিক উন্নতি ব্যাহত হবে।

অপরিণত বয়সে, যেমন- বালক বা কিশোর অবস্থায় বীর্যক্ষয় অবশ্যই শরীরের জন্য ক্ষতিকর; কারণ, এই সময় মানুষের দেহ গঠন হতে থাকে, তাই এই সময় বীর্যক্ষয়ে দেহের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু যুবক বা পরিণত বয়সে বীর্যক্ষয়ে বাস্তবে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এই সময়ে বীর্যক্ষয় না হলেই শরীরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। যারা বিবাহিত, তারা তো বীর্যক্ষয় করে বা করবেই, এটা সাধারণ বিষয়। কিন্তু যারা অবিবাহিত, তারা যদি দেহে যৌনতার কারণে প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করে, তখন তাদেরকে বীর্যপাত করতেই হবে, না হলে তারা নানারকম শারীরিক এবং মানসিক চাপে পড়বে, যা তাদের ক্ষতি করবেই করবে।

সনাতন ধর্মের চার আশ্রমের প্রথমটি, যাকে বলে ব্রহ্মচর্য, যে সময়ে মানুষ শিক্ষা গ্রহন করে, সেই সময়ে অপ্রয়োজনে শুধু দৈহিক সুখলাভের জন্য বীর্যক্ষয় অবশ্যই খারাপ এবং তা দেহের জন্য ক্ষতিকারক, কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে- সে বীর্যপাত না করে সুখ পাচ্ছে না, নানারকম সমস্যায় ভুগছে, তখন সে বীর্যপাত করতে পারে, এতে তার কোনো শারীরিক ক্ষতি তো হবেই না, উল্টো ভালো ঘুম হবে এবং এর ফলে বিভিন্ন কাজে ভালো করে মনোযোগ দিতে পারবে।

বীর্য রক্ষার ব্যাপারটা সারা পৃথিবীর মধ্যে শুধু ভারতীয় সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যেই প্রচলিত, যারা বিয়ে করে সংসার করে না। কিন্তু এতে বাস্তবে ভারতের কী উপকার হয়েছে ? নিজেদের বীর্য রক্ষা করে তারা জগতের কোন কল্যানটা করেছে ? ম্যাক্সিমাম মুনি ঋষিগণ বিয়ে করেছিলেন, সংসার করেছিলেন, সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, ফলে এটা প্রমাণিত যে গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশ করে আপনি বীর্যকে কাজে লাগাতে পারেন, তাতে সনাতন ধর্মে কোনো সমস্যা নেই। বরং সমস্যা এটাই যদি আপনি আপনার বীর্যকে কাজে না লাগিয়ে সন্তানের জন্ম না দেন। কারণ, তাতে সনাতনী সমাজের জনসংখ্যা কমে সনাতনী সমাজ শক্তিহীন হবে, আপনার বংশ তো বিলুপ্ত হবেই, আর সন্তানের জন্ম না দিয়ে সনাতনী সমাজের ক্ষতি করায় আপনার পারলৌকিক কোনো গতি তো হবেই না, সেটা পরের ব্যাপার।

তাই বীর্যধারণ বা বীর্যরক্ষার ব্যাপারটা জীবনের একটা সময়ের জন্য প্রযোজ্য, যখন আপনার শরীর গঠন হচ্ছে, আপনি শিক্ষা জীবনে আছেন, কিন্তু যৌবনে আপনাকে বিয়ে করতেই হবে, তখন বীর্য রক্ষা কোনো বিষয় নয়, তখন বিষয় হলো বীর্যকে কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত সন্তানের জন্মদান। কিন্তু সঠিক সময়ে বিয়ে না হলে, বীর্যের উৎপাতের কারণে যদি আপনার ঘুম ঠিক মতো না হয় বা কোনো কাজে ভালোভাবে মনোযোগ দিতে না পারেন তখন আপনি বীর্যপাত করতে পারেন, এটা কোনো ভাবেই বীর্যের ক্ষয় নয়, বীর্যের ব্যালান্স।

ইন্টারমিডিয়েট বা উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালীন আমি ভারত সেবাশ্রম সংঘের একটি আশ্রমে বেশ কিছুদিন ছিলাম, সেখানে নিরামিষ খাইয়ে ছেলেদের হীন দুর্বল করার পাশাপাশি, তাদের বীর্যরক্ষার ব্যাপারে বেশ উৎসাহ দেওয়া হয়। এসব নিয়ে ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের বেশকিছু বই আছে, সেগুলো পড়তে দেওয়া হয়। যদিও আমি ক্লাস নাইন থেকেই বিভিন্ন প্রকার যোগ ব্যায়াম, ক্যারাটে, বক্সিং এসবের চর্চা করি এবং যৌনতার দিক থেকে একজন সক্ষম ও সুস্থ পুরুষ হিসেবে প্রয়োজনে মাঝে মাঝে বীর্যপাতকে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না এবং বাল্যকালে অর্জিত ধারণা মোতাবেক অপরাধবোধে ভুগি, তার উপর আবার আশ্রমে গিয়ে ঐসব বই পুস্তক পড়ে বিষয়টি নিয়ে খুবই সিরিয়াস হয়ে গেলাম যে না আর কোনোভাবেই বীর্যপাত করবো না, দেখি কী হয় ? 

এর জন্য যৌন উত্তেজক কোনো কিছু দেখি না, সেই রকম আলোচনা শুনি না, এর মধ্যে আমার শরীরচর্চা কিন্তু চলছেই, তারপরও সপ্তাহ দুয়েক যেতেই খেয়াল করলাম ঘুমের ঘোরে উত্তেজনা বোধ হচ্ছে, নানা রকম সেক্সুয়াল স্বপ্ন দেখছি, উত্তেজনার জেরে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে, প্রস্রাব করে এসে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করছি, এইভাবে নানারকম মানসিক অশান্তি ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে চলছি, লক্ষ্য একটাই বীর্যপাত আর ঘটতে দেবো না, কিন্তু ২৮ দিনের দিন ঘটনা ঘটেই গেলো, ঘুমের মধ্যে আমার বীর্যপাত হয়ে গেলো এবং তারপর আবার শরীর ও মনে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেলাম। তবু এই বাস্তব ব্যাপারকে বাল্যকালে অর্জিত বিশ্বাস এবং আশ্রমের শিক্ষার জন্য আমি মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না যে প্রয়োজনে বীর্যপাতে শরীরের কোনো সমস্যা হয় না, এটা মাঝে মাঝে প্রয়োজনে করা যেতে পারে। কিন্তু এই ভ্রান্ত বিশ্বাস সম্পূর্ণ আমি ঝেড়ে ফেলতে পারি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পর যখন আমি চট্টগ্রামে গিয়ে ঐ বইটি পড়ি। 

তারপর থেকে বিয়ে করার পূর্ব পর্যন্ত এটা নিয়ে আমি আর কখনোই হীনন্মন্যতায় ভুগি নি, যখন প্রয়োজন হয়েছে, তখন করেছি এবং এভাবেই আমি যথেষ্ট সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন নিয়ে বেঁচে আছি। রেগুলার ব্যায়াম করার ফলে প্রায় সালমান খান টাইপের একটি শরীরসহ, সব সময়ই আমার শরীরে সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুন শক্তি ছিলো এবং এখনও আছে, যে শক্তিদ্বারা কাউকে এক থাপ্পড় দিয়ে তার ত্রিভুবন ঘুরিয়ে দিতে পারি, অন্যান্য আঘাতের কথা আর না ই বা বললাম এবং এই দৈহিক শক্তি ও ফিটনেস আমি নিরঙ্কুশ বীর্যধারণ করে করি নি, প্রয়োজনে বীর্যপাত করেছি, সেটা তো খুলেই বললাম, তাহলে বীর্যপাতে এই অপকার হয়, ঐ অপকার হয়, এসব বলে কি যুব সমাজের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে তাদেরকে অপরাধবোধে ভুগিয়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করার কি কোনো দরকার আছে ? শত কেনো, হাজার চেষ্টা করলেও তো কোনো যুবক নিজেকে বীর্যপাত করার থেকে আটকাতে পারবে না।

হিন্দু সমাজে বৈষ্ণব নামধারী একশ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ী বা গুরু আছে, এদের বেশির ভাগই বাড়িতে কেউ নিরামিষ খায় না, কিন্তু শিষ্যের বাড়িতে গেলে বা কোথাও কোনো অনুষ্ঠান করতে গেলে নিরামিষ ছাড়া কিছু খায় না বা এমনভাব দেখায় যে যদি কোনো আমিষ খায় বা আমিষের স্পর্শ লাগে এদের ভয়াবহ সর্বনাশ হয়ে যাবে। বাস্তবে এটা একপ্রকার ভণ্ডামী। বাস্তবে বৈষ্ণব সমাজ যেহেতু নপুংসকতার পূজারীর সমাজ এবং ভণ্ডামীর সমাজ, যে নপুংসকতা ও ভণ্ডামী বৈষ্ণব সমাজের প্রভাবে সনাতনী সমাজেও বিস্তার লাভ করেছে বা করছে, তাই বৈষ্ণব মতবাদের প্রভাবে অনেক হিন্দু নিজেরা অঢেল মাছ মাংস খেলেও বা তাকে সমর্থন করলেও তাদের কানমন্ত্র গুরুরা বা সনাতন ধর্মপ্রচারকেরা মাছ মাংস খাক, সেটা তারা মেনে নিতে পারে না। নিরামিষ না খেলে বৈষ্ণব সমাজে বা বৈষ্ণব প্রভাবিত হিন্দু সমাজে তারা কোনো মূল্য পাবে না, এটা ধরে নিয়ে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তারা নিরামিষ খেয়ে নিজেদের বাজার ঠিক রাখে, আর যারা আমিষ খাওয়া থেকে নিজেকে কণ্ট্রোল করতে না পারে, তারা বাড়িতে মাছ মাংস খায়, আর বাইরে গিয়ে আমিষ না খাওয়ার এবং নিরামিষ খাওয়ার ভণ্ডামী করে।

এই একইভাবে যৌনতার ব্যাপারে কিছু যুবক এমন ভাব দেখায় যে, তারা ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না, যৌনতার ব্যাপারে তারা যেন নির্মল এবং সাধুসন্ত মহাপুরুষ। তাই খুব কম যুবকই আছে, যারা তাদের যৌনজীবনকে খোলাখুলি সবার কাছে স্বীকার করার সাহস রাখে, যেমন আমি এই প্রবন্ধে করলাম; কারণ, আমি ভণ্ড নই, আমি যা, তাই প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করি না বা তা প্রকাশ করার সাহস আমার আছে। এই একই কারণে মাছ মাংস খেয়েও আমি সনাতন ধর্মের প্রচার করি, আর এটা করতে গিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেমন গীতাপাঠ করি, তেমনি সনাতন ধর্ম বিষয়ে বক্তৃতাও দিই। বৈষ্ণবগুরুদের মতো বিয়ে সংসার করে সন্তানের জন্ম দিয়েও আমি যেমন নিজেকে বৈষ্ণব বলে প্রচার করি না; কারণ, বৈষ্ণব মতবাদে বিয়ে সংসার সন্তানের জন্মদান বলে কিছু নেই; তেমনি ধর্মপ্রচার করতে হলেই তাকে নিরামিষ খেয়ে নপুংসক হতে হবে, এই ধারণাও আমি মানি না। আমি জানি সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্য কী, তাই সেটাই মানি, আর সেটাই কাজে প্রকাশ করি। 

কারণ, আমার উদ্দেশ্যে জনগনের মন মতো কথা ও কাজ করে অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো নয়, আমার উদ্দেশ্যে সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরা; কারণ, মিথ্যাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আর মহাভারতের কথা অনুযায়ী, যেখানে মিথ্যা আছে, সেখানে ধর্ম থাকে না। একারণে দশ জন যদি আমার লেখা পড়ে এবং তাদের মধ্যে থেকে একজন যদি আমার কথাকে মানে, সেটাই আমার সফলতা বলে মনে করি। কারণ, একটি বনে একটি বাঘই গুরুত্বপূর্ণ, ১০টি শেয়াল নয়। তাছাড়া আমি এই বাস্তবতাতেও বিশ্বাস করি যে- আজকে প্রকৃত সত্যকে হয়তো অনেকের কাছে তিতা লাগছে; কারণ, সত্য সব সময় তিতাই হয়; কিন্তু একদিন অধিকাংশ লোক আমার সেই সত্যকে মেনে নেবেই, কেননা সত্যের জয় যে অবশ্যম্ভাবী।

যা হোক, দেহের চাহিদাকে অবজ্ঞা করে কোনো পুরুষ যদি দেহের উপর দমন পীড়ন চালায়, সে শুধু নিজের ক্ষতিই করবে না, তার দ্বারা সমাজেরও ক্ষতি হতে পারে বা হয়। ইসলাম এমনিতেই ধর্ষকদের মতবাদ; কারণ, গনিমতের মালের নামে অমুসলিম নারীদেরকে ধরে এনে ধর্ষণ করে বা কোনো অমুসলিম এলাকাকে গায়ের জোরে দখল করার পর সেখানে তিন দিন ব্যাপী বিজয় উৎসব পালনের নামে ধর্ষণের উৎসব করে মুহম্মদ এবং তার অনুসারীরা মুসলমানদের জিনে যে ধর্ষণের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে, তার কারণে মুসলমানদের মধ্যে ধর্ষণের একধরণের বাতিক আছে, তাই কারণে অকারণে এরা সুযোগ পেলেই ধর্ষণ করে ফেলে, আর এতে কে বাচ্চা বা কে বুড়ি সেটার কোনো হিসেবে করে না।

এছাড়াও আরেকটি কারণে মুসলমানদের মধ্যে ধর্ষণ প্রবণতা বেশি, সেটা হলো- ইসলামে হস্তমৈথুন করা নিষেধ। একারণে ধর্মের ভয়ে যেসব মুসলমান হস্তমৈথুন করতে পারে না, তাদের দেহের উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে ধর্ষণ করে ফেলে, এই ধর্ষকরা হলো ইসলামিক লেবাসধারী- মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং মাদ্রাসার শিক্ষকরা; আর এদের শিকার মসজিদ মাদ্রাসায় কোরান পড়তে আসা কম বয়সী শিক্ষার্থীরা। দেহের উত্তেজনা নিরসনে হিন্দু যুবকদের মধ্যে যদি বীর্যপাতের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে হিন্দু যুবকদেরও মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটবে এবং তারাও ধর্ষণের মতো ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটিয়ে ফেলবে। তাই পরিণত বয়সে বীর্যের ব্যালান্স নিয়ে সমাজে ভুল তথ্য ছাড়ানো অনুচিত।

যারা বীর্যরক্ষা, বীর্যরক্ষা ব'লে চিল্লায়, তারাও যে বীর্য রক্ষা করতে পারে না, সেটা আমি নিশ্চিত; আর যদি তারা সেটা পারে, তাহলে তারা যে নপুংসক, সেটাও আমি নিশ্চিত। কারণ, এটা সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া, পায়খানা প্রস্রাবকে যেমন আপনি আটকে রাখতে পারবেন না, তেমনি বীর্যকেও আপনি কখনো আটকে রাখতে পারবেন না, যদি আপনি এ ব্যাপারে সুস্থ স্বাভাবিক হন।

ফটোপোস্টে যাকে দেখছেন, সেই স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব, বীর্যরক্ষা করে জগতের কী কল্যাণ করেছেন ? তার কথা মতো বীর্যক্ষয় যদি সকল দুঃখের ও দুগর্তির আকর হয় এবং বীর্যক্ষয়ে যদি দৈহিক মানসিক ও আত্মিক সকল সর্বপ্রকার অধঃপতন হয়, তাহলে তো তিনি জীবনে একদিনও বীর্যক্ষয় করেন নি বলে ধরে নিচ্ছি। এতে তিনি জগতের কোন উপকারটা করেছেন ? তাঁর বীর্যরক্ষার ফলে কি তিনি নিজের দেহে বা মনে এমন আধ্যাত্মিক শক্তির সঞ্চার করতে পেরেছেন, যার দ্বারা হিন্দুরা মুসলমানদের অত্যাচার নির্যাতন থেকে রক্ষা পেয়েছে ? অথচ এই বীর্য দ্বারা যদি তিনি এক বা একাধিক সন্তানের জন্ম দিতেন, তারা হিন্দু সমাজের জন্য শক্তি হতো।

শুধু এই স্বরূপানন্দ ই নন, যাঁরাই বীর্যরক্ষার ভণ্ডামি করেছেন, যেমন- চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, প্রণবানন্দ, জগদ্বন্ধু, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, বালক ব্রহ্মচারী, রামঠাকুরসহ অসংখ্য স্ত্রী-সংসার-সন্তানহীন মানুষ, যাদেরকে আমরা মহাপুরুষ বলে মনে করি এবং শ্রদ্ধা করি, তারা কি বাস্তবে বীর্যরক্ষা করে সমাজ সংসারের কোনো উপকার করতে পেরেছেন ? এদের বিপরীতে অন্তত এই দিক থেকে হরিচাঁদ এবং অনুকূলকে আমি শ্রেষ্ঠ মনে করি। তাঁরা বীর্যরক্ষার ভণ্ডামি না করে বিয়ে করেছেন, সংসারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেছেন এবং সন্তানের জন্ম দিয়ে সমাজের উপকার করেছেন। মূলত এই একটি সঠিক কাজ করার জন্যই দেখুন, থিয়োরিগতভাবে ভুল হলেও মতুয়া সমাজ এবং সৎসঙ্গের কেমন রমরমা, আর অন্যরা নিভু নিভু করছে।

যারা বীর্য রক্ষার পক্ষে এত সাফাই গায়, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি- আপনাদের জন্ম কি আপনার পিতার বীর্যরক্ষার ফলেই হয়েছিলো, না তার নিরন্তর বীর্যপাতের ফলে হয়েছিলো ? কোনো কোনো সন্তানের জন্ম হয়তো একবার সঙ্গমের ফলেই হয়, কিন্তু বেশির ভাগ সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে তাদের পিতামাতাকে মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে সঙ্গম করতে হয়। তাই দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমার আপনার জন্ম কিন্তু আমাদের পিতা মাতার নিরন্তর সঙ্গমের ফলেই হয়েছে, যেখানে পিতারা বহু বীর্যক্ষয় করেছে। আর বীর্যক্ষয় যদি এতই খারাপ বা এতই ভয়াবহ হয়, তাহলে কেউ জীবনে একবারই বা তা করবো কেনো ? এই একবারও যদি আপনার পিতা বীর্যক্ষয় না করতো, তাহলে আপনার কি জন্ম হতো ? আর আপনাদের কথা অনুযায়ী যদি জগতের সকল পুরুষ বীর্যক্ষয় বন্ধ করে দেয়, তাহলে সৃষ্টি প্রক্রিয়া তো বন্ধ হয়ে যাবে, তাহলে সমাজ সভ্যতা কয়দিন টিকে থাকবে ? 

বীর্যক্ষয় সম্পর্কিত এই ধরণের ভাবনা আসলে একটি নপুংসক ভাবনা, যার সূচনা মধ্যযুগে চৈতন্যদেব থেকে।

চৈতন্যদেব তো বিবাহ করেছিলেনই, যদি তিনি কমপক্ষে একটি সন্তানের জন্ম দিতেন এবং সেই সন্তান যদি পুত্র হতো, তাহলে হয়তো বৈষ্ণব মতবাদের বর্তমান চেহারাটাই শুধু অন্যরকম হতো না, চৈতন্যদেবকেও হয়তো পুরীর মন্দিরের পাণ্ডাদের হাতে খুন হতে হতো না। আর বর্তমানে- দুই দুইটি মেয়ের জীবন নষ্ট করার জন্য এবং নিজে সন্তানের জন্ম না দিয়ে হিন্দু সমাজের জনসংখ্যা কমানোর জন্য এবং নিজেদের আদর্শে হিন্দু যুবকদের সংসার বিরাগী করে ঐ সন্তানদের পিতা মাতার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করার জন্য- যারা চৈতন্যদেবের সমালোচনা করছে, তারাও সমালোচনা করতে পারতো না। যেসব তথাকথিত মহাপুরুষ, বীর্যরক্ষার তাগিদে সন্তানের জন্ম দেয় নি, তাদের আদর্শ একদিন না একদিন মুখ থুবড়ে পড়বেই, যেহেতু সেই আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা কোনো উত্তরাধিকারের জন্ম দিয়ে যায় নি। এই বিবেচনায় সৎসঙ্গ এবং হরিচাঁদের মতুয়া সমাজকে কিন্তু আমার অনেক বেশি টেকসই মনে হচ্ছে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- যারাই বীর্যরক্ষার তাগিদে বিয়ে করে নি, সন্তানের জন্ম দেয় নি, তারাই আবার অন্যের বীর্যপাতের ফলে জন্ম নেওয়া মানুষদেরকে নিজেদেরে ভক্ত-অনুসারী বা শিষ্য বানাতে ব্যস্ত, তাদেরই আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বীর্যপাত যদি এত খারাপ হয় বা বীর্যপাত যদি পাপ হয়, তাহলে বীর্যপাতের ফলে জন্ম নেওয়া কোনো সন্তান কিভাবে পাপমুক্ত হয়, যে তাকে নিজেদের ভক্ত অনুরাগী বানানোর জন্য এত টানাটানি করতে হবে ?

বীর্যরক্ষার তাগিদে যাদের ঘুম হয় না, সেই সব মহারাজ-ব্রহ্মচারী-সাধু-সন্ন্যাসীরা বাস্তবে হিন্দু সমাজের ক্ষতি করে চলেছে- হিন্দু সমাজের জনসংখ্যা কমিয়ে এবং বীর্যরক্ষার নামে হিন্দু যুবকদেরকে সংসার থেকে দূরে রেখে। সমাজ টিকে থাকে জনসংখ্যার উপরে, আপনি যদি সেই সমাজকেই টিকিয়ে রাখতে কোনো ভূমিকা পালন না করেন, তাহলে আপনি কিভাবে সমাজের উন্নতি করলেন ? অখণ্ড ভারতের যে যে অংশে মুসলমানরা বর্তমানে নিজেদের শাসন কায়েম করেছে, সেটা তারা করেছে নিজেদের বীর্যকে কাজে লাগিয়ে সন্তানের জন্ম দিয়ে সেইসব সন্তানদের মাধ্যমে ঐসব এলাকার ভূমি দখল ক'রে; আর এদের বিপরীতে আমাদের হিন্দু ধর্মগুরুরা ব্যস্ত বীর্যরক্ষার নামে সন্তান জন্ম না দিতে ! হিন্দু সমাজ যদি কোনোদিন বিলুপ্ত হয়, এইসব নপুংসক মহারাজ-ব্রহ্মচারী-সাধু-সন্ন্যাসীদের আদর্শের কারণেই হবে।

আমি বাস্তব কথা বলি বলে- অনেকেরই আমার কথা ভালো লাগে না। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। বিনা পয়সায় প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতার জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছি, যা যে কাউকে ভালোভাবে রাখতে ও সুন্দরভাবে বাঁচাতে সক্ষম, যার ন্যূনতম বোধবুদ্ধি আছে, সে আমার কথাকে মেনে নিয়ে নিজের উপকার ঘটাবে, আর যার সেই ন্যূনতম বোধ বুদ্ধি নেই, সে ধ্বংস হবে; তাতে কার ই বা কী করার আছে ? এজন্যই বোধহয় শ্রীকৃষ্ণ গীতার একটি শ্লোকে অর্জুনকে বলেছিলো- আমার যা বলার তোমাকে বললাম, এখন তোমার যা ইচ্ছা হয় তা করো।

বাস্তবে বীর্যরক্ষার আন্দোলনকারীদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে বিয়ে থেকে দূরে রাখা। আর এটার চেয়ে ক্ষতিকারক কোনো বিষয় সমাজে নেই। কারণ, একজন পুরুষ বিয়ে না করলে একজন মেয়ের গতি হয় না, একটি পরিবার সৃষ্টি হয় না, যে পরিবার সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও কোনো পুরুষ বিয়ে না করলে তার বংশ বিলুপ্ত হয় এবং বংশের বিলুপ্তির মাধ্যমে সমাজের জনসংখ্যা কমে সমাজ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। তাই বীর্যরক্ষার আন্দোলনকারীদের কোনোরকম পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং এদেরকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই দমন করতে হবে; কারণ, এরা সমাজের ক্ষতি করছে। পরিণত বয়সে বীর্য রক্ষা নয়, বীর্যকে সঠিক পন্থাতে কাজে লাগালেই হয় বা হবে সমাজের প্রকৃত কল্যান।

জয় হিন্দ।

"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"- গীতার এই শ্লোকে আসলে কী বলা হয়েছে ?


"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"- গীতার এই শ্লোকে আসলে কী বলা হয়েছে ?

ফটোপোস্টে গীতার যে বানীটি উ্রল্লেখ করা হয়েছে, সেটা রয়েছে গীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ১১ নং শ্লোকে এবং এই শ্লোকটি হলো-

"যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।

মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।"

এবং এর অর্থ হলো- যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদেরক সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ, সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"

"সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।" এর আরও সরল মানে হচ্ছে মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যারা মানুষের মতো আচরণ করে বা করবে, তারা শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথ অনুসরণ করতে বাধ্য এবং সেই পথেই তারা শ্রীকৃ্ষ্ণকে লাভ করতে পারে বা পারবে।

এই শ্লোকটি নিয়ে আমার এক পাঠক বন্ধু যে প্রশ্নটি করেছে, তা তো ফটোপোস্টে দেখতেই পাচ্ছেন, তারপরও সেই প্রশ্নটি আমি আবারও উল্লেখ করছি-

"তাহলে পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্মের মানুষও কি তারই পথ অনুসরণ করে ?"

পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্ম বলে কিছু নেই, পৃথিবীতে ধর্ম একটাই আর সেটা হলো সনাতন ধর্ম, যাকে সনাতন মানব ধর্মও বলা হয়, যার বর্তমান প্রচলিত নাম হিন্দু ধর্ম। প্রচলিত ভাষায়- পৃথিবীতে ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, বৈষ্ণব ও জৈনসহ যে প্রায় ৪২০০ ধর্ম চালু আছে, এগুলো আসলে ধর্ম নয়, এগুলো ব্যক্তিগত মতবাদ; কারণ, কোনো না কোনো ব্যক্তির মতামতের উপর ভিত্তি করে এই থিয়োরিগুলো গড়ে উঠেছে। আর ব্যক্তিগত মতবাদকে ইংরেজিতে বলে ইজম (Ism), তাই Religion বলতে যা বোঝায়- তা ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, জৈনসহ প্রায় ৪২০০ ধর্মের একটিও নয়, রেলিজিয়ন বলতে বোঝায় শুধু একটি ধর্মকেই এবং সেটা সনাতন ধর্ম, যা আর্য ও সিন্ধু সভ্যতার মুনি ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, গীতায় বলা হয়েছে, "মনুষ্যগন সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।" এর সম্পূরক প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের মানুষ শ্রীকৃষ্ণের পথই অনুসরণ করে ?

একটু আগেই আমি বলেছি, পৃথিবীতে ধর্ম একটাই, আর সেটা হলো সনাতন, বাকিগুলো ইজম বা ব্যক্তিগত মত ও পথ। এই ব্যক্তিগত পথ বা মতের অনুসারীরা ধর্মের নামে যা বিশ্বাস ও পালন করে, সেটা মানুষের জীবন যাপনের জন্য সম্পূর্ণ নয়, তাই দৈনন্দিন জীবন যাপনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সনাতনের বিধি বিধান তারা পালন করতে বাধ্য। একটা উদাহরণ দিই- ইসলামে গান বাজনা করা ও শোনা নিষেধ, কিন্তু পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না যে গান বাজনা করতে বা শুনতে পছন্দ করে না, এককথায় টোটালি গান বাজনা শুনতে অপছন্দ করে এমন একজন মানুষও পৃথিবীতে নেই। এই গান বাজনা করা ও শোনা সনাতন ধর্মের অঙ্গ। কিন্তু ইসলামের কিছু অনুসারী আছে, যারা জঙ্গী বলে পরিচিত, তারা গান বাজনা শোনে না বা শুনতে চায় না, এমনকি অন্যেরা গান বাজনা করলে বা শুনলে সেটাও তারা সহ্য করতে পারে না, তাই তারা গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে আত্মঘাতী হামলা করে নিজেকে উড়িয়ে দেয় পরকালে আল্লার পতিতালয় বেহেশতে গিয়ে ৭২ হুরকে দোচার আশায়, মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্ম নিলেও এরা যে কোনোভাবেই মানুষ নয়, সেটা আপনারা আর একটু পরেই তথ্য প্রমানসহ বুঝতে পারবেন।

আজকের পোস্টের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, গীতায় যে বলা হয়েছে, মনুষ্যগন সর্বতোভাবে আমারই পথ অনুসরণ করে, তাহলে অন্যান্য ধর্মের মানুষও কি কৃষ্ণকে অনুসরণ করে ?- এই বিষয়টি।

সনাতন ছাড়া পৃথিবীতে যে অন্য কোনো ধর্ম নেই, সেটা তো একটু আগেই বললাম, এবার বুঝিয়ে বলছি যে পৃথিবীতে যারা মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবে তারা অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণের পথ অনুসর করে বা করতে বাধ্য।

হিন্দু শাস্ত্রের একটি বাণী হলো- 

"পরদ্রব্য লোষ্ট্রবৎ" 

অর্থাৎ, পরের সম্পদকে মাটির ঢেলা বিবেচনা করবে 

এবং 

“মাতৃবৎ পরদারেষু, কন্যাবৎ পরকন্যাষু” 

অর্থাৎ, পরের স্ত্রীকে নিজের মা এবং পরের কন্যাকে নিজের কন্যার মতো দেখবে।

-পৃথিবীতে নারী ও সম্পত্তি ই হলো সকল অপরাধের মূল, অন্যের অধিকারে থাকা এই দুটো বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ হিন্দু শাস্ত্রে একেবারে জিরো করে দেওয়া হয়েছে এবং এই দুটি বিষয় যারা মেনে চলে তারাই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে পরিচিত এবং এটাই আসলে মানুষের ধর্ম। যারা এই মানবধর্মকে মেনে চলে তারা শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথেই চলে এবং এই কথাই বলা হয়েছে গীতার ঐ শ্লোকে।

হিন্দু শাস্ত্র বলেছে, পরের সম্পদকে মাটির ঢেলা বিবেচনা করবে এবং পরের স্ত্রী ও কন্যাকে, নিজের মা ও নিজের কন্যার মতো দেখবে, কিন্তু এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে দেখূন-

"অতএব তোমরা যা কিছু ধন মাল লাভ করেছো, তা খাও, তা হালাল এবং তা পবিত্র।"- ( কোরান, ৮/৬৯)

-এখানে যুদ্ধলব্ধ ধন সম্পত্তির কথা বলা হয়েছে, ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলে গনিমতে মাল। এই গনিমতে মাল মানে পরাজিতদের যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং তাদের অধীনে থাকা নারী ও শিশু। মুসলমানদের সাথে যদি কখনো অমুসলিমদের যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে অমুসলিমরা পরাজিত হয়, তাহলে অমুসলিমদের যাবতীয় ধন সম্পদ এবং তাদের স্ত্রী কন্যাদেরকে মুসলমানরা দখল করে ভোগ করতে পারবে, সেই কথাই বলা হয়েছে কোরানের ঐ আয়াতে।

মুসলমানরা বর্তমানে কোরানে গনিমতের মালের কনসেপ্ট নিয়ে বিব্রত, তারা মুখে কখনো এই সব আয়াতের কথা তো বলেই না, পারলে কোরান থেকে ঐসব আয়াত ডিলিট করে দেয়, এই ধরণের মুসলমানরা বলতে পারে বা বলবে, কোরানের ঐ আয়াতে ধন সম্পত্তির সাথে যে নারীদের কথা বলা হয়েছে, তার প্রমান কী ? ওখানে কি নারীদের কথা উল্লেখ আছে ? এই ধরণের মুসলমানের মুখে শুয়োরের গু ভরে দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার জন্য দিলাম নিচের এই আয়াত-

"তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের উপর অধিকার অর্জন করেছে সেইরূপ নারী ব্যতীত অন্য কোনো সধবা নারী তোমাদের জন্য বৈধ নয়।"- (কোরান, ৪/২৪)

তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের উপর অধিকার অর্জন করেছে, এর মানে হলো যুদ্ধ করে যাদেরকে ধরে আনা হয়েছে, আর এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, "সেই নারী ব্যতীত", তার মানে যুদ্ধলব্ধ মালের মধ্যে নারীরাও থাকতো, এখানে তাদের কথা ই বলা হয়েছে।

এই হলো কোরান তথা ইসলামের বিধান, যেখানে স্পষ্টাক্ষরে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে অপরের স্ত্রী ও কন্যাকে ধর্ষণ করতে, এটা কোনো ঐশ্বরিক গ্রন্থ হতে পারে, না এটা কোনো ধর্ম হতে পারে ? আর যারা এই কোরান ও ইসলাম মেনে চলে তারা কি কখনো মানুষ হতে পারে ? নেভার, কখনো নয়। কোরান অনুসারে যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার মনোভাব পোষণ করে না এবং অমুসলিমদের ধন সম্পত্তিকে লুঠ করে খাওয়ার এবং অমুসলিমদের স্ত্রী ও কন্যাকে দখল করে ভোগ করার বা ধর্ষণ করার মানসিকতা পোষণ করে না, সে আসলে মুসলমানই নয়। এখন ভাবুন, এই যদি হয় মুসলমানের চরিত্র, তারা কিভাবে মানুষ হবে ? তারা কখনো মানুষ নয়, এই কারণে মুসলমানদেরকে কখনো আমি মানুষই মনে করি না, তারা মানুষের আকৃতিতে এক একটি হিংস্র, জংলী জানোয়ার। 

মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া যে ব্যক্তি, অমুসলিমদের ঘরে জন্ম নেওয়া কাউকে মানুষ হিসেবে মনে করে, অমুসলিমদের স্ত্রী ও কন্যাদেরকে নিজের মা ও কন্যার দৃষ্টিতে দেখে, ইসলামের সূত্র মতে, তারা মুসলমানই নয়; আর যারা মুসলমান নয়, তারাই মানুষ। পৃথিবীতে মানুষের আকৃতি নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রজাতি দুটি ভাগে বিভক্ত; এক. Human, দুই. Musolman, তাই যারা মুসলমান, তারা যেমন মানুষ নয়, তেমনি যারা মানুষ, তারা কখনো মুসলমান নয়। আর যারা মানুষ, তারা জন্মসূত্রে যে মতবাদে বিশ্বাসীর ঘরে জন্ম নিক না কেনো বা যে মতবাদেই বিশ্বাসী হোক না কেনো, তারা সনাতন মানব ধর্মের নির্দেশিত পথেই চলে এবং শ্রীকৃষ্ণকে লাভের পথে এগিয়ে যায়, যে কথা বলা হয়েছে গীতার ঐ শ্লোকে এভাবে- 

"হে পার্থ, সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।"

এই বিষয়টি বুঝতে হলে, এটা খুব ভালো করে বুঝতে হবে যে, মানুষের আকৃতিতে জন্ম নেওয়া যে সব প্রাণী- অপরের সম্পদ এবং অপরের স্ত্রী কন্যার দিকে নজর দেয় না, তারাই আসলে মানুষ; আর যারা এর বিপরীত কাজ করে তারা অমানুষ। গীতার এই শ্লোকে এই সব মানুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, মুসলমান নামের ইসলামী জঙ্গী জানোয়ার অমানুষদের সম্পর্কে নয় এবং মানবতার সূত্র অনুযায়ী যারা মানূষ, তারা জ্ঞাতে হোক বা অজ্ঞাতে হোক, অবশ্যই সনাতন ধর্মের বিধি বিধান মেনে চলে শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশিত পথেই চলেছে এবং এভাবে তারা আস্তে আস্তে শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

আশা করছি, আমি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে গীতার ৪/১১ নং শ্লোকটির সঠিক বক্তব্যটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 24 September 2020

রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?


রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থে প্রশ্ন করেছেন- এই রাধা আসিলেন কোথা হইতে, আর আমি আজকে প্রশ্ন করছি- রাধার নাম আসিল কোথা হইতে ?

#Rayon_Chakrabarty নামে এক বইপোকা আছে, যার কাজ শুধু বই পড়ে পড়ে কোন বইয়ে কোন তথ্য আছে, সেটা প্রকাশ করা; অবশ্য এটা একদিক থেকে ভালো দিক যে- বিভিন্ন তথ্য যেহেতু সে প্রকাশ করে, সেহেতু বিষয়গুলো অনেকে জানতে পারে এবং সেগুলো নিয়ে নানারকম আলোচনা হয় ও লোকজন প্রকৃত সত্যের দিকে ধাবিত হতে পারে। কিন্তু এই বইপোকার সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা কম বা বলতে গেলে একেবারেই নেই। সে, যে গ্রন্থে যে তথ্য পায়, সেটাকেই সে সত্য মনে করে এবং সেটাকেই প্রচার করে, সেই তথ্য দ্বারা সমাজের উপকার হচ্ছে, না অপকার হচ্ছে, সেটা তার দেখার বিষয় নয়, তার ভিডিওগুলো দেখলে আমার এই কথা ই মনে হয়। এই বই পোকা আবার অনূকূল ঠাকুরের ভক্ত বা অনুসারী, যে অনুকূলকে তার ভক্ত শিষ্যরা পূর্ণব্রহ্ম বলে মনে করে, যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন; জগতে পূর্ণব্রহ্ম একজনই, তিনি হলেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, অন্য কারো পূর্ণব্রহ্ম হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই; কারণ, পূর্ণব্রহ্ম হওয়ার জন্য যে ক্ষমতা থাকতে হয়, সেটা শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কারো কাছে ছিলো না এবং কারো মধ্যে সেটা থাকাও সম্ভব নয়। কিন্তু এ নিয়ে এই বইপোকাকে কখনো কিছু বলতে শুনি নি, আর এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে যে তার জ্ঞান বুদ্ধি সবকিছু অর্থহীন।

শ্রীকৃষ্ণের যে প্রামাণ্য জীবনী- হরিবংশ এবং মহাভারত, সেখানে রাধার নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি হরিবংশ এবং মহাভারত একে অপরের পরিপূরক গ্রন্থ, শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে যে তথ্য হরিবংশে আছে, সেটা মহাভারতে নেই, আবার মহাভারতে যে তথ্য আছে, সেটা হরিবংশে নেই। এজন্য হরিবংশে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে বাল্যলীলার সবকিছু আছে, কিন্তু মহাভারতে আছে তার বাল্য ও কৈশোর লীলার পরবর্তী ঘটনাগুলো।

কোনো নারী যদি কোনো ব্যক্তির জীবনে থেকে থাকে, আর সেই ব্যক্তিকে নিয়ে যদি একাধিক গ্রন্থ থাকে, তাহলে বিভিন্ন গ্রন্থে সেই নারীর কাহিনী থাকবে, এককথায় ঐ নারীকে নিয়ে ঐ ব্যক্তির জীবনে অনেক বাস্তব ঘটনা থাকবে, যেটা প্রমাণ করবে যে -ঐ ব্যক্তির জীবনে ঐ নারীর অস্তিত্ব ছিলো। কিন্তু কৃষ্ণের জীবনে রাধাকে নিয়ে এমন কোনো ঘটনা বাস্তবিক আকারে নেই, যেটা প্রমাণ করে যে কৃষ্ণের জীবনে রাধা নামক কোনো নারীর অস্তিত্ব ছিলো, যার সাথে কৃষ্ণের প্রেম ভালোবাসা বা যৌনতার সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু এই বইপোকা সে সব বিষয় বিবেচনা না ক'রে কোথায় কোথায় রাধার নাম আছে, সেসব তথ্য তুলে ধরে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে- শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব আছে। এ সম্পর্কে একটি ভিডিও সে নেটে ছেড়েছে, তার লিঙ্ক এই প্রবন্ধের সাথে যুক্ত করে দিয়েছি, প্রয়োজনে সেটা দেখে নিতে পারেন, তার ভিডিওতে সে যেসব তথ্য দিয়েছে, সেগুলো আমি খণ্ডন করবো আজকের এ প্রবন্ধে-

আমি একটা কথা প্রায়ই বলি যে- গীতার সাতশত শ্লোক ছাড়া সনাতনী ধর্মীয় প্রায় সমস্ত গ্রন্থ কোনো না কোনোভাবে বিকৃত এবং কোনো কোনো গ্রন্থ তো অর্বাচীনদের দ্বারা লিখিত হয়ে সনাতন ধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত লাভ করে ফেলেছে, তাই এই সব গ্রন্থের কোনো একটির তথ্যের ভিত্তিতে কোনোভাবেই কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না; কোনো একটি গ্রন্থের তথ্যকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার আগে, পূর্বাপর সমস্ত তথ্যকে যাচাই বাছাই করে অর্থাৎ ক্রস চেক করে দেখতে হবে যে ঐ তথ্যটি সত্যই সঠিক কি না, তারপর সেটাকে গ্রহন করতে হবে।

বর্তমানে বৈষ্ণব মতবাদের গ্রন্থ ছাড়া প্রায় সমস্ত সনাতনী গ্রন্থ বেদব্যাসের নামে চলে, যেটা মোটেই সত্য নয়। ভাগবতে যে বলা হয়েছে অষ্টাদশ পুরাণ বেদব্যাস রচিত, সেটাও সত্য নয়। কারণ, অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের নামও আছে, কিন্তু কোনোভাবেই ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের মতো একটি- উদ্ভট, অবাস্তব ও অশ্লীল কাহিনীর বর্ণনা সমৃদ্ধ পুরাণ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ সম্পূর্ণ লম্পট চরিত্র, যে বেদব্যাসের হাতে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর হিসেবে বর্ণিত, সেই বেদব্যাসের হাতে এই পুরাণ কিছুতেই রচিত হতে পারে না। এই ভাগবতেই গৌতমবুদ্ধকে অবতার বলা হয়েছে, যে গৌতমবুদ্ধের জন্ম, বেদব্যাসের অন্তত ২৭০০ বছর পর, তাহলে সেই ভাগবত কিভাবে বেদব্যাসের হাতে রচিত হয়। তাছাড়াও এমন কাহিনি প্রচলিত আছে যে- ভাগবত রচনা ক'রে বেদব্যাস, তার পুত্র শুকদেবকে শোনান; শুকদেব, রাজা পরীক্ষিতকে শোনান, কিন্তু মহাভারতের একটি তথ্যে আছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগেই শুকদেব মারা গেছে, তাহলে সেই শুকদেব কিভাবে পরীক্ষিতকে ভাগবতের কাহিনী শোনায় ?

এই ভাগবতেই আছে রাসের নামে কৃষ্ণের যৌণলীলার কাহিনী, কিন্তু রাসের সময় কৃষ্ণের বয়স ছিলো মাত্র ৭ বা আট বছর, এই বয়সী একটি শিশু কিভাবে যুবতী নারীদের সাথে যৌণক্রিয়া করতে পারে, বা তার মাথায় এই ধরণের চিন্তা আসতে পারে ? যদি বলেন যে ঈশ্বরের পক্ষে সবই সম্ভব আর তার যৌণতার খুবই প্রয়োজন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ, ২৯ বছর বয়সে রুক্মিণীকে বিয়ে করতেন না, অনেক আগেই করতেন, আর তখন রুক্মিণীকে না পেলে, যদি রাধার সাথে শ্রীকৃষ্ণের কোনো সম্পর্ক থাকতো, তাহলে রাধাকেই বিয়ে করতেন; আর অবতারগণ এসেছিলেন যেহেতু লোকশিক্ষা দিতে, সেহেতু তারা এমন কোনো আদর্শ সৃষ্টি করবেন না, যে আদর্শের উদাহরণে তারা লম্পট হিসেবে আখ্যায়িত হবেন। তাই বিভিন্ন গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের জীবনে যেসব যৌনক্রিয়া বা লাম্পট্যের ঘটনা আছে, সেগুলো যে সত্য নয়, এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এসব সনাতনধর্ম ও কৃষ্ণ বিরোধীদের মিথ্যা প্রচারণার অংশ মাত্র।

যা হোক, এই বই পোকা, রাধার অস্তিত্ব বা কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণে যেসব রেফারেন্স দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো- নারায়ণ গীতি স্তোত্রের ১০ নং শ্লোক, সেখানে বলা হয়েছে-

"রাধাধর মধু রসিকা রজনী-কর-কূল-তিলকাঃ।

নারায়ণ নারায়ণ জয় গোবিন্দ হরে।

নারায়ণ নারায়ণ জয় গোপাল হরে।"

এটা কোনো সংস্কৃত শ্লোক নয়, এটি সম্পূর্ণ বাংলা শ্লোক, যা বৈষ্ণবদের দ্বারা রচিত, যে বৈষ্ণবদের কোনো কথাকে বিশ্বাস করা যায় না, এরা সনাতন ধর্মের সমস্ত সিস্টেমকে ধ্বংস করেছে, করছে।

এরপর ঐ যুক্তিহীন বই পোকা, সৌভাগ্যলক্ষ্মী তন্ত্র ১৩/৩ এর একটি রেফারেন্স দিয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয়েছে রাধানাথ। নাথ মানে স্বামী, তাই রাধানাথ মানে রাধার স্বামী। কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ছাড়া অন্য কোথাও বলা হয় নি যে শ্রীকৃষ্ণ রাধার স্বামী, আর আগেই বলেছি- ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বেদব্যাসের হাতে রচিত নয়, তাই এই তথ্য সম্বলিত সৌভাগ্যলকক্ষ্মী তন্ত্রের তথ্য যে মনগড়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এরপর মৎস্য পুরাণ ১৩/৩৮ এর একটি রেফারেন্স দিয়ে স্থূলচিন্তক এই বই পোকা বলেছে- "গঙ্গাপারে রতিপ্রিয়া, শিবকুণ্ডে শিবানন্দা, দেবিকাতটে নন্দিনী, দ্বারবতীতে রুক্মিণী, বৃন্দাবনে রাধা, মথুরায় দেবকী।"

-কিন্তু এই সকল নারী কি কৃষ্ণের সঙ্গিনী বা শয্যা সঙ্গিনী ? যদি তাই হয় তাহলে যে বলা হয়েছে মথুরায় দেবকী, তাহলে কি দেবকীও কৃষ্ণের শয্যা সঙ্গিনী ? নিশ্চয় নয়; কারণ, দেবকী হলেন শ্রীকৃষ্ণের জন্মদাত্রী মা। তাহলে নিশ্চয় এই শ্লোকটি দিয়ে যেসব নারীর কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে দিয়ে কৃষ্ণের শয্যাসঙ্গিনীর কথা বলা হয় নি, কোন নারী কোথায় ছিলো, সেটা বোঝাতে এই শ্লোকটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূত্রে রাধা যে বৃন্দাবনে ছিলো, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। কৃষ্ণের ছোটবেলার সঙ্গী সাথীদের মধ্যে যে রাধা বলে একজন ছিলো, সেটা তো আমি অস্বীকার করি না, আমি যেটা অস্বীকার করি, সেটা হলো যুবক কৃষ্ণের সাথে যুবতী রাধার যে প্রেম-ভালোবাসার কথা বলা হয়, সেটা। মৎস্যপুরাণের এই শ্লোকটি কি রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম ভালোবাসাকে প্রমাণ করে ? কোথাও রাধার নাম থাকলেই যে সেটা কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে, ব্যাপারটা তো এমনও নয়।

এরপর রায়ণের দেওয়া একটি রেফারেন্স হলো- অচ্যুতাষ্টকম এর ৪ নং শ্লোক, যেখানে বলা আছে, "দেবকীতনয় দুঃখদবাগ্নে, রাধিকারমণ রম্য-সুমূর্ত্তে।"

-এই গ্রন্থটি কার লেখা ? এটি কি বেদব্যাস রচিত ? কমা (,) এবং হাইফেন (-) দ্বারা লিখিত শ্লোকটি যে আধুনিক যুগে কারো দ্বারা রচিত, সেটা নিয়ে কি আর বেশি কিছু বলার দরকার আছে ? প্রাচীন বাংলা বা সংস্কৃত ভাষায় কমা, হাইফেন বলে কিছু ছিলো না, এগুলো গদ্য লিখার সুবিধার্থে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ইংরেজি থেকে ধার করেন। এই সব বিরামচিহ্ন সহযোগে লিখিত শ্লোকে রাধিকারমণ শব্দ ব্যবহার করে শ্রীকৃষ্ণকে রাধার সেক্স পার্টনার প্রমাণ করা চেষ্টা করা হয়েছে, এই সব রচনার উদ্দেশ্য কী ? রায়ণ তার ভিডিওর এক স্থানে বলেছে, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ব্রহ্মার পৌরহিত্যে রাধা ও কৃষ্ণের বিয়ে হয়েছে, তাহলে তাদের মধ্যে যৌনসম্পর্ক হলে সমস্যা কী ? 

আমার ধারণা, রায়ণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ঠিকমতো পড়ে নি, পড়লে জানতো পারতো যে, যখন রাধা ও কৃষ্ণের বিয়ে দেখানো হয়েছে ঐ পুরাণে, তার অনেক আগে থেকে রাধা ও কৃষ্ণের যৌনতার কথা বলা হয়েছে, নিশ্চয় বিয়ের আগে যৌনতা ভালো কোনো বিষয় বা ভালো কোনো উদাহরণ নয় মানুষের জন্য, যেহেতু কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিলো লোকশিক্ষা দিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর রাধার সাথে যদি কৃষ্ণের বিবাহই হয়, তাহলে সেটা হরিবংশে বা মহাভারতে উল্লেখ নেই কেনো ? বিয়ে কোনো মানুষের জীবনে সাধারণ ঘটনা নয়, ভীষণ উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা, যে ঘটনা মানুষের সারাজীবনে নানাভাবে প্রভাব ফেলে, সেই বিয়ের ঘটনা, কৃষ্ণের উল্লেখযোগ্য দুটি জীবনীর একটিতেও নেই, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক ? এর চেয়েও এখানে বড় প্রশ্ন হলো- কৃষ্ণ, ১০+ বছর বয়সে বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় চলে যান, পরে আর কোনো দিন বৃন্দাবনে ফিরে যান নি, রাধারও বৃন্দাবনের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে, যুবক কৃষ্ণের সাথে যুবতী রাধার দেখা হয়েছিলো কখন, আর তাদের মধ্যে প্রেম বা বিয়েও হয়েছিলো কখন ? আগেই বলেছি, বিয়ে কোনো মানুষের জীবনে সাধারণ ঘটনা নয়, বলরামের সাথে রেবতীর এবং কৃষ্ণের সাথে রুক্মিনীর বিয়ে মহাধুমধামে সকল আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে হয়েছিলো, রাধা ও কৃষ্ণের বিয়েতে কে কে উপস্থিত ছিলো ? কে কন্যাদান করেছিলো ? শুধু হুট করে একটি কথা বললেই হয় না, সেই কথার সাপেক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রমাণও থাকতে হয়। আর যেটা বাস্তব ঘটনা তার সাপেক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রমাণ থাকেও। রাধার সাথে কৃষ্ণের বিয়ের ঘটনা যেহেতু বাস্তব নয়, তাই একটি উদ্ভট ও অশ্লীল পুরাণ ব্যতীত, তার স্বপক্ষে কোথাও কোনো যুক্তি বা বাস্তব ঘটনার প্রমাণ নেই।

এরপর রাধাতন্ত্র এর ১৬/৭ নং শ্লোকের রেফারেন্স রায়ণ দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, "রাধিকা কৃষ্ণ বল্লভা"

-যেখানে হরিবংশ এবং মহাভারতে রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম বিবাহ যৌনতার বিষয়ে কিছু বলা হয় নি, এমনকি গৌতমবুদ্ধের জন্মের পর রচিত ভাগবতেও রাধা সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই; কারণ, ঐ সময় রাধার কাল্পনিক কাহিনীর ডালপালাগুলো মেলে নি, সেখানে রাধাতন্ত্র নামে এই গ্রন্থটি কে রচনা করলো, এটি কার হতে রচিত হলো ? রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রেম বিবাহ যৌনতার কথা প্রথম পাওয়া যায় ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে, বিশেষজ্ঞদের মতে যেটা কোনোভাবেই ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের আগের রচিত নয়, যার কাহিনীর উপর ভিত্তি করে সংস্কৃত কবি জয়দেব রচনা করে গীত গোবিন্দ, বাংলা কবি বড়ুচণ্ডীদাস লিখে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, আর চৈতন্য পূর্ববর্তী মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবিরা লিখে বৈষ্ণব পদাবলী, সুতরাং কৃষ্ণের সাথে রাধার নাম জড়িয়ে লেখা রাধাতন্ত্র যে চৈতন্যপন্থীদের হাতে রচিত, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে ? আর চৈতন্যপন্থীরা তো বরাবরই মূর্খ, এরা প্রকৃত সত্যকে ধরতে পারে না, আর প্রকৃত সত্যকে বোঝেও না। এজন্যই তো এরা হরিবাসর বা হরিসভার নামে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সম্পর্কিত লীলাকীর্তনের প্রচার করে হিন্দুসমাজটাকে রসাতলে নিয় গেছে, যাচ্ছে। এদের হাতে রচিত গ্রন্থ দ্বারা আপনি কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, আপনার জ্ঞান বুদ্ধি বা সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা যে কতটুকু, সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন ?

এরপর যমুনাষ্টকস্তোত্র ৬ নং শ্লোকের রেফারেন্স দিয়ে "রাধিকাঙ্গ" শব্দ দ্বারা আপনি রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতেই কি প্রমাণ হয় যে- শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধা আছে ?

এরপর গর্গসংহিতা দ্বারকাখণ্ড ১৭/১৮ শ্লোকের রেফারেন্স দিয়ে রায়ণ দেখিয়েছে-

"রুক্মিণী কহিলেন, হে বৃষভানুনন্দিনী রাধে! তুমি ধন্যা, তোমার ভক্তিভাবে এই কৃষ্ণ বশীভূত হইয়াছেন। যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে, সেই কৃষ্ণ তোমারই কথা সর্বদা কহিয়া থাকেন।"

-এখন বাস্তবতার দৃষ্টিতে এই দৃশ্যটির কথা কল্পনা করুন। যদি কোনো পুরুষ সব সময় কোনো নারীর কথা ভাবে, তার কথা বলে, তাহলে এটাই প্রমাণ হয় যে, সেই পুরুষ, সেই নারীর প্রেমে উন্মত্ত। এই ধরণের কোনো পুরুষের প্রতি, তার স্ত্রীর প্রেম-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-ভক্তি কিছুই থাকতে পারে না। সেই নারী, সব সময় তার স্বামীকে নিয়ে বিরক্তিতে থাকবে, স্বামীর সাথে ঝগড়াঝাটি করবে, প্রয়োজনে মারপিটও করবে, যেহেতু তার স্বামী তাকে ছাড়া অন্য নারীকে নিয়ে ভাবছে, তার কথা বলছে। এই পরিস্থিতিতে সেই নারী কি, তার স্বামীর গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে এই ধরণের কথা বলতে পারে যে- তুমি ধন্যা, তোমার প্রেমে আমার স্বামী বশ হয়েছে ? 

পৃথিবীর এমন কোনো নারী নেই যে, তার প্রেমিকের স্ত্রীর সাথে নিজে গিয়ে দেখা করার সাহস রাখে। এসব ক্ষেত্রে স্বামীর লুচ্চামি টের পেলে, স্ত্রীরাই খোঁজ নিয়ে তার স্বামীর প্রেমিকার সাথে দেখা করে তাকে সাইজ করে, তার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না, আর বলে না যে- তুমি ধন্যা। বরং এমন কথা বলে যে, তুই যদি আমার স্বামীর দিকে নজর দিস, তোর চোখ আমি তুলে নেবো, আর যদি আমার স্বামীর দিকে দিকে হাত বাড়াস তোর হাত আমি ভেঙ্গে ফেলবো বা কেটে নেবো। এছাড়াও কৃষ্ণ যদি সব সময় রাধার কথাই ভাবে, রাধার কথাই বলে থাকে, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মীদের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার ভাবনা ভেবেছে কখন, আর তার জন্য কাজ করেছে কখন, এটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে- শ্রীকৃষ্ণের পৃথিবীতে অবতরণের উদ্দেশ্যই হলো দৃষ্কুতকারীদেরকে বিনাশ করে, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা, প্রেম করা নয়।

আচ্ছা, যদি ধরেও নিই যে গর্গসংহিতার বর্ণনাটি সত্য, তাহলে এটা প্রমাণ হয়ে যে- নিজের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও রাধার দিকে মন দেওয়ায় কৃষ্ণ লম্পট। তো ঘটনাটি সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, গর্গসংহিতার রেফারেন্স টেনে এনে আপনি কি কৃষ্ণকে লম্পট প্রমাণ করতে চাইছেন না ? যদি তাই হয়, সনাতন ধর্ম ও সমাজের ব্যাপারে আপনার উদ্দেশ্য কি সৎ ? আপনার পিতার জীবনে যদি কোনো নারী কেলেঙ্কারী থাকে, সেটাকে আপনার চাপা দেওয়া উচিত, না প্রকাশ করা উচিত ? আর যদি আপনার পিতার জীবনে কোনো নারী কেলেঙ্কারী না থাকে, কিন্তু কেউ যদি সেরকম কোনো কথা বলে, তাহলে আপনার কী করা উচিত ? তাকে দমন করা, না তার প্রশংসা করা ? যদি আপনি আপনার পিতার আদর্শ পুত্র হন, আপনি চেষ্টা করবেন জন মানসে আপনার পিতার একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে, যদি কোনো স্ক্যান্ডাল তার জীবনে থেকে থাকে, সেগুলোকে চাপা দিতে। আর এর বিপরীত কিছু করে যদি আপনি আপনার পিতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন, তাহলে আপনি আদর্শ পুত্র নয়, আপনি কুলাঙ্গার। 

শ্রীকৃষ্ণ হলেন এই জগতের পিতা, সেই কৃষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণের অপচেষ্টা করতে গিয়ে গর্গসংহিতার রেফারেন্স তুলে ধরে আপনি কি সেই কুলাঙ্গার পুত্রের ভূমিকা পালন করেন নি বা করছেন না ?

এছাড়াও রুক্মিণী যদি বলে থাকেন- "যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে", এটা শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাবের বহু পরে মোটামুটি আধুনিক যুগের কথা হতে পারে, কোনোভাবেই শ্রীকৃষ্ণের যৌবন কালের কথা নয়; কারণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বপর্যন্ত অখণ্ডভারতের বেশির ভাগ মানুষ শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান বা ঈশ্বর মনে করতো না, তাই যে কৌরবদের এত কুকীর্তি দেশজুড়ে পরিচিত ছিলো, সেই কৌরবপক্ষে দেশের অধিকাংশ রাজা যোগ দিয়েছিলো, যার ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নেওয়া মোট ১৮ অক্ষৌহিনী সৈন্যের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে ছিলো মাত্র ৭ অক্ষৌহিনী সৈন্য। বর্তমানেও যেখানে প্রায় সব হিন্দু বিশ্বাস করে যে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর, তারপরও পৃথিবীর প্রায় ৮০% মানুষ শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করে না। আর সেই সময় শ্রীকৃষ্ণের যখন যৌবন কাল, তখন রুক্মিণী এই কথা বলতে পারেন না যে- যে কৃষ্ণের কথা ত্রিলোকবাসী সর্বদা কীর্তন করে! কারণ, মর্ত্যের তখন অর্ধেক লোকও কৃষ্ণের কথা কীর্তন করতো না। এই তথ্য থেকে এটা প্রমাণ হয় যে, হয় গর্গসংহিতাকে বিকৃত করে রুক্মিণী ও রাধা সংক্রান্ত এই কথাগুলো চৈতন্য আন্দোলনের পর ঢুকানো হয়েছে, না হয় গর্গসংহিতা নাম দিয়ে কোনো চৈতন্যপন্থী এই গ্রন্থ রচনা করে তাকে সনাতনী শাস্ত্র বলে চালিয়ে দিয়েছে।

যা হোক- এইসব চুলচেরা বিশ্লেষণে, বাস্তবতার নিরীখে, গর্গসংহিতার এই বর্ণনাটি যে কোনোভাবেই সত্য হতে পারে না, এটি প্রমাণিত, তাই এর কোনো মূল্য নেই।

এরপর নারদপাঞ্চরাত্র-২/৩/৫০,৫১ তে বলা হয়েছে,

"রাধিকার উপাখ্যান অপূর্ব, গোপনীয়, সুদুর্লভ, সদ্যোমুক্তিপ্রদ, পবিত্র, বেদের সারভূত ও পুণ্যপ্রদ।"

-তো রাধিকার উপাখ্যান মানেই তো ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বর্ণিত রাধা ও কৃষ্ণের অবৈধ, অনৈতিক, পরকীয়া প্রেম ও যৌনতা; কারণ, উভয়েরই স্বামী ও স্ত্রী আছে, চটিগল্প হিসেবে এটা অবশ্যই অপূর্ব, গোপনীয় নয় মোটেই, সুদুর্লভও নয়, সদ্যমুক্তিপ্রদ কিভাবে হতে পারে, সেটা আমার বোধের অতীত, আর এটা যদি পবিত্র হয়, পৃথিবীতে অপবিত্র সম্পর্ক বলে কিছু নাই; আর এটা যদি পূণ্যপ্রদ হয়, তাহলে পৃথিবীতে পাপ বলেও আর কিছু নাই; এছাড়াও এটা যদি বেদের সারভূত হয়, তাহলে বেদে রাধা ও কৃষ্ণ সম্পর্কিত কোনো উপাখ্যান পর্যন্ত নেই কেনো? বেদে শ্রীকৃষ্ণের নাম পর্যন্ত নেই, এক স্থানে কৃষ্ণ শব্দটি আছে, কিন্তু সেটা কোনো একজন ঋষির নাম হিসেবে, পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ হিসেবে নয়। আবার বেদে কয়েক জায়গায় অবশ্য- রাধা, রাধস টাইপের কিছু শব্দ আছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো দিয়ে কোনো মানবীকে বোঝায় না, বোঝায় ধন সম্পদ, তাই রাধার ভক্তরা বেদের সেই শব্দের কথা বলে আবার রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না, তাহলে আপনাদের মুখ কিন্তু কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

যা হোক, নারদপাঞ্চরাত্র নামের এই বালছাল কে লিখেছে ? যেখানে শিবের মুখ দিয়ে কৃষ্ণের কাল্পনিক লাম্পট্যকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে কৃষ্ণের চরিত্রকে কলুষিত করার অপচেষ্টা করেছে ? শ্রীকৃষ্ণ যেখানে ঈশ্বর হিসেবে সনাতনধর্মীয় গ্রন্থে প্রমাণিত, সেখানে এই সব বাল ছাল লিখে কি শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে কলঙ্কিত করা যাবে, আর সেগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে ? এগুলোকে বিশ্বাস করতে পারে রায়ণের মতো স্থিরবুদ্ধির কিছু লোকজন, যাদের সত্য মিথ্যা বোঝার কোনো ক্ষমতা নেই, বইয়ে যা পড়ে সেটাকেই সত্য বলে ধরে নিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করে।

এরপর পদ্মপুরাণ পাতাল খণ্ড ৩৮/১২০ এ বলা হয়েছে-

"তাঁহার প্রিয়তমা কৃষ্ণবল্লভা রাধিকাই আদ্যা প্রকৃতি। সেই রাধিকার কোটি কোটি কলাংশ হইতেই ত্রিগুণময়ী দুর্গা প্রভৃতি দেবীগণের উৎপত্তি। ঐ রাধিকার পাদধূলি স্পর্শে কোটি বিষ্ণুর উৎপত্তি হইয়া থাকে।"

পদ্মপুরাণের এই শ্লোকগুলো যিনি লিখেছেন, হয় তার সনাতনধর্মীয় দেবতত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা ছিলো না, নয় তো ইচ্ছে করেই রাধাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে এই বিকৃতি তিনি ঘটিয়েছেন। সাধারণভাবেই আমরা জানি যে- আদ্যাশক্তি হলেন মহামায়া, যিনি দেবীদুর্গা, যার আরেক রূপের নাম মহাকালী। সৃষ্টির মূল হলেন বিষ্ণু, বিষ্ণুর ধ্বংসকারী রূপের নাম শিব এবং শিবের নারী শক্তি হলেন দুর্গা বা কালী যিনি মহামায়া নামে পরিচিতা, যাকে বলা হয় আদ্যাশক্তি। পদ্মপুরাণের এই শ্লোকে রাধাকে আদ্যাশক্তি বানিয়ে তার কোটি কোটি কলাংশ হতে দেবীগণের উৎপত্তি দেখানো হয়েছে এবং রাধিকার পাদধূলি থেকেই নাকি কোটির বিষ্ণুর উৎপত্তি হয়েছে। তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে- রাধিকার পাদধূলি থেকে যদি কোটি বিষ্ণুর উৎপত্তি হয়, তাহলে আমরা তো এক বিষ্ণুকে চিনি বা জানি, অন্য বিষ্ণুগণ কোথায়, কী করছে ? আর আদ্যাশক্তি শব্দটির দিকে খেয়াল করুন, এর মধ্যে শক্তির একটি ব্যাপার আছে, যে শক্তির পরিচয় আমরা দুর্গা বা কালীর মধ্যে দেখতে পাই, রাধার মধ্যে কি সেই শক্তির কোনো ব্যাপার আছে ? যদি না থাকে তাহল তাকে আদ্যাশক্তি বলা হচ্ছে কেনো ?

শ্রীকৃষ্ণের এক লীলায়- ব্রহ্মা একবার, শ্রীকৃষ্ণের সকল সঙ্গী সাথীকে ঘুমে অচেতন করে চুরি করে নিয়ে যায়। এটা বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণ একাই তার সকল সঙ্গী সাথীতে রূপান্তরিত হয়ে সব জায়গায় বিরাজ করতে থাকে, এভাবে এক বছর কেটে গেলে ব্রহ্মা বৃন্দাবনে এসে দেখে শ্রীকৃ্ষ্ণ আগের মতোই সে তার সঙ্গী সাথী দেরকে নিয়ে খেলাধূলা করছে। এটা দেখে ব্রহ্মা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে এটা কিভাবে সম্ভব ? ব্রহ্মার উপস্থিতিতেই হাজার হাজার ব্রহ্মা চারদিক থেকে আসতে থাকে, এটা দেখে আরও অবাক হয়ে ব্রহ্মা বলে- আমিই তো ব্রহ্মা, তাহলে এত সব ব্রহ্মা কোথা থেকে আসছে ?

এরপর শ্রীকৃষ্ণ, নিজেকে বিষ্ণুতে পরিণত করে বলে- চতুর্মুখী ব্রহ্মা, তুমি তো কেবল একটি ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা, কিন্তু এই সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে, যাদের রচয়িতারা তোমার থেকেও বহুগুণ বেশি জ্ঞানী ও শক্তিশালী, আর তারা সবাই আমার অধীনস্থ, আমার নির্দেশেই তারা কাজ করে এবং আমিই সেই সবগুলো ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক; আজ তোমার অবস্থান তোমাকে বোঝানোর জন্য সেই সকল ব্রহ্মাকে এখানে আহ্বান করেছি, যাদেরকে তুমি তোমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছো। এরপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের নিকট ক্ষমা নিয়ে ফিরে যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের খেলার সঙ্গীসাথীদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেরত দিয়ে যায়।

এছাড়াও গীতার ৯/১৭ তে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ।

যার অর্থ : আমিই এই জগতের পিতা মাতা, বিধাতা ও পিতামহ।

গীতার এই বাণী এবং শ্রীকৃষ্ণের ঐ লীলা থেকে বোঝা যায়, শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণুই এই মহাবিশ্বের মূল, তিনিই সবার সৃষ্টিকর্তা বা নিয়ন্তা। অথচ পদ্মপুরাণ মতে- এই বিষ্ণুর মতো কোটিকোটি বিষ্ণু নাকি রাধিকার পাদধূলি থেকে উৎপন্ন ! স্বল্পমাত্রা গাঁজা অবশ্যই উপকারী, কিন্তু বেশি মাত্রা গাঁজা এই রকম অসম্ভব এবং অবাস্তব সব কল্পনার জন্ম দিয়ে থাকে, যার জন্য বলা হয়- গাঁজার নৌকা পাহাড় বাইয়া যায়। পদ্মপুরাণের লেখক বা এর বিকৃতকারীরা নিশ্চয় অধিক মাত্রায় গাঁজা সেবনে অভ্যস্ত ছিলেন। না হলে যে বিষ্ণু সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক, সেই রকম কোটি কোটি বিষ্ণুর জন্মদাতা রাধা, এক কৃষ্ণের সাথে মিলনের ক্ষমতা রাখে না, তাকে সারাজীবন ধরে কৃষ্ণ বিরহে পুড়তে হয় ? ব্যাপারটা এমন- হাজার হাজার মন চাউলের মালিক সারা বছর ধরে এক প্লেট ভাতের জন্য ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই সে সেটা পাচ্ছে না, ব্যাপারটি বাস্তব ? এই ব্যাপার যদি বাস্তব না হয়, তাহলে রাধার পাদধূলি থেকে কোটি কোটি না হোক, অন্তত একজন বিষ্ণুর উৎপত্তিও সম্পূর্ণ অবাস্তব, সেই সাথে অবাস্তব রাধার কোটি কোটি কলাংশ হতে দেবীগণের উৎপত্তির বিষয়টিও। এবং এসব কারণেই পদ্মপুরাণের ঐ শ্লোকের বক্তব্য সম্পূর্ণ- মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং অবাস্তব; যাকে রায়ণের মতো বইপোকারা বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু যুক্তিবাদীদের পক্ষে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

এরপর স্কন্দপুরাণ, প্রভাষখণ্ড, দ্বারকামহাত্ম্য- ১২/৩০ নং শ্লোকে "রাধোবাচ" শব্দ দ্বারা রায়ণ রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, যদিও এতে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, কিন্তু তাতেই কি শ্রীকৃষ্ণের পাশে বা শ্রীকৃ্ষ্ণের জীবনে রাধার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় ?

এরপর স্কন্ধপুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, শ্রীভাগবত মাহাত্ম্য ২/১১ এর রেফারেন্সে বলা হয়েছে- "কালিন্দী বলিলেন- আত্মারাম কৃষ্ণের আত্মা রাধিকা, আমি তাঁহার দাসী, তাঁহার দাস্য প্রভাবেই কাতরতা আমাকে স্পর্শ করিতে অসমর্থ।"

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে এই কালিন্দী শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত প্রধান ৮ স্ত্রীর একজন, আমি কৃষ্ণের জীবনে রুক্মিণী ছাড়া অন্য কোনো নারীকে স্বীকার করি না, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে কালিন্দী, কৃষ্ণের স্ত্রী, তার মানে কৃষ্ণের জীবনে রুক্মিণীর মতোই কালিন্দীরও প্রভাব ছিলো। সেই কালিন্দী যদি রাধার দাসী নিজেকে মনে করে, যেকারণে কোনো প্রকার কাতরতা তাকে স্পর্শ করতে না পারে, তাহলে তার বাস্তবায়ণের জন্য তো রাধাকে দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের বাসভবনে থাকতে হবে, এরকম ঘটনার উল্লেখ কি কোথাও আছে যে- রাধা, দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের বাসভবনে গিয়ে বাস করেছে ?

এছাড়াও যেকোনো স্ত্রী, নিজেকেই তার স্বামীর আত্মা মনে করে, অন্য কোনো নারীকে নয়। যদি কোনো নারী এটা জানতে পারে যে, তার স্বামীর আত্মা অন্য কোনো নারী, তাহলে সেই নারীর পক্ষে সেটা সহ্য করা অসম্ভব, সেক্ষেত্রে গর্গসংহিতা প্রসঙ্গে রুক্মিণী ও রাধার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে উপরে যা বলেছি, সেই একই কথা এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার মানে কালিন্দী ও রাধা সম্পর্কে এই পুরাণে যা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

এরপর বরাহপুরাণের ১৬৪/৩৩,৩৪ নং শ্লোকে যে রাধাকুণ্ড এবং অরিষ্টকুণ্ডের কথা বলা হয়েছে, তার কাহিনী হলো- কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে, তখন কংসের নির্দেশে অরিষ্টাসুর নামে এক বিশালাকৃতির ষাঁড়, কৃষ্ণকে হত্যার জন্য বৃন্দাবনে কৃষ্ণের পাড়ায় গিয়ে তাণ্ডব শুরু করে। এই সংবাদ পেয়ে কৃষ্ণ নিজের পাড়ায় উপস্খিত হয়ে বিশালাকৃতির ঐ ষাঁড়কে হত্যা করে। কিন্তু যেহেতু এটি ছিলো ষাঁড় অর্থাৎ গরু, সেহেতু রাধা এবং তার সখীরা কৃষ্ণকে বলে, এই অরিষ্টাসুরকে হত্যার জন্য তার গোহত্যা পাপ হয়েছে, এই পাপমোচনের জন্য তাকে পৃথিবীর সমস্ত পবিত্র নদীতে গিয়ে স্নান করতে হবে। কৃষ্ণ বলে ঠিক আছে, সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে সমস্ত পবিত্র নদীতে স্নান করার পরিবর্তে সব পবিত্র নদীকে এখানে এনে স্নান করে নেবো। এরপর কৃষ্ণ তার পা দিয়ে মাটিতে একটা আঘাত করে, ফলে একটি পুকুর বা কুণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতে শুরু করলে পবিত্র নদীরূপ দেবী, যেমন- গঙ্গা, কাবেরি, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, যমুনা- সেখানে উপস্থিত হয় এবং সবাই জলরূপে ঐ পুকুরে পতিত হয়, এভাবে ঐ পুকুরটি জলে ভরে উঠে, তাতে শ্রীকৃষ্ণ স্নান করে রাধা এবং তার সখীদের দাবী মতো নিজেকে পাপ মুক্ত করে এবং শ্রীকৃষ্ণ ঐ কুণ্ডের নাম দেয় শ্যামকুণ্ড।

তারপর শ্রীকৃষ্ণ, রাধা এবং সঙ্গিনীদের বলে অরিষ্টাসুরের পক্ষ নিয়ে কথা বলে তোমরাও পাপ করেছো, এই কুণ্ডে স্নান করে তোমরাও পাপমুক্ত হয়। জবাবে শ্রীকৃষ্ণের চিরশত্রু রাধা বলে, তুমি স্নান করেছো বলে ঐ কুণ্ডের জল অপবিত্র হয়ে গেছে, আমরা নিজেরাই আরেকটি কুণ্ড বানিয়ে নিয়ে তাতে স্নান করবো। তারপর রাধা এবং সখীরা অরিষ্টাসুরের তাণ্ডবে তার পায়ের আঘাতে যেখানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো, সেখান থেকে আরো মাটি খুঁড়ে তুলে ফেলে ছোটখাটো একটি পুকুর বানিয়ে ফেলে, কিন্তু জল পাবে কোথা থেকে ? কৃষ্ণের এই প্রশ্নের জবাবে রাধা বলে পাশের যমুনা নদী থেকে তারা কলসী দিয়ে জল এনে এই পুকুর ভরাবে। এর পর তারা কয়েকজনে মিলে কয়েক কলসী জল এনে ঐ পুকুরে ঢালেও, কিন্তু তারা বুঝতে পারে এইভাবে পুকুর ভরাতে গেলে তাদের সারাজীবন লেগে যাবে, এই ভেবে যখন তারা হতাশ হয়ে বসে পড়ে, তখন কৃষ্ণের নির্দেশে পূর্বোক্ত ৬ জন দেবী আবার জলরূপে রাধারকুণ্ডে পতিত হয়। তখন কৃষ্ণ বলে তোমার কুণ্ড তো আমার কুণ্ডের চেয়ে বেশী সুন্দর, এই বলে কৃষ্ণ রাধাকুণ্ডে নেমে পড়ে এবং বলে প্রতিদিন সে এই কুণ্ডে নেমে স্নান করবে, এর ফলে রাধাও আগের ঝগড়াঝাটি ভুলে কৃষ্ণকে বলে তোমার কুণ্ডও খুব সুন্দর, আমিও তোমার কুণ্ডে নেমে প্রতিদিন স্নান করবো। এই ভাবে সৃষ্টি হয় শ্যামকুণ্ড ও রাধাকুণ্ড, যেটা শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের ঘটনা। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালে বৃন্দাবনে কৃষ্ণের সমবয়সীদের মধ্যে যে রাধা নামে কেউ ছিলো সেটা তো আমি অস্বীকার করি না, যেটা আগেই বলেছি। আমার আপত্তি শুধু যুবক কৃষ্ণের পাশে যুবতী রাধাকে দাঁড় করিয়ে কৃষ্ণের স্বর্গীয় মহিমাকে কলঙ্কিত করায়।

যা হোক, বরাহ পুরাণের এই ঘটনাটি কি প্রমাণ করে যে যুবক কৃষ্ণের জীবনে যুবতী রাধার কোনো অস্তিত্ব আছে বা কৃষ্ণের সাথে রাধার প্রেম ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিলো ?

শেষে দেবীভাগবতের একটি রেফারেন্স দিয়ে লেখাটি শেষ করবো, ইচ্ছে করেই এই আলোচনাটিকে আমি শেষে রেখেছি, বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে-

দেবীভাগবতের ৯/৫০/১৬ তে বলা হয়েছে- রাধিকার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না। সুতরাং সকল বৈষ্ণবেরই রাধার পূজা করা অবশ্য কর্তব্য। এই অনুবাদ যে ভুল বা সঠিক নয়, এমনটি বলা যাবে না; কারণ, শ্লোকের মধ্যেই বলা আছে, "বৈষ্ণবৈঃ সকলৈস্তস্মাং কর্ত্তবং রাধিকার্চ্চনম।"

বৈষ্ণব শব্দের উৎপত্তির দুটো সোর্স আছে, প্রথমত যারা বিষ্ণুর ভক্ত, তাদরেকে বলে বৈষ্ণব; দ্বিতীয়ত যারা চৈতন্যদেবের অনুসারী, তাদেরকে বলে বৈষ্ণব বা বৈরাগী। যদি এই শ্লোকটি বিষ্ণুর ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলা হতো, তাহলে এখানে বৈষ্ণব শব্দটাই ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়তো না; কারণ, থিয়োরি অনুযায়ী সকল সনাতনী ই বিষ্ণুর ভক্ত, সেই হিসেবে সবাই বৈষ্ণব, আর বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট কোনো কাহিনীতে রাধার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শ্লোকটি শুধুমাত্র চৈতন্যদেবের অনুসারী বৈষ্ণবদের উদ্দেশ্যে রচিত, যেকারণে বলা হয়েছে- "রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না। সুতরাং সকল বৈষ্ণবেরই রাধার পূজা করা অবশ্য কর্তব্য।" এ থেকে এটা প্রমাণ হয় যে- দেবী ভাগবতের এই শ্লোকটি কোনো চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবের হাতে রচিত, না হলে- যে রাধার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে শুধু কালিমালিপ্তই করা হয়, সেই রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার হয় না, এমন কথা বলতে পারতো না।

সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত জ্ঞান হলো গীতা, আর সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত বিষয় হলো শ্রীকৃষ্ণ, যেকারণে গীতায় বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকে জানা ই হলো চুড়ান্ত জ্ঞান। এই চুড়ান্ত শ্রীকৃষ্ণের পূজা রাধার পূজা ব্যতীত হবে না, যদি এটা সত্য হতো, তাহল নিশ্চয় সনাতন ধর্মের চুড়ান্ত থিয়োরি গীতায় অবশ্যই এ ব্যাপারে কিছু না কিছু বলা থাকতো বা ইঙ্গিত থাকতো, কিন্তু সেরকম কি কিছু আছে ? নেই। তাহলে সনাতন ধর্মের শেষ কথা গীতায়, যেখানে শ্রীকৃষ্ণের পূজার আগে রাধার বা অন্য কারো পূজার বিষয়ে কিছু বলা নেই, সেখানে দেবী ভাগবত নামের একটি পুরাণ, যার মূল বর্ণিত বিষয় হলো দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা, সেখানে হুট করে দু একটি শ্লোকে এরকম কথা বলা কি অযৌক্তিক বা অসঙ্গত নয় ?

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনী মোটামুটি কমবেশি সবাই জানে। সেখানে কোনো এক অখ্যাত লেখকের অখ্যাত গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যদি এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কিন্তু সেই তথ্য যদি আগের জানা তথ্যগুলোর সাথে ম্যাচ না করে, তাহলে লোকজন সেই অখ্যাত লেখকের অখ্যাত গ্রন্থের কথাকে বিশ্বাস করবে ? দেবী ভাগবতে রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজার ব্যাপারটাও সেরকম। যে শ্রীকৃষ্ণ মানবের মুক্তিদাতা, তার সম্পর্কে এতবড় একটি তথ্য, সনাতন ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থ, যেমন- গীতা, বেদ, মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদ কোথাও নেই, আছে এক অপ্রচলিত পুরাণে, তাহলে সেই কথা কি মেনে নেওয়া যায় ?

গীতার শেষ উপদেশ হিসেবে অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৫৭ এবং ৬৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

"তুমি মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পন করিয়া, মৎপরায়ণ হইয়া, সাম্যবুদ্ধির যোগ অবলম্বন করিয়া সর্বদা আমাতে চিত্ত রাখো এবং যথাধিকার কর্ম করিতে থাকো। তুমি একমাত্র আমাতেই মন দাও, আমাকে ভক্তি করো, আমাকে পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো, … তুমি নিশ্চয় আমাকেই পাইবে।"

কৃষ্ণের জীবনে রাধা যদি এত গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হতো এবং রাধাকে পূজা না করলে যদি শ্রীকৃষ্ণের পূজার অধিকার না থাকতো, তাহলে কি কৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার এই উপদেশগুলো দিতেন ? আর রাধার পূজা ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের পূজা ফলবান না হলে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর নয়, রাধাই পরমেশ্বরী হয়; কিন্তু রাধার পরমেশ্বর হওয়ার পেছনে সনাতন ধর্মের প্রামান্য কোনো গ্রন্থে কি তার কোনো রেফারেন্স আছে ? নাই। তাহলে দেবীভাগবতের এই সব কথা যে ভিত্তিহীন, সেটা কি এখনও চোখে আঙ্গুলের গুতা দিয়ে রায়ণ এবং রায়ণের মতোদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে ?

শুধু দেবী ভাগবতের এই শ্লোকটি নয়, সনাতন ধর্মীয় যেসব গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের পাশে রাধার অস্তিত্বকে প্রমাণ করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, সেসবই যে চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের কারসাজি সেটা বোঝানোর জন্যই দেবী ভাগবতের এই আলোচনাটিকে আমি শেষে রেখেছিলাম।

যে ভিডিও বক্তব্যর উপর ভিত্তি করে এই প্রবন্ধটি লিখেছি, তার লিঙ্ক-

https://www.youtube.com/watch?v=5hsoW2kwWYc&feature=share&fbclid=IwAR0-pNFbdJHnpDVrwovS_7mrojMgBOrmTaKdqVyGVkpwzCcSLWmAKwqrxX8

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

কৃষ্ণকে জন্ম নেওয়ার সুযোগ কংস কেনো দিয়েছিলো ?


কৃষ্ণকে জন্ম নেওয়ার সুযোগ কংস কেনো দিয়েছিলো ?

#Md_Shibaji নামের এই খচ্চরের প্রশ্নের জবাব একটু পরে দিচ্ছি, তার আগে যে গ্রুপে সে এই প্রশ্নটি তুলেছে, সেই "ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি" সম্পর্কে কিছু বলে নিই।

এই ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি গঠন করে প্রবীর ঘোষ নামের এক সেকুলার। ইন্টারমিডিয়েট বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর প্রবীর ঘোষের একটি বিখ্যাত বই 'অলৌকিক নয় লৌকিক', এক নাস্তিকের মাধ্যমে প্রথম হাতে পাই, এই একটা বই পড়েই আমি প্রবীরের দারুন ভক্ত হয়ে যাই, তারপর প্রবীরের যত বই যেখানে যা পেয়েছি সব সংগ্রহ করে পড়েছি। 

প্রবীর ঘোষ- সাধারণত তার বইগুলোতে আমাদের চারপাশে ঘটা বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা ঘটানো তথাকথিত অলৌকিক ঘটনাগুলো কিভাবে ঘটানো হয়েছে, তার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দেয়। এই প্রবীর ঘোষ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা্ এককথায় পাঁড় নাস্তিক, বলা বাহুল্য এই প্রবীর ঘোষের বই পড়তে পড়তে আমিও এক সময় নাস্তিকে পরিণত হয়েছিলাম।

পাঠ্য পুস্তকের ইতিহাস বলে- গজনীর সুলতান মাহমুদ ১৭ বার সোমনাথ মন্দির আক্রমন করে ধ্বংস করেছে, কিন্তু এটা বলে না যে সেই ১৭ বার আক্রমনে সুলতান মাহমুদ কত লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছে, কত লক্ষ নারী ও শিশুকে দাস হিসেবে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে গজনীতে বিক্রি করেছে, আর কত মন সোনা রূপা পিতলসহ অন্যান্য ধনরত্ন, সোমনাথ মন্দির থেকে লুট করে নিয়ে গেছে।

সোম মানে চাঁদ বা চন্দ্র, পৌরাণিক কাহিনী মতে চন্দ্র, প্রজাপতি দক্ষ দ্বারা- আস্তে আস্তে ক্ষয় হয়ে বিলুপ্ত হওয়ার অভিশাপে অভিশপ্ত হয়ে প্রভাস তীর্থ, অর্থাৎ যেখানে সোমনাথ মন্দির অবস্থিত, সেখানে এসে শিবের আরাধনা করতে থাকে, শিব তার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্র বা সোমকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন, এতে চন্দ্র সেখানেই একটি মন্দির বানিয়ে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে। ফলে চন্দ্র বা সোমের রক্ষাকর্তা হিসেবে শিবের এই মন্দিরের নাম হয় সোমনাথ মন্দির। এই মন্দিরটি কত প্রাচীন তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়; এই মন্দিরের সাথে রাবন এবং কৃষ্ণের নামও জড়িয়ে আছে। 

যা হোক, এই মন্দিরের প্রতি লোকজনের আকর্ষণ বাড়াতে এটির নির্মাণ বা পুণনির্মান কালের কোনো এক সময়, এতে একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছিলো, শিবলিঙ্গটিকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিলো যাতে এটি শুন্যে অবস্থান করতে থাকে, অর্থাৎ শিবলিঙ্গটি ভূমি থেকে খানিক উপরে শূন্যে অবস্থান করতো, সাধারণ লোকজনের কাছে এটি অলৌকিক ঘটনা বলে মনে হতো এবং মন্দিরের উন্নয়নের জন্য যেমন তারা অকাতরে মন্দিরে ধন সম্পদ দান করতো, তেমনি নিজেদের স্বর্ণ অলঙ্কার তারা মন্দিরে রেখে যেতো, প্রভু শিব, তাদের সেই ধনসম্পদকে রক্ষা করবে এই ভরসায়। 

সোমনাথ মন্দিরে রক্ষিত এই সব ধন সম্পত্তির খবর যায় লুটেরা সুলতান মাহমুদের কাছে এবং তারপর সে একের পর এক ১৭ বার সোমনাথ মন্দিরে অভিযান চালায়।

এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে সোমনাথ মন্দিরের ঐ শিবলিঙ্গকে শুন্যে ভাসিয়ে রাখা হয়েছিলো ? একটু আগেই বলেছি, সোমনাথ মন্দির কত প্রাচীন, তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই প্রাচীনকালেও ভারতের বিজ্ঞান কতদূর এগিয়েছিলো, তার নিদর্শন আছে এই সোমনাথ মন্দিরে শিবলিঙ্গ স্থাপনের মধ্যে।

সোমনাথ মন্দিরে যে শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা হয়েছিলো, সেটি ছিলো ধাতব এবং তাকে প্রাকৃতিক চুম্বকের মাধ্যমে চতুর্দিক থেকে আকর্ষণ করে মাঝখানে শুন্যে স্থির রাখা হয়েছিলো। বর্তমান যুগেও পৃথিবীতে এমন কোনো নিদর্শন নেই, যাতে চুম্বকের এই সূক্ষ্ম ব্যালান্সের ব্যবহার আছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে তড়িত চুম্বকের মাধ্যমে নানা ধরণের ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছে, কিন্তু প্রাকৃতিক চুম্বকের এরকম আশ্চর্য সূক্ষ্ম ব্যলান্সের ব্যবহার পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই, এই দিক থেকেও সোমনাথ মন্দিরে শিবলিঙ্গ স্থাপন, শুধু সেই প্রাচীনকালেই নয়, বর্তমান যুগেও একটি অলৌকিক ব্যাপারই বটে।

যা হোক, সোমনাথ মন্দিরের শূন্যে ভাসা সেই শিবলিঙ্গকে নিয়ে দেশে বিদেশে একটি অলৌকিক মিথ গড়ে উঠেছিলো, যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয় গজনী অর্থাৎ বর্তমান আফগানিস্তানের শাসক সুলতান মাহমুদের; ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে ভারতের প্রতি যত মুসলমান শাসকের নজর পড়েছে, তাদের সকলের একটাই উদ্দেশ্য ছিলো ভারতের হিন্দুদেরকে মুসলমান বানানো। সুলতান মাহমুদ ভেবেছিলো, সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করে যদি শিবলিঙ্গের সেই অলৌকিতার বিশ্বাসকে ভেঙ্গে দেওয়া যায়, তাহলে ভারতের হিন্দুদেরকে সহজে মুসলমান বানানো যাবে, তাই সে প্রথমবার মন্দির আক্রমন করে তা ধ্বংস করে এবং পরবর্তীতে ধন সম্পদের লোভে বার বার সে আক্রমন পরিচালনা করে। শুধু সুলতান মাহমুদই নয়, আরো অনেক মুসলমান শাসক এই মন্দির আক্রমন করেছে এবং লুঠপাটের সাথে তা ধ্বংসও করেছে। শুধু সোমনাথ মন্দিরের উপর একটি প্রবন্ধ আমি খুব শীঘ্রই লিখবো, সেখানে আপনারা এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

যা হোক, শুন্যে ভাসা শিবলিঙ্গের অলৌকিকতার বিশ্বাসকে ভেঙ্গে ফেলায়, সেকুলার প্রবীর ঘোষ, তার এক বইয়ে সুলতান মাহমুদের প্রশংসা করে এরকম একটি কথা বলেছে- এটা ছিলো অন্ধ ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে বিজ্ঞানের পথে আনার একটা প্রথম পদক্ষেপ।

আর এটাই হলো প্রবীর ঘোষকে আমার অপছন্দ করার প্রথম কারণ। যে ব্যক্তি ভারতের লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছে, লক্ষ লক্ষ হিন্দু নারী শিশুকে দাস হিসেবে বন্দী করে নিয়ে গেছে, কোটি কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি লুট করে নিয়ে গেছে, এককথায় যার হাতে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা, ভারতীয় হিন্দু সভ্যতা বিপন্ন হয়েছে, তার প্রশংসা করেছে যে কুকুর, তাকে আমি কিছুতেই আমার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারি না; এজন্যই আমি ঘৃণা করি প্রবীর ঘোষকে এবং তার সংগঠন ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতিকে।

শুরুতেই MD Shibaji কে কেনো আমি খচ্চর বলে অভিহিত করেছি, এখন তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি-

গাধা এবং ঘোড়া হলো কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের প্রাণী। এই গাধা এবং ঘোড়ার যৌনমিলনে যখন কোনো প্রাণীর জন্ম হয় তাকে বলে খচ্চর। এই খচ্চর শব্দটি বর্তমানে একটি গালি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে দুই ধরণের বৈশিষ্ট্য বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড লক্ষিত হয় তার উদ্দেশ্যে। খেয়াল করুন, যার স্ট্যাটাসের জবাব দেওয়ার জন্য এই প্রবন্ধটি লিখছি তার নাম MD Shibaji, শিবাজি হলো এক ভারতীয় হিন্দু বীর 'ছত্রপতি শিবাজী'র নামের অংশ; আর Md বা 'মুহম্মদ' হলো প্রচণ্ড হিন্দু বিদ্বেষী মহাউন্মাদ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্ত্রাসী আরবীয় বর্বর- 'হযরত মুহম্মদ' এর নামের অংশ। তাহলে যার নামের মধ্যে এরকম পরস্পর বিরোধী ব্যাপার থাকে, সে খচ্চর নয় তো কী ?

এবার আসি, এই খচ্চর যে প্রসঙ্গে প্রশ্নটি করেছে, এই প্রবন্ধের মূল বিষয়, দেবকী ও বসুদেবকে এক সাথে থাকতে দিয়ে কংস কেনো কৃষ্ণকে দেবকীর গর্ভে জন্ম নেওয়ার সুযোগ দিলো- সেই প্রসঙ্গে।

হিন্দুধর্মের ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাসের মতো আজগুবি নয়, হিন্দুধর্মের ইতিহাসে প্রত্যেকটি ঘটনার কারণের পেছনে মনস্তাত্বিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারণ রয়েছে। 

ইসলামের ইতিহাসের একটি ঘটনা হলো- মুহম্মদ যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য মক্কা থেকে মদীনায় পালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন রাতের বেলা মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে দিনের বেলায় মুহম্মদ ও আবু বকর একটি পাহাড়ের গুহার মধ্যে লুকিয়েছিলো। মুহম্মদের শত্রুরা তাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে সেই পাহাড়ের গুহার মধ্যে ঢুকতে গিয়ে দেখে একটি মাকড়সা তাতে জাল বিছিয়ে রেখেছে, এটা দেখে কুরাইশরা ভাবে, না এই গুহার মধ্যে কোনো মানুষ ঢুকে নি, ঢুকলে মাকড়সার এই জাল থাকতো না। এভাবে আল্লা এক মাকড়সার জালের মাধ্যমে মুহম্মদ ও আবুবকরের প্রাণ রক্ষা করে।

এই প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন হলো- আল্লা যদি সর্বশক্তিমান হয় এবং মুহম্মদ যদি আল্লার পেয়ারের বান্দা বা দোস্ত হয়, তাহলে মক্কায় মুহম্মদকে আল্লা রক্ষা করতে পারলো না কেনো ? কেনো আল্লাকে পাহাড়ের গুহার প্রবেশ পথে মাকড়সার জাল বিছিয়ে মুহম্মদকে রক্ষা করতে হবে ? মুহম্মদ যেমন মাঝে মাঝে কোরান ভুলে যেতো, তেমনি মনে হয় আল্লাও মাঝে মাঝে ভুলে যেতো যে সে সর্বশক্তিমান। এজন্যই বলেছি- ইসলামের ইতিহাস হলো একটি আজগুবি ইতিহাস।

যা হোক, এবার নজর দিই কৃষ্ণের জন্মের ইতিহাসের দিকে-

দেবকী ও বসুদেবের বিয়ের পর দৈববাণী হয় যে, দেবকীর গর্ভের অষ্টম সন্তানের হাতে কংসের মুত্যু হবে। এটা শুনে সাথে সাথেই কংস, দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তখন দেবকীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য বসুদেব বলে, আমাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখো, আমাদের যে সব সন্তান হবে, সবগুলোকে তোমার হাতে তাদের জন্মের পর পরই তুলে দেবো। আমার এই পরামর্শ না মেনে তুমি যদি দেবকীকে হত্যা করো, তাহলে আমাদের সকল মিত্র রাজা মথুরা আক্রমন করে তোমাকে হত্যা করবে, কিন্তু যদি আমার পরামর্শ মানো, আমি কথা দিচ্ছি কেউ তোমাকে বা তোমার রাজ্যকে আক্রমন করবে না। 

কংস বিষয়টি যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নেয় এবং দেবকী ও বসুদেবকে এক সাথে কারাগারে বন্দী করে রাখে।

এখানে প্রশ্ন হলো- কংস, দেবকী ও বসুদেবকে কেনো এক ঘরে এক সাথে বন্দী করে রাখলো ?

এখানেই কাজ করেছে মানুষের চরিত্রের একটি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার।

কংস ছিলো একজন বীর যোদ্ধা, সে কিভাবে একটি শিশুর ভয়ে ভীত হয়ে তার জন্মকে রোহিত করবে ? তাহলে তো সবাই বলবে- কংস একজন ভীরু কাপুরুষ, যে একটি শিশুর ভয়ে দেবকী ও বসুদেবকে আলাদা ঘরে বন্দী করে রেখেছে, এমন ভীরু কাপুরুষ কিভাবে রাজার পদে থাকতে পারে ? তার তো রাজা হওয়ার যোগ্যতাই নেই । কেননা, এমন ভীরু কাপুরুষ কোন রাজা তো বহিশত্রুর হাত থেকে নিজের রাজ্য এবং প্রজাদেরকে রক্ষা করতে পারে না বা পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এসব কারণে, প্রজারা যাতে কংসকে ভীরু ও কাপুরুষ বিবেচনা না করে, সে কারণে কংস একটি চ্যালেঞ্জ নেয়, সে দেবকী ও বসুদেবকে এক ঘরে বন্দী করে রাখে এবং তাদের সন্তান জন্মানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়; এজন্যই যে, দেবকীর একেকটা সন্তানকে জন্মানোর সাথে সাথেই সে হত্যা করে এটা প্রমাণ করবে যে, কংস দেবকীর কোনো সন্তানের ভয়ে ভীত নয় বা কাউকে সে ভয় পায় না। এভাবে কংসের উদ্দেশ্য হলো দেবকীর সকল সন্তানকে হত্যা করে নিজেকে বীর পুরুষ হিসেবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করা।

প্রকৃত বীর পুরুষদের চরিত্র এমনই হয়, তারা সকল চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে, তারা প্রাণ বাঁচানোর জন্য মুহম্মদের মতো রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় না।

আশা করছি, হিন্দুধর্ম সম্পর্কে এই খচ্চরের কটূক্তির জবাব, আমার বন্ধুদের মুখে তুলে দিতে পেরেছি।

উপরে যা লিখেছি, তার সব ঐ খচ্চরের স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে; এবার নিচে যে যা লিখছি, সেটা কৃষ্ণের জন্ম প্রসঙ্গে একটি বাড়তি তথ্য আমার পাঠক বন্ধুদেরকে জানানোর উদ্দেশ্যে।

আপনারা জানেন যে, দৈববাণী হয়েছিলো- কংসের বধ হবে দেবকীর অষ্টম পুত্রের দ্বারা। কিন্তু অষ্টম পুত্র কেনো ? দেবকীর প্রথম বা দ্বিতীয় সন্তানের দ্বারা যদি কংসের বধ হতো, তাহলে সমস্যা কী ছিলো ? এমন হলে তো দেবকী ও বসুদেবকে ছয়টি সদ্যজাত সন্তানের মৃত্যুর শোক সইতে হতো না।

একটি গ্রীক প্রবাদ হলো-"যে ডাক্তারের জ্যোতিষ শাস্ত্রে জ্ঞান নেই, সে কোনো ডা্ক্তারই নয়"। কিন্তু আমি মনে করি শুধু ডাক্তারি জ্ঞানই নয়, জ্যোতিষ শাস্ত্রের জ্ঞান ছাড়া সকল জ্ঞানই অপূর্ণ। জ্যোতিষ শাস্ত্রের জ্ঞান ছাড়া পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী বাংলার কোনো অধ্যাপকও যেমন বলতে পারবে না যে 'একাদশী বৃহস্পতি' বাগধারার প্রকৃত অর্থ কী ? তেমনি ভাগবত সম্পূর্ণ মুখস্থ করে ফেললেও কোনো ধর্মগুরুর ক্ষমতা নেই, জ্যোতিষের জ্ঞান ছাড়া বলা যে, কেনো দেবকীর অষ্টম পুত্রের হাতেই কংসের মৃত্যু হয়েছিলো, কেনো অন্য কোনো পুত্রের হাতে নয় ?

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে, আমাদের সৌরজগতের গ্রহ নক্ষত্রগুলো, আমাদের ভাগ্য তথা কর্ম ও জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রত্যেকটি গ্রহের সংখ্যাজ্ঞাপক একটি করে মান রয়েছে, যে সংখ্যাগুলো জানান দেয় ঐ গ্রহের চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। জ্যোতিষ মতে, সূর্যের সাংখ্যিক মান ১, চন্দ্রের ২, বৃহস্পতির ৩, ইউরেনাসের ৪, বুধের ৫, শুক্রের ৬, নেপচুনের ৭, শনির ৮ এবং প্লুটো ও মঙ্গলের ৯। যেহেতু পৃথিবীতেই মানুষ বাস করে, সেহেতু পৃথিবী কমন বলে পৃথিবী গ্রহ হলেও তার কোনো মান ধরার প্রয়োজন হয় নি, তাই জ্যোতিষ শাস্ত্রে পৃথিবীর কোনো সাংখ্যিক মান নেই।

শনি ছাড়া অন্য গ্রহগুলোর প্রভাব মানুষের উপর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুভ, তাই সেগুলোর প্রভাবে মানুষের জীবনের তেমন কোনো তারতম্য ঘটে না, যা ঘটে সেটা খুবই সূক্ষ্ম, সেগুলো বোঝার জন্য জ্যোতিষের জ্ঞান অপরিহার্য এবং জ্যোতিষীরাই একমাত্র সেগুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম। কিন্তু শনির প্রভাবে মানুষের জীবন তছনছ হয়ে যায়, তাই শনির প্রভাব যে কেবল ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তিই বুঝতে পারে, তা ই নয়; তার জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে যে, তার পরিচিত বলয়ের সবাই সেগুলো টের পায়।

এই শনির সংখ্যা হলো ৮, তাই আট যুক্ত যে কোনো কিছু, ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং সেই প্রভাব সব ক্ষেত্রেই ধ্বংসাত্মক বা নেগেটিভ। যাদের জন্ম ১৯৮৫/৮০ এর আগে তাদের হয়তো মনে আছে যে ২০০১ সালে বি.এন.পি জামাত নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশে কী ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো। খুন, ধর্ষণ, লুঠপাট, দখল অগ্নিসংযোগসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যে, তারা তা সেই সময় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় করে নি। ভূমিধ্বস বিজয় উদযাপনের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেই সময় জামাত বিএনপির লোকেরা দল বেঁধে আওয়ামী লীগ সমর্থক বিশেষ করে হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করতে যেতো বা দল বেঁধে ধর্ষণ করতো, এমন একটি ঘটনার শিকার হয়েছিলো সিরাজগঞ্জ জেলার উ্ল্লাপাড়া থানার পূর্ণিমা শীল নামের্ একটি মেয়ে। সেই সময় এই দলবদ্ধ ধর্ষণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মেয়েরা বাড়ি ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতো; যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলো দেশ, সেই নির্বাচন ছিলো বাংলাদেশের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এখন ৮ সংখ্যার কার্যকারিতার সাথে আমার কথার হিসাব মেলান।

বিজ্ঞানীরা তো পদার্থ নিয়ে কাজ করে, তাদের হাতে তো কোনো বস্তু থাকে, তারা সেটা নিয়ে গবেষণা করে তারপর সে সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করে। কিন্তু আমাদের মুনি ঋষিদের জ্ঞানের কথা একবার চিন্তা করুন, জ্যোতিষ শাস্ত্রের মাধ্যমে তারা এমন কিছু বিষয়ে কথা বলে গেছে, যেগুলো না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া। অথচ সেগুলো মানব জীবনে একেবারে বাস্তব এবং কার্যকর। আমাদের মুনি ঋষিদের জ্ঞানের সীমাটাকে একবার উপলব্ধি করুন, আপনার মাথায় কিছু যদি ঘিলু থাকে, আপনার মাথা নত হতে বাধ্য।

যা হোক, শনির কারণে ৮ সংখ্যা যে যেকোনো কিছুতে বিপর্যয় নিয়ে আসে, সেটা উপরের উদাহরণে সম্ভবত বোঝাতে পেরেছি; দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের মাধ্যমে কংসের জীবনে বিপর্যয় আনা, কৃষ্ণকে অষ্টম পুত্র হিসেবে প্রকৃতির জন্ম দেওয়ার একটি কারণ। এককথায়, কৃষ্ণ ছিলেন কংসের জন্য শনি, তাই কৃষ্ণের হাতে কংস শেষ হয়ে গেছে। শুধু কংসের জন্যই নয়, কৃষ্ণ ছিলেন সমস্ত অধর্মীদের জন্য শনি, তাই সমস্ত অধর্মীদের বিনাশ করার জন্য কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ঘটান এবং দুষ্কৃতকারীদেরকে বিনাশ করে ধর্মপ্রতিষ্ঠা করেন। 

অষ্টম পুত্র হিসেবে কৃষ্ণের জন্ম নেওয়ার অন্য কারণ হলো- সময় নিয়ে বহু বছর ধরে কংসের অত্যাচারকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরে তার বিনাশ যে অপরিহার্য তার ন্যা্য্যতা প্রতিপন্ন করা।

কংস শুরু থেকেই অত্যাচারী ছিলো, তাই সে তার পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে বন্দী করে রেখেছিলো। যে লোক এমন কাজ করতে পারে, সে যে রাজ্যে প্রজাদের উপর আরো কত কী অত্যাচার করেছিলো, সেটা তো সহজেই অনুমেয়। তাই কংসকে বিনাশ করার নীল নকশা দেবতারা করে ফেলে এবং দেবকী-বসুদেবের বিয়ের পর, কংসের জন্য সা্বধান বাণী হিসেবে ঐ দৈববাণী প্রকাশ করে। 

দেবকীর বিয়ে থেকে অষ্টম পুত্রের জন্ম পর্যন্ত কমবেশি ৮/১০ বছর সময় লেগেছে, এই সময়ে কংস তার অত্যাচারী রূপ থেকে সরে এসে দেবতাদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে পারতো, যেটা কংস করে নি। উল্টো সে তার অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে দেবকীর ছয় ছয়টি সন্তানকে দেয়ালের সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করেছে, এর ফলে কংসের অত্যাচারের ভয়াবহ রূপ সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে সন্দেহাতীতভাবে নিরূপিত বা প্রমাণিত হয়েছে, যার কারণে কৃষ্ণের হাতে কংসের বিনাশ ন্যায্যতা প্রাপ্ত হয়েছে।

মূলত এই দুটি কারণেই কংস বধ, দেবকীর প্রথম বা দ্বিতীয় পুত্রের দ্বারা না হয়ে অষ্টম পুত্রের দ্বারা হয়েছে।

আশা করছি, কৃষ্ণের জন্ম কেনো অষ্টম পুত্র হিসেবে, সেই বিষয়টি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

'ওঁ সহানা ভবতুঃ' (ঈশ্বর আমাদেরকে রক্ষা করুন)

Thursday, 17 September 2020

বিশ্বকর্মার পূজা করেও শিল্প, কারিগরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় হিন্দুরা এত পিছিয়ে কেনো ?


বিশ্বকর্মার পূজা করেও শিল্প, কারিগরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় হিন্দুরা এত পিছিয়ে কেনো ?

নকুল কুমার বিশ্বাসের কিছু হিন্দুবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ওকে আমি ঘৃণা করি, কিন্তু ওর বাস্তবতাবোধ এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির জন্য ওকে আবার পছন্দও করি। এই নকুল, তার দেবী লক্ষ্মী সম্পর্কিত একটি গানে লক্ষ্মীকে প্রশ্ন করছে- আমি প্রতিদিন তোমার পূজা করি, তবু আমি গরীব কেনো ? জবাবে দেবী লক্ষ্মী, নকুলকে বলছে- আমি সেখানেই থাকি যেখানে পরিশ্রম আছে, তুই তো শুধু আমার পূজা করে অলসের মতো বসে থাকিস, এমন লোককে আমি পছন্দ করি না, তাই তোর ঘরে থাকি না, এজন্যই তুই গরীব।

এই গানের মাধ্যমে নকুল আসলে বলতে চেয়েছে, শুধু পূজা করলে দেবী লক্ষ্মী খুশি হয় না, যে পরিশ্রম করে, লক্ষ্মী তার প্রতিই খুশি থাকে এবং তাকেই ধন সম্পদ দেন।

আমি একটা কথা প্রায়ই বলি যে- সনাতন ধর্ম হলো বাস্তবতার ধর্ম এবং পৃথিবীর সমস্ত লোক তাদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সনাতন ধর্মের বিধিবিধান পালন করে চলেছে। সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে রয়েছে মানুষের জন্য সিচুয়েশনাল শিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের ইঙ্গিত। মানুষের কর্তব্য হলো সেই সব পৌরাণিক কাহিনী থেকে শিক্ষা নিয়ে চলা এবং যে বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর ইঙ্গিত আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য গবেষণার মাধ্যমে চেষ্টা করা।

প্রাকৃতিক শক্তিসহ সকল প্রকার শক্তিকে সনাতন ধর্মে দেব-দেবী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এবং কালক্রমে এগুলোরই পূজা চালু হয়ে গিয়েছে। দেব-দেবীদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের পূজা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষের মধ্যে সেই বিষয়টি জাগ্রত রাখার একটি সিস্টেম, যেমন বছরে একদিন যদি স্বাধীনতা দিবস পালন করা না হয়, তাহলে লোকজন একসময় স্বাধীনতা্র বিষয়টি ভুলে যাবে, এতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে; কারণ, স্বাধীনতা দিবস পালনে দেশের লোকজনের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়, যা রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক। একইভাবে শ্রদ্ধাভক্তি নিয়ে কোনো দেব-দেবীর পূজা করলে সেই বিষয়টি পূজারীদের সন্তান সন্তুতিদের মধ্যে জাগরুক থাকে এবং যুগের পর যুগ ধরে সেটি চলতে থা্কে। কিন্তু কোনো দেব-দেবীর পূজার মূল শিক্ষাকে যদি কেউ বুঝতে না পারে এবং সেটা যদি সে গ্রহন করতে না পারে, তাহলে তার সেই দেব-দেবীর পূজা সম্পূর্ণ ব্যর্থ, লোক দেখানো অনুষ্ঠান মাত্র।

আমরা জানি, প্রতিটি দেব-দেবীর সাথে নানারকম বিষয় জড়িত থাকে, এই নানারকম বিষয়গুলো আসলে মানুষকে নানারকম শিক্ষা দেয়, যদি আমরা সেই বিষয়গুলো জানি এবং তা থেকে শিক্ষা নিই, তাহলেই সেই দেব-দেবীর পূজা সার্থক। যেমন- দেবী লক্ষ্মীর সাথে থাকা পেঁচা আসলে গোপনীয়তার প্রতীক, যে পেঁচা সাধারণত দিনে দেখা যায় না। লক্ষ্মীর পূজা করে আপনি যে এই শিক্ষা নিজে নেন এবং সন্তানদেরকে এই শিক্ষা দেন যে লক্ষ্মীর প্রতীক ধনসম্পত্তিকে লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে রাখতে হবে, তাহলেই আপনি বড় রকম বিপদের হাত থেকে বেঁচে যাবেন, যারা লক্ষ্মী পূজার এই শিক্ষা নেয় না, তারাই ধন সম্পত্তিজনিত বিপদের হাতে পড়ে এবং তাদের কাছেই অর্থ হয় অনর্থ।

সরস্বতী পূজার শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজের প্রতিভাকে মেলে ধরা। আপনি সরস্বতী দেবীকে বিশ্বাস করেন বা না করেন, আপনি আসলে সরস্বতী পূজার শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েই নিজেকে জ্ঞানে গুনে বড় করার চেষ্টা করছেন। বর্তমানের পিতা মাতারা তাদের সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে খুবই সিরিয়াস, ছেলে মেয়ের পড়াশোনার জন্য তারা নিজেদের সকল প্রকার সুখ সুবিধাকে বিসর্জন দিতেও পিছপা হন না; এই যে পড়াশোনা বা জ্ঞান অর্জনের তাগিদ সেটাই কিন্তু সরস্বতী পূজার শিক্ষা। সাধারণ মানুষ যেটা একবিংশ শতাব্দীতে এসে উপলব্ধি করছে, আমাদের মুনি ঋষিরা সেটা উপলব্ধি করেছে ৮/১০ হাজার বছর আগেই। তো আপনি সরস্বতী পূজা করেন বা না করেন, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়ে আপনি কি সরস্বতী পূজার শিক্ষাকেই কাজে লাগাচ্ছেন না ?

যা হোক, পুরাণের বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতগুলো বিজ্ঞানীদেরকে কিভাবে সাহায্য করেছে বা পথ দেখিয়েছে, এবার সেদিকে নজর দিই-

মহাভারতে- বেদব্যাস, সঞ্জয়কে, কুরুক্ষত্রের যুদ্ধ সরাসরি ২৩০ কি.মি দূরে হস্তিনাপুরের প্রাসাদে বসিয়ে দেখিয়েছেন, যেই প্রযুক্তি বর্তমানের লাইভ টিভি সম্প্রচার।

অর্জুন, আকাশে ঘুর্ণায়মান মাছের চোখকে, এক তীরে বিদ্ধ করে দ্রৌপদীকে জয় করেছিলো, এটা আকাশে প্রদক্ষিণরত কৃত্রিম উপগ্রহকে, পৃথিবী থেকে ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করে ধ্বংস করার পৌরাণিক উদাহরণ, যে কাজ কিছু দিন আগেই ভারত করেছে।

গনেশের মাথার ঘটনা মানবদেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চুড়ান্তরূপ সার্জারির একটি ঘটনা, যার গবেষণা বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের উপর অলরেডি করে ফেলেছে এবং মানুষের উপর করার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পৌরাণিক কাহিনীতে আমরা্ দেখতে পাই, বিশ্বকর্মা প্রথম পুষ্পকরথ নামের একটি বিমান তৈরি করে তা কুবেরকে দিয়েছিলেন; রাবন, কুবেরের কাছ থেকে সেই রথ ছিনতাই করে। ফলে বিমান তৈরির আইডিয়া সনাতনী বা হিন্দুদেরই, যা বাস্তবায়ণ করেছে বিজ্ঞানীরা।

আমি আরেকটা কথা বলি যে পৌরাণিক কাহিনীগুলো হলো পৃথিবীর সকল ঘটনার সারসংক্ষেপ এবং পৃথিবীতে এমন কোনো ঘটনা বা বিষয় নেই, যার ইঙ্গিত পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে নেই। মানুষের মধ্যে শিল্পপ্রতিভা থাকে, দেবী সরস্বতী সেই শিল্প প্রতিভার প্রতীক; মানুষের মধ্যে- বীর, খেলোয়াড়, যোদ্ধা থাকে, মঙ্গল তার প্রতীক; মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ খুব জ্ঞানী হয়, বৃহস্পতি তার প্রতীক; মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ কবি সাহিত্যিক হয়, চন্দ্র তার প্রতীক; মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ খুব সুদর্শন হয়, শুক্র তার প্রতীক; মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ শ্যামলা হয় এবং লম্বা হয়, শনি তার প্রতীক; মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ বেঁটে বা খাটো হয়, বুধ তার প্রতীক, সব মানুষ লিডার বা নেতা হয় না, কিছু কিছু মানুষ নেতা হয়, সূর্য তার প্রতীক; তেমনি সব মানুষ কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় পারদর্শী হয় না, কিছু কিছু মানুষ হয়, বিশ্বকর্মা যার প্রতীক; এভাবে প্রতিটি দেব-দেবী কিছু না কিছুর প্রতিনিধি বা প্রতীক; কোনো দেব-দেবীর পূজা করা মানে সেই দেব-দেবী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতি তার আগ্রহকে প্রকাশ করা। সরস্বতীর পূজা করা মানে শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করা, লক্ষ্মীর পূজা করা মানে ধন সম্পত্তির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা, শিব-কালী-দুর্গার পূজা করা মানে সমাজ সংসারের অশুভশক্তিকে দমন করতে তাণ্ডবলীলা করার আগ্রহকে প্রকাশ করা। একইভাবে কারিগরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় ভালো করার যাদের আগ্রহ, তারা করে বিশ্বকর্মার পূজা।

এরপর বলতে পারেন, সবই তো বুঝলাম, তাহলে বিশ্বকর্মার পূজা করে হিন্দুরা কারিগরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় এত পিছিয়ে কেনো ?

ভুলে যাবেন না, হিন্দুরাই নির্মান করেছিলো পৃথিবীর প্রথম সভ্যতা, যা সিন্ধু, আর্য ও হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা নামে পরিচিত; হিন্দুরাই প্রথম লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার করে, যার মাধ্যমে প্রথম রচিত হয় বেদমন্ত্র, হিন্দুরাই শূন্যসহ সংখ্যাগুলোর আবিষ্কারক, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞানের সকল হিসাব নিকাশ ও আবিষ্কার। হিন্দুরাই চিকিৎসা বিদ্যার জনক, যার নাম আয়ুর্বেদ শাস্ত্র; হিন্দুরাই চাকা আবিষ্কার করে ঘোড়ার গাড়ি নির্মান করে, যার নাম রথ। হিন্দুরাই জলযান হিসেবে প্রথম নৌকা আবিষ্কার করে, যার কাহিনী আছে মৎস্য অবতারের ঘটনায়। হিন্দুরাই প্রথম ভয়ংকর সব মারণাস্ত্রের আইডিয়া দিয়েছে, যার কিছু বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র, যার প্রয়োগে সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে, এরকম অস্ত্র এখনও বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারে নি, কিন্তু ভবিষ্যতে একসময় পারবে, যেহেতু এর ইঙ্গিত দেওয়া আছে পুরাণে। 

যা হোক, এরকম জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রে হিন্দুরাই প্রথম পদক্ষেপ ফেলেছে বা পথ দেখিয়েছে, সেই পথে এগিয়েছে অন্যরা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সভ্যতার শুরুর দিকে হিন্দুদের এই জ্ঞান বিজ্ঞান মধ্যযুগে এসে স্তিমিত হয়ে গেলো কিভাবে ?

মানুষ যখন বেশি সভ্য হয়, তখন সে বেশি ভদ্র হয়, আর ভদ্ররা অন্যের হাতে মার বেশি খায়। হিন্দুদের ক্ষেত্রেও এই ঘটনাই ঘটেছে। বেশি সভ্য হয়ে, বেশি ভালোমানুষী দেখাতে গিয়ে এরা বিদেশী শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে, আর বিদেশী শক্তি ভারতে ক্ষমতাবান হয়েই হিন্দুদেরকে সবদিক থেকে পিষে মারা চেষ্টা করেছে। ভারতে মুসলিম শাসনের শুরুতে হিন্দুদের প্রায় সবাই ছিলো কমবেশি শিক্ষিত। মোঘল আমলে এসে সেটা ২% এ দাঁড়ায়; কারণ, ভারতের মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয় পুড়িয়ে দিয়েছিলো, না হয় বন্ধ করে দিয়েছিলো। বিদেশি শাসকদের এই জাঁতাকলে পড়ে হিন্দুরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা চালিয়ে যেতে পারে নি, এই সুযোগে মুসলমানরা ভারত থেকে বই পুস্তক নিয়ে গিয়ে নিজেরা সেই বই কপি করে নিয়ে মূল বই পুড়িয়ে ফেলে নিজেদের নামে সেই বই চালিয়ে নিজেদেরকে মহান বিজ্ঞানী ও বিশাল গবেষক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে; পরে ইহুদি খ্রিষ্টানদের হাতে সেই বইগুলো পড়লে, তারা তা থেকে সূত্র নিয়ে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছে। 

এভাবেই ইহুদি ও খ্রিষ্টান বিজ্ঞানীদের হাতে আবিষ্কার হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রায় সকল আবিষ্কার। একটা বিষয় খেয়াল করুন, সময়ের একক হিসেবে পল ও দণ্ডের আবিষ্কারক আমাদের মুনি ঋষিরা, কিন্তু ইহুদি খ্রিষ্টানরা ঘড়ি আবিষ্কার করে সেই সময়কে সেকেন্ড মিনিটে ভাগ করে সময়ের এককের আবিষ্কারক হিসেবে বাহাদুরী দেখাচ্ছে। আবা্র খেয়াল করুন ১৮০০ সালের দিকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব আরম্ভ হলে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো ঘটে, কিন্তু ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ঘটে ভারতের অর্থাৎ হিন্দুদের টাকায়; কারণ, ১৬০০ সালের পর থেকেই- পতুর্গীজ, ফরাসি ও ইংরেজরা ব্যবসার নামে ভারত থেকে প্রচুর টাকা তাদের দেশে নিয়ে যায়, এরপর ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলা দখল করে ভারত দখলের সূত্রপাত ঘটালে বিভিন্নভাবে প্রচুর টাকা ইংল্যাণ্ডে চলে যায়, এসব টাকাতেই হয় ইউরোপের শিল্পবিপ্লব এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কারগুলো। ফলে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব এবং তাদের বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের পেছনেও ছিলো হিন্দুদের হাত।

একটা কথা মনে রাখতে হবে যে- প্রাচীন হিন্দু সমাজ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে ছিলো সমৃদ্ধ, মাঝখানে বিদেশী শাসকদের হিন্দুবিরোধী এবং জ্ঞান বিরোধী নীতির কারণে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সেই ধারা থেমে হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু বিলুপ্ত হয়ে যায় নি, তাই আবার ভারত তথা হিন্দুরা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, যেহেতু তাদের মাথার উপর কোনো বিদেশি শাসন নেই।

জ্ঞান বিজ্ঞা্নের উৎকর্ষ এক প্রজন্মে হয় না, এর জন্য কয়েক প্রজন্ম দরকার; কিন্তু তারপর হিন্দুদের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাস যেহেতু স্বর্ণোজ্জ্বল, সেহেতু স্বশাসনের মাত্র ৭০ বছরের মধ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভারত তথা হিন্দুরা এত অগ্রগতি লাভ করেছে যে, হিন্দুদের সাফল্যে বিশ্ব চমকে যাচ্ছে- যেমন মাত্র কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে মঙ্গলে যান প্রেরণ, এই অভিযানে আমেরিকার লেগেছে কয়েক হাজার কোটি; পৃথিবী থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আকাশে ঘূর্ণায়মান কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অভিযান, ৫ হাজার কি.মি ব্যাসের ক্ষেপনাস্ত্র নির্মান, হিন্দুদের এসব পরিকল্পনা ও সাফল্যে বিশ্ববাসী শুধু চমকেই যায় নি, অবাকও হয়েছে।

যা হোক, ফটোপোস্টে চীনের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, বিশ্বকর্মা পূজা না করেও জ্ঞান বিজ্ঞানে চীনের অগ্রগতি ভারতের চেয়ে বেশি। একটা কথা ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার যে- বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং এ সংক্রান্ত প্রচেষ্টাই বিশ্বকর্মার পূজা, বিশ্বকর্মার মূর্তিতে ফুল জল দিয়ে মন্ত্র পড়া বিশ্বকর্মার পূজা নয়, এটা লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা, তবে এই আনুষ্ঠানিকতারও একটা মূল্য আছে, আর সেটা হলো- প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিশ্বকর্মার পূজার শিক্ষাটাকে প্রবাহিত করা, এই আশায় যে ভবিষ্যতের কেউ না কেউ তো এই শিক্ষাটাকে উপলব্ধি করে তাকে কাজে লাগাতেও পারে।

যা হোক, একটু আগেই বলেছি, বৈদেশিক শাসন, ভারতের হিন্দুদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে রোধ করেছে; স্বশাসনের পর ভারতের মুসলিম প্রেমী কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার এবং মূর্খ আঞ্চলিক দলগুলোও ভারত তথা হিন্দুদের অগ্রগতিকেও বহু পরিমাণে রোধ করেছে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এই সমস্যা ছিলো না; ১৯৪৯ সাল থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি কোনো রকম বিরোধিতা ছাড়াই একইভাবে এবং এককভাবে চীন শাসন করে যাচ্ছে, ফলে শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বর্তমানে চীনের যে সাফল্য, আমি মনে করি, এটা কিছুই নয়, তাদের অগ্রগতি আরো বেশি হওয়া দরকার ছিলো। ভারতের হিন্দুত্বববাদী বিজেপি সরকার, মাত্র কয়েকবছর দেশ শাসন করে ভারতকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে, আমি মনে করি, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মতো বিজেপি সরকার যদি দেশ পরিচালনার সময় ও সুযোগ পায়, চীন তো ছাড়, আমেরিকাও ভারত তথা হিন্দুদের পায়ে এসে তেল মালিশ করবে। 

চন্দ্রযান-২ এর অভিযানের পর আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ভারতের ইসরোর সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে; পৃথিবীর সেরা মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা কিন্তু আজ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে নি, এই বিষয়টিও কি ভারত তথা হিন্দুদের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করে না ?

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একটা জাতির উন্নতি হতে যত সময় লাগে, শিল্পসংস্কৃতিতে তত সময় লাগে না; একারণেই স্বশাসনের মাত্র ৫০/৬০ বছরের মধ্যে ভারতীয় নাচ এবং গান বিশ্ব দখল করে ফেলেছে; ভারতীয় সিনেমা বাহুবলী, আমেরিকান সিনেমাকে টক্কর দিয়েছে, নোবেল পুরষ্কার চালু হওয়ার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছে, এটা কি সরস্বতী পূজার শিক্ষা বা দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ নয় ?

যে ফটোপোস্টর উপর আলোচনা করছি, সেই ফটোটি ফেসবুকে ছাড়া হয়েছে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পক্ষ থেকে, এটা একটা নাস্তিক সংগঠন, এরা হিন্দুধর্ম না মানলেও এবং হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করলেও, ইসলামের কুসংস্কার ও বিজ্ঞানবিমুখতার বিরুদ্ধে কিছু বলে না; কারণ, তাহলে কথা বলার জন্য মুখ এবং চিন্তা করার জন্য মাথা, ঘাড়ের উপর থাকবে না। এদের উদ্দেশ্যে আমার প্রশ্ন হচ্ছে- বিশ্বকর্মার পূজা করে যদি কোনো ফল না হয়, তোরা বিশ্বকর্মার পূজা না করেই বা কোন বাল তুললি ? প্রতিষ্ঠার তো অনেক বছর হয়ে গেলো, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির কি একজন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে পেরেছে ?

এটা ঠিক, ফুল জল দিয়ে বিশ্বকর্মার পূজা করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিশ্বকর্মাকে পৌঁছে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো লাভ নেই বা লাভ হবে না; কিন্তু বিশ্বকর্মার শিক্ষাটাকে যদি আমরা কাজে লাগাই, অচিরেই আমরা যে চীন, জাপান, কোরিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, এবং আমেরিকাকেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ছাড়িয়ে যেতে পারবো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কারণ, ভারতের প্রকৃত হিন্দু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়, সেই অগ্রযাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

বিশ্বকর্মা সম্পর্কে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির ফটোপোস্ট, নিজের টাইমলাইনে পোস্ট করে তাতে মধুসূদন মাহাতো নামের এক বলদা মন্তব্য করেছে, 

"আমার মোটর সাইকেল তেল ছাড়া বিশ্বকর্মার দোহাই (দিয়ে) চলে না। তাই আজকে গাড়ি পরিস্কার ও পূজো কোনটাই করি না।"

-কতখানি নির্বোধ হলে কেউ এই ধরণের মন্তব্য করতে পারে, সেটা ভেবেই তো আমি অবাক হচ্ছি। সাধারণভাবে সন্তানের জন্ম দিতে গেলে নারী ও পুরুষের মিলন ঘটাতেই হবে, এটা সন্তান জন্মদানের যেমন একটা অপরিহার্য শর্ত; তেমনি পেটের ক্ষুধা মেটাতে গেলে এবং দৈহিক শক্তি পেতে গেলে খাবার খেতেই হবে; কারণ, এটা ক্ষুধা নিবারণ ও দৈহিক শক্তি অর্জনের অপরিহার্য শর্ত। একইভাবে গাড়ি চালাতে গেলে তাতে কোনো না কোনো ফুয়েল বা জ্বালানি দিতেই হবে, এটা যেকোনো ইঞ্জিন চালানোর অপরিহার্য শর্ত। গাড়ি চালানোর জন্য শক্তিরূপ যেকোনো জ্বালানি প্রয়োজন, এই যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, এই জ্ঞানেরই প্রতীক হলো বিশ্বকর্মা; সুতরাং কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে, প্রযুক্তির পৌরাণিক প্রতীক বিশ্বকর্মাকে অবজ্ঞা করা মানে ঈশ্বরপ্রদত্ত জ্ঞানকে অবমূল্যায়ণ করা।

শেষে এই বলদা বলেছে, "তাই আজকে গাড়ি পরিষ্কার ও পূজো কোনটাই করি না।"

বিশ্বকর্মার উপর অভিমান বা রাগ করে গাড়ি পরিস্কার না করলে বিশ্বকর্মার কিছু যাবে আসবে না, যাবে আসবে তোর। গাড়ি দ্রুত পুরাতন হয়ে লক্কর ঝক্কর হয়ে যাবে, ফলে বেচতে গেলে দাম পাবি না; আর এই গাড়িতে চড়ে বা নতুন একটা গাড়ি কিনতে গেলে তুই যে আসলে বিশ্বকর্মার মানসপুত্র গাড়ি নির্মাতাদের কাছেই মাথা নত করিস, সেটা কি তুই বুঝিস ? গাড়ি নির্মা্তাদের কাছে মাথা নত করা মানে বিশ্বকর্মার কাছেই মাথা নত করা, মানে বিশ্বকর্মারই পূজা করা, সেটাও কি তুই বুঝিস ? সেটা তুই বুঝবি কেমনে, সেই জ্ঞান কি তোর আছে ? যদি তোর সেই জ্ঞান থাকতো, তাহলে কি বিশ্বকর্মার বিরোধী নাস্তিকদের এই ফটোপোস্টকে সাপোর্ট করে কোনো মন্তব্য করতে পারতিস ? পারতিস না।

জয় হিন্দ।

জয় শ্রী বিশ্বকর্মা।

বিশ্বকর্মার বাহন হাতি কেনো ?


বিশ্বকর্মার বাহন হাতি কেনো ? 

এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্বকর্মা পূজার মূল তত্ত্ব ও এই পূজা করার তাগিদ।

শিল্পী ও নির্মাতাদের দেবতা হলেন বিশ্বকর্মা, এজন্য বিশ্বকর্মাকে বলা হয় দেব শিল্পী, তিনি দেবতাদের প্রয়োজনীয় সকল অস্ত্রপাতি এবং যানবাহনও তৈরি করে দেন। বিশ্বকর্মার চার হাত, তিনি হাতির পিঠে বসে থাকেন, তার চার হাতের এক একটিতে থাকে- দাঁড়িপাল্লা, হাতুরি, ছেনী এবং কুঠার; এগুলোর তত্ত্ব জানলেই উপলব্ধি করা যাবে, বিশ্বকর্মার পূজা কী ও কেনো ?

ব্যবসায়ীরা যেমন বেশী করে গণেশ পূজা, তেমনি কারিগররা করে বিশ্বকর্মার পূজা, এর কারণ কী ?

দেব বিশ্বকর্মা হলেন নির্মান শিল্পী বা্ নির্মাতা, তাই যারা নির্মান পেশায় বা কারিগরী কাজে জড়িত, তারা এই দেবতার আশীষ কামনায় এনার পূজা করে থাকে, যাতে তারা তাদের পেশায় আরো দক্ষতা লাভ করতে পারে। নির্মাতা বা কারিগরদের যন্ত্রপাতির প্রতীক হলো হাতুড়ি, ছেনী ও কুঠার, তাই এগুলো হাতে ধরে থাকেন দেব বিশ্বকর্মা। কিন্তু তার হাতে দাঁড়িপাল্লা কেনো, দাঁড়ি পাল্লা তো ব্যবসায়ীদের প্রতীক ? 

যারা কোনো কিছু নির্মান করে বা বানায়, তারা তা বিক্রির জন্যই বানায়, এই হিসেবে নির্মাতাদেরও প্রধান উদ্দেশ্য ব্যবসা ই, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকর্মার হাতে দাঁড়িপাল্লা থাকতেই পারে, কিন্তু এর অন্য একটি ব্যাখ্যাও আছে।

দাঁড়িপাল্লা হলো ব্যালান্স বা ভারসাম্য বা সমতার প্রতীক। দাঁড়িপাল্লার দুই দিকে থাকে দুটো পাল্লা এবং এর পাল্লাকে ধারণকারী দণ্ডের মাঝখানে সমতাসূচক একটি কাঁটা থাকে, এই কাঁটা যখন ভূমির সাথে ৯০ ডিগ্রী কোন করে থাকে তখন পাল্লা দুটির সমতাকে নির্দেশ করে। 

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা হলেন জ্ঞান ও কর্মের সমতার প্রতীক, সবাই জানেন যে, জ্ঞান ছাড়া কোনো কর্ম করা যায় না বা কোনো কিছু নির্মান করা যায় না; বিশ্বকর্মার হাতের দাঁড়িপাল্লার দুটো পাল্লা এটা নির্দেশ করে যে, তার এক পাল্লায় রয়েছে জ্ঞান এবং অন্য পাল্লায় রয়েছে কর্ম এবং তাতে জ্ঞান ও কর্মের একটা ব্যালান্সও রয়েছে। যে ব্যক্তির জীবনে এই জ্ঞান ও কর্মের ব্যালান্স রয়েছে, তার জীবনে উন্নতি হতে বাধ্য। কেউ যদি জ্ঞান অর্জন করে বসে থাকে অর্থাৎ জ্ঞানকে কাজে না লাগায় তার জীবনে যেমন উন্নতি হবে না, তেমনি যার জ্ঞান নেই, সেও কোনো কর্ম করতে পারবে না, এটা যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনি এটাও চিরসত্য যে, যে ব্যক্তি কোনো একটি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন না ক'রে একাধিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যায়, পরিশেষে সে আসলে সে কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারে না বা তার জ্ঞানকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, এজন্যই প্রবাদ বাক্যের সৃ্ষ্টি হয়েছে- Jack of all trades, masater of none, এর মানে হচ্ছে যে ব্যক্তি সকল কাজ করতে চায় বা যায়, সে আসলে কোনো কাজই ঠিক মতো করতে পারে না; এটা ঘটে জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যের অভাবে। যে জ্ঞান অর্জন করা হবে, সেটাকেই ঠিকমতো কাজে লাগাতে হবে, এটাই হলো জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্য, এই ভারসাম্যের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো- অর্জিত জ্ঞানকে যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে যদি আরও জ্ঞান অর্জনের জন্য জ্ঞানের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কর্মকে অবহেলা করা হবে, পরিণামে আসবে দুঃখ, অভাব; আবার কর্মের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়লে আসবে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ । তাই জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যহীনতা মানেই কোনো না কোনো সমস্যা। এই ভারসাম্যকে বজায় রাখার প্রতীকই হলো বিশ্বকর্মার হাতের দাঁড়িপাল্লা।

এবার নজর দিই বিশ্বকর্মার বাহন হাতির দিকে।

আমি আমার অনেক লেখায় আগেই বলেছি, দেব-দেবীরদের বাহন বলে কিছু হয় না; কারণ, দেব-দেবীরা এমনিতেই সুপার পাওয়ারের অধিকারী, এখানে সেখানে যাওয়ার জন্য তাদেরকে কারো উপর নির্ভর করতে হয় না। তাই দেব-দেবীদের বাহন বলে যাদেরকে আমরা মনে করি, সেগুলো আসলে বহন করে বিশেষ কিছু তথ্য, যা জানলে ও সেই মতো কাজ করলে মানুষের মঙ্গল বা কল্যান নিশ্চিত।

হাতি হচ্ছে স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, শক্তিশালী এবং মানুষ ছাড়া অন্যানী প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিমানও বটে। মানব সমাজে- নির্মাতা বা কারিগররাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণী, যাদের কাছে অন্য সকল শ্রেণীর মানুষ আসতে বা প্রতীকি অর্থে নত হতে বাধ্য। আপনার পোষাক প্রয়োজন, আপনি দর্জির কাছে যেতে বাধ্য; আপনার ছুরি-বটি-দা প্রয়োজন, আপনি কামারের কাছে যেতে বাধ্য; আপনি বাড়ি বানাবেন, আপনি স্থাপত্য ইঞ্জিনিয়ার এবং রাজমিস্ত্রী, রং মিস্ত্রি, ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাছে যেতে বাধ্য; আপনি ঘরের আসবাপত্র বানাবেন, আপনি সুতার বা কাঠমিস্ত্রির কাছে যেতে বাধ্য; আপনি গহনা বানাবেন, আপনি জুয়েলার বা সোনারের কাছে যেতে বাধ্য: আপনি সাইকেল, মোটর সাইকেল বা গাড়ি কিনবেন, আপনি এসবের নির্মাতা কোম্পানির কাছে যেতে বাধ্য; এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনি কারিগর বা নির্মাতাদের কাছে জিম্মি। জীবনকে সহজ ও সুন্দর করতে হলে তাদের কাছে আপনাকে যেতেই হবে, এভাবে নির্মাতা বা কারিগর শ্রেণী হলো মনুষ্য সমাজে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণী, যাদের জ্ঞান ও কর্মের কাছে আপনি মাথা নত করতে বাধ্য। মানব সমাজের এই শক্তিশালী শ্রেণীর প্রতীক হলো বিশ্বকর্মার সাথে থাকা হাতি, যে স্থলচরদের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী।

বিশ্বকর্মার থাকে চার হাত, এই চার হাত এই তথ্যও দেয় যে- শিল্পী, নির্মাতা বা কারিগড়রা, সাধারণ মানুষের মতো নয়, তারা বিশেষ শ্রেণীর এবং বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ, কেননা হাত হচ্ছে শক্তির প্রতীক, যার যত হাত তার তত বেশি শক্তি, এই সূত্রেই সর্বশক্তির প্রতীক হিসেবে দুর্গার দশ হাত।

প্রতিবছর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিন বিশ্বকর্মার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। 

পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী বিশ্বাস করা হয় যে- বিশ্বকর্মা, স্বর্গ, লঙ্কা নগরী, দ্বারকা নগরী এবং ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মান করেছেন। এছাড়াও বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর বিমান বা পুষ্পক রথ যা পরে রাবন ছিনাতাই করে, তা, ইন্দ্রের বজ্র এবং পুরীর প্রসিদ্ধ জগন্নাথ মূর্তিও বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেছেন। 

ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৮১ ও ৮২ নং সূক্তে বিশ্বকর্মা সম্পর্কে বলা আছে।

বিশ্বকর্মার পূজার মন্ত্র হলো-

"দেবশিল্পিন্ মহাভাগ দেবানাং কার্যসাধক।

বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টফলপ্রদ॥"

এবং বিশ্বকর্মার ধ্যান ও প্রণাম মন্ত্র হলো-

ওঁ দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।

বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।। 

ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।

বিশ্বকর্মার মানস সন্তান- শিল্পী, কারিগর ও নির্মাতারা- বিশ্বকর্মার পূজা করে, বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে, সমাজ সংসার ও সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে আরো ভূমিকা রাখুক, এই কামনায় বলছি-

জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় হোক বিশ্বকর্মা এবং তার মানস সন্তানদের।

জয় হিন্দ।

Friday, 11 September 2020

শিবের গাঁজা খাওয়া : প্রকৃত ব্যাপারটা কী ?


শিবের গাঁজা খাওয়া : প্রকৃত ব্যাপারটা কী ?

অনেক মুসলমানই শিবকে নিয়ে এই ভাবে কটুক্তি করে যে, শিব গাঁজা খায়, আর গাঁজাখোর শিবকে হিন্দুরা পূজা করে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

যারা এই ভাবে কটূক্তি করে, তারা জানে না শিবের আসল পরিচয় এবং তারা এটাও জানে না যে, গাঁজা আসলে কোনো মাদকদ্রব্য নয়। এই দুটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হবে, আজকের এই পোস্টে।

প্রথমেই বলি শিব কে ?

হিন্দুশাস্ত্র মতে, সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর হলো পরমব্রহ্ম, যাকে শুধু ব্রহ্মও বলা হয়। পরমাত্মারূপে এই ব্রহ্ম সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত, এই জন্যই হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, 

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

এর অর্থ হলো- সকলের মধ্যে ব্রহ্ম বিদ্যমান। - (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৩/১৪/১, বেদান্ত দর্শন)

পরমব্রহ্ম, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, এই তিনটি রূপে তার কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তার নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তার নাম বিষ্ণু; যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তার নাম শিব বা মহেশ্বর। কিন্তু আমরা স্থূল দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে বিভক্ত করে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরে এই তিনভাগে বিভক্ত করেছি এবং এই তিনটি সত্ত্বাকে আলাদা আলাদা তিনটি রূপ দান করেছি। প্রকৃতপক্ষে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, এগুলো জাস্ট তিনটি নাম এবং এই তিনটি নাম পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের নাম মাত্র।

ব্রহ্ম এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ব্যাপারটা সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রীর হাতে তিনটি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে; তো যখন প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী যে মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করেন বা ফাইলে সই করেন, তখন তিনি কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী। ব্রহ্মও ঠিক সেরূপ, তিনি যখন যে কাজ করেন, তখন সেই রূপের নামে কাজটি করেন, সেই তিনটি নামই হলো- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।

এই ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার করার জন্য বলছি, অনেকে বা সকলেই জানেন যে, বিষ্ণু হলো পালন কর্তা। তাহলে বিষ্ণুর অবতারদের তো যুদ্ধ, ধ্বংস, বিনাশ এই সব করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিষ্ণুর আংশিক অবতার রাম কি যুদ্ধ করে রাবনের বংশকে বিনাশ করে নি ? বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ কি নিজে কংস, শিশুপাল, নরকাসুরকে হত্যা করে নি ? কৃষ্ণ কি ভীমের মাধ্যমে জরাসন্ধ, দুর্যোধনকে হত্যা করায় নি ? কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের মাধ্যমে কুরুবংশকে ধ্বংস করে নি ? বিষ্ণু যদি কোনো আলাদা সত্ত্বা হতো আর তার কাজ শুধু যদি পালন করা হতো, তাহলে কি সে এই যুদ্ধ, বিনাশগুলো করতো ? আসলে এগুলো করিয়েছেন ব্রহ্ম, আমাদের শাস্ত্রকাররা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। না হলে পৃথিবীতে এত বিষ্ণুর অবতার, সেই তুলনায় ব্রহ্মা ও শিবের কোনো অবতার নেই কেনো ? আসলে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর তো আলাদা কেউ নয়। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তারই নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তারই নাম বিষ্ণু এবং যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তারই নাম শিব বা মহেশ্বর; যে কথা বলা আছে গীতার এই শ্লোকে-

“অবিভক্তংচ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্।

ভূতভর্তৃ চ তজজ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।”

অর্থ- পরমেশ্বরকে যদি যদিও সমস্ত ভূতে বিভক্তরূপে বোধ হয়, কিন্তু তিনি অবিভক্ত। যদিও তিনি সর্বভূতের পালক, তবু তাঁকে সংহার কর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলে জানবে।

এতক্ষণে পাঠক-পাঠিকাদেরকে নিশ্চয় এটা বোঝাতেপেরেছি যে, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা আলাদা কেউ নয়, তারা একই ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ। 

একটু আগেই বলেছি, আমাদের শাস্ত্রকাররা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র।

তার মানে আমাদের মুনি ঋষিরা- বিশ্বের সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের থিয়োরিকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রকৃতি রূপ ঈশ্বর বা ব্রহ্মকে সর্বশক্তিমান হিসেবে ধরে নিয়ে, তার প্রধান তিনটি রূপ- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এবং তার পরবর্তী অন্যান্য দেব-দেবীগুলোকে কল্পনা করে নিয়েছেন মাত্র। এই বহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এবং অন্যান্য দেব-দেবী কোনো দিনই বাস্তব পৃথিবীতে ছিলো না, তাই তাদেরকে নিয়ে যেসব পৌরাণিক গল্প, তা কোনো দিন পৃথিবীতে ঘটে নি; আমাদের শাস্ত্রকাররা, বিভিন্ন দেব-দেবীকে নিয়ে যেসব গল্প লিখেছে, তার মূল কারণ সেই সব গল্পের মাধ্যমে লোকশিক্ষা দেওয়া।

তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, দেব-দেবীরা যদি বাস্তব পৃথিবীতে কখনো না এসে থাকে, তাহলে তাদের কি কোনো শক্তি নেই ? অবশ্যই আছে। কোনো অঙ্কের সমাধানের জন্য আমরা যেমন এক্স ওয়াই জেড ধরে নিই, যদিও সেই অঙ্কের মধ্যে এক্স ওয়াই জেড নাই, কিন্তু অঙ্কের সমাধানের পর আমরা কিন্তু এক্স ওয়াই জেড এর একটি মান ঠিকই পাই, যেটা ঐ অঙ্কের ক্ষেত্রে এক্স, ওয়াই, জেড এর মান বা শক্তি। তেমনি বিশ্বের সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের মহাজটিল অঙ্কের সমাধানের জন্য আমাদের মহাগণিতবিদ মুনি-ঋষিরা, এক্স-ওয়াই-জেড রূপ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাদের যে মান বা শক্তি পেয়েছেন, তাহলো- ব্রহ্মা= সৃষ্টি, বিষ্ণু= পালন, শিব= ধ্বংস এবং এরকম আরো ইত্যাদি ইত্যাদি।

দেব-দেবীরা যে কাল্পনিক, এই কথা মেনে নিতে যদি কারো মনে এখনও দ্বিধা থাকে বা কষ্ট হয়, তাদের জন্য আরও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের মুনি ঋষিরা পৃথিবীর প্রত্যেকটি শক্তিসত্তাকে কোনো না কোনো দেবতা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। যেমন- বাতাসের যে শক্তি, সেটা একজন দেবতা, নাম পবনদেব। জলের শক্তি বরুনদেব। আগুনের শক্তি অগ্নিদেব। মাটির যে শক্তি, সেও একজন দেবী, মাতা বসুন্ধরা। এই ভাবে প্রকৃতির সব শক্তিই হিন্দুদের কোনো না কোনো দেব-দেবীরূপে পূজিত। শুধু তাই নয়, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিশালী প্রাণীও হিন্দু দেব-দেবীদের সহযোগীশক্তি, যেমন- সিংহ, হাতি, ময়ূর, ইঁদুর, হুনুমান ইত্যাদি। প্রকৃতির যে সকল শক্তির মাধ্যমে আমরা টিকে থাকি, সেই সকল অদৃশ্য ও দৃশ্যমান শক্তি, এই ভাবে হিন্দু শাস্ত্রে পূজিত বা শ্রদ্ধার পাত্র।

প্রকৃতিতে প্রভাব বিস্তার করা- আগুন, জল, বায়ুর মতো শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে অন্যান্য যে শক্তি বা দেব-দেবীর কথা হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়, সেগুলো যে আমাদের মুনি-ঋষিদের ধরে বা কল্পনা করে নেওয়া, আশা করছি- সেই বিষয়টি এখন পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। এর সাথে আরো একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, পৃথিবীতে যার জন্ম হয় নি, তার দুটি জিনিসের কখনো প্রয়োজন হবে না, সে দুটি জিনিস হলো খাদ্য ও যৌনতা। অবতারগণ পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, তাই তাদের খাদ্যের ও যৌনতার প্রয়োজন ছিলো। এই জন্যই রাম, কৃষ্ণ- খাবার খেয়েছেন এবং বিয়ে করেছেন এবং তাদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যে শিবের কখনো পৃথিবীতে জন্মই হয় নি, তার খাবারের প্রয়োজন হবে কেনো ? 

দেব-দেবীরা কাল্পনিক, এই কথা মেনে নিতে যাদের এখনও অসুবিধা হচ্ছে, তাদের জন্য বলছি- পরশুরাম, রাম, বলরাম, কৃষ্ণ, এরা পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, তাই এদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, গণেশ- এদের কি কখনো মৃত্যু হয়েছে ? এদের মৃত্যু সম্পর্কে কি আপনি কিছু জানেন বা বলতে পারবেন ? পারবেন না। কারণ, আগেই বলেছি, যারা পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি, তাদের যেমন খাদ্যের ও যৌনতার প্রয়োজন হবে না, তেমনি তাদের কখনো মৃত্যুও হবে না। অবতারগন ছাড়া কোনো দেব-দেবীর মৃত্যুর কোনো ইতিহাস বা ঘটনা নেই, এই ঘটনা ই প্রমান করে যে, পৃথিবীতে তারা কখনো এবং কোনোদিনই ছিলেন না।

এবার নিশ্চয় প্রমাণিত যে, শিব পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি; তাহলে যে পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি, তার কোনো খাদ্যের প্রয়োজন হবে না, যেটা আগে বলেছি। তাহলে শিবের গাঁজা খাওয়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে ?

শিব যে কখনো গাঁজা খায় নি বা শিবের যে গাঁজা খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সেই বিষয়টি নিশ্চয় এতক্ষণে পাঠকেদর কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তাহলে এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে- শিবের নামে এই অপবাদের উৎপত্তি আসলে হলো কিভাবে ?

আমাদের মুনি-ঋষিরা ধ্যান করতেন। ধ্যান আসলে গবেষণা। হিন্দিতে ধ্যান শব্দের অর্থ মনোযোগ। তার মানে কোনো কিছুর প্রতি মন নিবিষ্ট করাই হলো ধ্যান। আর যেখানে মন নিবিষ্ট হয়, সেখানেই কোনো নতুন কিছুর উদ্ভব বা আবিষ্কার হয়। এই ধ্যান বা গবেষণা করতে গিয়ে আমাদের মুনি-ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন, প্রকৃতির লক্ষ লক্ষ গাছ পালার মধ্যে রয়েছে অজস্র ভেষজ বা ঔষধি গুন। এ থেকেই তারা আবিষ্কার করেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্র, যা পৃথিবীর প্রথম চিকিৎসা জ্ঞান। এই চিকিৎসা জ্ঞান বেদের অংশ বলেই এর নাম আয়ুর্বেদ। অর্থাৎ বেদ এর যে জ্ঞান মানুষের আয়ু বাড়ায় তাই আয়ুর্বেদ। এই আয়ুর্বেদ বলছে, গাঁজার রয়েছে অসংখ্য ঔষধি গুন, যা স্বল্পমাত্রার ব্যবহারে মানুষ তার উপকার পেতে পারে।

কিন্তু গাঁজা খেলে যেহেতু একধরণের নেশা হয় এবং মানুষ এটা বার বার খেতে বাধ্য হয়, তাই আধুনিক যুগ শুরু হলে, অনেকেই এটাকে মাদক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে এবং এটা এবং এর সেবনকারীরা, সমাজে একেবারে ঘৃণিত না হলেও তারা সমালোচনার পাত্র হয়ে পড়ে। 

স্বল্প পরিমানের গাঁজা খাওয়ার যে বিজ্ঞানভিত্তিক কী উপকারিতা, সেটা আমি একটু পরেই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো; কিন্তু গাঁজা খেলে যে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাজে বা কোনো বিষয়ে গভীর মনোযোগের সৃষ্টি হয় বা গাঁজা সেবনকারী কোনো বিষয়ে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে পারে, এটা কিন্তু বাস্তবভাবে প্রমাণিত। এজন্যই আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান বা গবেষণায় মনোযোগ বৃদ্ধির সুবিধার্থে স্বল্প পরিমান গাঁজা সেবন করতেন।

আমাদের মুনি ঋষিদের পরম্পরা হলো বর্তমানের সাধু-সন্ন্যাসী, এই পরম্পরা চলে আসছে প্রায় ৮/১০ হাজার বছর আগে থেকে; তো মুনি ঋষিরা যা করতেন, তার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে এখনও আছে। এই ভাবে সমাজ সংসার ত্যাগ করা, পাহাড় জঙ্গল শ্মশানে বিচরণকারী সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে গাঁজা সেবনের প্রচলন এখনও আছে এবং প্রাচীন বা মধ্যযুগেও ছিলো। কিন্তু মধ্যযুগের শেষ এবং আধুনিক যুগের শুরুর দিকে যখন গাঁজাকে মাদক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হলো, তখন সাধু-সন্ন্যাসীদের মতো ব্যক্তি কেনো গাঁজা খায়, এই প্রশ্নের জবাবে আমাদের সাধু-সন্ন্যাসীরা বিব্রত হলো; কারণ, এর ভেষজগুন সম্পর্কে তাদের কোনো স্পষ্ট এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা ছিলো না, কিন্তু তারা যেহেতু খায় এবং তাদেরকে যেহেতু এটা খেতে হবে, তাই আত্মপক্ষ সমর্থন ক’রে এটা সেবনের জন্য তারা বলে দেয়, আমাদের মহাদেব শিবও গাঁজা সেবন করতেন এবং শিবের বেশ ভূষা যেহেতু সাধু সন্ন্যাসীদের মতোই এবং সে সব সময় থাকে ধ্যানমগ্ন, সেহেতু শিবের সাথে গাঁজা সেবনের এই গল্প খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে যায় এবং লোকজন তা বিশ্বাস করে ফেলে।

এভাবেই সমাজে শিবের গাঁজা সেবনের গল্প ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের অন্নদামঙ্গল কাব্যের মাধ্যমে তা লোকমনে একেবারে সুপ্রতিষ্ঠিত রূপ পায়; কারণ, সেই কাব্যে বলা আছে, স্বয়ং শিবঠাকুর গাঁজা-ভাং খেয়ে কচুরিপানায় উপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে বেড়াতেন। এইসব বিবেচনা থেকেই বাংলা গান বানানো হয়েছে,

“গাঁজার নৌকা পাহাড় বাইয়া যায়।”

মূলত বন জঙ্গল পাহাড়ে বসবাসকারী ও বিচরণকারী আমাদের স্বল্পজ্ঞানী সাধু সন্ন্যাসীরা নিজেদের গাঁজা সেবনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য মহাদেব শিবের উপর এই কলঙ্ক লেপন করে এবং যেহেতু মনে করা হয় যে, সাধু সন্ন্যাসীরা শাস্ত্র পড়ে এবং তারা শাস্ত্র সম্পর্কে ভালো জানে এবং যেহেতু বেশ ভূষা ও ধ্যানমগগ্নতার দিক থেকে শিব হলো সাধু-সন্ন্যাসীদের রোল মডেল, সেহেতু জনসমাজে শিবের নামে গাঁজা খাওয়ার এই অপপ্রচার খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

যা হোক, অপপ্রচার করে যতই শিবের নামে গাঁজা খাওয়ার অপবাদ দেওয়া হোক, একটা প্রশ্নে এই থিয়োরি সম্পূর্ণ ধ্বসে পড়বে, আর তা হলো, পৃথিবী যে শিব জন্ম নেয় নি, তার খাবারের প্রয়োজন হবে কেনো ? আর যদি কেউ বলে, পৃথিবীতে শিব ছিলেন। তখন তাকে প্রশ্ন করবেন, তাহলে সেই শিব মরলেন কোথায় এবং কিভাবে ? ব্যস, দেখবেন সব চুপ।

আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান বা গবেষণায় গাঁজার উপকারিতা সম্পর্কে জেনেছিলেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন আমাদের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে; আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের সেই কথাই নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায়, এবার নজর দেওয়া যাক সেই দিকে।

গাঁজা, পুরুষের বন্ধ্যাত্বকে দূর করে:

হ্যাঁ,এমনই অবিশ্বাস্য কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গাঁজার নেশা করলে তা গিয়ে প্রভাব ফেলে ব্রেনের ক্যানাবিনয়েড রিসেপটরে, এই ক্যানাবিনয়েড রিসেপটরে গাঁজার ধোয়া যখন তা পৌঁছায় তখন তা স্পার্ম উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এইভাবে সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম পুরুষদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাঁজা ফলদায়ক। ডিটেইলস রিপোর্টি দেখত হলে ক্লিক করুন নিচের এই লিঙ্কে:

http://zeenews.india.com/bengali/lifestyle/marijuana-can-help-in-infertility_139329.html

গাঁজা খেলে ভালো থাকে চোখ :

হ্যাঁ, এরকমই কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। গাঁজা খেলে রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হয়। কারণ, গাঁজার মধ্যে রয়েছে ক্যানাবিনয়েডস, যা অল্প আলোতেও দেখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। গাঁজার উপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়েছেন কানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল গবেষক। তাদের গবেষণাতেই উঠে এসেছে এই তথ্য। তারা বলেছেন, গাঁজার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আলো শনাক্তকরণ ক্ষমতা। মারিজুয়ানা বা গাঁজা বা ক্যানাবিস-এ রয়েছে ৫০০টি প্রাকৃতিক যৌগ। এরমধ্যে কমপক্ষে ৮৫টি যৌগ মিলে তৈরি করে ক্যানাবিনয়েডস। যারমধ্যে সবচেয়ে বেশি গুণসম্পন্ন হল THC বা টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল ও CBD বা ক্যানাবিনল। বিস্তারিত রিপোর্টটি পাবেন নিচের এই লিঙ্কে :

http://zeenews.india.com/bengali/health/marijuana-can-cause-this-benefit-to-you_147425.html

গাঁজা প্রতিরোধ করে অ্যালঝেইমারস : 

বয়স হলে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার রোগ অ্যালঝাইমার এর উদাহরণ রয়েছে সারা বিশ্বে। ডায়বেটিস, ওবেসিটির মতোই বর্তমান সময়ের অন্যতম দুঃশ্চিন্তার বিষয় অ্যালঝাইমার। এই অসুখের চিকিৎসা এখনও অজানা বিশ্বের কাছে। তবে সম্প্রতি জানা গিয়েছে গাঁজার মধ্যে খুব কম পরিমানে থাকা ডেল্টা-৯- টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল বা টিএইচসি রুখে দিতে পারে অ্যালঝাইমারকে।

ইউনিভার্সিটি অফ সাইথ ফ্লোরিডার নিউরোসাইন্টিস্টরা জানাচ্ছেন বয়স্ক মস্তিষ্কের অ্যামাইলয়েড বিটার পরিমান কমিয়ে দিতে পারে গাঁজা সেবন। গবেষকরা বলেন খুব কম পরিমানে গাঁজা সেবনের ফলে ধরে রাখা যাবে স্মৃতিশক্তি। গবেষকরা এখন টিএইচসি-র মধ্যে ড্রাগ ককটেলের ব্যবহার নিয়ে গবেষনা করছেন। 

দেখুন, জার্নাল অফ অ্যালজাইমারস ডিজিসে প্রকাশিত হয়েছে গবেষনার রিপোর্ট। 

http://zeenews.india.com/bengali/lifestyle/marijuana-can-beat-aljhimers_120146.html

এছাড়াও দেখুন, গবেষকরা বলছেন পরিমাণমতো গাঁজা ওষুধ হিসেবে সেবন করলে নাকি অনেক উপকার৷ বিজ্ঞানীদের বাতলে দেওয়া এমনই নয়টি উপকার তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে !

মৃগীরোগ কমায় :

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০১৩ সালেই জানিয়েছেন, মারিজুয়ানা বা গাঁজা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিলে মৃগী বা এই ধরণের কিছু স্নায়ুরোগ থেকে দূরে থাকা যায়৷ বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী জার্নাল অফ ফার্মাকোলজি অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল থেরাপিউটিক্সে ছাপাও হয়েছে তাদের এই গবেষণালব্ধ তত্ত্ব৷

গ্লুকোমা দূরে রাখতে সহায়তা করে :

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আই ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, মারিজুয়ানা গ্লুকোমার ঝুঁকিও কমায়৷ গ্লুকোমা চোখের এমন এক রোগ যা চির অন্ধত্ব ডেকে আনে৷ এখানে মারিজুয়ানা বলতে যা বোঝানো হচ্ছে, তা গাঁজারই আমেরিকান নাম।

গাঁজা, ক্যানসারেরও ‘অ্যানসার’!

এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবেই স্বীকার করেছে৷ ২০১৫ সালে সেই দেশের ক্যানসার বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্যানসার অর্গ-এ জানানো হয়, মারিজুয়ানা অনেক ক্ষেত্রে টিউমারের ঝুঁকি কমিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধকেরও ভূমিকা পালন করে৷ 

কেমোথেরাপির ক্ষতি কম :

ইউএস এজেন্সি ফর ড্রাগ জানিয়েছে, মারিজুয়ানা ক্যানসার রোগীর রোগ যন্ত্রণা অন্যভাবেও কমায়৷ ক্যানসার রোগীকে এক পর্যায়ে কেমোথেরাপি নিতে হয়৷ কেমোথেরাপির অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া৷ মারিজুয়ানা কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত অনেক ক্ষতি লাঘব করে৷

স্ট্রোক কম হয় :

এটি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহ্যামের গবেষকদের উদ্ভাবন৷ তাঁরা গবেষণা করে দেখেছেন, মারিজুয়ানা মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতেও সহায়তা করে৷ ফলে স্ট্রোক-এর ঝুঁকি কমে৷

গাঁজা মাল্টিপল সক্লেরোসিস বিরোধী:

মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিশেষ স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হলে ‘মাল্টিপল সক্লেরোসিস’ বা এমএস নামের এক ধরণের স্নায়ুরোগ হয়৷ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মারিজুয়ানা সেবন করলে এই রোগের ঝুঁকিও কমে৷

ব্যথা নিরোধ :

ডায়াবেটিস চরম রূপ নিলে রোগীদের অনেক সময় হাত-পা এবং শরীরের নানা অংশে জ্বালা-যন্ত্রণা হয়৷ ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা বলছেন, ক্যানাবিস সেই যন্ত্রণা লাঘব করতে সক্ষম৷

হেপাটাইটিস ‘সি’-র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমায় :

হেপাটাইটিস সি-র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কমায় মারিজুয়ানা৷ নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধের মতো গাঁজা সেবন করিয়ে দেখা গিয়েছে এই রোগে আক্রান্তদের শতকরা ৮৬ ভাগেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক কমেছে।

উপরের এই প্রতিবেদনটি যে আমার বানানো নয়, তার প্রমান পাবেন নিচের এই লিঙ্কে গেলে।

http://www.chandpurweb.com/health/2016/04/21/25051

গাঁজা শরীরের বিষ-ব্যথা সারায়:

একটু আগেই অন্য একটা রিপোর্টে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছি, এখানে করছি বিস্তারিত। গাঁজার এই উপকারের কথার বর্ণনা রয়েছে ভারতবর্ষের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিকিৎসা শাস্ত্র অর্থাৎ আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বর্তমানে গাঁজা, ভাং ও মারিজুয়ানার ওপর গবেষণা করে জেনেছেন যে, এ সব দ্রব্য থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ব্যথানাশক ওষুধ প্রস্তুত করা সম্ভব, যা মানুষের কোনো ক্ষতি করবে না। গবেষণাটি করেছে ফ্রান্সের বায়োমেডিকেল ইনস্টিটিউট। এর নেতৃত্ব দিয়েছে আইএনএসইআরএম। ফ্রান্সের গবেষকরা জানান, 'তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের যে অংশের কোষের নিউরনে গাঁজা বা মারিজুয়ানা ক্রিয়া করে তা ওষুধ প্রয়োগ করে নিষ্ক্রিয় করেন প্রথম। এর পর ওই ইঁদুরের শরীরে এসব পদার্থ প্রবেশ করিয়ে দেখা গেছে যে, তাতে ইঁদুরটি বেহুশ হয় না। বরং ওটির প্রাণচাঞ্চল্য ঠিকই থাকে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ব্যথানাশক হিসেবে গাঁজা বা মারিজুয়ানার ভালো গুণ মানুষের বিভিন্ন রোগের ওষুধ এবং অস্ত্রোপচারের জন্য চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। শিগগিরই গাঁজা ও মারিজুয়ানার নির্যাস থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এ ওষুধ প্রস্তুত হবে।

গাঁজার ক্ষতি সিগারেটের চেয়ে কম :

যারা গাঁজাকে খুব নিম্নশ্রেণির নেশা বলে মনে ক’রে সিগারেট ফুঁকেন, তাদের জন্য আছে দাঁত ভাঙ্গা জবাব। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় দেখেছেন, ভাং ও গঞ্জিকা সেবনে ফুসফুসের ক্ষতি, তামাক পাতায় প্রস্তুত সিগারেটের চেয়ে কম।

এই দুটি বিষয়ের উপর করা রিপোর্ট দেখতে পারেন, নিচের এই লিঙ্কে :

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9C%E0%A6%BE

গাঁজা সেবনকারীর হাড় জোড়া লাগে খুব তাড়াতাড়ি :

সম্প্রতি ইসরায়েলের একদল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় দেখেছেন যে, গাজা সেবনকারীদের মধ্যে কারও হাড় ভেঙ্গে গেলে তা যারা গাজাসেবন করেন না তাদের চেয়ে দ্রুত জোড়া লাগে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে গবেষকদল গাজায় থাকা  নন-সাইকোঅ্যাকটিভ কমপাউন্ড ক্যানাবাইডিয়ল (সিবিডি) কিছু ইদুরের উপর পরীক্ষা করেন। গবেষকদলের গবেষক ড. ইয়াঙ্কেল গাবেত বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে সিবিডি হাড় জোড়া হতে এবং খুব দ্রুত ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলতে বেশ কার্যকরীই শুধু নয়, অন্যান্য উপাদানের চেয়ে অধিক কার্যকরী। হাড়ের নতুন টিস্যু তৈরিতে এর রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। সিবিডি’র মাধ্যমে একবার হাড় জোড়া লাগলে তা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত হয়।’ গবেষকদলের মতে, মানবশরীর প্রকৃতিগত ভাবেই এন্ডোক্যানাবাইনয়েড ব্যবস্থা চালু রাখে যা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মেরুদণ্ডের উপর কাজ করে। মানুষের মস্তিস্ক এবং শরীর ক্যানাবাইনয়েডের সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিকভাবেই সাড়া দেয়, তা সেটা আভ্যন্তরীন পর্যায়েই হোক অথবা গাজা সেবনের মাধ্যমেই হোক।

এছাড়াও এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাজা রক্তচাপ সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রন করতে এবং এইচআইভি প্রতিহত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

শুধু তাই নয় কয়েক প্রকার ক্যান্সার নিরাময়েও পর্যন্ত গাজা ভালো ফল দেয়। বিশেষ করে যারা লিওকোমিয়ায় আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিনই চিকিৎসকরা অনুমোদন সাপেক্ষে গাজা ব্যবহার করে আসছেন।

যারা ভাবছেন গাঁজার যখন এতই উপকারিত তখন এটা এখনো কেনো নিষিদ্ধ মাদক ? তাদের জন্য বলছি

ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশ ইতোমধ্যেই চিকিৎসাশাস্ত্রের খাতিরে গাজাকে বৈধতা দিয়েছে। গাজা বৈধকরণে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি রাজ্য। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কলোরাডোতে প্রথম বৈধতা দেয়া হয়েছিল। এরপর কলোরাডোতে গাজা বৈধকরণের সফলতার পর অন্যান্য রাজ্যগুলোও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এর বাইরে নতুন করে চিলি তাদের দেশ গাজাকে শুধু বৈধতাই দেয়নি, প্রতিটি নাগরিক সর্বোচ্চ পাঁচটি গাজা গাছ লাগাতে পারবে সেই অনুমোদনও দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কানাডা, স্পেন, হল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া মারিজুয়ানাকে ঔষধ হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। নিচে উইকিপিডিয়ার একটি লিঙ্ক দিয়েছি, সেখানে দেখতে পাবেন এই তথ্যটি।

যা হোক, প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন মিথ বা সাহিত্যে গাজার ব্যবহার দেখা যায়। কোথাও নেশাদ্রব্য হিসেবে গাজার ব্যবহার দেখা যায়নি। এর ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শাস্ত্রবিদেরা এবং অন্যান্য গবেষকরা দাবি করছেন যে, গাজার ক্ষতি নেই বরংচ রয়েছে শারিরীক লাভ। মানব শরীরের বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণে গাজা মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু ভারতের সেকুলার সরকার, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের এই জ্ঞানকে পাত্তা না দিয়ে কেমিক্যালজাত মাদকের সাথে সাথে গাজাকেও মাদকের পর্যায়ভূক্ত করে এবং ১৯৮৫ সালে আইন করে গাজাকে অবৈধ ঘোষণা করে।

এই রিপোর্টটি সত্য কিনা, তা যাচাই করতে চাইলে দেখুন লিঙ্কটি।

http://www.24updatenews.com/bangla/article/17620/index.html

উপরে বলেছি, আমাদের মুনি-ঋষিরা গাঁজা সেবন করতেন, এটা শুনে যাদের কষ্ট হয়েছে বা মেনে নিতে পারেন নি, তাদের জন্য উইকিপিডিয়া বলছে,

“হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতে হিন্দু ও শিখদের মাঝে এবং নেপালে কান্নাবিস গ্রহণের রেওয়াজ ছিল।এই বনজ উদ্ভিদের নাম ছিল সংস্কৃত ভাষায় গঞ্জিকা বা গাঁজা।” 

এটা যে শুধু হিন্দু মুনি-ঋষিরাই খেতো, তাই নয়, প্রাচীন কালের ইহুদি খ্রিষ্টানরা সেবন করতো এমন কি সেবন করতো, মামলুক আমলের মুসলিম সুফীরাও। দেখুন, উইকিতে কিভাবে বলা আছে এই কথা- 

“কান্নাবিসকে প্রাচীন ইহুদি ও ক্রিস্টানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করত। মামলুক সময়ে বিভিন্ন সূফী সম্প্রদায়রা কান্নাবিস গ্রহণ করত।”

উইকির এই লিঙ্কটি দেখতে পারেন নিচে-

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE

তাস খেলা একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও মজাদার খেলা, কিন্তু এই খেলার সাথে যখন টাকা যুক্ত হলো অর্থাৎ তাস খেলা যখন জুয়ায় পরিণত হলো, তখন সমাজ তাকে খারাপভাবে দেখতে শুরু করলো এবং যারা তাস খেলে, তারা সমালোচনার পাত্র হয়ে পড়লো। শুধু এই ভয়েই অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাস খেলে না। এটা কিন্তু তাসের দোষ নয়, দোষ মানুষের; যারা তাসকে ঐ খারাপভাবে ব্যবহার করা শুরু করেছিলো।

একইভাবে উপকারী গাঁজাকে যারা নেশার দ্রব্যে পরিণত ক’রে একে সমালোচিত করেছে, দোষ সেইসব মানুষদের, কোনোভাবেই গাঁজার নয়।

অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ, এমনকি যদি অতিরিক্ত ভাত বা জল খাওয়া হয়, সেটাও খারাপ। তাহলে আপনি অতিরিক্ত গাঁজা খাবেন কেনো ? আপনার প্রয়োজনে এবং কার্য সিদ্ধির জন্য যতটুকু খাওয়া প্রয়োজন তাই খাবেন।

আগুন খুব উপকারী, যতক্ষণ সেটা নিয়ন্ত্রণে থাকে; আর যেই সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তখনই সেটা হয়ে উঠে বিধ্বংসী। তাই বলে কি আমরা আগুনকে ব্যবহার করছিনা ? না, আগুনের ব্যবহার ছেড়ে দিয়ে আমরা আদিম যুগে ফিরে গিয়েছি বা যাবো ? একইভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে অবশ্যই গাঁজা ক্ষতিকর। যদি আমরা এর থেকে উপকার চাই, তাহলে অবশ্যই এটাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে ব্যবহার করতে হবে।

শেষে একটা কথা না বললেই নয়, গাঁজার উপকারিতা নিয়ে পোস্ট লিখলাম বলে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমি কাউকে গাঁজা খেতে উৎসাহিত করছি। শিব সম্পর্কে মুসলমানদের কটূক্তির জবাব দিতে গিয়ে, আমি শুধু প্রকৃত সত্যটাকে জানালাম, এখন এটাকে কে কিভাবে ব্যবহার করবে, সেটা তার বা তাদের ব্যাপার।

জয় হিন্দ।